জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের একটি দল চার মাস ধরে কাহারোল উপজেলার ডাবর ইউনিয়নের মাধবগাঁও গ্রামে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পরিচালনা করছেন। এ বছরের খনন পরিচালিত হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে। প্রকল্পের শুরু থেকেই মাঠকর্ম ও তদানুষঙ্গিকতায় যুক্ত থাকতে হয়েছে। দীর্ঘদিনের জরিপ অনুসন্ধান ও খননে উন্মোচন হতে থাকে এ অঞ্চলের প্রত্ন ঐতিহ্যের নানা সাক্ষ্য। সম্প্রতি দিনাজপুরের কাহারোলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে একটি নতুন পালক। বিশেষ করে নবরথ বিষ্ণু মন্দির ও একটি দুষ্প্রাপ্য প্রস্তর-ভাস্কর্যের সন্ধান পাওয়ায় নতুন করে ভাবতে হচ্ছে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যিক সাক্ষ্য ও ইতিহাস নিয়ে। এ ভাস্কর্যসহ অন্যান্য নিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মন্দিরটিকে কেন্দ্র করে খ্রি. একাদশ-দ্বাদশ শতকে এখানে বৈষ্ণব মতাবলম্বীদের একটি কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। প্রাপ্ত প্রস্তর-ভাস্কর্যটিকে বিষ্ণুর একমাত্র নারী অবতার-মোহিনীর প্রতিমা হিসেবে শনাক্ত করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত প্রতিমালক্ষণবিদ ও প্রাচীন শিল্পকলার ইতিহাসবিদ ক্লদিন বুদজে-পিক্রো।

চলমান খনন কার্যক্রমের পরিচালক হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণ থেকে দেখেছি, আবিষ্কৃত মন্দিরটির গর্ভগৃহ বাইরের দিকে উলম্ব অভিক্ষেপকে প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের পরিভাষায় ‘রথ’ বলা হয়। নয়টি রথবিশিষ্ট বলে মন্দিরটিকে নবরথ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। নবরথ গর্ভগৃহের পূর্বে আয়তাকার চারটি স্তম্ভবিশিষ্ট মণ্ডপ রয়েছে। মন্দিরটির স্থাপত্যরীতিকে কলিঙ্গ (বর্তমান ওডিশা) মন্দির স্থাপত্যরীতির অনুসারী হিসেবে শনাক্ত করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও প্রাচীন ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যশাস্ত্র-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. দীপক রঞ্জন দাশ। তার অনুমান অনুসারে গর্ভগৃহের উপরে উঁচু শিখর ছিল, যেটাতে রথ অভিক্ষেপগুলো প্রলম্বিত হতো। এ শিখর রেখা দেউল নামে পরিচিত। তিনি আরো বলেন, মণ্ডপের উপরে সম্ভবত ছিল ধাপে ধাপে নির্মিত শিখর। এ শিখর পীড়া দেউল নামে পরিচিত।

আমরা দেখেছি, বর্তমান ওডিশার ভুবনেশ্বরে যে মন্দিরগুলো আছে, সেগুলো পাথরের তৈরি। ইটের তৈরি আবিষ্কৃত এ ধরনের মন্দিরের অস্তিত্ব বাংলাদেশে আপাতদৃষ্টিতে এই প্রথম। কারণ এর আগে বিভিন্ন স্থানের খননে যে ধরনের মন্দির আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে, তার গাঠনিক বৈশিষ্ট্য এর সঙ্গে মেলে না। এ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের জরিপ, অনুসন্ধান ও খননের অভিজ্ঞতায় আমাদের বিশ্বাস, দিনাজপুর-জয়পুরহাট অঞ্চলে এ ধরনের মন্দির আরো ছিল। অন্তত আমাদের নিবিড় জরিপ ইঙ্গিত করে, এ ধরনের স্থাপত্যের সংখ্যা এখানে আরো বেশি হওয়ার কথা। তবে অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলে ইটের তৈরি রেখা দেউল ও পীড়া দেউলসহ মন্দির এখনো পাওয়া যায়নি। আবিষ্কৃত এ মন্দিরটির রেখা দেউল কেমন ছিল, তা বোঝা যেতে পারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে বহুলড়ায় অবস্থিত সিদ্ধেশ্বর মন্দিরটি দেখে।

খননে অংশগ্রহণকারী গবেষক দল দীর্ঘদিনের অক্লান্ত শ্রমে এখান থেকে বিভিন্ন নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন, যেগুলো বাংলার ইতিহাস নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এর মধ্যে উল্লেখ করা যেতে পারে পাথরের প্রতিমার বিভিন্ন ভগ্নাংশ। এসব ভগ্নাংশের কয়েকটি শনাক্ত করা গেছে, যা নিয়ে বিশ্লেষণ ও উপযুক্ত গবেষণার অবকাশ রয়েছে। ১১-১২ শতকের বিষ্ণু প্রতিমার চার হাতে থাকা শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মর ভগ্নাংশ এগুলোর মধ্যে অন্যতম। গবেষণার কাজে এখানে আসার পর গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে আমরা জেনেছি, তারা ঢিবিটির পূর্ব দিকে খুঁড়ে কয়েকটি প্রতিমার ভগ্নাংশ পান মুক্তিযুদ্ধেরও আগে। তারা নিকটবর্তী গাছের নিচে এ প্রতিমাগুলোর উপাসনা করতেন। এগুলোর মধ্যে একটি ছিল প্রমাণ আকারের বিষ্ণু প্রতিমার অংশ। বাকিগুলো ছিল ছোট দেবী প্রতিমা। সব প্রতিমাই চুরি হয়ে গেছে। সেগুলো ওই সময়ে চুরি না গেলে এ অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধানকাজের আলোকসম্প্রপাত অনেক সহজ হয়ে যেত।

খনন ও অনুসন্ধানের একটি পর্যায়ে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য প্রতিমার ভগ্নাংশটিও পাওয়া গেছে ঢিবির পূর্বাংশ থেকে। প্রতিমাটি সম্পর্কে ক্লদিন বুটজে-পিক্রোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ওই দেবী প্রতিমাটিকে বিষ্ণুর নারী অবতার মোহিনী হিসেবে শনাক্ত করেন। তিনি আরো জানান, খ্রি. একাদশ-দ্বাদশ শতকে এ অঞ্চলে বৈষ্ণব মতবাদ প্রবল ও প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠে ব্রাহ্মণ্যধর্মীয় অন্যান্য ধারার মতোই। পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্রগুলোয় উল্লিখিত বিভিন্ন দেবতা ও দেবীরূপের বাস্তবিক প্রতিমা তৈরি করা শুরু হয়। ভাগবত পুরাণে বিষ্ণুর এ নারী অবতারের কথা উল্লেখ আছে। প্রখ্যাত প্রতিমালক্ষণবিদ জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও পুরাণে উল্লিখিত বিষ্ণুর ২২টি অবতারের কথা বলেছেন। মোহিনী তার মধ্যে অন্যতম আর একমাত্র নারীরূপ। ক্লদিন বলেন, ভারত উপমহাদেশের পূর্বাংশে এই প্রথম প্রস্তরনির্মিত মোহিনীর প্রতিমা পাওয়া গেল। বিভিন্ন লিখিত উপাদানের নিরিখে তিনি মনে করেন, আলোচ্য মন্দিরটি বৈষ্ণব মতাবলম্বীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ১১-১২ শতকে।

সম্প্রতি দিনাজপুরের কাহারোলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আমাদের সহযোগী পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহছান তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত প্রত্ননিদর্শনের আপাত অনুমান করার চেষ্টা করেছেন। তিনি মনে করেন, প্রাথমিকভাবে খননকৃত স্থাপনাটি গঠন, রূপান্তর, ফাটল, স্তম্ভগুলোর কাত হয়ে পড়াসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য একটি প্রত্ন-ভূমিকম্পের আলামত অনুমান করার জন্য যথেষ্ট। ভৌগোলিকভাবে পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায়, মন্দিরটি তিস্তা পলল পাখার নরম বালির উপরে দুটি আদি নদীখাতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে নির্মিত। এর আগে মহাস্থানগড়ে বাংলাদেশ-ফ্রান্স যৌথ খননে খ্রি. দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে সংঘটিত একটি ভূমিকম্পের প্রত্নতাত্ত্বিক আলামত পাওয়া গেছে। ওই ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল বর্তমান নেপালে। এক্ষেত্রে ভূমিকম্পের আলামতগুলো বিশ্লেষণ করার জন্য প্রত্ন-ভূমিকম্প বিশারদদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলে উপযুক্ত কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে জানা সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননের কাজ শেষ হলেও, ছবি তোলা ও বিশদ ড্রইংয়ের কাজ এখনো চলছে। নথিভুক্তকরণ শেষ হওয়ার পর সংরক্ষণের প্রয়োজনে স্থাপত্য কাঠামোটি আবার মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়ার কাজ শুরু হবে। সব কাজ শেষ হতে আরো এক মাস সময় লাগবে। মন্দিরটির বিষয়ে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। আমরা আশা রাখছি, খনন ও বিশ্লেষণ আনুমানিক শেষ পর্যায়ে গেলে দ্রুতই গবেষণার আপাত ফলাফল নিয়ে একটি সেমিনার করে প্রাপ্ত নিদর্শন ও তার বিশ্লেষণমূলক তথ্যাদি উপস্থাপন করা হবে। আমি আমার শিক্ষার্থী ও সহগবেষকদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অসীম ধৈর্য ও আগ্রহ নিয়ে কাজ করে এবারের খননকাজ সফলভাবে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

লেখক: অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়