স্নেহের বাদল,

তোমার চিঠি এবং কাটিং দুই-ই সময়মতো পেয়েছি। স্থানীয় কাগজে খবরটা আগেই বেরিয়েছিল। এবং পড়ে বেশ হকচকিয়ে গিয়েছিলাম— তার পর তোমাদের ওখানের কাগজে ছবি ও আরো বিস্তারিত বিবরণ দেখে রীতিমতো স্তম্ভিত। তুমি যে এ ঘটনার জন্য বেশ কিছুটা অংশে দায়ী, তা অবশ্য আমার নিজেরও বিশ্বাস। যা-ই হোক না কেন, ঘটনা বোধহয় অভূতপূর্ব। গর্ব, আক্ষেপ ও কিছুটা সংকোচ— এই তিনটি মনোভাবই বোধ করেছি। আক্ষেপ এ কারণে যে, আজ আমাদের বাংলা ছবি তোমাদের ওখানে যাওয়ার ও দেখানোর সুযোগ থাকলে আমাদের আর কোনো রকম চিন্তার কারণ থাকত না। ফিল্মের সঙ্গে একটা অনিশ্চয়তা যে সব সময়ই আমাদের মনকে উদ্বিগ্ন করে, সেটা বোধহয় সম্পূর্ণ অপসৃত হতো। সংকোচ এই কারণে যে, যে আশা নিয়ে এত লোক এত অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করল, সেটা কি ছবি দেখার পর তাদের চার আনাও সার্থক বলে মনে হলো? কখনই না। যা-ই হোক, তবু বলব, ভালো লাগে।

আমার এ ছবি শেষ হয়ে এল। ৩০ এপ্রিল মুক্তি। বাক্সবদল ভীষণ ভালো চলল এবং লোকে খুবই উপভোগ করল। আমি নতুন গল্প নায়ক লিখতে শুরু করেছি। নাম ভূমিকায় উত্তম কুমার। উত্তমেরই জন্য লেখা গল্প। আমাদের ফিল্মজগতের চেহারা কিছুটা এতে তুলে ধরতে পারব বলে মনে হয়। তবে গল্পের অধিকাংশই ঘটছে একটা দিল্লিগামী ট্রেনের ভেতর, নায়ক চলেছেন দিল্লি সরকারি পুরস্কার নিতে। সেইখানে ফ্ল্যাশব্যাকে তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ছবি আমরা দেখছি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আজ আসি। এখানে সব মোটামুটি ভালোই। কাল থেকে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। দু-এক পশলা বৃষ্টি এবং একটি কালবৈশাখী ঝড়ও হয়ে গেছে। ইতি।

শুভাকাঙ্ক্ষী

সত্যজিত্ রায়

১০.০৪.১৯৬৫

হেমন্তের আবছা সন্ধ্যার মুখোমুখি এ আমি ধীরে ধীরে উঠে এলাম মানিকদার লেক টেম্পল রোডের বাসার তিনতলায়। আজ থেকে বহু বছর আগেকার কথা। তখন এ বাংলাদেশ স্বাধীন বাংলাদেশ নামে পরিচিত হয়নি। কিন্তু তার অঙ্কুর বপন হয়ে গিয়েছিল সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে। প্রতিভাবান ব্যক্তিদের স্পর্শে একটা নবজাগরণের স্রোত ঢুকে পড়েছিল রাজনৈতিক চেতনা ও মানবতাবোধের ক্ষেত্রে।

বিকৃত রুচি নয়, সুন্দর-সুস্থ আত্মবিকাশের ভূমিকা নিয়ে সেই সময়ে ঢাকায় যেসব পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হতো, তার মধ্যে সাপ্তাহিক সিনেমা ও সাহিত্য পত্রিকা চিত্রালীও ছিল। এই চিত্রালীর প্রতিনিধি হয়ে আমি মানিকদার সাক্ষাত্কার নিতে যাই। উত্সাহ আমারই ছিল বেশি। চিত্রালীর সম্পাদক মরহুম মোহাম্মদ পারভেজের কাছে আমি যখন বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিত্ রায়ের নাম উচ্চারণ করেছিলাম, সত্যজিতের সঙ্গে পারভেজ ভাইয়ের ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তখন তিনি আমাকে তেমনভাবে উত্সাহিত করেননি, যেমন অন্যদের বেলায় করতেন।

কলকাতায় এসে কারণটা অনুভব করলাম। আমার মন দমে গেল। শুনলাম সত্যজিত্ রায় অহঙ্কারী, দাম্ভিক ও রাশভারী মানুষ। বেশি কথা বলেন না। ছবি তুলতে দেন না।

‘পথের পাঁচালী’ ১৯৫৫ সালে কলকাতায় রিলিজ হওয়ার অল্প দিন পরেই বাণী সিনেমা হলে সবান্ধব ছবিটি দেখি। সেদিন সিনেমা হল প্রায়ই খালি ছিল। সাধারণ দর্শক হিসেবে ছবিটি দেখে এত অভিভূত হয়ে পড়ি যে, কয়েক দিন-রাত ছবির সেই অনুভূতিতে আচ্ছন্ন থাকি। কলকাতায় এসে সত্যজিত্ রায় সম্পর্কে উক্তিগুলো শুনে নিরাশ হলেও আমার মন কেবলই বলতে থাকে মানবদরদি স্রষ্টা কি এত কঠোর হতে পারেন? আশা-নিরাশা নিয়ে কাঁপা কাঁপা বুকে ফোনের ডায়াল ঘোরাতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে অপূর্ব গম্ভীর কণ্ঠস্বর। যেন বর্ষার মেঘের প্রতিধ্বনি। মানিকদা সময় দিলেন। দুদিন পরে।

দরজার কাছে এসে আমি থমকে দাঁড়ালাম। দরজার এক পাল্লা খোলা। ভেতরের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, সাদা শাল জড়িয়ে যিনি লিখে চলেছেন নিবিষ্টমনে, তার সামনে গিয়ে আমি কখনো দাঁড়াতে পারব না। কী যোগ্যতা আছে আমার তার সাক্ষাত্কার নেয়ার? নিজেকে আমি বিচার করে দেখিনি। বিশ্ববিখ্যাত পরিচালকের সাক্ষাত্কার নিতে আসেন দেশ-বিদেশ থেকে ঝানু ঝানু দক্ষ সাংবাদিক। সে তুলনায় আমি অতি নগণ্য, অতি সাধারণ। ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেই মানিকদা আমার উপস্থিতি টের পেয়ে বললেন, ‘কে?’

এখন আর পালিয়ে যাওয়া যায় না। কাঁপা বুকে দরজা ঠেলে ভেতরে এসে সালাম জানিয়ে বললাম, ‘আমি ঢাকার চিত্রালী পত্রিকার প্রতিনিধি।’

‘বসুন’ বলেই মানিকদা লেখার মধ্যে ডুবে গেলেন। কয়েক মিনিট পর মুখ তুলে আমাকে স্থির দৃষ্টিতে দেখলেন, কী দেখলেন জানি না। তবে আমি যে নার্ভাস বোধ করছি, এটা তিনি সহজেই বুঝতে পারলেন। অত্যন্ত সাদাসিধে বাংলাদেশের পদ্মাপাড়ের মেয়েকে দেখে মানিকদার মনে বোধ হয় করুণাই জেগেছিল। কিংবা হয়তো সুদূরে হারিয়ে যাওয়া মাটির টান অনুভব করেছিলেন। কারণ মানিকদার পূর্বপুরুষের দেশ তো বাংলাদেশ।

অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে, নম্রভাবে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার সম্পর্কে আপনি কী জানতে চান?’ এই একটি কথাতেই আমার আত্মবিশ্বাস ফিরে এল। ভাবলাম, ঝানু সাংবাদিক না হলেও আমি তো সাংবাদিকই। চিত্রালীর সম্মান আমাকে রাখতেই হবে।

পথের পাঁচালী বা অন্য ছবির প্রসঙ্গ আমি তুলিনি। স্বল্প কথার পরিবর্তে অনেক কথা শোনার প্রত্যাশায় আমি ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবির কাহিনী শুনতে চাই। মানিকদা তখন সদ্য কাঞ্চনজঙ্ঘার শুটিং শেষ করে দার্জিলিং থেকে ফিরে এসেছেন। এর আগে মানিকদা যেসব ছবি করেছেন, তা প্রখ্যাত লেখকদের উপন্যাস। সিনেমার আবেদন ফোটানোর জন্য অনেক সময় মূল কাহিনীকে একটু অদলবদল করতে হয়। এ কারণে সমালোচকদের তিক্ত মন্তব্যে তিনি দুঃখ পান। কাঞ্চনজঙ্ঘার কাহিনী মানিকদা নিজে লিখেছেন। এখানে তিনি একাধারে পরিচালক, চিত্রনাট্য রচয়িতা এবং সংগীত পরিচালক। চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন দিকের সমন্বয় ঘটেছে এই ছবিতে তার একক প্রচেষ্টায়। মানিকদা যখন কাহিনী বলতে শুরু করেন, সেই কাহিনীর ভেতর থেকে প্রশ্ন বের করে আমি অনেক কথাই জিজ্ঞাসা করি। কাহিনীর মূল সুর হচ্ছে পুরনো সংস্কারের ওপর নতুনের জয়যাত্রা। কাহিনীর পটভূমি দার্জিলিং। দার্জিলিংয়ের অনেক অধিবাসী এ ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছেন। কাঞ্চনজঙ্ঘা ইস্টম্যান কালারে তোলা। এর আগে মানিকদা কালারে ছবি তৈরি করেননি। ছবির নায়ক-নায়িকা সবাই নবাগত।

প্রশ্ন করি, ‘কার অভিনয় সবচেয়ে ভালো হয়েছে?’

‘আমার ধারণা, ছবি বিশ্বাস সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছেন।’ কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রসঙ্গ শেষ হওয়ার পর মানিকদা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ঢাকার চলচ্চিত্রের খবর কী?’

‘ভালো ছবি করার প্রচেষ্টা চলছে’— এটুকু বলেই আমি থেমে যাই। কিন্তু পদ্মা নদীর কথা মানিকদা যখন জিজ্ঞাসা করলেন, তখন আমি পদ্মা নদীর সৌন্দর্যের সুন্দর বর্ণনা দিই। আমার কথা শেষ হওয়ার পর মানিকদা তার ছেলেবেলার স্মৃতির কথা বললেন।

ঢাকা থেকে কলকাতায় যাচ্ছিলেন স্টিমারে পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে। খুব ভোরবেলায় ঘুম থেকে তুলে মা তাকে দেখিয়েছিলেন সূর্যোদয়। বিশাল নদীর ওপরে লাল সূর্যটাই মানিকদার মনে আছে। আর কিছু মনে নেই। একটু থেমে বললেন, পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবি তোলার ইচ্ছা তার বহু দিনের। সরকারের সহযোগিতায় তা যদি সম্ভব হয়, তবে তিনি তুলবেন।

মানিকদা লেখার ফাঁকে ফাঁকে আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন। সেই সন্ধ্যায় মানিকদার বেশ কিছুটা সময় নষ্ট করি। কিন্তু সেজন্য তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেননি এতটুকুও। ফলে মানিকদা সম্পর্কে আমি যা শুনেছিলাম, তা মিথ্যা হয়ে যায়। আনন্দ ও শ্রদ্ধায় মন ভরে ওঠে। চলে আসার সময় যখন ছবি তোলার অনুমতি চাইলাম, তিনি কোনো আপত্তি করলেন না। বরং খুশি হয়ে বললেন, ‘এই লাইনে আমাদের দেশের মেয়েরা একেবারেই আসে না।’

&dquote;&dquote;এ প্রসঙ্গে পরে একজনের কাছে শুনেছিলাম মানিকদার মন্তব্য, ‘ওর ক্যামেরা ধরার অ্যাঙ্গেল দেখেই বুঝেছিলাম ও ভালো ছবি তোলে।’ ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তুলতেই একটা ছোট ঘটনা ঘটে যায়। ফ্ল্যাশের আলো ঝিলিক দিতেই মঙ্কুদি (বিজয়া রায়) ছুটে ঘরের মধ্যে চলে আসেন। তিনি ভেবেছিলেন, মানিকদার বোধহয় কোনো অঘটন ঘটেছে। আমাকে ক্যামেরাসহ ফ্ল্যাশ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বস্তি বোধ করে হেসে ফেলেন। মানিকদা আমাকে মঙ্কুদির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রথম দর্শনেই মঙ্কুদিকে আমার ভালো লাগে। তার ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য ও কোমলতা আমাকে মুগ্ধ করে। চা খাওয়ার পর যখন বিদায় নিলাম, মঙ্কুদি এলেন সিঁড়ি পর্যন্ত। আমার দিকে স্নেহভরে তাকিয়ে বললেন, আবার যেন আসি। সেই থেকে মানিকদার বাড়ির দ্বার আমার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।

কয়েক দিন পর আমি ঢাকায় ফিরে এলাম। মানিকদা আমাকে কাঞ্চনজঙ্ঘার কয়েকটি স্টিল ছবি দিয়েছিলেন। সেই ছবি, আমার নিজের তোলা মানিকদার ছবি এবং সাক্ষাত্কার লিখে যখন পারভেজ ভাইকে দিলাম, তিনি বিস্ময়ভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী করে এই অসাধ্য সাধন করলেন!’ আমার দেয়া ছবি ও লেখা পারভেজ ভাই চিত্রালীতে খুব সুন্দরভাবে কাভারেজ দেন, যা দেখে মানিকদাও খুশি হয়েছিলেন।

আমি যখন মানিকদার সাক্ষাত্কার নিই, সেই সময়ে মানিকদা আমার সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। আমি যে বিশিষ্ট সংস্কৃতিমনা শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে, এটা তিনি কীভাবে জেনেছিলেন জানি না। মানিকদা যখন শান্তিনিকেতনে ছিলেন, তখন আমার বড় ভাই সুরকার ও রবীন্দ্রসংগীতজ্ঞ আবদুল আহাদ সংগীত ভবনের ছাত্র ছিলেন। ভাইয়ের সঙ্গে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গভীর আন্তরিকতার কথা আমাকে তিনি পরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।

দু-তিন বছর মানিকদা আমাকে সাংবাদিক হিসেবে দেখতেন। আমাকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। এতে আমি সংকোচ বোধ করতাম, কিন্তু কিছু বলতাম না। একদিন চা খেতে খেতে মঙ্কুদি আমার সামনেই মানিকদাকে বললেন, ‘বাদলকে আপনি বলো কেন? ও তো আমাদের পরিবারের বন্ধু।’

কথাটা শুনে মানিকদা একটু হেসে আমার দিকে তাকালেন। সেই থেকে আমি মানিকদার কাছে ‘তুমি’ হয়ে গেলাম। পাকিস্তান আমলে ভিসার কড়াকড়ি থাকলেও বছরে একবার কলকাতায় যেতাম স্বাস্থ্যজনিত কারণে। থাকতাম দূরসম্পর্কের মামার (আবদুল সালেক) পার্ক সার্কাসের বাসায়। সেই সময়ে পারভেজ ভাইয়ের উত্সাহে ফটোজার্নালিস্ট হিসেবে টালিগঞ্জের স্টুডিওতে ঘোরাঘুরি করে ছবি তোলা এবং সাক্ষাত্কার নেয়া আমার নেশা হয়ে যায়। যাদের আমি ক্যামেরায় ধরেছিলাম এবং যাদের কথা শুনেছিলাম, তারা হচ্ছেন ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী স্যানাল, উত্তম কুমার, বিকাশ রায়, চন্দ্রাবতী দেবী, ছায়া দেবী, অরুন্ধতী দেবী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়, মাধবী মুখার্জি, নমিতা সিংহা ও সুচিত্রা সেন। ক্যামেরার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আমি একাই যেতাম সব জায়গায়। অবশ্য আমি জানতাম আমার পেছনে পাকিস্তানি চর রয়েছে।

আমি মানিকদার তিনটি ছবির কিছু কিছু শুটিং দেখি— ‘মহানগর’, চারুলতা’, ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’।

সেবার কলকাতায় যখন পৌঁছলাম, মহানগরের শুটিং প্রায়ই সমাপ্তির পথে। দু-তিন মাস শুটিং করেই মানিকদা ছবি শেষ করে ফেলতেন। সেদিন শুটিং ছিল মানিকদার নিজ বাড়িতে। নায়িকার একার। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বড় গল্প ‘অধিকারিণী’ অবলম্বনে মানিকদা মহানগরের চিত্রনাট্য লেখেন। নায়িকার ভূমিকায় ছিলেন মাধবী মুখার্জি। মাধবী দেবীকে দেখার আগে আমি তার প্রতিভা সম্পর্কে ‘অসাধারণ’ কথাটা শুনি মানিকদার মুখে। এই প্রশংসাবাচক কথার গুরুত্ব জানার জন্য মানিকদাকে বলি, ‘আপনার যেকোনো ছবির নায়ক-নায়িকা সম্পর্কে আপনার তো এই মত।’

এ কথা শুনে মানিকদা একটু হেসে বললেন, ‘সকলের সম্পর্কে আমি এ কথা বলি না, শুধু তিনজনার সম্পর্কে। তার মধ্যে মাধবী পড়েন। মাধবী দেবী যে খুব সৌন্দর্যের অধিকারী, তা নন। কিন্তু প্রতিভায় উজ্জ্বল। সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে তার চোখ। অপূর্ব অভিব্যক্তিময়।’ সেই সময়ে আমি মানিকদার সব ছবি না দেখলেও যে ক’টি ছবি দেখেছিলাম, তা থেকে আমার ধারণা হয়, নায়িকা নির্বাচনের সময় তিনি চোখের অভিব্যক্তি ও সৌন্দর্যের প্রতি বিশেষ প্রাধান্য দিতেন। এ প্রসঙ্গে মানিকদার অভিমত আমার অনুমান ভুল নয়। মানিকদা বলেন, ‘আমার ছবিতে নায়িকার সংলাপ কম থাকে বলে চোখের অভিব্যক্তির প্রয়োজন বেশি।’ গ্রীষ্মের তপ্ত মধ্যাহ্নে নিউ থিয়েটার স্টুডিওর ফ্লোরে মহানগর ছবির তিনটি শুটিং দেখি।

টুকরো টুকরো দৃশ্য কিন্তু তারই মধ্যে নিবিড় হয়ে ওঠে মধ্যবিত্ত জীবনের দ্বন্দ্বময় সংঘাত। ফ্লোরে মানিকদা যখন কাজ করেন, পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে থমথমে। এই থমথমে আবহাওয়ার মধ্যে মানিকদার বিস্ময়কর প্রতিভার নিঃশব্দে আত্মপ্রকাশ। কখনো মানিকদাকে চিন্তামগ্ন দেখায়, কখনো অস্থির, কখনো বা স্তব্ধ। ফ্লোরে একটি মুহূর্ত তিনি নষ্ট করেন না। বেশির ভাগ সময় ক্যামেরার শট তিনি নিজ হাতে তোলেন। নতুন ছবিতে মানিকদা যখন হাত দেন, তখন চিন্তিত হয়ে ওঠেন মঙ্কুদি নিজের প্রতি মানিকদার উদাসীনতার জন্য। মঙ্কুদির এ অভিযোগ মিথ্যা নয়। বহুমুখী প্রতিভা ও সৃষ্টির আলোড়নে মানিকদা ভীষণ পরিশ্রমী। আমি নিজেই দেখেছি জানালার পাশে বসে চিত্রনাট্য লেখার ফাঁকে স্কেচ করতে, সেই সঙ্গে বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকতে। পিয়ানোর সামনে সুর সৃষ্টিতে নিমগ্ন। ফ্লোরে চিন্তাশীল পরিচালক। ক্যামেরার ভিউ-ফাইন্ডারে চোখ লাগিয়ে নায়ক-নায়িকাকে নির্দেশ দেয়া। ছবির এডিটিং করার ফাঁকে শিশুদের কথাও ভেবেছেন তিনি। তাদের জন্য লিখেছেন গল্প-উপন্যাস। সেই সঙ্গে ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সম্পাদনার কাজ। লেখার ফাঁকে ফাঁকে ফোনে কথা বলা। অতিথিদের জন্য দরজা নিজে খুলতেন। অবশ্য মঙ্কুদি মানিকদাকে সহায়তা করতেন শুধু মানসিকভাবে নয়, বাস্তবেও। বিশেষ করে ছবির নায়িকাদের পোশাক-আশাক ও রূপসজ্জার ব্যাপারে। এ বিষয়ে মঙ্কুদির গভীর অভিজ্ঞতা ছিল। পারিবারিক সূত্র ছাড়া মানিকদা চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের আগেই মঙ্কুদি এ জগতে পা রেখেছিলেন। তিনি কলকাতা ও বোম্বে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। মানিকদার চিত্রনাট্যও মঙ্কুদি পড়তেন। প্রয়োজনবোধে সংশোধন করতে বলতেন এবং শুটিং চলাকালীন মঙ্কুদি এসে দেখতেন।

মেকআপ বা ডিটেলসের ধারাবাহিকতায় সামান্য একটু ত্রুটি হলেই মানিকদা ক্যামেরা ছেড়ে উঠে পড়তেন। একবার মাধবী দেবীর শুটিংয়ের সময় বারবার ক্যামেরার ভিউ-ফাইন্ডারে চোখ লাগিয়ে উঠে পড়েন। কোথায় যেন একটা ত্রুটি রয়েছে মেকআপের, অথচ ধরতে পারছেন না। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তার পর এগিয়ে এসে মাধবীর কপালের ওপর আসা কয়েকটি চুল ঠিক করে দিলেন।

১৯৬৫ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে মহানগর দেখানো হয়। এই ছবি দেখার জন্য সারা রাত দর্শক টিকিট কেনার জন্য লাইন দিয়েছিল। পত্রপত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশিত হলে আমি তাকে পত্রিকার কাটিং পাঠিয়ে দিই। তার জবাবে মানিকদা আমাকে একটা সুন্দর চিঠি লিখেছিলেন।

মহানগরের পর চারুলতার শুটিং আমি কয়েক দিন ধরে দেখেছিলাম। এই ছবির চিত্রনাট্য লেখার সময় মানিকদা কলকাতার বাইরে চলে যান।

সমুদ্রের তীরে ভেসে আসা সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে চারদিনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’-এর চিত্রনাট্য চারুলতা লিখে ফেলেন। জায়গার নাম আমার কাছে অজানা থেকে যায়। মানিকদা বলেন না। আমিও জিজ্ঞাসা করি না। বুঝতে পারি রিপোর্টারদের উত্পাতের ভয়ে তিনি এটা গোপন রাখেন। মানিকদা ভোর ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত একটানা লিখতেন। শুধু ১ ঘণ্টার জন্য সমুদ্রের তীরে এসে দাঁড়াতেন সূর্যাস্ত দেখতে। পাহাড়, নদী ছাড়াও সমুদ্রের প্রতি মানিকদার গভীর আসক্তি ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘সমুদ্রকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। ওর অশান্ত রূপটি আমাকে বিস্মিত করে। সমুদ্রের কাছে থাকলে নিজেকে আমার কখনো একা বা নিঃসঙ্গ মনে হয় না।’ নতুন কিছু সৃষ্টির তাগিদে তিনি প্রায়ই সমুদ্রের কাছে চলে যেতেন। হোটেলে একটি পুরনো পিয়ানোও ছিল। তাতে তিনি সুর সৃষ্টি করতেন।

‘ওপরে উঠে আসুন’— মানিকদার আহ্বানে ধীরে ধীরে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসি। সেট তৈরি করা হয়েছে ফ্লোরজুড়ে। নষ্টনীড়ের সেই সাবেকি আমলের চক মিলানো দোতলা বাড়ি। যে ঘরটা শুটিংয়ের কেন্দ্রস্থল, সেখানে পা দিতেই মন এক শতাব্দী পেছনে গিয়ে যেন থমকে দাঁড়ায়। আশ্চর্য! এটা যে সেট, তা যেন ভুলে যাই। ঘরের আসবাব ও সমস্ত পরিবেশের মধ্যে ভিক্টোরীয় যুগের স্পর্শ। নষ্টনীড়ের পটভূমি হচ্ছে ঊনবিংশ শতাব্দীর। স্বামী, স্ত্রী ও দেবর। এই তিনটি চরিত্রের মনস্তত্ত্বমূলক অন্তর্দ্বন্দ্ব হচ্ছে এ ছবির মূল আবেদন। মানিকদা হঠাত্ কেন এক শতাব্দীর পেছনের কাহিনী নিয়ে ছবি তুলেছেন। এ নিয়ে সুধীমহলে তখন চলছে জিজ্ঞাসাবাদ। বাঙালিরা সমালোচনা করতে ভালোবাসে। এটা হয়তো তারই লক্ষণ। বিশেষ করে মানিকদার ছবির বেলায় তো ঝড় বয়ে যায়।

মানিকদা একদিন নিজেই বলেন, যারা সমালোচক নয়, আমার ছবি দেখে তারাও সমালোচক হয়ে ত্রুটি ধরে।

কথাটা যে কতখানি সত্য, তা কাগজকলম ছাড়াও একদিন ফ্লোরে দেখলাম। মানিকদা ছবির উদ্বোধন করেন অত্যন্ত সাদামাটাভাবে। কোনো জাঁকজমক বা উত্সব অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নয়, তবু দর্শকদের আনাগোনার বিরাম ছিল না। মানিকদা যে কতখানি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, তা সাগরপাড়ের সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বোঝা যেত। পরেও দেখেছি বিদেশীদের আসতে— কেউ শুটিং দেখেন, স্কেচ করেন, কেউ বা নোট লেখেন, ছবি তোলেন।

মহানগরের ছবির এডিটিং যখন চলছিল, সেই সময়ে লাইফ পত্রিকার প্রতিনিধি এসে এডিটিংয়ের ছবি তোলেন শতাধিক। তার মধ্যে হয়তো দু-একটি ছবি ছাপাবে সেরা ছবি হিসেবে। এর মধ্যে একদিন অভিজাত পরিবারের কয়েকজন নারী এলেন শুটিং দেখতে। সেটের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তারা দেখলেন। এক নারী মানিকদাকে বললেন, দেয়ালে যে ছবিটি টাঙানো আছে ওটা একটুও মানাচ্ছে না। খুলে ফেলুন। কথাটা শুনে মানিকদা হো হো করে হেসে উঠেছিলেন, হাসিটা ছিল স্বচ্ছ-সরল।

আমি একটু অবাক হয়ে ভাবি— বিশ্বের দশ পরিচালকের মধ্যে মানিকদা যে অন্যতম, এ কথা কি ভদ্রমহিলারা জানেন না? নাকি জেনেও নিজেকে বেশি জ্ঞানী হিসেবে দেখাতে চান, ঠিক বুঝলাম না। আমার সঙ্গে ব্রিটিশ আর্টিস্ট যুবকটিও উঠে আসে ওপরে। প্রথম ফ্লোরের পর দ্বিতীয় ফ্লোরে কাজ শুরু হতেই দেখলাম কড়াকড়ি। আমরা দুজনই শুধু যখন-তখন ঢুকতে পারতাম। আমরা সেট ঘুরে দেখার পর মানিকদা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন দেখলে?’

বললাম, ‘অপূর্ব।’

শুধু যে সেট তা নয়, এই সেটের পরিবেশের মধ্যে মানিকদাকে মনে হতো অপূর্ব। লাঞ্চের বিরতির সময় ইউনিটের সবাই সেট ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মানিকদা সামান্য একটু দই আর সন্দেশ খেয়ে পরবর্তী শুটিংয়ের জন্য চিত্রনাট্য নিয়ে তন্ময় হয়ে যেতেন। ফ্লোর স্তব্ধ। অল্প অল্প আলোয় সমস্ত পরিবেশ আরো রহস্যঘন হয়ে উঠত। পুরনো যুগের পালঙ্কোর বাজুতে মানিকদা হেলান দিয়ে বসতেন। সেই সময়ে মানিকদাকে আমার গ্রিক ভাস্কর্যের সুমহান ব্যক্তির মতো মনে হতো। তার পৌরুষময় চেহারা, চিন্তায়, ব্যক্তিত্বে ও প্রতিভার আলোয় উদ্ভাসিত। দু-একটি ছবি তুলতাম। কিন্তু তন্ময়তা ভেঙে যাওয়ার ভয়ে ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তুলতে সাহস হতো না। মহানগরে মানিকদা যে সৃষ্টির রূপ দিয়েছেন বাস্তবতায়, চারুলতায় সেই সৃষ্টির রূপ দিচ্ছেন লিরিক কবিতায়, যা মনকে স্পর্শ করে দুলিয়ে যাবে। তাছাড়া এই ছবিতে মানিকদা যে নতুন ধরনের টেকনিক ব্যবহার করছেন, তা এর আগে কোনো ছবিতে করেননি।

শুটিংয়ের ফাঁকে একদিন অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে আমিও প্রশ্ন করি চারুলতা সম্পর্কে। মানিকদা বললেন, এই ছবি করার কথা তিনি ভেবে আসছেন অনেক দিন থেকে। ঊনবিংশ সালের কাহিনী হলেও এর মনস্তত্ত্ব অতি আধুনিক। অথচ এ কাহিনী দেখার সময় দর্শকদের মনে কোনো অস্বস্তি জাগবে না। কারণ নায়ক-নায়িকার মনস্তত্ত্ব এ যুগের হলেও ঘটনা অন্যকালের। তিনি আরো বলেন, আমার সব ছবি যে দর্শকদের ভালো লাগবে, আমার তা মনে হয় না। ‘অভিযান’ জনপ্রিয় হয়েছিল। মহানগর হয়নি।

বর্তমানকালে মহানগর অবশ্য নারীবাদীর ভূমিকা হিসেবে একটি স্বতন্ত্র রূপ নিয়েছে।

অভিযান ছবি সম্পর্কে মানিকদা একটি চমকপ্রদ কাহিনী বলেন। পুজোর ছুটিতে রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশ ভ্রমণ করে এসে সেবার তিনি জ্বরে পড়েন। অসুস্থতার জন্য মঙ্কুদির কড়া শাসন ছিল। কিন্তু অবাধ্য ছেলের মতো মানিকদা সে শাসন ভেঙে গল্প করতে ভালোবাসতেন, ওষুধ আর পথ্য খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে। আমাদের মতো কয়েকজন শ্রোতা পেয়ে মহাখুশি। কী করে অভিযানের পরিচালক হলেন তাই বলেন, অভিযাত্রিক গোষ্ঠীর তরুণদের অনুরোধে মানিকদা অভিযান ছবির চিত্রনাট্য লেখেন আর কোনো দায়িত্ব নেন না। হঠাত্ করে তিনি সেই ছবির পরিচালক হলেন মনোরাজ্যে একটা অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ায়। রূপকথার মতো। নিশ্চল, গতিহীন, কালো পাথরের খণ্ড মানিকদার মনে শিল্পবোধ জাগিয়েছিল। অভিযান মহড়ার কিছুদিন পর বীরভূম অঞ্চলে আউটডোর শুটিংয়ের লোকেশন দেখানোর জন্য মানিকদাকে অভিযাত্রিক গোষ্ঠীর তরুণরা নিয়ে যায়। টিলা বা ছোট পাহাড় নয়, জলের ধারে একটু উঁচু জমির ওপরে ছড়িয়ে রয়েছে বড় বড় কালো পাথর। সেই পাথরের পাশ দিয়ে মোটরে যাওয়ার সময় মানিকদা মনের মধ্যে অনুভব করেন গভীর আলোড়ন। মূক-বধির স্তব্ধ পাথরের মধ্যে তিনি দেখেন মানুষের জীবনের নানা ব্যর্থতার পুঞ্জীভূত বেদনার রূপ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝেছিলেন, এ পাথরগুলো বাদ দিয়ে অভিযান ছবি তোলা অর্থহীন। যে মন নিয়ে মানিকদা শুটিংয়ের লোকেশন দেখতে গেলেন, ফিরে এলেন অন্য অনুভূতি নিয়ে। হাজার অনুরোধে যে মন অচল ছিল, সে মনে জাগল আগ্রহ। নতুন করে তিনি আবার চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন। রূপকথার সোনার কাঠির মতোই কালো পাথরের স্পর্শে মানিকদার প্রতিভা জেগে উঠল নতুন রূপে। অভিযান ছবির নাটকীয় মুহূর্তগুলো দানা বেঁধে উঠেছে এই পাথরের আশপাশে।

(ক্রমশ)