‘পান্তা খেয়ে শান্ত হয়ে/কাপড় দিয়ে গায়,/গরু চরাতে পাচন হাতে/রাখাল ছেলে যায়।’
অথবা, ‘রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে,/শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।’ আম্মা বেহেশতে চলে গেছেন ১৯৯০ সালে। কিন্তু স্মৃতিতে তার স্বর এখনো সতেজ। মানুষের কিছু কিছু কণ্ঠ কখনো পুরোপুরি মরে না; দূর থেকে ভেসে আসে।
এ উপমহাদেশে গরু নিয়ে যত ধর্মীয় উত্তেজনা, তার মাঝেও লোকরস কখনো মরে না। মানুষ ভয় পায়, তর্ক করে, মারামারি করে, আবার ঠাট্টাও করে। গরু আমাদের কাছে শুধু প্রাণী নয়, সামাজিক স্নায়ু।
উপমহাদেশে গরু নিয়ে যখন ধর্মের টানাপড়েন তুঙ্গে, ঠিক তখন আধুনিক বিজ্ঞানের পাতায় ‘গাভি’ (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন) নামটা ঘুরেফিরে আসে বিল গেটসের সৌজন্যে। পৃথিবীর অনুন্নত দেশগুলোর শিশুদের রোগমুক্ত রাখতে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের বড় অর্থায়নে আলোচিত এ বৈশ্বিক টিকা-জোটের নাম ‘গাভি’। আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে যেমন যার গোয়ালে ‘গাভী’ বেশি তাকে সম্পন্ন মনে করা হতো, আজকের বিশ্ব-রাজনীতিতেও যার হাতে এ টিকা-জোটের অর্থ, সরবরাহ ও সিদ্ধান্তের প্রভাব বেশি, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য-রাজনীতিতেও তার ওজন বেশি। নাম এক হলেও কাজ আলাদা—কিন্তু মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদে গরুর ওই নামটা যেন প্রতীকীভাবে আধুনিক বিজ্ঞানেও ঢুকে পড়েছে।
আমাদের শিক্ষাজীবনেও গরুর বিরাট ভূমিকা ছিল। রচনা লেখার শুরুই হতো গরু দিয়ে। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই। ‘গরু একটি গৃহপালিত উপকারী প্রাণী’—এই বাক্য দিয়ে কত প্রজন্ম যে লেখালেখির হাত পাকিয়েছে, তার হিসাব নেই। এখনো কি স্কুলে গরুর রচনা লেখা হয়? জানা নেই। তবে একসময় প্রতিপক্ষ স্কুলকে বিদ্রূপ করতেও গরু ছিল অমোঘ অস্ত্র। নিরীহ গালাগালি অর্থে বলদ কিংবা ধর্মের ষাঁড়—চলেছে, চলছে এবং চলবে। এছাড়া শিশুকাল বা কৈশোরের দিনগুলো প্রতিপক্ষ স্কুলের ছাত্রবন্ধুদের জব্দ করতে সুর করে, কখনো একা, কখনো কোরাসে বলতাম, ‘অমুক স্কুলের রঙ সাদা,/মাস্টারগুলো গাধা।/বেঞ্চগুলো সরু সরু,/ছাত্রগুলো ধামড়া গরু!’ জেন-জি বা জেন-আলফার কয়জন এখন এসব ছড়া জানে?
আসলে গরু আমাদের জীবনে এত গভীরে ঢুকে আছে যে তাকে আলাদা করে দেখাই কঠিন। সে ভাষায় আছে, লোকস্মৃতিতে আছে, গ্রামে আছে, শহরে আছে, ধর্মে আছে, আছে কোরবানির তালিকায়, রসবোধে আছে, অপমানে আছে, শিশুশিক্ষায় আছে। এমনকি বানান-রাজনীতিতেও আছে। বাসনার সেরা বাসা যদি রসনায় ধরা হয় তাহলে সেখানেও গরু গোশত বা আমাদের এক বন্ধুর ভাষায় ‘ষাড়াংশ’-এর ভূমিকা অনেক। ‘ধর্মে আছে জিরাফেও আছে’ নামে যদি কোনো প্রাণীকে ডাকা যায় তবে গরুর মতো লাগসই আর কোনো প্রাণী হবে কি!
কিন্তু গরুর গল্প কেবল এখানেই শেষ নয়। এ নিরীহ ঘাসখেকো প্রাণীটিকে মানুষ একসময় দেবতা বানিয়েছে, রাজশক্তির প্রতীক বানিয়েছে, পৌরুষের মূর্তি বানিয়েছে, আবার রাজনীতির বিস্ফোরকও বানিয়েছে। সুস্বাদু খাদ্য বানিয়েছে।

মিথ্রাস একটি ষাঁড়কে পরাজিত করছেন ছবি: ব্রিটিশ মিউজিয়াম
মহেঞ্জোদারোর কুঁজওয়ালা বৃষের সামনে দাঁড়ালে সেই ইতিহাসের প্রথম মহড়া দেখা যায়। পোড়ামাটির ফলক, সিলমোহর, খেলনা, মূর্তি—এসবের মধ্যে যে বৃষ দেখা যায়, সে নিছক গৃহপালিত জন্তু নয়। তার কুঁজ অতিরঞ্জিত, শিং সুশোভিত, দেহে এক ধরনের রাজকীয় স্থৈর্য। যেন সে মাঠের বলদ নয়, সভ্যতার আদিম সম্রাট। সে দাঁড়িয়ে আছে, মানুষ নেই—কিন্তু মানুষের তৈরি চিহ্নের কেন্দ্রে সে-ই। এ অনুপস্থিত মানুষই আসল রহস্য। মানুষ তখনো লিখিত ইতিহাসের দীর্ঘ ভাষা পায়নি; কিন্তু প্রতীক বানাতে শিখেছে। আর সেই প্রতীকের প্রথম সারিতে এসেছে বৃষ।
মহেঞ্জোদারোর বৃষকে দেখলে মনে হয়, মানুষ প্রথমে প্রাণীকে পোষ মানায়নি; আগে তাকে মুগ্ধ হয়ে দেখেছে। তারপর তাকে কাজে লাগিয়েছে। তারপর তাকে পূজা করেছে।
গরু মানুষের জীবনে ঢুকেছিল পেটের রাস্তা দিয়ে, কিন্তু উঠে বসেছিল মাথায়। কৃষির জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বুঝল, বুনো শিকার অনিশ্চিত, কিন্তু জমি স্থায়ী। জমি চাষ করতে শক্তি দরকার। মানুষ একা পারে না। ঘোড়া দ্রুত, কিন্তু সব জমির সঙ্গী নয়। হাতি মহিমান্বিত, কিন্তু দৈনন্দিন কৃষকের নাগালের বাইরে। বলদই হলো কৃষকের প্রথম ট্রাক্টর। যে মাটি চিরে খাদ্য আনে, সে কেবল শ্রমিক নয়; সে জীবনদাতা। সেখান থেকেই বৃষের দেবত্বের শুরু।
প্রাচীন কৃষি-সমাজে সম্পদ মানে সোনা নয়, গরু। যার গোয়াল বড়, তার মুখ বড়। যার বলদ আছে, তার জমি চাষ হয়। যার গাভী আছে, তার ঘরে দুধ, দই, ঘি, গোবর, জ্বালানি, সার। গরু ছিল জীবন্ত ব্যাংক, চলমান ভাণ্ডার, গ্রামীণ বীমা-নীতি। গরু চুরি মানে অর্থনীতি চুরি। গরু দান মানে পুণ্য। গরু হত্যা মানে শুধু প্রাণনাশ নয়, জীবনচক্রে আঘাত।
বৃষ একসময় সূর্য ও চন্দ্রদেবতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। মানুষ বিশ্বাস করত, ফসলের জন্ম ও পৃথিবীর জীবনীশক্তি নির্ভর করে আকাশের এই দুই মহাজাগতিক শক্তির ওপর। মেসোপটেমিয়ায় বৃষ ছিল ঝড়, বৃষ্টি ও উর্বরতার প্রতীক। আকাশে মেঘ গর্জায়—মানুষ শুনেছে বৃষের গর্জন। বিদ্যুৎ চমকে ওঠে—মানুষ দেখেছে শিংয়ের দীপ্তি। দজলা-ফোরাত নদী ফুলে ওঠে—মানুষ ভেবেছে দেব-বৃষ মাটিকে উর্বর করছে। সুমেরীয় দেবতা এনলিল, আকাশ-ঝড়-উর্বরতার শক্তি, বৃষরূপে কল্পিত হয়েছেন। সেখানে দেবতার শক্তি মানে শিংওয়ালা শক্তি। প্রাকৃতিক শক্তিকে বোঝার আগে মানুষ তাকে পশুর ভাষায় অনুবাদ করেছে। সুমেরীয় রাজাদের কাছেও বৃষ ছিল ক্ষমতা ও দেবত্বের প্রতীক। সারগনের মতো শাসকরা শিংযুক্ত মুকুট পরতেন এবং দেবতা এনলিলের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন ‘বুনো বৃষ’ উপাধি। মানুষের বিশ্বাস ছিল, রাজাদের শক্তি, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আসে সর্বোচ্চ দেবতার কাছ থেকে। সেই কারণেই বহু বৃষমূর্তি ও খোদাইকর্মে বৃষকে মানবিক বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়; তার মুখে যোগ করা হয় রাজকীয় দাড়ি।
এ বৃষ প্রতীকের ছায়া আকাশেও উঠেছে। মেসোপটেমিয়ার মানুষ বৃষরাশিকে ‘স্বর্গের বৃষ’ ভেবেছে; শিংয়ের বাঁক আর চাঁদের ক্ষয়-বৃদ্ধির মধ্যেও তারা একই জন্ম-মৃত্যু-ফেরার চক্র খুঁজেছে।
গিলগামেশ মহাকাব্যে ‘স্বর্গীয় বৃষ’ মানুষের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে দেবতার প্রতিশোধ। গিলগামেশ শক্তিমান। কিন্তু দেবতার বৃষ আরো ভয়ংকর। বৃষ আকাশ থেকে নামে, মাটি ফাটে, মানুষ মরে, বীরেরা তাকে হত্যা করে। কিন্তু তার পরিণতি নামে অভিশাপ হয়ে। এখানে বৃষ দ্বিমুখী প্রতীক—একদিকে দেবতার অস্ত্র, অন্যদিকে মানুষের বীরত্বের পরীক্ষাক্ষেত্র। মানুষ দেবতার প্রাণীকে হত্যা করে নায়ক হয়; কিন্তু সেই হত্যার ঋণ তাকে শোধ করতেই হয়।
মিসরে এপিস বৃষ আরো বিচিত্র। সে দেবতা পতাহর জীবন্ত অবতার। নির্দিষ্ট দাগ, কপালে সাদা চিহ্ন, দেহে বিশেষ লক্ষণ—এসব দেখে একটি ষাঁড়কে পবিত্র ঘোষণা করা হতো। সে মন্দিরে থাকত। জনতা তাকে দেখতে আসত। গ্রিক ইতিহাসকার হেরোডোটাস এমন পবিত্র বৃষের কপালের সাদা চিহ্ন, পিঠের বিশেষ দাগ, লেজের দ্বিগুণ লোম—এসব লক্ষণের কথাও লিখে গেছেন। তার চলাফেরা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো। সে মরলে রাষ্ট্রজুড়ে শোক, বিশাল অন্ত্যেষ্টি, সমাধি। ভাবা যায়? এক ষাঁড়ের মৃত্যু জাতীয় ঘটনা। আজকের ভাষায় বললে, সে ছিল রাষ্ট্রীয় দেব-প্রাণী।
কিন্তু মিসরের এ এপিসকে হাস্যকর ভাবলে ভুল হবে। আধুনিক রাষ্ট্রও তো প্রতীক ছাড়া বাঁচে না। ‘আঙ্কেল স্যাম’ বলতে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো হয়। একইভাবে ইংল্যান্ডের জাতীয় ব্যক্তিত্বের একটি প্রতীকী রূপ ‘জন বুল।’ পতাকা, জাতীয় পশু, রাষ্ট্রচিহ্ন, সামরিক কুচকাওয়াজ—এসবও তো প্রতীকী প্রাণতন্ত্র। মিসর শুধু গরুকে নিয়ে তা করেছে। আমরা আজ কাগজ, কাপড়, মানচিত্রকে প্রতীকে করি। প্রতীক ছাড়া মানুষ অস্থির; সে কিছু না কিছু পবিত্র করবেই।
ঋগ্বেদের স্তোত্রেও বৃষের গর্জন, বৃষ্টি আর উর্বরতার সম্পর্ক বারবার ফিরে আসে। ইন্দ্রকে কখনো ঝড়ের বৃষের মতো ভাবা হয়েছে—যে বজ্র হাতে অন্ধকার ও খরাকে পরাস্ত করে পানিকে মুক্ত করে। ফলে উপমহাদেশে বৃষ কেবল কৃষির পশু নয়; মেঘ, পানি, যুদ্ধ, দান ও আশীর্বাদেরও প্রতীক।
ভারতীয় উপমহাদেশে বৃষের কাহিনি আরো গভীর। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার সিলমোহরে কুঁজওয়ালা বৃষের উপস্থিতি নিছক কৃষি-বাস্তবতার প্রতিফলন নয়। এর মধ্যে আচার, মর্যাদা ও সামাজিক প্রতীকের শক্তি আছে। ‘পশুপতি’ নামে পরিচিত সিলটিতে বসে থাকা মানবমূর্তির চারপাশে নানা পশু দেখা যায়। এর সঙ্গে পরবর্তী শৈব কল্পনার মিল নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। সরাসরি এককে অন্যের পূর্বপুরুষ বলা ঝুঁকিপূর্ণ; কিন্তু ধারাবাহিক প্রতীকের স্রোত অস্বীকার করাও কঠিন। মানুষ, পশু, উর্বরতা, যোগাসন, বন্যতা, শাসন—এসব একসঙ্গে উপস্থিত।

মহেঞ্জোদারোর মাটির সিলে ষাঁড়। ছবি: ইন্ডাস ক্যারাভান
পরবর্তী হিন্দু সংস্কৃতিতে শিবের বাহন নন্দী সেই দীর্ঘ বৃষ-প্রতীকের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ। নন্দী মন্দিরের প্রবেশমুখে বসে থাকে। সে দেবতার বাহন, আবার প্রহরী। সে পৌরুষের প্রতীক, আবার ভক্তিরও প্রতীক। তার দেহ বলবান, কিন্তু ভঙ্গি শান্ত। সে আক্রমণ করে না; অপেক্ষা করে। তার চোখ শিবের দিকে। এ অপেক্ষাই ভারতীয় ধর্মীয় কল্পনায় বৃষকে শুধু শক্তির নয়, সংযমের প্রতীক করেছে।
এখানে একটি আশ্চর্য রূপান্তর ঘটে। বন্য বৃষের গর্জন শান্ত নন্দীর ধ্যান হয়ে যায়। শক্তি ভক্তিতে রূপ নেয়। পৌরুষ নিয়ন্ত্রিত হয়। শিং আছে, কিন্তু তা রাজদণ্ড নয়; মন্দিরের স্থিরতা। কুঁজ আছে, কিন্তু তা কৃষির ঘাম নয়; ধর্মের ধৈর্য। হিন্দু-ভারতীয় সমাজে গরু-বৃষ তাই একই সঙ্গে গৃহস্থ, দেবতা, সম্পদ, মা, বাহন, দান, নিষেধ, পবিত্রতা এবং রাজনীতি।
বাংলার গ্রামে একসময় গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে কৃষক তার ভাগ্য মাপত। বর্ষার আগে বলদের পিঠে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। গাভী বাছুর দিলে বাড়িতে উৎসবের গন্ধ ছড়াত। শিশুর জন্মের পর মায়ের হাতে গরম দুধ তুলে দেয়া হতো। গোবর শুকিয়ে রান্নার জ্বালানি হতো। কাঁচা উঠোন গোবর মেখে পরিষ্কার করা হতো।
তবে ধর্ম সবসময় কোমলতা শেখায় না। গরুর ইতিহাস তাই শুধু স্নেহের নয়; ভীষণ রক্তাক্তও। বৃষ বলির ইতিহাস মানবসভ্যতার অন্যতম পুরনো নাটক। দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে মানুষ বারবার প্রাণী হত্যা করেছে। বৃষের রক্ত মাটিতে পড়লে ভূমি উর্বর হবে—এ বিশ্বাস পৃথিবীর বহু অঞ্চলে ছিল। রক্ত মানে জীবন; তাই রক্ত ঢেলে জীবন ডাকা। আজকের চোখে নিষ্ঠুর, কিন্তু কৃষি-মানবের কাছে তা ছিল প্রকৃতির সঙ্গে চুক্তি। দেবতা বৃষ্টি দেবেন, মানুষ রক্ত দেবে।
গ্রিসের পুরাণে বৃষ কখনো দেবতা, কখনো ছদ্মবেশী কামনা। জিউস বৃষরূপে ইউরোপাকে অপহরণ করেন। সুন্দর, শুভ্র, মোহময় বৃষ—কিন্তু তার ভেতরে দেব-পুরুষের আকাঙ্ক্ষা। এখানে বৃষ যৌন ক্ষমতার প্রতীক। আবার মিনোটর—অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক বৃষ—সভ্যতার অন্ধকার গহ্বর। ল্যাবিরিন্থ বা গ্রিক পুরাণের বিশাল ধাঁধাময় পথঘেরা স্থাপনা জটিল গোলকধাঁধার ভেতরে সে বন্দি। মানুষ-প্রাণীর সংমিশ্রণ, কামনা ও ভয়ের সন্তান। মিনোটরকে হত্যা করে থিসিউস নায়ক হয়। অর্থাৎ মানুষ নিজের পশুত্বকে হত্যা করে সভ্যতার দাবি করে। কিন্তু প্রশ্ন থাকে—পশুটা সত্যিই মরেছে, নাকি শহরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে?
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর একটি ঐতিহ্যবাহী বৃষ-নিয়ন্ত্রণের খেলা জাল্লিকাট্টু, এই বৃষ-সংস্কৃতির এক বিশেষ রূপ। তামিলনাড়ুতে প্রতি বছর ১৪ থেকে ১৭ জানুয়ারির পোঙ্গল উৎসবের সময় এ খেলা হয়।
আমেরিকার রোডিওতে আবার বৃষ আধুনিক বিনোদনের অংশ। কাউবয় বৃষের পিঠে ওঠে, আট সেকেন্ড টিকে থাকাই লক্ষ্য। এখানে বৃষ গ্রামীণ শ্রমজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাজারের দৃশ্য। দর্শক টিকিট কেটে বিপদ দেখে। বৃষের রাগ, মানুষের ভারসাম্য, জনতার চিৎকার—সব মিলিয়ে পুঁজিবাদী পৌরুষের খেলা। যে প্রাণী একদিন জমি চাষ করত, সে আজ স্টেডিয়ামে করতালি উৎপাদন করে।
এসব খেলায় একটি সাধারণ বিষয় আছে—মানুষ বৃষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে চায়। কেন? কারণ বৃষ এমন শক্তির প্রতীক যা মানুষ নিজের মধ্যে দেখতে চায় কিন্তু পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। বৃষের যৌনতা, পেশি, গর্জন, আক্রমণ, ধৈর্য—এসব পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে মুগ্ধ করেছে। ‘ষাঁড়ের মতো’ শব্দবন্ধ প্রায় সব ভাষায় শক্তি ও পৌরুষের ইঙ্গিত। আবার ‘গরু’ শব্দটি অনেক সমাজে নির্বোধতা বোঝাতেও ব্যবহৃত। একই প্রাণী—একদিকে মহাশক্তি, অন্যদিকে বোকামির উপমা। মানুষের ভাষা নিজেই দ্বিমুখী।
একসময় বাংলার গ্রামে হাট বসত গরুকে কেন্দ্র করে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ বলদ কিনতে আসত। দাঁত দেখে বয়স মাপা হতো, পিঠে হাত দিয়ে শক্তি যাচাই হতো। গরুর চোখের দিকে তাকিয়ে দাম ওঠানামা করত। একেকটি বলদ বিক্রি মানে কৃষকের ভাগ্য বদল। পাট, ধান, খেজুর গুড়—এসবের বাজার যেমন ছিল, তেমনি ছিল গরুর বাজার।
গ্রামীণ লোককথায় গরু প্রায়ই নৈতিক প্রাণী। সে ধৈর্য ধরে, পরিশ্রম করে, মানুষের উপকার করে। অর্থনীতির পাশাপাশি মানুষের খাদ্য সংস্কৃতিতে এখনো জায়গা দখল করে রেখেছে গরু।
সৈয়দ মূসা রেজা: সাংবাদিক ও লেখক









