প্রাচীন বাংলাকে
জানার জন্য
৬৪ জেলা
ভ্রমণ করতে
গিয়ে পড়েছি
মেগাস্থিনিস, ফা-হিয়েন,
রালফ ফিচ,
ফ্রান্সিস বুকানন,
বারবোসাসহ বিশ্ববিখ্যাত
পর্যটকদের ভারতবর্ষ
দর্শনের বর্ণনা।
যুগে যুগে
নানা গবেষক,
পর্যটক ও
বণিকদের লেখনীতে
উঠে এসেছে
প্রাচীন বাংলার
কথা। সেসব
ভ্রমণ লেখনী
থেকেই রসদ
নিয়ে পরবর্তী
সময়ে আমাদের
দেশীয় গবেষক
ও ইতিহাসবিদরা
বঙ্গের সমৃদ্ধ
ইতিহাস তুলে
ধরেছেন আমাদের
সামনে।
স্বভাবতই মনে
প্রশ্ন জাগে,
বাঙালি কি
বিশ্বভ্রমণে বের
হয়নি তবে!
লেখনীতে সংরক্ষিত
কি নেই
সে রকম
কোনো ভ্রমণবৃত্তান্ত!
দুটো প্রশ্নেরই
উত্তর—হ্যাঁ।
প্রথম ভারতীয়
ভূপর্যটক বিমল
মুখার্জী দুই
চাকায় দুনিয়া
ঘুরেছেন ও
লিখেছেন, সাইকেলে
বিশ্বভ্রমণ করেছেন
রামনাথ বিশ্বাস।
প্রায় ৪০টি
ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন।
প্রথম বাঙালি
নারী হিসেবে
জাপান ভ্রমণ
করেছেন হরিপ্রভা
তাকেদা। জাপান
থেকে ফিরে
এসে সে
অভিজ্ঞতা নিয়ে
রচনা করেন
‘বঙ্গ
মহিলার জাপান
যাত্রা’।
যেটি প্রকাশিত
হয় ১৯১৫
সালে কবিগুরুর
‘জাপানের
চিঠি’ প্রকাশিত
হওয়ার আগে।
১৭৭৯ সালে
প্রকাশিত হয়েছিল
মির্জা শেখ
ইতিসামুদ্দিনের ‘বিলায়েতনামা’
বইটি। কোনো
ভারতীয়র এটাই
প্রথম ইউরোপ
ভ্রমণের স্মৃতিকথা।
এ ভ্রমণকাহিনী
ও লেখককে
নিয়ে আমাদের
সমাজে সে
রকম আলোচনা
হয়নি বলেই
মনে হয়।
ভারতীয়দের মাঝে
যারা ইউরোপ
ভ্রমণ করে,
ভ্রমণকাহিনী লিখে
গেছেন, তত্কালীন
নদীয়া জেলার
পাঁচনুর গ্রামের
মির্জা শেখ
ইতিসামুদ্দিন তাদের
মধ্যে সর্বপ্রথম।
তিনি ইউরোপ
ভ্রমণ করেন
১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে,
তারপর নিজের
অভিজ্ঞতা ফারসি
ভাষায় লিপিবদ্ধ
করেন। যতটুকু
জেনেছি, ইতিসামুদ্দিনের
রচিত মূল
ভ্রমণকাহিনী ‘শিগার্ফ-নামা-এ-বিলায়েত’
ছাপা হয়নি।
১৮২৫ সালে
ক্যাপ্টেন জে
ই আলেকজান্ডার
একটি সংক্ষিপ্ত
অনুবাদ প্রকাশ
করেছিলেন, কিন্তু
সেটি আর
এখন সহজলভ্য
নয়। আমি
যে বাংলা
অনুবাদটি পড়েছি,
সেটি প্রকাশ
করেছে ১৯৮১
সালে মুক্তধারা
থেকে প্রকাশিত,
অনুবাদক আবু
মহামেদ হাবিবুল্লাহ।
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য
এক নিঃশ্বাসে
পড়ে ফেলার
মতো ভ্রমণকাহিনী
‘বিলায়েতনামা’।
এ ভ্রমণকাহিনীতে
রয়েছে ভ্রমণযাত্রার
বর্ণনা, মহাসমুদ্রের
বিশালতার ও
অতলস্পর্শী গভীরতার
বর্ণনা, কম্পাসের
দিগিনর্ণয়ের, জাহাজের
বিন্যাস, পাল
ও গতিবিধির
গল্প, বিভিন্ন
প্রকার বাতাসের
বর্ণনা, যাত্রাবিরতিতে
মরিশাস, মাদাগাস্কার,
ফ্রান্স, উত্তমাশা
অন্তরীপ, স্কটিশ
হাইল্যান্ডের কথা।
রয়েছে মালদ্বীপ
ও স্মরণ
দ্বীপের (আজকের
শ্রীলংকা) কথা।
ইংল্যান্ডের প্রাচীন
ইতিহাস, রানীর
প্রাসাদ, প্রাসাদে
সৈন্য ব্যবস্থা
ও বিন্যাস,
আদালতের নিয়মকানুন
ও কার্যপদ্ধতি,
ইউরোপের খাবার,
বাজারহাট, আচার-অনুষ্ঠান,
কী নেই
‘বিলায়েতনামাতে’।
রয়েছে মত্স্যকন্যার
উপকথা আর
আঠার শতকের
ইউরোপীয় নারীদের
গল্প।
আমার এ
লেখনীতে আমি
ইতিসামুদ্দিনের ভ্রমণ
বর্ণনায় তত্কালীন
ব্রিটিশ নারীদের
কথাই তুলে
ধরার একটি
ক্ষুদ্র প্রয়াস
করছি মাত্র।
ইংরেজি সাহিত্যের
ছাত্র হওয়ার
দরুন চসার,
শেকসপিয়ার কিংবা
জেন অস্টেনের
বর্ণনায় সে
সময়কার ইউরোপের
নারীদের একরকম
চিত্র আমার
কাছে রয়েছে।
কালজয়ী লেখকরা
সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ
থেকেই সে
বর্ণনা করেছেন।
অবশ্যই সাহিত্য
জীবন থেকে
আলাদা নয়।
যদিও তাতে
কল্পনার রঙ
থাকে। সেজন্যই
একজনের বাঙালি
পর্যটকের দৃষ্টিতে
আঠারো শতকের
ইউরোপের নারীরা
কীভাবে উঠে
এসেছে সেটি
লিখতে লোভ
হলো।
বিলায়েতনামার চতুর্থ
পরিচ্ছেদে প্রথম
ইতিসামুদ্দিন উল্লেখ
করেন ইউরোপীয়
নারীদের কথা।
ফ্রান্স থেকে
রওনা হয়ে
ইংল্যান্ডের সমুদ্রতীরবর্তী
ছোট্ট একটি
শহরে তিনি
বেড়াতে গেছেন।
শহরটির নাম
উল্লেখ করা
নেই বইতে।
সেখানে একটি
বাড়িতে নাচ-গানের
আয়োজন করা
হয়েছে। নিমন্ত্রণ
পেয়ে ইতিসামুদ্দিন
গেছেন সেখানে।
ভারতীয় সাজ-পোশাকে
বাঙালি মুনশিকে
দেখে নাচের
মেয়েরা নাচ
বন্ধ করে
উনাকেই দেখছিল।
ইতিসামুদ্দিনের জামা
ও পাগড়ি
নর্তকদের পোশাকের
মতো বলে
নাচ দলের
নারীরা তাকে
নর্তক মনে
করেছে এবং
তাকে নাচ
দেখার আমন্ত্রণ
জানিয়েছে।
সেই নাচের
দলের নারীদের
বর্ণনা তিনি
এভাবে লিখেছেন,
‘তামাশা
দেখতে গিয়ে
আমি নিজেই
তামাশা হয়ে
গেলাম। সে
মজলিশে বুদ্ধিমানের
বিবেচনা লোপ
পায়, আর
হুরীসদৃশ সুন্দরীদের
রূপ দেখে
পরীরাও লজ্জায়
মুখ ঢাকে।
আমি দ্বীপের
আলো ও
আর সুন্দরীদের
মুখের জ্যোতিকে
পার্থক্য করতে
না পেরে
বিস্ময়ে হতবাক
হয়ে চিত্রবত
এক জায়গায়
দাঁড়িয়ে রইলাম
আর প্রকৃত
স্রষ্টার সৃজন
শক্তিতে অভিভূত
হয়ে তার
প্রশংসার স্তুতি
পাঠ করতে
লাগলাম।’
ইতিসামুদ্দিনের সাজ-পোশাকে
স্থানীয় লোকজন
ও শিশুরা
তাকে ‘ডেভিল’
বলে সম্বোধন
করত। বাড়ির
যুবতী মেয়েরা
জানালা থেকে
হাত নেড়ে
হাসি বিনিময়
করত। পথে
অনেক নারীরা
তাকে হাস্যোচ্ছলে
বলত ‘my dear kiss me’।
ইতিসামুদ্দিন লন্ডনের
বিভিন্ন এলাকার
বাজার ও
রাস্তাগুলোকে দারুণ
সুপরিকল্পিত ও
সুবিন্যস্ত বলে
বর্ণনা করেছেন।
কলকাতার কিছু
রাস্তার সঙ্গে
তুলনামূলক একটি
আলোচনাও রয়েছে।
শহরে জুতোর
দোকান, রুটির
দোকানে যেমন
প্রতিকৃতিসহ মূল্যনির্ধারণ
করে দেয়া
আছে, তেমনি
বারঙ্গনাদের বাড়ির
সামনে নাম,
বয়স ও
নির্দিষ্ট মূল্যসহ
প্রত্যেকের ছবি
বাড়ির দরজায়
লাগানো থাকে।
একবিংশ শতাব্দীতে
এসে আমি
একই চিত্র
দেখেছি নেদারল্যান্ডসের
রেড লাইট
ডিস্ট্রিক্টে। নেদারল্যান্ডসের
পর্যটন কেন্দ্রগুলোর
মধ্যে সবচেয়ে
জনপ্রিয় পর্যটন
কেন্দ্র রেড
লাইট ডিস্ট্রিক্ট।
স্কটল্যান্ডের রাজধানী
এডিনবরার মনোমুগ্ধকর
বর্ণনা আছে
‘বিলায়েতনামায়’।
ক্যাপ্টেন সুইনটনের
সঙ্গে এডিনবরাতে
তার পরিবারের
সঙ্গে সাক্ষাৎ
করার জন্য
গিয়েছিলেন ইতিসামুদ্দিন।
ক্যাপ্টেন সুইনটনের
পরিচয় পরে
দিচ্ছি। সুইনটনের
বয়ঃপ্রাপ্ত আজীবন
অবিবাহিতা দুই
বোনকে দেখে
খুবই অবাক
হয়েছিলেন এ
বাঙালি পর্যটক।
অনুবাদকের ভাষান্তর
থেকে সেই
অনুভূতি তুলে
ধরছি—‘এদেশে
বিবাহ পুরুষ
ও নারীর
পারস্পরিক সম্পর্কের
ওপর নির্ভর
করে। পুরুষকে
সুশ্রী ও
উপার্জনক্ষম হতে
হবে। নারীকে
সুন্দরী, সুচরিত্রা,
পিতার ধনের
বা পূর্ব
স্বামীর উত্তরাধিকার
সূত্রে প্রাপ্ত
ধনের অধিকারিণী
হতে হবে।
বিদ্যা ও
শিল্পকলায় কিছু
পারদর্শী হতে
হবে। কারো
মাঝে এ
রকম গুণের
একত্র সমাবেশ
হওয়া কঠিন।
তবে অন্যান্য
গুণ অপেক্ষা
ধনসম্পদকেই গুরুত্ব
দেয়া হয়
বেশি। ধন
থাকলে বিবাহ
সম্ভব, যার
ধন নেই
তাকে কেও
বিবাহ করে
না। কেননা
বিলাতে সুন্দরী
রমণী অজস্র
রয়েছে। যার
রূপ বা
ধন কিছুই
নেই, তাকে
কে বিবাহ
করবে। এ
কারণে এমন
হাজার হাজার
নারী এদেশে
আছে, যারা
বৃদ্ধা হয়ে
গেছে, কখনো
স্বামীর মুখ
দেখেনি।’ ক্যাপ্টেন
সুইনটনের দুই
বোনের কোন
বিষয়ে কমতি
ছিল সে
সম্পর্কে ইতিসামুদ্দিন
কোনো ব্যাখ্যা
দেননি। কিন্তু
আমি মনে
মনে ভাবছি,
নারীদের এ
রকম তথাকথিত
গুণাবলির প্রয়োজন
একবিংশ শতাব্দীতে
কি বিলুপ্ত
হয়েছে? অথবা
ধনসম্পদ দিয়ে
গুণাবলি বিচারের
নিয়ম কি
সমাজে পরিবর্তন
হয়েছে! উত্তরটি
হচ্ছে রূপ
বদলেছে, বিষয়গুলো
একই রকম
বিদ্যমান সমাজ
ও সংস্কৃতি
ভেদে।
তত্কালীন বিলাতে
উচ্চশ্রেণীর লোকেরা
কন্যাসন্তানদের শিক্ষাদান
করত এবং
শিক্ষাগ্রহণের জন্য
দূর দেশেও
পাঠাত। বিলাতে
ধনীরা চার
বছর বয়স
থেকেই পুত্র-কন্যাদের
লেখাপড়া ও
নানা প্রকার
শিল্পকলায় শিক্ষা
দিতে যত্নবান
হয়। যেসব
মহিলা নৃত্য-গীত
জানে না,
অভিজাতরা তাদের
বিবাহ করতে
আগ্রহী হয়
না।
তখন বিলাতে
শিক্ষিত হওয়া
ছিল ব্যয়সাপেক্ষ।
আভিজাত্য ও
সম্ভ্রম ধনসম্পদের
ওপর নির্ভরশীল
ছিল। তাই
বিদ্যাশিক্ষার জন্য
গরিব লোকেরা
তাদের কন্যাসন্তানদের
ধর্মীয় শিক্ষা
নেয়ার জন্য
মক্তবে পাঠাত।
সেখানে ছেলেমেয়েরা
আলাদাভাবে শিক্ষাগ্রহণ
করত।
ইংল্যান্ড ও
ফ্রান্সে অনাথ
ও দরিদ্র
শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণের
ব্যবস্থা সরকারিভাবে
করা হতো
বলে এ
বাঙালি পর্যটক
লিখেছেন। শহর
ও শহরতলির
গরিব লোকেরা
যারা সন্তানদের
ভরণপোষণ করতে
পারে না,
ছয় মাস
ও এক
বছরের শিশুকে
তারা সেই
সরকারি বাড়ির
দরজায় এনে
রাজকর্মচারীদের হাতে
সোপর্দ করে
দেয়।
বারাঙ্গনাদের গর্ভপাত
করারও অনুমতি
ছিল না।
সে সময়
ইংল্যান্ডে গর্ভপাতকে
আইনগতভাবে হত্যার
শামিল বলে
ধরা হতো এবং
একমাত্র শাস্তি
ছিল মৃত্যুদণ্ড।
তাই তারা
সন্তান প্রসব
করার পর
এ ইমারতের
দরজায় রেখে
চলে যেত।
সেসব বাচ্চাকে
অত্যাবশ্যকীয়ভাবে লিখতে-পড়তে
শেখানো হয়।
তাদের বিভিন্ন
শিল্পকর্ম ও
পেশা শিক্ষা
দেয়া হয়।
ছেলেমেয়েদের শিক্ষার
জন্য আলাদা
নির্দিষ্ট স্থান
আছে। কিন্তু
মেয়েদের লেখাপড়া
শিক্ষা শেষ
হয়ে যাওয়ার
পর তাদের
নানা ধরণের
সেলাই শেখানো
হয়। দক্ষ
জনশক্তি গড়ে
তোলার প্রয়াসে
সবসময় ইউরোপ
এগিয়ে ছিল।
সেজন্যই হয়তো
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য
বিশ্বজুড়ে ছিল।
সাম্রাজ্য না
থাকলেও বিশ্বজুড়ে
তারা এখনো
বিরাজমান।
সুইনটন ও
তার কয়েকজন
বন্ধু তাকে
ফারসি ভাষার
শিক্ষক হিসেবে
ইংল্যান্ডে থাকতে
রাজি করানোর
চেষ্টা করেছিলেন,
এমনকি তিনি
তাকে একজন
ইংরেজ ভদ্র
মহিলাকে বিয়ে
করতে প্ররোচিত
করার চেষ্টা
করেছিলেন, কিন্তু
তিনি রাজি
হননি।
এলিজা বিনতে এলাহী: পর্যটক ও শিক্ষক





