কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্রে হ্যারিসন রোডের ৬৬ নম্বরে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউজ। এখন সড়কের নাম মহাত্মা গান্ধী রোড। কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকে শিয়ালদহের দিকে কিছুটা গেলেই হাতের ডানে এই ঐতিহাসিক ভবন। মূল রাস্তার ধারেই। চারতলা বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে অবশ্য তিনতলা মনে হয়। কিন্তু ছাদেও কিছু ঘর আছে। সে হিসেবে চারতলা।
এখন জরাজীর্ণ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মতো। পলেস্তারা খসে গেছে। কাঠের বারান্দা। ছাদে পাঁচিলের কাজ করা রেলিং। আদ্যিকালের বনেদি জানালা। এখনো সেখানে মানুষ থাকে। নিচতলায় এখন একটি ভাতের হোটেল। নাম মহল। উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়ির মতোই মাঝখানে খোলা উঠোন। সেখানে ভাতের হোটেলের জন্য মাছ ধোয়া, কাটা, সবজি কাটা, মসলা বাটা ইত্যাদি কর্মযজ্ঞ। যত্রতত্র কাপড় শুকাতে দেয়া। সিটি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেসিডেন্সি কলেজের কাছাকাছি এ আবাসিক হোটেলে জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কাটিয়েছেন বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রভাববিস্তারী কবিদের একজন জীবনানন্দ দাশ।
নির্জনতা আর রূপসী বাংলার কবি বলে যে জীবনানন্দকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরে সীমাবদ্ধ করে রাখার প্রয়াস চলেছে দীর্ঘদিন, সেই মানুষটি মূলত নগরপ্রিয়। তার ভাষায়: ‘চিরদিন শহরেই থাকি, পড়ে থাকি পাটের আড়তে।’ তবে এই পাটের আড়ত কিংবা নগরীর ভেতরে থেকেই তিনি নির্জনতা খুঁজেছেন। যে নির্জনতার ভেতরে বসেই লিখেছিলেন ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের কালজয়ী কবিতাগুলো।
বাণী রায় (নিঃসঙ্গ বিহঙ্গ, বিভাব, জীবনানন্দ জন্মশতবর্ষ সংখ্যা ১৪০৫) এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে: ‘জীবনানন্দের নির্জনতাপ্রিয়তার মধ্যে লক্ষণীয় ছিল এই যে, শহরের প্রাণকেন্দ্রে তিনি থাকতে ভালোবাসতেন। তার গ্রামীণ কবিতা সত্ত্বেও এই দিক থেকে মানসিক প্রবণতা নাগরিক ছিল। যেখানে সভ্যতা বা সংস্কৃতি নেই, সেখানে শুধু প্রকৃতি অথবা নির্জনতা নিয়ে তিনি থাকতে পারেননি। অনেক লোকের মধ্যে নিঃসঙ্গতা তার ধর্ম ছিল।’ বাণী রায় জানাচ্ছেন, তাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করলেও বাড়িতে জনসমাগমহেতু জীবনানন্দ সেখানে কম যেতেন।
জীবনানন্দের নগরপ্রিয়তার আরেকটি কারণ বোধ হয় এটা, জনতার ভেতরেই জনান্তিক বা আড়াল তৈরি করা সহজ। জনতার অন্তরালে নিজেকে লুকিয়ে রাখা যায়। গ্রাম বা মফস্বল শহরে নিজেকে আড়াল করে রাখা কঠিন। কারণ সেখানে সবাই পরিচিত। কে কার থেকে কাকে আড়াল করবে? কিন্তু নগরীতে যেহেতু অধিকাংশ মানুষই অধিকাংশকে চেনে না, তাই জীবনানন্দ মেট্রোপলিটন শহরের মাঝখানে কোনো বাসা-বাড়ি নয়, বেছে নিলেন একটি আবাসিক হোটেল; ৬৬ হ্যারিসন রোড, যেখানে বসে ট্রাম ও বাসের অব্যাহত শব্দের ভেতরেও নির্জনতা খুঁজে নিয়ে দুদণ্ড শান্তির প্রার্থনা করা যায়। স্নেহাকর ভট্টাচার্য আরেকটু এগিয়ে বলছেন, ‘সবার থেকে আলাদা হবার পথের সব বাধা জয় করেছেন বলেই তার নিজের বলার কথার কথাটুকু আর কারুর নয়, একান্তভাবে তারই। শুধু কথাটুকু নয়, ভঙ্গিটুকুও।’
বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএ পাস করার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএ পড়ার সময় জীবনানন্দ থাকতেন অক্সফোর্ড মিশন হোস্টেলে। এরপর ইংরেজিতে মাস্টার্সের পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তির পর থাকা শুরু করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে। জীবনানন্দ আইন পড়ার লোক ছিলেন না। তার পরও হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে থাকার সুবিধা পেতে ইংরেজির পাশাপাশি ল’য়ে ভর্তি হয়েছিলেন। স্বভাবতই আইনবিদ্যার পাঠ সমাপ্ত করেননি। ইংরেজিতে মাস্টার্স শেষ হওয়ার পরই টিউটর হিসেবে যোগ দেন অদূরেই সিটি কলেজে। সেটি ছিল ব্রাহ্মদের। ফলে ব্রাহ্মসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে এই কলেজে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে জীবনানন্দ কিছুটা সুবিধা পেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, তার বাবা প্রখ্যাত শিক্ষক সত্যানন্দ দাশও এই সিটি কলেজের ছাত্র ছিলেন।
১৯২২ সালে সিটি কলেজে টিউটর হিসেবে যোগ দেয়ার পরে জীবনানন্দ থাকা শুরু করেন ৬৬ হ্যারিসন রোডে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে। এরপর কলেজ সংলগ্ন বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ১৮/২/এ নম্বরের বাড়িতে দুটি কক্ষ ভাড়া নেন। ছোট ভাই অশোকানানন্দও তার সঙ্গে থাকতেন। তবে এই বাসায়ও বেশি দিন ছিলেন না। রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটের একটি মেস, কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট সংলগ্ন একটি গলির মধ্যে একটি বাসায় থেকেছেন কিছুদিন।
প্রথম পর্বে কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার পর তিনি বরিশাল থেকে মাঝে মধ্যে কলকাতায় এলেও থাকতেন প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে। অর্থাৎ ছোট ভাই অশোকানন্দ বিয়ে করে আলাদা বাসা নেয়ার আগ পর্যন্ত। ফলে জীবনানন্দের একটা বড় সময় কেটেছে এই আবাসিক হোটেলে।
নাম প্রেসিডেন্সি হলেও প্রেসিডেন্সি কলেজের সঙ্গে এর মালিকানার কোনো সম্পর্ক নেই। নন্দলাল দত্ত নামে এক ভদ্রলোক এটি নির্মাণ করেন। জীবনানন্দের অনেক চিঠিপত্রেই প্রেরকের ঠিকানায় ৬৬ হ্যারিসন রোড লেখা রয়েছে। এমনকি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা একটি চিঠিতেও এ ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।
নন্দলাল দত্তর নাতি সন্দীপ দত্ত মনে করেন, কাছেই প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষার্থীদের অনেকে এখানে থাকতেন বলে তার দাদু হয়তো হোটেলের নাম দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি। তার কাছ থেকে জানা গেল, জীবনানন্দর সময়ে বা এখনো এই জরাজীর্ণ ভবনে যে কয়কজন থাকেন, তারা থাকেন মাসিক হিসেবে। জীবনানন্দের আমলে মাসিক থাকা-খাওয়া (দুপুরে ও রাতে) বাবদ ৩ থেকে ৪ টাকার বেশি ছিল না। ১৯৬৭-৬৮ সালেও তিনি মাসিক থাকা-খাওয়া ৩০ টাকা দেখেছেন। জানালেন, এখনো কয়েকজন এখানে আছেন। তারা বহুকাল ধরেই আছেন। তাদের কারো ভাড়া ৩ হাজার, কারো ৮০০। তবে এখন শুধু থাকার ভাড়া। খাওয়াটা যুক্ত নয়। এখন যারা আছেন, তাদের মধ্যে একজন আইনজীবী, একজন মুহুরি। তাদের পরিবার কলকাতা থেকে দূরে থাকে। এখনো চার-পাঁচটা রুম চালু আছে বলে জানালেন। তবে নতুন করে কাউকে ভাড়া দেয়া হয় না। পুরো ভবনের নকশা ও কাঠামো অবিকল রেখেই এর সংস্কার করার কথা জানালেন সন্দীপ দত্ত।
জীবনানন্দের বন্ধুপ্রতিম ছোট ভাই অশোকানন্দ দাশের (আমার দাদা জীবনানন্দ দাশ, হাওড়া গার্লস কলেজ পত্রিকা, জীবনানন্দ স্মৃতি সংখ্যা ১৯৫৫, পৃষ্ঠা ৪-৫) ভাষ্য: ‘তিনি (জীবনানন্দ) তখন সিটি কলেজে কাজ করেন; হ্যারিসন রোডে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে থাকতেন। আমি পাঠ সমাপ্ত করে কিছুদিন তার সঙ্গে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে ছিলাম। অনেক শীতের সন্ধ্যায় দেখেছি মোহিতবাবু কালো কোট পরে গলায় কমফোর্টার জড়িয়ে এসে আসন গ্রহণ করতেন। বহুক্ষণ ধরে কবিতা নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা চলত।’
জীবনানন্দের ‘আবিষ্কারক’ বুদ্ধদেব বসু (আত্মজৈবনিক, পৃষ্ঠা ৯৯) লিখেছেন, ‘এক বিকেলে অচিন্ত্য আর আমি উৎসাহের ঝোঁকে হানা দিয়েছিলাম তার (জীবনানন্দ) প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ের তেতলায় বা চারতলায়। তিনি ঘরে ছিলেন। আমরা চেয়েছিলাম তাকে নিয়ে কোথাও বেরোবো, কিন্তু সেই ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি আমাদের। আর একদিন অনেকে মিলে যাচ্ছি, কল্লোল দলের প্রিয় রেস্তোরাঁ বৌ বাজারের মোড়ে ইন্দো-বার্মায়, আমাদের সামনে দেখা গেল জীবনানন্দকে। আমরা তাকে চমকে দিয়ে এবং সম্ভবত বিব্রত করে তাকে পিছন থেকে ধরে ফেলেছিলাম।’
প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং নিয়ে কথা হয় জীবনানন্দের জীবনীকার প্রভাতকুমার দাসের সঙ্গে। জানান, বছর ৬০ আগে তিনি একবার গ্রামের বাড়ি মেদিনীপুর থেকে বাবার সঙ্গে কলকাতায় এসে এই প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে রাত্রিযাপন করেছিলেন। এর মালিকও ছিলেন মেদিনীপুরের লোক। প্রভাতকুমার বলেন, ‘কিন্তু তখন আমি জীবনানন্দ সম্পর্কে কিছু জানিও না, শুনিওনি। কিন্তু ওই ভবনে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে।’ তিনি জানান, প্রখ্যাত কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২) এই প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে এসে জীবনানন্দের সঙ্গে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আলাপ করেছিলেন।
ইতিহাস বলছে, ১৯২৮ সালে সিটি কলেজ থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পরে জীবনানন্দ ১৯২৯ সালে বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে মাস কয়েক চাকরি করেন। কিন্তু সেটিও ছেড়ে দেন। এরপর আবার কলকাতায় ফিরে যান। এ সময় এই প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে থেকে গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর দিল্লির রামযশ কলেজে যোগ দেন। কিন্তু ১৯৪৬ সালে চূড়ান্তভাবে কলকাতায় আসার আগ পর্যন্ত যখনই কলকাতায় এসেছেন, ছোট ভাই অশোকানন্দের বিয়ে করার (২৪ এপ্রিল ১৯৪৩) আগ পর্যন্ত তিনি এই বোর্ডিংয়েই উঠতেন। অশোক ও নলিনীর বিয়ের পরে তারা প্রথমে দক্ষিণ কলকাতার রসা রোডে ‘মোহিনী ম্যানশন’ (বাড়িটি খুঁজে পাওয়া যায়নি) নামে একটি বাসায় কিছুদিন থাকেন। ওই বাসায়ও জীবনানন্দ থেকেছেন। তখন তিনি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষক। অশোক-নলিনী দম্পতি ১৯৪৩ সালের ৪ জুলাই (পত্রালাপ জীবনানন্দ দাশ, প্রভাতকুমার দাস সম্পাদিত) ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাসায় চলে যান। আমৃত্যু এটিই জীবনানন্দের ঠিকানা হয়ে যায়।
জীবনানন্দের এ পর্যন্ত যতগুলো চিঠি উদ্ধার করা গেছে, তার অধিকাংশই বরিশালে সর্বানন্দ ভবন থেকে পাঠানো। এর বাইরে এখন পর্যন্ত প্রভাতকুমার দাস মাত্র চারটি উদ্ধার করতে পেরেছেন, যেগুলোয় পত্র প্রেরকের ঠিকানা হিসেবে ৬৬ হ্যারিসন রোড, প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং উল্লেখ আছে। যেমন ১৯২৭ সালের ২৪ নভেম্বর মুরলিধর বসুকে, বাংলা ১৩৩৪ সালের ২৩ অগ্রহায়ণ এবং ওই বছরের ৩ পৌষ সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়কে, ৩ পৌষ তারিখে আরেকটি চিঠি লিখেছিলেন ধূর্জ্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও এই বোর্ডিংয়ে বসে লেখা একটি চিঠির সন্ধান মেলে। তবে সেই চিঠির তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। প্রভাতকুমার দাস জানাচ্ছেন, চিঠিটি রবীন্দ্র ভবন সংগ্রহশালায় নেই। এ থেকে অনুমান করা যায়, চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পাঠাননি। চিঠিটি মূলত রবীন্দ্রনাথের চিঠির জবাব, যেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের স্নেহাশীষ লাভ করে আনন্দিত বলে উল্লেখ করেন। চিঠিতে তিনি রবীন্দ্রনাথকে ‘বাংলাদেশের নবীন লেখকদের মাথার উপরে স্পষ্ট সূর্যালোকের মতো আধুনিক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষী’ বলে উল্লেখ করেন। দীর্ঘ এ চিঠিতে জীবনানন্দ তার কাব্যভাবনা বলতে গিয়ে প্রাচীন গ্রিস, দান্তে, বিঠোফেনের প্রসঙ্গও তোলেন। অর্থাৎ সময়ের চেয়ে অগ্রসরমাণ একজন কবির যে ভাষায় তার সময়কালের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ কবিকে চিঠি লেখার কথা, জীবনানন্দ সে রকম তমিজের সঙ্গেই চিঠিটা লিখেছিলেন। কিন্তু কেন এটি ডাকে দেননি, নাকি ডাকে দিলেও কোনো কারণে চিঠিটি রবীন্দ্র ভবন সংগ্রহশালায় নেই, তা এক প্রশ্ন বটে।
১৯২৮ সালের ৬ এপ্রিল মুরলিধর বসুকে লেখা একটি চিঠিতে প্রেরকের ঠিকানায় শুধু কলকাতা লেখা। ধারণা করা যায় এই চিঠিটিও ৬৬ হ্যারিসন রোডে বসেই লেখা। যেখানে তিনি লিখেছেন: ‘দুয়েকদিনের মধ্যেই আমি দেশে যাব। চলে যাবার আগে আপনাদের সঙ্গে একবার দেখা করে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।’ দেশ মানে বরিশাল। জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় পূর্ব বাংলার এই শহরে কাটলেও শেষদিকে বস্তুত দেশভাগের প্রাক্কালে একজন অমুসলিম কলেজশিক্ষকের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার ভীতিতে ১৯৪৬ সালে শেষবারের মতো প্রিয় দেশ ছেড়ে তিনি স্থায়ী হন এ কলকাতাতেই।
শুধু চিঠিপত্র নয়, জীবনানন্দের গল্পেও এই বোর্ডিংয়ের কথা এসেছে। ‘বিন্দুবাসিনী’ গল্পের শুরুতে নায়ক সুধীনের কথা বলা হচ্ছে: ‘ধরো কলকাতার দিনগুলো হ্যারিসন রোডের একটা বোর্ডিংয়ের কামরায় থেকে যখন সে দিনের পর দিন নিরবচ্ছিন্নভাবে কাটিয়ে দেয়, চেষ্টা করে, পড়ে, লিখে, আড্ডা দিয়ে, কিন্তু এক মুহূর্তও সুষমার সংস্পর্শে এসে নয়। তিন-চার মাস পরে সুষমার কথা ভেবে মনে হয়তো একটু মধু জমে ওঠে, কিন্তু সেই ফেনাটুকুর বিশেষ কোনো মানে নেই, সুষমার সঙ্গে দেশের বাড়িতে একদিন গিয়ে আবার বাস করলে তা যাবে কেটে, বিস্বাদে ব্যথায় ভরে উঠবে, অবসাদে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।’
৬৬ হ্যারিসন রোডের এই ঠিকানায় জীবনানন্দ ঠিক কতদিন বা কত বছর ছিলেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। ওই বোর্ডিংয়ের পুরনো কাগজপত্র ঘেঁটেও এই রহস্যের কূলকিনারা করা যায়নি। তাছাড়া ঠিক কোন কক্ষে জীবনানন্দ থাকতেন, তাও এখন আর জানার উপায় নেই। কারণ সন্দীপ দত্ত জানাচ্ছেন, ওই সময় কারো জন্য কোনো নির্দিষ্ট ঘর থাকত না। সবাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এ ঘরে-ও ঘরে থাকতেন। আবার জীবনানন্দ যেহেতু ১৯৩৫ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে যোগ দেয়ার পরে ১৯৪৩ সালে অশোকানন্দের বিয়ের আগ পর্যন্ত এই বোর্ডিংয়ে এসে মাঝে মধ্যে থাকতেন, ফলে যখন যেটি খালি পাওয়া যেত, সেখানেই উঠতেন। তিনি ১৯২২ সালে সিটি কলেজে যোগ দেয়ার পরে বেশ কিছুদিন এখানে ছিলেন। মাঝখানে কিছুদিন অশোককে সঙ্গে নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন ঠিকানায়, অর্থাৎ ১৯২২ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত সময়কালে জীবনানন্দ বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন মেয়াদে এ বোর্ডিংয়ে ছিলেন।
তবে ৬৬ নম্বর হ্যারিসন রোডের এই প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং শুধু জীবনানন্দের কারণেই নয়, বাংলা সাহিত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের কারণেও বিখ্যাত; তিনি ব্যোমকেশ। জনপ্রিয় গোয়েন্দা ব্যোমকেশও এই ঠিকানায় থাকতেন জীবনানন্দের কালেই। তিনিও তখন ব্যাচেলর। সঞ্জীব দত্তর তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৯ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত এই বোর্ডিংয়ে থাকতেন ব্যোমকেশখ্যাত শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। সত্যবতীকে বিয়ে করার পর চলে যান দক্ষিণ কলকাতার কেয়াতলায়।
জীবনানন্দের কবিতায় হ্যারিসন রোড শব্দটি বহুবার এসেছে। এর মধ্যে একটি লাইন এ রকম: ‘ঘুমের ভেতরে তবু হ্যারিসন রোডে গভীর অসুখ’। এই রোড ধরে এখনো ঘণ্টা বাজিয়ে চলে যায় ট্রাম, বাস। এসবের পাশ দিয়েই হাতেটানা রিকশা। দীর্ঘ এ সড়কের গা ঘেঁষে ডানে-বাঁয়ে ঢুকে গেছে অজস্র গলি। যেসব গলির নামও তিনি লিখেছেন। যেসব গলির ভেতর দিয়ে হেঁটেছেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। ঐতিহাসিক এ ভবন প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং সংস্কারের পরে এখানে জীবনানন্দের স্মৃতিতে একটি আবক্ষ মূর্তি এবং তার নামে একটি কক্ষের নামকরণ করা যেতে পারে।






