সবার আগে কালাপানি পেরিয়ে জাতধর্ম খুইয়ে বেশ নাম কামিয়েছিলেন কিংবা গোঁড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিশাপের ভাগিদার হয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। কালাপানি পারাপারের সঙ্গে গোঁড়াই হোক কিংবা প্রগতিশীল—ভারতীয় মুসলমানদের জাতধর্ম বিসর্জনের ব্যাপারটা জড়িত ছিল না বলে এ নিয়ে হইচই কম হতো। তবে বিলাতে গিয়ে পানীয় পান করে, শূকর ভক্ষণ করে, শ্বেতাঙ্গ নারীসঙ্গ করে নরকবাসী হয়ে পড়তে পারে—এ আশঙ্কা বরাবরই ছিল।

রাজা রামমোহন রায় ১৮৩০ সালে রাজা উপাধি নিয়ে বিলাত গিয়ে সেখান না হলেও ভারতবর্ষে যথেষ্ট হইচই সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। সতীদাহ প্রথা রদ করার আইনটি ধর্মীয় মোড়লদের চাপে বাতিল হয়ে যেতে পারে, অনেক কাজের মধ্যে এটা ঠেকানোও ছিল তার বিলাত মিশনের একটি। যেজন্য ক্ষয়িষ্ণু এবং মূলত ক্ষমতাহীন মোগল বাদশাহ তার বিলাত যাত্রায় সহযোগিতা করেছেন এবং তড়িঘড়ি করে রাজা উপাধি দিয়ে ব্রিটিশ কাউন্টারপার্টের সঙ্গে আলোচনায় অনেকটা সমকক্ষ ও মর্যাদাবান করে তুলেছেন। এসবই সম্রাটের নিন্তান্তই স্বার্থসংশ্লিষ্ট—মোগল বাদশাহর বৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি। প্রথম উদ্দেশ্য অর্থাৎ সতীদাহ আইন বাতিলের আশঙ্কাটি ভারতে যেমনই অনুভূত হোক না কেন, বিলাত তা পুনর্বিবেচনার কোনো ক্ষেত্রই তৈরি হয়নি।

রামমোহন রায় বিলাতে কী করেছেন, কী দেখেছেন—নিজে লেখক হলেও সম্ভবত তা লেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মস্তিষ্কের প্রদাহে আক্রান্ত হয়ে ইংল্যান্ডের তখনকার উপশহর ব্রিস্টলে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানকার আরনস ভেলে সিমেট্রিতে সমাহিত হন।

রামমোহন রায়ের মৃত্যুর ৩৩ বছর আগেই বিলাতফেরত আর এক বাঙালি স্বদেশেই সমাহিত হয়েছেন—মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিন। মির্জা সাহেব বিলাত পৌঁছেছিলেন রামমোহন রায় সেখানে পা রাখার ৬৫ বছর আগে। তার পৌঁছা ও ফিরে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি তার সফরটিকে বিস্তারিতভাবে ফারসি ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন ‘শিগার্ফ-নামা-এ-বিলায়েত’ গ্রন্থে। তিনিই প্রথম ভারতীয়, যিনি তার বিলাত সফর এবং সফরলব্ধ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি বিস্তারিতভাবে গ্রন্থভুক্ত করেছেন। জন্মসূত্র ও ধর্মাচারে যার অদৃষ্টবাদীই হওয়ার কথা, সেই ইতিসামুদ্দিন ‘ওয়াইজম্যান অব বিলায়েত’ বলেছেন, জীবনকে মধুর ও সহজ করে তুলতে পার্থিব সম্পদ আহরণ জরুরি।’ আরো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন: শিক্ষা অর্জন করতে হবে কারণ ‘শিক্ষা মানুষের জানার পরিধি ও জ্ঞান বৃদ্ধি করে এবং যারা তার পরামর্শ চায় তাদের সঠিক পথ দেখাতে পারে।’

তিনি যখন বিলাত এলেন তখন কী ঘটল?

‘ইংরেজরা আগে কখনো কোনো ভারতীয় মুনশি দেখেনি, কেবল চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর থেকে আসা লস্করদের দেখেছে। তারপর ভারতীয় ভদ্রলোকদের পোশাক ও আচার সম্পর্কে অবহিত হয়েছে’—তারপর মানে ভারতীয় মুনশিকে দেখার পর। বিলাতে তিনিই প্রথম ভারতীয় ভদ্রলোক।

ইতিসামুদ্দিন লিখলেন: ইংরেজরা আমাকে বাংলার একজন ‘গ্রেটম্যান’ বিবেচনা করেছে, সম্ভবত ভেবেছে নবাবের ভাই, দূর থেকে কাছ থেকে অনেকেই আমাকে দেখতে এল। যেখানেই আমি গিয়েছি বেশ বড় একটি জমায়েত আমাকে সান্নিধ্য দিয়েছে এবং লোকজন বিস্ময়ভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকেছে।... তবে কয়েক মাসের মধ্যেই প্রতিবেশী সকলে আমার প্রতি বন্ধুসুলভ হয়ে ওঠে। যাদের মতে, কিছু আতঙ্ক জেগেছিল তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল এবং আমি যে তাদের অপরিচিত নই সে অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে থাকল।

আনওয়ারুল ইসলামের ‘দ্য ফার্স্ব ইন্ডিয়ান হু ট্র্যাভেলড টু ব্রিটেন অ্যান্ড রোওট অ্যাবাউট ইট’ থেকে উদ্ধৃত করছি:

ইতিসামুদ্দিন ইংরেজদের জাহাজ চালনার পরিশীলিত নেভিগেশন চার্ট এবং জাহাজের কম্পাসের প্রশংসা করেছেন; লন্ডনের রাস্তার আলো, জলচক্র, ঘড়ি এবং সুলভে সাধারণ মানুষের বিনোদন লাভের সুযোগের গুণকীর্তন করলেন। সর্বোপরি ছাপাখানা এবং সাধারণের মধ্যে জ্ঞানের বিস্তারে ছাপাখানার ভূমিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। ... তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়াম এবং অক্সফোর্ডের বড় মাদ্রাসা পরিদর্শন করলেন। এসব দেখে তিনি তার পর্যবেক্ষণের কথা জানালেন: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞানের কারণে বিলাত অধিকতর উন্নতির দিকে তাদের সমাজকে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করছে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্য দেশের উপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে।

ইতিসামুদ্দিনকে কেন বিলাত যেতে হলো?

অনুমান ১৭৩০-এ মোগল সাম্রাজ্যের বাংলা সুবার নদিয়া জেলার চকদহ পরগনায় পাঁচনূর গ্রামে মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিনের জন্ম। তিনি সচ্ছল ও অভিজাত পরিবারের সন্তান হওয়ায় ভালোভাবে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন। আরবি, বাংলা, হিন্দুস্তানি এবং ফারসি ভাষায় কথন, পঠন ও লিখনে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। তার বড় ভাই ছিলেন বাংলার নবাব আলীবর্দী খানের মুফতি ও উপদেষ্টা। তার উদ্যোগেই নবাব মীর জাফর আলী খানের অধীনস্ত দুজন কর্মচারী মুনশি সুলিমুল্লাহ ও মির্জা মুহাম্মদ কাশিম ইতিসামুদ্দিনকে মুনশির কাজে প্রশিক্ষণ দেন এবং তখনকার সরকারি ভাষা ফরসিতে দক্ষ করে তোলেন।

তখনকার বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে নবাব মীর জাফরের মুনশি হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু। মীর কাশিম ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সমর্থন পেয়ে তার শ্বশুর মীর জাফরের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবি গ্রহণ করলে ইতিসামুদ্দিন সরাসরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে মুনশি হিসেবে যোগ দান করেন। দেশপ্রেমিক মীর কাশিম ধীরে ধীরে ইংরেজ কোম্পানি প্রতি কঠোর হয়ে ওঠেন। ইংরেজরাও তাকে অপসারণের জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত বক্সারের যুদ্ধে ৭ জুলাই ১৭৬৩ মীর কাশিম ক্ষমতাচ্যুত হন। কোম্পানির বিশ্বস্ত কর্মচারী হিসেবে ইতিসামুদ্দিন সেদিন বক্সারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাম্পেই অবস্থান করছিলেন। একালের ভাষায় হয়তো তাকে রাজাকার আখ্যাও দেয়া যায়। তাছাড়া তিনি কোম্পানির পক্ষে ক্যাপ্টেন ম্যাককিননের সঙ্গে গিরিয়ার যুদ্ধে এবং উদয়নালার যুদ্ধে সরাসরি মীর কাশিমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছেন। এর আগে কোম্পানির মেজর কার্টিজ ও মেজর মার্কের সঙ্গে চাকরি করার সময় বীরভূমের ভারতসম্রাট বিরোধী রাজা আসাদ উজ-জামানকে দমন করতে সহায়তা করে ভারত সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নজরে আসেন। বক্সার যুদ্ধের পর তিনি কোম্পানির সঙ্গে চাকরি অব্যাহত রাখেন এবং ফয়জাবাদ থেকে শাপুরের যুদ্ধে কর্নেল কারনাককে সহযোগিতা করেন। বাদশাহ শাহ আলম সন্তুষ্ট হয়ে মির্জা খেতাব প্রদান করেন এবং ইতিসামুদ্দিনকে তার অধীনে মুনশির চাকরি গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। সম্রাট শাহ আলম যখন আহমেদাবাদ এলেন তখন মোগল-মারাঠা একটি যৌথ ক্ষমতালিপ্সু চক্র দিল্লির অধিকার নিয়ে নেয়। শাহ আলম কোম্পানির সামরিক সহায়তা নিয়ে দিল্লির সিংহাসন উদ্ধারের পরিকল্পনা করছিলেন কিন্তু চতুর কর্নেল ক্লাইড পরিস্থিতি সম্রাটের জন্য আরো নাজুক করে তুলতে সামরিক সমর্থন যোগাতে অস্বীকৃতি জানান। সম্রাট কোম্পানিকে রাজি করার হুকুম জারি করতে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় জর্জের দরবারে দূত পাঠাবার কথা ভাবছিলেন। দূত তার অনুরোধপত্র বহন করে রাজাকে প্রদান করবে। সম্রাট সুশিক্ষিত মুনশি মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিনকে এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করলেন। তার সফরসঙ্গী হবেন ক্যাপ্টেন অর্চিবল্ড সুইনটন। তিনি তার ভৃত্য মুহাম্মদ মুকিমকেও সঙ্গে নেবেন।

সম্রাট শাহ আলম চিঠি, ১ লাখ টাকা এবং রাজা তৃতীয় জর্জের জন্য উপঢৌকনও দিলেন। কিন্তু কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ কোনোভাবেই চাইলেন না ভারত সম্রাট ও ব্রিটেনের রাজার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হোক। তিনি সুইনটনের কাছ থেকে সম্রাটের চিঠিটি হরণ করলেন এবং বিলাত পৌঁছার আগে বিষয়টি ইতিসামুদ্দিনকে জানাতে নিষেধ করলেন। ইতিসামুদ্দিন যখন জানালেন তখন নিশ্চিত হলেন যে এ মিশনে ব্যর্থ হয়েছেন। রাজা তৃতীয় জর্জের সঙ্গে সাক্ষাতের আর কোনো সুযোগ রইল না। ক্লাইভ কেবল চিঠি নয় ১ লাখ টাকাও রেখে দিয়েছিলেন। এ টাকা অবশ্য তিনি আত্মসাৎ করেননি। সম্রাটের নয় বরং তার নিজের উপহার হিসেবে রাজার কাছে পাঠিয়েছেন। সুইনটনের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটেনি কারণ প্রভাবশালী ক্লাইভের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা সুইনটনের ছিল না। তিনি সুইনটনকে কিছু আরবি শেখালেন। সরাসরি বিলাত না গিয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ উপকূল হয়ে সুইনটনের সঙ্গে ফ্রান্সে এলেন। মরিশাস, মাদাগাস্কার ও উত্তমাশা অন্তরীপও ভ্রমণ করলেন। সুইনটন ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে চলে এলেও তিনি আরো কিছুকাল সেখানে থেকে ডোভার উপকূল হয়ে ১৭৬৬ সালে বিলাত পৌঁছলেন। তিন মাস লন্ডনে কাটানোর পর অক্সফোর্ডে আবার সুইনটনের সঙ্গে মিলিত হলেন। উভয়ে প্রাচ্যতত্ত্ববিদ স্যার উইলিয়াম জোন্সকে দক্ষিণ এশীয় পাণ্ডুলিপি পাঠ ও অনুবাদে সাহায্য করলেন। সে সময় স্যার জোন্স ‘অ গ্রামার অব পার্শিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ’ লিখলেন এবং ফারাহাঙ্গ-ই-জাহাঙ্গীর অনুবাদ করলেন।

১৭৬৮ সালে তিন বছরের সফর শেষে তিনি ভারতে ফিলে এলেন। বিলাতি খাবারের সঙ্গে তিনি তেমন খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি। এটিও তার ফেরার একটি কারণ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাকে আবার নিয়োগ দিল। এবার কূটনৈতিক দায়িত্বে। সারাক্ষণ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সমঝোতা ও দরকষাকষি। জন হ্যামিল্টনকে নিয়ে তিনি পুনা এলেন। চুক্তিনামা তৈরি করলেন এবং বিরোধ প্রশমিত হলো। ততদিনে তিনি ‘বিলায়েত মুনশি’ নামে পরিচিত হয়ে উঠলেন। তার আগেও লস্কর ও আয়া হিসেবে অনেক ভারতীয় ইংল্যান্ড গমন করছেন। কিন্তু শিক্ষিতজনদের মধ্যে তিনিই প্রথম।

রাজনৈতিক টানাপড়েন ও ক্ষমতায় দ্বন্দ্বে দিল্লির অস্থিরতা ও শাসনের দুর্বলতা অপসারণ করতে তিনি শক্তিশালী সম্রাট কামনা করেন। তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক ক্ষমতার কথা ভাবেননি। তিনি তার গ্রন্থে মওলানা রুমির মাসনবির উল্লেখ করেন।

মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিনের গ্রন্থটি এবিএম হাবিবুল্লাহ মূল ফারসি পাণ্ডুলিপি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন।

ইতিসামুদ্দিনের বিলাত হচ্ছে ‘এম্পোরিয়াম অব বিউটি’।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা