বাহার-নাহার, নাহার-বাহার আমার সাহিত্যিক জীবনের সূচনায় উচ্চারিত হতে শুনেছি এ বুলি। সাহিত্যের ব্যাপারে এ দুই ভাইবোনকে চাটগাঁয়ে আমরা কখনো পৃথক করে দেখতাম না, ভাবতাম না পৃথক করে। পারিবারিক মহলেও তাই ছিল অবস্থা। ...শিক্ষা ও সাহিত্যের একটা অনুকূল পরিবেশ যেমন এখানে ছিল, তেমনি জীবনের চৌহদ্দি ছিল সে যুগের মুসলিম আভিজাত্য বা শরাফতীর পাঁচিল ঘেরা। শামসুন নাহারের নানি আর খালাম্মারা কোনোদিন পর্দার বাইরে পা বাড়াননি।
নাহারেরও প্রাথমিক জীবন পর্দার অন্তরালেই কেটেছে। অসাধারণ প্রতিভা, তেজস্বী ব্যক্তিত্ব আর অমিত মনোবলের অধিকারিণী হয়েও রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন পর্দার পাঁচিল ভাঙতে পারেননি। সে পাঁচিল ভাঙার, তার রুদ্ধদ্বার খোলার দায়িত্ব পড়েছিল তার সুযোগ্য আর অনুগামিনী শামসুন নাহারের ওপর। ...শামসুন নাহার বুঝতে পারলেন, নিভৃত অন্তঃপুরে বসে বইপড়া আর ঘরকন্নার দিন গত হয়েছে।
এবার বহির্জগতের কর্মস্রোতে গা ভাসাতে হবে। সমাজের জাগরণ আর কর্মচাঞ্চল্যকে দিতে হবে স্রোত আর তাকে করতে হবে সম্মুখ- প্রবাহিণী। এতদিন অন্তঃপুরে বসে যে সুকঠিন পরিশ্রম ও সাধনায় নিজেকে প্রস্তুত করে তুলছিলেন, এবার তাকে সার্থক করে তুলতে হবে নানা গঠনমূলক কাজের ভেতর দিয়ে। ফলে শামসুন নাহার এখন থেকে জড়িত হয়ে পড়েন বিভিন্ন সমাজ ও নারীকল্যাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। বলা বাহুল্য, শামসুন নাহার প্রতিষ্ঠানের নামকে ওয়াস্তে বা ঘুমিয়ে থাকা সদস্য ছিলেন না। সর্বত্র তিনি সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতেন। এসব ব্যাপারে তার যোগ্যতা সম্পর্কেও কারো মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না।
তিনি সমানে ইংরেজি, বাংলা, উর্দু বলতে পারতেন। উর্দুভাষীদের সামনে উর্দুতেই নিজের বক্তব্য পেশ করতেন। চট্টগ্রাম কলেজে অগণিত ছাত্র ও অধ্যাপকদের সামনে তাকে ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতে দেখেছি। দেখেছি অনর্গল নিজের বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন—শব্দের কি বক্তব্যের জন্য ভাবতে হতো না, শ্রোতাদের প্রশ্নে যত মত থাক না, কয়েকটি ছাত্রী ছাড়া সব শ্রোতাই পুরুষ, তবু বলতে গিয়ে গলা কাঁপেনি তার একটুও। নিজের ওপর নিজের বিশ্বাস ছিল যেমন প্রচণ্ড, তেমনি বক্তব্য বিষয়ের ওপর দখলও ছিল অসাধারণ।
আবুল ফজল: সাহিত্যিক










