বাংলা সাহিত্যের
যে ইতিহাস
পাই—সেখানে
আঠারো শতকের
গুরুত্ব কি
সৃষ্টিপ্রাচুর্যে? এমন
প্রশ্ন ধরে
এগোলে খুব
সন্তোষজনক উত্তর
মেলে না।
কারণ পরিমাণে
বিস্তর হলেও
সাহিত্যকর্ম হিসেবে
সৃষ্টিগুলো যে
খুব উঁচুদরের,
তেমন দাবি
করা চলে
না। ফলে
গুণের বাটখারায়
ফেললে তা
সহজেই খারিজ
হয়ে যায়।
বরং এটি
জোর দিয়ে
বলা চলে
যে বাংলা
সাহিত্যে এ
শতকের গুরুত্ব
নিহিত রয়েছে
আগত ও
অনাগত কালের
সন্ধিক্ষণের মহিমায়।
আবার এটিও
জানি ও
মানি—সাহিত্য
কোনো কালাতিক্রান্ত
উপাদান নয়।
এ কারণে
সমাজ, রাজনীতি;
সর্বোপরি রূপান্তরের
তরঙ্গও এখানে
এসে আঘাত
হানে। উপস্থিতিটা
এড়ানো চলে
না কোনোভাবেই।
এ শতকের
আরম্ভেই দেখি—মোগল
সাম্রাজ্য কাল-ঘুণের
ভারে আক্রান্ত।
বাংলার নবাবি
নিয়েও চলছে
দাবার কুটিল
চাল। কেবল
ষড়যন্ত্র আর
ক্ষমতা দখলের
লড়াই। খোয়া
যাচ্ছেন রাজার
পর রাজা।
এর পরই
বাংলাজুড়ে এক
দশকের বর্গি
আক্রমণ। পলাশীর
যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার
পরাজয়, ছিয়াত্তরের
মন্বন্তরে বাংলার
খাক হয়ে
যাওয়া। ফকির-সন্ন্যাসীদের
বিদ্রোহ, রাজক্ষমতার
লাটাই ইংরেজদের
হাতের নাগালে
আসা। চিরস্থায়ী
বন্দোবস্ত। রাষ্ট্র-রাজনীতির
এ ঢেউগুলো
সমাজ, সাহিত্যেও
আছড়ে পড়ে।
তাই দেখব—মানুষের
জীবনটাও ঠিক
সুখের ছিল
না। ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এর
সোনালি স্বপ্ন
এখানে নেই।
বরং আছে
‘মনসামঙ্গল’-এর
নীল দুঃখ।
নিচুতলার মানুষের
কথাই বলি।
কারণ এ
শতকের প্রথমার্ধের
যে সাহিত্য
সেখানে তাদের
উপস্থিতিটাই চোখে
পড়ে বেশি।
হূদয়বান কবিরাও
যাকে উপেক্ষা
করতে পারেননি।
সতেরো শতক
অব্দি বাংলায়
যে সাহিত্যকর্মগুলো
পাই—সেখানে
মুখ্য আসন
নিয়ে ছিল
রচয়িতাদের ধর্ম-মনস্কতা।
মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব
পদাবলী, পৌরাণিক
আখ্যানের অনুবাদ,
পীর পাঁচালি,
রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানগুলোতে
তার প্রমাণ
মেলে। আঠারো
শতকে এসেও
এ প্রকরণগুলো
একেবারে হারিয়ে
যাচ্ছে না।
তবে ধর্মের
মুখোশটা আলগা
হয়ে পড়ছে।
সেই ফাঁক
গলে আসরে
ঢুকে পড়ছে
মর্ত্যের মানুষ।
এ শতকের
শ্রেষ্ঠ কবি
রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রকে
বলতে শুনি:
‘নিত্য
তুমি খেলো
যাহা/ নিত্য
ভাল নয়
তাহা/ আমি
যা খেলিতে
চাহি/ সে
খেলা খেলাও
হে।’ এ
স্বরের অভিনবত্ব,
জীবনলিপ্সুতা অস্বীকার
করা চলে
না। সঙ্গে
যোগ হচ্ছে:
শাক্ত পদাবলী,
কবিগান, বাউলগান,
দোভাষী-পুঁথি
সাহিত্য ও
গীতিকা সাহিত্য।
উনিশ শতকে
সাহিত্যের পরিমণ্ডল
থেকে দেবতাদের
যে স্বর্গপ্রাপ্তি,
তার সলতে
পাকানো এ
শতকের শুরু
থেকেই দেখি।
বাংলা সাহিত্যে
মঙ্গলকাব্যের বিকাশ
ঘটেছিল তেরো
শতক থেকে
আঠারো শতকের
মধ্যে। এ
চার শতকের
রাজনৈতিক প্রতিবেশে
পাই—তুর্কি
আক্রমণ ও
ভিনদেশী শাসন,
ইসলাম ধর্মের
বিকাশ এবং
হিন্দু উঁচু
শ্রেণীর শাসন
ক্ষমতা হারানোর
আক্ষেপ। অপরপীঠে
বাঙালি সমাজের
প্রতিটি স্তরে
দেখা মেলে—অদৃষ্টবাদে
বিশ্বাস, প্রবল
দৈবনির্ভরতা এবং
কুসংস্কারের বীজ।
এ বিপন্ন
রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক
প্রতিবেশই মঙ্গলকাব্যের
জন্মদাতা। ধর্মের
কোলে কবিদের
আস্থা খোঁজা।
মঙ্গলকাব্যের ধারায়
সবচেয়ে বিখ্যাত
মনসা-মঙ্গলকাব্য।
প্রাক-পলাশী
পর্বে অন্তত
চারজন কবিকে
পাই; যারা
১৭০৩-১৭৪৪
সালের মধ্যে
মনসা-মঙ্গলকাব্য
রচনা করেছেন।
তারা হলেন
: চট্টগ্রামের রামজীবন
বিদ্যাভূষণ, পশ্চিমবঙ্গের
সীতারাম দাস,
রাইপুরের বাণেশ্বর
রায় ও
বগুড়ার জীবনকৃষ্ণ
মৈত্র। পূর্ববর্তী
তিনজন কেবলমাত্র
ঐতিহ্যের অনুসারী
হলেও জীবনকৃষ্ণের
মধ্যে কাল
ও সমাজস্রোতের
ক্ষীণ সাক্ষাৎ
পাওয়া যায়।
‘দেবখণ্ড’
ও ‘বণিকখণ্ডে’
বিভাজিত তার
‘পদ্মাপুরাণ’
প্রকাশিত হয়েছিল
১৭৪৪ সালে।
কাব্যপাঠে বুঝতে
পারি—সীমাহীন
দারিদ্র্যের মধ্যে
জীবন কাটাতে
হয়েছিল কবিকে।
লেখাপড়া করার
তেল ছিল
না। এতটাই
দৈন্য! ছিল
না লেখার
কালিও : ‘কাগজ
অতি বুড়া
কলম তাহে
মুড়া/ দোওয়াতে
পচা মসি।’
আলিবর্দী খানের
নবাবিতে দ্রব্যমূল্যের
যে বাড়বাড়ন্ত,
সেটিও কবিতার
ছলে লিপিবদ্ধ
করে গেছেন
জীবনকৃষ্ণ। যা
সে সময়ের
আর্থসামাজিক বাস্তবতা
নিমিষে মূর্ত
করে তোলে,
বোঝা যায়
সাধারণ মানুষের
দিনাতিপাত কত
কঠিন ছিল
: ‘সাধু
বলে এহি
মত্স্য বেচিব
ছয় বুড়ি।/
এরু পণের
চালু লবণ
হাঁড়ি তৈল
খড়ি।।/ পাঁচগণ্ডা
হাড়িক দিয়া
বাজাইব কাড়া।/
ডাকিয়া বলেন
গেল কানির
মাথা মোড়া।।/
বাকি পাঁচগণ্ডার
খাইব গুয়াপান।/
আনন্দে যাইব
দেশে করিয়া
পয়াণ।।’ ইতিহাসে
পাই— এ
অবস্থার জন্য
দায়ী ছিল
১৭৩৭ সালের
প্রাকৃতিক দুর্যোগ,
বর্গি হাঙ্গামা
ও জটিল
মুদ্রা ব্যবস্থা।
এ শতকের
প্রথমার্ধে দেবী
চণ্ডী ও
চণ্ডীগোত্রের অবতারদের
নিয়েও কাব্য
রচনার পরিচয়
পাওয়া যায়।
এগুলোর মধ্যে
: হরিশচন্দ্র বসুর
‘চণ্ডীবিজয়’
(১৭৩০), মুকুন্দ
মিশ্রের ‘বাশুলী
মঙ্গল’ (১৭৩৫),
মুক্তরাম সেনের
‘সারদা
মঙ্গল’ই
(১৭৪৭) কেবল
উল্লেখ করার
মতো। তাদের
কাব্যগুলো খুলে
বসলে দেখি—তারা
সবাই প্রায়
অন্ধভাবে মুকুন্দরাম
চক্রবর্তীর অনুকরণ
করেছেন। ফলে
মৌলিকতা, অভিনবত্ব
কিংবা কালিক
ছাপের কোনো
অস্তিত্ব সেখানে
পাই না।
ধর্মমঙ্গল কাব্যের
জন্ম সতেরো
শতকে হলেও
বিকাশটা আঠারো
শতকের প্রথমার্ধে।
ফলে ধর্মমঙ্গলে
প্রাক-পলাশী
পর্বের সমাজ,
মানুষ ও
রাজনীতির বেশ
বিশ্বস্ত পরিচয়
ফুটে উঠতে
দেখি। বর্ধমানের
ঘনরাম চক্রবর্তী,
বর্ধমানের নরসিংহ
বসু, বিষ্ণুপুরের
দ্বিজরামচন্দ্র, হুগলির
সহদেব চক্রবর্তী,
বীরভূমের প্রভুরাম
মুখোপাধ্যায়, বর্ধমানের
হূদয়রাম সাউ
এ ধারার
বিশিষ্ট কবি।
তারা সবাই
১৭১১-১৭৫০
কাল-পরিসরে
কাব্য রচনায়
মন দিয়েছিলেন।
ধর্মমঙ্গলের কবিদের
মধ্যে প্রথমেই
পাই ঘনরাম
চক্রবর্তীকে। প্রখ্যাত
পণ্ডিত সুকুমার
সেন তাকে
নিয়ে বেশ
উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন
: ‘ঘনরামের
রচনার বিশেষ
গুণ প্রসন্নতা
ও ভদ্ররুচি’।
এছাড়া সমাজ,
রাজনীতি ও
জীবনাচারের ছবি
খুঁজতে হলেও
ঘনরাম চক্রবর্তীকেই
এ ধারার
শ্রেষ্ঠ প্রতিভা
বলে স্বীকার
করতে হয়।
অনেকেই ১৭১১
সালে প্রকাশিত
তার কাব্য
‘শ্রীধম্মমঙ্গল’কে
অভিধা দিয়েছেন
‘রাঢ়ের
জাতীয় মহাকাব্য’
বলে। সঙ্গে
ঘনরামের কাব্যের
ঐতিহাসিক মূল্যও
সমান গুরুত্ব
দিয়ে মানতে
হয়। ইতিহাসের
দিকে চাইলে
পাচ্ছি—ঘনরাম
যখন এ
কাব্য রচনা
করেন, তখন
বাংলায় মুর্শিদকুলি
খানের সুবেদারি
চলছে। আঠারো
শতকের প্রথমার্ধের
বাংলার সমৃদ্ধি
যেমন তার
কাব্যে গোপন
থাকতে দেখি
না, তেমনি
দেখি শাসকের
প্রজাপীড়নের নজিরও
: ‘সম্প্রতি
সামর্থ্য নাই
রাজকর দিতে।/
গতবর্ষে মহারাজ
গোচর করিতে।।/
কৃপা করি
আপনি করিলে
কর মানা।/
মফঃস্বলে মহাপাত্র
দিল বন্দীখানা।।/
পূর্ব্বাপর পেলেছ
পুত্রের প্রায়
মোরে।/ এবে
অপমান এত
যেন দুষ্ট
চোরে।’ এখান
থেকে গৌড়রাজ
কর্ণসেনের রাজকার্যে
ব্যক্তিগত মনোযোগের
অভাব পরিলক্ষিত
হয়। নইলে
এ প্রশ্ন
তুলতে চাই—তার
অগোচরে কর্মচারীরা
কী করে
প্রজাদের এমন
অত্যাচার করে?
আমলাদের নিয়ে
রাজার কাছে
প্রজাদের নালিশ
জানাতেও দেখি।
বোঝা যায়
একেবারে নিষ্পেষণের
নিচে থাকলেও
কথা বলতে
পারতেন তারা।
আবার আঞ্চলিক
অনুন্নয়ের যে
চিত্র ঘনরাম
এঁকেছেন, সেটিও
আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিজাত:
‘এত
পীড়া পাইয়া
পালাল প্রজাগণ।/
মফঃস্বলে মহারাজা
নাহি দিল
মন।’ এ
থেকেও বলতে
পারি—ঘনরাম
চক্রবর্তী কেবল
কাব্য রচনা
করেই নিজের
কার্যসমাধা করেননি।
তিনি প্রজার
কল্যাণ চান।
চান দেশ
ও দশের
কল্যাণ। তাই
তুলে ধরেন
প্রান্তিকের সমস্যাকে।
এমন সাম্য
ও গণতান্ত্রিক
বোধ প্রাক-পলাশী
পর্বের কবিদের
মধ্যে প্রকৃতই
দুর্লভ।
শিব চরিত্রকে
অবলম্বন করে
সতেরো-আঠারো
শতকে ‘শিবমঙ্গল’
কাব্যধারার জন্ম
হতে দেখি।
তবে এ
ধারাটি যে
খুব বিকশিত
হয়েছিল—তেমনটি
দাবি করার
অবকাশ নেই।
পুরো আঠারো
শতকে মাত্র
একজন কবিকে
পাই—যিনি
শিবমঙ্গল রচনা
করেছিলেন। তিনি
রামেশ্বর চক্রবর্তী
(ভট্টাচার্য)।
তিনিও ছিলেন
ঘনরাম চক্রবর্তী
ও মুর্শিদকুলি
খানের সমকালীন।
তার ‘শিবায়ন’
বা ‘শিবসংকীর্তন’
প্রকাশিত হয়
১৭১১ সালে।
এ কাব্যে
‘শ্রীধম্মমঙ্গল’-এর
রাজনৈতিক পরিসর
অনাদৃত্য থাকলেও,
বাংলার কৃষিনির্ভর
সমাজ ব্যবস্থার
এক বিশ্বস্ত
ছবি পাই।
ঘনরামের কাব্যে
মুর্শিদকুলি খানের
আমলের প্রজা-উত্পীড়নের
যে ছবি
মেলে; রামেশ্বর
তার বিপরীতে
আঁকেন দরিদ্র
হলেও সুখী
জীবনের ছবি।
এমনকি কবির
মুখটাও আধুনিক
যুগের পানে
ফেরানো। তিনি
শিব ও
গৌরির দৈব্য-বাস
কেড়ে নিয়ে
তাদের সাজিয়েছেন
বাংলার দরিদ্র
কৃষক ও
কৃষাণীর মূর্তিতে।
শিবকে আটপৌরে
কৃষকদের মতোই
মাঠে কাজ
করতে, ফসল
ফলাতে দেখি।
পাকা ধান
ঘরে তুলে
আনন্দ তার
ধরে না।
গৌরিও সাধারণ
গৃহিণীর মতোই
তার জন্য
মাঠে খাবার
নিয়ে যায়।
গুছিয়ে সংসার
করে। পতি
পুত্রকে খাইয়ে
সুখী হয়ে
ওঠে। রামেশ্বর
চক্রবর্তী লিখেছেন
: ‘তিন
ব্যক্তি ভোক্তা
একা অন্ন
দেন সতী।/
দুটি সুতে
সপ্তমুখ, পঞ্চমুখ
পতি।।/ তিন
জনে বার
মুখে পাঁচ
জনে খায়।
এই দিতে
এসে নাঞি
হাড়ি পানে
চায়।।/ সুক্ত
খায়া ভোক্তা
যদি হস্ত
দিল শাকে।/
অন্নপূর্ণা অন্ন
আনে রুদ্রমূর্তি
ডাকে।।/ কার্তিক
গণেশ বলে
অন্ন আন
মা।/ হৈমবতী
বলে বাছা
ধৈর্য হইয়া
খা।/ উল্বন
চর্বণে ফির্যা
ফুরাইল ব্যঞ্জন।/
এক কাল্যে
শূন্য থালে
ডাকে তিনজন।।/
চটপট পিষিত
মিশ্রিত করা
যুষে।/ বায়ুবেগে
বিধুমুখী ব্যস্ত
হইয়া আসে।।/
চঞ্চল চরণেতে
নূপুর বাজে
আর।/ রিনি
রিনি কিঙ্কিনী
কঙ্কণ ঝঙ্কার।।’
এছাড়া গৌরির
বিবাহপূর্ব জীবন
ও নানা
সামাজিক প্রথার
আয়োজন এখানে
দেখা যায়।
‘শিবসংকীর্তন’
কাব্যে দারিদ্র্য
আছে, তবে
অপর পীঠে
সুখও হাজির।
এ আঠারো
শতকের একেবারে
আরম্ভের চিত্রপট।
আঠারো শতকের
বাংলা সাহিত্যের
শ্রেষ্ঠকীর্তি রায়গুণাকর
ভারচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল
কাব্য’।
তিনি ১৭৫২
সালে নবদ্বীপের
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের
রায়ের অনুরোধে
‘অন্নদামঙ্গল
কাব্য’ রচনা
করেন। এ
কাব্যের তিনটি
অংশ রয়েছে
: ক. অন্নদামঙ্গল
বা দেবখণ্ড,
খ. কালিকামঙ্গল
বা বিদ্যাসুন্দর
আখ্যান এবং
গ. অন্নপূর্ণাঙ্গম
বা মানসিংহ-ভবানন্দ
উপাখ্যান। একই
মালায় পুরাণ,
রোমান্টিকতা ও
ইতিহাসকে গেঁথে
বাংলা সাহিত্যে
এক অভিনব
ঘটনার জন্ম
দেন ভারতচন্দ্র।
তার জন্ম
ও মৃত্যু
প্রাক-পলাশী
পর্বে। একালের
সামাজিক, রাজনৈতিক
ও সাংস্কৃতিক
জীবনের বিশ্বস্ত
পরিচয় তুলে
ধরেছেন তিনি।
একেবারে বিপুল
বর্ণনায়। ইতিহাসে
পাই বর্গি
আক্রমণে আলিবর্দী
খানের রাজকোষ
একেবারে শূন্য
হয়ে উঠেছিল।
তিনি রাজা
কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে
নজরানা হিসেবে
১২ লাখ
টাকা দাবি
করেন। কৃষ্ণচন্দ্র
এ টাকা
না দেয়ায়
তাকে কারারুদ্ধ
করা হয়।
ভারতচন্দ্র এ
কাঁচা ইতিহাসকে
তার কাব্যের
রসদ করে
নেন। সেই
পথেই আবার
মাহাত্ম্য পায়
দেবী অন্নদা,
নিরুপায় ও
অর্ঘ্যদাতা কৃষ্ণচন্দ্রকে
মুক্ত করে
দিয়ে: ‘সেই
আজ্ঞামত রাজা
কৃষ্ণচন্দ্র রায়/
অন্নপূর্ণা পূজা
করি তরিল
সে দায়।’
বস্তুত, কৃষ্ণচন্দ্রের
পূর্বপুরুষ ভবানন্দ
মজুমদারের মহিমা
গাইবার জন্যই
কলম ধরেছিলেন
ভারতচন্দ্র। সে
পথ বেয়ে
সম্রাট জাহাঙ্গীর,
রাজা মানসিংহ,
রাজা প্রতাপাদিত্যও
ঢুকে পড়েন
আখ্যানে। একদিকে
রাজার লড়াইয়ের
চিত্র, অপরদিকে
সাধারণ মানুষের
জীবনের ছবি।
ভবানন্দকে কেন্দ্র
করে রাষ্ট্র
রাজনীতি ও
সমাজটাকে খুলে
দেখান ভারতচন্দ্র।
কত সামাজিক
আচারের পরিচয়
পাই! মেলে
নানা ধরনের
সংস্কার ও
লোকবিশ্বাস। আছে
বিস্তারিত রান্নার
বিবরণ। মঙ্গলকাব্যের
ধারা মেনে
রূপ ও
প্রকৃতি বর্ণনাও
দুর্লভ নয়।
সঙ্গে প্রথম
নাগরিক কবির
শিরোপা পাওয়া
ভারতচন্দ্রের বাগ-বৈদগ্ধ।
ঈশ্বর পাটনীর
মুখ দিয়ে
তিনি বলিয়ে
নেন যুগের
বার্তা: ‘আমার
সন্তান যেন
থাকে দুধে
ভাতে’ কিংবা
বর্গি আক্রমণ
নিয়ে উচ্চারণ
করেন: ‘নগর
পুড়িলে কি
দেবালয় এড়ায়?’
এই কাব্যেই
জীবনের মধ্যযুগীয়
বন্ধন খানিকটা
শৈথিল্যের অবকাশ
পায়। কুলীন
কন্যার সম্প্রদান
হতে হতে
বয়স উতরে
যেত, ‘বিদ্যাসুন্দর’
অংশে সে
আওয়াজ পাই
: ‘আর
রামা বলে
আমি কুলীনের
মেয়ে।/ যৌবন
বহিয়া গেল
বর চেয়ে
চেয়ে।।/ যদি
বা হইলো
বিয়া কতদিন
বই।/ বয়স
বুঝিলে তার
বড়দিদি হই।।’
স্বামীর জন্য
কাতর কুলীন
মেয়ের এ
আক্ষেপ তখনকার
সমাজের চিত্রকেই
তুলে ধরে।
সব মিলিয়ে
ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল
কাব্য’ হয়ে
ওঠে আঠারো
শতকের শ্রেষ্ঠ
কীর্তি। বাংলা
সাহিত্যের ধ্রুপদি
সম্পদ।
রামেশ্বর চক্রবর্তীসহ
বিভিন্ন পর্যটকের
বয়ানে আঠারো
শতকের প্রথমার্ধের
বাংলার এক
সমৃদ্ধ ছবি
প্রত্যক্ষ করি।
কিন্তু এ
শতককে রাষ্ট্রবিপ্লবের
কাল হিসেবেও
অস্বীকার করা
চলে না।
এ কারণে
চিত্রটা বহমান
থাকে না।
দেখা যায়—১৭৪০
সালে সরফরাজ
খানকে পরাজিত
করে নবাবিতে
বসেন আলিবর্দী
খান। তবে
তার নবাবি
আমল খুব
সুখের ছিল
না। ১৭৪২
থেতে ১৭৫১
সাল; এ
এক দশকজুড়ে
বাংলার বুকে
চলে বর্গিদের
অবাধ লুণ্ঠন
ও অত্যাচার।
যে কারণে
শাসক থেকে
শুরু করে
সব শ্রেণীর
মানুষের জীবন
দুর্বিষহ হয়ে
উঠেছিল। এ
বর্গি আক্রমণের
শেষ দিকের
বিবরণ পাওয়া
যায় ১৭৫১
সালে প্রকাশিত
গঙ্গারাম দত্তের
‘মহারাষ্ট্রপুরাণ’-এ।
এছাড়া রায়গুণাকর
ভারতচন্দ্র তার
‘অন্নদামঙ্গল
কাব্য’ও
রচনা করেছিলেন
এ বর্গি
হামলার দশকেই।
তিনিও এই
কালপর্বকে উপেক্ষা
করতে পারেননি।
তবে তিনি
আলিবর্দী খানের
প্রতি বিরাগ
ছিলেন। আলিবর্দী
তার অন্নদাতা
কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতি
নিষ্ঠুর হয়েছিলেন
বলে। ফলে
পক্ষপাত অগোচর
থাকে না।
অপরদিকে—‘মহারাষ্ট্রপুরাণ’-এ
ঐতিহাসিক নিষ্ঠতা
যেমন পাই,
তেমনি পাই
বাংলায় মারাঠা-বর্গিদের
অত্যাচারের সকরুণ
চিত্র। এ
কারণে—‘মহারাষ্ট্রপুরাণ’কে
এ শতকের
শ্রেষ্ঠ ইতিহাসনিষ্ঠ
সাহিত্যকীর্তি বললে
অত্যুক্তি হয়
না। গঙ্গারাম
প্রথমে পৌরাণিক
বাতাবরণ সৃষ্টি
করে, পাপক্ষয়ের
বাহানায় এখানে
মারাঠাদের প্রবেশ
করান। তবে
সেটিও ইতিহাসের
গণ্ডি মেনেই।
দিল্লির সম্রাট
মহম্মদ শাহর
সঙ্গে আলিবর্দীর
দ্বন্দ্ব সেখানে
গোপন থাকে
না। সামনে
আসে ১৭৪০
সালে সম্রাট
কর্তৃক মারাঠাদের
চৌথ প্রদানের
প্রসঙ্গটিও। ভাস্কর
পণ্ডিতের অত্যাচার
ও তার
নিধন-চিত্রও
উন্মোচন করেন
গঙ্গারাম। তবে
তার বড়
মুন্সিয়ানা দেখি
জনজীবনের অত্যাচারের
চিত্র তুলে
ধরতে। যেখানে
সাধারণ মানুষ
থেকে আরম্ভ
করে জগেশঠের
তুল্য ধনীরাও
রেয়াত পায়
না। গঙ্গারাম
লিখেছেন: ‘তবে
সব বর্গি
গ্রাম লুটিতে
লাগিল।/ জত
গ্রামের লোক
সব পলাইল।।/
ব্রাহ্মণ পণ্ডিত
পলাএ পুথির
ভার লইয়া।/
সোনার বাইনা
পলাএ কত
নিক্তি হড়পি
লইয়া।।/ গন্ধ
বণিক পলাএ
দোকান লইয়া
জত।/ তামা
পিতল লইয়া
কাঁসারি পলাএ
কত।।/ কামার
কুমার পলাএ
চাক নড়ি।/
জাউলা মাউছা
পলাএ লইয়া
জাল দড়ি।।’
গর্ভবতী নারীদের
সকরুণ বেদনাও
তার নজর
এড়ায়নি, তিনি
লিখেছেন: ‘গর্ভবতী
নারী জত
না পারে
চলিতে।/ দারুণ
বেদনা পাইয়া
প্রসবিছে পথে।।’
তবে অনেক
গ্রামের লোকজন
আতঙ্কেও পালিয়ে
যেতেন বলে
জানা যায়।
এখানে মারাঠাদের
বিপরীতে নানা
যুদ্ধের বিবরণও
গঙ্গারাম দিয়েছেন।
যার পেছনে
সেকালের দলিল-দস্তাবেজ
ও কোম্পানির
নথির সমর্থন
পাই। তবে
ভাস্কর পণ্ডিতের
নিধনের মধ্য
দিয়েই ‘মহারাষ্ট্রপুরাণ’-এর
বিবরণ সমাপ্ত
হয়েছে। ফলে
পরেরটুকু জানার
এক চিলতে
ইচ্ছে মনের
মধ্যে উঁকি
দেয়। এছাড়া
বিভিন্ন কবিতা
ও ছড়াতেও—মারাঠা
বর্গিদের কর্তৃক
বাংলা লুণ্ঠনের
সংবাদ পাওয়া
যায়। ‘মহারাষ্ট্রীয়
আক্রমণের কবিতা’
নামের এক
খণ্ডিত পুঁথিতে
পাচ্ছি, বর্গি
হামলার মুখে
ইংরেজদের কলকাতার
কাশিমবাজার কুঠি
ছেড়ে পালাবার
খবর : ‘ফজদুর
সেছমান পলায়
আর পলায়
ফরাস।/ এনসান
ওলন্দাজ পলায়
পাইয়া তরাস।।/
কলিকাতায় ডিঙ্গিরাজ
পলায় আর
পলায় স্বাস।/
বরগিরে দেখিয়া
তারা না
করে বিশ্বাস।।’
বুঝতে পারি—কেবল
বাঙালি নয়,
ইংরেজদেরও ভুগতে
হয়েছিল বেশ।
সমাজের চাহিদা
থেকেই মধ্যযুগে
বাংলা সাহিত্যে
অনুবাদের জন্ম
হয়। এ
অনুবাদগুলো হয়েছিল
বস্তুত তিনটি
ভাষা থেকে:
সংস্কৃত, আরবি
ও ফারসি।
আঠারো শতকেও
এ অনুবাদের
অব্যাহত ধারা
দেখি। তবে
ক্ষয়ের হাত
থেকে তা
রক্ষা পায়নি।
এটি অনুবাদের
ম্লানতার কাল।
প্রাক-পলাশী
পর্বে তিনজন
‘রামায়ণ’
অনুবাদককে পাচ্ছি।
প্রথমেই আসা
যাক—বাঁকুড়া
জেলার শঙ্কর
কবিচন্দ্র প্রসঙ্গে।
তিনি ১৭০২
সালে বাল্মীকি
ও অধ্যাত্ম
রামায়ণ অবলম্বনে
ছয়খণ্ডে ‘বিষ্ণুপুরী
রামায়ণ’ রচনা
করেন। অপর
দুজন হলেন:
ফকিররাম কবিভূষণ
ও শিবচন্দ্র
সেন। আঠারো
শতকের প্রথমার্ধে
‘মহাভারত’
ও ‘ভাগবত’-এরও
প্রচুর অনুবাদ
পাওয়া যায়।
‘মহাভারত’-এর
অনুবাদগুলোর অধিকাংশই
খণ্ডিত ও
অনুকরণের দোষে
ক্লিষ্ট। ফলে
তত্কালীন সমাজ,
রাজনীতির ছাপ
তাতে পাওয়া
যায় না।
তবে ‘ভাগবত’-এর
অনুবাদক হিসেবে:
বলরাম দাস,
অভিরাম দাস
ও শঙ্কর
চক্রবর্তীর নাম
উল্লেখ্য। আবার
এ অনুবাদগুলোই
কি কিছুটা
হলেও জর্জ
আব্রাহাম গিয়ার্সন,
ম্যাক্সমুলারদের প্রাণিত
করে না—ভারতাত্মার
সন্ধানে? সে
গুরুত্ব মানতে
হয় বৈকি!
এ শতকের
প্রথমার্ধে, আরবি-ফারসি
না জানা
বাঙালি মুসলমানদের
জন্য ইসলামী
পুরাণের অনুবাদও
দৃষ্টিগোচর হয়।
সমাজের নানা
প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম
করে এ
ধারার কবিদের
অনুবাদে হাত
লাগাতে হয়েছিল।
এ ধারার
অনুবাদ-কবিদের
মধ্যে রয়েছেন:
শেখ মনসুর,
কবি আশরাফ,
শেখ পরান
ও হেয়াত
মামুদ। তারা
১৭০৩ থেকে
১৭৫৭ সালের
মধ্যে এ
অনুবাদগুলো সম্পন্ন।
বিশেষভাবে নাম
করতে চাই—
রংপুরের কবি
হেয়াত মামুদের।
তিনি চারটি
কাব্য অনুবাদ
বা রচনা
করেছিলেন: ‘জঙ্গনামা’
(১৭২৩) ‘সর্বভেদবাণী’
(১৭৩২), ‘হিতজ্ঞানবাণী’
(১৭৫৩) এবং
‘অম্বিয়াবাণী’
(১৭৫৭)।
শাহ্ গরীবুল্লাহ্র
‘জঙ্গনামা’ও
এ পর্বের
রচনা। তবে
এটিও বলতে
চাই—কাব্যিক
কুশলতা থাকলেও
সমাজ, মানুষ,
সমকালীনতার বিশ্বস্ত
চিত্র তাদের
রচনাগুলোতে পাই
না। এ
শতকের প্রথমার্ধ
থেকেই: বৈষ্ণব
পদাবলী, পীর
পাঁচালি, সুফি
সাহিত্য, রোমান্টিক
প্রণয়োপাখ্যান রচনাতেও
ভাটা দৃষ্টিগোচর
হয়। আরম্ভে
উল্লেখ করেছিলাম—আঠারো
শতকের সাহিত্যের
গুরুত্ব যুগসন্ধিক্ষণের
মহিমায়। প্রাক-পলাশী
পর্ব অব্দি
সেই পুরনো
সাহিত্যগুলোরই পর্দা
গুটানোর পালা
চলে। যার
মান্য উদাহরণ
এসব ধারার
কাব্যকীর্তিগুলো। আবার
পলাশী-উত্তর
পর্ব থেকেই
বাংলা সাহিত্যকে
পল্লী কিংবা
ছোট ছোট
রাজসভার বলয়
থেকে মুক্ত
হয়ে কেন্দ্রের
দিকে চলতে
দেখি। পুরনো
খোলস ছেড়ে
শরীরে নতুন
আভরণ জড়ানোর
প্রয়াস মূর্তি
পায়। কলকাতাকে
কেন্দ্র করে
বিকশিত হতে
দেখি নাগরিক
আবহ। কবিগান,
নিধুবাবুর গান,
পাঁচালী গীতি
এ নবোদ্ভূত
প্রাক-নাগরিক
শ্রেণীর সাহিত্যরুচি
মেটায়, যা
কালধর্মকে মেনেই
উনিশ শতকের
সঙ্গে আঠারো
শতকের সেতু
যোজনা করে।
দেখা দেন
ঈশ্বরগুপ্তের তুল্য
প্রতিভারা। বাংলা
সাহিত্যে অবসান
ঘটে আঠারো
শতকীয় দ্বিধা,
সংকীর্ণতা ও
সংকরতার।
নাজমুল হাসান: লেখক





