আমাদের দেশে আমাদের সমাজজীবনে যিনি ছিলেন একটি দীপ্তিময়ী নক্ষত্রের মতো সমুজ্জ্বল, তিনি আজ আর আমাদের মাঝখানে নাই। বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ আজ আর নাই। যাঁহার নাম উচ্চারণ করিতে শুধু শিক্ষিত সম্প্রদায়ই নয়, দেশের সর্বসাধারণও গৌরব বোধ করিয়াছে। যাঁহার কথা শুধু নিজের দেশে নয়, বিদেশেও ছিল গর্ব করিয়া বলিবার মতো। আজ মৃত্যুর নির্মম হস্ত তাঁহাকে আমাদের মাঝখান হইতে চিরদিনের মতো অপসারিত করিয়াছে। আর আজ আমরা অনুক্ষণ বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁহারই কথা স্মরণ করিতেছি!
আজ বিশেষ করিয়া মনে পড়িতেছে ১৯৫০ সনের মে মাসে একটি ঘরোয়া বৈঠকে তাঁহার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ও পরিচয়ের কথা। সেই প্রথম দেখার পর হইতে ক্রমেই তাঁহার যত ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসিয়াছি, ততই মন তাঁহার দিকে আকৃষ্ট হইয়াছে তাঁহার অশেষ গুণে, তাঁহার সৌজন্য ও অমায়িক ব্যবহারে।
১৯৫০ সনে ঢাকায় মুসলিম মহিলা কর্মীর সংখ্যা ছিল নিতান্তই স্বল্প। আর তাঁহাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্ব বিষয়ে অগ্রগামিনী। ফলে ক্রমশ তাঁহার নাম সর্বাধিক সুপরিচিত হইয়া ওঠে এবং তিনি সকলের সর্বাধিক শ্রদ্ধা অর্জনে সক্ষম হন।
মুসলিম নারী সমাজের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নতি বিধানে অগ্রদূতী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জীবনী লেখিকা বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ শুধু তাঁহার জীবনী লিখিয়াই ক্ষান্ত থাকেন নাই। নিজ জীবনেও তাঁহার আদর্শকে তিনি সুপরিস্ফুট করিয়া তুলিয়াছিলেন। তাঁহার সময়ে তাঁহার মতো উচ্চশিক্ষিতা মহিলা বাংলা মুসলিম সামজে আর কে ছিলেন জানি না। কিন্তু জানি যে ঢাকায় মহিলাদের মধ্যে ১৯৪৭ সনের পর হইতে সমাজসেবার কাজে তিনিই ছিলেন নানাভাবে সর্বাপেক্ষা অগ্রগামিনী।
আজ মনে পড়ে, ১৯৫১ সনে গেণ্ডারিয়ায় আমাদের মহিলা সমিতির প্রথম শিল্পমেলার উদ্বোধন করিতে তাঁহাকে যখন আমরা আমন্ত্রণ করি, তখন তিনি আমাদের মাঝখানে উপস্থিত হইয়া মেলার উদ্বোধনকার্য ও তাঁহার উৎসাহব্যঞ্জক ভাষণ দ্বারা আমাদিগকে আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত করেন। সেই সময়ে ঢাকায় মহিলাদের ভিতর ঐরূপ কর্মপ্রচেষ্টা একরূপ ছিল না বলিলেই চলে। ইহার পর আমরা আমাদের যে কাজে যখনই তাঁহাকে আহ্বান করিয়াছি, তখনই তিনি আমাদের মাঝখানে আসিয়া উপস্থিত হইতে কিছুমাত্র ত্রুটি করেন নাই।
ঢাকায় তখন মহিলা প্রতিষ্ঠান বেশি ছিল না। ইহার পর ক্রমে ক্রমে যখনই নানা মহিলা সমিতি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠিতে লাগিল, তখনই তাহার প্রায় প্রতিটির সঙ্গেই ছিল তাঁহার কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ। তিনি কাহারও কর্মপ্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করেন নাই, কাহারও আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করেন নাই। সমাজসেবামূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত থাকিয়া সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করিয়াছেন।
যেকোনো সভাসমিতিতে ও যেকোনো অনুষ্ঠানে তাঁহার উপস্থিতি ছিল যেন অবধারিত। আমরা যখনই এরূপ কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হইয়াছি, তখনই আমাদের চোখ খুঁজিয়া বেড়াইয়াছে, তিনি উপস্থিত হইয়াছেন কিনা তাহা দেখিবার জন্য। মন উৎসুক হইয়া রহিয়াছে তাঁহার মনোজ্ঞ ভাষণ শুনিবার জন্য।
কি বাংলা, কি ইংরেজি উভয় ভাষাতেই তাঁহার যে অনর্গল বাকপটুতা ছিল তাহা কাহাকে মুগ্ধ না করিয়াছে? আজ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠানে আমাদের চোখ শত খুঁজিয়াও আর তাঁহাকে দেখিতে পাইবে না, শুনিতে পাইবে না আর তাঁহার সেই বাঞ্ছিত কণ্ঠস্বর!
শুধু সামাজিক জীবনে নয়, পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন আদর্শস্থানীয়। পতি-পুত্র নিয়া তাঁহার দুঃখ-তাপ বিবর্জিত ছোট সুখের সংসারটি সুগঠিত হইয়াছিল তাঁহারই নৈতিক প্রভাবে। উদার-হৃদয় সুযোগ্য স্বামীর স্নেহশীলতা, উপযুক্ত পুত্রদ্বয়ের মাতৃ-অনুরাগ তাঁহার সংসার জীবনকেও মধুর করিয়া ছিল। সামাজিক জীবন ও পারিবারিক জীবন উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে সম্মান ও সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়া সংসারে নিতান্তই দুর্লভ। কিন্তু সেই সম্মান ও সৌভাগ্যের অধিকারিণী ছিলেন তিনি। দুই বৎসর আগে পতি বিয়োগ ব্যথা তাঁহাকে অতীব শোকাভিভূত করিয়াছিল। কিন্তু সে বিয়োগ ব্যথাও তাঁহাকে বেশি দিন ভোগ করিতে হইল না। তাঁহার জীবনসঙ্গী অল্পকালের ভিতরেই তাঁহাকে নিজের কাছে আহ্বান করিয়া নিলেন। উপযুক্ত পুত্রদ্বয়, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনি রাখিয়া পারিবারিক জীবনে আমাদের দেশে নারীর যাহা কাম্য, সেই ভাবেই সব পূর্ণ করিয়া তিনি চলিয়া গিয়াছেন।
আজ আমরা তাঁহার বিয়োগ বেদনায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁহার প্রতিভা প্রদীপ্ত জীবনের গুণাবলি স্মরণ করিতেছি। আর তাঁহার অভাব যে দেশের ও সমাজের পক্ষে কত বড় অভাব তাহাই গভীরভাবে অনুভব করিতেছি। আজ তিনি আর মরদেহে আমাদের মাঝখানে নাই, কিন্তু আমাদের স্মৃতির মাঝখানে জাগিয়া রহিয়াছেন।
কবি বলিয়াছেন, "স্মৃতি শুধু জেগে রহে, অতীত কাহিনী কহে—আজ সেই স্মৃতিই আমাদের মনে জাগাইয়া দিতেছে তাঁহার জীবনের সব অতীত কাহিনি। জাতীয় জীবনে, দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত সেই সমুজ্জ্বল স্মৃতিকাহিনির ভিতর দিয়াই তিনি অমর হইয়া সকলের মাঝখানে অবস্থান করিবেন। আর আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ মহিলা সমাজ তাঁহার সেই স্মৃতির ভিতর দিয়াই জীবনের পথে নিত্যনূতন উৎসাহ ও নিত্যনূতন কর্মপ্রেরণা লাভ করিবে।
আশালতা সেন: কবি ও সমাজসেবক










