১৮১২ সালে ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানির
কার্যক্রম নিয়ে
সিলেক্ট কমিটির
দাখিল করা
পঞ্চম প্রতিবেদনে
ভারতীয় গ্রামকে
বর্ণনা করা
হয়েছে সামাজিক
সংগঠনের মৌল
একক হিসেবে,
যা বিভিন্নভাবে
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা
হস্তান্তরের পরও
অখণ্ড সার্বভৌম
হিসেবে বিরাজ
করে। ১৮৩২
সালে চার্লস
মেটকাফ ভারতীয়
গ্রাম সম্পর্কে
তার বিখ্যাত
উক্তিটি করেন—গ্রাম
সম্প্রদায় হচ্ছে
ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্র
বা ‘লিটল
রিপাবলিক’।
স্যার চার্লস
মেটকাফের মন্তব্য
হঠাৎ দেখা
পর্যটকের মন্তব্য
নয়। তিনি
কর্তৃত্ব নিয়ে
অনুসন্ধানী গবেষকের
মতো এ
কথা বলেছেন।
তার জন্ম
কলকাতায় ৩০
জানুয়ারি ১৭৮৫।
তার বাবা
ভারতে এসেছেন
১৭৬৭ সালে
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির ক্যাডেট
হিসেবে। মাদ্রাজের
ফোর্ট সেন্ট
জর্জের ব্যবসায়ী
জন ডেবনেয়ারের
কন্যা সুসানাকে
তার বাবা
১৭৮২ সালে
কলকাতায়ই বিয়ে
করেন। বার্কশায়ারের
ইটন কলেজে
ম্যাট্রিকুলেশনের পর
১৬ বছর
বয়সে ভারতবর্ষে
যখন প্রত্যাবর্তন
করেন। তিনি
লিখেছেন, গ্রাম
সম্প্রদায় হচ্ছে
খুদে প্রজাতন্ত্র,
যা স্বয়ংসম্পূর্ণ
এবং যেখানে
সবই আছে।
একটার পর
একটা রাজবংশ
হুমড়ি খেয়ে
পড়েছে—হিন্দু,
পাঠান, মোগল,
মারাঠা, শিখ,
ইংরেজ একটার
পর একটা
প্রভু বদল
ঘটেছে—একটি
বিপ্লব এসে
অন্য বিপ্লবকে
পরাস্ত করেছে।
কিন্তু গ্রাম
যেমন ছিল
তেমনই রয়ে
গেছে। প্রজন্মের
পর প্রজন্ম
আসবে, বাবার
কাছ থেকে
ছেলে দায়িত্ব
নেবে, গ্রাম
তেমনি মাথা
উঁচু করা
প্রতিষ্ঠান হিসেবে
রয়ে যাবে।
স্যার চার্লস
মেইন ও
কার্ল মার্ক্স
চার্লস মেটকাফের
তত্ত্বকে আরো
সম্প্রসারিত করেছেন।
প্রাক-ব্রিটিশ
ভারতীয় তথা
বাংলার গ্রামের
স্বনির্ভরতার যে
চিত্র চার্লস
মেটকাফ এঁকেছেন
এবং এর
কতটা সত্য
আর কতটা
কল্পকথা সে
বিতর্ক রয়েই
গেছে। বাংলার
শাসকরা গ্রামবাংলার
মানুষের কাছ
থেকে আদায়
করে কী
পরিমাণ অর্থ
ও ধনদৌলত
দিল্লির শাসক
বা সম্রাটের
কাছে পাঠাতে
পারত সেটা
যদি বাংলার
বৈভবের মাপকাঠি
হয় তাহলে
খুদে প্রজাতন্ত্রের
নাগরিকরা কতটা
সন্তোষ প্রকাশ
করতে পারবে
তা বিতর্কের
বিষয়। কিন্তু
পুরনো দিনের
দলিল যখন
প্রমাণ দেয়,
এ খুদে
প্রজাতন্ত্রের নাগরিক
ক্ষুধার জ্বালায়
স্ত্রী, পুত্র
ও কন্যা
এবং কখনো
নিজেকেও বিক্রি
করে দিয়েছে
তখন গ্রামবাংলার
ঐশ্বর্যের যথার্থতা
নিয়ে প্রশ্ন
জাগবেই।
অধ্যাপক সিরাজুল
ইসলাম মনে
করেন, প্রশাসনের
ক্ষুদ্রতম ইউনিট
গ্রাম পর্যায়ে
স্বায়ত্তশাসন ও
আত্মনির্ভরতার যে
সাধারণ চিত্র
বিভিন্ন সময়ে
উঠে এসেছে
তা নিয়ে
পণ্ডিতদের মধ্যে
বিভেদ কম,
কিন্তু প্রশাসনিক
দিক দিয়ে
গাঙ্গেয় বদ্বীপ
এলাকার গ্রাম
ভারতের অন্য
অঞ্চলের মতো
নয়। তিনি
লিখেছেন, বদ্বীপ
এলাকায় গ্রামীণ
সমাজ গড়ে
ওঠার মতো
বৃহদায়তন হওয়ার
আগেই গ্রামগুলো
ভেঙে যায়
এবং চাষাবাদ
এলাকায় গড়ে
ওঠে নতুন
বসতি। সেকালের
পূর্ববঙ্গের জেলাগুলোয়
গ্রামীণ বসতি
ও গ্রামীণ
সমাজের পৃথক
বৈশিষ্ট্যের কারণে
কেন্দ্রীয় সরকার
বাধ্য হয়ে
গ্রাম পর্যায়ে
কর্মকর্তা নিয়োগ
করত, যাতে
তারা রাজস্ব
বিলি ব্যবস্থা
এবং রাজস্ব
সংগ্রহের প্রচলিত
পদ্ধতিতে কাজ
চালিয়ে যেতে
পারে। এভাবে
বাংলাদেশে মধ্যযুগীয়
গ্রামে আমরা
পাটোয়ারি, কানুনগো,
তরফদার, মাজমুয়াদার,
ওয়াদ্দাদার, কুটকিদ্দার,
মেজওয়াল প্রভৃতি
সরকারি কর্মচারীদের
অবস্থান দেখতে
পাই।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের
আগে দীর্ঘ
সময় এ
ধরনের ব্যবস্থাই
বহাল ছিল,
কিন্তু ১৭৯৩-এর
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
এই প্রশাসনিক
ও রাজস্ব
কাঠামো ভেঙে
দিয়ে রায়তকে
রাষ্ট্রের কাছ
থেকে বিচ্ছিন্ন
করে জমিদারের
কাছে ন্যস্ত
করে।
মধ্যযুগে যে
শক্তিশালী ও
সার্বভৌম গ্রাম
পরিষদের শাসনের
কথা বলা
হচ্ছে, তা
ভারতের অনেক
স্থানে বহাল
থাকলেও বাংলার
গ্রাম পরিষদ
কিংবা বহু
শতাব্দী আগে
থেকে প্রচলিত
হয়ে আসা
পঞ্চায়েত বাংলার
গ্রামে কতটা
কার্যকর ছিল,
তা নিয়ে
সন্দিহান হওয়ার
সুযোগ রয়ে
যায়। তবে
এটা স্বীকার্য,
রুশো যে
সোস্যাল কন্ট্র্যাক্টের
ধারণা দিয়েছেন,
সে ধরনের
অলিখিত সামাজিক
চুক্তি তখনকার
মানুষকে সহিংস
হতে দেয়নি।
গ্রামবাংলায় হিন্দু ও মুসলমান
রালফ
ফিচ (১৫৫০-১৬১১)
কম আলোচিত
পরিব্রাজকদের একজন।
১৮৮৫-৮৬
সালে আগ্রা
থেকে গঙ্গা-যমুনা
হয়ে বঙ্গদেশে
পৌঁছতে তার
পাঁচ বছর
লেগে যায়।
তিনি বাংলার
গ্রামে ১০
বছরের কম
বয়সী বালক-বালিকার
বিয়ে দেখেছেন।
বাংলায় তিনি
অনেক হাট
দেখেছেন, বৃহৎ
নৌকা দেখেছেন,
প্রচুর ভার
বহন করতে
সক্ষম ২৪
কিংবা ২৬
দাঁড়ের নৌকা,
নৌকায় আচ্ছাদন
থাকে না।
তাদের ঘরের
কাছে কূপ
থাকলেও তারা
গঙ্গা থেকে
পানি আনে
এবং সে
পানি পবিত্র
মনে করে।
যদি পান
করার মতো
পর্যাপ্ত পানি
না থাকে
তাহলে অন্য
পানির ওপর
গঙ্গার পানি
ছিটিয়ে তা
শুদ্ধ ও
পবিত্র করে
পান করে।
ফিচের বর্ণনায়
মুসলমানের তেমন
উপস্থিতি নেই।
জেমস ওয়াইজের
নোটস
অন দ্য
রেসেস কাস্টম
অ্যান্ড ট্রেডস
অব ইস্টার্ন বেঙ্গল
ঊনবিংশ শতাব্দীতে
লিখিত হলেও
তিনি বাংলার
গ্রাম ও
শহরের মানুষের
যে বিবরণ
দিয়েছেন তা
বিগত শতবর্ষগুলোরই
বর্ধিত অংশ।
তার বর্ণনা
অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
এমনকি প্রাক-ব্রিটিশ
যুগের এ
মানুষগুলোর পূর্বপুরুষেরাই
একই ধরনের
বা কাছাকাছি
কোনো পেশায়
নিয়োজিত ছিলেন।
জেমস ওয়াইজের
বিশ্লেষণ থেকে
জানা যায়,
বঙ্গদেশ পর্যন্ত
যোগাযোগ ব্যবস্থা
এতই খারাপ
ছিল যে
তা আক্রমণকারীদের
কেউ এদিকে
আসতে উৎসাহিত
হতো না,
এমনকি বঙ্গদেশে
যাত্রার নির্দেশকে
মনে করা
হতো নির্বাসনের
শামিল। বাংলার
শাসকরা যতটা
সম্ভব লুণ্ঠন
করে দিল্লি
ও আগ্রায়
বিলাসী জীবন
যাপন করতেন।
গ্রামীণ সমাজে
প্রবল ব্রাহ্মণ্যবাদী
শাসন ও
নিপীড়ন ছিল।
মুসলমানদের আগমন
নিপীড়িত হিন্দুদের
জন্য আশীর্বাদ
হয়ে দেখা
দেয়। বর্ণ
প্রথার শোষণ
থেকে মুক্তি
পেতে তারা
দলে দলে
ইসলাম ধর্ম
গ্রহণ করে।
জেমস ওয়াইজ
লিখেছেন (ফওজুল
করিমের অনুবাদ):
বাংলায় তখন
দুঃশাসন ও
দুর্ভোগের কাল।
দুঃখকষ্টের হাত
থেকে রেহাই
পাওয়ার অন্যতম
উপায় ছিল
ক্রীতদাস হওয়া।
হিন্দুদের মধ্যে
অনেকেই তাই
বাধ্য হয়ে
ক্রীতদাস হয়ে
গিয়েছিল। বঙ্গদেশে
ক্রীতদাস প্রথাকে
রীতিমতো উৎসাহিত
করা হতো
এবং ছলে
বলে কৌশলে
ক্রীতদাস বানানো
হতো। অসমিয়া
ও মগদের
হামলা, রোগ,
মহামারী ও
গৃহযুদ্ধের ফলে
দারিদ্র্যপীড়িত নির্যাতিত
অতিষ্ঠ মানুষ
নিজেদের সন্তানসন্ততিদের
বিক্রি করে
দিত মুসলমান
ক্রীতদাস হিসেবে।
এদের সঙ্গে
সদাচার করা
হতো এবং
তারা বসবাস
করত মর্যাদার
সঙ্গে। তারা
বিয়ের অনুমতি
লাভ করত
এবং তাদের
পরিবারবর্গ থাকত
প্রভুর আশ্রয়ে
এবং এভাবে
বাড়ত মুসলমানদের
সংখ্যা।
ধর্মান্তরে বল
প্রয়োগের কিংবা
কর বাড়িয়ে
কৌশল প্রয়োগের
ঘটনাও ঘটানো
হয়েছে। বিভিন্ন
দণ্ডনীয় অপরাধে
অভিযুক্তরা মুসলমান
হয়ে রক্ষা
পেতে চেষ্টা
করেছে। জাতচ্যুত
হিন্দুদের একমাত্র
আশ্রয়স্থল ইসলাম।
ফলে বাংলার
গ্রামীণ সমাজে
নিম্নবর্ণ হিন্দুদের
প্রতিবাদ ও
প্রথাবিরোধী কার্যক্রম
বেড়ে যায়।
জেমস ওয়াইজ
আদমশুমারির পরিসংখ্যান
বিশ্লেষণ করে
দেখিয়েছেন, ভিন্ন
স্থান থেকে
দলে দলে
মুসলমান এসে
বাংলায় মুসলমানের
সংখ্যা বৃদ্ধি
করেনি। মানবেতর
জীবনযাপন থেকে
মুক্তি পেতে
মুসলমান হয়েছে।
জেমস ওয়াইজ দেখিয়েছেন, বঙ্গদেশের মুসলমানরা মোগল-পাঠানের বংশোদ্ভূত নয়। তারা হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত। উপরন্তু আমরা এখনই যদি গ্রামের একদল মানুষকে নিরীক্ষণ করি তাহলে দেখা যাবে তাদের দেহাকৃতি, শরীর ও গায়ের রঙ মোটামুটি একই রকম—চুল, দাড়ি, পোশাকের তারতম্য স্বীকার করে নিলে তাদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমানের পার্থক্য নির্ণয় করা দুরূহ। ৫০ জন হিন্দু ও ৫০ জন মুসলমান কয়েদির ওপর চালানো একটি সমীক্ষা তুলে ধরে জেমস ওয়াইজ তার বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করেছেন।
হিন্দুদের বর্ণবিভেদের
মতো প্রকট
না হলেও
মুসলমানদের মধ্যে
শিয়া ও
সুন্নির বিভেদ,
বিভিন্ন মাজহাবের
বিভেদ, আভিজাত্য
ও তরিকার
বিভেদ ছিল:
তাদের মধ্যেও
বিভিন্ন ধরনের
কুসংস্কার ছিল।
তবে পীর
বদর, পীর
গাজি প্রমুখ
মুসলমান মানবতাবাদী
পীর হিন্দু-মুসলমান
উভয়েরই শ্রদ্ধার
পাত্র ছিলেন।
জেমস ওয়াইজ
পঞ্চায়েত বিচার
ব্যবস্থার প্রশংসা
করেছেন এবং
বলেছেন, এতে
ব্যক্তি ও
শ্রেণীস্বার্থের চেয়ে
সামাজিক স্বার্থের
দিকেই পরিচালনা
করা হতো।
গ্রামবাংলার কৃষকদের
সম্পর্কে জেমস
ওয়াইজের বিবেচনা
প্রতিধানযোগ্য—‘অধিকাংশই
সরল নিরক্ষর
কৃষক; কিন্তু
স্বার্থে টান
লাগলে কৃষক
মামলা করতে
দ্বিধা করেন
না। সহজে
তাকে জমিদারের
বিরুদ্ধে প্ররোচিত
করা যায়।
পূর্ববঙ্গের কৃষক
পরিশ্রমী ও
সংযমী। স্ত্রীকে
সে মনে
করে ক্রীতদাসী।
কুমতলবে কখনো
তাকে ব্যবহার
করে না।
সন্তানসন্ততির প্রতি
স্নেহবৎসল। গ্রামে
নবাগত বা
আগন্তুকদের প্রতি
সে সন্দেহপ্রবণ।’
তিনি আরো
লিখেছেন, ‘পূর্ববঙ্গের
রায়তের চরিত্রের
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
দিক হচ্ছে
তার দয়ালু
প্রকৃতি ও
মুক্তহস্ত দান-খয়রাত।
ভিক্ষুককে সে
ভিক্ষাদান করে
এবং কেউ
যদি এক
বেলা খেতে
চায় কখনো
তাকে বিমুখ
করে না।
কেউ এক
রাত থাকতে
চাইলেও সহজে
বিমুখ করে
না। জাতীয়
চরিত্রের এই
দুর্বলতার জন্যই
বোধ হয়
ভিক্ষুকের অভাব
নেই বাংলায়।
ভিক্ষুকেরা ঘুরে
বেড়ায় এক
বাড়ি থেকে
আরেক বাড়ি।
থাকা-খাওয়ার
একটা ব্যবস্থা
হয়েই যায়।’
মমতাজুর রহমান
তরফদারের ‘হোসেন
শাহী আমলে
বাংলা’ (১৪৯৪-১৫৩৮)
থেকে বাংলার
গ্রামের একটি
বর্ণনা উপস্থাপন
করা হয়েছে:
গ্রামের বসতিগুলোতে
বাসস্থান ছাড়াও
সড়ক ও
পায়ে চলা
পথ, স্নানের
ঘাটসহ পুকুর
থাকত, যা
জনসাধারণের জন্য
জল সরবরাহ
করত, জঙ্গল
যা চারণভূমির
কাজ করত
এবং খালও
ছিল, যা
ছিল গ্রামের
এক ধরনের
জল নিষ্কাশন
ব্যবস্থা। আবাদি
ও পতিত
জমি ছিল।
জনসংখ্যার নিয়মিত
ও মন্থর
বৃদ্ধির সঙ্গে
সঙ্গে শেষোক্ত
জমিকে চাষের
আওতায় আনা
হতো।
শ্রীনাথ আচার্য
চূড়ামণি থেকে
উদ্ধৃত করেন
তিনি: গ্রাম
এলাকায় উর্বর
জমি চারণক্ষেত্র,
ধর্মীয় বলিদানের
স্থান, বাজার,
হ্রদ, অনুর্বর
জমি, চৌমাথা
এবং শবদাহের
স্থান ছিল—গ্রামে
জমি ব্যবহারের
শ্রেণীবিন্যাস গ্রামবাসীর
প্রয়োজনেই করা
হতো।
হোসেন শাহী
আমলে গ্রামীণ
বসতি ছিল
বসবাসের মোটামুটি
স্বয়ংসম্পূর্ণ একক।
কৃষক তেমন
কোনো অসুবিধার
সম্মুখীন না
হয়েই তার
উদ্বৃত্ত ফসল
স্থানীয় বাজারে
নুন-তেল-কাপড়
ও জীবনধারণের
অন্যান্য প্রয়োজনীয়
দ্রব্যের সঙ্গে
বিনিময় করতে
পারতেন। সুতরাং
প্রধানত জমি
ও এর
ফসলের ওপর
নির্ভরশীল বলে
গ্রামে সীমিত
পরিমাণ ব্যবসা-বাণিজ্য
ছিল।
রমেশচন্দ্র মজুমদার
মনে করেন,
কিছু পরিমাণ
ব্যবসা-বাণিজ্যের
প্রচলন থাকলেও
গ্রামবাংলায় কৃষিই
ছিল জনসাধারণে
উপজীব্য। ‘প্রাচীন
একখানি পুঁথিতে
আছে আত্মমর্যাদাজ্ঞানসম্পন্ন
লোকের পক্ষে
কৃষিই প্রশস্ত।
কারণ বাণিজ্য
করিতে মূলধনের
প্রয়োজন এবং
অনেক জাল-প্রতারণা
করিতে হয়।
চাকুরীতে আত্মসম্মান
থাকে না
এবং ভিক্ষাবৃত্তিতে
অর্থ লাভ
হয় না।
নানাবিধ শস্য,
ফসল, শাক-সবজীর
চাষ হইত—এবং
এ বিষয়ে
বাঙ্গালির অভিজ্ঞতা
বহু পরিমাণে
ছিল। মুকন্দরাও
চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ
হইয়াও চাষ
দ্বারা জীবিকা
অর্জন করিতেন।...
একজন চীনা
পর্যটক লিখিয়াছেন
যে বাংলাদেশে
বছরে তিনবার
ফসল হয়—লোকেরা
খুব পরিশ্রমী;
বহু আয়াসসহকারে
তাহারা জঙ্গল
কাটিয়া জমি
চাষের উপযোগী
করিয়াছে। সরকারি
রাজস্ব মাত্র
উত্পন্ন শস্যের
এক-পঞ্চমাংশ।’
ইবনে বতুতার (১৩০৪-৭৮) বাংলা সফরকালে (১৩৪৬) এক বৃদ্ধ বাঙালি মুসলমান তাকে জানিয়েছিলেন তার স্ত্রী, একজন ভৃত্য এবং তার—এই তিনজনের বার্ষিক খোরাকির জন্য ১ টাকা মাত্র ব্যয় হয়। ইবনে বতুতার দেয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য তালিকা ‘বাংলাদেশের ইতিহাস মধ্যযুগ’-এ রমেশচন্দ্র উদ্ধৃত করেছেন:
ইবনে বতুতা
তার সফরনামায়
উল্লেখ করেছেন,
বাংলাদেশে যত
সস্তায় জিনিসপত্র
পাওয়া যায়,
পৃথিবীতে আর
কোথাও তা
পাওয়া সম্ভব
নয়। ইবনে
বতুতার দুই
শতক পর
পর্যটক বার্নিয়ারও
অবিশ্বাস্য সস্তা
সামগ্রীর কথা
লিখেছেন: নামমাত্র
মূল্যে পাওয়া
চাল, ঘি
এবং তিন-চার
রকমের শাকসবজি
ছিল সাধারণ
বাঙালির নিত্যকার
খাদ্য। গ্রামীণ
দরিদ্র বাঙালির
সত্যিই তা
ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে
ছিল কিনা
এ নিয়ে
প্রশ্ন রয়েছে।
গ্রামবাংলার সংস্কৃতি
গ্রাম
হচ্ছে ফোকলোর
বা লোকসংস্কৃতির
জন্মভূমি। প্রবাদ,
ধাঁধা, ছড়া,
গীত, লোকগল্প,
নাচ, গান,
পট, আল্পনা,
মূর্তি, বিভিন্ন
টোটেম, ট্যাবু
সবকিছুরই শুরুটা
গ্রামে; এই
সংস্কৃতির লালনও
গ্রামে—গ্রাম
থেকে যতই
শহরের দিকে
যেতে থাকে
গ্রামীণ অখণ্ডতা
ততই কলুষিত
হতে থাকে।
দৈত্য-দানো,
রাক্ষস-খোক্কস,
ভূত-পেত্নি,
পঙ্খীরাজ, পাতালপুরী,
সাত সমুদ্র
তের নদী,
সপ্ত আসমান,
তেপান্তরের মাঠ,
ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমি,
বুদ্ধভুতুম, সোনার
কাঠি রুপার
কাঠি, হাউ-মাউ-খাউ,
ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি,
সুয়োরানি-দুয়োরানি
সবই গ্রাম
থেকে উঠে
এসেছে। উড়কি
ধানের মুড়কি,
বিন্নি ধানের
খই, বাটাভরা
পান এবং
এমন আরো
শত সম্পদ
গ্রামবাংলার ঘরে
না থাকলেও
ঘুম পাড়ানিয়া
গানে আছে।
হিন্দু-মুসলমান
দুই সম্প্রদায়েরই
শ্রদ্ধেয় গাজী
পীরের পাঁচালি
আছে:
পেত্থমে বন্দনা
করি গাজী
পীরের পায়
যাহার লাগি
পয়দা হইলাম
এই দুনিয়ায়\
জীবের সুখ
দেইখা খোদার
আর সয়
না তর
কলির শেষে
জন্ম নিল
গাজী-পীর
পয়গম্বর\
তারপরে বন্দনা
করি কালু
ফকির সাঁই
এক ডালেতে
দুটি পাখি
যেন যমজ
ভাই।
গ্রামের নাম
বাংলার
গ্রামের নামেও
অসাধারণ বৈচিত্র্য।
অমিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
পশ্চিমা বাংলার
গ্রামের নাম
নিয়ে চমত্কার
একটি সমীক্ষা
উপস্থাপন করেছেন।
যেমন ধরা
যাক কিছু
সুললিত গ্রামের
নাম: নবঘনপুর,
মেঘরাজপুর, মেঘডম্বুর,
অকালপৌষ, সন্ধ্যাজল,
আঁধারনয়ন, আঁধারমানিক,
আলোকঝারি, অকালমেঘ,
পাথরপ্রতিমা, স্বরূপনগর,
কদমদেওলি, পাতাঝরিয়া,
ফুলমালঞ্চ, ফুলসুন্দরী,
ফুলেশ্বরী, ফুলকমলি,
পারিজাতপুর, চম্পকলতা,
কমলতীর, শেফালিকা
চন্দন, পৌষশিউলি,
পরদেশিপুর, হেমকুমারী,
বৌঠাকুরাণী, সন্দেশখালী,
নয়নানন্দপুর, আশাকণ্ঠী,
সিঁদুরগৌরা, মানিকদীপা,
ললিতাকুড়ি, সোনারচালুন,
চন্দনপিঁড়ি, বরণডালা,
কঙ্কণকিয়ারি, মুকুটমণিপুর,
আলতাগ্রাম, চামরদানি,
কৃষ্ণপ্রিয়া, আড়ালবাঁশি,
ময়ূরঝরনা, ভ্রমরকোল
ও ময়ূরেশ্বর।
পৌরাণিক নামের
গ্রাম: হস্তীনাপুর
কুরুপাহাড়, ইন্দ্রপ্রস্থ,
পাণ্ডববসান, অর্জুননগর,
কর্ণগড়, ভীমনগর,
ভীমার্জুন, পাণ্ডুগ্রাম,
অঙ্গদপুর, লক্ষ্মণকাটি,
লঙ্কাপাড়া, শত্রুঘ্নবাড়,
সীতাহাটি, হনুমানপুর,
সীতাকুণ্ড, সীতাদীঘি,
ভারতগড় ও
অযোধ্যানগর।
মানবচরিত্র প্রকাশক
গ্রামের নাম:
অসত্গঞ্জ, কানকাটা,
অসুরালয়, পশুপাড়া,
কলহপুর, বুজরুকদীঘি,
ঝগড়াপাড়া, প্রচণ্ডপুর,
হল্লাপুর, মাতালগাঁও,
মাতালপাড়া, কাঁসাচোরা,
চোরগলি, চোরপালিয়া,
ঠেঙ্গামারা, লেঙ্গামারা,
লোটাভাঙ্গা, ছুরিমারা,
সোনাচোরা, সোনাচালানি,
মড়কপুর, যমদুয়ার,
হাঁটুভাঙ্গা, হাঁড়ভাঙ্গা,
ইটামারি, রোদনপুর,
তামাসাপুর, শরমপাড়া,
কল্কিহারা, ঘটিহারা,
মহিলাপাড়া, মাকুন্দা,
টাটকাপুর, দোস্তপুর,
পাতলাখাওয়া, পিরিতচক,
বেগারখাটা, মিস্টারপাড়া,
বকশিশপুর, নচ্ছারপাড়া,
ফাজিলপুর, বাহানা
ও জটলা।
পশ্চিমবঙ্গে ২৯টি
গ্রামের নাম
মোহাম্মদপুর, ২২টি
রসুলপুর, ৩১টি
মামুদপুর, ২১টি
হোসেনপুর ও
২৫টি আলীপুর।
এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা





