প্রাক-পলাশী পর্বে সিরাজউদ্দৌলাই ছিলেন বাংলার ‘শেষ স্বাধীন নবাব’, এ কথা পুরোপুরি যথার্থ নয়। মোগল শাসনে বাংলার কোনো নবাবই রীতিমাফিক স্বাধীন ছিলেন না। দিল্লিতে তাকে রাজস্ব পাঠাতে হতো। ভ্যাট পাঠাতে হতো। তবেই সুবেদারির সনদ পেতেন। অথবা দিল্লিই কাউকে ওই দায়িত্ব দিয়ে সুবেদার করে পাঠাত। যেমন আকবরের আমলে মান সিং, জাহাঙ্গীরের আমলে ইসলাম খান, আওরঙ্গজেবের সময় দীর্ঘকাল শায়েস্তা খান (১৬৬৪-৭৭, ১৬৭৯-৮৮)। সম্রাট শাহজাহানের সময় শাহ সুজা ছিলেন বাংলার শাসনকর্তা। আওরঙ্গজেবের দক্ষ সেনাপতি মীর জুমলা তাকে আরাকানে বিতাড়িত করেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। সুবেদার নিযুক্ত হন মীর জুমলা। তার মৃত্যুর পর শায়েস্তা খান।

বাংলার রাজধানীও বরাবর এক জায়গায় থাকেনি। মান সিং রাজধানী স্থাপন করেন রাজমহলে। পরে ইসলাম খান ১৬১০ সালে তা স্থানান্তর করেন ঢাকায়। নতুন নাম দেন তার জাহাঙ্গীরনগর। শায়েস্তা খানের আমলেও ঢাকাই ছিল রাজধানী। এমনকি ১৭০১ সালে আওরঙ্গজেব যখন হায়দরাবাদ থেকে মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার দেওয়ান করে পাঠান, তখনো ছিল তা-ই। সে সময় বাংলার সুবেদার ছিলেন নবাব আজিম উশ্ শান। তিনি আওরঙ্গজেবের পৌত্র। কিন্তু দেওয়ানি বা রাজস্বসংক্রান্ত বিষয়ে সম্রাটের আস্থা ছিল বেশি মুর্শিদকুলি খানের ওপর। এতে সুবেদার ও দেওয়ানের ভেতর মনোমালিন্য দেখা দেয়। তা পারস্পরিক অবিশ্বাসে রূপ নেয়। তাতে দেওয়ান তার কাজ নির্বিবাদে করতে পারবেন, এ উদ্দেশ্য নিয়ে গোটা দেওয়ানি দপ্তর ১৭০৩ সালে গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চল মুকসুদাবাদে তিনি তুলে নিয়ে যেতে চান। আওরঙ্গজেব তাতে সম্মতি দেন এবং আজিম উশ্ শানকে বিহারের পাটনায় রাজধানী উঠিয়ে নিয়ে যেতে আদেশ পাঠান। সম্রাট তখন দাক্ষিণাত্যে। মুর্শিদকুলি খান নিজে গিয়ে তাকে রাজস্বসংক্রান্ত সব বিষয় বুঝিয়ে বলেন। সম্রাট সন্তুষ্ট হয়ে তাকে একই সঙ্গে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নায়েব-নাজিমের দায়িত্বও অর্পণ করেন। দেওয়ানের কাজ যেমন রাজস্ব বিভাগ চালানো, নাজিমের কাজ তেমনি আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। সুবেদার স্বয়ং নাজিম। দেওয়ানির সঙ্গে নায়েব-নাজিমের পদ পাওয়ায় মুর্শিদকুলি খানের প্রভাব-প্রতিপত্তি আরো বাড়ল। নিজের নাম অনুসারে মুকসুদাবাদের নতুন নাম দিলেন তিনি মুর্শিদাবাদ। তখন থেকে এই নামই চল।

রাজস্ববিশারদ মুর্শিদকুলি খানের মুকসুদাবাদে তার দপ্তর সরিয়ে আনার পেছনে মনে হয় অন্য একটা বৈষয়িক যুক্তিও কাজ করেছিল। গঙ্গার পাড়ে হওয়ায় উত্তর ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের যোগাযোগ তদারক করে সরকারি প্রাপ্য আদায় করা সহজতর ছিল। তাছাড়া ইংরেজ, ফরাসি ও ওলন্দাজ বণিকদের আনাগোনা তখন বেড়ে গিয়েছিল অনেক। সমুদ্রপথে এসে হুগলি হয়ে ভাগীরথী বেয়ে সোজা তারা দেশের ভেতর ঢুকে পড়ে বাণিজ্য করতে শুরু করেছিল। তাদের কাছ থেকে নির্ধারিত মাশুল আদায়ের জন্যও খবরদারি করায় ঢাকার চেয়ে মুকসুদাবাদ বেশি উপযোগী ছিল। এ বিষয়গুলোও বোধহয় আওরঙ্গজেবকে বোঝানোয় কাজে দিয়েছিল। কারণ রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন তখন তার অতি জরুরি। বিষয়টি কেন অত গুরুতর ছিল, তা পরে বোঝার চেষ্টা করছি। পরিণাম অবশ্য তার শুভ হয়নি। তার নিজের জন্যও না।

এদিকে আওরঙ্গজেবের জীবনাবসান ঘটে ১৭০৭-এ। তার পর থেকেই মোগল শাসনে দুর্বলতা প্রকট হয়ে পড়ে। আজিম উশ্ শানের বাবা বাহাদুর শাহ নাম নিয়ে সিংহাসনে বসেন। বেশি দিন রাজত্ব করা তার কপালে ছিল না। তারপর জাহান্দর শাহ হয়ে আজিম উশ্ শানের ছেলে ফারুকশিয়ার দিল্লির বাদশাহ হন। ১৭১৩ সালে তিনি মুর্শিদকুলি খানকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি ও নাজিমি উভয় দায়িত্বই আনুষ্ঠানিকভাবে অর্পণ করেন। তখন থেকেই মুর্শিদকুলি খান জাফর সুবেদার ও নবাব। মোগল সম্রাটের দরবারে আমির-ওমরাহদের সারিতেও তার ঠাঁই। তবে বেশি তাত্পর্যপূর্ণ, রাজস্ব ও সমর ব্যবস্থা, দুটোর কর্তৃত্বই তার একার হাতে আসা। মনসবদারদের নিয়োগ, বদলি, অবস্থান বা প্রত্যাহার, এগুলোর জন্য দিল্লির অনুমোদনের আর প্রয়োজন মনে করে না। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা অনেকটাই দিল্লি থেকে আলগা হয়ে যায়। আলগা হওয়া মানে অবশ্য বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। মোগল বাদশাহর প্রতি আনুগত্য অব্যাহতই থাকে। তা তার পরও মুর্শিদাবাদ যতদিন বাংলার রাজধানী ছিল, ততদিন।

রাজস্ব বাড়ানোতেই মুর্শিদকুলি খানের নজর ছিল বেশি। তখন বাংলা অপেক্ষাকৃত নিরুপদ্রব অঞ্চল। তাই দিল্লিরও তাতে সায় ছিল। এতে মনসবদারদের ঘাঁটির সংখ্যা কমল। তাদের দাপটও গেল কমে। পুষিয়ে নিতে ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতে থাকে কেউ কেউ। ১০০ ঘোড়সওয়ার রেখে এক হাজার ঘোড়সওয়ারের হিসাব দিয়ে টাকা তোলা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আলীবর্দি খানের সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে অপদস্থ হন মীর জাফর। পলাশীর ষড়যন্ত্রের পেছনে একই লোভ ও কাপুরুষতাও ইন্ধন জোগায়। তবে এখানে যা বলার, তা হলো সেনা ছাউনিগুলোর দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠতে শুরু করে। যোগ হতে থাকে চুরি-ছ্যাঁচড়ামি। দায়বদ্ধতার জায়গাটা ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। স্বাদেশিকতার প্রশ্ন অবান্তর। কারণ অধিকাংশ রাজপুরুষই বহিরাগত। ইরান-তুরান-মধ্যপ্রাচ্যের। অনেকে আবার একে অন্যের আত্মীয়। মুর্শিদকুলি খান নিজে ছিলেন ভিনদেশী। জনশ্রুতি, দাক্ষিণাত্যে তার জন্ম। কিন্তু পারস্যে এক ধনাঢ্য পরিবারে প্রতিপালিত। মোগল প্রশাসনে যুক্ত হয়ে ফিরে আসেন দাক্ষিণাত্যেই। আওরঙ্গজেবের সুনজরে পড়ে তারপর তার বাংলায় আসা। একা নয়। পারস্য থেকে তার মতো আসা একদঙ্গল আত্মীয়স্বজন-দলবল নিয়ে। এতে যে নিজেদের ভেতরে তাদের সংহতি বাড়ে, তা কিন্তু নয়। ইতিহাস বলে, ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ ও পারস্পরিক হানাহানিই বরং তুলনায় বেশি। এবং তা গোটা মোগল আমলজুড়েই। এই মুর্শিদাবাদের নবাবিতেও।

তবে রাজস্ব আদায় সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল করায় মুর্শিদকুলি খানের কৃতিত্ব খাটো করে দেখা চলে না। আগে দাক্ষিণাত্যে তার প্রশাসনিক উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় মেলে। তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে আওরঙ্গজেব তাকে বাংলায় দেওয়ান করে পাঠান। রাজস্বের মূল উৎস কৃষি। সেই সঙ্গে বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্যও তখন আগের চেয়ে বেশি সরগরম। বিশেষ করে বিদেশী বণিকদের কেনাবেচা ক্রমবর্ধমান। শুল্ক আদায়ের পন্থা-পদ্ধতি নির্ধারণ ও তাদের প্রয়োগ তাই আলাদা গুরুত্ব পায়। ঝগড়া-ফ্যাসাদ-চক্রান্ত-যুদ্ধ যা ঘটে, তা পরে। রাজস্ব বাড়লেই নবাব খুশি।

এ সূত্রে কৃষি ব্যবস্থায় তিনি কতকগুলো বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। বলেছি, মনসবদারদের অধীনে যে জায়গিরগুলো ছিল, তাদের বেশির ভাগ তিনি তুলে দিলেন। কিছু সরিয়ে দিলেন উড়িষ্যায়। এসব জায়গির চালানোর খরচ সরাসরি রাজকোষ থেকে দিতে হতো। অথবা জায়গিরের জমিজমা থেকে মনসবদাররা তা উশুল করে নিত। জায়গিরের সংখ্যা কমে যাওয়ায় নবাবের রাজস্ব ব্যয়ও কমে গেল। আবার ওইসব জমি মুক্ত হওয়ায় তাদের নতুন করে বন্দোবস্ত দিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ল। তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল ভূমি রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনায়। বিশাল বিশাল খণ্ডে বড় বড় জমিদারি গড়ে উঠল। এমন জমিদারি আকবরের আমলে টোডরমলের নকশাতেও ছিল। কোনো উৎপাত না ঘটলে সাধারণত তা বংশানুক্রমিকই থাকত। মুর্শিদকুলি খান তাদের আয়তন অনেক গুণ বাড়িয়ে দিলেন এবং সেপাই-সান্ত্রী দিয়ে সরকারি ব্যয়ে তদারকিও প্রায় তুলে নিলেন। ওই দায় গিয়ে পড়ল বেশির ভাগ জমিদারের ওপর। তাদের নায়েব-গোমস্তা, পাইক-পেয়াদাদের দাপট বাড়ল। জমিদাররা আপন আপন এলাকায় কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে নবাবের প্রাপ্য অংশ তার কোষাগারে জমা দিতেন। এতে কোনো গাফিলতি না হলে অথবা কোনো উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে না পড়লে নিজ নিজ জমিদারিতে তারাই এক রকম প্রভু। তাদের করিত্কর্মা দেওয়ান বা নায়েবরা কখনো কখনো রাজকোষে খাজনা দিতে প্রবঞ্চনার আশ্রয় নিয়ে জমিদারির কিছু কিছু ভাগ নিজেদের নামে করে নিত। তা নইলে বড় বড় জমিদার রাজা-মহারাজার সম্মানই পেত। আগেও যে বড় বড় ভূস্বামী ছিল না, তা নয়। আকবরের আমলে বারোভূইঞার কাহিনী তো আমাদের জানা। তবে মুর্শিদকুলি খান ব্যবস্থাটাকে এমন এক নিয়মের মধ্যে নিয়ে এলেন, যাতে নবাবের প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রেখেও ক্ষমতার বহির্বৃত্তে তাদের প্রভাব অনেক বেড়ে গেল। এমনকি ভেতর বৃত্তেও ঢুকে পড়ে কেউ কেউ। এটা সম্ভব হয় বিশেষ করে মনসবদার-জায়গিরদারদের স্থানচ্যুতির ও তুলনায় অবান্তর হয়ে পড়ার ফলে। শতাব্দী শেষে ১৭৯৩তে লর্ড কর্নওয়ালিস যে জমিদারদের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করেন, তার বীজ কিন্তু পোঁতা হয় এই মুর্শিদকুলি খানের আমলে। অবশ্য তার অন্য মাত্রাও ছিল। রণজিৎ গুহ তার আলোচনা করেছেন।

ক্ষমতাবলয়ে জমিদাররা দৃশ্যমান হলেও নবাব যে তাদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, এমন ধারণা ঠিক নয়। তার লক্ষ্য ছিল রাজস্ব আয় বাড়ানো ও ব্যয় কমানো। দুদিক থেকেই জমিদারদের মাঝখানে রাখা তুলনায় লাভজনক। যেসব জমিদার সময়মতো খাজনা শোধ করতে ব্যর্থ হতো, তাদের প্রতি তিনি সদয় ছিলেন না। অতি নিষ্ঠুর আচরণ তাদের সঙ্গে করা হতো। নবাবের নিকটাত্মীয় সৈয়দ রেজা খানের ওপর ভার ছিল ওইসব জমিদারকে ধরে এনে তাদের ওপর নির্যাতন করার। সবচেয়ে গা শিউরে ওঠা ব্যাপার ছিল ‘বৈকুণ্ঠ’ বাস। অকল্পনীয় নোংরা খুপরি বানিয়ে তার নাম দেয়া হয়েছিল ‘বৈকুণ্ঠ’। খাতক জমিদারদের সেখানে দায় খালাস না হওয়া পর্যন্ত পুরে রাখা হতো। অথবা তাদের জমিদারি কেড়ে নিয়ে তাদের ন্যূনতম খোরপোশের ব্যবস্থা করে দেয়া হতো। ব্যাপারটা কিন্তু বাস্তবে এখানেই থেমে থাকেনি। ঊর্ধ্বতন জমিদাররাও অধস্তন খাতকদের ওপর কেউ কেউ এ আচরণের অনুকরণ করতে শুরু করেন। গোটা দেশেই এর প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা একটা দাঁড়িয়ে যায়। এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও আগে থেকে আরো বলে রাখি, ১৭৬৫তে বাদশাহ শাহ আলমের কাছ থেকে রবার্ট ক্লাইভ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি হস্তগত করেন। তিনি আরেক মোহাম্মদ রেজা খানকে তার সহকারী বানান। জমিদারদের নির্যাতন নতুন নয়, ইংরেজ প্রভুদের খাঁই মেটাতে সাধারণ প্রজাদের উত্পীড়নেও তিনি কম যান না। মুর্শিদকুলি খানের পর নবাব সুজাউদ্দিন (১৭২৫-৪০) জমিদারদের গাফিলতির ব্যাপারে অনেকখানি নমনীয় হন। ধরে এনে জন্তু-জানোয়ারের মতো তাদের বেঁধে রাখায় তিনি খুব উৎসাহী ছিলেন না। দিল্লি থেকে মোগল শাসনের কড়াকড়ি শিথিল হয়ে পড়ায় জমিদারদের ওপর নির্ভরতাও বাড়ে। বিশেষ করে মুর্শিদকুলি খানের ভূমি ব্যবস্থা চালু করার পর যারা বড় জমিদার, যেমন—নাটোর, বর্ধমান, ঢাকা, বীরভূম, নদীয়া, বিষ্ণুপুর, কলকাতা ইত্যাদির আওতায় বড় বড় এলাকাজুড়ে যাদের কর্তৃত্ব, তাদের উপেক্ষা করা চলে না। নবাব দরবারেও আসন পাতেন কেউ কেউ। বেশির ভাগই এই ভূখণ্ডের। পাঠান-মোগলও যে কেউ ছিল না তা নয়। পরে পলাশীকাণ্ডে এদের কারো কারো ভূমিকা যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। কলকাতার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তো নিজেই সরাসরি প্রতিপক্ষ। এতে আরো বোঝা যায়, বিদেশী বণিক শক্তি তখন সাবালক হয়েছে। দেশের ভেতরে ডালপালা ছড়িয়েছে।

এখন আওরঙ্গজেব কেন মুর্শিদকুলি খানের ওপর আস্থা রেখে তাকে বাংলায় রাজস্ব বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়ার চেষ্টা করি। আগেই বলেছি, মুর্শিদকুলি খানের কর্মপ্রতিভার পরিচয় মেলে প্রথমে দাক্ষিণাত্যে। সম্রাট নিজেও তখন ওইখানে। আসলে তার জীবনের শেষ ২০ বছর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত তাকে যুদ্ধবিগ্রহ ও বিদ্রোহ সামলানোয় ব্যতিব্যস্ত রাখে। শুরুও তার ওইখানে। শাহজাহান তখন বেঁচে। তিনি কাছে থেকে মুর্শিদকুলি খানের রাজস্ব বাড়ানোর নতুন নতুন কৌশল লক্ষ করেছিলেন। এদিকে দাক্ষিণাত্যে গোলমাল লেগেই আছে। সেখানে সুফল অনিশ্চিত। বিপরীতে বাংলা স্থিতিশীল। আগেই তার আমলের গোড়ার দিকে মীর জুমলা আসাম ও কোচবিহার কবজা করে মোগল সাম্রাজ্যে নিয়ে এসেছেন। শায়েস্তা খান আরাকান রাজকে পরাস্ত করে চট্টগ্রাম দখল করেছেন ১৬৬৬ সালে। তার পর থেকে এ অঞ্চল শান্ত এবং বাংলার মাটি অনেক বেশি উর্বরা। বিশ্বস্ত মুর্শিদকুলি খানের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় এখান থেকে বাদশাহর রাজকোষ ভরবে অনেক বেশি। তার প্রয়োজনও বেড়ে গেছে অনেক গুণ। পেছনে কাজ করেছে সম্রাটের দূরাকাঙ্ক্ষা।

দাক্ষিণাত্যে বিজাপুর ও গোলকোণ্ডায় ছিল শিয়া শাসন। তাদের বিধ্বস্ত করে আওরঙ্গজেব ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তার সম্পূর্ণ করেন। উত্তর-দক্ষিণে প্রায় গোটা উপমহাদেশেই তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। উত্তরে ভারতবর্ষের সীমানাও তা ছাড়িয়ে যায়। এদিকে শিয়া-সুন্নি বিভেদ মুসলিম জগেক বিভক্ত করে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। ইরানে, ইরাকে ও তুরস্কের কিছু অংশে শিয়া প্রাধান্য; অন্যদিকে তুরস্ককেন্দ্রিক অটোমান সাম্রাজ্য (১২৮৪-১৯২১) দীর্ঘদিন ধরে সুন্নি মতাদর্শের নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। ইসলামে সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় পীঠস্থান মক্কা-মদিনাও হয় সরাসরি তার আওতায় থেকেছে, নয়তো তাদের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে তার একাত্মতা অব্যাহত রয়ে গেছে। আওরঙ্গজেব তার শুদ্ধতার প্রতিনিধি হয়ে উঠতে চান। শুধুই ধর্মপরায়ণতা বোধহয় এর কারণ নয়। তখন অটোমান সাম্রাজ্যের গৌরবদীপ্তি আগের চেয়ে ম্লান। মোগল সম্রাটের চোখ পড়ে গোটা সুন্নি মুসলিম জগতের নেতৃত্বের ওপর। ভারতবর্ষ, আরাকান, আফগানিস্তান হয়ে তার সাম্রাজ্য যদি মধ্য এশিয়াতেও প্রসারিত করা যায়, তবে তার তুল্য ক্ষমতাবান সুন্নি জগতে আর কেউ তখন থাকেন না। এ কারণে দাক্ষিণাত্যে শিয়া সুলতানদের পরাস্ত করে তাদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা। শাসিত ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা। একমাত্র কারণ নাও হতে পারে। অন্য বিবেচনাও থাকা সম্ভব। তবে মোগল সম্রাটের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও গৌরব সুন্নি মুসলিম জাহানে অদ্বিতীয় করে তোলার এ তাগিদকে খাটো করে দেখা যায় না।

কিন্তু কোনো কিছুই বিনামূল্যে মেলে না। কাউকে না কাউকে কিছু না কিছু দাম দিতেই হয়। সঙ্গে সঙ্গে না হলেও একসময় না একসময় তা চুকিয়ে নেয়। এখানে দামটা সবচেয়ে বেশি দেয় মোগল সাম্রাজ্যই। যদিও আপাতদৃষ্টে আওরঙ্গজেবই ছিলেন ভৌগোলিক বিস্তারে সবচেয়ে বড় মোগল সম্রাট। তবে তিনিও তাত্ক্ষণিকভাবে হিসাব-নিকাশের ছক কিছু বদলাতে বাধ্য হয়েছিলেন। মুর্শিদকুলি খানকে দেওয়ান করে বাংলায় পাঠানোর পেছনে এ অনিবার্যতা কাজ করেছে বলে মনে হয়। যুদ্ধবাজ হওয়া মানে সৈন্যসামন্ত বাড়ানো। তাদের নিয়মিত বেতন দেয়া, খুশি রাখা। দক্ষ সেনানায়কদের পদোন্নতি ঘটানো। তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা। তখনকার দিনের অস্ত্রশস্ত্র, সাজসরঞ্জাম, হাতি-ঘোড়া ইত্যাদির পেছনে বিপুল থেকে বিপুলতর খরচ অব্যাহত রাখা। জয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছাড়া যৌক্তিক প্রত্যাশা একটাই—বিজিত অঞ্চল থেকে ধনদৌলত, ক্ষতিপূরণ, নজরানা, খাজনা ইত্যাদি ইচ্ছামতো তুলে আনা। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি উশুল করা। হেরে গেলে কিছু করার নেই। রাজা স্বয়ং বিধ্বস্ত হয়ে নিজের দায় চোকান। কিন্তু খরচের বোঝা দুদিক থেকেই ঘাড়ে চাপে। হারলে তো বটেই। জিতলেও।

এ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মুর্শিদকুলি খানকে অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ায় বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ান করে পাঠানোর বিষয়টি আমরা ভেবে দেখি। যুদ্ধবিগ্রহ সম্রাটের কোষাগার খালি করে দেয়। বিভিন্ন জায়গায় ভূস্বামীদের নেতৃত্বে কৃষিজীবীদের বিদ্রোহ অবস্থা আরো জটিল করে তোলে। অথচ রাজস্বের প্রয়োজন ক্রমবর্ধমান। বাংলা অঞ্চল তুলনায় দীর্ঘদিন ধরে শান্ত। দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি জমিতে উৎপাদন কম। ব্যবসা-বাণিজ্যেও বাংলায় নতুন নতুন সম্ভাবনা বেশি বেশি শুল্ক আদায়ের আশা জাগায়। কাজেই সম্রাটের কোষাগার ভরতে উদ্বৃত্ত আদায়ে বাড়তি নজর পড়ে এদিকেই। এবং সততা ও দক্ষতার সঙ্গে সেই কাজ সামাল দিতে মুর্শিদকুলি খানকেই মনে হয় যোগ্যতম ব্যক্তি। দেওয়ান হয়ে সম্রাটের এ আস্থার যোগ্য বলে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। পরে নিজেই যখন মুর্শিদাবাদে তিনি নবাব হয়ে বসেন, তখনো তার কর্মদক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা একই রকম থেকেছে। তবে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি পালটে যায় অনেকখানি। দিল্লির রাশ আলগা হয়ে পড়ে। নবাব নিজের বুদ্ধিতে বেশি চলেন।

এদিকে বাংলায় মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যুর (১৭২৫) পরই পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠতে শুরু করে। জনজীবনে শান্তি ও সুস্থিতির বাতাবরণ যে একটা ছিল, তা দ্রুত মিলিয়ে যেতে থাকে। ভূস্বামীরা খাজনা আদায়ে বেশি তত্পর হয়। কারণ নবাবের দরবারে তা সময়মতো পৌঁছানো চাই। তা নইলে লাঞ্ছনার একশেষ। কোথাও কোথাও এরই অজুহাতে প্রজা পীড়ন মাত্রা ছাড়ায়। জমিদারদের ভেতরে স্তরবিন্যাস বাড়ে। কারণ বড় বড় ভূস্বামীর বিশাল এলাকায় একার পক্ষে খাজনা আদায় করার মতো উপযুক্ত বিধি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যান চলাচলও সব জায়গায় সুগম ও নিরাপদ ছিল না। এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় অভাবের তাড়নায় চুরি-ডাকাতি বেশি বেশি হতে থাকে। পথেঘাটেও। আর নবাবের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরেও সুযোগমতো যে যেমন পারে বাড়তি ফায়দা লোটার দিকে ঝোঁকে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে তো আরো বেশি। আজ যে আমরা ঘুষ আর দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক বেড়াজালে আটকা পড়ে হাবুডুবু খাই, কার্যকরভাবে তার শুরু কিন্তু ওই সময়েই। উনিশ শতকে এসে কাজকর্মের সংকীর্ণ পরিসরেও বাঙালি বাবুদের ‘উপরি খাওয়া’ এক সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়ে যায়। তাতে বাহাদুরির গৌরবই ফুটে ওঠে।

 

সনত্কুমার সাহা: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক