ভেসপা— প্রয়োজন থেকে সাংস্কৃতিক আইকন। ভেসপা স্কুটার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে ইতালির ভোক্তা সংস্কৃতি, তরুণদের সংস্কৃতি, নারী স্বাধীনতা প্রভৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে এ প্রভাব শুধু ইতালিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এসব ক্ষেত্রে ভেসপা একসময় পুরো দুনিয়াকেই প্রভাবিত করেছে এবং সেই প্রভাব এখনো অব্যাহত আছে।
ভেসপার জন্মের পেছনে রয়েছে শক্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। পিয়াজ্জিও ইতালির জেনোয়াভিত্তিক একটি শিল্প প্রকৌশল কোম্পানি। রিনাল্ডো পেয়াজ্জিও ১৮৮৪ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত করেন। পিয়াজ্জিও শুরুতে বিলাসী জাহাজের বিভিন্ন ফিটিংস তৈরি করত। এর পর গত শতকের শুরুতে এরা রেলের ক্যারিজ, মালপত্র পরিবহনের ভ্যান, ট্রাম প্রভৃতি তৈরি শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পিয়জ্জিওর উত্পাদনে আরেকবার পরিবর্তন আসে। এবার তারা বিমান তৈরি শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এ কোম্পানি ফ্যাসিস্ট ও নািস বাহিনীর জন্য বিমান তৈরি করেছে। ফলে এ কোম্পানি কারখানা মিত্র বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ১৯৪৩ সালের ৩১ আগস্ট মিত্র বাহিনীর বোমারু বিমান পিয়াজ্জিও কারখানা প্রায় মাটিতে মিশিয়ে দেয়। অন্যদিকে জার্মান বাহিনী পিছু হটার সময় কারখানার বিভিন্ন ভবন ও প্লান্টে মাইন পেতে রেখে যায়। বোমায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর এনরিকো পিয়াজ্জিও তার কোম্পানিকে নতুন করে চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া কারখানা আর বিমান উত্পাদনে সক্ষম ছিল না। কোম্পানির বিশেষজ্ঞ দক্ষতার সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে হালকা কোনো যানবাহন তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। এছাড়া হালকা যান তৈরির সিদ্ধান্তের পেছনে ইতালির তত্কালীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাও ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বযুদ্ধের কারণে ইতালি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছিল, যুদ্ধে ভারী শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে সস্তায় একটি নিজস্ব পরিবহনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সমস্যার সমাধান নিয়ে বাজারে আসে পিয়াজ্জিওর ভেসপা। এ স্কুটারের নকশা করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান প্যারাসুটিস্টদের জন্য তৈরি এক ধরনের ছোট আকারের মোটরসাইকেলের অনুকরণে। ছোট আকারের জলপাই রঙের এই কুশম্যান এয়ারবোর্ন মোটরসাইকেলগুলো প্যারাসুটের সাহায্যে সেনাদের সঙ্গে ড্রপ করা হতো। ভেসপার ডিজাইন করেছিলেন একজন বিশিষ্ট এরো-ইঞ্জিনিয়ার কোরাডিনো ডি’আসকানিও। শুরুতে ডিজাইনার ডি’আসকানিও যে প্রোটোটাইপ তৈরি করেছিলেন, সেটার নাম ছিল এমপি ফাইভ বা প্যাপেরিনো। কিন্তু পিয়াজ্জিওর কর্তা এনরিকোর সেটা পছন্দ হয়নি। তিনি ডি’আসকানিওকে আবার নতুন ডিজাইন তৈরি করতে বলেন। ডি’আসকানিও নিজেই এরো-ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, তাই প্রচলিত মোটরবাইক তার পছন্দ ছিল না। বিশেষত এগুলোয় মানুষের পোশাক নোংরা হতো। তিনি এসব ঝামেলা থেকে মুক্তি দিতে পারে— এমন একটি স্কুটার তৈরি করতে চেয়েছিলেন। স্কুটারটিকে একই সঙ্গে আরামদায়কও হতে হবে। অন্যদিকে নারীদের ছড়ানো পোশাকেও যেন এ স্কুটারে স্বচ্ছন্দে বসা যায়, সেটাও মাথায় রাখা হয়েছিল। এর পর কয়েক দিন সময় নিয়ে তিনি নতুন একটি ডিজাইন তৈরি করেন, যা আজকের ভেসপা। নতুন ডিজাইনের প্রোটোটাইপটি দেখে এনরিকো পিয়াজ্জিও বলে ওঠেন, ‘এটা দেখতে ভিমরুলের মতো!’ বোল তা বা ভিমরুলকে ইতালীয় ভাষায় বলে ‘ভেসপা’। এই ভেসপা স্কুটারের হাত ধরে ইতালীয় ভাষায় একটি নতুন ক্রিয়া পদ যুক্ত হয়— ‘ভেসপারে’, অর্থ— ভেসপায় চড়ে ঘুরতে যাওয়া। ১৯৪৬ সালের ২৩ এপ্রিল পিয়াজ্জিওর পক্ষ থেকে ভেসপার পেটেন্টের জন্য আবেদন করা হয়। ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে ইতালির তুসকানির কারখানায় ১৫টি ভেসপা তৈরি হয়। রোমের গলফ ক্লাবে মিত্র বাহিনীর প্রতিনিধি মার্কিন জেনারেল স্টোনের উপস্থিতিতে ভেসপা প্রথমবারের মতো পথ চলা শুরু করে। অবশ্য এর মাসখানেক আগে ১৯৪৬ সালের ২৪ মার্চ ইতালীয়রা মোটর ম্যাগাজিনের পাতায় ভেসপার চেহারাটা দেখে ফেলেছেন। একই বছর ১৫ এপ্রিল লা মোটোর সাদা-কালো প্রচ্ছদে স্থান পায় ভেসপা।
ভেসপা ‘মিরাকল’ খুব শিগগিরই বাস্তব হয়ে ওঠে। ১৯৪৬ সালে ২৪৮৪টি ভেসপা বাজারে ওঠে। পরের বছর সংখ্যাটা বেড়ে হয় ১০ হাজার ৫৩৫। পরের বছর ১৯৪৮ সালে ভেসপার উত্পাদন বেড়ে হয় ১৯ হাজার ৮২২ ইউনিট। এর পর তিন বছরের মাথায় ভেসপার উত্পাদন পৌঁছে যায় ১ লাখ ৭১ হাজারে। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি ভেসপা স্কুটার তৈরি হয়েছে। ১১৪টি দেশে ভেসপা বিক্রি হয়। এ পর্যন্ত ভেসপা একশর বেশি মডেল বাজারে এনেছে।
শুরু থেকেই বিদেশী বাজারগুলো ভেসপাকে আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে। বিদেশী এবং তাদের মিডিয়া উভয়ই ভেসপাকে নিয়ে কৌতূহল ও গুণমুগ্ধতা দেখিয়েছে। দি টাইমস লিখেছিল, ‘রোমান চ্যারিয়টের পরে তৈরি হওয়া একটি পূর্ণাঙ্গ ইতালীয় পণ্য।’ এনরিকো তার পণ্য ছড়িয়ে দিতে ইউরোপ তথা দুনিয়াজুড়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। ভেসপা ক্লাব ছিল এনরিকোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ১৯৫৩ সালের মধ্যে ভেসপা ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করে। ১৯৫১ সালে ২০ হাজার ভেসপা ভক্ত ‘ভেসপা ডে’ উদযাপন করেন। বিভিন্ন দেশে এখনো ভেসপা ভক্তরা উত্সাহ নিয়ে ভেসপা ডে পালন করেন। জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশে প্রতি বছরই নিয়ম করে ভেসপা ডে উদযাপিত হয়। ইউরোপে ভেসপা ডে ইউরোভেসপা নামে পরিচিত। প্রতি বছর বিভিন্ন শহরে বিপুল উত্সাহ নিয়ে এ দিবস উদযাপিত হয়।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভেসপার সাফল্য দেখে বেশকিছু দেশ এর ডিজাইন অনুকরণে নিজেরা নতুন বাইক তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। যেমন— জাপান তৈরি করেছিল ফুজি র্যাবিট, জার্মানি ও গ্রেট ব্রিটেনও কিছু স্কুটার তৈরি করেছিল কিন্তু কেউই সৌন্দর্য আর সেবায় ইতালির ভেসপার স্থান দখল করতে পারেনি।
১৯৫০ সালে জার্মানিতেও ভেসপা উত্পাদন শুরু হয়। জার্মানির সঙ্গে সঙ্গে ভেসপা উত্পাদনে আরো যুক্ত হয় গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স। ১৯৫৩ সালে স্পেনের মাদ্রিদেও ভেসপা উত্পাদন শুরু হয়। এর পর শুরু হয় ব্রাসেলস, বোম্বাই, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রে। ভেসপার জনপ্রিয়তা রিডার্স ডাইজেস্টেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারা ভেসপাকে নিয়ে বিরাট এক প্রতিবেদন ছাপে। এসবই ছিল মাত্র শুরু। দ্রুতই ভেসপা ১৩টি দেশে উত্পাদন ও ১১৪টি দেশে বিক্রি শুরু হয়। ভেসপার কাছাকাছি ডিজাইনে এ স্কুটার তৈরি শুরু করে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। তারা তাদের ভেসপাসদৃশ স্কুটারের নাম দেয় ভিয়াটকা ১৫০, সময়টা ছিল ১৯৫৭ সাল। তবে পরবর্তীতে ভেসপা কর্তৃপক্ষের আপত্তির মুখে ভিয়াটকা উত্পাদন বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
১৯৫৬ সালের জুনে ভেসপার বিক্রি ১০ লাখের মাইলস্টোন ছুঁয়ে ফেলে। ভেসপার বিক্রির গতি তখন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ১৯৬০ সালে ভেসপার বিক্রি স্পর্শ করে ২০ লাখের মাইলফলক। ১৯৭০ সালে ৪০ লাখ ও ১৯৮৮ সালে ভেসপার বিক্রি ১ কোটি ইউনিট অতিক্রম করে। ১৯৬৫ সালে এনরিকো পিয়াজ্জিও মারা যান। আর সে বছর পর্যন্ত শুধু ইতালিতেই ভেসপা তৈরি হয়েছে সাড়ে ৩৩ লাখ। ভেসপার ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ডিজাইন ভেসপা পিএক্স (১২৫, ১৫০ ও ২০০ সিসি), ১৯৭৭ সালে এটি বাজারে আসে। ডিজাইনটি ২০ লাখের বেশি ইউনিট বিক্রি হয়েছে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভেসপার মতো নিরীহ দর্শন স্কুটারও মোটরসাইকেল রেসে অংশ নিয়েছে। ইউরোপে গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ভেসপা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন রেসে অংশ নিয়েছিল। ১৯৫২ সালে ফরাসি জর্জেস মনোরেত একটি উভচর ভেসপা তৈরি করে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন। ১৯৫১ সালে ভেসপা ইতালীয় সেরা মোটরসাইকেল হিসেবে পুরস্কৃত হয়। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ভেসপা নিয়ে অভিযাত্রা শুরু হয় এ সময়। ইতালির এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জিয়ানকার্লো তিরোনি ভেসপা নিয়ে আর্কটিক সার্কেলে পৌঁছে যান। আর্জেন্টাইন কার্লোস ভেলেজ বুয়েন্স আয়ার্স থেকে ভেসপায় চড়ে আন্দিজ পর্বতমালা পার হয়ে চিলির সান্তিয়াগো পৌঁছেন। ১৯৪৮ সালে ফরাসি বিমান বাহিনীর সার্জেন্ট পিয়েরে ডেলিয়েরে ভেসপা কিনেছিলেন। সেই ভেসপা নিয়ে তিনি ছয় হাজার কিলোমিটার সফর করে প্যারিস থেকে ভিয়েতনামের সায়গন পৌঁছেন। আফগানিস্তানের মরুভূমিও পার হয়েছেন এ ভেসপায়।
নতুন ও সস্তা এ বাহন ইতালির সংস্কৃতিকে দারুণভাবে বদলে দিয়েছিল। সে সময়ের পর্যবেক্ষকদের মতে, ভেসপার মধ্যেমে ইতালিতে কনজিউমার পণ্যের গুরুত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। আমি একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক এবং এজন্য অবশ্যই আমার একটি ভেসপা থাকতে হবে— পণ্য সম্পর্কে এই বোধ ভেসপাই ইতালিতে প্রথম সৃষ্টি করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইতালিতে ভেসপাই মানুষের মনে কিছুটা প্রেরণা জাগিয়ে তুলেছিল। পিয়াজ্জিও তাদের প্রচারণায় ভেসপাকে মানুষের লাইফস্টাইলের অঙ্গ হিসেবেই দেখাতে চেষ্টা করেছিল। ষাটের দশক পর্যন্ত ইউরোপীয় আদর্শে ইতালীয়দের আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল। কিন্তু সস্তা ভেসপা তাদের মনে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের একটা বাস্তব আশা জাগিয়ে তোলে। মার্চি এম. ভেসপাকে সে সময়ের আশার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন, এটা ভোক্তা সংস্কৃতি ও তরুণদের সংস্কৃতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। “ভেসপা একটি শব্দ নয়, বরং একটি ধারণা— যা একেবারে আন্তর্জাতিক এবং যা পুরো একটি প্রজন্মের স্বপ্ন ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেছে। ভেসপা সাধারণ কোনো স্কুটার বা বাহন নয়; এটা পূর্ণাঙ্গ ‘স্কুটার’। ভেসপা নামটিই তরুণদের স্মৃতিকে চাগিয়ে তোলে।”
কম দাম ও জনপ্রিয়তার কারণে ইতালির তরুণ শ্রমিকরা ভেসপার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ভেসপা যেমন ছিল ‘আধুনিকতা’র প্রতীক, তেমনি ভেসপায় চড়ে তরুণরা আশপাশের গ্রাম কিংবা শহরে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিত, অনেকে স্রেফ ভেসপা নিয়ে একসঙ্গে মাঠে ঘুরে বেড়াত। এভাবে ভেসপা সামাজিক সম্পর্ক নির্মাণ ও বিকাশেও ভূমিকা রেখেছিল। ভেসপায় চড়ে এই চলাচল ইতালির পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে ভাঙতে ভূমিকা রেখেছিল, বিশেষত তরুণ-তরুণীদের উন্মুক্ত চলাচল তাদের পিতৃতান্ত্রিক শাসন-বারণ থেকে অনেকটা মুক্ত করে দিয়েছিল।
ষাটের দশকে নারীদের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভেসপা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ভেসপা বাজারে আসার আগে ইতালির রাস্তায় কোনো নারী মোটরবাইক চালাচ্ছেন— এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। এই গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি হলিউডের সিনেমায়ও ভেসপার রূপায়ণ ভেসপাকে নারীবাদ ও পরিবর্তনের প্রতীকে পরিণত করে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মধ্যে ভেসপার জনপ্রিয়তা পিয়াজ্জিও ভালোই বুঝতে পেরেছিল, তাই ১৯৪৯ সালের আগে ভেসপার বিজ্ঞাপনে নারীদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। সে সময় ভেসপার প্রায় প্রতিটি পোস্টারেই নারীদের দেখা যেত। তবে ভেসপার যে প্রচারণাটি ইতালিতে নারী স্বাধীনতা ও নারীদের স্বাধীন চলাফেরাকে সবচেয়ে বেশি উত্সাহিত করেছিল, সেটা হচ্ছে— হলিউডের সিনেমা রোমান হলিডে। ভেসপার প্রচারণায় সবচেয়ে বড় সাফল্য এনে দিয়েছিল অবিস্মরণীয় অড্রে হেপবার্ন অভিনীত ১৯৫৩ সালের ‘রোমান হলিডে’। সে বছর ভেসপার বিক্রি ১ লাখের ঘর ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ভেসপার বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ইতালীয়রা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছিলেন যে, ভেসপা মানে স্টাইলিশ ও স্বচ্ছন্দ জীবন।
ভেসপা সব শ্রেণীর তরুণ-তরুণীদের যে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, তা সমাজের নৈতিক নেতাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। ক্যাথলিক চার্চও ছিলেন এই উদ্বিগ্নদের তালিকায়। ইতালির সমাজজীবনে ভেসপার প্রভাবটি এই লক্ষণ থেকে বেশ ভালোভাবেই অনুভব করা যায়। মোটরবাইকের মতো ভেসপারও গ্যাং তৈরি হয়। ইতালির পাবলিক প্লেসে নানা শ্রেণীর তরুণদের এসব গ্যাং দেখা যেতে থাকে। এই ভেসপা গ্যাংকে তরুণদের উচ্ছন্নে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।
ভেসপার গ্রহণযোগ্যতা ইতালির মানুষকে অনেক বেশি সচল করে তুলেছিল। ভেসপাকে কেন্দ্র করে ইতালিতে গড়ে ওঠা তরুণদের সংস্কৃতির প্রভাব শুধু ইতালিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা আন্তর্জাতিক চেহারা পেয়েছিল। ইতালির পর ভেসপার সবচেয়ে বড় বাজার ছিল ব্রিটেন। ব্রিটেনের মড সংস্কৃতির উপাদান হয়ে উঠেছিল ভেসপা। মডদের ট্রেডমার্ক ছিল তাদের স্যুট, তাই ভেসপা তাদের কাছে উপযুক্ত বাহন হয়ে উঠেছিল। ষাটের দশকে ছুটির দিনে ব্রিটেনের সাগরঘেঁষা রিসোর্টগুলো ভেসপা নিয়ে আসা মডদের ভিড়ে গিজগিজ করত। নিজেদের ভেসপা দেখানোটা ছিল এসব আড্ডার একটি জরুরি কাজ। ভেসপার মাধ্যমেই পিয়াজ্জিও আবিষ্কার করে যে, তরুণরা একটি বিশেষ ক্রেতা শ্রেণী। শুধু পিয়াজ্জিও নয়, এ সময় ইতালির বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উপলব্ধি করতে পারে। আর তা হলো, তরুণ এবং নারীদের এক বিশেষ ক্রেতাগোষ্ঠী হিসেবে আবিষ্কার। ভেসপার বিক্রি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ইতালির অর্থনীতিতে নতুন গতি আনে। অন্যদিকে ভেসপার মাধ্যমে ইতালির তরুণদের গতিশীলতাও অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
ভেসপার কিংবদন্তি এখনো জীবন্ত। ২০১৩ সালে ভেসপার একটি নতুন মডেল বাজারে ছাড়া হয়। এর টার্গেট ছিল ভারতের বাজার। আর তাদের প্রেরণা ছিল বলিউড। ভারতের বিরাট কৃষিসমাজের মানুষের তেমন কোনো যানবাহন নেই। পায়ে হেঁটে বা গরুর গাড়িতে তারা বাজারে যাতায়াত করেন। তাই খুব সস্তায় তাদের কাছে ভেসপা পৌঁছে দেয়ার জন্য এই নতুন মডেল বাজারে ছাড়া হয়। আজকের দিনেও ভেসপার বাজার যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। দুনিয়ার শহরগুলোয় প্রতিদিনই মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাই নিজস্ব পরিবহনের গুরুত্বও বাড়ছে। গাড়ির চেয়ে ভেসপার দাম কম এবং ভেসপা অনেক বেশি টেকসই, তাই ভেসপা এ যুগেও মুখ থুবড়ে পড়বে না বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা। আর আজকের দিনেও কিন্তু ইতালিতে কোনো সিনেমার শুটিং হলে ভেসপার উপস্থিতি প্রায় নিশ্চিত।






