১৮৮৩ সালে কার্ল
মার্ক্সের মৃত্যুর
সময় তার
কিছু লেখাপত্র
অপ্রকাশিত রয়ে
গিয়েছিল। তার
মধ্যে বাঙালির
জন্য বিশেষভাবে
কৌতূহলোদ্দীপক একটি
অংশ রয়েছে।
সেটি পাওয়া
যায় তার
দি এথনোলজিকাল
নোটবুকসে। জীবনের
প্রায় শেষ
সময়ে এসে
এ নোটবই
তৈরি করেছিলেন
তিনি। সময়কালটা
১৮৮০-৮২।
১৯৭৪ সালে
লরেন্স ক্রেডারের
সম্পাদনা ও
ভূমিকায় প্রকাশিত
হয় দি এথনোলজিক্যাল নোটবুকস অব
কার্ল মার্ক্স। এ
নোটবইতে মার্ক্স
হেনরি মর্গানের
এনসিয়েন্ট
সোসাইটি,
জন বাড
ফিয়ারের দি এরিয়ান
ভিলেজ,
হেনরি সামনার
মেইনের লেকচার্স অন
দি আর্লি
হিস্ট্রি অব
ইনস্টিটিউশনস
ও জন
লাবকের দি অরিজিন
অব সিভিলাইজেশন গ্রন্থ
থেকে বিভিন্ন
অংশ টুকে
নিয়েছেন এবং
সেখানে নিজের
মন্তব্য যুক্ত
করেছেন। বাংলাভাষীরা
এখানে বিশেষভাবে
আগ্রহী হবেন
জন বাড
ফিয়ারের দি
এরিয়ান ভিলেজ
অংশটি নিয়ে,
কারণ এখানে
মার্ক্স বাংলার
গ্রাম, তার
সমাজ-অর্থনৈতিক
জীবন নিয়ে
অনুসন্ধান করেছেন।
উল্লেখ্য, জন
বাড ফিয়ার
ছিলেন ব্রিটিশ
ঔপনিবেশিক প্রশাসনের
একজন বিচারক।
তিনি সেকালের
পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন
এলাকায় দায়িত্ব
পালন করেছেন
এবং কাজ
করেছেন সিংহলেও।
মার্ক্স এই
ফিয়ারের যে
বইটি থেকে
নোট নিয়েছেন
তার নাম
‘দি
এরিয়ান ভিলেজ
ইন ইন্ডিয়া
অ্যান্ড সিলন’।
ঔপনিবেশিক ভারতকে
বিশ্লেষণ করতে
গিয়ে মার্ক্স
শুরু থেকেই
ভারতের গ্রামের
প্রতি মনোযোগী
ছিলেন। এর
প্রমাণ পাওয়া
যায় ১৮৫৩
সালে প্রকাশিত
তার ভারতে ব্রিটিশ শাসন
শীর্ষক নিবন্ধে।
সেখানে তিনি
গ্রাম-গোষ্ঠীগুলোকে
প্রাচ্য স্বৈরাচারের
ভিত্তি হিসেবে
মূল্যায়ন করেছিলেন।
অবশ্য পরবর্তীতে
মার্ক্সের ধারণায়
পরিবর্তন এসেছিল।
ইতিহাসবিদ, নৃতাত্ত্বিক
পার্থ চট্টোপাধ্যায়
লিখেছেন, ‘পরবর্তী
তিরিশ বছরে
মার্ক্স-এর
নিজস্ব ইতিহাসতত্ত্ব
যতই পরিশীলিত
হয়েছে আর
অন্য দিকে
ভারতবর্ষের ইতিহাস
ও সমাজব্যবস্থার
সঙ্গে তার
পরিচয়ও যত
গভীর হয়েছে,
ততই কিন্তু
ঔপনিবেশিক শাসনের
পুনরুজ্জীবক ভূমিকার
কথা প্রায়
সম্পূর্ণ মুছে
গেছে তার
চিন্তা থেকে।
অত্যন্ত স্পষ্টভাবে
তিনি দেখেছেন,
ব্রিটিশ শাসন
একদিকে ভারতের
নিজস্ব সমাজকাঠামোকে
ভেঙে তছনছ
করে দিচ্ছে,
কিন্তু পরিবর্তে
কোনও বৈপ্লবিক
গতিশীলতার সৃষ্টি
হচ্ছে না।
আধুনিক ইউরোপের
পুঁজিবাদী রীতিনীতি,
কলাকৌশল, রাষ্ট্রীয়
গঠনপ্রক্রিয়া, আইনকানুন,
ধ্যানধারণা সেখানে
চাপিয়ে দেওয়া
হচ্ছে বটে,
কিন্তু দেশজ
সমাজপ্রক্রিয়ার সংমিশ্রণে
তা এক
উদ্ভট চেহারা
নিচ্ছে। ফলে
ঔপনিবেশিক স্বার্থে
ভারতবর্ষের মানুষের
ওপর শোষণের
চাপ ক্রমেই
বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কিন্তু অন্য
দিকে কোনও
অগ্রসর সমাজব্যবস্থার
ভিত রচিত
হচ্ছে না।’
নৃতত্ত্বের নোটবইতে মার্ক্স
যে অংশে
ফিয়ারের বই
নিয়ে কাজ
করেছেন তার
ভাষাটি একটু
অদ্ভুত, কিছুটা
অগোছালো। বাক্যগুলো
প্রায় সবই
আধা জার্মান
এবং আধা
ইংরেজি ভাষায়
লেখা। বলা
বাহুল্য যে
ফিয়ারের মূল
লেখাটি পরিষ্কার
ইংরেজিতে। মার্ক্স
ফিয়ারের বই
থেকে যেসব
অংশ নোট
নিয়েছেন তার
অনেক লাইনের
নিচে আবার
নিজে আন্ডারলাইন
করেছেন। দি
এথনোলজিক্যাল নোটবুকস
অব কার্ল
মার্ক্স থেকে
ফিয়ারের অংশটি
পার্থ চট্টোপাধ্যায়
বাংলা ভাষায়
ভূমিকাসহ অনুবাদ
করেছেন অনেক
বছর আগে,
সেই ১৯৮৭
সালে। পার্থ
চট্টোপাধ্যায়ের বাংলার গ্রাম-সমাজ প্রসঙ্গে কার্ল মার্ক্স—শিরোনামের
লেখায় এ
অনুবাদ পাওয়া
যায়, যা
পরবর্তী সময়ে
তার ইতিহাসের উত্তরাধিকার গ্রন্থে
সংকলিত হয়েছে।
বহু বাংলাভাষী
পাঠকই লেখাটি
পড়েছেন। বর্তমান
লেখায় তাই
ফিয়ারের মূল
বইটিকে একটু
পাতা উল্টে
দেখার চেষ্টা
করা হয়েছে।
স্যার জন
বাড ফিয়ারের
‘দি
এরিয়ান ভিলেজ
ইন ইন্ডিয়া
অ্যান্ড সিলন’
গ্রন্থটি প্রকাশিত
হয় লন্ডনে
১৮৮০ সালে।
অর্থাৎ বইটি
প্রকাশের সঙ্গে
সঙ্গে কার্ল
মার্ক্সের দৃষ্টি
আকর্ষণ করেছিল
এবং তিনি
বইটি থেকে
নোট নিচ্ছিলেন।
বইটি তিনটি
ভাগে বিভক্ত—মডার্ন
ভিলেজ লাইফ
ইন বেঙ্গল,
দি এগ্রিকালচারাল
কমিউনিটি ইন
সিলন ও
ইভল্যুশন অব
দি ইন্দো-এরিয়ান
সোস্যাল অ্যান্ড
ল্যান্ড সিস্টেম।
মডার্ন ভিলেজ
লাইফ ইন
বেঙ্গল অংশটি
প্রথম প্রকাশিত
হয়েছিল ১৮৬৪
সালে ক্যালকাটা রিভিউতে।
বাংলার গ্রামগুলোর
গঠন বিচ্ছিন্ন
প্রকৃতির মনে
হয়েছে ফিয়ারের
কাছে এবং
এগুলো যে
অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ
সেটাও তিনি
উল্লেখ করেছেন।
এখানে যোগাযোগ
ব্যবস্থা যে
খুবই দুর্বল
সেটা তার
নজর এড়ায়নি।
তিনি বলেছেন,
মালামাল পরিবহন
হয় মূলত
মানুষের মাথায়,
নৌকায় নয়তো
গরুর গাড়িতে।
একটু অবস্থাপন্নরা
চলাচল করে
পালকি নয়তো
নৌকায়।
গ্রামের স্থানীয়
উৎপাদনের বাণিজ্যকেন্দ্র
হচ্ছে বড়
হাট। এগুলো
সাধারণত রাস্তা
বা খালের
পাড়ে বসে।
গ্রামীণ সমাজে
সংঘটিত অপরাধের
বেশ লম্বা
বিবরণ দিয়েছেন
ফিয়ার। গ্রামে
সাধারণ অপরাধটি
হচ্ছে ডাকাতি।
সাধারণত গ্রামে
কেউ ধনসম্পদের
মালিক হয়ে
উঠেছে এমন
খবর চাউর
হলেই তার
ডাকাতদের কবলে
পড়ার আশঙ্কা
বেড়ে যেত।
ডাকাতির জন্য
অপরাধীরা বেছে
নিত ঝড়
কিংবা অমাবস্যার
রাত। তারা
সবাই মুখোশ
বা অন্য
কিছু দিয়ে
মুখ ঢেকে
নিত। অস্ত্র
হিসেবে নিত
লাঠি এবং
অদ্ভুত দর্শন
তলোয়ার। মাটির
বা অন্য
কোনো বেড়ার
দেয়াল কাটার
জন্যও হাতিয়ার
নেয়া হতো।
ডাকাতির কাজটা
তারা খুব
দ্রুত সারতে
চেষ্টা করত
নয়তো গ্রামবাসীদের
হাতে আটক
হওয়ার সম্ভাবনা
থাকত। এরা
অনেক সময়
ঘরে মেঝে
খুঁড়ত মূল্যবান
জিনিসের সন্ধানে।
বাড়ির কর্তাকে
নানা রকম
অত্যাচার করে
তারা লুকিয়ে
রাখা সম্পদের
হদিস বের
করার চেষ্টা
করত। ফিয়ারের
মতে, গ্রামের
এসব ডাকাতকে
পুলিশ নাগাল
পেত না।
তাই অলস,
সাহসী মানুষরা
এ লাভজনক
কাজে আগ্রহী
হয়ে উঠত।
পরিবারের সম্মান
রক্ষায় খুনোখুনির
ঘটনাও বাংলার
গ্রামগুলোয় ঘটতে
দেখা যেত।
গ্রামে ধনী
হিন্দুদের অনেকে
পাকা বাড়ি
ছিল। ধার্মিক
হিন্দুদের জীবন
ছিল বেশ
শৃঙ্খলাবদ্ধ। ঘুম
থেকে ওঠা,
পূজা-অর্চনা,
গোসল—সবকিছুই
ছিল নিয়মমাফিক।
তবে ব্রাহ্মণ
নন এমন
ভদ্রলোক হিন্দুরা
অবশ্য এত
সময়, নিয়মের
ধার ধারতেন
না। বাঙালি
ভদ্রলোক তার
দৈনন্দির ব্যবসার
কাজকর্ম বৈঠকখানায়
বসে সকালবেলাতেই
সেরে নিতেন।
আর তাদের
স্ত্রীরা ব্যস্ত
থাকতেন রান্নাঘরে।
মোটামুটি দুপুর
১২টা পর্যন্ত
বৈঠকখানায় চলত
কাজকর্ম, আড্ডা।
কৃষকদের দৈনন্দিন
জীবন অবশ্য
এ ভদ্রলোকদের
চেয়ে একেবারে
ভিন্ন ছিল।
তারা ক্ষেতের
কাজে, নয়তো
পশু পালনে
ব্যস্ত থাকত।
তবে উভয়
শ্রেণীর নারীদের
কাজের ধরন
একই রকম
ছিল। তারা
রান্নাঘরে স্বামী
ও পরিবারের
সদস্যদের জন্য
খাবার প্রস্তুত
করতে ব্যস্ত
থাকতেন এবং
তারা খাবার
খেতেন অন্য
সবার খাওয়ার
পর। গ্রামের
মানুষের খাবার
বলতে মূলত
ভাত, ডাল
ও সবজি।
মাঝেমধ্যে খাদ্যতালিকায়
যুক্ত হতো
মাছ ও
দুধ।
দিনের কাজকর্ম
শেষ করে
সাধারণ মানুষ
তাদের ঘরের
বারান্দায় নয়তো
এলাকার বড়
কোনো গাছের
তলায় জমা
হয়ে সারাদিনের
সুখ-দুঃখের
আলাপ করত।
গ্রামীণ সমাজের
এসব নিত্যদিনের
নানা বিষয়
বর্ণনার সঙ্গে
সঙ্গে বাড
ফিয়ার গ্রামে
সম্পত্তির মালিকানার
ধরন, জমিদার-মহাজন,
ধর্মচর্চাসহ বিভিন্ন
বিষয়ে নিজের
পর্যবেক্ষণ ও
মন্তব্য লিখেছেন।
কার্ল মার্ক্সের
নোটবইতেও এসব
অধ্যায়ের প্রাধান্য
দেখা যায়।
এসএম রশিদ: লেখক





