কিন্তু পূর্ব এশিয়ার নদী অববাহিকায় জন্ম নেয়া ধান কীভাবে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের ইরান, মধ্য এশিয়া, আরব অঞ্চল, উত্তর আফ্রিকা হয়ে ইউরোপে পৌঁছল, সে গল্প বেশ রোমাঞ্চকর। সবচেয়ে বিস্ময়ের কথা ধান শুধু কোনো একটি নির্দিষ্টভাবে পশ্চিমের পথেই যায়নি।
গবেষণায় পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, এর অন্তত দুটি সমান্তরাল পথ ছিল। একটি স্থলপথে দক্ষিণের পাহাড় ও মধ্য এশিয়ার শুষ্ক অঞ্চল পেরিয়ে, অনেকটা সিল্ক রোডের ধার ঘেঁষে। অন্যটি দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্রবন্দর থেকে ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপের দিকে।
ধান হচ্ছে এমন এক ফসল, যা ফলাতে প্রচুর পানির প্রয়োজন। অথচ পূর্ব এশিয়া থেকে পশ্চিমে পৌঁছানোর পথে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে শুষ্ক পাহাড়, মরুভূমি ও তীব্র পানি সংকটে ভোগা বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ফলে ধান যে শুধু খাদ্যশস্য হিসেবে সফর করেছে এমন নয়। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করেছে কৃষি প্রযুক্তি, সেচ ব্যবস্থা, আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্য, মানুষের স্থানান্তর ও বহুমাত্রিক খাদ্যসংস্কৃতি।
বুনো ধান থেকে চাষের ফসল
ধানের গল্প শুরু হয়েছিল চাষাবাদ দিয়ে নয়, সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। পূর্ব এশিয়ার মানুষ হাজার হাজার বছর আগ থেকেই বুনো ধান সংগ্রহ করত। ইয়াংজি নদীর নিম্ন অববাহিকায় প্রায় আট হাজার বছর আগেও ধান সংগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায়। তখন অবশ্য ধান ছিল খাদ্যতালিকার একটি অংশমাত্র। তখন মানুষ ফল, বাদামসহ আরো নানা বুনো খাদ্যের ওপর নির্ভর করত।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ধানের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। ইয়াংজি নদীর তীরের তিয়ানলুশান ও হেমুদুর মতো প্রত্নস্থানে ধান চাষের প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যায়। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ সহস্রাব্দে মধ্য ও উচ্চ ইয়াংজি অঞ্চলেও ধান চাষ ছড়িয়ে পড়ে।
বুনো ধান আর চাষ করা ধানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। বুনো ধানের পাকা দানা সহজেই শিষ থেকে ঝরে পড়ে। ফলে মানুষের জন্য তা সংগ্রহ করা কঠিন। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের বাছাইয়ের ফলে এমন ধানের বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়, যার দানা শিষে শক্তভাবে আটকে থাকে। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০০ সালের দিকে চাষ করা ধানের এ বৈশিষ্ট্য চাষযোগ্য জনগোষ্ঠীতে স্থায়ী হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় ধানের আসল যাত্রা।
পাহাড় পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ধানের আগমন
আজকের ধানের বৈচিত্র্যের বড় অংশের সঙ্গে দুটি প্রধান বংশধারা যুক্ত—পূর্ব এশিয়ার জাপোনিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার ইন্ডিকা। গবেষণায় দেখা যায়, পূর্ব এশিয়া ও উত্তর ভারতে ধান চাষের বিকাশে আলাদা স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া কাজ করেছিল। পরে বিভিন্ন অঞ্চলের ধানের মধ্যে সংকরায়ণ ঘটে। ফলে বলা যায়, আজকের ধান কোনো এক জায়গায় তৈরি হয়ে অপরিবর্তিত অবস্থায় পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েনি।
পূর্ব এশিয়ার গৃহপালিত ধান দক্ষিণ এশিয়ায় কীভাবে পৌঁছল, তা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে একটি জোরালো সম্ভাবনা হলো, এটি উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে পাহাড়ি নদী উপত্যকা ধরে ছড়িয়ে পড়েছিল। কাশ্মীর, সোয়াত ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকাগুলো ছিল তখনকার যোগাযোগের মূল করিডোর।
পাহাড়কে সাধারণত আমরা প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে দেখি। কিন্তু প্রাচীন মানুষের জন্য পাহাড়ের নদী উপত্যকাগুলো ছিল এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাওয়ার স্বাভাবিক পথ। এসব এলাকায় পানি, উর্বর জমি ও মানব বসতির সুযোগ ছিল। সোয়াত ও কাশ্মীরে পূর্ব এশীয় ধরনের প্রাচীন পাথর ও কৃষি সরঞ্জাম পাওয়ায় ধারণা করা হয়, ফসলের পাশাপাশি কৃষির প্রযুক্তি ও ধারণাও এসব পথে চলাচল করেছিল। এমনকি হিমালয়ের বেশ উঁচুতেও প্রাচীন ধানের নমুনা পাওয়া গেছে।
সোয়াত উপত্যকায় ধানের নতুন জীবন
সোয়াত উপত্যকা এ যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতেই সেখানে কৃষিভিত্তিক সমাজের শক্ত অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে বারিকোটের মতো স্থানে বিভিন্ন ফসলের সমন্বয়ে একটি জটিল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে ধানও ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ায় ধানের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়তে থাকে। গঙ্গা অববাহিকায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি ধান চাষ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পরে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলেও ধানের গুরুত্ব বাড়ে। কোনো কোনো প্রত্নস্থানে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে ধান অন্য শস্যকে প্রায় পেছনে ফেলে দিয়েছে। ভারতের উত্তরাঞ্চলের রাজধনী নামক স্থানের একটি প্রত্নস্থানে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শেষ দিকে ধানের দানা যবের তুলনায় প্রায় ২৫০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
মরুভূমির কঠিন পথেও থামেনি ধান
দক্ষিণ এশিয়া পেরিয়ে পশ্চিমে যাওয়ার সময় ধানের সামনে ছিল সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল শুষ্ক, কোথাও সম্পূর্ণ মরুভূমি। সেখানে এমন একটি ফসল নিয়ে যাওয়া, যার জন্য প্রচুর পানি দরকার। এসব কাজ একেবারেই সহজ ছিল না। তবু ধান সেখানে পৌঁছেছিল।
ভাষার ইতিহাসেও ধানের এ সফরের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন ভাষায় ধানের নামের সঙ্গে প্রাচীন চীনা শব্দের মিল পাওয়া যায়। প্রাচীন চীনা শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়ে তা পরবর্তী সময়ে বৈদিক, ফার্সি, তুর্কি ও ইউরোপীয় ভাষায় নানা রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ বীজের সঙ্গে সঙ্গে শস্যের নামও বিশ্বভ্রমণ করেছিল।
প্রাচীন লিখিত ইতিহাসে ধানের উপস্থিতি সবসময় ধারাবাহিক নয়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর দিকে চীনা ঐতিহাসিক নথিতে ফারঘানা অঞ্চলে ধান চাষের কথা জানা যায়। আবার অনেক শতাব্দীর নথিতে ধানের কোনো উল্লেখই নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও একই গল্প বলে। উজবেকিস্তানের খালচায়ানে খ্রিস্টীয় তৃতীয়-পঞ্চম শতাব্দীতে মাত্র দুটি ধানের দানা পাওয়া গেছে। ফারঘানা, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান ও জিনজিয়াংয়েও বিভিন্ন সময়ের ধানের সামান্য নমুনা মিলেছে।

মানচিত্রে বিভিন্ন ধরনের ধান ও তার উৎপাদন অঞ্চল। নীল ছাপের এলাকায় আধুনিক সময়, ডট লাইনে আধুনিক বুনো ধানের এলাকা দেখানো হয়েছে
সূত্র: এ জার্নি টু দ্য ওয়েস্ট: দি অ্যানসিয়েন্ট ডিসপারসাল অব রাইস আউট অব ইস্ট এশিয়া
সমুদ্রের লবণ পানিতে চালের বাণিজ্য
স্থলপথের পাশাপাশি ধানের পশ্চিমযাত্রায় সমুদ্রও ছিল গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় বন্দর থেকে ভারত মহাসাগর পেরিয়ে চালবাহী জাহাজ পৌঁছত লোহিত সাগরে। সেখান থেকে মিসর ও ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর হয়ে ইউরোপের দিকে।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক লেখকদের কাছে ভারতীয় চাল পরিচিত ছিল। পরে গ্রিক ও রোমান লেখকরাও চালের কথা বলেছেন। কিন্তু তাদের বর্ণনায় চাল কখনই পূর্ব এশিয়ার মতো সাধারণ প্রধান খাদ্য নয়। কখনো এটি ওষুধ, কখনো রুটি বা পানীয় তৈরির উপাদান, কখনো খাবার ঘন করার উপকরণ।
রোমান আমলের মিসরের কুসেইর আল-কাদিম, বেরেনিকে ও মিওস হরমোসের মতো লোহিত সাগরীয় বন্দরেও ধানের দানা পাওয়া গেছে। এগুলো ইঙ্গিত দেয়, চাল সমুদ্রপথে বাণিজ্যপণ্য হিসেবে চলাচল করত।
ইউরোপে গিয়ে চালের পরিচয় আরো আলাদা হয়ে যায়। বর্তমান জার্মানির কাছে রোমান সামরিক ঘাঁটিতে পাওয়া প্রথম শতাব্দীর ধানের দানা একটি চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে মিলেছে। ফলে চালের ঔষধি ব্যবহারের ধারণা আরো শক্ত হয়।
শুষ্ক ভূমিতে ধান চাষের সংগ্রাম
পূর্ব থেকে পশ্চিম এশিয়ায় ধান পৌঁছানো আর সেখানে ধান চাষ করা—দুটি এক জিনিস ছিল না। চাষের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল পানি।
ধানের জমিতে পানি ধরে রাখতে হয়। আবার অতিরিক্ত পানি ও লবণ জমলে জমির ক্ষতি হতে পারে। ফলে নিয়মিত পানি দেয়া, বের করে দেয়া এবং আবার সেচ দেয়ারও প্রয়োজন হয়। শুষ্ক অঞ্চলে এটি ছিল শ্রমসাধ্য কাজ।
প্রাচীন কৃষকেরা নদী, খাল, বাঁধ ও সেচ ব্যবস্থার সাহায্যে এমন জায়গায়ও ধান ফলানোর চেষ্টা করেছেন, যেখানে প্রকৃতি নিজে ধানের পক্ষে ছিল না। কোথাও ছোট জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে, কোথাও জমি কয়েক বছর পতিত রাখা হয়েছে।
এখানে মানুষের খাদ্যরুচির শক্তিও বোঝা যায়। একটি ফসল চাষে এত পরিশ্রম ও পানি খরচ করেও মানুষ তা চালিয়ে গেছে, কারণ ধান ধীরে ধীরে তাদের পছন্দের খাবারে পরিণত হচ্ছিল।
ওষুধ থেকে পোলাওয়ের প্রাণ
পশ্চিম এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরে চালের প্রথম পরিচয় আজকের মতো ভাত বা পোলাও হিসেবে হয়নি। প্রাচীন লেখায় চালের মাড়, পায়েস, গুঁড়া চালের খাবার ও ওষুধের উল্লেখ বেশি।
প্রথম দিকের আরবি রান্নার বইয়েও চাল ছিল সীমিত উপাদান। কোথাও চাল দিয়ে রুটি, কোথাও মিষ্টি পায়েস, কোথাও খাবার ঘন করার জন্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। পরে ধীরে ধীরে মাংস ও অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে চালের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে।
আজ উজবেকিস্তান থেকে আফগানিস্তান, ইরান থেকে উত্তর আফ্রিকা বিভিন্ন অঞ্চলে ‘পিলাফ’ জাতীয় খাবার শুধু খাদ্য নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। অথচ একসময় সেই চালই ছিল দূরদেশী বিলাসপণ্য।
ইসলামী যুগে গতি, কিন্তু শুরু তারও আগে
পশ্চিম এশিয়ায় ধানের বড় বিস্তারকে অনেক সময় ইসলামী সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সপ্তম শতাব্দীর পর সেচ ব্যবস্থা ও কৃষি অবকাঠামোর বিস্তার ধান চাষে নতুন সুযোগ তৈরি করেছিল। ধান যে ইসলামী যুগেই প্রথম পশ্চিম এশিয়ায় আসে, তা নয়।
সাসানীয় যুগেই ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে ধান চাষের প্রমাণ ছিল। জমির কর নির্ধারণেও ধান উৎপাদন বিবেচনায় নেয়া হতো। মিসরের ফাইয়ুমেও পরে ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবু পশ্চিম এশিয়ার সর্বত্র ধান প্রধান শস্য হয়নি। গম ও যবের আধিপত্য দীর্ঘদিন ছিল। লেভান্ত অঞ্চলে ধান ব্যাপক খাদ্যশস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে আরো অনেক সময় লাগে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও দেখায়, মধ্যযুগ পর্যন্ত বহু অঞ্চলে ধান ছিল অন্যান্য শস্যের তুলনায় অতি সামান্য।
এক মুঠো চালে মানুষের ইতিহাস
পূর্ব এশিয়ার নদী অববাহিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া, সেখান থেকে একদিকে মধ্য এশিয়ার পাহাড়-মরুভূমি পেরিয়ে পশ্চিমে, অন্যদিকে ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগর হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ধানের এ দুই যাত্রাপথ শেষ পর্যন্ত বদলে দিয়েছে মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি।
আজকের ভাত, পোলাও কিংবা পিলাফ তাই শুধু রান্না নয়। প্রতিটি দানার ভেতরে আছে কৃষির পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বাণিজ্যপথের স্মৃতি, সেচের শ্রম, মানুষের চলাচল এবং সংস্কৃতির দীর্ঘ বিনিময়। একসময় যে চাল পশ্চিমে ছিল অচেনা ওষুধ কিংবা অভিজাতের খাবার, সেটিই পরে হয়ে উঠেছে কোটি মানুষের পরিচিত খাবার।
তাই পরের বার যখন আমরা এক থালা গরম ভাত বা সুগন্ধি পোলাও মুখে তুলে নেব, তখন মনে পড়বে এ স্বাদের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে হাজার বছর ধরে শত শত অচেনা মানুষের ঘাম, দীর্ঘ পথচলা এবং বিশ্ব পরিবর্তনের এক অন্য রকম গল্প।
এ জার্নি টু দ্য ওয়েস্ট: দি অ্যানসিয়েন্ট ডিসপারসাল অব রাইস আউট অব ইস্ট এশিয়া শীর্ষক প্রবন্ধ অবলম্বনে
মাহফুজা মিম: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা








