এক বাঁও মেলে না
‘ডার্করুমে যে যে অজ্ঞান হয়ে যাবি, স্লাইড ক্যালিপার্স দিয়ে তোদের নাক তুলে ফেলব, তোদের আমি নিজহাতে ফেল করাব’— এসব ঘোষণা দিয়ে মাদলকুমার দে আমাদের ঠেলে ঢোকালেন অন্ধকার ঘরটায়।
এবং প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের মাঝখানে অজ্ঞান হয়ে গেলেন নিজেই।
আমরা ধরাধরি করে স্যারকে ডার্করুম থেকে বের করে আনলাম। বমিমাখা শরীর। ঘামের মানচিত্রময় বগল। পি.টি. আপা এসে স্যারের না নীল না খড়কুটো না ন্যাকড়ামতন ভাপসা রঙ জামা খুলে দিলেন, পাখা জোরে করে দিলেন। মাথার তালুর চুল ভিজিয়ে দিয়ে জোরে জোরে ডাকতে লাগলেন— ‘দে স্যার! দে স্যার!’
এই দে স্যার, দে স্যার ডাকটা আমার মাথায় গেঁথে গেল। যতবার পরবর্তী জীবনে কোনো কিছুতে নাম্বার কম জুটবে, আমি মনে মনে চিত্কার করে বলব, দে স্যার, দে স্যার! মনে মনে স্যারদের আপনি-আজ্ঞে না করলেও চলবে, আদতে মনে মনে স্যারদের তুইতুকারি করাই নিয়ম। যেসব বরাহ অবতার কেবল গুরুশ্রোণি তুঙ্গস্তনী ছাত্রীদের বাম ঊরুতে বসিয়ে রেখে জাগতিক সাধনা করবে আমৃত্যু, তাদের ওভাবেই ডাকে। এসব অবশ্য তখন ভাবিনি। তখন আসলে কিছুই ভাবিনি, এর পর আর প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস হবে কিনা সেটা ছাড়া।
অতএব
আমি প্র্যাকটিক্যাল খাতার ফিনফিনে কাগজের ওড়না সরিয়ে পাতায় বলপয়েন্ট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লিখলাম—
‘আজ তারায় তারায় দীপ্ত শিখার অগ্নি জ্বলে
নিদ্রাবিহীন গগনতলে
ঐ আলোকমাতাল স্বর্গসভার মহাঙ্গন
হোথায় ছিল কোন যুগে মোর নিমন্ত্রণ...’
গানটা একদিন শুনতে হবে, সুরটা এখনো আমার অজানা। (পরবর্তীতে যখন গানটা শুনব আমার মনে হবে, ধুত্তোর। এ কথার সাথে জেমসের চিত্কার হওয়া উচিত। আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব মার্কা)।
বাইরে চড়চড় করে রোদ চড়ছে। দুপুরচরা পাখি ডাকছে দেবদারু গাছগুলোর নীল নীল অন্ধকার থেকে। বাতাসে একটা নাম না জানা গাছের চিরল চিরল পাতা নড়ছে, রোদে ঝামরে ওঠা পাতার রঙ, কাঁচা দুপুরে ওই গাছের শীর্ষে আলোর পোকা ওড়ে— হোথায় ছিল কোন যুগে মোর নিমন্ত্রণ।
ক্যামেলিয়া তাশফিন, শিলা রানী সরকার আর জামিলার সাথে করিডোরে এসে দাঁড়াই আমি। শেষ হয়ে যাচ্ছে স্লাইড-ক্যালিপার্স আর স্প্রিং নিক্তির দিন। ক্রমে বায়ুশূন্য বেলজারের ভেতরে শব্দের অবাধ মৃত্যু। লন মোয়ার ঠেলতে সহজ না টানতে সহজ, বিলাসী আর নবকুমার। জিম আর ডেলা। সানন্দার পাতায় গঙ্গার ইলিশের কাছে পদ্মার ইলিশের প্রতিযোগিতায় গঙ্গার ইলিশের অকুণ্ঠ জয় নিয়ে আমাদের বিরক্তি। কাগজের ঠোঙায় ওয়াইডব্লিউসিএর ক্যান্টিন থেকে আসা চপচপে আলুর চপ আর শিঙ্গাড়া। ফেয়ার ড্যাফোডিলস উই উইপ টু সি ইউ হেইস্ট অ্যাওয়ে সো সুন! সো-ও-ও সুন! তবু, মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ (আচ্ছা, পরে এই মাইলস টু গোর ধারণাটাও প্রতারণামূলক মনে হবে। বিবিধ উদ্বেগে জীবন কাঁটালো হয়ে ওঠার পর যেন হাতছানি দিয়ে অরণ্যের গহিনে মৃত্যুর অপেক্ষা না ডাক দেয়, সেজন্য ভেবে নেয়া আরো বহুদূর যেতে হবে!)
বাইরে দেয়ালের ওইপারে দাঁড়িয়ে আছে ১৯৯৫ সাল। কী এনেছে আমাদের জন্য? বর্ষভরা পুঁজির বিনিময়ে?
উপচে পড়া জলের কথা/ বুঝবে না তো কেউ
আমাদের কলেজে প্রথম দিন থেকেই রোল নাম্বার অনুযায়ী আমাদের দুই ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। জোড়রা ট্রোজান। বেজোড়রা স্পার্টান। আমার রোল নাম্বার জোড় বলে, সোজা ঢুকিয়ে দেয়া হলো ট্রোজান দলে। আমি বেজায় খুশি, আমি বরাবরই ট্রোজানদের ভালোবাসি (আরে, তখন একবারও মনে হয়নি, এ দেশে দুটি দল হতে গেলে কৌরব-পাণ্ডব না হয়ে কেন ট্রোজান-স্পার্টান হতে হবে। আমরা কলেজে বেসবল খেলতাম, ইংরেজিতে ফটফট করতাম এবং ক্রিসমাসের সময় টুনিবাতি দিয়ে খেজুরগাছ ও তত্সংলগ্ন নীলমণিলতাটিকে সাজাতাম।), স্পার্টানরা যেভাবে কাঠের ঘোড়ার পেটে লুকিয়ে থেকে ভেতরে এসে ট্রোজানদের কচুকাটা করল, সেটা অতি নিকৃষ্ট এবং অবীরোচিত। সবচেয়ে বড় কথা, হেলেন অব ট্রয় (হেলেন অব ল্যাকুনিয়া নয় কিন্তু) স্বেচ্ছায় ট্রয়ের রাজপুত্রের সাথে দেশত্যাগ করেছে— সেটা গ্রিকদের মানতে এত অসুবিধে হচ্ছিল কেন? কেনর উত্তর রাম দিয়েছেন, রাবণ হত্যা তো তিনি সীতাকে ফিরে পেতে করেননি, নিজের স্ত্রী অন্যে হরণ করেছিল বলে পুরুষকারে বেধেছিল বলে করেছিলেন।
মেঘশিরীষের সবুজ ছায়ায় প্রকাণ্ড শিকড়ের ওপর বসে আমরা সমুদ্রের প্রতি রাবণ পড়ি, এই রাবণকেই আমাদের বেশ ভালো লাগে। কৃষ্ণ আর কৃষ্ণের প্ররোচনায় অর্জুন কত মেয়েকে ভাগিয়ে আনল, দোষ হলো না, দোষ হলো রাবণের বেলায়। এমনি মেয়েকে ভাগালে দোষ নেই, কিন্তু বৌকে ভাগিয়ে আনা চলবে না, বৌয়ের কোমরে ঝুনঝুন করে ঝুলছে স্বামীর পুরুষকার— স্বামীর পৌরুষ এবং অহম, সে যদ্দূর যাবে, ওই অদৃশ্য পৈঁছার ঝুনঝুন তদ্দূর যাবে! এসব নিয়েও আমরা জেরবার হতাম। জেরবার হওয়ার সে এক বিচিত্র সময়। আমার মা বলত, ‘বাড়িভাড়ার চিন্তা নেই, কাঁচাবাজারের চিন্তা নাই, এসবই চিন্তা করতে থাকো মণি!” (মুশকিল হলো পরে, বাড়িভাড়া-কাঁচাবাজারের চিন্তা যোগ হওয়ার পরের জীবনেও আমার এই রাম-রাবণ এই স্পার্টান-ট্রোজান বিতর্ক মাথা থেকে গেল না। আমি একটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আচারের তেলে আশিরনিমগ্ন একখানা কুলবরই মাত্র, এর বাইরের যে জীবন জারিত নয়, তা দেখার সমূহ সুযোগ জুটল কই?)
আমাদের বাড়ির কয়েকটা বাড়ির পরই দুঃখ-বাড়ি, দুটি ছেলেমেয়ে, একটি বিধবা মা ওই বাড়িতে থাকে। ছেলেটা কোনো ছোটখাটো অফিসে চাকরি করে, রোজ সে করুণ একটা নীলচে শার্টের উপরে হাফ-সোয়েটার পরে কাদাপানি টপকে কাজে যায়। ওর ওই রাস্তা ডিঙানোও যে কী করুণ।
আমাদের গলির শুরুর বাড়িটা কাঁচা-পয়সাঅলা নজরুল সাহেবের, বারান্দায়ও আকাশি টালি লাগানো। মৌসুমি গাঁদা ফুলে টব উপচে পড়ছে। কলেজ থেকে ফেরার সময় প্রতিদিন আমার মনে হয়, ওই বাড়ির একটা ঘরের নাম কোপভবন, গোঁসা-ঘর। সেখানে রানী কৈকেয়ী মূর্ছা খেয়ে পড়ে আছে। গায়ে নীল শাড়ি। চুল খোলা। বুড়ো রাজা দশরথ লোভের চোখে রানীর বুকের রেখা দেখছে। মুখ যদিও বিচলিত। কলেজফেরতা ঘাম জবজবে মাথায় আমার প্রায়ই মনে হয় রাজরানী মানেও কেবল আকাশি টালি— গাঁদা ফুলের টব লাগানো মহল, রানী কতই পরাধীন। ঝাঁসীর রানীও কি তাই? দীঘাপতিয়ার স্বামীসোহাগিনী রন্ধনে-দ্রৌপদী রানী কিরণলেখাও কি তাই? যা-ই হোক, এসব চলতে থাকুক, বাড়িভাড়া নিয়ে তো চিন্তা নেই, কাঁচাবাজার নিয়েও।
আচ্ছা, দুঃখ-বাড়ির ছেলেটা রোজ কাজ থেকে ফিরে এসে ছাদে দাঁড়ায়। ঠিক সাত কদমে পায়চারি করে। তার পর উত্তর দিকে মুখ করে বসে থাকে। উত্তর দিকে বিশাল ধূ-ধূ মাঠ। তার শেষে বস্তির ধূসর রেখার ওপর থেকে লিকলিক করে ধোঁয়া উঠতে থাকে। কারো বৌ পেটানোর শব্দ— কারো কলতলার ঝগড়া এসবের ভেতরে সে বসেই থাকে— স্টিমারের ভোঁ ধ্বনির মতো ভেসে থাকে সন্ধ্যার অন্ধকারের উপরে। (বিশ্বাস করো, ওর নাম জানার কোনো নরম রুমালের মতো ইচ্ছা আমার হয় না। ও একটা দ্বিমাত্রিক ছবিমাত্র হয়ে থাকে।)
আমার পৃথিবী মোটের উপরে দ্বিমাত্রিক। সব ছবি। আমি দেখতে ভালোবাসি। গণ্ডুকোমাগ্রস্ত চোখ নিয়ে পুরনো শাড়ির পাড় খুলে নিতে থাকা দাদিজান একটা ছবি। অনবরত মাথার চুলে ঝর্ণাকলমের কালি মুছে পরীক্ষার খাতা দেখে যাওয়া মা একটা ছবি। আমার ডাকাতিয়া আপা ইম্প্রেশনিস্টদের দগদগে তুলিতে আঁকা ছবি। গোলচেহারা বেগমের মা (সত্যি ওর মেয়ের নাম গোলচেহারা বেগম) তার ওই ময়লা মিলের শাড়িসমেত ছবি। আলমারির পাল্লায় লাগানো পোস্টারে নেতানো সূর্যমুখীরা ছবি। সামনের গাছটা, ল্যাম্পপোস্টটা, কার্তিক মাসের পোকাগুলো সবই ছবি। সব আমি দেখতে ভালোবাসি।
একজন শুধু ছবি নয়। ছবি সে হতে পারে না। তাকে আমি শুধু দেখতেই ভালোবাসি না, সে কীর্তি, সজীবতম ভাস্কর্য— তাকে আমি ছুঁতে চাই। প্লাস্টিসিনের পুতুলের মতো নেড়েচেড়ে টিপেটুপে তার গায়ের রক্তমাংস দেখতে চাই। আমার ছবির দেশের একটি মোটে মানুষ। তার কথা কাউকে বলিনি। সামনের দিনগুলোয় যখন একসময় কাগজের ক্যালেন্ডার আর দেয়ালে গোত্তা খাওয়ার দিন থাকবে না (দিনপঞ্জি থাকবে কম্পিউটারে), যখন হাতের লেখা দেখে দ্রুতি বা আবেগ কিংবা গ্রুমিং এসব দেখার দিন ফুরাবে, যখন পাশের বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে বলে হেমন্ত-সতীনাথ-প্রতিমা ইত্যাদি বাজানো হবে না, যখন সেলফোন হাতে-হাতে ঘোরে বলে ঠিক নিরুদ্দেশ হওয়া যাবে না, তখন একদিন তার গল্প করা হবে। সত্যি বলতে কি, তখন হয়তো পোড়া পাতুরির পাতা ফুঁড়ে বেরোনো মাছের টুকরোর মতো করে আমার ভেতর থেকে গলগলিয়ে তেলতেলিয়ে তার গল্প বের হয়ে যাবে। এহ! উপমাটা ঠিক ক্ল্যাসিক পর্যায়ের হলো না। তবে এটাই আমার মনে এল, কি আর করা।
১০/০৮/২০১৬
অলঙ্করণ: সুহাস বুজবাল






