সম্প্রতি ব্রাজিলের ভিয়াতিনা-১৯ নামে গরু সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ গরু নিলামে ৪০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়ে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এটিই বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দামি গরু। গরুটিকে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখে সশস্ত্র রক্ষী, সিকিউরিটি ক্যামেরা এবং একজন পশুচিকিৎসক। এছাড়া প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এ চমৎকার প্রাণীটিকে একনজর দেখতে ভিড় জমায়। আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন একটি প্রভাবশালী প্রাণীর উত্থান সংশ্লিষ্টদের চমকে দিয়েছে।
বিভিন্ন সময় বিশ্বব্যাপী খবরের শিরোনাম হয়েছে কিছু গরু। এবার তুলে ধরা যাক তাদের গল্প।
ফার্দিনান্দ দ্য বুল
ফার্দিনান্দ দ্য বুল নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা আছে। যেমন বই, গান ও সিনেমা। তবে অনেকেই যেটা উপলব্ধি করেন না তা হলো ফার্দিনান্দ আসলে কোনো কাল্পনিক চরিত্র ছিল না, বরং ১৯৩০-এর দশকে স্পেনের সালামানকার কাছে বসবাসকারী একটি বাস্তব গরু ছিল। বাস্তবে সেই ষাঁড়টির নাম ছিল সিভিলন (Civilón)।
চমৎকার কালো রঙের এই ষাঁড়টি একবার অন্য ষাঁড়দের সঙ্গে গুঁতোগুঁতি করতে গিয়ে চোট পায়। আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে পালনকারীর সাত বছর বয়সী মেয়ে কার্মেলিটার সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। এর পর থেকে অন্যান্য শিশুও ‘সিভিলন’ (যার অর্থ ‘বিশাল নাগরিক’) কে দেখতে আসতে শুরু করে এবং স্প্যানিশ সংবাদপত্রগুলোতে এ শান্ত স্বভাবের প্রাণীটিকে নিয়ে খবর প্রকাশ শুরু হয়।

ভিয়াতিনা-১৯
১৯৩৬ সালে বার্সেলোনার প্রাচীন রিং ‘মনুমেন্টাল’-এ একটি লড়াইয়ের জন্য সিভিলনকে চুক্তিবদ্ধ করা হয়। হাজার হাজার মানুষ এসেছিল এটা দেখতে যে জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে পড়লে সিভিলন কি সত্যিই লড়াই করবে? অবশ্য সে তা করেছিল। সিভিলন আক্রমণাত্মকভাবে লড়াই শুরু করে প্রমাণ করেছিল যে সে লড়াই করতে সক্ষম। কিন্তু সে যখন লড়ছিল তখন দর্শকরা দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে শুরু করে—তার প্রাণভিক্ষার জন্য। গ্যালারিভর্তি মানুষের গগনবিদারী চিৎকারে শেষ পর্যন্ত সিভিলনের প্রাণ রক্ষা পায় এবং সে শান্তভাবে রিংয়ের পাশে তার মালিকের কাছে ফিরে গিয়ে তাকে আদর করতে থাকে। এরপর সিভিলন অসংখ্য ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা করে নেয়।
বিমানে চড়া প্রথম গরু
এলম ফার্মের ‘অলি’ নামের গরু বিখ্যাত হয় হয় ১৯৩০ সালে। সে বছর বিমানে ওড়া প্রথম গরু হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখায় এটি। শুধু তা-ই নয়, উড্ডয়নরত অবস্থায় তার দুধও দোয়ানো হয়েছিল। যা কৃষি এবং উড়োজাহাজ চালনার ইতিহাসে এক অনন্য ও কৌতূহলপূর্ণ মাইলফলক ঘটনা হয়ে আছে।
এ জার্সি গরুটি নেলি জে (Nellie Jay) বা স্কাই কুইন" নামেও পরিচিত। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপোজিশন’-এর অংশ হিসেবে মিসৌরির বিসমার্ক থেকে সেন্ট লুইস পর্যন্ত ৭২ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছিল। ১৯৩০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এ ঐতিহাসিক ফ্লাইট অনুষ্ঠিত হয়। এ ইভেন্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষিপণ্যের পরিবহনে বিমান ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রদর্শন করা। একই সঙ্গে ফ্লাইটের ফলে গবাদিপশুর ওপর কোনো প্রভাব পড়ে কিনা পরীক্ষা করা এবং তথ্য সংগ্রহ করা।

এলম ফার্মের অলি
এলম ফার্ম অলির এ যাত্রা মূলত একটি প্রচারণামূলক কৌশল ছিল। যাতে উড়োজাহাজ চালনা বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং কৃষিক্ষেত্রে এর ব্যবহারিক প্রয়োগ তুলে ধরা যায়। মজার ব্যাপার হলো উড়োজাহাজে থাকা অবস্থায় তার দোয়ানো দুধ কাগজের প্যাকেটে সিল করে প্যারাশুটের মাধ্যমে নিচের দর্শকদের জন্য ফেলা হয়।
মডিন ওর্মসবি (Maudine Ormsby)
মডিন ওর্মসবি গরু একাধিক কারণে স্মরণীয়। ১৯২১ সালের দিকে এ হোলস্টাইন জাতের গরুটি মাত্র সাত দিনে ৭৪৩.৫ পাউন্ড দুধ এবং ২৮ দশমিক ৭ পাউন্ড বাটার ফ্যাট তৈরি করে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত মাত্র সাত বছর বয়সে ব্রুসেলোসিসে (একটি সংক্রামক রোগ) আক্রান্ত হয়ে মডিন মারা যায়।
এলসি দ্য কাউ
‘বোর্ডেন ডেইরি প্রডাক্টস’ কোম্পানির বিখ্যাত গরু এলসি। গলায় ডেইজি ফুলের মালা পরা গরুটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি বিপণন আইকন হিসেবে টিকে আছে। এ চরিত্রের পেছনের আসল গরুটি ছিল মূলত একটি ছোট খামারের জার্সি গরু, যার নাম ছিল "ইউ’ল ডু লোবেলিয়া।
১৯৩৯ সালে নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এ মেলায় বিভিন্ন কোম্পানি নিজেদের পণ্য ও ব্র্যান্ড প্রদর্শন করেছিল। সেখানে লোবেলিয়াকে কোম্পানির মডেলস্বরূপ প্রথম প্রদর্শন করা হয়। লোবেলিয়া ছিল শান্ত মেজাজ ও আকর্ষণীয় চেহারার। ক্যামেরায় তাকে বিভিন্ন প্যারেড, মেলা ও জনসমাবেশে প্রদর্শন করা হয়। এভাবে এ গরু শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
গরুটির জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে ছিল যে তাকে কেন্দ্র করে খেলনা, পোশাক এবং নানা স্মারক পণ্য তৈরি করা হয়। ১৯৪০ সালে সে"‘লিটল মেন’ নামক একটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করে। একই বছর সে ‘বিউলা’ নামে একটি বাছুরের জন্ম দেয়। বছরের পর বছর ধরে এলসিকে নানা সম্মানসূচক ডিগ্রি দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ‘ডক্টর অব বোভিনিটি’, ‘ডক্টর অব হিউম্যান কাইন্ডনেস’ এবং ‘ডক্টর অব ইকাউ-নো-মিক্স’। এগুলো দেয়া হয় ‘বোর্ডেন ডেইরি প্রডাক্টস’-এর বিজ্ঞাপনী প্রচারণার অংশ হিসেবে।
পলিন ওয়েন
আমেরিকান গবাদিপশুর ইতিহাসে পলিন ওয়েন এক অনন্য নাম। কারণ সে ছিল হোয়াইট হাউজের লনে চরে বেড়ানো শেষ গরু। ১৯১০-১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হাওয়ার্ড ট্যাফটের শাসনামলে পলিন সেখানে অবস্থান করত। সে কেবল টাটকা দুধের উৎস ছিল না, বরং সেই সময়ের প্রতীক। কারণ তখন হোয়াইট হাউজের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়ও গ্রামের ছোঁয়া থাকত।
পলিন ছিল একটি হোলস্টাইন জাতের গরু, যা ১৯১০ সালে উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর আইজ্যাক স্টিফেনসন প্রেসিডেন্ট ট্যাফটকে উপহার দিয়েছিলেন। তাকে মূলত ‘মুলি উলি’ নামক আগের একটি গরুর জায়গায় আনা হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে হোয়াইট হাউজে পলিনের উপস্থিতি প্রমাণ করত, ব্যাপক হারে ফ্রিজ বা বাণিজ্যিক দুধ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে মানুষ সতেজ ডেইরি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
পলিন ওয়েনও জনগণের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন সংবাদমাধ্যমে তার প্রতিদিনের জীবনযাত্রা এবং মাঝে মাঝে জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হওয়া নিয়ে নিয়মিত সংবাদ ছাপা হতো।
ওপরের ঘটনাগুলো ইতিহাসের এমন কিছু গরুর সংক্ষিপ্ত ঝলক যারা কেবল একটি জাতির নয়, বরং সারা বিশ্বের মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল। এ অসাধারণ প্রাণীগুলো মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে এবং বহু বছর ধরে তাদের নিয়ে আলোচনা চলবে।
নীরব হাসান: প্রাবন্ধিক









