মুর্তজা বশীর, দেশের কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী, ১৭ আগস্ট ছিল তার ৮৫তম জন্মদিন। ১৯৮০ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিল্পীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন: আলীম আজিজ
আলীম আজিজ: একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে চাই। আপনার জন্মের ইতিহাস ঘটনাবহুল, জন্মের সময় জীবন-মরণের মতো জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, আপনার বাবার সিদ্ধান্ত মানলে আপনার পৃথিবীতে আসার কথা ছিল না!
মুর্তজা বশীর: আমার জন্ম ১৭ আগস্ট ১৯৩২ সালে। বাংলা মাসটা সঠিক মনে নেই। তবে আমার জন্মের দিনক্ষণ এবং সময় আমার পিতা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। আর আমার জন্মপূর্ববর্তী ঘটনা মায়ের মুখে যা শুনেছি সেটা হলো, জন্মের দুইদিন আগে আমার মা পা পিছলে পড়ে যান। এর ফলে গর্ভবাস থেকে আমার একটা হাত বাইরে বের হয়ে এল। খুবই জটিল অবস্থা, এর কারণে দুইদিন দুই রাত আমার মা বসতে পারেননি, শুতে পারেননি। তখনকার সময়ে খাটের চারকোনায় মশারি টাঙানোর জন্য কাঠের স্ট্যান্ড লাগানো থাকত। আমার মা খাটের ওই স্ট্যান্ড ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন টানা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার ড. বোস এসে দেখেটেখে বললেন: প্রসূতিকে বাঁচাতে হলে সন্তানকে মেরে ফেলতে হবে। যে অবস্থায় আছে তাতে বাইরে থেকে জীবাণু আক্রান্ত হতে পারে। আমার মা এ প্রস্তাবে রাজি হলেন না। ফলে দুইদিন পর আমার জন্ম হলো। আর এ ঘটনাটা আমি বিশেষভাবে মায়ের কাছ থেকে শুনতাম যে, মা প্রায়ই বলতেন, তুই পেটে থাকতেও আমাকে জ্বালিয়েছিস এখনো জ্বালাচ্ছিস। আমার জন্মের সঙ্গে আরো ঘটনা আছে: এটা খুবই মিস্টিরিয়াস। এটাও মায়ের মুখেই শুনেছি। আমরা থাকতাম ফুলার রোডে বর্তমান ব্রিটিশ কাউন্সিলের উত্তর দিকের একটা বাড়িতে। তার সামনে আলুসা মালুসা নামে দুটি মাজার ছিল। আমার বাবা তখন সলিমুল্লাহ হলের প্রভোস্ট হওয়ার সুবাদে ওই বাড়িটি পেয়েছিলেন। এ বাড়িটা সবার কাছে পরিচিত ছিল ড. হাসান সাহেবের কুঠি নামে। তিনি এ বাড়িতে থাকতেন, ড. মাহমুদ হাসান সাহেব পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছিলেন। তিনি কোনো একটি শিক্ষাগত কারণে বিলাত গেলে ওই বাড়িটি খালি হয়। আর বাবা প্রভোস্ট হওয়ার কারণে সেখানে সেই সুযোগে তাকে ওই বাড়িটি দেয়া হয়। ওই বাড়িতেই আমার জন্ম হয়েছিল, সেটা দুপুর সাড়ে ১২টায়। সেদিন সন্ধ্যায় অথবা ঠিক আগের সন্ধ্যায় হঠাত্ দেখা গেল, প্রসূতির ঘর খুব আলোকিত হয়ে গেছে। তখন ইলেকট্রিসিটি ছিল না, গ্যাসের বাতি দিয়ে আলোর ব্যবস্থা করা হতো। আমাদের সঙ্গে ছোট চাচি থাকতেন। উনি মায়ের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখেন, পাঁচ-ছয়জন লোক; মাথায় পাগড়ি লম্বা আলখেল্লা পরা, তারা দু’হাত তুলে মোনাজাত করছেন। তাদের একজন চাচিকে দেখে ঘটনাটি কাউকে না জানানোর অনুরোধ করলেন। সাবধান করলেন, নিষেধ অমান্য করলে ক্ষতি হবে। কিন্তু আমার চাচি ঘটনাটি গোপন রাখতে পারলেন না, আমার মাকে ঘটনাটি জানালেন। এর পর আমার চাচি অল্প কদিন পরই মারা গেলেন। মায়ের কাছ থেকে এ ঘটনা জানার পর আমার ভেতর একটা অপরাধবোধ তৈরি হলো।
আমার বড় বোন মহযূযা খাতুন, তার স্বামী ড. সিরাজুল হক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজের। এই বোন আমাকে বলতেন, ওই লোকগুলো কেন এসেছিল জান? ওরা এসে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে বলছিল: দুনিয়ায় এক জালেম আসছে, তার থেকে আমাদের
রেহাই দাও। আমি শুনে দুঃখ পেতাম। বড় বোনকে আমি প্রতিবাদ করে বলতাম, পৃথিবীতে একজন ভালো লোক আসছে, ওই লোকগুলো এসে সেজন্যই মোনাজাত করেছিল।
আমি পিতার কবরে যাইনি দাফনের পর, বহু বছর। অনেক পরে, আমার পুত্রসন্তান, পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে আমার যাওয়া পিতার কবরে। আমি আমার কর্তব্যবোধ থেকে তাদের কবরটি চিনিয়ে দিতে চেয়েছি। এর পর তারা যাবে কি যাবে না, সেটা তাদের ব্যাপার। আমি মায়ের কবরের কাছে গিয়েছিলাম প্রায় ৪৮ বছর পর, দুই মেয়েকে নিয়ে।
আমি এমনিতেই কবরস্থানে যাই না। আমি সেভাবে ধর্মকর্ম করতে পারি না। কিন্তু আল্লাহকে বিশ্বাস করি পরিপূর্ণভাবে। শুধু বিশ্বাস নয়, আমি আল্লাহর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। টোটাল সারেন্ডার টু অলমাইটি আল্লাহ বলতে যা বোঝায়, আমি ঠিক তাই।
১৯৬৬ কিংবা ’৬৭ সালের দিকের কথা বলি: আমরা তখন থাকি বেগমবাজারে, আমার বাবা বাসায় থাকলে তার ছেলেদের নামাজের জন্য ডাকতেন। তবে উনি উইদাউট নক কারো ঘরে ঢুকতেন না। সবসময় নক করে ঘরে ঢুকতেন। আমাকে যখন নক করতেন, আমি খাটের নিচে লুকিয়ে থাকতাম। যদিও আমি দুবেলা তার সঙ্গে নামাজ পড়তাম। এভাবে চলতে চলতে আমার বড় মেয়ের বয়স যখন তিন কি চার হবে, এ রকম একদিন ডাকাডাকির সময় তাকে বললাম, দাদাকে বলো বাবা ঘরে নেই। তার দুদিন পর আবার বাবা যখন ঘরের দরজায় টোকা দিলেন, এবার আমি গিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ালাম। তিনি নামাজের কথা বললেন। তখন আমি তাকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম, কার ভয়ে নামাজ পড়ব, আপনার ভয়ে নাকি আল্লাহর ভয়ে? উনি একটু থতমত খেয়ে গেলেন। আমি যদি নামাজ না পড়ি, তাহলে আপনি আমাকে বের করে দেবেন? তাহলে আমার বউ-বাচ্চা নিয়ে আমি যাব কোথায়, খাব কী?
এটা বলেছিলাম কারণ আমি কোনো দিন চাকরি করিনি। আমার জীবনের প্রথম চাকরি সে অর্থে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, ৪১ বছর বয়সে অধ্যাপনা শুরু করেছিলাম। এর আগে টুকটাক চাকরি করেছি। রেগুলার কিছু নয়। তখন বাবার দিকে তাকিয়ে আরো বলেছিলাম, হোয়াই ফাইভ টাইমস? হোয়াই নট টোয়েন্টি ফোর আওয়ারস? বাবা শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কোনো কথা বললেন না। ৫ মিনিট পর মাথা নামিয়ে চলে গেলেন। তার পর যে কয়েক বছর তিনি সুস্থ ছিলেন, তিনি আমাকে ডাকেননি। আমার উল্টো দিকের ঘরে আরেক ভাই থাকতেন, তিনি তাকে ডাকতেন।
আলীম আজিজ: আপনার আঁকাআঁকির শুরু অনেক ছোট বয়সেই, প্রথম বাইরের কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন মার্ক্স, লেনিন, এঙ্গেলসের প্রতিকৃতি এঁকে, তখন আপনারা বগুড়ায় থাকতেন।
মুর্তজা বশীর: আমার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করার পর ১৯৪৪ সালে বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে তিনি আমাদের বগুড়ায় নিয়ে যান। তো সে সময় আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। বাবার কাছে কলেজের নানা ছাত্ররা আসতেন। তখন কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম প্রকাশ্যে নয়, গোপনে। পুরোপুরি গোপনও বলা যায় না, সেমি-আন্ডারগ্রাউন্ডে বলতে পারো। তখন ছাত্র ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন কবি আতাউর রহমান। বাবার ছাত্র, নিয়মিত আসতেন বাবার কাছে। তিনি আমাকে প্রায়ই তাদের অফিসে আসতে বলতেন। আমি তাদের অফিসে একসময় যাওয়া শুরু করলাম, সেখানেই তাদের আলোচনায় শুনতাম মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেলিনদের কথা। শুনে আমার ভেতরে খুব আলোড়ন হতো। পরে আমি ছাত্র ফেডারেশনের সক্রিয় কর্মী হিসেবেই তাদের মিটিং-মিছিলে যাওয়া শুরু করি। তখন আমার খুব ইচ্ছা হলো আমি মার্ক্স, লেলিন, এঙ্গেলস, স্ট্যালিনের প্রতিকৃতি আঁকব। কিন্তু তার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমার খুব আর্টিস্ট হওয়ার শখ ছিল। বরং আর্টিস্ট হওয়ার বাসনা আমার কোনো কালেই ছিল না। ছোটবেলায়ও নয়। তবে ছবি দেখতে আমার খুব ভালো লাগত। তো বাবার লাইব্রেরিতে ভারতবর্ষের বিচিত্রা, বঙ্গশ্রী, বসুমতি প্রভৃতি মাসিক পত্রিকা থাকত। আবার এনসাইক্লোপিডিয়া, ব্রিটানিকাও থাকত। এসবের মধ্যে খাস্তগীর, মুকুল দে, রমেন চক্রবর্তী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসুদের আঁকা ছবি আমাকে বিমোহিত করত।
ঢাকায় আমি পড়তাম নবকুমার ইনস্টিটিউটে। ওখানে পড়ার সময় বইয়ের ইলাস্ট্রেশনগুলোয় রঙ করতাম। তখনো চিন্তা করিনি, আর্টিস্ট হব। কিন্তু মার্ক্স, লেলিনদের পোর্ট্রেট করতে চেয়ে বুঝলাম, পোর্ট্রেট কীভাবে করতে হয় আমি জানি না। এ সময় বগুড়া শহরে রাস্তায় নানা সাইনবোর্ডের কাজ হতো, আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে এ সাইনবোর্ড পেইন্টারদের কাজ দেখতে শুরু করলাম। তখন খেয়াল করলাম, ওরা কাগজে ঘর করে বিশাল সব মুখ-দৃশ্য আঁকছে, আমি ছোট কাগজে ওদের মতো গ্রাফ এঁকে বাসায় প্র্যাকটিস শুরু করলাম। সিনেমার নায়ক অশোক কুমার, খলনায়ক ইয়াকুবের পোর্ট্রেট করলাম নিজে নিজে। আবার জিন্নাহর মুখ আঁকলাম। সুভাষ বসুর। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পোর্ট্রেট আঁকলাম। এর পর পুরো কাগজজুড়ে যাকে বলে ফুলশিটে মার্ক্স, লেলিন, এঙ্গেলস, স্ট্যালিনের পোর্ট্রেট করে ছাত্র ফেডারেশনের অফিসে নিয়ে গেলাম একদিন। আমার ছবি এত পছন্দ হলো সবার, ওগুলো বগুড়া জেলা কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে টাঙিয়ে রাখা হলো।
১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক নেতা ভবানী সেন এলেন বগুড়ায়। তখন আমার অটোগ্রাফ জমানোর খুব শখ ছিল। ভবানী সেনের কাছে গিয়ে অটোগ্রাফ চাইলে তিনি লিখলেন, শোষিত জনগণের দুঃখ-দুর্দশাকে চিত্রের ভেতর দিয়ে এমনভাবে সৃষ্টি করো, যা সমাজের নবজীবনের কথা বলবে... এ রকমই কিছু কথা বলেছিলেন। তার কথাগুলো সেই কচি বয়সেই এমনভাবে মনে গেঁথে গেল যে, পরে পুরোদস্তুর আর্টিস্ট হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত কল্পনার জগতে থেকে কোনো ছবি আঁকিনি, যা কিছু ছবি এঁকেছি, তা সমাজের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা থেকে।
আলীম আজিজ: আপনি ঢাকা চারুকলার পাট চুকিয়ে ইতালির ফ্লোরেন্সে গেলেন আঁকাআঁকির বিদ্যা আরো ভালোভাবে রপ্ত করার জন্য? একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পুত্র হিসেবে টাকাপয়সা জোগানো সহজ হওয়ার কথা নয়!
মুর্তজা বশীর: আমি ইতালির ফ্লোরেন্সের দুই বছর পড়াশোনা করেছি। বাবাই পাঠিয়েছিলেন।
আলীম আজিজ: আপনার সে সময়ের ছবিতে কিন্তু ফিমেল ফিগার খুব বেশি এসেছে।
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ। সে দেশের নৈসর্গিক দৃশ্য এত সুন্দর, কিন্তু তা আমাকে আকর্ষণ করেনি। আমির ফ্লোরেন্সের খেটে খাওয়া মানুষের চিত্র আঁকতাম। এভাবেই আমার ছবি তৈরি হতে শুরু করে। যেমন ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝি আমার সমসাময়িক দুই বন্ধু আমিনুল ইসলাম ও মোহাম্মদ কিবরিয়া, তারা বিমূর্ত ছবি এঁকে বসলেন। তাই দেখে আমারও খুব আঁকতে ইচ্ছা করত। কিন্তু আমার ওই যে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ব্যাপার, আমি আঁকত পারছি না, বিমূর্ত ছবি আমার আসছে না। খুব কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়াই, মনে নানা রকম প্রশ্ন উঁকি দেয়: আমি কি কনটেম্পোরারি হতে পারছি না? আমি বোধ করি সেকেলে আর্টিস্ট হয়ে যাচ্ছি! হূদয়ে রক্ষক্ষরণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ রকম নানা চিন্তা, দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে যখন রিকশায় চড়ে বেগমবাজারের বাড়ি ফিরি, একদিন চোখ পড়ল জেলখানার প্লাস্টার খসে পড়া দেয়াল, ছিঁড়ে ফেলা পোস্টারের নিচের আঠার দাগ— তার অন্য রকমের টেক্সচার, দেয়ালে পেরেকের ফুটো, অচেনা মানুষজনের হাতের ছাপ— এগুলো দেখে দেখে ভাবতাম, আমি তো এগুলোও আঁকতে পারি। এগুলোর মধ্যেও তো আমি নানা ফর্মের উপস্থিতি দেখছি। এগুলো তো কোনো কল্পনা নয়, আমার চোখের সামনে, বাস্তব। আমি প্রতিদিন নোট নেয়া শুরু করলাম। আঁকা শুরু হলো। হুবহু একজন রেনেসাঁ শিল্পীর দৃষ্টিতে, অর্থাত্ চূড়ান্ত রিয়ালিজম, কিন্তু একটা ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পের মনমানসিকতাকে ধারণ করে এ কাজগুলো শুরু করলাম। এ কাজের নাম দিলাম ‘দ্য ওয়াল’। দেয়াল নাম দেয়ার পেছনে একটা কারণ ছিল, তখন আইয়ুব খানের যুগ, মার্শাল ল’ চলছে। একটা দমবন্ধকর অবস্থা দেশে। সঙ্গে আর্থসামাজিক অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে, পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে, কন্যা মাতাকে বুঝতে পারছে না। সবার মাঝে, কীভাবে কোথায় যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সাধারণত শিল্পী এগুলো তার মনোজগত থেকে আঁকে। কিন্তু আমি আঁকলাম অ্যাকচুয়াল স্পট থেকে। এ রকম আমি ৯২টা ছবি আঁকলাম। এর কিছু পাকিস্তানে আঁকা। একাত্তরের নভেম্বরে দেশ থেকে পালালাম।
আলীম আজিজ: আপনার সহপাঠী, বন্ধু আমিনুল ইসলামই বোধহয় আপনাকে ইনফর্ম করেছিলেন যে, আপনি পাক আর্মির লিস্টে আছেন।
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, আমিনুলই প্রথমে আমাকে তার গ্রামে নিয়ে গেল। বুঝলাম এভাবে হবে না। দেশ ছাড়তে হবে। আমার স্ত্রী ও ছোট মেয়ের নাম পাসপোর্টে এন্ডোর্স করার জন্য তখনকার পাসপোর্ট ইমিগ্রেশনে বাহাউদ্দিন সাহেবের কাছে গেলাম, যিনি বাংলাদেশ হওয়ার পর ডিরেক্টর হয়েছিলেন। আমার পাসপোর্টের মেয়াদ ছিল মাত্র সাতদিন। করাচি গিয়ে কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে কিনা, তার কাছে জানতে চাই। তিনি প্রশ্ন করেন, ডু ইউ রিয়েলি ওয়ান্ট টু গো? তিনি আমার পাসপোর্ট খুলে দেখেন, আমার নাম পাসপোর্টে বশীরউল্লাহ। বাবার দেয়া নাম, যে নামটিকে আমি বলতাম দুর্গন্ধ। কেননা আমি বাবার পরিচয়ে বড় হতে চাইনি; যার জন্য ’৫২ সালে আমি আমার নাম থেকে উল্লাহ কেটে দিয়ে মুর্তজা বশীরে রূপান্তর হলাম। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা এখানে বলি: বাবা তার লাইব্রেরিতে বসে আছেন, এ সময় একজন ডাকপিয়ন মুর্তজা বশীরের নামে লেখা একটি চিঠি নিয়ে এলেন, বাবা চিঠিটি নেড়েচেড়ে দেখে বললেন: এ নামে এ বাড়িতে কেউ থাকে না। আমি তখন গিয়ে তাকে জানালাম, ওটা আমার চিঠি। আমার মুর্তজা বশীর নাম দেখে বাবা খুব অবাক হন। আমি তাকে বললাম: আমি আপনার পরিচয়ে বড় হতে চাই না। মুর্তজা বশীর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে— এ পরিচয় নয়, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মুর্তজা বশীরের বাবা— লোকে এটা বলুক আমি চাই। তখন পর্যন্ত আমি মুর্তজা বানান লিখতাম ‘মূ’ দিয়ে। বাবা এটা দেখে বললেন, দেখো, তুমি তো বুদ্ধিমান। মূর্খের বানান হয় ‘মূ’ দিয়ে, তুমি ‘মু’ দিয়ে লিখবে। তবে বাবা প্রথম স্বহস্তে আমার মুর্তজা বশীর নাম লেখেন ১৯৬৯ সালে, ইতালি থেকে আসার পর করাচিতে আমার প্রথম প্রদর্শনীর সময় বাবা ইনভাইটেশন কার্ডে মুর্তজা বশীর লিখলেন।
বাবা চেয়েছিলেন আমি প্যারিসে যাই, কিন্তু আমিনুল তখন ইতালিতে। বন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় আমি ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু আমি ফ্লোরেন্সে যেতে যেতে আমিনুল ফিরে এসেছে। তবে প্যারিসে যাওয়ার চেয়ে ইতালি যাওয়াই আমার জন্য সঠিক হয়েছিল। কেননা রেনেসাঁর পীঠস্থানে যাওয়ায় আমার শিল্পচর্চার ফাউন্ডেশনটা অনেক স্ট্রং হয়। প্যারিসে গেলে আমি হয়তো তালগোল পাকিয়ে ফেলতাম।
আলীম আজিজ: একাত্তরে আপনার পাকিস্তান ছাড়া সহজ হয়নি। পাসপোর্টের ব্যাপার তো ছিলই, পাশাপাশি করাচি গিয়েও কি আপনাকে জেরার মুখে পড়তে হয়নি?
মুর্তজা বশীর: করাচিতে নামার পর কানেক্টিং ফ্লাইট রাত ১টায়। ইমিগ্রেশন অফিসার আমাদের আলাদা করে নিয়ে উর্দুতে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন— লন্ডন যাবে? আমি ইংরেজিতে উত্তর দিলাম, ইস্ট পাকিস্তান ইজ ফুল অব ক্যাওস। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম, উর্দুতে বেশিক্ষণ উত্তর দিতে পারব না। তাই স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে উর্দুতে দ্রুত বললাম: আমা বিবি, বহুত সর্দি হ্যায়, আন্ধার যাকে বেঠো। ইমিগ্রেশন অফিসার নড়েচড়ে বসে দ্রুত বললেন, আপ আন্দার মে যাইয়ে... যেহেতু আগেই মনে সতর্কতা জারি হয়েছে, আমার উর্দু অ্যাকসেন্ট চোস্ত পাকিস্তানি হবে না, যেকোনো সময় ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই এর পরের সব প্রশ্নের উত্তর আমি ইংরেজিতেই দিলাম। শেষ পর্যন্ত বড় কোনো ঝামেলা ব্যতিরেকেই ফ্রান্সে পৌঁছলাম। পাকিস্তান হাইকমিশনে গেলাম পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য। মেয়াদ দুই বছর করতে বলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অখুশি হলেন। আমি দুই বছর চেয়েছিলাম। কারণ আমার ধারণা ছিল, মুক্তিযুদ্ধ দুই বছর ধরে চলবে। তাই খামাখা পাঁচ বছরের চাইনি। কিন্তু নয় মাসে যে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে, সে ধারণা করিনি। আজকে মনে হয়, যদি দুই বছর ধরে যুদ্ধ চলত, তবে আজকে বাংলাদেশের চিত্র পাল্টে যেত। তাহলে দেশে সত্যিকারের সমাজতন্ত্র কায়েম হতো।
যা-ই হোক, দুই বছর পর আমার স্ত্রী দেশে আসার জন্য অস্থির হয়ে গেল। ১৯৭৩ সালের জুলাইয়ে দেশে ফিরে এলাম। প্রেস ক্লাবে একদিন আবুল ফজল সাহেবের সঙ্গে দেখা হলে তিনি আমাকে চট্টগ্রামের আর্ট কলেজে যোগ দেয়ার কথা বললেন। আমি সেখানে সরাসরি অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগ দিলাম। আমি আটটা ইনক্রিমেন্ট চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা পাঁচটি দিল, নিয়োগ হলো অ্যাডহক ভিত্তিতে। ছয় মাস পর অবশ্য আমাকে পুরো ইনক্রিমেন্ট দেয়া হলো।
আলীম আজিজ: আপনি ঢাকার চারুকলায়ও যোগ দিতে চেয়েছিলেন।
মুর্তজা বশীর: আমি ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলাম। আমার সঙ্গে রশিদ চৌধুরী ও আবদুর রাজ্জাক ছিল। রাজ্জাক আমার চেয়ে দুই নম্বর বেশি পেয়ে ফার্স্ট হয়, রশিদ চৌধুরী এক নম্বর পেয়ে। আর কাইয়ুম চৌধুরী, সেও আমার সহপাঠী ছিল। সে সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছিল। তখন জয়নুল আবেদিন যাকে পছন্দ করতেন, তারই কেবল চাকরি হতো।
যেমন প্রথম ব্যাচে ১৯৪৮ সালে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিল বিজন চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম হয়েছিলেন ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড। কিন্তু বিজনের চাকরি হলো না, জয়নুল আবেদিন আমিনুল ইসলামকে চাকরি দিলেন। পরবর্তীতে তিনি এ ধারা বজায় রেখেছেন, নিতুন কুণ্ডু ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলো, তাকে চাকরি দিলেন না। প্রাণেশ মণ্ডল ফার্স্ট হলো, তাকে চাকরি দিলেন না। একইভাবে নাসির বিশ্বাসকেও চাকরি দেননি। ঢাকা চারুকলার চাকরি হওয়ার যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল, আপনি জয়নুল আবেদিনের কতটা অনুগত। ওখানে চাকরি না হওয়ায় আমার ক্ষোভ ছিল। যে কারণে জয়নুল আবেদিনের মৃত্যুশয্যায় (মারা যাওয়ার চার কি পাঁচদিন আগে) আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার, আপনি আমাকে চাকরি দেননি কেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তোমাকে আমার প্রয়োজন ছিল না।’ বলে উনি অনেকগুলো নাম বললেন। বললেন, ‘এরা আর কিছু হতে পারত না, তাই এদেরই আমার প্রয়োজন ছিল। তবে আমি তোমাকে দোয়া করে যাই, তোমাকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না।’
গুরুর আশীর্বাদ কাজে লেগেছিল। আমি ১৯৮৩ সালে চারুকলায় পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে জয়েন করি। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ওনারা কেউ পূর্ণ অধ্যাপক ছিলেন না।
কাইয়ুম চৌধুরী আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল, একেবারে ফার্স্ট ইয়ার থেকে। ওকে না দেখলে আমি পাগল হয়ে যেতাম। সেই বেগমবাজার থেকে আমি সাইকেলে মালিবাগে আসতাম। পরে কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। ঢাকা চারুকলায় নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএনডির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার ছিল, সেখানে মিটিংয়ে উপস্থিত একজন আমার নিয়োগের বিরোধিতা করে বলেন, মুর্তজা বশীরকে এখানে আনলে রক্তারক্তি হয়ে যাবে। তো আমার কথা হলো, কাইয়ুম চৌধুরী তুমি আমার বাল্যবন্ধু, খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তুমি একবারও প্রতিবাদ করলে না কেন? আমি তাকে কখনো এ কথা জিজ্ঞেস করিনি। এর পর একেবারেই নির্লিপ্ত হয়ে যাই। যোগাযোগ বন্ধ করে দিই।
আরেক বন্ধু রশিদ চৌধুরীর সঙ্গেও সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায়। আমি দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে যখন প্যারিসে পৌঁছলাম, বউ ও দেড় বছরের শিশুসহ উঠলাম গিয়ে হোটেলে। প্যারিসে তখন আমার থাকার ব্যয়ভার পাঠান আমার ভাই রশিদের বাসার ঠিকানায়। একদিন ভাইয়ের চিঠির জন্য রশিদের বাসায় যাই। আমাকে দেখে রশিদের ফরাসি স্ত্রী অ্যানি অবাক হয়ে বলল: তুমি প্যারিসে! হোটেলে উঠেছি শুনে মর্মাহত হলো। সঙ্গে সঙ্গে বলল হোটেল ছেড়ে তার বাসায় ওঠার জন্য। রশিদ তখন পাশে দাঁড়িয়ে একেবারে চুপচাপ। ও কোনো কথাই বলল না। অ্যানি নাছোড়বান্দার মতো তার মেয়েকে নিয়ে আমার সঙ্গে হোটেলে এল। আমাদের স্যুটকেস গাড়িতে তুলে নিয়ে আমাদের তার অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে এল। ক’দিন পর রশিদ ওর স্ত্রী অ্যানিকে রহস্যময়ভাবে কান্ট্রিসাইডে, মানে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। তার পর রশিদ হঠাত্ একদিন অ্যানি অসুস্থ বলে আমাদের একা রেখে চলে গেল। তখন দেখি রশিদ একফোঁটা কোনো খাবারদাবার রেখে যায়নি, ফ্রিজ পুরো খালি। যাওয়ার সময় এসব কিছুই বলে যাইনি রশিদ। প্যারিসে আমি মাত্র এসেছি, ফ্রেঞ্চ জানি না। রাস্তাঘাট ভালোমতো চিনি না। রশিদের আচরণে তীব্র অপমান বোধ হলো। ওদের অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। মাথা গোঁজার জন্য কোনো একটা হোটেল খুঁজে নেব। বাইরে তখন বৃষ্টি; ওর মধ্যে এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে ছুটছি। ঢোকার সময় দেখছি রুম অ্যাভাইলঅ্যাবল সাইন ঝুলছে, কিন্তু গিয়ে জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে আমার ও স্ত্রীর চোহারা পর্যবেক্ষণ করে মুখ গোমড়া করে বলছে, অকুপাইড। রুম নেই। তখন আলজেরিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের গণ্ডগোল চলছিল, আমাদের আলজেরিয়া ঠাউরেই জায়গা দিতে দ্বিধা করছিল। বড় কষ্টের সময় গেছে, শুকনা পাউরুটি খেয়ে দিন গেছে আমাদের। এর আগে ঢাকায় আমার এক ফরাসি বন্ধু ছিল। তার মা কীভাবে আমাদের খোঁজ বের করে একদিন হোটেলে এসে হাজির। তার পর জোর করে তার বাসায় নিয়ে গেল। এর পর রশিদের সঙ্গে কি আর বন্ধুত্ব থাকে।
আলীম আজিজ: বাবার সঙ্গে যেন আপনার এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, আপনাদের পিতা-পুত্রের সম্পর্কের মধ্যে, বিশেষভাবে আপনার দিক থেকে এক ধরনের ক্রোধ ছিল—
মুর্তজা বশীর: পিতা সম্পর্কে আমি বলতাম, তিনি জনক হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু পিতা হতে পারেননি। আমি যখন বিয়ে করি, আমার বউ তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। আমি পরীক্ষার হলে খাবারটাবার নিয়ে যেতাম। পাস করার পর বাবা আমাকে বউয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বললেন। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম, বাড়িটা হবে হোম সুইট হোম। সেখানে ইন্টেলেকচুয়ালিজমের জায়গা থাকতে পারবে না। আমার সঙ্গে আরেকজন ইন্টেলেকচুয়াল...আমি চাইতাম বাইরে লড়াই করব, ক্লান্ত হব, বাড়িতে আসব, একটা প্রশান্তি অনুভব করব। সে কারণে তখন বাবার ওপর বিরক্ত হয়েছিলাম।
নাউ আই ফিল ফর মাই ফাদার। আগে মনে করতাম দুর্গন্ধ। মনে করতাম সিন্দাবাদের বুড়া, ঘাড়ে চেপে বসে আছে, না নামালে মুক্তি নেই। তবে পরে বুঝেছি, উনি ধার্মিক ছিলেন, ধর্মান্ধ ছিলেন না। ১৯১৭ সালের বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনের সভাপতির ভাষণে উনি বলেছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাঙ্গালী জাতি গড়িয়া তুলিতে বহু অন্তরায় আছে, কিন্তু দূর ভবিষ্যতে হোক না কেন, তাহা তো করিতেই হইবে। বাঙ্গালী হিন্দু বাঙ্গালী মুসলমান ব্যতীত চলিতে পারিবে না, বাঙ্গালী মুসলমান বাঙ্গালী হিন্দু ছাড়া চলিতে পারিবে না। চিরকাল কি একভাবেই যাইবে?’
এই যে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান মিলে জাতি— এটা বিরাট কথা, বিরাট ব্যাপার। ১৯৪৮ সালে সাহিত্য সম্মেলনে তিনি আবারো বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু ও মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়েও বড় সত্য আমরা বাঙ্গালী।’ এ লোকের সন্তান হিসেবে আমি এখন প্রাউড ফিল করি।
আলীম আজিজ: ওই যে সুইট হোম বললেন, সেই সুইট হোমের মালকিনের দেখা কীভাবে পেলেন?
মুর্তজা বশীর: লাহোরে ১৯৬১ সালে আমার এক জার্মান বন্ধু আমাকে বললেন, তুমি আমাদের সঙ্গে চলো। আমরা বাই রোডে জার্মানি যাচ্ছি। তুমিও চলো, তার পর তোমার ওখানে থাকার একটা কোনো ব্যবস্থা হয়েই যাবে। আমারও স্বপ্ন ছিল একদিন ইউরোপে গিয়েই থিতু হব। যাওয়ার আগে চিন্তা করলাম, জার্মানি তো যাচ্ছি, তো যাওয়ার আগে পিতা-মাতার কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে তাদের সঙ্গে একবার দেখা করে যাই। নভেম্বরে লাহোর থেকে ঢাকায় চলে এলাম। আমাদের দোতলা বাড়ির সদর দরজাটা খোলা। আমি দেখলাম, কেরোসিনের চুলায় মা চা বানাচ্ছে। অথচ ঘরে ভাবিরাও আছে। আমি খুব কষ্ট পেলাম। আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, আই মাস্ট ম্যারি! বাবাকে জানানো হলো, বাবা জানালেন, বকুল যাকে পছন্দ করবে আমরা তাকেই মেনে নেব। আমার ডাকনাম ছিল বকুল।
এ সময়েই একদিন চারুকলার একটা প্রদর্শনীতে আমার বন্ধু চিত্রশিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা। ও আমাকে পেয়ে বলল, চল আমার বাসায় চল। গ্রিন রোডের স্টাফ কোয়ার্টারে থাকে ও। বলল, তোর ভালোই লাগবে, বাসার সামনের কোয়ার্টারে মেয়েরা ব্যাডমিন্টন খেলে। দেখতে ভালোই লাগবে। আমি ওই ব্যাডমিন্টন খেলার একজন দর্শক হলাম, ওখানেই আমার হবু বউকে দেখলাম প্রথম; ফর্সা। ঘোলা ঘোলা চোখ। লাল চুল। মেয়েটাকে নিয়ে কৌতূহল জাগল ভীষণ। দেবদাসের মুখে জানলাম, তার এক বন্ধুর বোন। ওকে বললাম, দেবু, আমাকে মেয়েটির কাছে নিয়ে চল। দেবু বলল, ধ্যাত; তা কী করে হয়!
যাহোক, আমার ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল, আমি মেম বিয়ে করব। যখন দেখলাম মেম বিয়ে হলো না। ইতালিতে বিয়ে করতে গিয়েও শেষে হলো না। মেয়েটির পরিবারের শর্ত ছিল, আমি তাদের মেয়েকে বিয়ে করে ইতালিতেই থেকে যাই যেন। কিন্তু আমার মাথায় তখন কাজ করেছে: আমি তো একটা গরিব দেশ থেকে এসেছি। দেশের প্রতি ওই দায়বদ্ধতার ব্যাপারটা তো ছিলই। আমি যা শিখেছি, তা-ই দেশকে দিতে চেয়েছি। শেষ পর্যন্ত তাই ওই ২৫ বছর বয়সে দেশের কারণে আমি ইতালিতে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করিনি। আমি ইচ্ছা করলে থাকতে পারতাম। সে সময়ই ওই মিস একাডেমির সঙ্গে পরিচয় হয়, তার আসল নাম তোমাকে বলছি না। তাকে তো পরিবারের শর্ত মেনে নিয়ে অনায়াসেই বিয়ে করে থেকে যেতে পারতাম। কিন্তু এখন আমি নিজেকে বোকা মনে করি। কারণ আমাদের দেশের কোনো নেতার মনেই তো দেশপ্রেম নেই।
বিয়ের কথা বলি, গ্রিন রোডের বাসায় ফিরে আসি। বাবা প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। বাবা যেদিন আশীর্বাদ করতে যাবেন, দেবদাস সেদিন বাড়িতে উপস্থিত। মুসলমানের অনুষ্ঠানে যেতে সে বিব্রতবোধ করছিল। বাবা হঠাত্ বললেন, যেকোনো শুভ অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ, গণিকা ও মহারাজার উপস্থিতি থাকা ভালো। এখানে রাজা ও গণিকা নেই, ব্রাহ্মণ আছে, কাজেই তোমার যেতে বাধা কি, তুমি চলো।
আমার স্ত্রী এক মহীয়সী নারী, কারণ তার কোনো চাহিদা নেই। এই যে বাড়িতে যা কিছু দেখছ, সব আমি কিনেছি। আমি খুব রোমান্টিক একজন মানুষ, বুঝলে। আমি ১৯৭২ সালে প্যারিস থেকে লন্ডন যাই ম্যুরাল করতে। তখন তুলু, আমার স্ত্রীর কথা ভেবে চারটি শিফন শাড়ি কিনলাম। এর মধ্যে একটা সাদা। আমি তো কল্পনা দিয়ে সব দেখছি, ও সাদা শাড়ি পরেছে, গায়ের রঙ যেহেতু ফর্সা, মানাবে ভালো। আমি পাকিস্তানের সোয়াতে গেছি, ওখানে উপজাতীয় মেয়েদের কাছ থেকে ওর জন্য কানের রিং, গলার হার কিনেছি। ওসব জিনিস যেকোনো আপার সোসাইটির মেয়েরা পেলে পাগল হয়ে যেত। অথচ আমার স্ত্রী পরেও দেখেনি। পরে আমার মেয়েরা ব্যবহার করেছে। আমার খুব ইচ্ছা ছিল, আমার বউয়ের লম্বা লম্বা চুল হবে। শাড়ি উঁচু করে পরবে, বুট জুতা পরবে। কিন্তু বিয়ের পরে দেখলাম, সে কাদামাটি। ভাবলাম কাদামাটি নিজের মতো করে গড়ব, কিন্তু সে তো গ্রানাইটের।
বাসর রাতে আমি আমার ইতালীয় প্রেমের কথা বলে দিয়েছি তাকে। তার ছবিও দেখিয়েছিলাম। পরে আমার মেয়েদেরও দেখিয়েছি। ১৯৬৮ সালে তাকে নবরত্নের পাথর দিয়েছিলাম। কিন্তু ওই যে বললাম, তার কোনো চাহিদা ছিল না। কোনো দিনও সে বলেনি, এটা আমার, এটা আমার লাগবে। আমি তো আমার ভাবিদের দেখেছি, বন্ধুদের স্ত্রীদের দেখেছি। জীবনে সে কোনো দিন আমার খ্যাতি নিয়ে চঞ্চলতা প্রকাশ করেনি। সে কখনো বিরক্তও হয়নি। তবে আমাকে ও উটের সঙ্গে তুলনা করত।
বিয়ের মাসখানেক পর একদিন আমি আর দেবদাস রমনায় একটু বিয়ার-টিয়ার খাওয়ার পর মাথায় বাই চাপল ইসলামপুরে গিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি খেতে হবে। গেলাম। খেতে খেতে আমার মনে হলো, বউয়ের জন্য একটু নিয়ে যাই। রাত ২টার দিকে বাসায় ফিরে তার কাছে গিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে বিরিয়ানির কথা জানালে ও আমাকে বলল: রাতদুপুরে মাতলামি করছ। অথচ সেটা আমার মাতলামি ছিল না; সত্যিকারের আবেগ ছিল।
আলীম আজিজ: আপনার প্রতি কোনো অভিমান ছিল?
মুর্তজা বশীর: না, কোনো অভিমান ছিল না। এখন আমার মধ্যে রিগ্রেট হয় অর্থকড়ি নিয়ে। যদিও আমার মধ্যে কোনো করাপশন ছিল না। কমার্শিয়াল কাজ করিনি। একমাত্র আমিই ছিলাম দরিদ্র আর্টিস্ট। অথচ আমার এমন হওয়ার কথা ছিল না। তবে আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি না। কিন্তু নিয়তিতে বিশ্বাস করি।
আলীম আজিজ: ডেড লেজার্ড নিয়ে একটা প্রদর্শনী করেছিলেন বোধহয়?
মুর্তজা বশীর: মৃত টিকটিকি। ১৯৬১ সালে আঁকা। এটা ছিল বাংলা একাডেমির একটা প্রদর্শনী। আমার বাবা দেখলেন। তিনি বাড়িতে এসে আমাকে বললেন, আমি তো আর্ট দেখেছি। তোমার আর্ট এমন কিম্ভূতকিমাকার কেন? আমি উত্তর দিয়েছিলাম, আপনি আমি আমরা সবাই অশরীরী। আমরা অশরীরী হয়ে চলাফেরা করছি। তিনি বললেন, তা হয়তো হবে।
আলীম আজিজ: আপনার আঁকা কেইজ বার্ড নিয়ে অনেক রিভিউ হয়েছিল। সম্ভবত লাহোরে কোনো প্রদর্শনীতে ছবিটা প্রদর্শিত হয়েছিল, ওই ছবির সঙ্গে অনেকেই ইস্ট পাকিস্তানের সিচুয়েশনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছিলেন।
মুর্তজা বশীর: না, আমি তা মনে করি না। আমি এমনি একটা মেয়ের দুর্দশা ভেবে এঁকেছিলাম। ওসব ভাবনা সমালোচকদের। আমি ও রকম কিছু ভেবে আঁকিনি। এর পর শিরোনামে আমি অনেকগুলো ছবি এঁকেছিলাম।
এপিটাফ কেন আঁকলাম? আমি একাত্তরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আমি জীবনকে ভালোবাসি বলেই তো এমন করেছিলাম। ফ্রান্সে বরফ পড়ার পর যেন কাদা না জমে, সেজন্যে ছোট ছোট নুড়ি বিছানো হতো। হঠাত্ ছোট একটা নুড়ি আমার চোখে পড়ল। আমি উঠালাম, দেখলাম অনেকটা হিউম্যান অর্গানের মতো। প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন কোনো যোদ্ধা মারা যেতেন, তার মাথার কাছে একটা পাথর রাখা হতো। সেই পাথর সিম্বল হয়ে যেত। তখন আমার উপলব্ধি হলো, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা মনে পড়ল, সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কথা— তখন একদিকে ছাত্রলীগ, অন্যদিকে ছাত্র ইউনিয়ন, কিন্তু যারা এদের দলের কেউ না, তাদের কথা কে বলবে! তখন এপিটাফ আঁকলাম। ব্যাকগ্রাউন্ড করলাম সাদা দিয়ে। কারণ কাফনের রঙ সাদা, বিধবার রঙ সাদা আবার পবিত্রতার রঙও সাদা। সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলতে কেউ সাহস পেত না।
আলীম আজিজ: কালেমা শাহাদা বা বলি ক্যালিগ্রাফি করার কথা কীভাবে মাথায় এল?
মুর্তজা বশীর: আমিই প্রথম ক্যালিগ্রাফিকে পেইন্টিংয়ে রূপান্তর করি। এখন অনেকেই করছে। কিন্তু মুসলিমবিশ্বে আমিই প্রথম। এর মধ্যে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই, সবই আল্লাহর।
আলীম আজিজ: আপনার উইংস?
মুর্তজা বশীর: ১৯৯৭ ধর্ষণ, ফেনসিডিল, এই ইয়াবা তখনো আসেনি। আমি মার্ক্সবাদী, আমি একটা আগামী সুন্দর জীবনে বিশ্বাস করি। কিন্তু দেখছিলাম ক্রমেই সমাজ হতাশায় ডুবে যাচ্ছে। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ একজন শিল্পী হিসেবে আমি মনে করলাম, আগামীর জীবন যে সুন্দর, তাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তাকে হতাশা থেকে তুলে আনতে হবে। তখন প্রজাপতির কথা মাথায় এল। ওদের জীবন ক্ষণস্থায়ী— ১৫-২০ দিন বাঁচে। তবে চঞ্চল, কালারফুল। তখন ভাবি, আমি যদি এগুলো আঁকি, তবে মানুষের মধ্যে একটা আবেদন সৃষ্টি হবে। ১৯৯৮ সালে শিল্পকলায় প্রথম শো করলাম। বোরখা পরা মানুষ, দাড়িওয়ালা মানুষদের অনেকে কাছে এসে আমাকে বলেছেন, আপনার ছবি বুঝি না, কিন্তু আমাদের খুব নাড়া দেয়।
আলীম আজিজ: আপনারা একঝাঁক নক্ষত্র ছিলেন, আপনার সমসাময়িক সব চিত্রশিল্পীই স্বক্ষেত্রে বিখ্যাত, তো এ বন্ধুদের মধ্যে নিজেদের ছবি নিয়ে কোনো আলোচনা হতো না?
মুর্তজা বশীর: না।
আলীম আজিজ: এ সময়ের আর্টিস্টদের ছবি দেখেন? কেমন লাগে?
মুর্তজা বশীর: এ সময়ের আর্টিস্টরা আমাদের চেয়ে প্রতিভাবান। পাওয়ারফুল দ্যান আস। তা সত্ত্বেও তাদের ড্রব্যাকটা বলি— এটা ইন্টারনেটের যুগ। পৃথিবীর নানা দেশের শিল্প দেখে তাদের মধ্যে স্বকীয়তা তৈরি হচ্ছে না। আমাদের সময়ের শিল্পীদের মধ্যে স্বকীয়তা রয়েছে। পৃথিবীর কোনো আর্টিস্টের সঙ্গে মেলে না। এ সময়ের আর্টিস্টদের খুব মুশকিল। ফলে এখন কোনো নামকরা আর্টিস্ট নেই। অর্থ, তথ্যপ্রযুক্তি, অ্যাপস কত কি, তার পরও নাম করতে পারছেন না কেউ।
আলীম আজিজ: পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি ফিল্মেও আপনার পদচারণা ছিল। নদী ও নারীর স্ক্রিপ্ট আপনার—
মুর্তজা বশীর: স্ক্রিপ্টটা আমার। লাহোরে থাকার সময় আমার ফিল্মে হাতেখড়ি হয়। আফজাল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করি তখন। তো তিনি আমকে একদিন ডব্লিউজেড আহমেদের কাছে নিয়ে গেলেন। আমি ওনার সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করলাম। আফজাল চৌধুরী তখন বলেছিলেন, বশীর তুমি নামকরা আর্টিস্ট হতে পারো, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে হতে পারো। কিন্তু ফিল্মের জগতে তুমি একেবারে নতুন। হয়তো তুমি একটা প্রশ্ন করবে, লাইটবয় হেসে ফেলবে সে প্রশ্ন শুনে। তোমাকে কিন্তু এ বিষয়টি সহজে নিতে হবে। কারণ তুমি এ বিদ্যার কিছুই জানো না।
আলীম আজিজ: আপনার লেখারও দুর্দান্ত হাত ছিল। কিন্তু তেমন লিখলেন না!
মুর্তজা বশীর: লেখা ছেড়ে দেয়ার গল্পটি বলি আগে। আমার একটাই ছোট গল্প— কাঁচের পাখির গান। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয়। এ সময়ে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাউঞ্জে আড্ডা মারতে যেতাম। ওখানে মুনীর চৌধুরী আমাকে বললেন, বশীর, তুমি এবার আদমজি পুরস্কার পাবে। কিন্তু পুরস্কার ঘোষণার সময় দেখলাম, আমি নই, পুরস্কার পেয়েছেন সত্যেন সেন। আমি মনে করি, সত্যেন সেন যে বইয়ের জন্য পেয়েছেন, সেটা তার উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল না। আমার ছোটবেলার বন্ধু হাসান হাফিজুর রহমান তখন রাইটারস গিল্ডের এ অঞ্চলের প্রধান। হাসান তার পজিশনকে ম্যানিপুলেট করার জন্য বলেছিল, এই একটা বই দিয়ে বিচার করা যায় না, আর বশীর মূলত আর্টিস্ট। এর পর ঘৃণায় আমি লেখালেখি বন্ধ করে দিলাম। আর লিখিইনি।
তার পর কবিতা লিখলাম। ফ্রান্সে বসেও কবিতা লিখলাম। ঢাকায় ফিরে শামসুর রাহমানকে দেখালাম, তিনি খাতা উল্টে উল্টে একটা-দুটো কবিতায় টিক চিহ্ন দেন, তার পর বললেন, এগুলো আমাকে কপি করে দেবেন, আমি গণশক্তি পত্রিকায় দেব। আমি বললাম: ওরা ছাপবে তো? আমার এ প্রশ্নে শামসুর রাহমানের মুখ লাল হয়ে গেল, তিনি বললেন, আমি পাঠাচ্ছি বুঝতে পারছেন না! ও তাই খাসি বাছাই করে পাছায় টিক চিহ্ন দিয়ে সিল মেরে দিলেন— বললাম আমি।
আমার প্রথম কবিতার বইয়ের ব্যাকফ্ল্যাপ লিখেছিলেন শামসুর রাহমান। কিন্তু স্বনামে নয়। পরের বইটা ‘তোমাকেই শুধু’র ব্যাকফ্ল্যাপ শামসুর রাহমান স্বনামেই লেখেন। আমার প্রথম কবিতার নাম ছিল ‘রেণু’।
আমি ইংরেজিতে আমার কিছু কবিতা অনুবাদ করেছিলাম। আমি যখন অনুবাদ করি, ফিল করি, একজন লেখকের তো একটা স্টাইল আছে। তার নিজস্ব পাংচুয়েশন আছে। আমি যা দাঁড়ি-কমাসহ হুবহু অনুবাদ করলাম। একেবারে আক্ষরিক অনুবাদ। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আমার কবিতা পড়ে সমালোচনা লিখেছিলেন, তাতে তার এ কথাটা আমার খুব মনে ধরেছিল: মুর্তজা বশীরের কবিতা একেবারে মুর্তজা বশীরের মতো। এটা বিশাল কমপ্লিমেন্ট। তবে আক্ষরিক অনুবাদ ওনার কাছে যান্ত্রিক মনে হয়েছিল।






