কোয়ামি অ্যান্টনি আপিয়া
অনুবাদ: শওকত হোসেন
নুরুদ্দিন ফারাহর সঙ্গে কবে প্রথম পরিচয় হয়েছিল মনে নেই, তবে সেটা কোনো সম্মেলনেই হবে। এক ভবন থেকে অন্য ভবনে যাওয়ার পথে নানা গল্প বলেছিলেন তিনি, সেগুলোর বেশির ভাগই আফ্রিকান লেখক বেসি হিদকে নিয়ে। তিনি সত্যিকার অর্থে গল্প শুরু করার পর আর থামতে না বলে পারিনি, কারণ হাসির চোটে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। অবশ্যই তার লেখার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল, ভালোও লাগত। ১৯৭০ সালে লন্ডনে ২৫ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস ফ্রম আ ক্রুকেড রিব প্রকাশের ভেতর দিয়ে সোমালিয়ার প্রথম ঔপন্যাসিকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি (যদিও অবশ্যই কোনোভাবেই প্রথম মহান সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, কারণ এক উজ্জ্বল মৌখিক সাহিত্যিক ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি, যে সাহিত্য এখন অডিও রেকর্ডিংয়ের কল্যাণে প্রচারিত হতে পারে)। ফারাহ কেবল সোমালি নয়, বরং ইতালীয়, আরবি, আমহারিক এবং অবশ্যই তার নয়টি উপন্যাসের ভাষা চমৎকার ইংরেজি বলতে পারেন।
তিনি মূলত একটি জায়গা নিয়েই—সোমালিয়া—লেখালেখিতে ব্যস্ত লেখক হলেও এক ধরনের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন। বিশ্বের এমন এক অঞ্চলের নারীবাদী লেখক তিনি, যেখানে পুরুষ লেখকদের ভেতর বিষয়টি প্রায় অজানা বলা চলে। এমনকি বিরাট কোনো কাহিনী বয়ানের সময়েও, যেমন স্বৈরাচার দেশের কি দশা করতে পারে— সম্পূর্ণ কাল্পনিক নারী ও পুরুষ, তাদের পরিবার, তাদের বন্ধুত্ব, ভালো-মন্দ গুণ— কোন জিনিসটা বিশেষত তাদের অনন্য করে তোলে এবং কোন জিনিসটা তাদের আমাদের মতো মানুষে পরিণত করে, সেটা বর্ণনা করেন। ১৯৭৪ সালে সোমালিয়া ছেড়ে এক ধরনের পরিব্রাজকের জীবন শুরু করেছিলেন তিনি। তার সোমালি পূর্বপুরুষরাই হয়তো অর্থবোধক হতে পারত। যদিও ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকায় বাস করে আরো ব্যাপক বিস্তৃত এলাকা সফর করেছেন। দুই বছর পর আ নেকেড নিডল প্রকাশের মাধ্যমে সোমালিয়ার স্বৈরশাসক সাঈদ বারির কুনজরে পড়েন তিনি। ফলে ২২ বছরের দীর্ঘ নির্বাসনের সূচনা ঘটে। সাঈদ বারির বিদায়ে সোমালিয়া সংকটে পড়লে সেই নির্বাসনের অবসান ঘটে। সোমালিয়া এখনো সে সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ফারাহ এবং আমি প্রায়ই বিভিন্ন সম্মেলনে একসঙ্গে হই, ই-মেইল মারফত যোগাযোগ রাখি এবং বিশ্বের একই অঞ্চলে থাকার সম্ভাবনা থাকলে দেখা করার চেষ্টা করি। সোমালি ডায়াসপোরায় বিপুল চাহিদা রয়েছে তার এবং উদারভাবে স্বদেশীদের সঙ্গে মেশেন তিনি। তার সর্বশেষ আবাস দক্ষিণ আফ্রিকায়, অ্যাংলো স্যাকসন স্ত্রী আমিনা ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকছেন। আমিনা কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। গত বছর তিনি নিউইয়র্ক সফরে এলে ম্যানহাটনে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে এসেছিলেন তিনি। চা পানের অবসরে আমাদের ভেতর আলাপ-আলোচনা হয় (অ্যাংলো ঔপনিবেশিক আফ্রিকায় বেড়ে ওঠা দুজন মানুষের ভেতর যেমনটা আশা করতে পারেন আপনি)।
প্রশ্ন: বেশ, এ মুহূর্তে কী করছেন, সেই প্রশ্ন দিয়েই শুরু করা যাক।
উত্তর: আপ স্টেট নিউইয়র্কে একটা রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম ‘আর্ট অমনিতে’ আছি, নিরিবিলি পরিবেশ এবং একটা উপন্যাস নতুন করে লেখা উপভোগ করছি। দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজের ভেতর দিয়ে পুনর্লিখনে খুবই নিয়ম মেনে কাজ করি আমি, খুব অল্প ঘুমাই। এভাবে গল্পের কোথায় কোথায় দুর্বলতা আছে বুঝতে পারি। একেকটা উপন্যাস তিন থেকে চারবার লিখি আমি। সবসময়ই গোড়া থেকে শুরু করে কোথাও না থেমে আগে বাড়ি এবং তারপর তিন, চার বা ছয় মাসের জন্য খসড়াটা দূরে সরিয়ে রাখি। তারপর মোটামুটি স্মৃতি থেকে ফের লিখি।
প্রশ্ন: এসব খসড়াই রেখে দেন?
উত্তর: যতক্ষণ সবগুলোর কাজ শেষ না হচ্ছে খসড়াগুলো রেখে দিই, কোনোটা বেশ খারাপ আবার কোনোটা তত খারাপ নয়।
প্রশ্ন: গোটা প্রক্রিয়ার নাগাল পেলে হাতে স্বর্গ পাওয়ার মতো বহু সাহিত্যিক, প্রত্নবিদ পাওয়া যাবে।
উত্তর: খসড়াগুলো দিয়ে কারো তেমন একটা ফায়দা হবে বলে মনে করি না। গোড়ার দিকে খসড়াগুলোর কোনোটা দেখে আপনার মনে হবে আমি হয়তো লেখার কায়দাই জানি না এবং হয়তো সত্যিই জানি না। দ্রুত লিখি আমি, তারপর সমান দ্রুত নতুন করে লিখি। প্রথমবারের মতো ৫৭০ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস লিখলেও সেটিকে এখন ৩০০-র কিছু বেশি কলেবরে নামিয়ে আনছি। এমনিতে উল্টোভাবেই কাজ করি আমি। ১০০ পাতার উপন্যাস লেখা শেষে সেটিকে আরো বিস্তৃত করে তুলি। আমার পুরনো উপন্যাসগুলোর মতো প্রায় একই ধরনের উপন্যাস বের করতে সবচেয়ে ঘৃণা করি আমি। সেটি যাতে না ঘটে, সেজন্য সম্পূর্ণ এবং বিপুলভাবে ভিন্ন কিছু সৃষ্টির আশায় লিখতে বসামাত্র কথা নিজেকে বোঝাই, যেন প্রথমবারের মতো করছি কাজটা। প্রবন্ধ বা উপন্যাস কিংবা নাটক লেখার সময় প্রতিবারই এমন করি আমি।
প্রশ্ন: তাহলে উপন্যাসের বিষয়বস্তুর কারণে লেখার প্রক্রিয়া বদলায় না?
উত্তর: কায়দাটাই গুরুত্বপূর্ণ। লেখালেখিকে আমি একাকী একটা কামরায় খেলার মতো দেখি। সবচেয়ে প্রীতিকর পেশা এটি নয়, কীভাবেই বা হবে? নিজেকে একটা কামরায় বন্দি করে রোজ ফাঁকা কাগজের মুখোমুখি হচ্ছেন। পেশা হিসেবে লেখালেখি ক্লান্তিকর, আদৌ উপভোগ্য নয়। খুব বেশি প্রশংসিতও হয় না, আবার কেউ বোঝেও না।
প্রশ্ন: তাহলে লেখালেখির এ অপ্রীতিকর কাজে এলেন কীভাবে?
উত্তর: (হাসি) কীভাবে লিখতে হয় জানার ঢের আগেই লেখালেখিতে আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। বলতে পারেন আরবি বর্ণমালার প্রথম কয়েকটি হরফ শেখার পর পরই শুরু হয়েছিল এটা, দারুণ মোহনীয় ঠেকেছিল আমার কাছে, আরবি ক্যালিগ্রাফি আমাদের বাড়ির দেয়াল অলংকৃত করত। এত আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম যে অবিরাম নকল করতাম সেগুলো। আমাদের শহরের বহু লোকই নিরক্ষর ছিল এবং তাদের বিরাট একটা অংশ আমি ফলপ্রসূ কোনো কাজে লেগে আছি বলে বিশ্বাস করত। এমনকি আমার মা-বাবাও আমার ব্যবসাকে কোরআনের ভাষা আরবির পবিত্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত করেছিলেন। তারা জানতেন না যে আমি কেবল হরফের পবিত্রতায় নয়, বরং আলংকারিক সৌন্দর্যে মোহিত হয়েছিলাম। সোমালিদের ভেতর ধার্মিক হওয়ার ঝোঁক থাকলেও কোরআন বা ইসলাম সম্পর্কে তাদের তেমন গভীর জ্ঞান ছিল না। পড়া আর নকলই আমার পলায়নের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তারপর আরবি ভাষায় সেক্যুলার লেখালেখির সংস্পর্শে আসি আমি এবং সমানভাবে মুগ্ধ হই। আসলে আমার নাম নুরুদ্দিন এক হাজার এক আরব্য রজনীর এক যুবরাজের নাম জেনে আরো বেশি উত্তেজনা বোধ করেছি। দুষ্টুমি করে এক হাজার এক আরব্য রজনীর প্রতিটি কপি থেকে নুরুদ্দিন নামটা কেটে এক্সারসাইজ বুকে সেঁটে দিয়েছিলাম। খেলার সাথীদের বড়াই করে বলতাম, ‘দেখো, আমি একজন লেখক।’ পরে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরের কাজে নিয়োজিত আমেরিকান ইভাঞ্জেলিকাল মিশনে প্রতিষ্ঠিত আমার স্কুলের ইংরেজি পাঠ্যবইয়ের প্রতিও সমান আগ্রহ দেখিয়েছি আমি। আমি বলব, আমার ১৫ বছর বয়সে বিড়ালের আক্রমণের বিরুদ্ধে ইঁদুরের দলের ষড়যন্ত্রের একটা লোককাহিনীর নতুন বয়ানের চেষ্টার মাধ্যমে লেখালেখির প্রথম প্রয়াস পেয়েছিলাম। গল্পটাকে নিজের মতো করে তোলার ইচ্ছায় গল্পের ইঁদুর আর বিড়াল চরিত্রগুলোর নামের জায়গায় আমার সহপাঠীদের নাম জুড়ে দিয়েছিলাম। যাদের পছন্দ করতাম তাদের ভালো নাম দিয়েছিলাম, যাদের পছন্দ করতাম না তাদের দিয়েছি বাজে নাম।
প্রশ্ন: তাহলে একটা লোককাহিনী নতুন করে বয়ান করছিলেন আপনি?
উত্তর: ওটাকে নতুন রূপ দিয়ে আমার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ চাপিয়ে দিচ্ছিলাম। যাহোক, ততদিনে আমার ভাই আমাকে আরবিতে দস্তয়েভস্কি ও ভিক্তর হুগোর বই পড়তে দিয়েছিলেন। ইংরেজিতে লেখা বইও দিয়েছিলেন তিনি; সেগুলো বোঝা দূরে থাক, পড়তেই পারতাম না; প্রতিটা শব্দ আন্ডারলাইন করে ডিকশনারিতে অর্থ খুঁজে বের করতে হতো। তখন ভাই বছরে একবার গোটা ডিকশনারি পড়ার পরামর্শ দেন। বেশ কয়েক বছর তা-ই করেছি।
প্রশ্ন: ছোট থাকতে দুটি ভাষা ছিল আপনার— সোমালি ও আরবি এবং তারপর আপনার ভাই আপনাকে ইংরেজি ভাষার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু কোরআন সম্পর্কে ভীষণ সিরিয়াস ছিলেন আপনি, তাই নয় কি? খুব ভালো করে জানা ছিল আপনার এটি।
উত্তর: বাবা কোরআন শিক্ষার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলেন। আমি ছিলাম চতুর্থ সন্তান। বেশ কয়েকজন ছেলে সন্তানের অধিকারী পরিবারগুলোর ঐতিহ্য ছিল একজনকে কোরআন ও ধর্মশিক্ষায় নিবেদন করা। আমাকেই বেছে নেয়া হয় এবং আধ্যাত্মিক বিষয়-আশয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। দুর্দান্ত স্মৃতিশক্তির সুবাদে অল্প বয়সেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোরআন আবৃত্তি করতে পারতাম। তাই বাবা ধরে নিয়েছিলেন আমি ভালো কিছুই হব। দুর্ভাগ্যক্রমে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার স্মৃতিশক্তি অবিশ্বস্ত হয়ে ওঠে। ...১৯৪৫ সালের শেষদিকে আমার জন্ম, যখন দুনিয়ার সব জায়গার মতো বহু প্রাচীন ঐতিহ্য হয় প্রত্যাখ্যাত বা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। দুনিয়াটা যেমন ছিল, তার থেকে সম্পূর্ণ অজানা কিছুতে বদলে যাচ্ছিল। এসবই আমাদের জীবন ও দুনিয়াকে দেখার আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছিল।
প্রশ্ন: ওগাদেন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় আপনার জন্ম?
উত্তর: হ্যাঁ এবং আমার বাবা ব্রিটিশ গভর্নরের দোভাষী হিসেবে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসে ছিলেন। আমার জন্ম শহর বায়দোয়া থেকে বাবাকে বদলি করে দেয়া হয়েছিল। ইতালির দখলে ছিল শহরটা, ইতালীয়রা ওগাদেনে যুদ্ধে হেরে গেলে ব্রিটিশরা অধিকার করে নেয়। পরে ব্রিটিশরা ওগাদেনকে হাইলে সেলাসির কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইথিওপিয়ার কাছে হস্তান্তর করে। ১৯৪৮ সাল নাগাদ বাবা দোভাষীর চাকরির সুবাদে কৃষিকাজ শুরুর সময় পর্যন্ত যথেষ্ট টাকা জমিয়েছিলেন। বাবা তিল, ভুট্টা, লেটুস, লেবু আর পেঁপে উৎপাদন করতেন।
প্রশ্ন: তাহলে খামারই আপনার প্রথম স্মৃতি ছিল?
উত্তর: শহরের যেখানে আমরা থাকতাম, সেখান থেকে খামার ১০ মাইল দূরে ছিল। ছোট থাকতে—কারো পিঠে বা কাঁধে করে—আমাকে ওখানে নিয়ে যাওয়ার কথা মনে আছে। বড় হয়ে হাঁটতে শেখার পর খামারের কাজে সাহায্য করেছি।
প্রশ্ন: তখন থেকে অনেক জায়গাতেই ছিলেন আপনি— ভারত, গাম্বিয়া, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, উগান্ডা, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
উত্তর: হ্যাঁ, তবে সোমালিয়ার ধারণার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলাম। আমি বলব, আমি যেসব জায়গায় ছিলাম, সেসব জায়গা সম্পর্কে যা জানি তা বড়জোর হাজার শব্দেই লিখে ফেলা যাবে, তার বেশি লাগবে না। অবশ্যই এসব দেশের পটভূমিতে উপন্যাস লিখতে পারি, কিন্তু গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে গেলে এ ধরনের বইয়ের মূল্য সামান্যই।
প্রশ্ন: সোমালিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের কারণেই আপনি সোমালিয়া ছাড়তে বাধ্য হন। অন্য জায়গাগুলোয় স্বেচ্ছায় যাননি, নির্বাসিত ছিলেন আপনি। কথাটা কি ঠিক?
উত্তর: সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে সোমালিয়ায় আমার দ্বিতীয় উপন্যাসটা লিখতে শুরু করি। ১৯৭০ সালে আমার প্রথম উপন্যাস ফ্রম আ ক্রুকেড রিব বের করেছিলাম, বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল সেটা, বিশেষ করে নারী মহলে জনপ্রিয় কাল্ট বই ছিল সেটা, ঘটনাক্রমে যুক্তরাজ্যে বইটি পেঙ্গুইন ক্ল্যাসিক হিসেবে নতুন করে বেরিয়েছে।
প্রশ্ন: প্রথম উপন্যাস ইংরেজিতে লিখেছিলেন?
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: আমি নিশ্চিত যে লোকে প্রায়ই আপনাকে প্রশ্নটি করে থাকে, তবে আরবি বা সোমালি কিংবা ইংরেজি লিখতে পারেন এমন কারো বেলায় প্রশ্নটা কৌতূহলোদ্দীপক: কীভাবে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, নাকি স্রেফ লিখছেন বলে আবিষ্কার করেছেন?
উত্তর: তখন আমার মাতৃভাষা সোমালির কোনো এথনোগ্রাফি না থাকায় ইংরেজিতে লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তাহলে আরবি, আমহারিক বা ইতালীয়তে লিখলাম না কেন? ব্যাপারটা ছিল এমন, একটা ভালো, নিরেট আমেরিকান টাইপরাইটার স্থির করে দিয়েছিল যে আমি ইংরেজিতে লিখব। রাজকীয় জিনিস ছিল সেটা, মনে ধরে গিয়েছিল। টাইপ করার সময় ওটার আওয়াজ ভালো লাগত। আমার লেখার মতো অন্য ভাষায় যথেষ্ট ভালো টাইপরাইটার পাইনি। গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় ছিল, আমার বেশির ভাগ বুদ্ধিবৃত্তিক গঠন ছিল ইংরেজিতে। তাছাড়া রীতিমতো বাস্তববাদী মানুষ হওয়ায় জানতাম আমহারিকে টাইপরাইটারে ধারণ করার পক্ষে বড্ড বেশি হরফ ছিল, ঢের জটিল ছিল সেটা। আরবির তো প্রশ্নই ছিল না, কারণ আমাদের পেনিনসুলায় আরবি সাধারণ ভাষা ছিল না; যেভাবেই হোক, আমার কাছেও আরবি ভিনদেশী ভাষা ছিল। অচিরেই সোমালি ভাষায় একটা উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলাম, একমাত্র মোগাদিসু দৈনিকে প্রতি সপ্তাহে এক অধ্যায় হিসেবে বের হচ্ছিল সেটা। সেন্সরশিপ রোর্ডের লোকজনের গোটা দুই অধ্যায় পছন্দ না হওয়ায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়। আমার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে টেক্সটে কাটছাঁট করতে রাজি হইনি। ভেবে দেখুন! ‘এটা শিল্পকর্ম,’ যুক্তি দেখিয়েছি আমি। ‘তুমি শিল্পের ব্যাখ্যা দিয়ো না, গ্রহণ করো নয়তো বাদ দাও।’ তো সোমালি ভাষায় আমার উপন্যাসের প্রকাশনাই কেবল বন্ধ হয়নি, সেন্সর বোর্ড সে সময় অবধি আমার প্রকাশিত একমাত্র উপন্যাস ফ্রম আ ক্রুকেড রিবও নিষিদ্ধ করে। অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ি আমি। সোমালিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষকতা করছিলাম কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আরো ঝামেলা এড়াতে ১৯৭৪ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিল স্কলারশিপ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব এসেক্সে থিয়েটার বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রিতে পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ডে চলে আসি। দুই বছর পরে আমার সোমালিয়া ফেরার সময় হওয়ার মাসখানেক আগে আ নেকেড নিডল বের করি। ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় বেশ কয়েকটি অনুকূল সমালোচনায় উপন্যাসটিকে এক দিক থেকে সাঈদ বারি সরকারের প্রতি বৈরী প্রহসনমূলক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তো মোগাদিসু এয়ারপোর্টে আমাকে নিতে আসতে আমার এক ভাইকে যখন ফোন করলাম, সে বলল, ‘বোঝা যাচ্ছে, তুমি টের পাওনি— তুমি এখন এক নম্বর শত্রু। তোমাকে অন্য কোনো কাজ খোঁজার পরামর্শ দিচ্ছি আমরা, সোমালিয়ার কথা ভুলে যাও।’ ফলে আমি নির্বাসিত হয়ে গেলাম।
প্রশ্ন: আপনি বলছেন, লিখতে চান এমন একটি জায়গাই আছে আপনার। সেখান থেকে আপনি কেবল প্রত্যক্ষভাবে বিচ্ছিন্নই নন, নির্বাসন কত দীর্ঘ হবে তাও জানেন না। সাঈদ বারির উত্তরাধিকার হয়তো আপনার বাকি জীবনে রয়ে যাবে। তো সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াতে হয়েছে আপনাকে অথচ তার পরও কেবল সোমালিয়া নিয়েই লিখতে চান।
উত্তর: সাঈদ বারি এখন মৃত, কবরে। কিন্তু সে যা পেছনে রেখে গেছে, তা আমাদের তাড়া করে ফেরে। কারণ স্বৈরাচার সবসময়ই বিকল মন, অসংখ্য হিসাবহীন অমঙ্গল রেখে যায়। সোমালি গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল স্বৈরাচারের কারণে। যখন ইচ্ছা ফিরে যেতে পারি আমি, কিন্তু বাড়তি একটা জটিলতা আছে এখানে: তরুণ একটা পরিবার আছে আমার, ওরা কেপটাউনে সুখে আছে। এখানে আমরা বাড়ি কিনেছি। আমার স্ত্রীর চমৎকার একটা চাকরি আছে, তিন সন্তান সন্তুষ্টির সঙ্গে থিতু হয়ে গেছে। তবু স্থায়ীভাবে সোমালিয়ায় ফিরে গিয়ে থাকতে পারলে ভালো হতো বৈকি। কিন্তু এটা নিয়ে জোর করার মতো ভাগ্যবান আমি নই, তার মানে হবে ওদের উন্মূল করে দেয়া। তাছাড়া অবস্থা যেমন, সোমালিয়া কোনো কাজ চালানোর মতো অবস্থায় নেই: চালু কোনো স্কুল নেই, আমার স্ত্রীর জন্য কোনো কাজ নেই ইত্যাদি। কে জানে, দক্ষিণ আফ্রিকায় কাজে লাগার মতো অবস্থা তৈরি হতে পারে, তখন নতুন করে ভেবে দেখব আমরা। এ অবসরে নির্বাসিত হিসেবে আমার চেনা পৃথিবীর ওপরই আস্থা রাখব আমি। আর যে দেশে বাস করতে পারছি না, সে দেশ নিয়ে আমার প্রথম ভাষা নয়, এমন এক ভাষায় লিখে যাব।
প্রশ্ন: কিংবা আপনার দ্বিতীয়।
উত্তর: কিংবা আমার দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়। (হাসি) এসব স্ববিরোধিতা আমার অবস্থান পুনর্মূল্যায়নে সাহায্য করে এবং একদিক থেকে এসব অস্বস্তি আমাকে আমার কল্পনায় আমারই বিকলন জরিপে সাহায্য করে, যে বিকৃতি আমার বিষয়বস্তুর প্রতি মনোযোগ জোরালো করে— যে দেশ থেকে আমি বিচ্ছিন্ন।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম উপন্যাসে সোমালিয়াকে টানাপড়েনে রূপলাভ করা একটা জায়গা হিসেবে লিখেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেখানে বসবাসরত মানুষগুলোর ভেতর ভালোবাসা আর সম্পর্ক আছে। পৃথিবী বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা কীভাবে লৈঙ্গিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান খুঁজে পাবে, সে-সম্পর্কিত প্রশ্নও আছে। আপনি কিন্তু আসলে পুরো সময়টায় প্রত্যক্ষভাবে সাঈদ বারির ওপর চড়াও হননি।
উত্তর: আমার সতীর্থ সোমালিদের এ কাজটা করার জন্যই চ্যালেঞ্জ করব আমি: সাঈদ বারি নয়, বরং শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ে কথা বলতে হবে। মানুষটা নয়, সিস্টেমই মানুষকে তৈরি করে— এ দুটো পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ‘সোমালি পরিবারের কাঠামো পর্যালোচনা করে দেখো,’ চ্যালেঞ্জ করব আমি, ‘তাহলেই পরিবারের দুর্বল সদস্যদের মনোভাব আর স্পর্শকাতরতার থোড়াই পরোয়া করে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়া খুদে স্বৈরাচারের দেখা পাবে।’ ...আমি ভিলহেম রাইখের কথাই উল্লেখ করব: অর্ধশিক্ষিত প্রতিটি বাবাই সমাজের কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর ভেতর প্রধান প্রতিনিধি। সোমালি সমাজের বিশ্লেষণে প্রায়ই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাই আমি। আমরা যাকে ঘৃণা করি, সেই স্বৈরাচারেরই প্রতিমূর্তিতে পরিণত হয়ে গেছি। এ যুদ্ধবাজদের, এ স্বৈরাচারদের আমরা ঘৃণা করি এবং ওদের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে নিজেরাই স্বৈরাচারে পরিণত হই। এ জিনিসটাই আফ্রিকার বহু মহান জাতীয়বাদীকে শেষ করে দিয়েছে; তারা কর্তৃত্ববাদীতে পরিণত হয়েছেন, ঠিক যেসব উপনিবেশবাদীর বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ করেছিলেন। একটা প্রশ্ন: আপনি দানবের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করার পর কী ঘটে? আপনি নিজেই দানব হয়ে যান।
প্রশ্ন: তবে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, আপনার উপন্যাসের নারীরা, তরুণী, বয়স্কা খুবই শক্তিশালী মানুষ।
উত্তর: সোমালিয়ার মতো একটা জায়গায় আপনি টিকতেই পারবেন না— আমি সোমালিয়াকে ভালোবাসি কিন্তু ওই জায়গাটা কত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, সেটা কবুলকারী প্রথম ব্যক্তি আমিই— শক্তিশালী না হলে সত্যি এবং বাস্তবিক ওখানে থাকতে পারবেন না। সোমলিয়ার পটভূমিতে একটি নারী চরিত্র শক্তিশালী না হলে কৌতূহল জাগানো হতে পারবে কিনা, তাতে সন্দেহ আছে। আমাকে সরলীকরণ করতে দিন। যে নারীকে পিষ্ট করা হয়েছে, যে কিনা নিজের মনের কথা বলতে অক্ষম, সে কোনো উচ্চাভিলাষী লেখকের লেখা উপন্যাসের চরিত্র হতে পারবে না, যে লেখক তিনি কী করছেন, সেটা জানেন বলে মনে করেন। সব সমাজই নারীদের প্রতি ভয়ংকর, মারাত্মক। আমার চরিত্রগুলোকে আমি মায়ের মতো চরিত্রের আদলে খাড়া করেছি। তিনি শক্তিশালী ছিলেন। আমি একজন শক্তিশালী নারীকে বিয়ে করে সুখে আছি। আমার স্ত্রী যখন নিজের অবস্থান ধরে রেখে বলেন, ‘তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।’ আমার ভালো লাগে। কারো মা-বাবা, স্বামী বা স্ত্রী, দেশের প্রেসিডেন্টকে এটা বলার মতো সামর্থ্য থাকতে হবে। আমার কাছে এটাই গণতন্ত্র।
প্রশ্ন: আপনি যেটা বলছেন, সেটা তো গোটা সামাজিক জীবনের এক ধরনের গণতন্ত্রায়ণ। এর প্রতি আপনার জোরালো অঙ্গীকার কোত্থেকে এসেছে? সোমালিয়ার দিকে কিংবা বলতে গেলে যেকোনো দেশের দিকে তাকালে দেখতে পাবেন দুনিয়াটা নিজেদের কথা শোনাতে চায় এমন মানুষে ভর্তি, কিন্তু তাই বলে অন্যের কথা শুনতে আগ্রহী নয়। আপনি সোমালি ঐতিহ্য কিংবা আপনার পরিবারে অথবা পর্যটক, অভিবাসী হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতায় বিষয়টি আছে মনে করেন কিনা জানতে আগ্রহী আমি।
উত্তর: আমার মায়ের কাছ থেকে এসেছে এ অঙ্গীকার। বাবার চেয়ে ঢের বেশি প্রাজ্ঞ এবং গোছানো ছিলেন তিনি। বাবার বিপরীতে— তার সঙ্গে মতে না মিললে কাউকে সহ্য করতে পারতেন না তিনি— মায়ের শোনার ক্ষমতা ছিল। শোনার এ গুণটা বহু মানুষের ভেতর, বিশেষ করে পুরুষ ও স্বৈরাচারদের, নেই। আপনি যখন শোনেন, নিজেকে শত্রুর বিরুদ্ধে সজ্জিত করেন। অন্য পক্ষ কথা শেষ না করা পর্যন্ত শুনতে হবে, তাহলে ওদের যুক্তির ফাঁকফোকর বের করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। মা এভাবেই করতেন কাজটা। লোকে শোনে না কিংবা সেই ধৈর্য বা সময়ও নেই তাদের। ঔদ্ধত্য বা আপনি বেশি জানেন মনে করা ছোট মনের পরিচায়ক। আমি ধীরে সুস্থে কথা বলি এবং সাধারণত কী বলতে চাইছি, শেষ করার আগেই বহু আলোচক আমি কী বলছি, তাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, তখন—
প্রশ্ন: আপনার লেখায়ও এটা এসেছে, লোকে অন্যদের সঙ্গে ভালো আচরণ করলে কী ঘটতে পারে। অবশ্যই, লোকে যখন একে অন্যের সঙ্গে ভালো আচরণ করে না, তখন কী ঘটে দেখাও সেটা জানার একটা উপায়। সাঈদ বারি উত্খাত হওয়ার পর এখন আপনি সোমালিয়ায় ফিরে যেতে পারেন; নিরাপদ জায়গা নয়, কিন্তু অন্তত বর্তমান প্রশাসনের প্রেসিডেন্টের হাতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবেন না।
উত্তর: (হাসি) এখনো না।
প্রশ্ন: সোমালিয়ার মানুষদের সঙ্গে এসব ধারণার কোনোটা নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন?
উত্তর: বহু রাজনীতিক আর যুদ্ধবাজকে যেসব কথা বলি, তার ভেতর একটি হলো, অন্যরা কী বলছে সেটা শুনুন। শুনলে আপনাকে বন্দুক বের করতে হবে না। সংক্ষেপে, আসুন সোমালি রাজনীতি থেকে অন্ত্র সরিয়ে নিই, এমনকি কেউ যদি আপনার অপছন্দের কথা বলেও। ওরা শেষ করার পর স্রেফ ওদের দিকে তাকান; কিছু বলবেন না। আরো কিছু শুনুন, ওরা তখন মত পাল্টাবে। গত বছর প্রায় দুই মাস ‘শান্তির কথা ভাবতে, শান্তির কথা বলতে’ রাজি করাতে আমার পক্ষে যতদূর সম্ভব বহু যুদ্ধবাজের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি এবার ফিরে গিয়ে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট দলের কথা শোনার পরিকল্পনা করছি, তাদের কেউ সশস্ত্র, কেউ নয়। সোমালিয়ায় থাকলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য জায়গায় পাবলিক লেকচার দিয়ে থাকি। আশা করছি আমার দেশে শান্তি আরো চালু জিনিসে পরিণত হবে। যুদ্ধবাজ, যারা লুটতরাজ করেছে, অন্যদের সম্পত্তি দখল করেছে, তারা কিছুদিন লুটপাটের ফল ভোগ করার পর সেগুলোর কিছু পরিমাণ ফিরিয়ে দেবে।
প্রশ্ন: তাহলে এখন তারা তাদেরই ধ্বংস করা নৈমিত্তিক সাধারণ জীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আপনার পরবর্তী উপন্যাসও কি সোমালিয়ার পটভূমিতেই রচিত?
উত্তর: হ্যাঁ, আমি এখনো সোমালিয়া নিয়েই লিখছি।
প্রশ্ন: এখন সোমালিয়া নিয়ে কী লেখা যেতে পারে?
উত্তর: গৃহযুদ্ধ আর মানুষ কীভাবে গৃহযুদ্ধের সময় বাস করছে, কীভাবে নিজেদের প্রকাশ করছে, তাদের অসুস্থতাকে সারিয়ে তুলতে, ক্ষতিগ্রস্ত স্মৃতিকে মেরামত করতে নিজেদের ভাঙা সত্তাকে কীভাবে জুড়ে নিচ্ছে। বেশিসংখ্যক সোমালি, বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা থেকে পুনর্গঠনে সহায়তা দিতে মোগাদিসুতে ফিরে যাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ শুনতে শুরু করেছে। বুঝতেই পারছেন, আমেরিকান হস্তক্ষেপের সমস্যা ছিল এ রকম: সোমালিদের কথা কানেই তোলেনি ওরা। মোগাদিসুতে নিজের দুর্গে স্বেচ্ছাবন্দি হয়েছিল, একেকবার এক যুদ্ধবাজের দুর্গে হানা দিয়ে তারপর দেশ ছেড়ে চলে গেছে। আমার উপন্যাস লিংকস ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদের সোমালি গৃহযুদ্ধ নিয়ে, জেনারেল আইদিদের সঙ্গে অ্যাডমিরাল হাউইর লড়াইয়ের প্রসঙ্গও আছে এতে। এ উপন্যাসে আমি শহরকেই মূল চরিত্র হিসেবে দেখার চেষ্টা করছি, এখানকার বাসিন্দা বা এখানে যারা বেড়াতে এসেছে, তারা পরিণত হয়েছে গৌণ চরিত্রে।
প্রশ্ন: এটা শহরের জীবনকথা।
উত্তর: এটা দুই পায়ের ফাঁকে লেজ গুটিয়ে রাস্তা দিয়ে ছুটে যাওয়া একটা কুকুরের কাহিনী; সাঈদ বারির সেনাবাহিনীর সদস্য থেকে ভিখিরিতে পরিণত হওয়া খুদে স্বৈরাচারের কাহিনী; শহরটা কীভাবে বিভাজন হলো আর দুর্নীতি কী ভূমিকা রেখেছে, সেই কাহিনী। শহরের বাসিন্দারা ত্রাসের সাক্ষী কিংবা ক্ষয়ক্ষতি অথবা তার কারণে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন: বিগত কয়েক বছরে আপনার আবার সোমালিয়ায় যেতে পারার বাস্তবতা কি লেখার ক্ষেত্রে বিরাট কোনো পার্থক্য এনেছে? নাকি ওখানে আপনার বিভিন্ন কন্টাক্টের মাধ্যমে বরাবরই সম্পর্কিত ছিলেন?
উত্তর: সবকিছু পাল্টে যাওয়ায় ফেলে আসা জায়গায় আসলে কারো ফিরে যাওয়া হয় না, এমন একটা ক্লিশে বুলি আছে না? আমি ফিরে যেতে পারায় গত ছয় বা সাত বছরে আমার লেখা উপকৃত হয়েছে, আরো শাণিত হয়েছে, যেখানে আগে কিছুটা নিরস ছিল। তবে আগে বিভিন্ন বিষয়কে অস্পষ্ট করে ঢের বেশি কাব্যিক ভাব আনতে পারতাম। বেশ কয়েক বছর আগে কোনো রাস্তার নামের ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে বিশেষ কোনো রাস্তার বদলে শহরের একটা এলাকার ওপর বেশি নজর দিতাম। এখন রাস্তাঘাটের নাম জানা থাকায় অন্যান্য বিচ্যুতিও ঢুকে পড়েছে; ফলে আমার লেখায় বিমূর্ত ভাব কমে গেছে। এটা ভালো কিনা বলতে পারব না।
প্রশ্ন: একদিক থেকে গোটা সময়টায় ওখানে না থাকায় আপনার কল্পনা বন্ধনমুক্ত হয়ে গিয়েছিল।
উত্তর: হ্যাঁ। এ থেকে অনেক বেশি শিল্প তুলে আনতে পেরেছিলাম। সেই শিল্প গুণ হারিয়ে ফেলছি কিনা, নিজেকে প্রশ্ন করি আমি, আমার কথা যদি বুঝতে পেরে থাকেন। নাকি কয়েক বছরের মধ্যেই আমার রচনা সেকেলে হয়ে যাবে?
প্রশ্ন: তাহলে নির্দিষ্টতা বিমূর্তের পথে আপনার যাত্রাকে বিঘ্নিত করে।
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: ইংরেজিতে উপন্যাস লিখছেন সোমালিতে লিখতে কখনও প্রলুব্ধ হয়েছেন কি?
উত্তর: বেশ, একই সময়ে নানা বিষয়ে কাজ করছি। সেগুলোর একটা হলো চলচ্চিত্র চিত্রনাট্য আকারে সোমালি ভাষায় একটি উপন্যাস। আমার নির্বাসনে থাকা আর পূর্ণাঙ্গ সোমালি রাষ্ট্র না থাকা, এগুলো সমস্যা। আমি একাকী প্রতিষ্ঠানের মতো। কেউই কিন্তু একাকী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে না, অন্তত লাভজনকভাবে নয়। সোমালিয়ায় কার্যকর রাষ্ট্র থাকলে ইতালি কিংবা জার্মানির ফিল্ম ও টেলিভিশন কোম্পানিগুলো হয়তো আমার সঙ্গে সহযোগিতার ইচ্ছা প্রকাশ করত— এক দেশ থেকে আরেক দেশে, একে আপনি বলেন যৌথ উদ্যোগ, কিন্তু অবস্থা তো আপনি জানেন।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, গোড়ার দিকে মোগাদিসুতে লেখা বের হয়েছিল। নতুন লেখকদের ভাগ্যে এখন কী ঘটছে ওখানে?
উত্তর: খবরের কাগজের পাতায় ছোটগল্প ছাপানো গেলেও মোগাদিসুতে এখন খুব একটা প্রকাশনা ঘটছে না। ঘটনাক্রমে সোমালিয়ার ইতিহাসে যত পত্রিকা ছিল, পত্রিকার সংখ্যা এখন তার চেয়ে ঢের বেশি। সাঈদ বারির আমলে সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি মাত্র পত্রিকা ছিল। এখন প্রায় ১৩টি খবরের কাগজ রয়েছে। ছাপার মান ভয়াবহ, তবে সেসব বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।
প্রশ্ন: কিন্তু সোমালিরা গল্প আর কবিতা পড়তে পারছে, তারা পড়তে চায় ধরে নিয়ে আর কি।
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: রেডিওর কী অবস্থা?
উত্তর: প্রচুর রেডিও অনুষ্ঠান করি আমি। বিবিসি সোমালি সার্ভিস ও স্থানীয় রেডিও স্টেশনগুলোর জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠান করছি। সোমালি মৌখিক ভাষা হওয়ায় রেডিওতে কথা বললে তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়। সম্প্রতি মোগাদিসুতে দেড় ঘণ্টার একটি রেডিও ও টেলিভিশনে সরাসরি কল-ইন অনুষ্ঠান করেছি। বহু শ্রোতা ফোন করে শান্তি ও সংলাপের পক্ষে কথা বলা এবং অস্ত্রের হুঙ্কার থামানোর চেষ্টায় আমার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন। সাঈদ বারির আমলে এটা সম্ভব ছিল না।
প্রশ্ন: আপনি অবশ্যই ডায়াসপোরায় সোমালিদের ভেতর অত্যন্ত পরিচিত। যুদ্ধ ও স্বৈরাচারের কারণে বহু আমেরিকান ও ইউরোপীয় শহরে সোমালি জনগোষ্ঠী আছে। আপনি কি বক্তব্য রাখতে ওদের কছে যান?
উত্তর: আমার বিভিন্ন সফরে ডায়াসপোরার সোমালিদের সঙ্গে সোমালিয়া সফর সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ভাগাভাগি করি। লাখ লাখ সোমালি গোটা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বিক্ষিপ্ত অবস্থায় আছে। ওদের ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা না থাকলেও সঙ্গে করে স্থানচ্যুতির বেদনা নিয়ে এসেছে ওরা, ওই বেদনায় তারা ভারাক্রান্ত। নতুন ভাষায় তারা পর্যাপ্ত শিক্ষিত নয়, খুব সহজে চাকরি মেলে না। এটা যেন ওরা সোমালিয়ায় মন ফেলে কেবল শরীর নিয়ে এসেছে, তার কারণ তারা এখনো সোমালিয়ার সঙ্গেই সম্পর্কিত। আমি ওদের বলি, যেখানে আছ সেখানে ভালো করতে পারলে সেটা সোমালিয়ার জন্যই ভালো হবে। তারা যদি ভালো করতে না পারে তো সোমালিয়া ভুগবে। ওদের কোথায় যেতে চায়, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দিই। আমেরিকায় আমেরিকানদের মতো থাকতে চাইলে তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে দিতে হবে, সবকিছুতে অংশ নিতে দিতে হবে— পরিপূর্ণভাবে। অন্য কথায়, ওরা আমেরিকান হয়েও সোমালিত্ব বজায় রাখতে পারবে, ওদের মানসিকতার পক্ষে এটা গুরুত্বপূর্ণ। ওদের মনে করিয়ে দিই, কেউই ওদের কাছ থেকে সোমালিত্ব ছিনিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু কেবল পেছনে তাকালে সামনে তাকানো হবে না, তাতে কোনো উপকার হওয়ার নয়, এখানে সফল হতে পারবে না ওরা।
প্রশ্ন: সোমালি ডায়াসপোরায় লেখক আছেন?
উত্তর: ডায়াসপোরার সোমালিরা ওলন্দাজ, নরওয়েজীয়, সুইডিশ, ফরাসি ভাষায় লিখছেন, তবে কেউ কেউ সোমালি ভাষায় লেখা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যদিও তারা ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় বাস করছেন। তারা এখনো যারা সোমালিয়ায় আছেন তাদের চেয়ে বেশ স্বস্তির সঙ্গেই লেখালেখি করতে পারছেন।
প্রশ্ন: আপনার লেখালেখি অব্যাহত রাখতে পারার আরেকটা কারণ, বিশ্বব্যাপী আপনার বিপুল পাঠক রয়েছে। সোমালিয়াকে সেইসব মানুষের জন্য আপনি বাস্তব জায়গায় পরিণত করেছেন, যারা এমনিতে সময়ে সময়ে খবরে যতদূর জানতে পারেন, তার চেয়ে বেশি সোমালিয়াকে নিয়ে ভাবতে যেতেন না।
উত্তর: আমার বৈরী দৃষ্টিভঙ্গিতে, আমি বলি যে পৃথিবীর একজন সোমালি, একজন ঘানাবাসী, একজন ফরাসি, একজন মেক্সিকান, একজন চীনা এবং একজন ভারতীয় প্রয়োজন— এসব দেশের অল্প কয়েকজন লেখকের নাম যদি উল্লেখ করতে হয়। একটা অনুষ্ঠানে পৃথিবী সব জায়গা থেকে একজন বা দুজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাওয়া সোমালি ছিলাম আমি এবং আপনি সম্ভবত ঘানাবাসী ছিলেন। সে কারণেই আমি এবং আপনি বিশ্বলেখক।
প্রশ্ন: ওইসব দেশ আর জার্মানির মতো দেশের পার্থক্য ধনী ও দরিদ্র দেশের পার্থক্যের চেয়ে খুব একটা ভিন্ন নয়। জার্মানিতে ওরা হয়তো অন্যান্য জায়গার লেখালেখি নিয়েই অনেক বেশি আচ্ছন্ন। নিজেদের দিকে নজর দিচ্ছে না।
উত্তর: হয়তো জার্মান ও ফরাসিরা সত্যিই অন্য জাতের সংস্কৃতির ব্যাপারে আগ্রহী। হয়তো সে কারণেই আমার প্রায় সব উপন্যাস জার্মান ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ দুনিয়ার বাজার হওয়া খুব খারাপ নয়। আফ্রিকায় আমরা আমেরিকা, জার্মানি, ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সে উৎপাদিত পণ্য কিনি। আর ওরা আমাদের লেখা কিনে প্রকাশ করে। তবু আমেরিকান, ব্রিটিশ কিংবা জার্মানদের চেয়ে সোমালিদের ওইসব দেশ সম্পর্কে বেশি জানার বিষয়টি অস্বস্তিকর। কারণ মিডিয়া ও আজকের দিনের প্রযুক্তি সেদিকেই ঝুঁকে আছে। অন্য প্রেক্ষাপটে, এক সোমালি কবির কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়েছিল আমাকে, তিনি প্রার্থনা করেছেন, ‘প্রভু, হয় যেসব জিনিস আমি দেখি সেগুলো আমাকে দেখিও না, নয়তো বাকি সবাইকে দেখার সুযোগ করে দাও।’
প্রশ্ন: আমার ধারণা সমাজ কীভাবে স্বৈরাচারের কারণে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, সেই প্রশ্নে আলোচনাই বিভিন্ন ধরনের মানুষের মাঝে আপনার ব্যাপক শ্রোতা থাকার আংশিক কারণ। সেটা কেবল বিশেষ করে সোমালি প্রশ্নে নয় এবং আপনি প্রজন্মান্তরে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক আলোচনা করছেন, এগুলো অবশ্যই অন্য মানুষকে আগ্রহী এবং উৎসাহিত করে।
উত্তর: এ কথায় ফ্রেডেরিখ দুরেন্টমাটের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন: তাই?
উত্তর: আমরা একই প্লেনে কোথাও যাচ্ছিলাম। তার কোনো বই পড়েছি কিনা জানতে চাইলেন তিনি। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, পড়েছি।’ ‘আপনার কাছে সেগুলোর ব্যাপারে মতামত জানতে চাইব না। তবে আমি আপনার বই পড়িনি। তো বলুন, মিস্টার ফারাহ, আপনার বই কেন পড়তে যাব?’
প্রশ্ন: (হাসি) বেশ, আপনার জবাব কী ছিল?
উত্তর: বলেছি, তিনি আমার বই পড়লে এমন এক বিশ্বদৃষ্টির দেখা পাবেন, যা কোনো জার্মান, সুইস, নাইজেরীয়, আরব বা অন্য কারো বইতে মিলবে না। তিনি বললেন: ‘আমি যদি ভিন্ন কোনো বিশ্বদৃষ্টির ব্যাপারে আগ্রহী না হই, কারণ নিজেরটা নিয়েই আমি সন্তুষ্ট?’ উত্তরে বলেছি, নিজস্ব বিশ্বদৃষ্টি নিয়ে কেউ— সুইস বা আমেরিকান, সোমালি— যতই খুশি থাকুক, আসল সত্যি হচ্ছে, আমাদের পৃথিবী এক, একে আরো সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ করে তুলতে আমার তুলে ধরা অতিরিক্ত আরেক জগৎ, জগতের গল্পগুলো ছাড়া আপনার জানা অসম্পূর্ণ।






