১১৮০ হিজরির শাওয়াল
মাসের ৯
তারিখ ছিল
১১৭০ বঙ্গাব্দের
১৩ মাঘ।
মাঘের সেই
শীতের দিনে
হিজলি ঘাট
থেকে মঁসিয়ে
সোরভিল নামের
একটি ফরাসি
জাহাজে বাংলার
মাটি ছেড়ে
সাত সমুদ্র
পাড়ি দিয়ে
বিলেতের পথে
যাত্রা করলেন
মির্জা শেখ
ইতিসামুদ্দিন। খ্রিস্টীয়
ঐতিহ্য অনুসারে
সেটা ছিল
১৭৬৫ সাল।
মোটামুটি তিন
বছর বিলেতে
কাটিয়ে ফিরলেন
দেশে। ১৭৭৯
সালে রচনা
করলেন এ
সফরের বৃত্তান্ত—শিগার্ফ-নামা-এ-বিলায়েত—বিলাতের
আশ্চর্য কাহিনী।
শুধু যে
ইউরোপীয়রা ভারতবর্ষে
এসে বিস্মিত
হয়েছিলেন এমনটা
নয়, পাল্টা
বাংলা থেকে
শিক্ষিতজন লন্ডনে
গিয়ে বস্ফািরিত
চোখে দেখেছেন
সেখানকার সমাজ।
তুলনা করেছেন
নিজেদের সমাজের
সঙ্গে। আর
সেসব হয়ে
আছে ইতিহাসের
আশ্চর্য দলিল।
নদীয়া-কাহিনী
গ্রন্থে
শ্রী কুমুদনাথ
মল্লিক লিখেছেন,
নদীয়ার চকদহের
কাজীপাড়ার কাজী
বংশকে স্থানীয়
উল্লেখযোগ্য এবং
সবিশেষ প্রাচীন
বংশ হিসেবে
উল্লেখ করেছেন।
এ বংশেরই
সন্তান মির্জা
ইতিসামুদ্দিন। শ্রী
কুমুদনাথ আরো
লিখেছেন, “এই
বংশে বহু
বিদ্বান ক্রিয়াবান
দানশীল মহাত্মা
জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।
তন্মধ্যে হজরত
আবদস শুকুর
নামে একজন
সিদ্ধ পুরুষ
জন্মলাভ করিয়াছিলেন।
ইহার নিম্নতম
সপ্তম পুরুষে
বেলাত মুনসী
(মির্জা ইতিসামুদ্দিন
বিলায়েত মুনশি
নামে খ্যাত
ছিলেন) জন্মলাভ
করেন, তিনি
মহা বিদ্বান
ছিলেন. দিল্লি
তখতের বাদশাহ
শাহ আলমের
সময় তিনি
বাদশাহের প্রয়োজনে
তাহার প্রতিনিধি
স্বরূপ বিলাত
গমন করেন।”
শিগার্ফ-নামা-এ-বিলায়েত প্রথম ইংরেজি
অনুবাদ করেন
ক্যাপ্টেন জেমস
এডওয়ার্ড আলেকজান্ডার,
লন্ডন থেকে
১৮২৫ সালে
অনুবাদটি প্রকাশিত
হয়। ১৯৮১
সালে ইতিহাসবিদ
আবু মহামেদ
হাবিবুল্লাহ মূল
ফার্সি থেকে
বইটি বাংলায়
অনুবাদ করেন,
যা বিলায়েতনামা নামে খ্যাত।
মির্জা শেখ
ইতিসামুদ্দিনের ফার্সি
ভাষাজ্ঞান ও
নানা বিষয়ে
পাণ্ডিত্য ইংরেজদের
আকর্ষণ করেছিল।
তারা তাকে
সমাদর করেই
বিলেতে জায়গা
করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু বাংলা
ও পরিজন
ছেড়ে মির্জা
সাহেবের আর
ভালো লাগছিল
না। লিখেছেন—‘সুলেমানের
সিংহাসন অপেক্ষা
নিজ জন্মভূমির
মমতা মহত্ত্বর!
জন্মভূমির কাঁটা
(বিদেশের) সুবাসিত
ফুল অপেক্ষাও
মধুরতর। ইউসুফ
যে মিসরে
রাজত্ব করেছিল,
সেও বলত—কানআনের
ভিখারি হওয়াও
এর চেয়ে
প্রিয়তর।’
এ পর্যায়ে
আমরা বুঝতে
পারি, স্বদেশ
ও আত্মীয়দের
প্রতি মির্জার
ভালোবাসা অটুট
ছিল। ভিন
সংস্কৃতিতে গিয়ে
তিনি বাঁচতে
চাননি। এ
যুগে বহু
দেশপ্রেমিক এক
সময় দেশ
ছেড়ে ইউরোপ
ও আমেরিকার
সমাজে গিয়ে
থিতু হচ্ছেন,
সেখানে রীতিমতো
সুখে-শান্তিতে
কেটে যাচ্ছে
তাদের জীবন।
অনেকে নিয়ে
যাচ্ছেন পুরো
পরিবার। তুলনাটি
না চাইলেও
এসে যায়।
এমনকি সে
কালেও এ
রকম ঘটনা
(তুলনা) ছিল,
খোদ ইতিসামুদ্দিনের
লেখাতেই এমন
পরিস্থিতি জানা
যায়। বলে
রাখা ভালো,
ইতিসামুদ্দিন ফ্রান্স
হয়ে ব্রিটেনে
পৌঁছেছিলেন। “হিজরি
১১৮০ সাল
শওয়াল মাসের
সাত তারিখে
আমরা মরিশাস
দ্বীপে পৌঁছাই।
সেখানে চাটগাঁয়ের
একজন সারেং
এবং হুগলি,
ভেল্লোর ও
সাহপুর নিবাসী
সাতজন মুসলমান
খালাসির সঙ্গে
আমার পরিচয়
হলো; এরা
ঈদের নামাজে
যোগ দিয়েছিল।
তারা সকলেই
সেখানে বিয়ে
করে সন্তানের
পিতা হয়ে
সেখানকার স্থায়ী
অধিবাসী হয়ে
গিয়েছিল। এবং
ফরাসি মেয়ে
বিয়ে করে
নিজেদের ক্রীতদাসত্বের
বন্ধনে জড়িয়ে
ফেলার দরুন
দেশের কোনো
চিন্তাই তাদের
মনে আর
উদয় হতো
না। ফরাসিরাও
তাদেরকে নিজের
দেশে ফিরে
যেতে দিত
না। স্বদেশবাসীর
সাক্ষাৎ পেয়ে
লেখক খুবই
খুশি হয়েছিলেন
বটে কিন্তু
তাদের এ
দেশে থেকে
যাওয়ায় তার
মন বিমর্ষ
হয়ে গেল।
অবশ্য তাদেরই
সাহায্যে আমি
ষোল দিন
থাকবার জন্য
একটি ভালো
ঘর পেয়েছিলাম।”
একসময় ফ্রান্সের
লো বলোন
শহরের উপকূলে
নোঙর করে
তাদের জাহাজ।
সেখানে ইতিসামুদ্দিন
দেখলেন দরিদ্র
ফরাসি মানুষ।
তুলনা করলেন
ইংরেজদের সঙ্গে—“একটা
ব্যাপার দেখে
আমি আশ্চর্য
হলাম। ফরাসিদের
জুতা পরার
সামর্থ্য নেই,
সেজন্য ওরা
কাঠের একটা
খাপ (খড়ম
সদৃশ কিছু?)
বানিয়ে পায়ে
পরে।...ইংল্যান্ডের
লোকদের মধ্যেও
গরিব আছে
বটে, কিন্তু
জুতা-মোজার
অভাব তাদের
হয় না।
ক্যাপ্টেন সুইনটন
ও মি.
পিকক লোকদের
এ রকম
পাদুকা দেখে
হাসতে লাগলেন
এবং বললেন,
এরা বড্ড
গরিব, তার
কারণ পরিশ্রম
ও জীবিকা
অর্জনের ক্ষেত্রে
এরা ইংরেজের
তুলনায় বড়ই
অলস।”
লন্ডনে নেমে
প্রথম দর্শন
আর মেলামেশায়
মুগ্ধ হলেন
মির্জা ইতিসামুদ্দিন—“জাহাজে
যাত্রার দুঃখ-কষ্টে
এ অধমের
মন যেমন
বিমর্ষ হয়েছিল,
লন্ডন শহরের
মনোরম দৃশ্য
দেখে তেমনই
প্রফুল্ল ও
খুশি হয়ে
ওঠে। আমার
চেহারা পুষ্পিত
গোলাপকুঞ্জে নিষ্পত্র
বৃক্ষবৎ হলেও
বিলাতের লোকও
আমাদের পেয়ে
খুশি হলো।
আমার কাপড়-চোপড়ের
দৈন্য সত্ত্বেও
আমি সবার
প্রিয় হয়ে
উঠলাম। এটা
আসলে বিলাতের
লোকের ঔদার্য
ও সত্স্বভাবের
গুণ, কথায়
যার বর্ণনা
বা প্রশংসা
করা অসম্ভব।
গৃহহারা বিদেশীদের
এরা প্রাণাপেক্ষা
প্রিয় বন্ধু
মনে করে
এবং তার
মন রাখতে
ও তুষ্ট
করতে অশেষ
চেষ্টা করে
থাকে।”
শুরুতে পাশ্চাত্যের
চোখে ‘কালা
আদমি’ হিসেবে
দর্শনীয় এক
বস্তু হয়ে
উঠেছিলেন ইতিসামুদ্দিন।
তাকে দেখলে
রাস্তার পাশের
বাড়িঘরের বালক-তরুণরা
ভেতরে গিয়ে
পুরুষদের জানাত,
“দৌড়ে
এসো, দেখবে
একটা কালো
মানুষ যাচ্ছে।”
এরপর এ
বর্ণনা “শোনামাত্র
গৃহকর্তারা নিচে
এসে দুয়ারে
দাঁড়িয়ে আমাকে
দেখত আর
আশ্চর্য হতো।
অনেক শিশু
ও বালক
আমাকে ওদের
ভাষায় যাকে
ডেভিল অর্থাৎ
কালো দৈত্য
বলে, তাই
মনে করে
ভয়ে কাছে
আসত না।”
বোঝা গেল
কালো মানুষ
রূপকথার দৈত্যসম
কিংবা রূপকথার
দৈত্য রাস্তায়
হাজির হয়েছে
এশিয়ার কালো
মানুষের চেহারায়।
এ বর্ণবাদী
মনোজগৎ যেমন
সত্য, তেমনি
ইতিসামুদ্দিন এ-ও
জানাচ্ছেন—“এইভাবে
দু’একমাস
অতীত হবার
পর সকলে
আমার সঙ্গে
বেশ অমায়িক
ও সহূদ
ব্যবহার করতে
লাগল এবং
আমার সম্বন্ধে
তাদের মনে
যে আতঙ্ক
ছিল তা
দূর হয়ে
গিয়ে এমন
অবস্থা হলো
যে আমার
সঙ্গে তারা
অন্তরঙ্গ সুলভ
কৌতুক ও
রসিকতা করতে
আরম্ভ করল।”
মির্জা ইতিসামুদ্দিন
ছিলেন অভিজাত
ঘরের সন্তান,
উপযুক্ত শিক্ষা
পেয়েছিলেন, কাজ
করেছেন নবাব,
সম্রাট কিংবা
ইংরেজ প্রশাসকদের
দপ্তরে। তাই
লন্ডনে গিয়ে
তিনি সেখানকার
শাসন, বিচার
ও প্রতিরক্ষা
ব্যবস্থা নিয়ে
অনুসন্ধান করেন
এবং তার
গ্রন্থেও সে
বিষয় বিশদ
মূল্যায়ন করেছেন।
প্রাচ্যের সামন্তীয়
সংস্কৃতির মানুষ
হয়েও মির্জা
ব্রিটেনবাসীর মধ্যে
যে স্বাধীন
নাগরিক সত্তার
বিকাশ দেখেছেন
তাতে তিনি
মুগ্ধ। অষ্টাদশ
শতাব্দীতে প্রাচ্য
ও ইউরোপের
মনোজগতের মধ্যে
যে বড়
ফারাক তৈরি
হয়ে গিয়েছিল
তা জানা
গেল ইতিসামুদ্দিনের
বিবরণীতে—“ইংরেজ
যে স্বাধীনতাপ্রিয়
জাতি, তার
একটা নিদর্শন
এই যে
উচ্চ বা
নিম্ন, যেকোনো
স্তরেরই লোক
হোক না
কেন, প্রত্যেকে
নিজেকে স্বাধীন
মনে করে,
কেউ কারো
উপরে প্রভুত্বের
দাবি করে
না, মালিক
ও দাস
বা চাকর
এবং মনিবের
সম্পর্ক এরা
নিজেদের উপরে
আরোপ করে
না। অন্যান্য
দেশে যেমন
রাজার ভৃত্য
বা দাস
হওয়া গৌরবের
বিষয় মনে
করা হয়,
বিলাতে কিন্তু
তেমন নয়।
ইংল্যান্ডে উজির-ওমরাহ
ও ছোট-বড়
রাজকর্মচারী সবাই
‘চাকরি’
শব্দটিকে খুব
লজ্জার মনে
করে।”
ক্ষমতাবান ইংরেজরা
নিজেদের দণ্ডমুণ্ডের
কর্তা বিবেচনা
করেন না।
তারা মনে
করেন তারা
কেবল নিজ
নিজ দায়িত্ব
পালন করছেন।
“ওরা
বলে বাদশাহের
নিয়োগ নেহাৎ
আনুষ্ঠানিক কেননা
রাজ্যের শাসন
ব্যবস্থা ও
ইহকালীন কাজকর্মের
সুষ্ঠু পরিচালনার
জন্য একজন
রাজা বা
নায়ক না
হলে চলে
না। সেজন্য
আমরা একজনকে
প্রধান নিযুক্ত
করেছি; যে
কাজের দায়িত্ব
আমরা নিজে
নিয়েছি, তা
আমরা পালন
করি আর
জীবনধারণের জন্য
যিকঞ্চিৎ পারিশ্রমিক
নিয়ে থাকি।”
আদালতকে ততদিনে
ব্রিটিশরা রাষ্ট্রের
গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক
হিসেবে প্রতিষ্ঠা
করেছেন—“জনসাধারণের
কল্যাণের জন্য
যে আদালত
আছে তার
কার্য নির্বাহের
জন্যও কিছু
লোক নিযুক্ত
আছে এবং
তাদের নির্দেশ
ও সিদ্ধান্ত
আমরা শিরোধার্য
বলে মেনে
নিয়েছি; আমাদের
জানমাল ও
সম্মান রক্ষার
জন্য শত্রুর
বিরুদ্ধে যুদ্ধ
করতে ও
আত্মত্যাগ করতে
সমস্ত জাতি
প্রস্তুত থাকে।
কিন্তু আমরা
কেউ কারো
দাস ও
চাকর না।”
সঙ্গে ব্রিটিশরা
আইনসংগত যেকোনো
রাজকীয় আদেশ
নিষ্ঠার সঙ্গে
মেনে চলেন।
যুদ্ধের প্রশ্নেও
রাজাকে পরিস্থিতি
ব্যাখ্যা করে
রাষ্ট্রের প্রয়োজনে
সংশ্লিষ্টদের ময়দানে
অবতীর্ণ হওয়ার
আহ্বান জানাতে
হয়। রাজার
খেয়ালখুশি কিংবা
অহংকারবশত কোনো
যুদ্ধে যেতে
কর্মকর্তারা অস্বীকৃতিও
জানাতে পারেন।
ব্রিটেনের আইন,
আদালত পর্যবেক্ষণ
করে ইতিসামুদ্দিন
জানিয়েছেন, কেউ
আনুষ্ঠানিক অভিযোগ
না জানালে
কারো ঘরের
মধ্যে কী
হচ্ছে তা
নিয়ে সমাজ
কিংবা রাষ্ট্রের
মাথাব্যথার কোনো
কারণ নেই
এবং এ
পরিস্থিতি যে
ভারতবর্ষের একেবারে
উল্টো সে
কথাটি জানতে
মির্জা সাহেব
ভুল করেননি।
তত্কালীন ইংল্যান্ডের
শিক্ষা ব্যবস্থা
নিয়েও নিজের
পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন
ইতিসামুদ্দিন। এখানে
শিক্ষার মূল্য
আছে এবং
নিয়ম-কানুন
বেশ শক্ত।
অভিজাতরা গৃহশিক্ষক
রেখে সন্তানদের
শিক্ষিত করেন
না, বরং
সবাইকে দূরের
কোনো স্কুলে
গিয়ে শিক্ষকদের
তত্ত্বাবধানে থাকতে
হয়। শিক্ষা
ব্যয়বহুল ছিল।
একেবারে দরিদ্রদের
ভালো প্রতিষ্ঠানে
শিক্ষা গ্রহণের
সুযোগ ছিল
না। “যদিও
বিলাতের লোকদেরকে
নিজ সন্তানদের
বিদ্যা শিক্ষার
জন্য দূর
দেশে পাঠিয়ে
তাদের প্রতি
নিষ্ঠুর আচরণ
করে বলে
বাঙলার লোক
দোষারোপ করে
থাকে, কিন্তু
বিচার করে
দেখলে মানতেই
হয় যে
সন্তানের প্রতি
কঠোরতা অবলম্বন
করে বিলাতের
পিতামাতা পরম
বন্ধুর কাজই
করেন, যাতে
তারা বিদ্যা
ও শিল্পে
সুশিক্ষিক হয়ে
সারা জীবন
সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে
কাটাতে পারে।”
শিক্ষার অনুষঙ্গ
হিসেবে বইয়ের
সহজলভ্যতা তার
দৃষ্টি আকর্ষণ
করেছিল। “বিলাতের
শিক্ষক ও
পণ্ডিতরা কঠিন
শাস্ত্রের এমন
সহজ-সরল
পুস্তক রচনা
করে থাকে
যে জ্ঞান,
বিজ্ঞান ও
শিল্পের প্রারম্ভিক
শিক্ষার্থীদের কোনো
অসুবিধা হয়
না। আর
মুদ্রিত পুস্তকের
প্রাচুর্য এত
বেশি যে
কেউ যদি
প্রত্যেকটি শাস্ত্র
ও বিদ্যার
উপরে লিখিত
দশ হাজার
করে বই
কিনতে চায়,
তা এক
দোকান থেকেই
পাওয়া যেতে
পারে। তাছাড়া
বহু পুস্তক
অত্যন্ত সস্তা,
হিন্দুস্তানে শাহনামার
একটি বই
কিনতে হলে
কয়েকশ টাকা
লাগবে, বিলাতে
কিন্তু সেই
বই দশ-বারো
টাকাতেই পাওয়া
যায়।” অবশ্য
ছাপা বইয়ের
আধিপত্যে সুন্দর
হস্তলিপির মূল্য
ব্রিটেনে কমে
গিয়েছিল। সে
নিয়ে মির্জা
আফসোসও করেছেন।
পেশা নির্বাচনে
ব্রিটিশরা স্বাধীন
ছিল। তাদের
এ বৈশিষ্ট্যটি
ইতিসামুদ্দিনের ভালো
লেগেছে এবং
এ স্বাধীনতা
যে ভারতবর্ষে
নেই তাও
উল্লেখ করেছেন।
ব্রিটিশদের এতসব
প্রশংসা মির্জা
কলমে পড়ে
তার মনের
উপনিবেশায়ন নিয়ে
প্রশ্ন উঠতে
পারে। তবে
খেয়াল করলে
দেখা যাবে
এতসবের পরও
তিনি ব্রিটেনে
স্থায়ীভাবে থেকে
যাওয়ার কথা
ভাবেননি। সুইনটন
তাকে নানাভাবে
ইংল্যান্ডে থেকে
যাওয়ার জন্য
অনুরোধ করেছেন,
লোভ দেখিয়েছেন।
কিন্তু নিজের
ধর্ম, জাতি,
পরিচয়কে সবকিছুর
ওপরে স্থান
দিয়ে তিনি
বাংলাতেই ফিরে
এসেছেন। নিজের
ধর্মবিশ্বাস নিয়ে
তিনি ছিলেন
দৃঢ়।
মির্জা ইতিসামুদ্দিন
তার বিবরণীর
শেষ পর্যায়ে
এসে ভারতবর্ষ
আর ইংল্যান্ডের
সমাজের যেসব
পার্থক্য প্রত্যক্ষ
করেছেন তার
ভিত্তিতে মৌলিক
একটি প্রশ্ন
ছুড়ে দেন।
“শারীরিক
পরিশ্রম ও
কষ্ট করাকে
তারা (ব্রিটিশরা)
দক্ষতা জ্ঞান
করে, আলস্য,
বিলাস ও
শৈথিল্যকে দোষণীয়
মনে করে।
সে জাতি
দেশে দেশে
রাজ্য বিস্তার
ও প্রভুত্ব
স্থাপন করবে
না তো
কি আমাদের
হিন্দুস্তানের বর্তমান
অভিজাত ও
আমীর ওমরারা
করবে, যারা
কেবল পোলাও
খাওয়া, বরফ
ও সোরায়
ঠাণ্ডা করা
পানি পান
করা, নরম
মখমলের গদিতে
তাকিয়া হেলান
দিয়ে আরাম
করে মেয়েদের
মতো বসে
থাকা আর
শান-শওকত
আর ভোগবিলাসকেই
জীবনের দস্তুর
বানিয়ে রেখেছে?
যে দেশের
নেতৃবর্গরা এই
রকম, তাদের
দেশ ও
ঘরবাড়ি বিদেশীদের
কব্জায় ভোগদখলে
চলে যাবে
না তো
কি হবে?”
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক





