সেই সময় থেকে তারা পোষ মানানোর চেষ্টা করে। ষাঁড়ের ক্ষেত্রে একে খোজা করার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়েছিল। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩২০০ অব্দে প্রাচীন মেসোপটেমিয়াবাসী লাঙল ও বলদ টানা গাড়ি ব্যবহার শুরু করে। ধারণ করা হয়, একই সময়ে দুধ দোয়ানোর প্রচলনও শুরু হয়। গবাদিপশুকে এই নতুনভাবে ব্যবহার করার মাধ্যমে দুটি স্বতন্ত্র সমাজ ও জীবিকা ব্যবস্থার জন্ম দেয়—একদিকে ছিল লাঙলনির্ভর কৃষিজীবী সমাজ, তারা অনুর্বর জমি চাষ করত এবং স্থায়ী বসতি গড়ে তুলত; অন্যদিকে ছিল পশুপালক সমাজ, যারা তাদের পশু জবাই না করেই দুধের মাধ্যমে ধারাবাহিক খাদ্যের জোগান পেত। দ্বিতীয় ধারাটি এখনো আফ্রিকায় দেখা যায়।
কৃষিতে লাঙল ও বলদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। লাঙল আবিষ্কারের আগে নব্যপ্রস্তর যুগের কৃষকরা মাটি চাষের জন্য লাঠি ও কোদালের মতো যন্ত্র ব্যবহার করত। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মানুষকে ক্রমে আরো অনুর্বর জমি চাষ করতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। তখন পশুশক্তির প্রয়োজন দেখা দেয় এবং মানুষ গরুকে সেই কাজে ব্যবহার শুরু করে।
উর্বরতা-সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠানে বহুদিন ধরেই ষাঁড়কে আনা হতো। আনুষ্ঠানিকভাবে জমিতে প্রথম দাগ কাটত বা চাষকৃত জমিতে শস্য মাড়াই করত ষাঁড়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা ছিল কঠিন। ফলে ষাঁড়কে খোজা করা হলো। স্প্যানিশ পশুচিকিৎসক সান্স এগানা বলদের এ হরমোনজনিত রূপান্তর ব্যাখ্যা করেছেন:
‘খোজাকরণ পিটুইটারি গ্রন্থির কোষে গভীর পরিবর্তন ঘটায়, যা মানসিক কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে। অনেক প্রাণীকেই বিশেষভাবে শান্ত ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য করার জন্য খোজা করা হয়। বলদ শান্ত, স্থির ও নিরীহ স্বভাবের হয়; এতে আক্রমণাত্মক মনোভাব থাকে না, প্রতিক্রিয়া ধীর হয়, এটি বাধ্য ও সহজেই ভয় পায়।’
ষাঁড়ের সমস্ত শক্তি বজায় রেখেও শান্ত স্বভাবের বলদকে লাঙল টানতে এবং বলদগাড়ি চালাতে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হয়েছিল, ফলে ভারী মালপত্র পরিবহন সহজ ও দ্রুত হয়ে ওঠে।

মেসোপটেমিয়ায় ষাঁড়ের শিংয়ের সঙ্গে লাঙল বাঁধা হতো
যদিও বলদের ব্যবহারের প্রচুর চিত্রভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে, তবে তাদের কীভাবে জোয়ালে অভ্যস্ত করা হতো সে বিষয়ে লিখিত তথ্য খুব কম। প্রাচীন গ্রিক কবি হেসিয়ড (খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৭০০) তার Works and Days কবিতায় লিখেছেন যে একজন তরুণ কৃষকের প্রথম কাজ হলো বলদ সংগ্রহ করা। তবে সেখানে প্রশিক্ষণের কোনো বর্ণনা নেই, শুধু লাঙল তৈরির নির্দেশনা আছে।
পরবর্তীকালে ভার্জিল তার The Georgics-এ অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে বলদ প্রশিক্ষণের বর্ণনা দেন—
অন্য বাছুরগুলোকে স্বাধীনভাবে চরতে দাও;
কিন্তু যেগুলো জমির কাজে রাখবে, তাদের প্রশিক্ষণ শুরু করো সঙ্গে সঙ্গে।
অল্প বয়সেই তাদের সঠিক পথে আনো,
কারণ তখন তারা সহজে শেখে ও মানিয়ে নেয়।
তাদের গলায় আলগাভাবে বেতের বৃত্ত বেঁধে দাও,
এবং এতে অভ্যস্ত হলে
একে অপরের সঙ্গে জোড়া লাগাও,
সমান স্বভাবের দুটিকে পাশাপাশি হাঁটতে শেখাও।
প্রথমে খালি গাড়ি টানার অভ্যাস করাও,
যাতে তাদের হালকা পদক্ষেপে ধুলোমাখা মাটিতে কম দাগ পড়ে।
পরে ধীরে ধীরে বোঝা বাড়াও, যতক্ষণ না বিচ কাঠের অক্ষ কেঁপে ওঠে
এবং তারা ব্রোঞ্জের দণ্ড ও চাকা টেনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তাদের ঘাস, উইলোর সরু পাতা
ও জলাভূমির ঘাস খেতে দাও,
কিন্তু এখনো পুরোপুরি প্রশিক্ষিত হওয়ার আগে
তাদের জন্য সবুজ শস্য সংগ্রহ করো।
প্রথমে বলদের শিংয়ে দড়ি পরানো হতো। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩০০০ অব্দে জোয়াল আবিষ্কার করে মানুষ। ফলে তারা কেবল শিং নয়, পুরো শরীরের শক্তি ব্যবহার করে লাঙল বা গাড়ি টানতে পারত।
মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন জাতের বলদও পালন করা হতো। রোমান লেখক কোলুমেলা তার De Re Rustica গ্রন্থে ইতালির বলদগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ক্যাম্পানিয়া সাধারণত ছোট আকারের সাদা বলদ উৎপাদন করে। তবে তারা কাজ ও স্থানীয় মাটি চাষের জন্য খুব উপযোগী। উমব্রিয়া বিশাল সাদা বলদ পালন করে, আবার লাল বলদও উৎপাদন করে, যেগুলো তাদের উদ্যম ও শক্তির জন্য সমানভাবে প্রশংসিত। এত্রুরিয়া ও লাতিয়াম এমন বলদ পালন করে, যেগুলো খাটো কিন্তু অত্যন্ত কর্মক্ষম। অ্যাপেনাইন অঞ্চলের বলদগুলো অত্যন্ত সহনশীল এবং সব ধরনের কষ্ট সহ্য করতে পারে, যদিও দেখতে খুব আকর্ষণীয় নয়।’
এ বলদগুলো সারা বছর বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো, শুধু বপন বা ফসল কাটার মৌসুমে নয়—যেমন আজও জীবিকানির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় দেখা যায়। তারা পণ্য পরিবহন, পানি তোলা, গাছ কাটা, শস্য পেষাই এবং রাস্তা নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারত বা আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য যান্ত্রিক কৃষির মাধ্যমে কর্মরত বলদকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। তবে আফ্রিকার ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল আলাদা।

টেরাকোটায় গরুর গাড়ি, মহেঞ্জোদারোয় প্রাপ্ত
মিসরে শস্য মাড়াই, লাঙল টানা এবং বোঝা বহনের কাজে বলদ ব্যবহৃত হলেও উপনিবেশ-পূর্ব আফ্রিকার বাকি অংশে বলদের ব্যবহার খুবই বিরল ছিল। ইউরোপীয়রাই সেখানে বলদ ব্যবহার বাড়িয়েছিল। সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে আফ্রিকার বন্দর ও দ্বীপগুলোতে বলদগাড়ির প্রচলন শুরু হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ডাচ পণ্যের বিনিময়ে গরু বেচাকেনা হতো। বসতি স্থাপনকারীরা সেই গরু দিয়ে পণ্য ও নির্মাণসামগ্রী বোঝাই গাড়ি জাহাজ থেকে বসতিতে আনা-নেয়া করত।
১৯০০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ পরীক্ষামূলক খামার প্রকল্প এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকার বহু দেশে বলদের শ্রম ব্যবহার চালু করে। কিন্তু এর সাফল্য সীমাবদ্ধ ছিল সেই সব এলাকায়, যেখানে রফতানিযোগ্য ফসল উৎপাদন হতো এবং যেখানে পশুচিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণের সুবিধা পাওয়া যেত।
স্বাধীনতা অর্জনের পর অধিকাংশ সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকান রাষ্ট্র তাদের কৃষিকাজে ‘ট্রাক্টরনির্ভরতা’ আনার চেষ্টা করে। কিন্তু তেলের উচ্চমূল্য এবং ভাড়াভিত্তিক কর্মসূচির ব্যর্থতার কারণে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে দাতা-সমর্থিত উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে আবার বলদের শ্রমের পুনর্জাগরণ দেখা যায়।
আজও আফ্রিকায়, মধ্যযুগীয় ইউরোপের মতোই, বলদ ও কৃষিযন্ত্র পরিবারগুলোর মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হয় এবং ধনী জমির মালিকেরা দরিদ্র প্রতিবেশীদের ঋণ ও কর্মসংস্থান প্রদান করেন। অনেক এলাকায় বলদের পরিবর্তে গাভীও ক্রমেই ব্যবহৃত হচ্ছে, বিশেষত যেখানে বলদের ঘাটতি রয়েছে বা খাদ্যসংস্থান এতটাই সীমিত যে একই সঙ্গে দুটি গরু পালন সম্ভব নয়।
ভারত ও নেপালেও এখনো বলদের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। এ দেশগুলোতে গরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ষাঁড়কে শিবের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পবিত্র মনে করা হয়। ফলে জেবু জাতের বলদই ভারবাহী প্রাণীর ভূমিকা পালন করে এবং লাঙল টানে। এ প্রথা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। প্রাচীন সিন্ধু নগরী মহেঞ্জোদারোর প্রশস্ত রাস্তা ইঙ্গিত দেয় যে সেখানে বলদটানা গাড়ি ব্যবহৃত হতো এবং খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৪০০ সালের তৈরি কাঁচা পোড়ামাটির বলদগাড়ির মডেলও সেখানে পাওয়া গেছে।
ষাঁড় ও গাভীর তুলনায় বলদ নিয়ে মানুষের আবেগ ও প্রকাশের ধরনে পার্থক্য দেখা গেছে সবসময়। অথচ কৃষক ও বলদের মধ্যে সম্পর্কটি বরাবরই ঘনিষ্ঠ। বলদের কর্মনিষ্ঠা তাকে অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণী থেকে আলাদা মর্যাদা দেয়। ১০৮৬ সালের Domesday Book-এ কাজ না করা গাভী ও ষাঁড়ের তুলনায় লাঙল টানা বলদের উল্লেখ অনেক বেশি দেখা যায়। সেখানে জমির পরিমাপের একক ছিল ‘হাইড’, যা সাধারণত ১২০ একর জমি বোঝাত—অর্থাৎ আটটি বলদের একটি দল এক বছরে যতখানি জমি চাষ করতে পারত। এর পরও গাভী ও ষাঁড়ের তুলনায় বলদ অবহেলিতই বলা যায়। এর অন্যতম কারণ ষাঁড়ের শক্তি ও গাভীর দেয়া দুধ।
পশুপালক সমাজের কথা ধরা যাক। তারা এক স্থানে বেশিদিন থাকত না। ঋতুভিত্তিক চারণভূমির মধ্যে তাদের গবাদিপশু—এক্ষেত্রে গরু—নিয়ে চলাফেরা করত। গবাদিপশুগুলো অনুর্বর জমির অল্প উদ্ভিদ খেয়ে তা হজম করে মানুষের জন্য প্রোটিনে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়। অল্প বৃষ্টিপাতপ্রাপ্ত অঞ্চলে টিকে থাকার এটি অন্যতম উপায়।
আফ্রিকার পশুপালকদের প্রধান খাদ্য হলো গরুর দুধ ও রক্ত। রক্ত সংগ্রহ করা তুলনামূলক সহজ। কেনিয়া ও তানজানিয়ার মাসাই জনগোষ্ঠী কাছ থেকে তীর গরুর গলার জুগুলার শিরায় আঘাত করে, তারপর বেরিয়ে আসা রক্ত একটি লাউয়ের পাত্রে সংগ্রহ করে। এ রক্ত কখনো জ্বাল দিয়ে পোরিজে মাংসের স্বাদ আনা হয়, আবার কখনো জমাট বাঁধা পর্যন্ত রেখে আগুনের ছাইয়ে ভেজে খাওয়া হয় অথবা দুধের সঙ্গে মিশিয়ে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার তৈরি করা হয়। গরুর ক্ষত প্রাণঘাতী হয় না; পরে মাটি ও ঘাস দিয়ে তা বেঁধে দেয়া হয়।
প্রাচীন সভ্যতাগুলো দ্রুতই বুঝতে পারে মানুষের খাদ্যে গরুর দুধ ব্যবহারের দুটি প্রধান সমস্যা আছে: প্রথমত, গরুর কাছ থেকে দুধ আদায় করা; দ্বিতীয়ত, কাঁচা দুধের ল্যাকটোজ হজম করার জন্য শারীরবৃত্তীয়ভাবে মানিয়ে নেয়া।
নিজেদের জন্য যত বেশি সম্ভব দুধ পাওয়ার উদ্দেশ্যে তারা দিনের বেলা বাছুরগুলোকে মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখত, যাতে বাছুর সব দুধ খেয়ে ফেলতে না পারে (যা আধুনিক পাশ্চাত্য দুগ্ধগাভীর তুলনায় খুবই কম ছিল)। এরপর সেই দুধ সংগ্রহ করতে হতো।
দুধ সংগ্রহ করার পর প্রাচীন মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পরিপাকতন্ত্র কাঁচা গরুর দুধে থাকা দুধের চিনি, অর্থাৎ ল্যাকটোজ, শোষণ করার জন্য উপযুক্ত নয়। ফলে তারা এমন কিছু উপসর্গ অনুভব করত, যা সম্ভবত এত কষ্ট করে সংগ্রহ করা দুধ পান করার আগ্রহ নষ্ট করে দিত—যেমন ডায়রিয়া, পেট ফাঁপা, গ্যাস ও পেটব্যথা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, কাঁচা দুধ নিয়মিত পান করার ফলে তাদের পরিপাকতন্ত্র ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয় এবং দুধপানকারী সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে ল্যাকটোজ সহনশীলতা বিকশিত হয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অনেক জনগোষ্ঠী বা চীনা জনগণের বিপরীতে পশুপালক সমাজগুলো কাঁচা দুধকে মাখন বা পনিরে রূপান্তর না করেই পান করতে সক্ষম হয়ে ওঠে। খাদ্য ও শ্রমের মাধ্যমে এরপর দ্রুতই গরু হয়ে ওঠে সমাজের ভিত্তি।
আফ্রিকার পশুপালকদের সঙ্গে তাদের গবাদিপশুর সম্পর্ক অনেক গভীর। গরু ও অন্যান্য গবাদিপশু হলো পশুপালকদের চলমান সম্পদ এবং তাদের পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার। তাই এগুলোর প্রতি তারা যত্নশীল। অন্যান্য কৃষিভিত্তিক ও পশুপালক সমাজেও একই চিত্র দেখা যায়।

ইথিওপিয়ার আফার সম্প্রদায়ের এক রাখাল ছবি: হানা ভেলতেনের বই ‘কাউ’
স্বাভাবিকভাবেই গরুর ওপর মানুষ বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। খরা বা গরুর রোগের সময় পরিবারগুলোর ওপর সহজেই বিপর্যয় নেমে আসত। কিন্তু গরু অর্জন যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, পশুপালকরা দুর্ভিক্ষ ও খরার সময় পার্শ্ববর্তী গোত্রের সঙ্গে গবাদিপশুর বিনিময়ে বাজরা, জোয়ার বা ভুট্টা আদান-প্রদান করে। তারা যেকোনো আর্থিক, পারিবারিক প্রয়োজনে বা অন্য গবাদিপশু কেনার জন্য অতিরিক্ত পশু বিক্রিও করে।
নৃতত্ত্ববিদ মেলভিল হার্সকোভিটস (১৮৯৫-১৯৬৩ খ্রি.) পূর্ব আফ্রিকার পশুপালকদের সংস্কৃতিকে Cattle Complex দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে বর্ণনা করেছেন। এর প্রকাশ দেখা যায় মানুষের গবাদিপশুর প্রতি গভীর আসক্তি, প্রাণীগুলোর সঙ্গে নিজেদের পরিচয় মেলানো এবং আচার-অনুষ্ঠান ছাড়া সেগুলো হত্যা করতে অনীহায়। যদিও বিশেষভাবে পূর্ব আফ্রিকার গোত্রগুলোকেই আলোচনায় আনা হয়েছে, তবু মনে হয় আফ্রিকার সর্বত্রই এ ধরনের মানসিকতা বিদ্যমান। এমনকি ভারত, বাংলাদেশেও পশুপালক, কৃষকদের মধ্যে এ চরিত্র দেখা যায়। শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পটি নিছক একটি গল্প নয়, উপমহাদেশের কৃষক-পশুপালকের আবহমানকালের চরিত্র। তাই বলা যায় ক্যাটেল কমপ্লেক্স মূলত বৈশ্বিক।
পূর্ব আফ্রিকার পশুপালক সমাজে গরুর মালিকানা পিতৃসূত্রে বংশপরম্পরায় হস্তান্তরিত হয়। তাই শিশুরা খেলাধুলা ও কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিবারের গবাদিপশুর সঙ্গে পরিচিত হলেও উত্তরাধিকার মূলত পুরুষেরাই পায়। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে তারা পশু ও তার ব্যবস্থাপনার ক্রমবর্ধমান দায়িত্ব গ্রহণ করে, আর মেয়েদের সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু গাভীর দুধ দোয়ানোর অধিকার দেয়া হয়।
দীক্ষা বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আচার চলাকালীন পশুপালক ছেলেরা প্রতীকীভাবে তাদের পিতার গরুর মালিকানা গ্রহণ করতে শুরু করে। পিতা তার ছেলেকে একটি বলদ উপহার দেন, যা ছেলের ব্যক্তিগত প্রাণী হয়ে ওঠে। এই বলদ ছেলের পরিচয় গঠন করে, কারণ সে বলদের গায়ের রঙ ও নকশা, শিংয়ের আকার বা অন্য বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একটি নাম গ্রহণ করে।
এ সমাজে গবাদিপশু পূর্বপুরুষদের আত্মা ও ভূতের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। কারণ এগুলো পারিবারিক বংশধারার সম্পত্তি। নুয়েররা কোনো গরু বা বলদের পিঠে ছাই ঘষে তার সঙ্গে যুক্ত আত্মা বা ভূতের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। যখন কোনো মাসাই শিশুর জন্ম হয়, তখন তাকে সঙ্গে সঙ্গে গরুর গোবর দিয়ে ধুয়ে দেয়া হয় এবং বাবা একটি গরু বলি দেন। মা তার বিশেষ গাভীর লেজের লোম (যে গাভীটি তিনি বিয়ের সময় তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন) দিয়ে একটি তাবিজ-হার তৈরি করেন, যা শিশুকে অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে এবং সৌভাগ্য নিয়ে আসে।
মৃত্যুর পর অধিকাংশ পশুপালক সম্প্রদায় শোকাহত পরিবারের পাল থেকে একটি বিশেষ গরু জবাই করে। মৃতদেহ দাফনের আগে গরুর চামড়ায় মুড়ে দেয়া হয় এবং পরে সেই বিশেষ গরুকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি শোকভোজের আয়োজন করা হয়।
আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে মনে করা হয়, গবাদিপশু নেই মানে সমাজও নেই। গবাদিপশু নিয়ে বিরোধ আফ্রিকায় অসংখ্য দুর্ভোগ ও রক্তপাতের কারণ হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, বিশেষত উত্তর-পশ্চিম কেনিয়া, উত্তর-পূর্ব উগান্ডা এবং দক্ষিণ সুদানের গোত্রগুলোর মধ্যে। তুরকানা গোত্রের একটি প্রবাদ হলো গবাদিপশুই আমাদের শত্রুর কাছে নিয়ে যায়।
তাদের আক্রমণাত্মক লুণ্ঠনের ন্যায্যতা একটি পৌরাণিক কাহিনিতে নিহিত: পৃথিবী ও আকাশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় তাদের বৃষ্টির দেবতা এনগাই সব গবাদিপশু নিরাপদে রক্ষার জন্য তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
কারণ বা যুক্তি যা-ই হোক না কেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গবাদিপশু লুণ্ঠন আফ্রিকার বহু গোত্রের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। তবে ১৯৭০-এর দশকে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রসারের পর এ সংঘর্ষগুলো আরো প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। গবাদিপশু ও মানুষের উচ্চ মৃত্যুহার, বাণিজ্য ও চিকিৎসা সরবরাহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া—এসবের ফলে কৃষিকাজ অবহেলিত হয়, খাদ্যসংকট, রোগব্যাধি এবং আরো গবাদিপশু ক্ষতির সৃষ্টি হয়।
আফ্রিকায় নানা সময় গবাদিপশুকে কেন্দ্র করে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। সেখানে ক্ষমতার প্রকাশ মানেই গবাদিপশু। কৃষির পাশাপাশি পশুর অধিকার একটি পরিবার, গোত্র বা গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করে তোলে। আধুনিক সময়েও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। নানা বিরোধ তৈরি হয় তাই গরু, ষাঁড় ও বলদের মতো গবাদিপশু নিয়ে। সে কারণেই ক্যাটেল কমপ্লেক্স এ অঞ্চলে এখনো তীব্র।
মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক









