দারিদ্র্য ছিল
ঠিকই, কিন্তু
রান্না-খাওয়ায়
বৈচিত্র্যের অভাব
ছিল না।
মধ্যযুগের গ্রামবাসী
বাঙালির খাওয়াদাওয়া
বিষয়ে বলতে
গেলে এ
কথাটাই প্রথমে
মাথায় আসে।
অভাব থাকা
সত্ত্বেও বাঙালি
তার সীমিত
সামর্থ্যে রসনাবিলাস
পূরণ করতে
চেয়েছে বরাবরই।
মধ্যযুগের বাঙালির
পদের প্রধান
বা ‘মেইন
কোর্স’ কী
ছিল? এর
জবাবে চোখ
বুজে ভাতের
কথা বলতেই
হবে। গোলাম
হোসেন সেলিম
বিপরীতপক্ষে তার
মহাগ্রন্থ ‘রিয়াজ-উস-সালাতিন’-এ
স্পষ্ট করে
তার চোখে
দেখা মধ্যযুগের
বাঙালিদের বিবরণ
দিতে গিয়ে
বলেছেন, ‘তারা
রুটি বা
গম খায়
না।’ ভৌগোলিক
কারণে ধানের
ফলন গ্রাম-বাংলায়
আদিকাল থেকেই
ভালো। তারই
প্রতিফলন খাবারের
পাতেও।
ভাতের সঙ্গে
একটু মাছ
পেলেই গ্রামীণ
বাঙালি খুশি।
ওই মধ্যযুগেও
তার ব্যতিক্রম
ছিল না।
দ্বিজ বংশীদাসের
‘মনসামঙ্গল’
কাব্যে তো
নানা রকম
সবজি ও
মাছ দিয়ে
তৈরি পদের
একটি বিরাট
তালিকাই পাই:
‘কাতলের
কোল ভাজে
মাগুরের চাকি/চিতলের
কোল ভাজে
বসবাস মাখি\/ইলিশ
তলিত করে
বাচা ও
বাঙ্গনা।/শউলের
খণ্ড ভাজে
আর শউল
পোনা\/...পাবতা
মৎস্য দিয়া
রান্ধে নালিতার
ঝোল।/পুরান
কুমড়া দিয়া
রোহিতের কোল\.../বাগুন
দ্বিখণ্ড করি
তাতে লাউ
যোগ।/মাগুর
মৎস্য সহ
রান্ধে কোঞর
ভোগ\/ নবীন
কুমড়া দিয়া
কই মৎস্য
সনে।/ বিপুল
বাইয়া ঝোল
রান্ধিল বন্ধনে।’
এ রচনাংশ
থেকে বোঝা
যায়, সে
যুগের গ্রামবাসীর
খাদ্যজ্ঞান কতটা
টনটনে ছিল।
‘পুরান’
ও ‘নবীন’—দুই
জাতের কুমড়ো
যে দুই
আলাদা আলাদা
মাছের সঙ্গে
ভালো মিলমিশ
খায়, তা
তারা রীতিমতো
নির্ণয় করে
ফেলেছিলেন। উল্লেখ্য,
নদীর মিঠা
মাছ সবসময়
নিম্নশ্রেণীর দরিদ্র
পল্লীতে জুটত
না ঠিকই,
কিন্তু শুঁটকি
মাছের দাম
তুলনায় তখন
স্বল্প হওয়ায়
তা দিয়ে
রসনাতৃপ্তি করে
নেয়া ঠিকই
যেত।
মাছের পরে
মাংস আসে।
আর্থিক সামর্থ্যের
অভাব বা
ধর্মীয় বিশ্বাসের
কারণে গ্রামের
বাঙালি হয়তো
তখন মাংস
কম খেত।
কিন্তু একেবারে
যে তার
পাতে মাংস
পড়তই না—তেমনটিও
আসল ঘটনা
নয়। পনের
শতকের শেষ
ভাগে কবি
বিজয় গুপ্ত
বণিক ঘরের
গৃহিণীর রান্নার
বিবরণ দিতে
গিয়ে লিখেছেন:
‘...মাংসেতে
দিবার জন্য
ভাজে নারিকেল।/ছাল
খসাইয়া রান্ধে
বুড়া খাসীর
তেল\/ছাগ
মাংস কলার
মূলে অতি
অনুপাম।/ডুম
ডুম করি
রান্ধে গাড়রের
চাম\’ এ
থেকে বোঝা
যায়, সেকালের
গ্রাম্য বণিক
গৃহে ছাগ
মাংস অস্পৃশ্য
ছিল না।
পূর্ববঙ্গ গীতিকাতেও
পাই ‘মোরগের
গোছ’ রান্নার
প্রসঙ্গ: ‘হাঁসর
আন্ডা রাইন্ধে
ডালা নুন
মরিচে কড়া।/পরুণ
দিয়া তেলত
বুঝি বানাই
লইছে বড়া\/লৈটা
মাছের ঝোল
আর মোরগের
গোছ।/খাইয়া
দাইয়া মালেকের
মন হইল
খোস\’ আর
পূর্বোক্ত ‘মনসামঙ্গল’
কাব্যে দ্বিজ
বংশীদাস তো
ছাগল বা
মুরগি ছাড়িয়ে
আরো নানা
রকম মাংসের
পদের বর্ণনা
দিয়ে গেছেন:
‘...মাংসের
ব্যঞ্জন তবে
রান্ধয়ে বিশেষ\/কাউঠার
রান্ধে মাংস
তৈল ডিম্ব
দিয়া।/তলিত
করিয়া তুলে
ঘৃতেত ছাকিয়া\/কৈতরের
বাচ্ছা ভাজে,
কাউঠার হাতা।/ভাজিছে
খাসীর তৈলে
দিয়া তেজপাতা\/মৃগ
মাংস ঘৃত
দিয়া ভাজিলেক
কত\/রান্ধিছে
পাঁঠার মাংস
দিয়া খর
ঝাল/পিঠালী
বাটিয়া দিল
মরিচ মিশাল\...’
আর ছিল
সবজির বাহার।
কৃষ্ণদাস কবিরাজের
বর্ণনায় একাধিক
নিরামিষ পদের
কথা উঠে
এসেছে। সেগুলোর
কয়েকটি নিম্নরূপ:
নিমের ঝোল,
মরিচের ঝাল,
মোচার ঘণ্ট,
ভাজা শাক,
‘বুড়ো
কুমড়ো’ দিয়ে
তৈরি বড়ি,
পটল ভাজা,
কুমড়োর চাকভাজা,
কাঁচাকলার বড়া
ইত্যাদি। নানা
ধরনের শাক
খাবার চল
মধ্যযুগের খাদ্যাভ্যাসে
বিশেষভাবে পরিলক্ষিত
হয়। সেকালের
কবিদের লেখায়
এমন কিছু
শাকের নাম
পাওয়া যায়,
যা হয়তো
এখন বিলুপ্তই
হয়ে গেছে
বা খুব
একটা নজরে
আসে না।
যেমন বাথুয়া,
গিমা, কাঁটাসিজ,
কাতপুষ্পী, মাটা,
বোদালী, বনতা
ঝপুই, ভদ্রপলা,
হিজলি, জাঙ্গি
ও ডারিপাতা।
মধ্যযুগের আগে
গ্রামবাসী বাঙালি
(অন্যত্র বসবাসকারীরাও)
ডাল খাচ্ছে,
এমনটা দেখা
যায়নি। ডালের
কথা নাকি
মঙ্গলকাব্যের আগে
বাংলা ভাষায়
লেখাও হয়নি।
সে যা-ই
হোক, মধ্যযুগে
পল্লীর বাঙালি
সমাজে ডাল
প্রথম প্রবেশ
করলেও তার
সমাদর পেতে
বেশি সময়
লাগেনি। মাছ-ভাত-সবজির
মতোও ডালও
তখন থেকেই
নিত্যদিনের আহার্যে
পরিণত হলো।
মুখে স্বাদ
আনার জন্য
বাঙালি সে
যুগে গ্রামে
বসেও আচারের
সন্ধান করত
বৈকি। কৃষ্ণদাস
কবিরাজ ‘আম্রকাসন্দি’,
‘শুণ্ঠি’,
‘কোলি’,
‘কোলিখণ্ড’
কিংবা ‘কোলিচূর্ণের’
মতো ‘শত
প্রকার আচার’-এর
কথা লিখে
গেছেন দেখা
যাচ্ছে।
শেষপাতে
মিষ্টি চাই,
গ্রামদেশে থাকলে
কী হবে।
প্রথাগত মিষ্টান্নের
বদলে তখন
গ্রামে পিঠাপুলির
চলই ছিল
অধিক। মৈমনসিংহ
গীতিকার অন্তর্গত
‘কাজলরেখা’-য়
পাই পিঠা
তৈরির অনুপম
বিবরণ: ‘নানা
জাতি পিঠে
করা গন্ধে
আমোদিত/চন্দ্রপুলি
করে কন্যা
চন্দ্রের আকিরত\/চই
পপরি পোয়া
সুরস রসাল।/তা
দিয়া সাজাইল
কন্যা সুবর্ণের
থাল\/ক্ষীর
পুলি করে
কন্যা ক্ষীরেতে
ভরিয়া।/রসাল
করিল তায়
চিনির ভাজ
দিয়া\’ পিঠা-পুলির
পাশাপাশি ছিল
নাড়ু তৈরির
রমরমা। এর
বিবরণ দিতে
ফের সহায়
হতে হয়
কৃষ্ণদাস কবিরাজের:
‘নারিকেল
খণ্ড আর
নাড়ু গঙ্গাজল।/চিরস্থায়ী
খণ্ড বিকার
করিল সকল\/শালিকাচটি
ধান্যের আতব
চিড়া করি।/নূতন
বস্ত্রের বড়
থলি সব
ভরি\/ কথোক
চিড়া হুড়ুম
করি ঘৃতেতে
ভাজিয়া।/চিনি
পাকে নাড়ু
কৈল কর্পূরাদি
দিয়া\/শালি
তুল্য ভাজা
চূর্ণ করিয়া।/ঘৃতে
সুক্তা চূর্ণ
কৈল চিনিপাক
দিয়া\...’
শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক





