পুরোধা ইতিহাসবিদ
নীহাররঞ্জন রায়
তার বাঙ্গালীর ইতিহাস:
আদিপর্ব গ্রন্থে বাংলার
ইতিহাসের প্রাচীন
যুগের সমাজ
বিন্যাসের বাস্তব
উপাদান বিশ্লেষণপূর্বক
এতদঞ্চলের প্রাক
আর্য কৃষিজীবী
অস্ট্রিক ভাষাভাষী
কৌমগুলোর সভ্যতা
ও সমাজ
ব্যবস্থাকে একান্তই
গ্রামীণ ও
গ্রামকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা
রূপে আখ্যা
দিয়েছেন। কৃষিভিত্তিক
জীবন ও
কৃষিকে আশ্রয়
করেই গ্রামীণ
জনগোষ্ঠীর বসবাস।
তিনি বলেন,
‘প্রাচীন
বাঙলায়.... গ্রামগুলির
পত্তন.. সর্বত্র
নদী, নালা,
খাটিকা, খালবিল
ইত্যাদির তীরে
তীরে। খাদ্য
ও পানীয়
যেখানে সহজলভ্য
সেখানেই তো
মানুষের বসতি;
কাজেই সেই
বসতি জলপ্রবাহকে
আশ্রয় করিয়া
গড়িয়া উঠিবে,
ইহা কিছু
বিচিত্র নয়।
গ্রাম্য কৃষি
সভ্যতার বিকাশও
সেই জন্য
নদী, খাল,
বিল, খাটিকার
তীরে তীরে।’
(পৃ. ২৮১)
ভূমি লেনদেনের
দলিল তথা
তাম্রশাসন, সংস্কৃতি
গ্রন্থাদি—যেমন,
সদুক্তিকর্ণামৃত, সুভাষিত রত্নকোষ, আর্যাসপ্তশতি থেকে প্রাপ্ত
তথ্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খ
বিশ্লেষণ করেই
নীহাররঞ্জন রায়
বাংলার গ্রামীণ
কাঠামো সম্পর্কে
উপর্যুক্ত মূল্যায়ন
করেছিলেন। আদিপর্বে
রচিত বাংলা
ভাষার আদি
নিদর্শন চর্যাপদে
বাংলার গ্রামীণ
জীবনের যে
চিত্রপট পাওয়া
যায় তা
এ পুরোধা
গবেষকের দৃষ্টি
এড়ায়নি। এ
ধারাবাহিকতায় মধ্যযুগের
বাংলা কাব্যগ্রন্থগুলোতে
গ্রাম বাংলার
নানা দৃশ্য
কবি কল্পনার
সঙ্গে মিশ্রিত
হয়ে ফুটে
উঠেছে। বর্তমান
নিবন্ধে সাহিত্যিক
সূত্রাদির বাইরে
বাংলায় আগত
বিদেশী পর্যটক,
নাবিক, ধর্মপ্রচারক,
কূটনীতিবিদদের চোখে
দেখা গ্রাম
বাংলার নানা
দিক তুলে
ধরার একটি
প্রয়াস নেয়া
হয়েছে। কেননা
সাহিত্য সমাজের
দর্পণ— এ
বক্তব্য সর্বজনগৃহীত
হলেও এটিকে
আকর সূত্র
ধরে ইতিহাস
পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে
প্রথাগত ইতিহাসতত্ত্বে
কবির কল্পনাকে
প্রকৃত সত্য
উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে
সীমাবদ্ধতা হিসেবে
অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ
করবেন। এ
বিবেচনায় বিদেশী
পর্যটকদের চোখকে
বর্তমান মুভি
ক্যামেরার রেকর্ডিংয়ের
সঙ্গে তুলনা
করা যেতে
পারে। বাংলায়
বিভিন্ন এলাকায়
তারা যা
দেখেছিলেন তাই
নিজেদের ভ্রমণ
বৃত্তান্তে লিপিবদ্ধ
করেছেন। ফলে
তাদের বর্ণনা
হয়তো এ
সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম
করতে সক্ষম
হবে।
মধ্যপর্বের বাংলার
সম্পর্কিত প্রথম
ভ্রমণ বৃত্তান্তটি
হলো আফ্রিকা
মহাদেশের বিখ্যাত
মুসলিম পর্যটক
ইবনে বতুতার
(১৩০৪-৭৮)
কিতাবুল
রিহলা।
প্রায় সমগ্র
মুসলিম বিশ্ব
ভ্রমণকারী ইবনে
বতুতা ১৩৪৬
সালে বাংলায়
এসেছিলেন। তার
উদ্দেশ্য ছিল
কামরু অঞ্চলে
বসবাসরত বিখ্যাত
সুফি শায়খ
জালালুদ্দিনের সাক্ষাৎ
লাভ। তিনি
সমুদ্রগামী জাহাজে
করে বাংলার
বন্দর শহর
‘সুদকাওয়ান’
বা বর্তমান
চট্টগ্রাম শহরে
নেমেছিলেন। এখান
থেকে নদীপথে
তিনি কামরুর
পাবর্ত্য এলাকায়
পৌঁছান। তার
এ নদীযাত্রায়
সময় লেগেছিল
প্রায় এক
মাস। কামরুতে
তিনি শায়খ
জালালুদ্দিনের খানকাহতে
(সুফি আস্তানা)
তিনদিন অবস্থান
করেছিলেন। আমরা
সহজেই অনুমান
করতে পারছি,
ইবনে বতুতা
বর্তমান বাংলাদেশের
সিলেটে অবস্থিত
হজরত শাহজালালের
সুফি খানকাতে
এসেছিলেন। জালালুদ্দিনের
কাছ থেকে
বিদায় নিয়ে
ইবনে বতুতা
নহর-উল-আযরক (শাব্দিক অর্থ
নীল রঙা
নদী, বর্তমান
সুরমা নদী)-এর
তীরবর্তী ‘হবঙ্ক’
শহরে পৌঁছান।
এ নদীর
স্রোতধারা অনুসরণ
করে ইবনে
বতুতা ১৪
দিন নৌযাত্রার
পর উপস্থিত
হন ‘সুনারকাওয়ান’
(সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ)
নগরে। নহর-উল-আযরকের উভয় তীরস্থ
গ্রামীণ দৃশ্যপট
ইবনে বতুতাকে
মোহিত করেছিল।
তিনি বলেছিলেন,
এই নদীর
উভয় তীরেই
রয়েছে জলকল
(water wheels), বাগান
এবং গ্রাম—যেমনটি
দেখা যায়
মিশরের নীলনদের
দুইপাশে। .... চৌদ্দদিন
আমরা এই
নদীতে তরী
চালিয়ে অসংখ্য
গ্রাম ও
বৃক্ষরাজির বাগান
পার হয়েছি;
কোনো মনোরম
গাছপালা বেষ্টিত
মনোরম একটি
ভ্রমণপথ অতিক্রম
করছি।
বাংলা অঞ্চলের
সঙ্গে চীন
দেশের যোগাযোগ
অতি প্রাচীনকাল
থেকেই। প্রাচীন
যুগে এ
যোগাযোগের কেন্দ্রে
ছিল বৌদ্ধধর্ম।
মধ্যপর্বে বাংলায়
বৌদ্ধধর্মের পতন
হলেও চৈনিক
যোগাযোগ রয়েই
যায়। ইবনে
বতুতার প্রায়
কাছাকাছি সময়ের
চৈনিক পর্যটক
ওয়াং তা-য়ূন
তার Brief Annals of Foreign Lands গ্রন্থে
বাংলা সম্পর্কে
মন্তব্য করেছিলেন,
‘উঁচু
উঁচু পাহাড়গুলি
মূল্যবান বৃক্ষরাজিতে
আবৃত। সেখানকার
অধিবাসীরা বৃত্তাকারে
বসবাস করে।’
ওয়াং তা—য়ূনের
বর্ণিত দৃশ্যপটটি
সম্ভবত বর্তমান
বাংলাদেশের রাঙ্গামাটির
পাহাড়ি কোনো
গ্রামের চিত্র।
বাংলার মানুষ
সম্পর্কে তিনি
বলেন, ‘এখানকার
স্থানীয় অধিবাসীরা
সাদাসিধে ও
দয়াবান।’ বাংলার
কৃষিজ সংস্কৃতি
সম্পর্কে তার
বক্তব্য হলো,
স্থানীয় অধিবাসীরা
সারা বছরজুড়েই
জমি চাষ
করে এবং
বছরে তিনবার
ফসল ফলায়।
তারা কোনো
জমিই অনাবাদি
ফেলে রাখে
না। এখানে
ফসলি কৃষিক্ষেত্রের
অত্যন্ত চমকপ্রদ
দৃশ্য দেখা
যায়। এখানকার
সবকিছুই অত্যন্ত
কম মূল্যে
বিক্রি হয়....
এখানকার আবহাওয়া
সবসময় উষ্ণ।’
ইবনে বতুতা
ও ওয়াং
তা-য়ূন
উভয়েই চতুর্দশ
শতাব্দীর প্রথমার্ধে
বাংলায় এসেছিলেন।
তাদের বর্ণনায়
এটি স্পষ্ট
যে তাদের
দেখা পরিমণ্ডলে
দ্রব্যমূল্য অত্যন্ত
কম, প্রকৃতি
চোখ জুড়ানো
ও শান্তিময়।
তারা বাংলার
হাটবাজারে বিনিময়
প্রথার পাশাপাশি
তঙ্কা বা
তাম্রমুদ্রার প্রচলন
দেখেছেন।
পঞ্চদশ শতাব্দীর
শুরুতে বাংলার
সঙ্গে চীনের
যোগাযোগ নতুন
মাত্রা পায়।
এ সময়
বাংলার সুলতান
ও মিঙ
সম্রাটদের মধ্যে
কূটনৈতিক দল
এবং তাদের
মাধ্যমে বিভিন্ন
উপহার বিনিময়
হয়। বাংলার
একাধিক কূটনৈতিক
মিশন যেমন
চীনে গিয়েছিল,
তেমনি চীন
সম্রাটদের একাধিক
মিশন বাংলায়
এসেছিল। এ
রকম একটি
চৈনিক কূটনৈতিক
দলের সদস্য
ফেইসিনের লেখা
Xingocha Shenglan (The
Overall Survey of the Star Raft) পুস্তকে
গ্রাম বাংলার
মানুষের মধ্যে
পারস্পরিক সহযোগিতার
ইঙ্গিত পাই।
তিনি লিখেছেন,
‘পুরুষ
ও নারীরা
আলাদা আলাদা
হয়ে খাদ্যগ্রহণ
করে। পুনঃবিবাহ
গ্রহণযোগ্য নয়।
এতিম ও
বিধবা নারীদের
ন্যায় অসহায়রা
যদি নিজের
খরচ চালাতে
অক্ষম হন,
তাহলে সেই
গ্রামের অন্য
পরিবারগুলি তাদের
দায়িত্ব নেয়।
এটা এই
জন্য করা
হয় যেন
তারা অন্য
গ্রামে গিয়ে
ভিক্ষা না
করেন। এই
প্রথা সমাজে
বিরাজমান সুকুমার
চেতনার প্রমাণ।’
ইউরোপীয় জাতিগুলোর
মধ্যে পর্তুগিজরাই
সর্বপ্রথম বাংলায়
আসেন। ভাস্কো
দা গামার
ভারত আবিষ্কারের
তিন দশকের
মধ্যে বাংলার
সমুদ্র তীরবর্তী
এলাকাগুলোর পাশাপাশি
বিভিন্ন এলাকায়
পর্তুগিজ নাবিক,
ব্যবসায়ী ও
ধর্মপ্রচারকদের পদচারণা
লক্ষ করা
যায়। ষোড়শ
শতাব্দীর শুরুর
দিকে একটি
পর্তুগিজ কূটনৈতিক
দল গৌড়ের
সুলতান নুসরত
শাহের (১৫১৯-৩২)
রাজদরবারে এসেছিলেন।
এ দলের
সঙ্গে দোভাষী
হিসেবে ছিলেন
এ্যান্তনি দ্য
ব্রিতো। ব্রিতোর
দলটি চট্টগ্রাম
বন্দরে পৌঁছেছিল
১৫২১ সালের
১৩ অক্টোবর
এবং তারা
দুই সপ্তাহ
আলুইআতে (আধুনিক
অরুলা) অবস্থান
করেন। ব্রিতো
বলেন,
‘আমরা
বেলা একটার
সময় আলুইআতে
পৌঁছাই.... আমাদেরকে
ঐ এলাকার
সবচেয়ে ভালো
কুটিরগুলিতে থাকতে
দেওয়া হয়েছিল।
সেখানকার সবগৃহই
ছিল এ
রকম কুটির।
.... নিজেদের চিত্তবিনোদনের
জন্য আমরা
পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে
একাধিকবার ভ্রমণ
করেছিলাম। এই
এলাকা সবুজময়
ও বিভিন্ন
ধরনের ফলজ
গাছপালায় পরিপূর্ণ;
এ ধরনের
ফলাদি আমাদের
দেশে নেই।
জমিতে ধান
ও ইক্ষু
চাষ করা
হয়।’
আলুইআ থেকে
দলটি জগদিয়ার
উদ্দেশে যাত্রা
করে। জগদিয়া
ছিল নয়/দশ
লীগ দূরবর্তী
একটি দ্বীপ।
জগদিয়া পার
হয়ে পর্তুগিজ
মিশনটি নদী
তীরবর্তী পথ
ধরে অগ্রসর
হয়ে মিয়ামগড়ে
উপস্থিত হয়।
ব্রিতোর বর্ণনায়
মিয়ামগড়ে তাদের
অভিজ্ঞতা হলো:
উজানে আমাদের
প্রথম রাতটি
কেটেছিল একটি
গাছের নিচে
কেননা সেখানে
থাকার কোনো
জায়গা ছিল
না। এভাবেই
আমাদের পরবর্তী
কয়েকদিন অতিবাহিত
হয়। নদীর
দুই তীরেই
ছিল ছোট
ছোট গ্রাম।...
এই এলাকায়
অত্যন্ত কম
খরচে উন্নত
প্রজাতির ইক্ষু
চাষ করা
হয় ।
এখানে ইক্ষু
চাষ বহুল
প্রচলিত।
পর্তুগিজ দোভাষীর
উপর্যুক্ত বর্ণনায়
চিত্রিত বাংলার
গ্রামীণ প্রেক্ষাপট
নিশ্চিতভাবেই চট্টগ্রাম
থেকে তত্কালীন
বাংলার রাজধানী
গৌড়ে যাওয়ার
পথেরই দৃশ্যপট।
এর সঙ্গে
কিছুটা মিল
পাওয়া যাবে
ইবনে বতুতার
পথযাত্রার সঙ্গে।
উভয়েই নদীপথে
ভ্রমণ করে
তীরবর্তী গ্রামীণ
পরিবেশ এবং
গ্রাম বাংলার
ফসলি ক্ষেত
ও বনাঞ্চল
অবলোকন করে
সবুজ মায়াবি
প্রকৃতির মোহমায়ায়
বাঁধা পড়েছিলেন
বলে মনে
হয়।
বাংলায় খ্রিস্টধর্ম
প্রচারের জন্য
গোয়ার খ্রিস্টান
চার্চ থেকে
বিভিন্ন মিশন
প্রেরণ করা
হতো। প্রথম
দিকের এ
রকম একটি
মিশনের সদস্য
ছিলেন ফাদার
ফনেসকা। তার
লেখা বিভিন্ন
চিঠিতে বাংলার
জনজীবন, খ্রিস্টধর্মের
সম্ভাবনা, প্রচারের
ক্ষেত্রে সমস্যা
ও সম্ভাব্য
সমাধান ইত্যাদি
বিষয়াদির সম্পর্কে
তথ্য পাওয়া
যায়। ফাদার
ফনেসকার ১৬০০
সালের ২০
জানুয়ারিতে লেখা
একটি চিঠিতে
বাকলা (বর্তমান
বরিশাল) থেকে
চান্দিকান (সাগর
দ্বীপ, যশোরের
মহারাজা প্রতাপাদিত্য
কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত)
পর্যন্ত ভ্রমণপথের
বর্ণনায় গ্রাম
বাংলার নিম্নরূপ
তথ্য পাওয়া
যায়,
বাকলা থেকে
চান্দিকানের ভ্রমণপথটি
অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর।
সমগ্র যাত্রাপথজুড়ে
পরিষ্কার মিঠাপানির
গভীর স্রোতধারা
প্রবহমান। নদীর
একধারে দেখা
যায় গহীন
বনরাজির ছায়া,
গবাদিপশুর পাল
এবং সমভূমিতে
পশুরা চড়ে
বেড়াচ্ছে। অন্যধারে
দৃষ্টির গোচর
পর্যন্ত চোখ
জুড়ানো ধানক্ষেত।
আমরা গঙ্গা
ও অন্যান্য
নদীপথে চলছিলাম।
কোথাও কোথাও
গাছপালা এত
বেশি যে
সেখানে সূর্যের
কিরণ ডালপালা
ভেদ করে
ভিতরে পৌঁছাচ্ছিল
না। গাছের
শাখায় বসে
ছিল মৌমাছির
ঝাঁক; আর
কোথাও ঝুলে
ছিল মৌচাক।
বানরেরা মনের
আনন্দে এক
গাছ থেকে
আরেক গাছে
লাফাচ্ছিল। এখানে-সেখানে
দেখা যায়
মূল্যবান ইক্ষুক্ষেত।
কিন্তু এর
পাশাপাশি মানুষ
খেকো বাঘ
ও কুমিরও
ছিল। জঙ্গলে
গণ্ডারের অস্তিত্ব
থাকলেও আমাদের
নজরে একটিও
পড়েনি।
এটি স্পষ্ট
যে, ফাদার
ফনেসকা বাংলার
দক্ষিণভাগের বনাঞ্চল
অতিক্রম করার
সময়ে যে
গ্রামীণ বনজ
দৃশ্যাবলি দেখেছিলেন,
সেগুলোই তার
চিঠিতে উল্লেখ
করেছেন। নদী
তীরবর্তী ফসলি
জমি অথবা
গবাদিপশুর চারণভূমির
দৃশ্য আজও
গ্রাম বাংলার
নিত্যদিনের দৃশ্যপট।
সপ্তদশ শতাব্দীর
শুরুতে মোগল
সম্রাট জাহাঙ্গীর
ভাটির জমিদারদের
দমন এবং
সমগ্র বাংলার
ওপর মোগল
আধিপত্য প্রতিষ্ঠার
জন্য ইসলাম
খান চিশতিকে
বাংলার সুবাদার
নিযুক্ত করেছিলেন।
নবনিযুক্ত সুবাদার
ইসলাম খান
বিশাল সৈন্যবাহিনী
ও নওয়ারাসহ
ঢাকায় আসেন।
এ সামরিক
বাহিনীর সঙ্গে
অনেক বেসামরিক
কর্মকর্তা ও
মোগল অভিজাতও
ঢাকায় আসেন।
এ বিশাল
আভিযাত্রিক বাহিনীর
একজন সদস্য
ছিলেন উত্তর
ভারতীয় মোগল
অমাত্য আবদুল
লতিফ। তিনি
তার বাংলায়
ভ্রমণের বিস্তারিত
বর্ণনা দিনলিপি
হিসেবে লিপিবদ্ধ
করেছিলেন। এটি
আবদুল
লতিফের ডায়েরি হিসেবে
বহুল প্রচলিত।
রাজমহল থেকে
ঘোড়াঘাট পর্যন্ত
মোগল বাহিনীর
অগ্রসর হওয়ার
বিবরণের মাধ্যমে
তার ডায়েরির
আকস্মাৎ সমাপ্তি
ঘটে। লতিফের
বক্তব্য অনুযায়ী,
সুবাদার ইসলাম
খান চিশতি
১৬০৮ সালের
ডিসেম্বর মাসের
৭ তারিখ
সরকার নারঙ্গাবাদের
ঘোষ পরগনাতে
এসে গঙ্গা
নদী অতিক্রম
করে আলাইপুর
পৌঁছান। তিনি
আলাইপুরকে অত্যন্ত
সাদামাটা এলাকা
হিসেবে উল্লেখ
করেন, যেখানে
বিশেষ আকর্ষণীয়
কিছু নেই।
কিন্তু আলাইপুর
থেকে এক
লীগ দূরত্বে
দুটি বিখ্যাত
গ্রাম রয়েছে;
একটি হলো
পরগণা চন্দিবাজুতে
বাঘা গ্রাম
এবং অন্যটি
পরগনা আলাইপুরে
মালিক গ্রাম।
ইতিহাসবিদ আবদুল
করিম আধুনিক
মানচিত্রে আলাইপুর
থেকে তিন
মাইল দূরত্বে
অবস্থিত বাঘা
ও বাঘা
মুলকি গ্রামকে
আবদুল লতিফের
বর্ণিত গ্রামদ্বয়ের
সঙ্গে চিহ্নিত
করেন। বর্তমান
বাংলাদেশের রাজশাহী
জেলার বাঘা
ও বাঘা
মুলকি গ্রাম
দুটি সেই
সময়ের একাধিক
সাক্ষ্য বহন
করে আছে।
বাঘার বিবরণে
আবদুল লতিফ
বলেন,
‘এই
গ্রামে [বাঘায়]
প্রায় শতবর্ষী
সাধক পুরুষ
হাওদা মিয়া
বাস করেন।
গ্রামের মাঝখানে
অত্যন্ত সুন্দর
একটি জলাধার-বাংলা
ভাষায় যাকে
পুক্কুর বলা
হয়-এই
জলাধারের পানি
বেহেস্তের ঝর্ণাধারার
সমকক্ষ হিসেবে
কেউ কেউ
মনে করতে
পারে। এই
জলাধারের চারপাশে
হাওদা মিয়ার
বংশধরগণ চক-বন্দিস
(চতুর্ভূজাকার
গৃহগুচ্ছ) তৈরি
করেছে। এখানে
৯৩০ হিজরির
একটি মসজিদ
রয়েছে। হাওদা
মিয়ার বাসগৃহে
কাদামাটির দেয়াল
এবং ছনের
ছাদ দেয়া
গৃহেই একটি
মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা
করা হয়েছে।’
আবদুল লতিফের
উল্লিখিত এই
পুকুর, মাদ্রাসা
ও মসজিদের
অবস্থান রাজশাহী
জেলার বাঘায়
এবং এগুলো
এখনো জনমানুষের
পদচারণায় মুখরিত।
ব্রিটিশ সরকারের
পক্ষ থেকে
ভারতীয় উপমহাদেশে
শিক্ষা জরিপের
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
এ্যাডওয়ার্ড অ্যাডাম
তার Report on the State of Education in Bengal প্রণয়নের
আগে বাঘায়
এসেছিলেন। সে
সময় মাদ্রাসা
ও মসজিদটির
কাঠামোগত অবস্থান
ভালো ছিল
এবং এলাকাটি
ছিল প্রাণবন্ত।
অ্যাডামের সময়
মাদ্রাসাটি ছিল
একটি আবাসিক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং
সেখানে ছাত্র-শিক্ষক
একই কমপ্লেক্সে
একসঙ্গে থাকেন।
কিন্তু তার
বর্ণনায় মাদ্রাসার
পাঠকক্ষ, ছাত্র-শিক্ষকদের
থাকার ভবনের
কাঠামো কেমন
ছিল তা
অনুপস্থিত। ১৮৫৯
সালের ভূমিকম্পে
মসজিদটির কিছু
অংশ ধ্বংস
হলেও বর্তমানে
এটি সংস্কারকৃত
এবং প্রাত্যহিক
নামাজের সঙ্গে
সঙ্গে জুমার
নামাজ ও
ঈদের নামাজও
অনুষ্ঠিত হয়।
মসজিদটির সামনেই
সেই বিশাল
পুকুরটি রয়েছে।
আবদুল লতিফের
চোখে দেখা
গ্রামটি ছিল
নিম্নরূপ:
পুকুরের কিনারায়
আম-কাঁঠালের
গাছ, সবুজ
শীতল ছায়াময়
পরিবেশ। গ্রামের
চারপাশের প্রকৃতি
সবুজ এবং
চিত্তে প্রফুল্ল
উদ্রেক করে।
বাস্তব সত্য
হলো এই
জায়গাটি অত্যন্ত
মনোমুগ্ধকর। সুবাহ
বাংলাতে আমরা
এ রকম
পরিবেশ এখনো
আর কোথাও
দেখেনি।
আবদুল লতিফ
সে বছরের
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে
বাঘার প্রকৃতি
প্রতিবেশ অবলোকন
করেছিলেন। নিশ্চিতভাবেই
গ্রামের ফসলি
জমি এবং
পুকুরের চারপাশের
ফলাদি বৃক্ষ
ও গ্রামীণ
ছায়ানিবিড় পরিবেশ
তাকে মোহিত
করেছিল, বিধায়
তিনি এর
উচ্ছ্বসিত প্রশংসা
করেছেন।
ইবনে বতুতা,
ওয়াং তা-য়ূন,
ফেইসিন, ফাদার
ফনেসকা কিংবা
আবদুল লতিফসহ
অন্যান্য বিদেশী
পর্যটকদের থেকে
প্রাপ্ত তথ্যাদি
হয়তো সামগ্রিক
চিত্র নয়।
বাংলার ইতিহাসের
আগ্রহী পাঠক
কিংবা গবেষক
বাংলার গ্রামীণ
জীবনের দুঃখ-দুর্দশা,
দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক
দুর্যোগের অসংখ্য
দৃষ্টান্ত উপস্থাপন
করে আমাদের
উপস্থাপিত চিত্রপটকে
প্রশ্নবিদ্ধ করে
তুলতে পারেন।
সেই কঠিন
সত্যকে উপেক্ষা
করার কোনো
প্রয়াস হয়তো
দালিলিক প্রমাণে
অত্যন্ত দুর্বল
মনে হবে;
আমরা সে
চেষ্টাও করিনি।
সোনার বাংলার
যে চিত্র
আমাদের মানসজগৎ
ঘুরে বেড়ায়,
সে ভাবনার
কিছুটা যেন
প্রতিফলিত হয়েছে
বাইরে থেকে
আসা পর্যটকদের
চোখে। তারাও
যেন বাংলার
সবুজ-শ্যামল
মায়াময় গ্রামীণ
পরিবেশের প্রেমে
পড়েছেন। তাদের
দেখা বাংলা
হয়তো এখন
খুঁজতে গেলে
আমাদের অনেককেই
শহুরে গণ্ডী
ছেড়ে বের
হয়ে অতিক্রম
করতে হবে
ক্রোশের পর
ক্রোশ দূরত্ব।
কেননা আধুনিক
শিল্পবিপ্লব ও
হালের প্রযুক্তিবিপ্লব
গ্রামীণ জীবনের
অনেকখানি জায়গা
দখল করে
নিয়েছে। লেবাস
পরিয়ে দিয়েছে
শহুরে সংস্কৃতির।
এ হাহাকার
হয়তো আমাদের
সবার—টিকে
থাক গ্রাম,
গ্রাম-বাংলার
প্রকৃতি ও
আত্মিক পরিবেশ।
শহিদুল হাসান:
সহকারী
অধ্যাপক
ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





