[আবু মহামেদ হাবিবুল্লাহ কৃত মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিনের ফারসি ভাষায় প্রণীত শিগার্ফ-নামা-এ-বিলায়েত নামক গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ বিলায়েতনামার অংশবিশেষ। বর্তমান শিরোনামটি আমাদের দেয়া। ঢাকার দিব্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত সংস্করণ থেকে সংকলিত]
শোনা যায়,
প্রাচীনকালে দস্তুর
ছিল যে
কোনো প্রধান
ব্যক্তি মারা
গেলে তার
আত্মীয়-পরিজনরা
মরদেহকে নানা
প্রকার ওষুধ
ও ভেষজ
তেল মাখিয়ে
গাছের পাতা
ও কাপড়
জড়িয়ে রেখে
দিত, যাতে
প্রয়োজন হলে
তার চেহারা
ও অবয়ব
দেখানো যেতে
পারে। এ
রকম সাক্ষ্য-প্রমাণের
জন্য যখনই
মোড়ক খোলা
যায়, মরদেহের
গায়ের রঙ
তাজা ও
অপরিবর্তিত পাওয়া
যায়। তবে
খোলার সময়
সতর্কতার প্রয়োজন;
কোনো প্রকার
বাতাস মরদেহকে
স্পর্শ করলেই
তা পচে
যাবে; নচেৎ
হাজার হাজার
বছর পর্যন্ত
টাটকা থাকবে।
সেখানে (ব্রিটিশ
মিউজিয়ামে) আমি
লবণ সমুদ্রের
শৃঙ্গযুক্ত মাছের
ছোট ও
বড় শৃঙ্গের
নমুনা দেখলাম।
এ মাছকে
‘tiger
fish’
বলা হয়।
ছুরি ও
ভোজালির বাঁট
প্রভৃতি এর
থেকে তৈরি
করা হয়।
এ জাতের
মাছের একটা
বড় আকারের
মাছ হয়,
তারও একটা
শৃঙ্গ সেখানে
রক্ষিত আছে।
কালো হরিণের
শৃঙ্গের মতো
বাঁকানো, মেপে
দেখলাম দৈর্ঘ্যে
পাঁচ হাত,
বাঁশের মতো
মোটা আর
এমন ভারী
যে দুই
হাত দিয়ে
অতি কষ্টে
তোলা যায়।
একটা মাছের
মাথা দেখলাম
যার দেহের
আকার চিন্তা
করলে স্তম্ভিত
হতে হয়।
মাথাটি একটা
বড় হাতির
মাথার মতো,
আর মুখের
আকৃতি গরুর
মুখের মতো,
মাথার উচ্চতা
মানুষের উচ্চতার
চেয়ে বেশি।
মনে হলো
জীবিতকালে এ
মাছের মুখ
খোলা থাকলে
তার মধ্যে
হাতিও ঢুকতে
পারে। এসব
অতিকায় মত্স্য
শিকারের পদ্ধতি
এই রকম—ইংল্যান্ডের
উত্তর কোণে
তিন মাসের
পথের দূরত্বে
একটা জায়গা
আছে, যেখানে
নয় মাস
রাত্রি-দিন
অন্ধকার থাকে,
আর তিন
মাস দিবালোক
থাকে এবং
তখন রাত্রি-দিনের
প্রভেদ বোঝা
যায় না।
এ নয়
মাসের মধ্যে
টুপিধারী ইংরেজরা
এসব মত্স্য
শিকারের জন্য
সেখানে যায়।
শিকার করার
রীতি হচ্ছে
সেখানে বরফ
ও অত্যধিক
ঠাণ্ডার জন্য
সমুদ্রের পানি
জমে গিয়ে
সমতল পাতের
মতো দেখায়।
এ মাছের
পিঠের কাঁটাগুলো
তার ওপরে
জেগে থাকে
আর দূর
তা থেকে
দেখা যায়।
জাহাজ থেকে
খালাসিরা নেমে
কুঠার দিয়ে
বরফ ভেঙে
ফেলে এবং
মাছের চক্ষু
দেখা গেলেই
দড়ি বা
শিকলে বাঁধা
বিষাক্ত তীর
বা কাঁটা
ছুড়ে সে
চক্ষু বিদ্ধ
করে, শিকলের
অন্যপ্রান্ত জাহাজে
মাছ ধরা
ছিপের হুইলের
মতো একটি
চাকায় পেঁচিয়ে
বাঁধা থাকে।
লোহার কাটা
মাছের পিঠের
তিন জায়গায়
মজবুত করে
গেঁথে দিয়ে
শিকারিরা ছুটে
জাহাজে এসে
ওঠে। মাছের
চোখের মধ্যে
বিশেষ ক্রিয়া
আরম্ভ হতেই
সে নড়ে
ওঠে এবং
ক্রমাগত সরে
যায় এবং
জাহাজকেও সঙ্গে
টেনে নিয়ে
চলে, আর
জমানো বরফ
তখন পাপড়ের
মতো ভেঙে
যেতে থাকে।
এভাবে জাহাজকে
১০-১২
ক্রোশ টেনে
নিয়ে যাওয়ার
পর মাছটি
মরে যায়।
তখন শিকারিরা
জাহাজ থেকে
নেমে এসে
ছোরাছুরি দিয়ে
মাছের মাংস
ও অস্থি
কেটে জাহাজে
নিয়ে যায়
এবং কাঠের
হাঁড়িতে রেখে
আগুনের তাপ
দিয়ে তার
থেকে তেল
বের করে।
সে তেল
বিলাতে নিয়ে
এসে বিক্রয়
করে। এ
তেল প্রদীপ,
কাঠের কাজ,
গৃহনির্মাণ ও
অন্যান্য কাজে
ব্যবহূত হয়
এবং মাছের
অস্থি থেকে
বাক্স, বন্দুকের
কুঁদো প্রভৃতি
তৈরি হয়।
শোনা যায়,
যে বিষ
দিয়ে মাছটিকে
মারা হয়,
তা আসলে
হলুদ।
লন্ডন শহর
থেকে দুইদিনের
পথে অক্সফোর্ড
অবস্থিত। সেখানে
হাজার বছরের
কিংবা তার
চেয়েও পূর্বেকার
নির্মিত মাদ্রাসা
ও গির্জার
ইমারত দেখা
গেল, যা
এখনো বেশ
অটুটভাবে দাঁড়িয়ে,
মনে হয়
যেন সদ্য
নির্মাণ করা।
সিসের পাত
দিয়ে ছাদ
ঢাকা হয়েছে,
বৃষ্টি তাতে
প্রবেশ করতে
পারে না।
ছাদের ওপরের
দিকে সমান
করে চুন
সুরকির পলেস্তারা
করা, কড়ি
বরগার জন্য
কাঠের পরিবর্তে
অষ্টধাতু ব্যবহার
করা হয়েছে।
ছাদের আকৃতি
বাংলাদেশ ও
হিন্দুস্তানের চৌচালা
ঘরের মতো,
চালের প্রত্যেক
কোণে লোহার
পাত ও
পেরেক দিয়ে
জোড়া দিয়ে
শক্ত করা
হয়েছে। বৃষ্টিপাত
ও ঝড়ের
আধিক্য সত্ত্বেও
এসব ঘরের,
যাতে খুঁটি
বা কড়ি
বরগার নাম-গন্ধ
নেই, কোনো
রকম ক্ষতি
হয় না।
সেখানে পুরনো
বেশ কয়েকটি
বাগানও দেখা
গেল। নানা
রকম গাছের
বিন্যাস করে
ও মধ্যে
মধ্যে চৌবাচ্চা
তৈরি করে
রাস্তা ও
কুঞ্জবন রচনা
করা হয়েছে।
গাছের ডালপালাগুলো
এমনভাবে ছাঁটা
হয়েছে যে
কোনোটা মানুষের
আকৃতি, কোনোটা
বিভিন্ন রকমের
পশু, কিংবা
ছোট ছোট
বারান্দাযুক্ত ঘরের
মতো প্রতীয়মান
হয়। এ
রকম বিচিত্র
উদ্যান রচনা
অবশ্য সমস্ত
জীবনব্যাপী প্রচেষ্টার
ফল।
Dr. Hun: নামে
একজন লোক
এক বিদ্যালয়ের
শিক্ষক ছিলেন।
সে বিদ্যালয়ে
অনেক ফারসি
পুস্তক ছিল,
এর মধ্যে
‘কলিলা
ওরা দিমনা’
একটি ফারসি
তর্জমা আমি
দেখলাম। সেখানেই
ক্যাপ্টেন সুইনটনের
জন্য ‘ফারহাঙ্গে
জাহাঙ্গীরি’র
শেষাংশ এ
অধম নকল
করে দেয়।
এখানে কলকাতার
আদালতে জজ
রূপে কর্মরত
মিস্টার জোনস
নামে এক
ভদ্রলোকের সঙ্গে
আলাপ হলো।
উপরিউক্ত ক্যাপ্টেন
সুইনটন এ
অধমকে জোনস
সাহেবের সঙ্গে
গ্রন্থাগার পরিদর্শন
করতে নিয়ে
গেলেন। সেখানে
বহু আরবি,
ফারসি ও
তুর্কি পুস্তক
দেখলাম। তার
মধ্যে হারবিনিয়া
নামক সমুদ্রতীরে
তুর্কি সাম্রাজ্যের
অন্তর্গত এক
রাজ্যের রাজার
ইংল্যান্ডের রাজাকে
তুর্কি ও
ফারসিতে লেখা
একটি চিঠি
ছিল, যা
নাকি সে
সময়ে ফারসি
ভাষা ভালোভাবে
কারো জানা
না থাকায়
কেউ সম্পূর্ণ
হূদয়ঙ্গম করতে
পারেনি। অনেক
জায়গায় অর্থ
পরিষ্কার হয়নি।
চিঠিটা অধমকে
দেখান হলো,
আমি সবটাই
পড়ে সাহেবদের
বুঝিয়ে দিলাম।
সে সময়ে
আমার বিদ্যাবুদ্ধি
পরীক্ষা করার
জন্য আরো
কয়েকটা বই
আনা হলো।
তাদের অনুরোধে
সেসব বইয়ের
অংশ বিশেষ
পড়ে আমার
জ্ঞান মতো
তার অর্থ
বুঝিয়ে দিলাম,
তাতে তাদের
কাছে আমার
বিদ্যাবত্তা প্রমাণিত
হলো। বিলাত
আসার পথে
জাহাজে ক্যাপ্টেন
সুইনটন আমার
কাছে ‘কলিলা
ওয়া দিমনা’
বইটি পাঠ
করেছিলেন।
তাকে আমি
ফারসি ব্যাকরণসংক্রান্ত
‘ফারহাঙ্গে
জাহাঙ্গীর’, ‘দোয়াজদহ
আইন’ নামক
অধ্যায়টিও লিখে
দিয়েছিলুম, যাতে
তিনি ইংরাজিতে
তার অনুবাদ
করতে পারেন।
লন্ডনে পৌঁছনোর
পর মিস্টার
জোনস সেটি
দেখে এবং
তা অবলম্বন
করে ক্যাপ্টেন
সুইনটনের সম্মতি
নিয়ে ‘শকরিস্তান’
নামে একটি
বই সংকলন
করে মুদ্রিত
করেন এবং
তা বিক্রয়
করে প্রচুর
অর্থ উপার্জন
করেন। বিলাতের
সাহেবদের মধ্যে
‘শকরিস্তান’
এখনো প্রচলিত
আছে। একটি
গ্রন্থাগারে দক্ষ
শিল্পী ও
চিত্রকরদের হাতে
তৈরি অনেক
সুন্দর চিত্র
ও মূর্তি
দেখলাম, ধনী
লোকরা বিভিন্ন
দেশ থেকে
২০ হাজার
টাকা পর্যন্ত
মূল্য দিয়ে
এগুলো সংগ্রহ
করে এনে
এখানে রেখে
দিয়েছে। দেখলাম
সেগুলোর বেশির
ভাগ নারী-পুরুষের
মর্মর প্রতিকৃতি,
মিসর ও
গ্রিসের তৈরি,
পাঁচ-সাত
হাত উঁচু।
প্রাচীনকালের মানুষের
দৈর্ঘ্যের নমুনা
মনে হলো।
এ অধম
যদিও এসব
মূর্তি ও
ভাস্কর্যের দোষ-ত্রুটি
বিচারে অক্ষম,
তবু আপাতদৃষ্টিতে
এগুলোর মুখমণ্ডল,
গঠন, দেহের
আকৃতি, ভাব
ও ভঙ্গির
সঙ্গে বাস্তবের
তিলমাত্র পার্থক্য
দেখা যায়
না। সৃষ্টি
ক্ষমতায় এসব
শিল্পী যেন
মানী ও
বিহজাদের কীর্তিকেও
ছাড়িয়ে গেছে।
যদিও এখন
ইংল্যান্ড সব
বিদ্যা ও
শিল্পীদের কেন্দ্রভূমি।
তবু এ
রকম চিত্র
ও ভাস্কর্য
এখানেও হয়
না। সেজন্য
প্রাচীন মিসরে
একজন দক্ষ
চিত্রশিল্পী ছিল,
যার হাতের
আঁকা চারটি
ছবি পৃথিবীতে
খুব বিখ্যাত
হয়েছিল। হজরত
ইয়াহিয়ার সঙ্গে
দুর্ব্যবহারের জন্য
ইহুদিদের ওপর
প্রতিশোধ নেয়ার
জন্য পারস্যের
সম্রাট তার
বিরুদ্ধে যখন
সৈন্য পরিচালনা
করে, তখন
ইয়ুনানী চিত্র
ও শিল্পের
নমুনার অনেকগুলো
নষ্ট ও
বিক্ষিপ্ত হয়ে
যায়। ওই
চারটি ছবির
একটিও সেই
সঙ্গে হারিয়ে
যায়। এ
হারানো ছবিটি
উদ্ধারের জন্য
বিলাতের লোকেরা
বহু চেষ্টা
করেছে এবং
ঘোষণা করেছে
কেউ এ
ছবি উদ্ধার
করতে পারলে
সে ১
লাখ টাকা
পুরস্কার পাবে,
কোনো কোনো
ধনী ব্যক্তি
২ লাখ,
৩ লাখ
দেয়ারও প্রতিশ্রুতি
দিয়েছে, কিন্তু
এখন পর্যন্ত
তার কোনো
সন্ধান পাওয়া
যায়নি। অবশিষ্ট
তিনটি ছবি
এখন ফিরিঙ্গিদের
দেশে আছে।
গল্প আছে,
পুরাকালে ইংল্যান্ডে
একজন শিল্পী
ছিল, যে
সে যুগের
অদ্বিতীয় ওস্তাদ
ছিল। সে
এক দরিদ্র
ব্যক্তিকে নিজের
গৃহে নিয়ে
গিয়ে ওষুধ
পান করিয়ে
সংজ্ঞাহীন করে
দেয় এবং
তাকে দেয়ালের
গায়ে দাঁড়
করিয়ে তার
দুই পা
দুই দিকে
লোহার পেরেকের
সঙ্গে বেঁধে
আর দুই
হাত দুই
দিকে প্রসারিত
করে দেয়ালের
গায়ে পেরেকের
সঙ্গে শক্ত
করে বেঁধে
রাখে। লোকটির
যখন হুঁশ
হলো, তখন
শিল্পী একটা
ধারালো ছোরা
দিয়ে তার
পেটে আঘাত
করল। সেই
মুহূর্তে লোকটির
মুখে ও
দেহে যন্ত্রণার
যে অভিব্যক্তি
হলো শিল্পী
তার চিত্র
এঁকে নিল।
তার আগে
কেউ কখনো
এ রকম
যন্ত্রণাকাতর মানবদেহের
ছবি আঁকেনি।
শিল্পরসিকদের হাতে
যখন ছবিটি
পৌঁছল, সবাই
তার প্রশংসায়
পঞ্চমুখ হলো।
কিছুদিন পরে
এ নির্দোষ
লোকটির হত্যার
সংবাদ বাইরে
প্রকাশ পেল
এবং হত্যাকারী
শিল্পীর প্রাণদণ্ডের
আদেশ হলো।
তাকে ফাঁসি
দেয়ার পূর্ব
মুহূর্তে শিল্পী
বলল, ছবিটি
এখনো অসম্পূর্ণ
রয়েছে, আরো
কিছু রঙ
দিতে হবে।
ছবিটি তখন
তার হাতে
দেয়া হলে
এ নিষ্ঠুর
লোকটি তাতে
কালো কালি
মাখিয়ে সম্পূর্ণ
ঢেকে দিল।
দর্শকরা তার
এ রকম
আচরণে আশ্চর্য
হলো, আর
বলতে লাগল,
‘হায়
হায়, এমন
অসামান্য ছবিটি
নষ্ট হয়ে
গেল!’ তাকে
তখন রাজার
কাছে নিয়ে
যাওয়া হলো।
রাজা তাকে
জিজ্ঞাসা করলেন
এ রকম
কাজ সে
কেন করল?
সে বলল,
‘অনেক
পরিশ্রম ও
অধ্যবসায় করে
আমি ছবিটি
এঁকেছিলাম। এখন
যদি এর
জন্য আমার
প্রাণ যায়,
তাহলে ছবিটি
রেখে আমার
কী লাভ?’
রাজা বলল,
‘যদি
তোমায় প্রাণ
ভিক্ষা দিই,
তুমি কি
ছবিটিকে পুনরুদ্ধার
করতে পারো
না? প্রত্যেক
তালারই তো
চাবি থাকে!’
রাজা তার
প্রাণভিক্ষার প্রতিশ্রুতি
দিলে শিল্পী
ছবির ওপরে
কালো রঙের
যে প্রলেপ
দিয়েছিল, তা
তখনো কাগজের
ভেতরে প্রবেশ
করেনি বলে
এক বিশেষ
প্রক্রিয়ায় সে
রঙ ধুয়ে
ফেলল, এতে
ছবিটা পরিচ্ছন্ন
হয়ে তার
পূর্বাবস্থায় ফিরে
এলো। দর্শকরা
তা দেখে
আশ্চর্য হলো
এবং শিল্পী-শ্রেষ্ঠ
বলে স্বীকৃত
হলো। জ্ঞানী
ও পণ্ডিত
ব্যক্তিরা জানেন,
এখন এ
জাতির মধ্যে
শিল্পী ও
চিত্রকরদের মর্যাদা
এত উঁচু
যে কাগজের
ওপরে অঙ্কিত
ছবি বা
নকশার জন্য
এরা লক্ষ
লক্ষ টাকা
ব্যয় করতে
প্রস্তুত, কোনো
নকশায় শিল্প
ক্ষমতার লক্ষণ
দেখলে এরা
অকৃপণ হাতে
পুরস্কার দেয়
এবং দেশের
গণ্যমান্যদের মধ্যে
সে শিল্পী
স্থান পায়।
এ রকম
দেশে জ্ঞান
ও শিল্পকর্মের
উন্নতি না
হওয়াই আশ্চর্য।
কিন্তু হিন্দুস্তানে
কেউ সারা
জীবন জ্ঞান
আহরণ ও
শিল্প শিক্ষায়
অতিবাহিত করে
যদি নিজ
যুগের শ্রেষ্ঠ
পণ্ডিত ও
শিল্পী হয়ে
ওঠে, তবু
সমাজপতিরা তাকে
সম্মান দেয়
না, সে
চিরদিন দরিদ্র
ও অবহেলিত
হয়। যদিও
পাণ্ডিত্য ও
শিল্প ক্ষমতার
বলে সে
খ্যাতির শীর্ষে
পৌঁছে যায়,
তবু সে
শ্রদ্ধা লাভ
করে না।
এ অবস্থায়
কারো জ্ঞানচর্চা
বা শিল্পকর্মে
আত্মনিয়োগ করাই
আশ্চর্য।
ওখানে একটা
মানমন্দিরও দেখলাম।
উচ্চতায় প্রায়
এক হাজার
হাত, আর
প্রস্থে ৫০০
হাত। কিছু
অংশ গোল,
বাকি অংশ
অষ্টকোনাকৃতি, সাদা
ও কালো
পাথরের তৈরি,
নয়তলা। ওপরে
গম্বুজ, মধ্যে
মধ্যে কাচের
গবাক্ষ। প্রত্যেক
তলে এক
বিঘতের মতো
ছিদ্র আছে,
যার মধ্য
দিয়ে সূর্যের
আলো নিচের
তলে পৌঁছে।
প্রতি তলে
পদার্থ ও
জ্যোতিষবিদ্যার পুস্তক
রক্ষিত আছে।
বিজ্ঞানীরা ওপরে
গিয়ে বড়
দূরবীনের সাহায্যে
আকাশমণ্ডল ও
দ্বাদশ রাশি
নির্ণয় করে
গ্রহ-নক্ষত্রাদির
গতি ও
অবস্থান পর্যবেক্ষণ
করে এবং
প্রত্যেক রাশি
ও উদয়
অস্তের প্রভাব
ও ফলাফল
অনুসন্ধান করে।
পদার্থবিদ্যার (Physics)
এক বিদ্যায়তনে
আমি ভূমণ্ডল
ও জ্যোতির্মণ্ডলের
একটা সম্পূর্ণ
নকশা দেখলাম,
পৃথিবী ও
আকাশের কাঠের
নমুনা তৈরি
করা হয়েছে।
তাতে দেখলাম
যে সপ্তম
আকাশ অন্য
আকাশগুলোকে বেষ্টন
করে রয়েছে।
প্রত্যেক আকাশ
অন্যটি থেকে
পাঁচ মাইল
দূরে অবস্থিত
বলে দেখানো
হয়েছে। কাজেই
জনসাধারণের ধারণা
যে আকাশ
পর্দার মতো
একটির ওপরে
আর একটি
রক্ষিত তা
ভুল। বিলাতের
বৈজ্ঞানিকরা বলে
যে আকাশগুলো
যদি একটির
ওপরে আর
একটি গায়ে
গায়ে লাগানো
থাকত, তাহলে
সপ্তম আকাশে
যেসব নক্ষত্র
আছে সেগুলো
দেখা যেত
না। এ
সম্বন্ধে এ
অধমের মনে
যে সন্দেহ
ছিল, আকাশমণ্ডলের
এ প্রতিকৃতি
দেখে তা
দূর হলো।
আকাশমণ্ডলের বৃত্তের
মধ্যে ডিম্বের
মতো ঝুলন্তভাবে
যে পৃথিবীর
আকৃতি দেখানো
হয়েছে, তা
চাকার মতো
একটা ক্ষুদ্র
কাঠের দণ্ডের
মধ্যে আটকানো,
যা ঘোরালে
পৃথিবী ঘোরে,
আর আকাশ
স্থির থাকে।
এ দণ্ডের
ওপর পৃথিবী
প্রতি মুহূর্তে
৩৬০ বার
ঘোরে আর
বছরে একবার
ওপর থেকে
নিচে সম্পূর্ণ
ঘুরে যায়।
সপ্ত ইকলিমের
নকশাও দেখলাম,
পৃথিবীর গ্লোবের
ওপরে ও
নিচে, দক্ষিণে
ও বামে
সে নকশা
লাগানো আছে।
আকাশের মধ্যে
পৃথিবী থাকাতে
প্রত্যেক দেশের
মানুষ চন্দ্র,
সূর্য ও
গ্রহ-তারকা
দেখতে পায়,
সবাই বলে
আমরা দুনিয়ার
ওপরে আছি,
আর অন্য
দেশের লোকরা
আমাদের নিচে
আছে। এটাই
অনুমানসংগত। কিন্তু
ইরান ও
ফিরিঙ্গিস্তানের বৈজ্ঞানিকদের
মধ্যে পৃথিবী
আকাশের আবর্তন
সম্বন্ধে বিপরীত
মতামত আছে।
বিজ্ঞানের জ্ঞান
না থাকলে
এসব বিতর্কের
কোনো নিশ্চিত
সমাধান পাওয়া
যায় না।
পৃথিবীর আবর্তনের
দরুণ যখনই
আকাশমণ্ডলের কোনো
এক ভাগ
পৃথিবীর সমান্তরালবর্তী
হয়, তখনই
বলা হয়
অমুক রাশিতে
প্রবেশ করেছে।
এবং যখনই
সূর্য, চন্দ্র
ও নক্ষত্রের
প্রতিচ্ছায়া পৃথিবী
ও রাশির
সম্মুখবর্তী হয়ে
দৃশ্যমান হয়,
তখন অনুমান
করা হয়
অমুক নক্ষত্র
অমুক রাশিতে
রয়েছে। এ
রকম সারা
দিনে এক
রাশি থেকে
অন্য রাশিতে
পরিভ্রমণ করে।
এদের মধ্যে
চন্দ্রের আবর্তন
বেগ সবচেয়ে
বেশি, এক
মিনিটে ৩৬০
বার ঘোরে,
আর প্রতি
মাসে একবার
সূর্যের সঙ্গে
একই রাশিতে
অবস্থান করে।
এ ওই
বিদ্যালয়ে astrolabe-ও
দেখলাম, গোলাকৃতি
করে নির্মিত।
তাতে জ্যোতিষিক
গণনার পরিমাণাদি
আঁকা, যার
দ্বারা সময়ের
শুভাশুভ নির্ণয়
করা যায়।
ওইখানে চিকিৎসাবিদ্যার
একটি বিদ্যালয়
দেখলাম। তার
মধ্যে মাথা
থেকে পা
পর্যন্ত মানুষের
কঙ্কাল লোহার
শিকল ও
পেরেক দিয়ে
প্রতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ
জুড়ে ঝুলিয়ে
রাখা হয়েছে
এবং যেসব
রস দ্বারা
শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে
জোড়া লাগে
তা বিশেষ
চেষ্টা করে
সংগ্রহ করে
রাখা হয়েছে।
***
শৌর্যবীর্যে ও
যুদ্ধবিদ্যায় ইংরেজদের
খ্যাতি জগতজোড়া।
সৈন্যদের কাছে
সেনাধিনায়কের হুকুম
ঐশী হুকুমের
মতো। তাছাড়া
ইংল্যান্ডে এমন
সব আইন
সেনাবাহিনীর জন্য
চালু আছে,
যা অন্য
কোনো দেশে
নেই। যেমন
অধিনায়কের আদেশের
চুল পরিমাণ
ব্যতিক্রম করলে
মৃত্যুদণ্ড বা
উপযুক্ত শাস্তি
দিয়ে বরখাস্ত
করা হয়।
আর কখনো
তাকে সৈন্যদলে
ভর্তি করা
হয় না,
এমনকি অন্য
জীবিকাও সে
পায় না।
এ আইন
যে কেবল
সশস্ত্র সৈন্যদের
ওপরই প্রযোজ্য
তা নয়,
পাইক, ঘোড়সওয়ার,
আমলা, পরিচারক
ও সহিসদের
ওপরেও প্রযোজ্য।
সৈন্য বিভাগের
আইনে যেসব
অপরাধ গুরুতর
বলে বিবেচিত
তার মধ্যে
একটি হচ্ছে
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে
পলায়ন। এটি
এমন অপরাধ
যার ক্ষমা
নেই এবং
অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড
অবধারিত, তা
সে আমির,
উজির এমনকি
রাজপুত্র হোক
না কেন।
তবে এটুকু
অনুমতি আছে
যে বিপক্ষ
সৈন্য সংখ্যায়
চারগুণ বেশি
হলে পলায়ন
বা পশ্চাদপসরণ
ক্ষমাযোগ্য, কিন্তু
বিপক্ষ দল
মাত্র দ্বিগুণ
হলে পৃষ্ঠপ্রদর্শন
করা ঘোর
অপরাধ—যার
দণ্ড মৃত্যু।
পশ্চাদপসরণ যে
অবস্থায় অনিবার্য
তখনো সুকৌশলে
ও সতর্কতার
সঙ্গে তা
সম্পন্ন করতে
হবে, যাতে
সৈন্যরা সাহস
ও নিয়মানুবর্তিতা
হারিয়ে না
ফেলে; যুদ্ধ
করতে করতে
নিরাপদ স্থলে
সরে আসতে
হবে।
যাতে অযথা
সৈন্যক্ষয় না
হয়। যদি
পশ্চাদপসরণ একান্তই
সম্ভব না
হয়, চতুর্দিক
অবরুদ্ধ থাকে,
তাহলে অগত্যা
বীরের ন্যায়
যুদ্ধ করে
প্রাণ দিয়ে
খ্যাতি অর্জন
করতে হবে।
আর যদি
সংখ্যায় তিন-চার
গুণ বেশি
শত্রুকে যুদ্ধে
পরাস্ত করতে
পারে, তাহলে
সৈন্যদের পদোন্নতি
হবে। একটি
বিধি হচ্ছে
পরাজিত শত্রুর
লুণ্ঠিত মাল
ও টাকাকড়ির
পরিমাণ যতই
হোক না
কেন, তার
সবই সৈন্য
ও অধিনায়কদের
প্রাপ্য, পদানুযায়ী
সবার মধ্যে
ভাগ করে
দেয়া হয়।
এটা অন্যান্য
দেশের আইনের
ব্যতিক্রম, যেমন
ফ্রান্স ও
পর্তুগালের রীতি
হচ্ছে দখলীকৃত
মালের এক-চতুর্থাংশ
সৈন্যদের দেয়া
হয়, বাকি
সরকারি ধনাগারে
জমা হয়।
ইংরেজদের আইনের
উদ্দেশ্য হচ্ছে
সৈন্যদের শৌর্য
ও সাহসিকতা
বৃদ্ধি করা;
সুনাম অর্জনের
আকাঙ্ক্ষায়, ধনদৌলত
ও পদোন্নতির
লোভে, যেন
তারা মৃত্যুকে
তুচ্ছ করে
সাহস ও
পৌরুষ নিয়ে
অবিচলিত চিত্তে
সংগ্রামের ভয়াল
সমুদ্রে ঝাঁপ
দিতে পারে,
যাতে হয়
আকাঙ্ক্ষিত রত্নলাভ,
নয়তো রক্তের
তরঙ্গাঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ
হয়ে মৃত্যুবরণ
করতে তারা
দ্বিধা না
করে। অন্যান্য
ফিরিঙ্গির দেশে,
এমনকি পৃথিবীর
কোনো দেশেই
এ ধরনের
আইন নেই।
সৈন্য ও
সর্দারদের নিয়ন্ত্রণ
ও প্রশিক্ষণের
জন্য কিন্তু
অন্য দেশের
চেয়ে ইংরেজদের
এ আইন
খুবই শ্রেষ্ঠ।
তবে অন্য
দেশের যেসব
স্বেচ্ছাতান্ত্রিক রাজা
আছে, তারা
বহু যুদ্ধে
পরীক্ষিত, অভিজ্ঞ
ও সমরকুশলী
নায়কদের একটিমাত্র
যুদ্ধে পরাজয়ের
কারণে বিনষ্ট
করেন না,
কেননা যুদ্ধে
জয়-পরাজয়
খোদার ইচ্ছায়
ঘটে। এসব
রাজারা বরঞ্চ
সেসব নায়কদের
ভর্ত্সনা ও
সাবধান করার
জন্য কাউকে
বদলি, কারো
পদ লাঘব,
আবার কাউকে
পুরস্কৃত করে,
কিন্তু সবাইকে
কাজে বহাল
রাখে।
নিজেদের কৃতিত্ব
বা শৌর্যবীর্য
নিয়ে দর্প
করা ইংরেজদের
চরিত্রবিরুদ্ধ। যারা
এ রকম
করে তাদের
ওরা নিন্দনীয়
মনে করে।
কখনো যুদ্ধের
কথা উঠলে
কোনো অধিনায়ক,
যে সুকৌশল
ও বীরত্বের
বলে যুদ্ধ
জয় করেছে,
সে যুদ্ধের
কেবল নিছক
বস্তুতান্ত্রিক একটা
বর্ণনা দিয়ে
যাবে, নিজের
ভূমিকা মোটেই
উল্লেখ করবে
না। সে
মজলিশের কেউ
যদি অধিনায়কের
প্রশংসা বা
তার কৃতিত্বের
কথা বলে,
তাহলে সে
অধিনায়ক অত্যন্ত
অপ্রতিভভাবে নিজের
পায়ের ওপর
দৃষ্টি নিবদ্ধ
রেখে চুপ
করে বসে
থাকে, আর
লজ্জায় ঘামে।
তাদের সম্মুখে
তাদের প্রশংসা
করা ইংরেজরা
পছন্দ করে
না। কেউ
এ রকম
করলে ওরা
তাকে খোশামুদে
মিথ্যাবাদী মনে
করে। এজন্য
এদের মধ্যে
খোশামোদ করার
রীতি নেই।
সব দেশে
খোশামোদ ও
আত্মম্ভরিতাকে বুদ্ধিমান
লোকেরা ঘৃণ্য
মনে করে,
কেননা তা
কাপুরুষ ও
নীচ প্রকৃতির
লোকের কাজ।
কিন্তু হিন্দুস্তানের
সেপাই ও
সর্দাররা আজকাল
আস্ফাালন ও
চাটুকারিতাকে গৌরবের
একমাত্র উপজীব্য
বলে মনে
করে। যেমন
কেউ যদি
অতি কষ্টে
ও বহু
চেষ্টার পর
একটি শৃগাল
মারে, তাহলে
সে উচ্চকণ্ঠে
ঘোষণা করে—
আজ আমি এক বিরাট সিংহ শিকার করেছি, আর বীরত্বব্যঞ্জক অঙ্গভঙ্গি করে, বুক ফুলিয়ে গোঁফে তাও দিতে থাকে, আর এমন ভাব দেখায় যে অন্য কারো সাহস তার সমতুল্য নয়, এমনকি মহাবীর রুস্তমও তার কাছে বালকমাত্র।





