কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি
মুর্তজা বশীরকে আমি প্রথমবার দেখি লাহোরের সামানাবাদে, সেটা ১৯৫৯ সালের কথা। গোলচক্করের কাছে সে এক বন্ধুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ব্যস্ত ভঙ্গিতে কথা বলছিল। তাকে দেখে আমার প্রথমে মনে হয়েছিল, সে বেশ খাটো কিন্তু শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ; বৈচিত্র্যময় জীবন্ত একজন মানুষ। আমি তখন থাকতাম এন-১২৪, সামানাবাদ। আমার বাসস্থানের খুব কাছেই একেবারে হাঁটা দূরত্বে বাস করতেন লেখক ইশফাক আহমাদ ও তার স্ত্রী প্রতিভাবান বানো কুদসিয়া। কাছেই ডুঙ্গি গ্রাউন্ড (জলমগ্ন খেলার ময়দান) ঘেঁষে থাকতেন বিখ্যাত চিত্রকর শাকির আলী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সিবতে হাসান, হামিদ শেখসহ আরো অনেক গুণীজন। মনে হচ্ছিল মুর্তজা এদেরই কারো বাসায় উঠেছেন বা কারো সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে এসেছেন।
মনে হয় আমার প্রকাশক বন্ধু চৌধুরী রশিদ আহমদ তাকে দেখিয়ে আমাকে বললেন যে, উনি হচ্ছেন ঢাকার একজন আধুনিক শিল্পী, মুর্তজা বশীর। রশিদের বড় ভাই মুহাম্মদ হানিফ রামি ছিলেন একজন বিমূর্ত চিত্রকর ও লেখক। পরবর্তীতে হানিফ রামির মাধ্যমে আমি জেনেছিলাম যে, মুর্তজা এসেছিলেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের আমন্ত্রণে। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তখন পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের পরিচালক, তিনি মুর্তজাকে লাহোর ও পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য শিল্পকেন্দ্রে ধারাবাহিক প্রদর্শনী করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। মুর্তজা আর্ট নিয়ে পড়েছেন ঢাকার জয়নুল আবেদিনের আর্ট ইনস্টিটিউটে, সরসারি জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন। এছাড়া পড়াশোনা করেছেন ইতালি, ইংল্যান্ড ও আরো কিছু ইউরোপীয় দেশে। এসব দেশে ভ্রমণের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন শিল্প ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। নিজের একক প্রদর্শনীর মাধ্যমে বেশ ভালো সাড়াও পেয়েছেন। সম্প্রতি তিনি পাকিস্তানে ফিরেছেন এবং লাহোরে এসেছেন। কয়েক মাস ধরে শাকির আলীর বাসায় থাকছেন। অতিসম্প্রতি তিনি কাছেই আরেকটি বাসায় উঠেছেন এবং সেটাকে স্টুডিওতে রূপান্তর করেছেন। শোনা যাচ্ছিল তিনি ‘ভয়ানক ব্যস্ত’, রাত-দিন একের পর এক চিত্রকর্ম আঁকছেন এবং মনোযোগী শ্রোতা পেলে অনর্গল কথা বলছেন। তিনি লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি ও করাচিতে প্রদর্শনীর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নিজের শহর ঢাকার সঙ্গে তিনি এ তিন শহরকেও পালাক্রমে বসবাস, ছবি আঁকা ও প্রদর্শনী করার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। যদিও তিনি পাকিস্তানে ফিরে নিজের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়াবলি নিয়ে আঁকার জন্য নিজেকে উত্সর্গ করেছিলেন। তার পরও একটা সাধারণ ধারণা ছিল যে, তার মন তখনো ইউরোপে পড়ে আছে। কারণ ছিল তার চরম বোহেমিয়ান জীবনযাত্রা। বিমূর্ততার সঙ্গে রিয়ালিজমের সমন্বয়ে তার মন বিরামহীনভাবে একটি অনন্য মাধ্যমের সন্ধান করছিল। এজন্য তিনি সাগরের ওপারের বিশিষ্ট শিল্পীদের কাজ নিয়ে যেমন অধ্যয়ন করছিলেন, তেমনি চারপাশের মানুষের জীবনের নান্দনিক উপাদান নিয়েও অনুসন্ধান করেছেন।
হানিফ রামি জানতেন না যে, আমি এরই মধ্যে বন্ধু ও সহকর্মী সাইয়েদ আমজাদ আলীর কাছ থেকে মুর্তজা বশীর সম্পর্কে জেনেছি। আমজাদ ছিলেন পাকিস্তান কোয়ার্টারলির সম্পাদক। তিনি একই সঙ্গে পাকিস্তানের একজন শীর্ষ শিল্প সমালোচক এবং পাকিস্তানের শিল্প ও শিল্পীদের নিয়ে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন প্রবন্ধের রচয়িতা। তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, মুর্তজা বশীর হচ্ছেন পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী, যিনি পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি ফ্লোরেন্স ও প্যারিসে চিত্রকলা নিয়ে অধ্যয়নকে স্বাধীনভাবে কাজে লাগিয়েছেন। আমজাদ মনে করতেন, বশীরের মধ্যে ‘বিশ্বমানের চিত্রকর’ হওয়ার প্রতিভা রয়েছে। রামির মুখেও তার প্রশংসা শুনে ভালো লাগল। কারণ রামি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই সতর্ক।
মুর্তজা বশীরের ‘পিস’
১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে করাচিতে অনুষ্ঠিত অল পাকিস্তান রাইটার্স কনভেনশনে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান রাইটারস গিল্ড তৈরি করা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের একজন সিনিয়র ডেলিগেট। এর আগে লাহোরে প্রথম পাকিস্তান ওরিয়েন্টাল কনফারেন্স (১৯৫৬) ও দি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক কোলোকিয়াম (১৯৫৮)-এ তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। কিন্তু এই করাচিতেই প্রথম এ মহান মানুষটির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মেশার সুযোগ পেলাম। আমি তাকে মুর্তজা বশীরের কথা বললাম এবং জানালাম যে, লাহোরে একক প্রদর্শনীর জন্য সে বেশ ভালো প্রস্তুতি নিচ্ছে। ড. শহীদুল্লাহর কাছ থেকে জানতে পারলাম, মুর্তজা করাচিতেও একটি প্রদর্শনীর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সে সময় সে করাচিতেই। সেখানে তখন দ্বিতীয় ন্যাশনাল এক্সিবিশন অব আর্টে তার ‘শান্তি’ চিত্রকর্মটি প্রদর্শিত হচ্ছিল। রাইটারস কনভেনশনের ব্যস্ততায় আমি আর বশীরের সঙ্গে দেখা করতে বা তার চিত্রকর্ম পিস দেখতে যেতে পারিনি। আমজাদ আলী আমাকে জানিয়েছিলেন, বশীরের চিত্রকর্মটিই প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কারের দাবিদার।
১৯৬০ সালের জানুয়ারিতে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে লিঙ্গুয়িস্টিকস নিয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলাম। ১৯৬১ সালের গ্রীষ্মের আগে আমার আর লাহোরে ফেরা হয়নি। তত দিনে বশীরের একক প্রদর্শনী হয়ে গেছে এবং তিনি লাহোরের বড় বড় শিল্পী ও শিল্প সমালোচকের মনে উচ্চাসন তৈরি করে নিয়েছিলেন। বশীর বেশি ছবি বিক্রি করেননি এবং তাকে নিয়ে দু-একটা প্রশংসনীয় রিভিউ ছাড়া বেশির ভাগ প্রেস রিভিউই ছিল ভাসা ভাসা, এটা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
‘দ্য কেজড বার্ড’
পরেরবার যখন আমি আবার করাচি গেলাম, তখন আমজাদ আলী আমাকে মুর্তজা বশীরের একক প্রদর্শনী দেখাতে নিয়ে গেল। তার চমত্কার চিত্রকর্ম ‘দ্য কেজড বার্ড’ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমজাদ আলী বিশ্বাস করতেন যে, এটি ইউরোপের শ্রেষ্ঠ আধুনিক শিল্পীদের সেরা কাজগুলোর সঙ্গে তুলনীয়। একজন শিল্প সমালোচক হিসেবে তিনি এ কাজের লাইন ওয়ার্ক, অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্ম, কম্পোজিশন, রঙের বিন্যাস, অসাধারণ টেক্সচার এবং এ রকম সুনিপুণ কাজের জন্য মুর্তজার সূক্ষ্ম কৌশলের প্রশংসা করেছেন। নিঃসন্দেহে এটা ছিল একটি প্রথম সারির কাজ। যাই হোক, চিত্রকর্মটি পর্যবেক্ষণের সময় আমার মন ব্যস্ত ছিল আরেক জগতে— আমি ছবিটার অর্থ খুঁজছিলাম। ‘কেজড বার্ড’কে আমি একটা প্রতীক হিসেবে দেখছিলাম। এটা কেন এত শক্তিশালী ও দৃষ্টি আকর্ষণকারী? এটা কি জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের অধীন থাকা পাকিস্তানের মানুষের একটি রাজনৈতিক বার্তা— মাত্র ১০ বছর আগে জন্ম নেয়া নতুন জাতিরাষ্ট্রকে মুক্ত, গণতান্ত্রিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের স্বপ্ন ভেঙে পড়া? যদি তা-ই হয়, তাহলে বলতে হবে মুর্তজা যথেষ্ট প্রজ্ঞাবান সামাজিক-রাজনৈতিক চিন্তক ছিলেন। চিত্রকর্মের পরিবর্তে যদি তিনি ‘বক্তব্য কিংবা লিখিত শব্দ’কে বেছে নিতেন, তাহলে নিষ্ঠুর শাসকদের তরফ থেকে তাকে সমস্যায় পড়তে হতো। নাকি এটা আমরা আজ যে সমস্যাসংকুল কালে বাস করছি, সে বিষয়ে মুর্তজা তার চারপাশ নিয়ে যা ভাবতেন, তার একটি সাধারণ প্রতিফলন? এমন কী হতে পারে যে, এ চিত্রকর্মটি আমরা যে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে বাস করছি তাতে মানুষের অবস্থান কী সেটা নির্দেশ করছে? এটা কি সম্ভব যে, মুর্তজা সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিষয়ে তার ধারণাটিকে প্রকাশ করছিলেন— স্বর্গের বাগানে মানুষের কিছুই করার ছিল না, সে পরিস্থিতির অনুভূতি কি এ খাঁচায় বন্দি পাখির সদৃশ? স্বর্গ থেকে পতনের পর মানুষ এমন এক জীবন পেল, যা মৃত্যুর রহস্য দিয়ে ঘেরা, নিজের অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম এবং নিজে নিজে কিছু করতে মানুষ খুব অল্প ও অজ্ঞাত পরিমাণ সময় পায়, চিত্রকর্মটি কি এ স্বর্গ থেকে পতনের পর মানুষের নিজের প্রথম পদক্ষেপ সম্পর্কে মুর্তজার বিবৃতি? নাকি এটা তার নিজের সীমাবদ্ধতা এবং সৃষ্টিকর্তার অসীমতার মধ্যকার সম্পর্ককে অনুসন্ধানের চেষ্টা?
আমি কেবল মুর্তজাকে দূর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছি, কিন্তু তার সঙ্গে সাক্ষাত্ হয়নি, তার অন্য কোনো কাজও দেখা হয়নি। কিন্তু তার সম্পর্কে যতটুকু শুনেছি তাতে আমার মনে হয়, খাঁচায় বন্দি পাখির চিত্রকর্মটি আসলে শিল্পীর নিজের প্রতিকৃতি। আমার মনে হয়, এটা আমার নিজেরও প্রতিকৃতি। কারণটা হচ্ছে দেশের স্বাধীনতার জন্য আমি লড়েছিলাম, আর এখন ৩০ বছরের একজন যুবক হয়ে আমি নতুন দেশটিতে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, দেখতে পাচ্ছিলাম দেশের নিয়ন্ত্রণ ভালো মানুষের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, তারা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করতেন ব্যক্তিপরিসরে আর সমাজে ছিলেন খাঁচায় আবদ্ধ পাখির মতো। ‘কেজড বার্ড’-এর সূত্রে আমি মুর্তজার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনুভব করছিলাম, আর তাই তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করার একটা তীব্র ইচ্ছা আমাকে পেয়ে বসে। আমি তার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আরো বেশি করে জানতে চাইছিলাম। একজন পণ্ডিত হিসেবে ড. শহীদুল্লাহর প্রতি আমার বিরাট শ্রদ্ধা ছিল। একটা বিষয় আমার মনে বারবার উঁকি দিচ্ছিল যে, তাঁর সন্তান শিল্পী হিসেবে একেবারে ভিন্ন রকমের এক জীবন বেছে নিয়েছেন।
মুর্তজার সঙ্গে আমার তৃতীয় সংক্ষিপ্ত সাক্ষাত্ হলো ইউনুস সাঈদের ম্যাগাজিন ভিশনে প্রকাশিত (করাচি, আগস্ট ১৯৬৩) তার লেখনীর মাধ্যমে। সাক্ষাত্কারে মুর্তজা তার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে কিছু সাধারণ প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সে সময় তিনি লাহোরে বাস করছেন এবং ছবি আঁকছেন, কিন্তু তার কথায় গ্রীষ্মে লাহোরের গরম তার চারপাশে ‘নীরস ও বিরান’ পরিবেশ তৈরি করে এবং এক রকমের দেয়াল তুলে দেয়, আর এটাই তার ধারাবাহিক বেশকিছু চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। ছবি আঁকতেও তার সমস্যা হচ্ছিল। কারণ তিনি এত দিন যা এঁকেছেন, এখন তার চেয়ে ভিন্নভাবে আঁকতে চাইছিলেন। তিনি একটি নতুন দিক নিয়ে নিরীক্ষা করতে চাইছিলেন, তার দেখা মানবজীবনের নাটকীয়তাকে তিনি আঁকতে চাইছিলেন। তিনি আগে বিশ্বাস করতেন যে, প্রকৃতির সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এবং তিনি যাই আঁকেন, তা প্রকৃতি ও জীবনের বৈচিত্র্যে এক রকমের ঐক্য। কিন্তু এবার তার মনে এ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, ‘কিন্তু সত্যিই কি তাই? আমি কি এ দুনিয়ায় এক বিচ্ছিন্ন, একাকী আত্মা নই?... আমি বেঁচে থাকলে সেটা কোনো ব্যাপার নয়, আবার আমি যদি মারা যাই, তাহলে সেটাও কোনো কিছু পার্থক্য করে না। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে চাই এবং পুরো দুনিয়ার সামনে নিজের অস্তিত্বকে জানান দিতে চাই।’ তিনি আরো বলেন, জীবনকে তিনি তার বিচিত্রতায় আঁকতে চান, যা ‘অনুভূত বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা’।
‘দ্য বার্ড’
সাক্ষাত্কারগ্রহীতার আরেক প্রশ্নের জবাবে মুর্তজা বলেছিলেন, গত কয়েক মাসে তিনি প্রায় ৪০টি ক্যানভাস এঁকেছেন। তার দুটি পছন্দের বিষয় ছিল ‘মাথা’ ও ‘পাখির সঙ্গে একটি বালক কিংবা বালিকা’। সে সময় তার প্রায় সব ক্যানভাসে এবং ১৯৬১ সালের জুনে লাহোরে হওয়া প্রদর্শনীর বেশির ভাগ চিত্রকর্মে পাখির মোটিফ পাওয়া যায়। সে সময়টায় আমি দেশের বাইরে ছিলাম। তাই আমার একমাত্র যোগাযোগ ছিল একটি ক্লিপিংস, যা আমজাদ আলী আমাকে পাঠিয়েছিলেন। এটা ছিল ড. এম. ডি. তাসীরের কন্যা সালমা তাসীরের লেখা চমত্কার একটি প্রবন্ধ। এটি প্রকাশ হয়েছিল শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা দ্য সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গ্যাজেট (লাহোর)-এ। প্রবন্ধটিতে বলা হয়েছিল: প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, এসব চিত্রকর্মের বেশির ভাগের মধ্যেই পাখির একটি চিত্তাকর্ষক প্রতীকী ব্যবহার দেখা যায়। সবসময়ই দেখা যায়, পাখি কারো হাতে খাঁচায় বন্দি। এরা কি জীবনকে নির্দেশ করে, নাকি সৃষ্টিশীলতা নাকি কল্পনা? এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল শিল্পীই দিতে পারবেন।’
ভিশনে দেয়া সাক্ষাত্কারে এ বিষয়ে একটি প্রশ্নের জবাবে মুর্তজা বলেছিলেন, পাখিগুলো কোত্থেকে আসে, সেটা তিনি জানেন না, কিন্তু হতে পারে, সেগুলো ‘স্বাধীন জীবন’-এর প্রতীক। বেশির ভাগ চিত্রকর্মই তার অবচেতন প্রকাশের ফসল।
‘দ্য ডেড লিজার্ড’
মুর্তজা আরো জানান, ১৯৬১ সালে তার লাহোরের আবাসস্থলের দেয়ালে তিনি একটি টিকটিকি দেখতে পান। তিনি কোনোভাবে সেই টিকটিকির সঙ্গে নিজের সাদৃশ্য খুঁজে পান। এভাবেই তিনি আঁকেন ‘ডেড লিজার্ড’।
মুর্তজাকে নিয়ে আমার স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে আরেকটি প্রবন্ধ, এটাও ভিশনে (করাচি) প্রকাশ হয়েছিল। এটা ছিল পাকিস্তানি সংস্কৃতির প্রসঙ্গে। প্রবন্ধটা আমার পছন্দ হয়নি। তিনি নিশ্চিতভাবেই প্রাচীন গান্ধারার (যা এখনকার পাকিস্তান) সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিষয়ে জানতেন না। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) গড়ে ওঠা বাংলাদেশপন্থী আন্দোলনের অংশীদার। ‘কোনো পাকিস্তানি সংস্কৃতি আছে কি?’— তার এই ভোঁতাবুদ্ধির প্রশ্নটি আমার মনে আছে। পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু অংশে পাকিস্তানের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের দাবি উঠছিল এবং তারা পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করেছিল। মুর্তজা এ বিষয়েই তার নিখাদ উদ্বেগকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।
দি আর্ট অব বাংলাদেশ
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর মুর্তজা তার জন্মভূমির শিল্পের ওপর কয়েকটি প্রবন্ধ লেখার সিদ্ধান্ত নেন।
মুর্তজা তার পর্যবেক্ষণে দেখেছিলেন, ১৯ শতকে ব্রিটিশ ও পশ্চিমা শিক্ষা চালু হওয়া এবং একটি শহুরে অভিজাত শ্রেণী গড়ে ওঠার প্রতিক্রিয়ায় লোকশিল্প পেছনে চলে যায়। উনিশ শতকের শেষদিকে ই. ভি. হাভেল যখন কলকাতা আর্টস কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন শিক্ষার্থীদের পশ্চিমা শিল্পের ওপর নতুন বিষয় ও আঁকার কৌশলের পরিপ্রেক্ষিতে একাডেমিক প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়। মুর্তজার নিজের কথায়, ‘এটা ছিল রূপকল্প থেকে বাস্তবে রূপান্তর হওয়ার যাত্রা।’ ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের আগ পর্যন্ত কলকাতাই ছিল বাংলার শিল্পের কেন্দ্র।
বাংলা ভাগ এবং তাদের অভিপ্রায়ণের পর জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমেদ ও কামরুল হাসান ১৯৪৮ সালে ঢাকায় আর্ট ইনস্টিটিউট চালু করেন। তারা পূর্ব পাকিস্তানের (এখন বাংলাদেশ) শিল্পে নতুন আন্দোলনের সূচনা করেন। এ শিল্পীরা শুধু চিত্রকর্মকে আন্তর্জাতিক মাধ্যম ও সর্বজনীন ভাষা হিসেবেই তুলে ধরেননি, বরং একই সঙ্গে বাংলার শিল্পের ঐতিহ্যবাহী লোকধারাকেও সামনে নিয়ে এসেছেন। কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরী ও কাইয়ুম চৌধুরীর মতো শিল্পীরা তাদের কাজে লোকজ মোটিফ এবং ফর্ম ও রঙকে প্রাধান্য দেন। পরিষ্কারভাবে জয়নুল আবেদিন ছিলেন এ আন্দোলনের নেতা, এ রীতিতে তিনি অনেকগুলো চিত্রকর্ম এঁকেছেন। এবং একই সঙ্গে তিনি তার কাজে পশ্চিমা ও আন্তর্জাতিক বিষয় ও কৌশলকেও
ব্যবহার করেছেন। আর্ট ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা এবং প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামেও তিনি পশ্চিমা ও আন্তর্জাতিক বিষয় ও কৌশলকে পরিচিত করিয়েছেন। আর্ট ইনস্টিটিউটের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে মুর্তজাও এসব ট্রেন্ড সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন এবং সেগুলো তার প্রাথমিক কালের কিছু কাজে ব্যবহার করেন।
পুনশ্চ
প্রিয় বশীর,
লাহোরে আমাদের প্রথম সাক্ষাতের পর ৫০ বছর কেটে গেছে। গত ৬০ বছরে আপনি শিল্পের জগতে যে অবদান রেখেছেন, তার সারাংশ তুলে ধরতেই আমি এ স্মৃতিকথা লিখেছি। এটা লেখার জন্য আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও শিল্প সমালোচকদের লেখা থেকে সাহায্য নিয়েছি। আমি মনে করি, আপনি আপনার জীবন ও কর্ম নিয়ে গর্বিত হতে পারেন।
আমি লেখায় যেগুলোর কথা উল্লেখ করেছি, তার বাইরেও আপনার অনেক চিত্রকর্ম রয়েছে। আমি দেখেছি শুধু এমন চিত্রকর্মগুলো নিয়েই লিখেছি, আর আমার চেয়ে অন্য যারা আপনার কাজ সম্পর্কে অধিকতর ওয়াকিবহাল, তাদের দৃষ্টিতে সেরা কাজগুলোকেও লেখায় অন্তর্ভুক্ত করেছি।
আপনি বেশ কতকগুলো ম্যুরালও করেছেন, কিন্তু আমি দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, সেগুলোর কোনোটাই বাস্তবে দেখিনি। আমি জেনেছি, আপনার করা সেরা ম্যুরালগুলো হচ্ছে— ‘দ্য ট্রি’, অগ্রণী ব্যাংক, ঢাকা, ১৯৬৪; ‘দ্য সীড’, অগ্রণী ব্যাংক, ঢাকা, ১৯৬৬; ‘ইভোলিউশন অব মানি’, ন্যাশনাল ব্যাংক, ঢাকা, ১৯৬৮; ‘মাই কান্ট্রি’, সোনালী ব্যাংক, লন্ডন, ১৯৭২; ‘মারটায়ার্স ট্রি’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৪; ‘হোমেজ’, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিলেট, ১৯৯৬; এবং ‘কাডেনজা’, মোহাম্মদ আমিনুজ্জামান ভূঁইয়ার বাসভবন, চট্টগ্রাম, ১৯৯৮। পরেরবার বাংলাদেশে গেলে এসব ম্যুরালের যতগুলো সম্ভব দেখে ফেলব। বিস্ময়করভাবে এগুলো সম্পর্কে খুব কম লেখা হয়েছে বা এমনও হতে পারে যে, লেখা ঠিকই হয়েছে, কিন্তু আমার চোখে পড়েনি।
আপনার তিনটি মূল চিত্রকর্ম আমার সংগ্রহে আছে— ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহ মুহাম্মাদ উর রাসূল আল্লাহ’, ‘তাহা’ ও ‘ক্যান্টো’ সিরিজের একটি বিমূর্ত চিত্রকর্ম। ‘ক্যান্টো’ সিরিজের এ বিমূর্ত চিত্রকর্মে অজানা ভাষার কোনো শব্দের সঙ্গে সদৃশ ছোট ছোট রেখা আছে। এ চিত্রকর্মগুলো যথাক্রমে আমার ঢাকা, ইসলামাবাদ ও স্যান ডিয়াগোর বাসায় শোভা পাচ্ছে।
লেখক: অধ্যাপক আনোয়ার দিল পড়াশোনা করেছেন লাহোরের সরকারি কলেজ, পেশওয়ারের ইসলামিয়া কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান ও ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে। ১৯৭৩ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইউনাইটেড স্টেটস ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (বর্তমানে আলিয়ান্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি নামে পরিচিত) ল্যাঙ্গুয়েজ সায়েন্স অ্যান্ড কমিউনিকেশনের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষাদান করেছেন। ২০০৩ সাল থেকে তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ল্যাঙ্গুয়েজ সায়েন্স অ্যান্ড ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট সিরিজের ১৯ খণ্ডসহ প্রায় ৪০টি বই লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ— হিউম্যানস ইন ইউনিভার্স (১৯৮৩), সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (২০০২), বাংলাদেশ: অ্যান ইন্টারকালচারাল মেমোয়ার (২০১১), বাংলাদেশ: অ্যান ইন্টারকালচারাল প্যানোরমা (২০১১)।






