হিমালয় থেকে বয়ে আনা উর্বর পলি দিয়ে আদিকালে গঙ্গা নদীর মোহনায় যে বদ্বীপ গড়ে উঠেছিল, সে দেশে বসতি গড়ে উঠেছিল নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের। এখানে জীবন সহজ। এখানকার উর্বর মাটিতে অনায়াসে ফসল ফলে, এখানকার আবহাওয়া বৈচিত্র্যময়, কিন্তু অসহ্য নয়। মরু কিংবা মেরু অঞ্চলের মতো বিশেষ পোশাকের প্রয়োজন হয় না। মানুষ যখন কেবল প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ দিয়ে জীবনধারণ করত, তখন এ দেশের তুল্য আর কোনো দেশ ছিল না। উর্বর দেশ বলে যুগে যুগে বহু দেশ থেকে এখানে অভিবাসীরা এসে ঘর বেঁধেছে, সংসার পেতেছে। এদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ এটি। সমভূমির যে বাসিন্দারা আজ বাঙালি বলে পরিচিত তাদের প্রায় সবাই অভিবাসী মিশ্র সংস্কৃতির আগন্তুক।

বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় যতই থাকুক, প্রতিটি মানুষের সঙ্গে একটা ধর্মীয় পরিচয়ও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকত। আদিতে এ অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবই পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে গেছে। সে প্রতিযোগিতা সর্বক্ষেত্রে অহিংস ছিল না। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলায় মুসলমান শাসকের আগমন শুরু। সে আগমনও অহিংস ছিল না। বর্তমানে আমাদের অধিকাংশ লিখিত এবং জ্ঞাত ইতিহাস মুসলমান আমলের সূচনালগ্ন থেকে শুরু। সে ইতিহাস থেকে আমরা জানি, এখানে বিজয়ী পশ্চিমা শাসকের আগমনের পর থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার একটা জোয়ার শুরু হয়েছিল। তার কারণগুলো নিয়ে বহুধাবিভক্ত বিতর্ক রয়েছে। সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলাদেশে ইসলামের প্রসার সম্পর্কে ১২৮৭ বঙ্গাব্দে বঙ্গদর্শনে যে মন্তব্য করেন তা এ যুগেও প্রাসঙ্গিক, ‘এখন ত দেখিতে পাই, বাঙ্গালার অর্দ্ধেক লোক মুসলমান। ইহার অধিকাংশই যে ভিন্নদেশ হইতে আগত মুসলমানদের সন্তান নয়, তাহা সহজেই বুঝা যায়। কেননা ইহার অধিকাংশই নিম্ন শ্রেণীর লোক—কৃষিজীবী। রাজার বংশাবলী কৃষিজীবী হইবে আর প্রজার বংশাবলী উচ্চ শ্রেণী হইবে ইহা অসম্ভব। দ্বিতীয় অল্পসংখ্যক রাজানুচর এত অল্প সময়ের এত বিস্তৃতি লাভ করিবে, ইহাও অসম্ভব। অতএব দেশীয় লোকেরা যে স্বধর্ম ত্যাগ করিয়া মুসলমান হইয়াছে, ইহাই সিদ্ধ।’

বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে দ্বিমত করার অবকাশ তেমন নেই। কিন্তু সেই ধর্মান্তরিত হওয়ার যুগটা ঠিক কখন শুরু হয়েছিল? বখতিয়ার খিলজি যখন ঘোড়সওয়ার নিয়ে বাংলায় এসে উপস্থিত হলেন তখন থেকে, নাকি তারও আগে? সেই প্রশ্নটির উত্তর সহজ নয়। কেননা বখতিয়ার খিলজির আরো কয়েকশো বছর আগে সুফি দরবেশ বায়েজিদ বোস্তামী চট্টগ্রামে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। যদিও অষ্টম শতকে বাংলায় মুসলমানের অস্তিত্ব ছিল কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে। কিন্তু চট্টগ্রামের সঙ্গে আরবদের বাণিজ্য যোগাযোগ ছিল খ্রিস্টপূর্ব যুগে ইসলাম ধর্মের জন্মের আগে থেকেই। সেই যোগাযোগ সূত্রে বায়েজিদ বোস্তামী কিংবা অন্যান্য পীর ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে এসে থাকতে পারেন।

জনসংখ্যার বড় একটা অংশ ধর্মান্তরিত হওয়ার পরেও যে বিষয়টি লক্ষ করার মতো তা হলো ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের পর মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয় খুব বেশি বদলায়নি। মানুষ তার পূর্বপুরুষের সংস্কৃতিকে ধারণ করে রেখেছিল। এদেশে এখন পর্যন্ত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে সবকিছুতে পূর্বপুরুষের ধর্মের প্রভাব, যা আদতে যত না ধর্ম তার চেয়ে বেশি সংস্কৃতি। যে কারণে উপমহাদেশের বিয়ের সংস্কৃতি কিংবা মৃত্যু-পরবর্তী আচারগুলো আরব দেশের চেয়ে ভারতবর্ষের সঙ্গে মেলে বেশি।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও গবেষক সুশীল চৌধুরী একবার খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী সাঁওতাল পল্লীতে ভ্রমণ করার সময় দেখতে পেলেন তারা দেবতার উদ্দেশ্যে একটা মোরগ বলি দিচ্ছে। দেখে তিনি জানতে চাইলেন খ্রিস্টান হয়ে তারা কেন এ আচার পালন করছেন। জবাবে সেই সাঁওতাল বলেছিল—‘আমরা খেরেস্টান হতে পারি কিন্তু আমার পূর্বপুরুষের ধর্ম তো ভুলে যেতে পারি না।’ এটা ছোট্ট একটা উদাহরণ, কিন্তু এ দেশে পূর্বপুরুষের সংস্কৃতি ধারণ করে রাখার এমন চিত্র খুব সুলভ।

মধ্যযুগের বাংলায় বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে কোনো ঐক্য না থাকলেও ধর্মই ছিল সমাজজীবনের একটি চালিকাশক্তি। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে এ দেশে বেশকিছু ধর্ম ও সম্প্রদায় একই সঙ্গে বেড়ে উঠেছিল। পরোক্ষভাবে এখানে ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন আসছিল। মুসলিম সুফি, বৈষ্ণব সহজিয়া ও শাক্তদের আচার ব্যবস্থার মধ্যে অনেক মিল দেখা যায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে সহজিয়া বৈষ্ণববাদ, মুসলিম সুফিবাদ ও শাক্ত-তান্ত্রিকদের কুলাচার আচার-আচরণ ও বিশ্বাসের দিক অনেক ক্ষেত্রেই খুবই কাছাকাছি চলে আসে। বাংলায় সুফিবাদ, বৈষ্ণববাদ, শৈব ও বৌদ্ধ-তান্ত্রিক ধারণার সংমিশ্রণে নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠীতে নতুন নতুন সাধনার বিকাশ ঘটে। এসব সমন্বয়বাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কর্তাভজা ও বাউল সম্প্রদায়। কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রবর্তক আওল চাঁদ (১৬৮৬-১৭৭৬) সপ্তদশ শতাব্দীতে সক্রিয় ছিলেন। বাউল সম্প্রদায় অবশ্য অনেক পুরনো। পঞ্চদশ শতাব্দীতে শাহ মোহাম্মদ সগীরের ইউসুফ-জোলেখা গ্রন্থেও বাউল শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। তবে এসব মতবাদ মূল জনগোষ্ঠীকে প্রভাবান্বিত করেনি। বাউল ও কর্তাভজা মতবাদ বাংলার কোনো কোনো অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে।

বাংলার ধর্ম ও সংস্কৃতিতে সুফিবাদের প্রভাব সম্পর্কে ঐতিহাসিক অসীম রায় যে ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন তা হলো বাংলায় ইসলাম ধর্ম প্রচারক পীর-আউলিয়াদের প্রকৃতি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের অনুরূপ প্রচারকদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মতে, বাংলার পীরদের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত বাংলার পীর বলতে শুধু আধ্যাত্মিক মুরশিদ বা ফকির-দরবেশ বোঝায় না। পীরদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে দেবতার পর্যায়ে উন্নীত সফল সেনাপতি, অনাবাদি এলাকার অগ্রণী বসতকার এবং রূপান্তরিত হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবতা। দ্বিতীয়ত বাংলায় পীরদের ভাবমূর্তি শুধু ইসলামী আদর্শে প্রভাবান্বিত হয়নি। পীরদের ভাবমূর্তি লৌকিক দেবতাদের আদলে গড়ে তোলা হয়। ব্যাঘ্র দেবতা, সর্প দেবী, কুমির দেবীর মতো দেবত্ব লাভকারী প্রাণীর আত্মাকে বাংলায় পীরের ক্ষমতার সঙ্গে একীভূত করা হয়।

নিয়ত পরিবর্তনশীল অশান্ত বদ্বীপের পরিবেশে যেখানে নদীভাঙন, বন্যা, প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক রুদ্ররোষ জীবনকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। এ পরিবেশে পীরেরা একটি বন্ধনকারী শক্তি হিসেবে মানুষের জীবনে শান্তির প্রলেপ নিয়ে আসেন। তাই মানুষ দলে দলে স্থানীয় পীরদের অনুসরণ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। বাংলার অধিকাংশ কিংবদন্তি পীরকে উপমহাদেশের অন্যান্য অংশেও সমভাবে ভক্তি-শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। উত্তর ভারতের মধ্যে মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পাঁচ পীরের পূজা সমভাবে জনপ্রিয়। মুসলমান বিশ্বের সর্বত্র খাজা খিজিরকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করা হয়। বাংলায় তিনি পীর বদর নামে পরিচিত। গাজী মিয়াকে বাংলায় বিয়ে-শাদি ও সন্তান ধারণের পীর হিসেবে শ্রদ্ধা করা হয়। উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবে গাজী মিয়াকে সমভাবে ভক্তি-শ্রদ্ধা করা হয়। বাংলায় প্রেমের পীর হচ্ছেন মনাই পীর, গরু-বাছুরের রক্ষক হচ্ছেন তিন নাথ, গ্রাম রক্ষাকারী হচ্ছেন মানিক পীর, বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন গাজী সাহেব এবং জানমালের হেফাজতকারী হচ্ছেন সত্যপীর। ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যেও একই ধরনের স্থানীয় পীরকে উপাসনা করা হয়েছে। সুফিবাদ এভাবেই প্রসার লাভ করেছিল উপমহাদেশে।

সুফিবাদের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ মাজার সংস্কৃতি। এদেশে পীর বা সাধকদের মাজারকে কেন্দ্র করে এক ধরনের বার্ষিক উৎসবের আয়োজন হয়। ওরশ নামে পরিচিত সে উৎসবের মধ্যে মেলার আয়োজন হয়, মেলা উপলক্ষে দূর-দূরান্ত থেকে নানা জাতের পণ্য নিয়ে হাজির হয় বিক্রেতারা। মেলায় বিকিকিনি হয়, গান বাজনা হয়, গরু-ছাগল জবাই করে খাওয়াদাওয়ার বিশাল আয়োজনও থাকে। পীরের মাজারে সিন্নি দেয়া, প্রদীপ জ্বালানো, মানত করা, এসব আচার সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির অনুকরণে সৃষ্ট। আরব দেশের কোথাও এ সংস্কৃতি নেই। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে এক বা একাধিক মাজারের অস্তিত্ব আছে, সে মাজারগুলো ধর্মীয় নেতারা নিয়ন্ত্রণ করলেও তাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ অবারিত। ওরশগুলো এতই উৎসবমুখর হয় যে নিজ নিজ গ্রামের মেয়েরা ওরশের উৎসবে যোগ দেয়ার জন্য বাপের বাড়িতে নাইয়র করতে যায়। বিশেষ করে চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে এ দৃশ্য খুবই স্বাভাবিক। মাজারকেন্দ্রিক এ সংস্কৃতি কেবল মুসলমানদের উৎসব নয়, এখানে সব ধর্মের মানুষ অংশ নেয়। এটা যতখানি ধর্মীয় উৎসব তার চেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক উৎসব। কট্টর ধার্মিকরা এ সংস্কৃতির বিরোধী হলেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ স্বতঃস্ফূর্ত। এ যেন গ্রাম-বাংলার একটা প্রাণের মেলা। বৈশাখী মেলার সঙ্গে এ মেলার সাদৃশ্যটা লক্ষণীয়।

মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু-মুসলমানদের একটা বোঝাপড়া হয়েছিল সুফিবাদের মাধ্যমে। বৈষ্ণবদের সঙ্গে সুফিদের মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেক গবেষক। তাদের একজন ড. এনামুল হক লিখেছেন, ‘...গোড়ীয় বৈষ্ণবদের এই “নামে রুচি জীবে দয়া” মুসলিম সুফি সাধকদের “জিকর” ও “খিদমৎ” নীতির নামান্তর... “কীর্তন” ও “সমা” এবং “দশা” ও “হাল” শব্দার্থ ভাব, সম্পাদনা ব্যবস্থা ও মানবিক অনুভূতির দিক হইতে একই বস্তুর অভিব্যক্তি। বিশেষত গোড়ীয় বৈষ্ণবদের “প্রেম”, সুফিদের “ইশক” “রাধা-কৃষ্ণ” সুফিদের “সাকী” ও “বুৎ” কিংবা শমআ ও পরওয়ানা, ঐশ্বর্য সুফিদের কিয়ামত ছাড়া কিছুই নহে। সুফিদের “গজলিয়াত” ও বৈষ্ণবদের “পদাবলী” ভাব ও রচনা উভয় হইতে অনেকখানি এক। সুফি সাহিত্যের “মৈয়” ও “শরাব” বৈষ্ণব পদাবলীতে প্রেম ও পীরিতি হইয়া দেখা দিয়াছে। সুফি সাহিত্যের “আশিক ও মাসুক” বৈষ্ণব পদাবলীর “রাধা ও কৃষ্ণ”। এই সাহিত্যের “হিজরান” ও “বিশাল” বৈষ্ণব পদাবলীর বিরহ ও মিলন।’

১৬২৯ সালে সেবাস্তিয়ান ম্যানরিক যখন বাংলায় এসেছিলেন, তখনো সেই সাংস্কৃতিক ঐক্যের দৃষ্টান্ত দেখেছিলেন। তিনি বলেছেন, কোনো কোনো মোগল শাসক বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে গঙ্গার জল সংগ্রহ করার নির্দেশ দিচ্ছে। গঙ্গার জল হিন্দুদের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত। রাজার অভিষেক উপলক্ষে পবিত্র হওয়ার জন্য গঙ্গা জলে স্নান করা আবশ্যক ছিল ভারতের প্রাচীনকাল থেকে। মোগল শাসকরাও সে প্রথা বহাল রেখেছিলেন। চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও মোগল শাসকরা ইউনানি চিকিৎসার চেয়ে ভারতীয় প্রাচীন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতিকে পছন্দ করতেন বেশি। সম্রাট জাহাঙ্গীর, আকবর কিংবা আওরঙ্গজেবের আমলেও তার নজির মেলে।

মোগল আমলে বাংলায় এ সাংস্কৃতিক ঐক্যের বেশ অগ্রগতি হয়। সে সময় থেকে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ধর্ম ও সংস্কৃতির এ বন্ধন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। দৈনন্দিন জীবনে মুসলমানরা হিন্দুদের কৃষ্টি গ্রহণ করে, হিন্দুরাও মুসলমানদের অনেক আচারকে গ্রহণ করে। ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করে সম্রাট বাবর বলেছিলেন, এটাই হলো আসল ভারতীয় জীবনধারা। সম্রাট আকবরের সময়ে সে ঐক্য চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। তবে এটাও ঠিক যে পাশাপাশি দুই ধর্মের একাংশ মসজিদ ও মন্দিরের অনুশাসনের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিল। দুই ধর্মেই পাশাপাশি দুটি ধারা অনুসরণ করেছে সাধারণ মানুষ। একটি কট্টর ধারা, অন্যটি জনপ্রিয় ধারা। স্বাভাবিকভাবেই জনপ্রিয় ধারাটি সবসময় এগিয়ে থেকেছে সমাজের সব আয়োজনে।

বাংলার সব মুসলমান একই ধরনের জীবনধারণ করেনি। সুফিবাদকে সবাই মেনে নেয়নি। অনেকে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতেও কড়াকড়িভাবে ধর্ম নির্দেশিত জীবনযাপন করেছে। বহিরাগত মুসলমানেরা এ ধরনের জীবনযাপন করত।

মধ্যযুগে আন্তঃধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে আরো অনেক দীর্ঘ গবেষণার অবকাশ আছে। তবু স্বল্প পরিসরে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে সুফিবাদ কিংবা পীরবাদ স্থানীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করেই সম্প্রসারিত হয়েছে সারা বাংলায়। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া রীতিনীতি এখানে প্রভাব বিস্তার করেনি। পীরের মুরিদ হওয়ার পেছনেও হিন্দু মুসলমান ভেদাভেদ ছিল না। নিজের ধর্ম পরিবর্তন না করেও পীরের মুরিদ হওয়া যেত। এটা ছিল বড় ধরনের আপস, যা সুফিবাদীরা সাফল্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে। বাংলার মিশ্র সাংস্কৃতিক আচার ব্যবস্থা যেমন তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, তেমনি ধর্ম এসেও সেসব আচারের ওপর খবরদারিত্ব চালায়নি। সুফিবাদের এ সহনশীল অবস্থানের কারণে বাংলায় ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে একটা সাংস্কৃতিক ঐক্যের জন্ম হয়েছিল কয়েক শতাব্দী আগেই। ধর্ম ও সংস্কৃতির শান্তিপূর্ণ অবস্থানের সে ধারাটি এখনো অনেকটা বহাল আছে।

 

হারুন রশীদ: সভ্যতা ও ইতিহাস

অনুসন্ধানী লেখক