ইতালীয় ভাষায় ভেসপার মানে হলো বোলতা। বোলতার নাম শুনলেই যেমন হুল ভেসে ওঠে চোখের সামনে, ভেসপা কল্পনা করলেও আমার তা-ই হয়। কারণ এ যান চালাতে গিয়ে অসম্ভব রকম ভুগেছি। অথচ সবাই বলে ভেসপা রাজকীয় যান। অনেকে তো ভেসপা বলতে অজ্ঞান!
বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের পছন্দ এ ভেসপা। ইতালিতে জন্ম এর। সম্ভবত দেশটির পাহাড়ি পথে উঁচু-নিচু রাস্তার সঙ্গে মানিয়ে চালানোর জন্যই এ যন্ত্রের পরিকল্পনা করা হয়। আলখেল্লার মতো পোশাক যারা পরে, তাদের মোটরসাইকেলে চড়া কষ্টকর, কারণ পা পুরো ছড়িয়ে দিয়ে উঠে বসতে হয়। তারা তখন ভেসপা বেছে নেয়। ভারতেও এর যথেষ্ট কদর রয়েছে; শাড়ি বা কামিজ পরা মেয়েরা অনায়াসে বসে চালাতে পারে বলে। কিন্তু চাকা অনেক বেশি ছোট হওয়ায় দুর্ঘটনাও বেশি ঘটে। এ বিচিত্র চেহারার বাহনটি মোটেও পছন্দ নয় আমার। অথচ দেখতে কিন্তু চমত্কার। আমি বিয়াল্লিশ বছর মোটরসাইকেল চালিয়েছি। ভেসপাও চালিয়েছি, তবে দু-চারদিন, আর সে অভিজ্ঞতাটাও মিশ্র, মনে হলে স্মৃতিকাতর হই, একাই হাসি।
কেন সেটা সবিস্তারে বলার আগে অন্য আরেকজনের কথা বলে নিই, যাঁর সঙ্গে আমার প্রায় চল্লিশ বছরের ঘনিষ্ঠতা। তিনি জনপ্রিয় লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন। সেবা প্রকাশনীর তো বটেই! মাসুদ রানারও স্রষ্টা। তিনি ভেসপা চালাতেন। আর যানটা তাঁর খুব প্রিয়ও ছিল। এ রকম একটা ‘বিটকেলে’ জিনিস কেন পছন্দ হয়েছে তাঁর, এ ব্যাপারে একদিন জিজ্ঞেস করতে গিয়ে জেনেছি, ভেসপার ইঞ্জিন খুব শক্তিশালী। দ্রুত চলে। চেইন নেই। তাই চাকা কিংবা ইঞ্জিনের পিনিয়নে চেইন পেঁচিয়ে অঘটন ঘটানোরও কোনো সম্ভাবনা নেই। আগেই বলেছি, আমার বিয়াল্লিশ বছর মোটরসাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। এত দীর্ঘ সময়ে মাত্র একবার চেইন নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। তা-ও আমার দোষে। কারণ পুরনো চেইনটাকে সময়মতো বদলাইনি। ভেসপার ব্যাপারে আরো একটা সুবিধার কথা বলেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। সিটে বসে সামনে পা রাখার জায়গাটায় অনেক বেশি স্পেস, তাতে প্রচুর জিনিসপত্র রাখা যায়। বিশেষ করে মুদি কিংবা কাঁচাবাজারের জিনিসপত্র। আরো একটা বিশেষ কাজে লাগত তাঁর বাহনের এ অংশটা। একসময় ধানমন্ডি লেকে নিয়মিত মাছ ধরতে যেতেন তিনি। সে মাছ ভেসপা করেই বহন করতেন। ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে আনা-নেয়া করতেন।
কিন্তু আমার মতে, ভেসপার সবচেয়ে খারাপ দিকটি হলো, এর ইঞ্জিনটা পেছনে, বসার সিটের নিচে, তা-ও একপাশে। চালানোর সময় এ ভারী অংশের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে আপনাআপনি কোমরটা একপাশে সামান্য বাঁকা হয়ে যায়। আমি চালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে খুব বিরক্ত হতাম। যানটার সামনের অংশটায় শুধুই একটা ছোট চাকা, আর কিছু নেই, একেবারে হালকা। কোনো সাধারণ গর্তে পড়লেও এমনভাবে লাফিয়ে ওঠে যে, ভারসাম্য রক্ষা করে সেটাকে বাগে রাখা খুব কঠিন কাজ। আর বড় সাইজের একটা ইট বা পাথর পড়লে তো কথাই নেই! লাফিয়ে উঠবে এবং একপাশে কাত হয়ে পড়ে যাবে। এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল কাজী সাহেবের বেলায়ও। সেবার তিনি তাঁর ছোট ছেলে রিংকুকে পেছনে বসিয়ে শাহবাগের দিকে যাচ্ছিলেন। শাহবাগ মোড়ে পৌঁছতেই হঠাত্ সামনে দিয়ে দৌড় দিল একটা কিশোর ছেলে, কোনো এক দোকানের কর্মচারী। যা-ই হোক, এমনিতেই পেছন-ভারী ভেসপার নিয়ন্ত্রণ খুব সহজ নয়, তার ওপর দুজন আরোহী থাকায় অতি দক্ষ আর অভিজ্ঞ চালকও ভেসপাটা সামলাতে পারলেন না। ভেসপাটা রাস্তায় পড়ে পিছলে চলে গেল কয়েক হাত। রিংকুর বয়স তখন সাত-আট বছর, ছেলেমানুষ, তাই ক্ষিপ্রতা অনেক বেশি। সে লাফ দিয়ে রাস্তায় নেমে দৌড়ে আইল্যান্ডের ওপর উঠে পড়ল। কিন্তু কাজী সাহেব রাস্তায় গড়াগড়ি খেলেন। কয়েক জায়গায় কেটে গেল। কবি রবীন্দ্র গোপ সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি এগিয়ে এসে কাজী সাহেবকে টেনে তুললেন। পরে কাজী সাহেবের শরীরে ব্যান্ডেজ দেখে কারণ জানতে গিয়ে দুঃখ পাওয়ার বদলে হেসে ফেললাম, বোধহয় তাঁর বলার ঢঙেই। তবে রিংকু রাগে ফেটে পড়ল। তার মতে, পুরোটাই ভেসপা নামক বাহনটার দোষ।
এখন আসি আমার কথায়: ভেসপার ওপর নির্ভর করে আমাকেও বেশকিছু যন্ত্রণা আর ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। ঘটনাগুলো বলেই ফেলি। আশির দশকে কাজী সাহেবের সঙ্গে আমি মাঝে মধ্যে পাখি শিকারে যেতাম। সাধারণত তার ফোক্সভাগেন গাড়িটায় করেই ঢাকার বাইরে গ্রামাঞ্চলে চলে যেতাম, যেখানে ঘুঘু পাওয়া যেত। গাড়িতে করে গেলে রিংকুও আমাদের সঙ্গী হতো। যেকোনো কারণেই হোক, সেবার রিংকু যেতে পারল না। কাজী সাহেব বললেন, আমরা যেহেতু দুজন, ভেসপায় করেই যাওয়া যাক। আমি তো এক কথায় রাজি। সকালে বাসা থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে রওনা হলাম। কাজী সাহেব চালাচ্ছেন। আমি পেছনে বসা। আমার এক হাতে একটা এয়ার গান, আরেক হাতে একটা পয়েন্ট ২২ রাইফেল। দিনটা
সুন্দর। ঝকঝকে রোদ। গাজীপুরের চৌরাস্তা পেরিয়ে গ্রামের পথ ধরলাম। কিছুক্ষণ থেকেই মৃদু একটা বিচিত্র শব্দ কানে আসছিল। শব্দটাকে গুরুত্ব দিইনি, কারণ বুঝতেই পারিনি কী হচ্ছে। হঠাত্ ধ্রাম করে পেছনের চাকাটা ফাটল। গতি কম ছিল রক্ষা। ভেসপাটাকে কোনোমতে খাড়া রাখলেন কাজী সাহেব। পরীক্ষা করে দেখা গেল, পেছনের চাকার উপরের ঢাকনার একটা কোনা ভেঙে বেঁকে গিয়ে টায়ারটাকে কাটছিল। আর তাতেই চাকাটা ফেটেছিল। ভাবতে লাগলাম, এখন কী করা? চাকা সারানোর দোকানের খোঁজ করতে লাগলাম। অতি সাধারণ ছোট্ট একটা গ্রামের বাজার পাওয়া গেল। গ্যারেজও নেই, মিস্ত্রিও নেই; শেষে একজন সদাশয় দোকানদার বললেন, ভেসপাটা এখানে ফেলে রেখে নিশ্চিন্তে চলে যান। আমরা পাহারা দেব। ঢাকা থেকে মিস্ত্রি পাঠিয়ে দেবেন, ঠিকঠাক করে নিয়ে যাবে। ভেসপার মোটামুটি একটা গতি করা গেলেও মেজাজটা খিঁচড়ে গেল ভেসপার ওপর। শিকারে বেরিয়ে শিকার করতে না পারায়! শেষে খাবারের টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে আমি আর কাজী সাহেব ঢাকামুখী একটা লোকাল বাসে চেপে বসলাম। ওই লাইনে তেমন ভালো বাস ছিল না তখন, দু-চারটা যা-ওবা ছিল, বাসস্ট্যান্ড ছাড়া অখ্যাত স্থানে থামত না। অগত্যা কাঠের ওপর প্লাস্টিক মোড়ানো শক্ত সিটে বসেই ফিরে চললাম দুজনে। সেগুনবাগিচায় কাজী সাহেবের বাসায় পৌঁছে ডাইনিং রুমে খেতে বসলাম। টিফিন ক্যারিয়ারে রাখা খাবার। শিকার সফল হলে যে খাবারটা অমৃত লাগত, সেটাই জোর করে গিলতে লাগলাম। রুচি একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মনে মনে ভেসপাটাকে অভিশাপ দিতে লাগলাম।
এর পর আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করে ভেসপা-রচনার ইতি টানছি। আমার এক ভগ্নিপতি একটা মোটরসাইকেল কিনেছিলেন। পা ছড়িয়ে সিটে চড়তে কষ্ট হতো বলে শেষে একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ভেসপা কিনেছিলেন। কেনার কিছুদিনের মধ্যেই ওটা ট্রাবল দেয়া শুরু করল। আজ এ সমস্যা, কাল সে-সমস্যা। তিনি করতেন কলেজে শিক্ষকতা, তাই বারবার ভেসপার গ্যারেজে গিয়ে বসে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি তখন বেকার। তাই আমার ওপরই ওই ভেসপা সারানোর ভার পড়ল। ঠেলতে ঠেলতে গ্যারেজে নিয়ে গেলাম ভেসপাটা। মেকানিক দেখে বলল, নাহ্ঃ তেমন কোনো সমস্যা নয়, সহজেই সারিয়ে দিতে পারব। দিলও তা। তখন ওটা নিয়ে বাসায় রওনা হলাম। আমি থাকি তখন মীরপুরে, ভগ্নিপতি কচুক্ষেতে। একটা ইঞ্জিনওয়ালা যানের জন্য দূরত্বটা কিছুই না। কিন্তু ওই সামান্য পথই ভেসপাটা আমাকে বিস্তর যন্ত্রণা দিল। আড়াই কিলোমিটার রাস্তা থেকে আড়াইবার বন্ধ হলো। আড়াইবার বললাম এ কারণে যে, প্রথম দুবার মোটামুটি জটিল সমস্যা হলো, আর তৃতীয়বার প্লাগে ময়লা। ময়লা পরিষ্কার কোনো কঠিন কাজ না। তবে এ ভেসপাটার ময়লা পরিষ্কার করে স্টার্ট দিয়ে কয়েক গজ যেতে না যেতেই আবার বন্ধ হয়ে গেল ইঞ্জিন। বিরক্ত হয়ে ঠেলে নিয়ে চললাম গ্যারেজে। আবার মেরামত করে দিল মেকানিক। এভাবে চলতেই থাকল। বাসায় আর পৌঁছতে পারি না। গরমের দিনের রোদের জ্বালা আর ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় কাহিল হয়ে আরো একবার যখন গ্যারেজে পৌঁছলাম, মেকানিক গম্ভীর হয়ে বলল, একটা পার্টস বদলানো লাগবে। রেগে গিয়ে বললাম, এতক্ষণ বদলাওনি কেন? জবাব এল, আপনার টাকা খরচ করাতে চাইনি, অল্পতে সারিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। যাহোক, কিছুটা নরম হলাম। বললাম, বদলাও পার্টস। বদলানো হলো। তার পরও একের পর এক ঝামেলা বাঁধিয়ে চলল ভগ্নিপতির সাধের ভেসপা। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়। শেষে বিরক্ত হয়ে গিয়ে তাঁকেই ডেকে আনলাম। ভেসপাটার প্রায় অর্ধেক শরীর আর যন্ত্রপাতি বদলানোর পর সচল হলো যন্ত্রটা। এর পর দুদিন আমার কাছেই রেখে দিলাম। এ দুদিন মোটামুটি ভালোই চলল। তৃতীয় দিন রোজার ঈদের আগের দিন। ভগ্নিপতি বললেন, চলেন, বাজার করে নিয়ে আসি। বাজার করতে বেরোলাম। ভেসপাটা বন্ধ হলো এমন এক জায়গায় যে, ঠেলে নেয়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই। ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেলাম অন্য আরেকটা গ্যারেজে। এ মেকানিক বেশ লম্বা-চওড়া লেকচার দিল— যে ব্যাটা ঠিক করেছে, সে কিছুই জানে না। দাঁড়ান আমি সারিয়ে দিচ্ছি। তার পর সে লাগল কাজে। ভেসপা একবার চালু হয়, পরক্ষণেই বন্ধ। সে-ও ওটার আচরণে বোকা হয়ে গেল। মহাবিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ধুঁকে চলার মতো করে যখন ঠিক করল, তখন শেষ বিকাল। আমি আর আমার ভগ্নিপতি ক্লান্ত, হতাশ। তবু ওই ভেসপা নিয়ে বাজার করতে বেরোলাম। কচুক্ষেত থেকে মীরপুর, তার পর মহাখালীর বাজারসহ এহেন জায়গা বাকি রাখিনি, যেখানে গেলাম না। ঈদের বাজার তখন ক্রেতার ভিড়ে গমগম করছে। পছন্দমতো কিছু কিনতে পারলাম। এদিকে সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত। প্রথমে ভগ্নিপতির ইচ্ছে ছিল খাসির মাংস কিনবে। পেল না। সব বিক্রি হয়ে গেছে। তখন গরুর মাংসের বাজারে গেলাম। বুড়ো গরুগুলো দেখে তাঁর ভালো লাগল না। না কিনে আরেক বাজারে গেলাম। সেখানে গরুই নেই। দুটো মোষ জবাই করা হয়েছে। মুখটাকে আষাঢ়ের মেঘের মতো কালো করে শেষে মোষের মাংস কিনতেই বাধ্য হলেন তিনি। আমি খাসি-মোষ কিছুই খাই না। মুরগি খুঁজলাম। দোকানদার বলল, বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। শেষে একলা বসে থাকা এক বুড়োর কাছে একটা ছোট্ট, শুঁটকে মুরগি দেখে তা-ই কিনে নিলাম। তার কাছে ওই একটা মুরগিই অবশিষ্ট ছিল। অতএব মুরগি কিনতে হলো প্রায় খাসির দামে।
দুজনই নির্বাক হয়ে বাসার পথ ধরলাম। অর্ধেক রাস্তা এসে যখন আবার বন্ধ হয়ে গেল ইঞ্জিন, রেগেমেগে আমার ভগ্নিপতি ভেসপাটাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তার পাশের নিচু জায়গায় ফেলে দিলেন। বিড়বিড় করে গালি দিলেন বোধহয়। তার পর আর কি? রিকশায় করে বাসায় ফেরা।
এর পর যদি আমাকে বলা হয়, ভেসপা নিয়ে ভালো কিছু লিখুন, কী লিখব?
লিখব, কারণ ওই সময় অনেক হাত ঘুরে ওই ভেসপাগুলো আমাদের হাতে এসেছে। সবই ঝরঝরে হয়ে যাওয়া ভেসপা। কাজেই ইতালীয়দের নতুন ভেসপার অভিজ্ঞতা তখনকার দিনে আমাদের কমই হয়েছে। তাই ভেসপা আমার কাছে সুখস্মৃতির বাহন না হলেও পৃথিবীজুড়ে ভেসপার গুণকীর্তন এখনো বজায় আছে। ভেসপা বোধকরি সত্তর পেরিয়ে বাহাত্তরে, তাই প্রায় বাহাত্তুরে বুড়ো ভেসপার যে গল্পগাছা করলাম তা খুব কি বেমানান হলো?
তাই স্বীকার করি শেষ পর্যন্ত দোষটা ভেসপার নয়, আমাদের। আমাদের কপাল খারাপ। আর আমার ভগ্নিপতি যে ভেসপাটা কিনেছিলেন, সেটা এত পুরনো হয়ে গিয়েছিল যে, তা ব্যবহারের অযোগ্য। কাজী আনোয়ার হোসেনেরটাও যে তেমন নতুন ছিল কি করে বলি! না হলে দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ যে জিনিস ব্যবহার করে সন্তুষ্ট, সেটা আমাদের দুর্ভোগে ফেলবে কেন?






