শহর ছেড়ে দূরে ঐতিহাসিক ভিমের জাঙ্গালের বিস্তৃতির ওপর, টিলামতো উঁচু অংশে ফয়েজের দোচালা টিনের বাড়ি। এ বাড়িটার পুবে এককালের প্রমত্তা কলুতু আর বর্তমানের শুকিয়ে খালের আকার ধারণ করা করতোয়ার সঙ্গে অবনমিত ভূমির মাখামাখি। আশপাশে বাড়িঘর তেমন একটা চোখে না পড়লেও, এ বাড়িটার ওপর চোখ পড়ল শহরের নবনির্বাচিত কমিশনার ও ভূমিদস্যু বাসেতের। সে মাদকসম্রাট মোহনের কাছে গিয়ে অমন সুন্দর একটা জায়গায় সামান্য এক ফ্যাক্টরির মেশিন অপারেটরের বাড়ি থাকা কতটা নৈতিক— এমন প্রশ্ন তুলতেই মোহন তাকে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলল,

খ্যায়া ফ্যালা...

ব্যস! মোহনের কাছ থেকে ভূমি দখলের লাইসেন্স পেয়ে বাসেত ফয়েজকে সেখান থেকে নির্বাসনের নোটিস দিলে ফয়েজ জানাল যে, সেখানে তার বাপ-দাদার আমল থেকে তাদের বসবাস এবং তার কাছে বাড়িটার দলিলও আছে জানালে বাসেত ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, তোক তো ভালো লোকই জানিচ্ছিনু। তুই এত জাউরা হলু কুনদিন থ্যাকা যে, সরকারি জাগার দলিল বানাস...?

তার কয়েক দিনের মধ্যে ফয়েজের বড় মেয়ে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে গেল। ফয়েজের একমাত্র স্বপ্ন ছোট মেয়ে হেলেনাকে নিয়ে। নবম শ্রেণীতে সে চতুর্থ বলে সামান্য বেতনভুক্ত কর্মচারী ফয়েজের মেধাবী এ মেয়েটাকে নিয়ে অনেক আশা। সেই আশার গুড়ে বুঝি বালি পড়ল! সন্ধ্যায় বাসেত এসে তাকে টিটকিরি করে বলল,

তাই তো কই, এটি থ্যাকা তুই যাবার চাস না ক্যা? লুকায়া লুকায়া ইয়াবার ব্যবসা করিচ্চু!

ফয়েজ বুঝে যায়, সমঝোতা না করলে তার সামনে আরো বিপদ আসছে। ফলে ফয়েজের আশ্রয় জোটে ভূত-পেত্নীর আখড়া নামে পরিচিত বিধায় মানুষ পরিত্যক্ত শহরতলির কাঁচাবাজার ছেড়ে আদিকালের এক জঙ্গলের পাশে, যে বাড়িটায় কেটেছে বাসেতের শৈশব।

বাড়ি হারানোর বেদনার চেয়ে মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ব্যাপক হয়ে উঠলে একদিন আনমনা ভঙ্গিতে কাজ করতে গিয়ে ফ্যাক্টরির মেশিন-করাতে ফয়েজের হাত কাটা পড়ল। সংসারে এমনিতেই টানাটানি, তার পর পেনশনহীন বেসরকারি চাকরিটা না করতে পারার মানসিক যাতনায় ফয়েজ একদিন ভোররাতে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়েও কোনো সাড়াশব্দ করল না। যেন, আয়হীন একজন পুরুষের মৃত্যুর সময় সেবাপ্রত্যাশা এক ধরনের বিলাসিতার অপরাধ। ভোরের আগেই সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চোখ মুদলে তার পরের সপ্তাহে মেজো মেয়ে মালিহা গেল বাসেতের কাছে। বাসেত তাকে আয়ের একটা পথ তৈরি করে দিল। তা আর কিছুই নয়, মাঝে মাঝেই নিজেদের আগের বাড়িতে মোহনের সঙ্গে রাত কাটানো। মালিহা হোস্টেলে থাকার কথা বলে জঙ্গলের এই অভিশপ্ত বাড়ি থেকে চলে গেল।

নতুন বাড়িটায় দুই মাস কেটে গেল। সন্ধ্যা নামছিল। বাড়ির বাইরে বাঁশবাগানে যাওয়ার পথে গোসলখানা আর টয়লেট। এক সন্ধ্যায় হেলেনা জানালায় দাঁড়িয়ে গোসলখানার ফুটোর অংশ দিয়ে ছায়ার মতো কিছুর নড়াচড়া দেখল। বাড়ির ভেতরের কাদাপথ মাড়িয়ে সে গোসলখানার কাছে পৌঁছতেই জাহাঙ্গীর সেখান থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে এসে হেলেনাকে অদ্ভুত এক গল্প শোনানোর কথা বলে সে তার হাত ধরে টেনে ঘরে এনে যা বলল তার অর্থ এমন যে, গোসলখানায় একটা ছায়া সত্যিই বাস করে। কিন্তু ছায়াটাকে দেখতে চাওয়াটা ঠিক কাজ নয়। হেলেনা জানতে চায়,

বাবার ছায়া?

না।

তাহলে?

জানি না।

ছায়াটা কথা কয়?

ফিসফিস করে কথা কয়।

কী বলে?

তুই যা চাস তাই-ই সে দেবে। কিন্তুক, ঠিক এই সময়তই ওটি যাওয়া লাগবি...

কথাগুলো বলে জাহাঙ্গীর হাতের মুঠো খুলে হেলেনাকে দেখাল। হেলেনা তার হাতে পঞ্চাশ টাকার দুটা নোট দেখে বিস্ময়ভরা চোখে তার আনন্দের আতিশায্য-মুখরিত চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

একশ টাকা! জাহাঙ্গীর কোনো কথা না বলে বোনের হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট দিয়ে বলল,

ছায়া যে হামাগরক ট্যাকা দিচ্চে এ কতা কাউকে কস না, আপা...

হেলেনা আর কী বলবে? তার হাতে কিছু টাকা এলে সে কত খুশি হয়— তা তার নিজেরই জানা ছিল না। স্কুলের মেয়েরা নিত্যনতুন মাথায় কত রঙের ক্লিপ-ফিতা পরে ক্লাসে আসে। প্রতিদিন তারা ক্যান্টিনের সামনে লাইন দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের টিফিন কেনে। হেলেনা কোনো দিন তার সহপাঠীদের সঙ্গে ওই লাইনে দাঁড়ানোর আনন্দকে আস্বাদ করতে পারেনি। সে জাহাঙ্গীরের কপালে চুমু দিয়ে হাতের মুঠোর মধ্যে পঞ্চাশ টাকার নোটটা শক্ত করে ধরে বলল,

না, কাউকে বলব না। তুই-ই যেন ভুলেও মুখ খুলিস না।

জাহাঙ্গীর বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গেল। বিদ্যুতের আলোয় হেলেনা হাতের মুঠো খুলে দেখল যে সত্যি টাকাটা তার ডান হাতের মুঠোর মধ্যে আছে এবং সে মিথ্যা দিবাস্বপ্ন দেখছে না। মানুষ জ্বিন-প্রেতকে ভয় পেলেও এ মুহূর্তে হেলেনার কাছে তারা কল্পলোকের বন্ধু হয়ে উঠল এবং কল্পনায় সে ক্যান্টিনের সামনে খাবার কেনার লাইনে দাঁড়াল, ভ্যানে করে টিং টিং ঘণ্টা বাজিয়ে চলে যাওয়া আইসক্রিমওয়ালাকে ডাকল। ইস! সুজাতা কত দিন তাকে এটা-সেটা খেতে দিয়েছে। নাহ, কালকে সে সুজাতাকে কিছু খাইয়ে নিজের লজ্জা ঘোচাবে। এসব ভাবতে ভাবতেই হেলেনা ঘেমে নেয়ে উঠল। তার কিশোরী হূদয় ঢিপ-ঢিপ তান তুলে আগামী সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। সে মনে মনে কামনা করল, যেন ছায়াটার সঙ্গে তার সখ্য হয়। সে এক মাসে কত টাকা উপার্জন হতে পারে, তা অংকের খাতায় আঁক কষে বের করল। টাকার অংকের দিকে তাকিয়ে তার কল্পনার ডানা বিস্তৃত হতেই থাকল।

পরদিন স্কুলের প্রাথমিক সময়টা হেলেনার কাটল ক্যান্টিনের সামনে লাইনে দাঁড়ানোর কল্পনায়। জীবনে প্রথম ক্যান্টিনের সামনে দাঁড়ানোর উত্তেজনাকর সময় পার করার পর বাকি সময়টুকু তার কাটল সন্ধ্যার ছায়া ছায়া-ঘোর ঘোর লগ্নের কল্পনার মুহূর্তকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। ভয়-উত্তেজনায় হেলেনার সময় আর কাটছে না। যখনই ভয় এসে তার নিঃশ্বাস প্রায় আটকে দেয়, তখনই তার গণিতের খাতায় আঁক কষা অংকের কথা ভেবে পুনরায় সে সাহসী আর আশাবাদী হয়ে ওঠে।

অবশেষে সেই মুহূর্ত আসে। হেলেনা দুরু দুরু বুকে গোসলখানার দিকে পা বাড়াতেই একরাশ দমকা বাতাস এসে তার কাঁধ পর্যন্ত বড় হওয়া চুলকে একটু উড়িয়ে দিল। কিন্তু বাঁশবাগানকে মনে হয় পুরোটাই কাঁপিয়ে দিল। তা না হলে বাঁশে বাঁশে অমন ঘর্ষণ-শব্দে সাঁঝের নিস্তব্ধতা এভাবে খানখান হয়ে উঠবে কেন? গোসলখানায় ঢুকে হেলেনার পা থর থর করে কাঁপল। তার মনে হলো সে পৃথিবীর কোথাও নয়, ভেসে যাচ্ছে বাতাসে, তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অতল গহ্বরে। কতক্ষণ ওভাবে তার কাটল সে আন্দাজ করতে পারল না। বাঁশবাগানের মাঝখানে এক পাকুড়গাছে কোনো পাখি ঘরে ফিরে এসে তার একটা ডাল কাঁপিয়ে দিল। ঘরের মাত্র একটা বাতির আলো আর তার ঘুমানোর চৌকিটাকে বড় আপন মনে হলো। কিন্তু ঘরে ফেরার পথ যেন বন্ধ করে রেখেছে অংকের খাতার কয়েকটা আঁকের মাঝে লুকানো স্বপ্ন। তার গা ছমছম করছিল। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি সে আর পাচ্ছিল না। ঘরে ফেরার জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হয়ে সে যখন তার ওজনহীন ভাসমান পা দিয়ে মাটি খুঁজল, ঠিক তখন তার কাঁধে হাতের আলতো স্পর্শে সে থমকে দাঁড়াল— ছায়া! অজান্তেই শব্দটা তার মুখ থেকে বের হয়ে গেল। ছায়ার হাতের আলতো স্পর্শ ক্রমে শক্ত হয়ে পেঁচিয়ে নিল হেলেনাকে। ছায়া শুধু আর ছায়া থাকল না, তা ক্রমেই এক অবয়ব নিয়ে পেছন থেকে হেলেনার শরীর স্পর্শ করল। তার বাড়ন্ত কচি ঊরু হয়ে পিঠে, তার পর দুই পাঁজরের হাড়ের মেদহীন পাতলা চামড়া পেরিয়ে উপরে যেখানে কিছু দিন হলো একপিণ্ড নরম মাংস তার শরীরে কিশোরীসুলভ ছোট্ট বাঁক তৈরি করেছে। ছায়ার হাত আর শরীর যত তার শরীকে নিজের মধ্যে টানল, তত শরীরময় জেগে ওঠা থরথর শিহরণ বয়ে চলল হেলেনার শরীরে। ছায়ার হাত খুলে ফেলল তার পায়জামার গিঁট। হেলেনার বিবমিষার সঙ্গে জীবনে প্রথম উপলব্ধি করা অচেনা আর নতুন শিহরণে কাঁপতে থাকল। তার শিহরণের চেয়ে বিন্দু বিন্দু রক্তের ছোট্ট এক ধারা জননেন্দ্রিয় থেকে আগুনের ফিনকি হয়ে যেন বয়ে চলছে তার হাঁটুর কাছে। তার স্কুলের সাদা জামায় দু’ফোঁটা রক্ত ঝরে পায়জামাটাকে স্কুলে যাওয়ার অনুপযুক্ত করল, যা সে ঘরে ফিরে কান্না আটকানোর কসরত করতে গিয়ে টের পেল।

 

২.

পরদিন সে অসুস্থতার কথা বলে স্কুলে গেল না। সালেহা মেয়ের কপালে হাত দিয়ে দেখল, তার গা পুড়ে যাচ্ছে। দুদিন ধরে শরীরের বিবমিষা না কাটলেও তার একসময় বাইরে যেতে ইচ্ছা করল। রিকশা নিয়ে নিউমার্কেটে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে কয়েকজন মেয়ের স্কুল থেকে দলবেঁধে বাড়ি ফেরার দৃশ্য দেখে হেলেনার বুকের ভেতর থেকে একরাশ বেদনার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। তার মনে পড়ল, সুজাতা পিরিয়ডের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে। সেই দিনটার কথা মনে করে সে লজ্জায় নুয়ে এল,

ওমা, তোর দেখি আমার চেয়ে খারাপ অবস্থা। এত রক্ত পড়ে তোর? এসবে কী পচা পুরান কাপড় ব্যবহার করিস! লজ্জা না পেয়ে চাচিকে তোর খুলে বলা উচিত। শোন, ব্যাগের ভেতর সবসময় তিনটা ন্যাপকিন লুকিয়ে রাখবি।

না, আজ তাকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতেই হবে— এমন ভাবনা ভাবতে ভাবতে বিচিত্র অনুভূতিতে ভাসতে ভাসতে সে গলি ছেড়ে শহরে যাওয়ার মূল রাস্তায় উঠল। কখনো মসৃণ আবার কখনো অমসৃণ রাস্তাটি থেকে রিকশার চাকা হেলেনার শরীরে যে গতি আর আন্দোলন সঞ্চালন অথবা পরিবহন করছে তা-ই হয়তো হেলেনার অপরিণত অনুভবে সমান্তরাল এবং একই সঙ্গে অসমান্তরাল বোধ আর উপলব্ধি তৈরি করছিল। সে ছায়াটাকে খুন করতে চাইছে আবার পরক্ষণেই তাকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছে। লজ্জায় তার বোধ কুঁকড়ে যাচ্ছে তো সামাজিক অবস্থানের কথা মনে করে তার স্বপ্ন তাকে পুনরায় উজ্জীবিত করছে!

কিন্তু হেলেনার স্বপ্ন তার বোধের কাছে পরাজিত হলো বাড়ি ফেরার জন্য রিকশায় ওঠার পর। তার বোধ আবেগাপ্লুত হলো তখন, যখন সে হাতে ধরা পলিথিনটার মুখ খুলল। মাথার একটা ব্যান্ড, চুল আটকানোর ক্লিপ-ফিতা আর ছোট ভাইটার জন্য অপেক্ষাকৃত কম দামি চকোলেট ছাড়া সে আর কিছু কিনতে পারেনি। হেলেনার মনে হলো পাঁচ মাস আগে থেকে শুরু হওয়া তার পিরিয়ডের সময় ব্যবহার করা পুরনো ন্যাকড়াগুলোই তাকে আবার ধুয়ে ধুয়ে ব্যবহার করতে হবে। ভাইয়ের জন্য চকোলেটটা রেখে নিজের জন্য কেনা কয়েকটা সামগ্রী পাশের ডোবায় ফেলে দিল এবং ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না আটকানোর চেষ্টা করল।

নিজের প্রতি ঘৃণা অথবা ভালোবাসা কিছুই কাজ করছিল না কিশোরী মেয়েটার। সেদিন থেকে সন্ধ্যার আগেই হেলেনা শৌচাগারের সব প্রয়োজন শুধু সম্পন্নই করল না, বরং সারা রাত যেন আর বাথরুমে যেতে না হয় তার জন্য রাতে কম করে পানি খেল। এভাবে দুই সপ্তাহ কাটানোর পর এক শুক্রবার সে জাহাঙ্গীরকে একটা খেলনা বন্দুক নিয়ে আঙিনায় গুলি ছোড়া রপ্ত করতে দেখল। খেলনা বন্দুকটা বেশ বড়। হেলেনা তার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল,

তুই বন্দুক কোত্থেকে পেলি? হেলেনার প্রশ্নে সে ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে ইশারায় বোনকে চুপ থাকতে বলল। তার পর তার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গিয়ে চৌকির নিচ থেকে আরো অনেক খেলনা বের করে বলল,

আপা, এগলান ঐ ছায়াডা দিছে। কিন্তু, তুই আবার মা’ক কবার যাস না। হেলেনা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে কষে জাহাঙ্গীরের গালে এক থাপ্পড় বসাল,

আর যদি ছায়ার সঙ্গে দেখা করে কিছু নিছিস... দাঁড়া মাকে সব...

জাহাঙ্গীর মাথা নিচু করে চোখ মুছল। হেলেনা তাকে ধরে মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য দাঁড়াতেই সে চৌকির নিচে শরীর গলিয়ে কিছুক্ষণ পর বাইরে এসে অপরাধীর ভঙ্গিতে মুঠো করা হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

নে, এগলান তোর। বলে সে হাতের মুঠা খুলে তিনটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে হেলেনার দিকে এগিয়ে ধরল,

হেলেনা তিনটা কচকচে পাঁচশ টাকার নোটের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ সে চুপ করে তাকিয়ে থেকে ফুঁসতে ফুঁসতে ধাতস্ত হলো। তার পর নোট তিনটা হাতে নিয়ে সে ছোট ভাইটার মুখে ছুড়ে দিল। তার দিনটা আবার এলোমেলো হয়ে গেল। অংকে তার মন বসছে না। সেদিন মার্কেটে প্রায় কিছুই না কিনতে পারার ব্যর্থতার কথা মনে পড়ছে। গোসল না করেই চুলার পাড়ে মায়ের পাশে বসে সে প্লেটে খাবার তুলে নিয়ে চুপচাপ খেয়ে ঘরে এসে ঘুমিয়ে গেল। এই ফাঁকে জাহাঙ্গীর বোনের চৌকির ওপর খোলা খাতার পাতার ফাঁকে নোট তিনটার মাথা একটু বের করে রেখে পালিয়ে গেল। গত কয়েক সন্ধ্যায় ছায়াটা বারবার জাহাঙ্গীরকে বিভিন্নভাবে হেলেনা যেন সন্ধ্যায় গোসলখানায় যায় তার অনুরোধ করেছে। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হওয়ায় জাহাঙ্গীরকে আর খেলনা অথবা টাকা না দেয়ার হুমকি দিয়ে নতুন করে এই পরামর্শই বাতলে দিয়েছে।

হেলেনা ঘুম থেকে চোখ খুলে হাই তুলতে গিয়ে থেমে গেল। তার চোখের সামনে খাতার পাতার ভেতর থেকে তিনটা পাঁচশ টাকার নোট যেন উঁকি দিয়ে তাকেই দেখছে। হেলেনা নোট তিনটার দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকল। তার পর হাত বাড়িয়ে নোটগুলো মুঠোতে পুরতেই তার শরীরের ভেতর আবার সেই শিহরণ ফিরে এল। সঙ্গে সঙ্গে আগামী রক্তক্ষরণের দিনগুলোয় ন্যাকড়াজাতীয় কাপড়ের চেয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের প্রবল ইচ্ছাটুকুও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। মনে মনে সে নিজেকে বোঝাল, তাকে কেউ দেখছে না। ব্যাপারটা তার শরীরে জাগা শিহরণের মতো! হেলেনা আর কিছু ভাবতে পারল না। তার মাথার মধ্যে ঝিঁঝিঁর কলতান এবং শরীরে জেগে ওঠা শিহরণে কামনার টান।

নোট তিনটা এবার হাতের তালুর মধ্যে নিয়ে মুঠো পাকিয়ে সে মুঠো শক্ত করতেই থাকল। অধিকারহীন অর্থকে কুক্ষিগত করার কিশোরী মনস্তত্ত্বে তাদের বেদখল হয়ে যাওয়া বাড়িটা কোনো প্রভাব ফেলে থাকতে পারে। পরদিন পুনরায় শহরে গিয়ে তার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কেনার স্বপ্নে সে বিভোর হলো। কিন্তু সে জানে এজন্য বাঁশবাগানের ছায়ার কাছে গিয়ে তার ঋণ শোধ করতে হবে। কথাটা মনে হতেই তার ভ্রূ কাঁপল, তার পেটের নিচে দলাপাকানো কী যেন আরো নিচের দিকে প্রবাহিত হলো। চিনচিন মাথাব্যথা আর কেমন বিবমিষা হেলেনাকে অবশ করে ফেলল। তার সারাটা রাত কেটে গেল ঘোর ঘোর এক আবর্তে।

এর পর ভটভটিতে শহরে গিয়ে বাকি টাকা দিয়ে হেলেনা সবার আগে দুটা স্যানিটারি ন্যাপকিন আর স্কুলে যাওয়ার নতুন এক সেট জামা বানাতে দিয়ে বাসার পথ ধরল। ফেরার পথে তার হাতে অবশিষ্ট টাকা তো নেই-ই, সে টেইলারের মজুরি বাবদ তিনশ ষাট টাকা পরিশোধের ভাবনায় হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল।

দুপুরের খাবার শেষে ঘুম-নির্ঘুমে তার কাছে বিকাল এল। জাহাঙ্গীর স্কুল থেকে ফিরে এসেই খেতে বসার আগে ঘরে এসে তার কানে কানে বলল,

আপা, ছায়াডা জানবার চায়... তার মুখ চেপে হেলেনা কিছু বলতে দিল না। সে-ই তাকে ফিসফিস করে বলল,

আগামীকাল সন্ধ্যায়... তাকে বলিস।

 

৩.

আগামীকাল সন্ধ্যায়... এ কথাটা বলার পর থেকে সময় যেন থমকে দাঁড়াল। জানালার কপাট খুলে সে বিস্ময়ভরা চোখে বনের ঘন ছায়ার ভেতর লুকানো বাঁশবাগানটার দিকে তাকাল। সব রহস্যটুকু, তার ভাবনা আর তল খুঁজে না পাওয়া উপলব্ধির সবটুকু ওই বনকে ঘিরেই ছিল। সেই চেনা জগেক মুহূর্তেই এত অচেনা মনে হচ্ছে! হেলেনার মনে হলো, বনের যুগ যুগ ধরে পরিত্যক্ত এবং বৃষ্টিতে গোসল করা ছায়াগুলোর ভেতর তার রক্ত খাওয়ার জন্য কোনো এক প্রেতাত্মা বড় এক চাকু হাতে অপেক্ষা করছে। বাঁশের একে অন্যকে অতিক্রমের ঘর্ষণজনিত শব্দ তার আত্মা কাঁপিয়ে দিল। সন্ধ্যা নামার আগে সে ভয়ে ঘরের জানালা বন্ধ করে দিতে চাইল। অথচ রাতে বাতি নিভিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর বনটা যেন তাকে ডেকেই চলল। গোসলখানার ছায়ার কাছ থেকে বাঁচার জন্য রাতের অন্ধকারের সঙ্গে মেশা বনের নিবিড়তা যে নিকষ কালো ছায়ার মতো মৃত্যুরূপ ধরেছে সেই ‘বড় আঁধার’ তাকে কাছে ডাকল। চৌকি থেকে সে উঠে পড়ল। সন্তর্পণে বারান্দায় এসে ঢিপ ঢিপ করা বুকে আঙিনায় নেমে এসে অন্ধকারের মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকল। বাঁশগুলোর একে অন্যকে অতিক্রম করার ঘর্ষণজনিত শব্দ শুনে তার মনে হলো, ওই বনে কেউ ধারালো চাকুতে ধার দিচ্ছে। ঝিঁঝিঁ আর গোবরে পোকার আর্তনাদ পেরিয়ে সেই তরবারিতে শান দেয়ার ‘খিচ’ ‘খিচ’ শব্দ এত প্রকট হয়ে উঠল যে, হেলেনা সেই তরবারির নিচে গলা দিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য বনের দিকে হাঁটা শুরু করল।

হেলেনা বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে, গোসলখানা বাঁয়ে রেখে পোকা আর ঝিঁঝিঁর কলতানমগ্ন জঙ্গলের নিচে গিয়ে থমকে দাঁড়াল একবার। তার পর অন্ধকার গায়ে মেখে থাকা সবুজ পাতাগুলোর বলয় পেরিয়ে পুনরায় আকাশের দিকে তাকাতেই তারাভরা আকাশে বাবার মুখটা স্পষ্টই দেখল। এক ঝলক। তার পরই তার দৃষ্টি চকিত্ নিচে নামল। বনের মাঝখানে সে এখন স্পষ্ট চাকুতে ধার দেয়ার শব্দ শুনছে। সে জমে পাথর হয়ে গেল। পরক্ষণেই তার মনে হলো বনের মাটি দীর্ঘদিন সূর্যের আলো থেকে তাকে বঞ্চিত করার অপরাধে গাছদের সঙ্গে বিতণ্ডায় লিপ্ত। ঝিঁঝিঁ আর গোবরে পোকাদের আর্তনাদের সমান্তরালে হেলেনার প্রখর কল্পনায় ধরে নেয়া শব্দগুলো একের পর এক ডানা মেলেই চলল। এক মৃত্যুউপত্যকা তার চেতনাকে প্রায় লুপ্ত করে ফেলছে, এমন সময় বনটার শেষে দূর প্রান্তে কিসের একটু আলো দেখে তার সেই চেতনা ফিরে এল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে সেই আলোর দিকে পা বাড়াল। এখন তার কানে তার কল্পিত শব্দগুলো আর খেলা করছে না। একটু পর তার পা পানিতে ছপ ছপ শব্দ তুলতেই সে দেখল আলোটা নিভে গেল। একটু পর আবার আলো জ্বলল। হেলেনা এবার সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে আলোর রেখা বরাবর এগিয়ে চলল। আলোটা আর নেই, কিন্তু অদ্ভুত শব্দ তার কানে ভেসে এল। শব্দটার আরো কাছে গিয়ে সে পাকুড়গাছের আড়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। একটু দূরে একটা খড়ের পালা দেখা যাচ্ছে। আর সেই খড়ের পালা থেকে খড় নিয়ে বনের অন্ধকারে তা বিছিয়ে দুটা ছায়া কী যেন করছে। বসামতো ছায়াটার মাথাটা একটু পর পর নিচে নেমে নামছে-উঠছে আর শায়িত কিছুর অস্পষ্ট অবয়ব শুধু দুই পা দিয়ে জড়িয়ে আছে তার কোমর।

বসা আর শায়িত ছায়া দুটো একসময় উঠে দাঁড়াল। তার পর একে অন্যের কোমর জড়িয়ে খড়ের পালার পাশ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। যে পথে সে এত দূর এসেছে, সেই পথে আর ঘরে ফেরার সাহস পেল না। সে খড়ের পালা পার হয়ে সামনে অচেনা পথ ধরে এগোতে এগোতে দূরে মহাসড়কে আঁধার বিদীর্ণ করা অসংখ্য যানের আলো দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মহাসড়ক হয়ে কিছু দূর এগিয়ে যাওয়ার পর ডানের চেনা গলিটায় ঢুকে পড়ার পর একটা জানালার উড়ে উড়ে ওঠা পর্দার ফাঁক দিয়ে তখনো জেগে থাকা মানুষের প্রাণস্পন্দনের শব্দ পেয়ে তার পায়ের গতি বেড়ে গেল। একটা বাড়ি থেকে একজন বৃদ্ধার অভিশাপ ভেসে আসছে। কোনো একটা স্থান থেকে কোনো নারীর গোঙানির মতো কান্নাও ভেসে আসছে। নারীর গোঙানি শুনে হেলেনার পায়ের গতি শ্লথ হয়ে গেল। কান্না থামিয়ে নারীকণ্ঠ অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছে। হেলেনা বুঝল, তাদের ঘরে এখনো রান্না না হওয়ায় ঝগড়া চলছে।

তার পর ধপ ধপ শব্দ। স্বামীটা মেয়েটাকে নির্দয়ভাবে হয়তো মারছে। তার পর দাপাদাপি, দৌড়াদৌড়ি। হেলেনা পায়ের গতি বাড়াতেই সেই মেয়েটা মুখে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে করতে তার সামনে দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল। তার স্বামী তার পেছন পেছন আমের ডাল হাতে দৌড়ে একসময় গলিটার মুখে মেয়েটাকে ধরল এবং তাকে ডাল দিয়ে বেদম প্রহার করল। হেলেনার সামনে ঘটতে থাকা এ দৃশ্য তার আর সহ্য হলো না। সে রাস্তার পাশে বাড়িটার চালের নিচে ঝোলানো খড়ির বোঝা থেকে একটা শক্ত খড়ি নিয়ে এসে পুরুষটার পেছনে জোরে আঘাত করল। লোকটা ভয় পাওয়া স্বরে চিত্কার করতেই হেলেনার রাগ চড়ে গেল। সারা দিন ধরে তার গলার কাছে আটকে থাকা মানসিক চাপ, যন্ত্রণা আর অভিমানকে উগরে দেয়ার এক ক্ষেত্র পেয়ে সে যেন কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে উঠল। লোকটা একসময় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে হেলেনা তাকে কাছে এসে গুনে গুনে তিনটা লাথি মেরেই ক্ষান্ত হলো না, তার মুখে থু থু দিয়ে উল্টা ঘুরে বাড়ির পথে পা বাড়াতেই লোকটার আলুথালুবেশি স্ত্রী যার বুকে টুকরা কাপড়টুকুও খসে পড়েছে, সে হেলেনার পা ধরে হঠাত্ বলল,

ও স্যার, জাউরাক আর মারেন না গো...

ঘৃণায় পা’টা সরিয়ে নিয়ে হেলেনা বাড়ির পথে হাঁটা শুরু করল। ঘুরে ঘুরে দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ার পর সে এক দৌড়ে বাড়ির সামনে এসে দেখল তার মা আর ছোট ভাইটা হারিকেন হাতে তাকে ডাকছে,

হেলে... না... তার ভাইটাও ডাকছে,

আ... পা...

মা আর ভাইয়ের এই ডাক যেন তার আত্মা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল অনেক দূর-দূরান্তে, বাঁশবাগানের অন্ধকার পেরিয়ে, বটগাছটার ঘন পাতার নিবিষ্টতা ছাড়িয়ে বনের ঊর্ধ্বে, আরো ঊর্ধ্বে আকাশের সীমানায়।

 

৪.

রাতের অন্ধকারের ভাষা শিখে, মৃত্যুর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে হেলেনা জীবনকে নতুন করে দেখতে শিখল। মহাকালের মাঝে এই সমাজের মানুষের জীবনের বেঁচে থাকার তাড়নার কাছে তার মূল্যবোধকে পানসে মনে হলো। মানসিক পীড়নে তার শরীরের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়া ক্লান্তি তাকে অতল ঘুমের গভীরে তলিয়ে নিল। সে স্বপ্নে দেখল, তাদের পুরনো বাড়িটার সামনে একটা শান বাঁধানো পুকুর। জোছনার রুপালি আলোয় প্লাবিত বাড়ির সামনের মাঠ-প্রান্তর। টিলার মতো উঁচু বাড়িটার সামনে বাবা একটা মাচা বানাতে ব্যস্ত। গায়ে তার চিরচেনা হাতওয়ালা বগলের কাছে ছেঁড়া সেই স্যান্ডো গেঞ্জি। হেলেনা তাকে জিজ্ঞেস করল,

এটা বানিয়ে কী হবে, বাবা?

রাতের খাবারের পর চাঁদের আলোয় এখানে আমি আর তুই বসে বসে গল্প করব। জানিস মা, বেঁচে থাকার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নয়। মৃত্যু এগিয়ে এলে বোঝা যায় যে, প্রাণ একটা মহান কিছু। প্রাণ নিয়ে প্রাণময় বেঁচে থাকা মানুষের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি...

বাবার মুখে ‘বেঁচে থাকা’ শব্দ দুটো হেলেনার সূক্ষ্ম চেতনায় ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হয়ে আছড়ে পড়ল। বাবার মরে যাওয়ার ব্যাপারটা এত দিন ধরে তাহলে একটা স্বপ্ন হয়ে আছে? স্বপ্নের তোলপাড় অনুভূতি থেকে বাবাকে দেখার আকুতি নিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসতেই তাকে চিরতরে আবার যেন নতুন করে হারিয়ে ফেলল। তার চোখের কোণ ভিজে উঠল।

 

জাহাঙ্গীর ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে খেলনা বন্দুক নিয়ে গুলি ছোড়া খেলছে। জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকেছে এক ফালি সোনারঙের নরম রোদ। তার আলোকরশ্মিতে ধূলিকণার অণু-পরমাণু রঙধনুর সাত রঙ নিজেদের অতি সূক্ষ্ম শরীরে মেখে নিয়েছে। হেলেনার কানে বাবার কথাগুলো বেজে চলল, ‘জানিস মা, বেঁচে থাকার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নয়।’

বিয়ে হওয়া নতুন কনের কান্নার মতো করে শুরু হলো হেলেনাদের বাঁচার প্রস্তুতিপর্ব। না, সে কারো কাছে ঋণী থাকবে না। বাবার জায়গাটা উদ্ধার করতে হবে এবং সেখানে একটা মাচা বানিয়ে চাঁদের আলোয় বসে বসে নিজের ছায়ার সঙ্গে গল্প করবে ভাবল সে।

স্কুল থেকে এসে হেলেনা স্বাভাবিকভাবে দুপুরের খাবার খেয়ে পরের দিনের সব পড়া গুছিয়ে নিল এটুকু জেনেও যে, স্কুলজীবন থেকে তার নির্বাসন আসন্ন।

সন্ধ্যার ছায়া ঘনিয়ে এলে জাহাঙ্গীরকে মায়ের কাছে থাকতে বলে সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল গোসলখানার ছায়ান্ধকারে। বনের ভেতর বাঁশগুলো একে অন্যকে নির্বাসনে পাঠানোর মহড়া হিসেবে নিজেদের অতিক্রম করছে। কখনো ধীরে। কখনো তার চেয়ে একটু দ্রুত।

 

আঁধারে আবৃত এক নিকষ কালো যমদূত তার বড় তরবারিতে ‘খিচ’ ‘খিচ’ শব্দ তুলে শান দিলেও তা হেলেনার হূত্স্পন্দনকে আন্দোলিত করছে না, কেননা সে জেনে গেছে, নিজের কাছ থেকে চিরতরে নির্বাসিত হলেও বেঁচে থাকার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নয়।

অলঙ্করণ: জেন আর্ট অবলম্বনে