পলাশী যুদ্ধের
আগের অবস্থাটা
বড় টালমাটাল।
দিল্লির শাসন
শিথিল হয়ে
পড়ছে, বাংলায়
তখন ইউরোপীয়
বণিকরা ব্যবসা-বাণিজ্যে
ব্যস্ত। দিল্লিতে
তখন ভারত
শাসক আওরঙ্গজেব,
তিনি নিজে
যেমন অন্যের
বিশ্বাসের পাত্র
ছিলেন না,
তেমনি অন্যকেও
বিশ্বাস করতেন
না। এ
সন্দেহপ্রবণতা আওরঙ্গজেবের
চরিত্রে প্রধান
দুর্বলতা। আর
তা বজায়
রাখতে গিয়ে
এবং সাম্রাজ্যের
বিপুল দায়িত্বভারের
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশটুকুও
নিজে করতে
গিয়ে একদিকে
যেমন তিনি
আমির-ওমরাহ
ও উচ্চপদস্থ
কর্মচারীদের উদ্যমহীন
করে তুলে
সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলার
পথ প্রশস্ত
করেছিলেন, অন্যদিকে
তেমনি শেষ
জীবনে বৃদ্ধ,
অশক্ত অবস্থায়
কর্মচারীদের ওপর
তার কর্তৃত্ব
নিয়ন্ত্রণের বাইরে
চলে যাচ্ছিল।
এমন
একটি অবস্থার
মধ্যে ১৭০২
খ্রিস্টাব্দে বাংলার
দেওয়ান মুর্শিদকুলি
খান আওরঙ্গজেবকে
১ কোটি
টাকা রাজস্ব
পাঠালেন। আওরঙ্গজেবের
রাজকোষ তখন
শূন্য হয়ে
পড়েছে। সম্রাট
খুশি হয়ে
তাকে পরিত্রাতা
দেবদূত বললেন।
মুর্শিদকুলি খান
নবাবের প্রিয়পাত্র
হয়ে উঠলেন।
তখন বাংলার
সুবাদার আজিম
উশ্ শান,
১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে
সুবাদারের সঙ্গে
বিরোধ বাধায়
মুর্শিদকুলি খান
দেওয়ানি দপ্তর
ঢাকা থেকে
সরিয়ে মুর্শিদাবাদে
স্থানান্তর করেন।
মুর্শিদাবাদের
কাশিমবাজার তখন
অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র।
ইউরোপীয় বণিকেরা
যথাক্রমে আর্মেনীয়,
ফরাসি, ওলন্দাজ,
দিনেমার, ইংরেজরা
সৈদাবাদ, ফরাসডাঙ্গা,
কালিকাপুর, কাশিমবাজারে
কুঠি স্থাপন
করে কাশিমবাজার
অঞ্চলকে একটি
বাণিজ্যনগরীতে পরিণত
করেছে। আওরঙ্গজেবের
মৃত্যুর পর
১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে
মুর্শিদকুলি বাংলায়
স্বাধীন রাজ্য
প্রতিষ্ঠা করেন,
মুর্শিদকুলির দক্ষ
শাসন, আন্তর্বাণিজ্য
ও বহির্বাণিজ্যে
দারুণ উন্নতির
ফলে ভারত
ও বাইরের
দেশ থেকে
বহু বণিক,
রাজপুরুষ, ধনকুবের,
সৈনিক, ভাগ্যান্বেষীরা
এখানে আসতে
লাগলেন।
এ
সময় কলকাতা
থেকে কাছে
হুগলিকে কেন্দ্র
করে চন্দননগরে
ফরাসি, চুঁচুড়ায়
ওলন্দাজ, শ্রীরামপুরে
দিনেমাররা ব্যবসা-বাণিজ্য
করছে। এছাড়া
চুঁচুড়ায় আর্মেনীয়,
হুগলিতে পর্তুগিজ,
রিষড়ায় গ্রিক,
ভদ্রেশ্বরে অস্ট্রিয়ানস,
হুগলিতে ইংরেজ
প্রভৃতি ইউরোপীয়
জাতি বাণিজ্য
করতে এসেছিল।
এত ছোট
জায়গার মধ্যে
এতগুলো দেশের
অবস্থানের জন্য
এ জায়গাটিকে
লিটল ইউরোপ
বলা হতো।
ইংরেজরাই নানা
ছল-চাতুরীর
মাধ্যমে স্থায়িত্ব
লাভ করেছিল।
সপ্তগ্রাম
বন্দরের পর
আর পলাশীর
যুদ্ধ হওয়ার
আগে কাশিমবাজার
বাংলার শ্রেষ্ঠ
বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে
উঠেছিল। ঢাকা
থেকে মুর্শিদাবাদে
রাজধানী স্থানান্তরিত
হলে ব্যবসা-বাণিজ্য
বহুগুণ বেড়ে
যায়। কাশিমবাজার
থেকে ভারতবর্ষের
বিভিন্ন স্থানে,
পূর্ব এশিয়ায়
ও ইউরোপের
নানা দেশে
পণ্য রফতানি
হতো। রেশম
ছিল প্রধান
পণ্য, নানা
রকমের রেশমি
কাপড় তৈরি
হতো। তাছাড়া
সুতির কাপড়,
ঘি, লংকা,
নীল, মোম,
কর্পূর, ফিটকিরি,
পারদ, চীনামাটির
বাসন, দস্তার
সামগ্রী, হাতির
দাঁতের জিনিসপত্রসহ
নানা ধরনের
বাণিজ্য চলত।
ইংরেজ,
ফরাসি, ওলন্দাজ,
আর্মেনীয় বণিকদের
পাশাপাশি বাঙালি
ব্যবসায়ী, গুজরাটি
ও মাড়োয়ারি
বণিকরাও থাকত।
পলাশীর যুদ্ধের
পর ইংরেজদের
যে অত্যাচার
কৃষিক্ষেত্রে, শিল্প
বাণিজ্যক্ষেত্রে হয়েছিল
এবং লাভের
জন্য যতটা
নিচে নামা
যায় তার
ব্যবস্থা করেছিল।
প্রাক-পলাশী
যুগে কিন্তু
তেমন ব্যবহার
বা অত্যাচার
তারা করার
সুযোগ পেত
না, সে
সময় একেকটি
ইউরোপীয় কুঠিতে
৫০০-৭০০
লোক রেশম
কাপড় বোনার
সঙ্গে যুক্ত
থাকত। এরা
বেশির ভাগ
স্থানীয় ও
আশপাশ থেকে
আসা তাঁতি।
ভালো কাজ
পাওয়ার আশায়
তারা কর্মচারীদের
সঙ্গে ভালো
ব্যবহার করত।
পলাশী
যুদ্ধের আগে
অষ্টাদশ শতাব্দীর
প্রথমদিকে ইউরোপীয়রা
অনেকটা বুঝে
গিয়েছিলেন এখানকার
প্রকৃতি, রাজনৈতিক,
সামাজিক, অর্থনৈতিক
ও ধর্মীয়
অবস্থা। বাংলার
সাধারণ মানুষ
এসব কুঠি
ও বাণিজ্যকেন্দ্রে
অনেক কাজের
সুযোগ পাচ্ছে।
রেশম ও
সুতি বস্ত্রের
দেশীয় কারিগররা
খাতির পেতেন।
ইউরোপীয়রাও জানত
ভালোভাবে ব্যবসা
করতে গেলে
দেশীয় মানুষের
সাহায্য ছাড়া
সম্ভব নয়।
বাংলার জল-হাওয়ায়
বড় হওয়া
বুদ্ধিমান বাঙালিরা
আদব-কায়দা
শিখে নিজের
গুণে কাজকর্মে
পারদর্শী হয়ে
কুঠিতে গুরুত্বপূর্ণ
পদের দায়িত্বে
থেকেছেন। উদাহরণস্বরূপ
বলা যেতে
পারে চন্দননগরে
ফরাসিদের দেওয়ান
ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী,
কাশিমবাজারে ছোট
রাজবাড়ীর দীনবন্ধু
রায় যিনি
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির রেশম
কুঠির গুরুত্বপূর্ণ
পদে ছিলেন,
বিভিন্ন মধ্যস্থতায়
থাকতেন মহারাজা
নন্দকুমার প্রমুখ।
সাধারণ
ব্যবসায়ী বা
সাধারণ মানুষের
সঙ্গে ভালো
ব্যবহারের সুফলও
ইউরোপীয়রা পেতেন।
কাশিমবাজার রাজবাড়ীর
প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণকান্ত
নন্দীর পূর্বপুরুষদের
কাশিমবাজারে রেশম
ও সুপারির
ব্যবসা ছিল।
কান্তবাবুর একটি
মুদির দোকান
ছিল বলে
তিনি কান্ত
মুদি নামে
পরিচিত ছিলেন।
তিনি বাংলা,
ফরাসি ও
সামান্য ইংরেজি
জানতেন। ইংরেজ
কুঠির সামনে
তার দোকান
থাকায় তার
সঙ্গে ইংরেজদের
ভালো যোগাযোগ
ছিল। ১৭৫৬
সালে সিরাজউদ্দৌলা
ইংরেজ কুঠি
আক্রমণ করলে
পলাতক ওয়ারেন
হেস্টিংসকে কেউ
আশ্রয় দিতে
রাজি হননি।
কান্তবাবু নবাবের
সৈন্যের ভয়
উপেক্ষা করে
হেস্টিংসকে আশ্রয়
দিয়ে একটি
জালার মধ্যে
লুকিয়ে রেখেছিলেন।
পরবর্তীকালে ওয়ারেন
হেস্টিংস যখন
গভর্নর হন
তখন কান্তবাবুকে
উচ্চরাজকার্যে নিযুক্ত
করেন ও
প্রচুর ভূসম্পত্তি
দান করেন।
কোম্পানি
নিজেরা ব্যবসা
করে লাভবান
হতো। কোম্পানির
বিভিন্ন পদে
থাকা কর্মচারীরা
স্থানীয় ব্যবসাদারদের
সঙ্গে যোগাযোগ
রেখে বিভিন্ন
ব্যবসায় যুক্ত
হয়ে লাভবান
হতেন। বিদেশে
এসে ইউরোপীয়রা
শুধুই ভাগ্যের
হাতে নিজেদের
ছেড়ে দিতেন
না। কলকাতার
প্রতিষ্ঠাতা জব
চার্নক একসময়ে
কাশিমবাজারে ২৫
টাকা বেতনের
ইংরেজ কুঠির
সহকারী অধ্যক্ষ
ছিলেন। ১৭৫৭
সালে ওয়ারেন
হেস্টিংস একজন
সাধারণ কর্মচারী
ছিলেন, সেখান
থেকে তিনি
বাংলার প্রথম
গভর্নর জেনারেল
হয়েছিলেন।
১৭৩১
খ্রিস্টাব্দে যোশেফ
দুপ্লেক্স চন্দননগরের
ফরাসি গভর্নর
হয়ে এলেন।
পণ্ডিচেরীতে থাকার
সময় তিনি
ব্যবসার মাধ্যমে
কোম্পানির সৌভাগ্য
গড়ে তুলেছিলেন।
তিনি চন্দননগরে
এসে এখানকার
বাসিন্দাদের উৎসাহিত
করলেন বাণিজ্যের
জন্য। অনেক
নৌকা কেনা
হলো, পণ্যবাহী
জাহাজ কেনা
হলো, ব্যবসায়ীদের
উৎসাহ দেয়ার
জন্য অগ্রিম
টাকা দেয়া
হলো এবং
উৎসাহী ব্যবসায়ীদের
নিয়ে কমিটি
তৈরি হলো।
প্রথমদিকের উদ্যোগে
ঢাকা, চট্টগ্রাম,
পাটনা, পণ্ডিচেরী,
মাহে, মালাবার
উপকূল প্রভৃতি
জায়গায় পাঠানো
হলো। উচ্চাকাঙ্ক্ষীরা
সুরাট, পারস্য
উপসাগর, চীন,
আরব দেশ,
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়া প্রভৃতি
জায়গায় সফল
বাণিজ্য হলো।
এভাবে আত্মবিশ্বাস
বাড়ার ফলে
আরো টাকার
জোগান দিতে
লাগল ইউরোপীয়রা।
রাজনৈতিক কারণে
অস্থিরতা থাকলেও
ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের
মধ্যে সমঝোতা
খুব ভালো
ছিল। আয়ের
মাত্রা বেড়ে
গেল, ইউরোপে
যাওয়া টাকার
পরিমাণও বাড়ল।
অষ্টাদশ
শতাব্দীর গোড়ার
দিকে সুতিবস্ত্র,
মসলিন বহুল
পরিমাণে রফতানি
হতো। এখান
থেকে বস্ত্র
রফতানি করে
যে দেশে
পাঠানো হতো
সেখানকার বস্ত্র
অপেক্ষা অনেক
উঁচু দামে
বিক্রি হতো
চন্দননগরের বস্ত্র।
আগে এ
শহরে প্রায়
১ হাজার
৪০০ ঘর
তন্তুবায়ের বাস
ছিল। এদের
উৎসাহ দিত
ফরাসিরা নিজেদের
ব্যবসার গতি
বাড়ানোর জন্য।
ম্যানিলা থেকে
তুলো এনে
তাদের দেয়া
হতো। এখানে
চরকায় সুতো
তৈরি হতো।
এ সুতো
কাটার কাজে
অনেক গরিব
মানুষের অন্নসংস্থান
হতো। শুধু
তন্তুবায় কন্যারাই
যে এ
কাজ করতেন
তা নয়,
এতে অনেক
গরিব স্ত্রীলোকেদের
অবলম্বন ছিল।
হস্তচালিত মাকু
আগে কাপড়
তৈরির জন্য
ব্যবহূত হতো।
এরপর ঠকঠকি
তাঁত বা
কলের তাঁতের
প্রচলন হয়।
শ্রীরামপুরে এ
ধরনের তাঁত
ব্যবহার করত
দিনেমার বা
ড্যানিশরা। ধুতি
ও শাড়ির
পাড়ের জন্য
সুতো রঙ
করার কাজও
এখানে খুব
হতো। এমন
পাকা ও
সুন্দর রঙ
অন্য কোথাও
হতো না।
ফরাসি, ডাচ
প্রভৃতি দেশের
বৈদেশিক বণিকেরা
এখানকার রঙিন
সুতো ইউরোপের
বিভিন্ন দেশে
চালান দিত।
সে সময়
প্রায় তিন
হাজার তাঁত
ছিল, এসব
তাঁতিকে উৎসাহ
দেয়া, তাদের
মনোরঞ্জনের জন্য
উৎসবের আয়োজন
করা ও
তাদের সাহায্য
ইউরোপীয়রা করত
সবটাই নিজেদের
ব্যবসার স্বার্থে।
বণিক
বৃত্তিবাদ বাংলায়
এক গভীর
ছাপ ফেলেছিল।
বণিকদের কার্যকলাপ
নিরীক্ষণ করে
এটাই প্রতীয়মান
হয় যে
ব্যবসা-বাণিজ্যের
উন্নতিতে, সুসংহত,
স্থায়ী বন্দোবস্তের
প্রয়োজনের সম্বন্ধে
ইউরোপীয় বণিককুলের
বদলা সম্বন্ধে
সঠিক ধারণাই
ছিল না।
ধীরে ধীরে
তারা অবস্থার
মূল্যায়ন করে
সাধ্যমতো চেষ্টা
করছিল সুসংহত
ও স্থায়ী
ব্যবস্থা গ্রহণে।
এর দ্বারাই
তাদের বাণিজ্যের
প্রসার সুগম
হয়েছিল। তারা
উপলব্ধি করেছিল
ব্যবসায় স্থায়িত্ব
আনতে গেলে
নদীতটের জমিগুলো
কাজে লাগাতে
হবে। তাই
তারা নদীতীরবর্তী
স্থানগুলোতে গুরুত্ব
অনুযায়ী প্রয়োজনীয়
কুঠি তৈরির
ব্যবস্থা করে
ফেলল।
মূল
ব্যবসার সঙ্গে
স্থানীয় কৃষিজ
পণ্যের ব্যবসায়ও
ইউরোপীয়রা ঢুকে
পড়েছিল। কৃষির
ব্যাপারে নিজেদের
সুবিধামতো বণিকেরা
জোগান বরাবর
রসদের দাম
ধার্য করত।
কৃষিজাত পণ্য
কম দামে
কিনত। আঞ্চলিকেরা
যে দরদাম
দিত তার
চেয়ে কম
দামে তাদের
উত্পন্ন জিনিস
কিনত। শ্রমিকদের
মজুরি নিয়ে
এক রকমের
শোষণ চলত।
নদীর
ধারগুলোতে তারা
নগরশৈলীর গঠন
বৈচিত্র্য, ঐশ্বর্য,
সুবন্দোবস্ত, নাগরিক
স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন
নগর হিসেবে
তৈরি করত।
এ এলাকার
মধ্যে স্থানীয়
কারোর বসত
তারা পছন্দ
করত না।
একটা দূরত্ব
তৈরি করেই
হতো এই
নগরজীবন।
শহরের
চারপাশ ঘিরে
একটা সবুজের
বেষ্টনী তৈরি
করত। পলাশীর
যুদ্ধের আগের
এই সময়টিতে
তারা ধর্মীয়
ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা
সৃষ্টি করা
বা বিভিন্ন
গোষ্ঠীর মধ্যে
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
ব্যাঘাত সৃষ্টি
করা, এমন
কাজ তাদের
করতে দেখা
যায়নি। স্থানীয়
ধর্ম বা
সংস্কৃতির ব্যাপারে
সংঘাতে তারা
যেত না।
ইউরোপীয়রা
বেশি অনুরক্ত
ছিল শিল্প
ও সংস্কৃতিতে।
ইউরোপীয়রা বেশি
আকৃষ্ট হয়েছিল
চিত্রকলায়। তারা
মোগল চিত্রকলায়
বেশি পরিমাণে
আকৃষ্ট হয়ে
পড়েছিল। স্থানীয়
পটুয়াদের অঙ্কন
পদ্ধতি ও
ছবি দেখে
তারা উৎসাহিত
হয়েছিল। সে
সময় ইউরোপীয়
শিল্পরীতির কিছু
প্রভাব পটুয়াদের
ছবিতেও পড়েছিল।
ব্যবসা-বাণিজ্যের
কাজে বন্দর
এলাকায়, গঞ্জ
প্রভৃতি জায়গায়
দোভাষী দিয়ে
কাজ চালাত
ইউরোপীয় বণিকেরা।
এতগুলো ইউরোপের
দেশ তাদের
কথাবার্তা, চালচলন,
পোশাক প্রভৃতিতেই
একটা পরিবর্তন
লক্ষ করা
গেছে এ
সময়। ইউরোপীয়রা
কখনো চাষের
প্রয়োজনে, কখনো
খাওয়ার প্রয়োজনে,
কখনো ভাষার
প্রয়োজনে নানা
ছাপ রেখে
গেছে। বাংলা
ভাষার শব্দভাণ্ডারের
দিকে তাকালে
তার কিছু
প্রমাণ পাওয়া
যায়। বিদেশী
ভাষা থেকে
আসা ওলন্দাজ
শব্দ ইশকাপন,
হরতন, রুইতন
প্রভৃতি, ফরাসি
শব্দ কার্তুজ,
রেস্তোরাঁ প্রভৃতি,
পর্তুগিজ শব্দ
আতা, আনারস,
আলমারি, পাউরুটি,
পেঁপে, বালতি,
সাবান প্রভৃতিসহ
অজস্র ইংরেজি
শব্দ এসেছে।
এ থেকে
সেই সময়ের
সমাজ জীবন
সম্বন্ধে বোঝা
যায় তারা
ব্যবসা-বাণিজ্য
করে ভোগবিলাসের
মধ্য দিয়ে
কাটানো ছাড়াও
তারা চাষবাস,
খাদ্য, প্রতিদিনকার
জীবনযাত্রায় তাদের
মতো করে
এ দেশের
মানুষকে শেখানোর
চেষ্টা করেছে।
ইউরোপীয়দের ব্যবসাকেন্দ্রিক
জীবনে যা
কিছু তারা
করেছিল তার
বেশির ভাগটা
তাদের স্বার্থের
জন্য, তার
মধ্যে দু-একটা
শিক্ষণীয় কাজ
তারা করেছিল।
আমাদের
গ্রাম-বাংলার
এখানে ওখানে
অনেক ছড়া
লুকিয়ে আছে।
সেই থেকে
রাজার কথা,
সাধারণ মানুষের
কথা, সমাজের
কথা প্রভৃতি
উঠে আসে।
এগুলো থেকে
ইতিহাসের অনেক
কথা জানা
যায়। ইউরোপীয়
সাহেবদের কোথাও
উঠে এসেছে
এমন ছড়ায়।
বাবু
বলেছেন যেতে
পান
সুপারি খেতে।
পানের
ভিতর মৌরি
বাটা
ইস্কাপনের
ছবি আঁটা।
আমার
নাম যদুমণি
যেতে
হবে অনেকখানি।
এ
ছড়ার মধ্য
দিয়ে সাহেব
বাবুদের বৈঠকখানায়
তাসের আসরে
যদুমণিদের মতো
অনেক বাঙালি
মেয়েদের বঞ্চনার
ইতিহাস ফুটে
উঠেছে। সে
সময় ইউরোপীয়
সাহেবদের এ
দেশের মেয়েদের
রক্ষিতা বা
বিবি হিসেবে
রাখার চল
ছিল। এ
কাজটা তারা
সহজ পথে
করতেন না,
ক্ষমতা ও
গায়ের জোরে
গ্রামের মেয়েদের
ধরে নিয়ে
আসত, যদুমণির
পান-সুপারি
খেতে যাওয়ার
মধ্যে এক
করুণ ইতিহাস
লুকিয়ে আছে।
ইউরোপ
থেকে আসা
অনেকেই শান্ত
জীবনযাপন পালন
করেছে এ
সময়। দিনেমার,
ফরাসি ও
ডাচ উপনিবেশগুলোতে
ব্যবসার কারণে
ছল-চাতুরী
ও শ্রমিক
শোষণ থাকলেও
অন্য বদনাম
কম ছিল।
সবদিক থেকে
সবচেয়ে বেশি
বদনামের অধিকারী
ছিল পর্তুগিজ
ও ইংরেজরা।
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য: ইতিহাসের
শিক্ষক
ভ্রামণিক ও লেখক





