রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শৈশবে কান্নার
জোরে ওরিয়েন্টাল
সেমিনারিতে ভর্তি
হয়েছিলেন, তখনই
শুভানুধ্যায়ী একজন
তাকে বলেছিলেন
এখন স্কুলে
যাওয়ার জন্য
তিনি যত
কাঁদছেন, একসময়
না যাওয়ার
জন্য এর
বেশি কাঁদতে
হবে।
মিথ্যে হয়নি
ভবিষ্যদ্বাণী। যত
বড় রবি
ঠাকুরই হন
না কেন,
ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট
তার ভাগ্যে
জোটেনি। অবশ্য
পরবর্তীকালে তিনি
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধীনে অনুষ্ঠিত
ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার
বাংলার প্রশ্নপত্র
তৈরি করেও
কিছু খ্যাতি
অর্জন করেছেন।
হার্ভার্ড থেকে
বড় ডিগ্রি
নিয়ে যারা
বেরিয়েছেন, তাদের
নিয়ে সপ্তকাণ্ড
হার্ভার্ডনামা রচিত
হতেই পারে,
কিন্তু বিভিন্ন
কারণে যাদের
ডিগ্রি নেয়া
হয়নি, ড্রপড
আউট হয়েছেন,
এক্সপেল্ড হয়েছেন,
ফেল করেছেন
তাদের নিয়ে
অন্তত এককাণ্ড
হার্ভার্ডনামা তো
রচিত হতেই
পারে।
দ্বিতীয় জন অ্যাডামস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন কুইন্সি অ্যাডামসের পুত্র, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছিলেন, কিন্তু বিদ্রোহী হওয়ার অভিযোগে ১৮২৩ সালে তাকে এক্সপেল্ড করা হয়। তার বাবা সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট, দেড় বছরের মধ্যে তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তার পুত্রকে বাঁচাতে তিনি শিক্ষাঙ্গনের শৃঙ্খলাতে হস্তক্ষেপ করেননি। জন বাবার অধীনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৮২৫ থেকে ১৮২৯ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয় জন
অ্যাডামসসহ আরো
কয়েকজনকে বিদ্রোহী
এবং অছাত্রসুলভ
আচরণের কারণে
বহিষ্কার করার
পেছনে কারণটি
ছির তারা
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাস ডরমিটরির
নিম্নমানের লিভিং
স্ট্যান্ডার্ড এবং
শিক্ষা কারিকুলামের
বিরুদ্ধে কয়েক
দিন লাগাতার
আন্দোলন করেন
এবং অন্যান্য
সাধারণ ছাত্রদেরও
আন্দোলনে উসকানি
দেন।
অনেক বছর
পর হার্ভার্ড
এ বহিষ্কৃত
ছাত্রদের প্রতি
সদয় হয়
এবং সবার
নাম বিনা
পরীক্ষার গ্র্যাজুয়েট
তালিকায় অন্তর্ভুক্ত
করে। অনেকটা
অনারারি ডিগ্রি
দেয়ার মতো
ব্যাপার। এ
বহিষ্কৃত ছাত্রটি
যদি দ্বিতীয়
জন অ্যাডামস
হন তা
হলে প্রথম
জন অ্যাডামস
কে—এই
প্রশ্ন হতেই
পারে? প্রথম
জন অ্যাডামস
আমেরিকার দ্বিতীয়
প্রেসিডেন্ট, ষষ্ঠ
প্রেসিডেন্ট জন
কুইন্সি অ্যাডামসের
বাবা। প্রেসিডেন্টের
নাতি ও
প্রেসিডেন্টের পুত্র
হলেও শৃঙ্খলা
ভঙ্গের অপরাধে
ক্ষমা পাবেন
না সভ্য
দেশে এটাই
হওয়ার কথা।
হ্যামিলটন কুলিজ
১৯১৬ সালে
হার্ভার্ডে ভর্তি
হন, কিন্তু
প্রথম মহাযুদ্ধে
অংশগ্রহণ করার
জন্য দ্বিতীয়
বর্ষেই হার্ভার্ড
ছেড়ে আসেন।
যুক্তরাষ্ট্র আর্মি
এয়ার সার্ভিসের
প্রথম দলের
হয়ে ফার্স্ট
লেফটেন্যান্ট হিসেবে
কমিশন লাভ
করেন এবং
ফ্রান্সে অ্যারো
স্কোয়াডে যোগদান
করেন। ৩
অক্টোবর ১৯১৮
ক্যাপ্টেন পদে
পদোন্নতি লাভ
করেন। ঠিক
২৪ দিন
পর আটটি
টার্গেটে বোমাবর্ষণ
করার পর
জার্মান অ্যান্টি
এয়ারক্রাফট গানের
গোলা সরাসরি
তার যুদ্ধবিমানকে
আঘাত করে
এবং তিনি
নিহত হন।
কুলিজ বীর
যোদ্ধার খেতাব
পান, হার্ভার্ডও
তাকে সম্মানজনক
ডিগ্রি প্রদান
করে। হ্যামিলটন
কুলিজ সরাসরি
প্রেসিডেন্ট থমাস
জেফারসনের বংশধর
ছিলেন। আলবার্ট
পাইক (১৮০৯-৯১)
ছিলেন লেখক,
কবি, বক্তা,
উকিল, বিচারপতি,
জ্যেষ্ঠ সেনা
কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্রের
কনফেডারেট আর্মির
একজন ঊর্ধ্বতন
কমান্ডার ছিলেন।
তার জন্ম
বোস্টনে। নিউব্যারি
পোর্ট স্কুল
থেকে পাস
করার পর
হার্ভার্ডের ভর্তির
জন্য পরীক্ষায়
বসলেন এবং
ভালোভাবেই উতরে
গেলেন। হার্ভার্ড
কলেজ তাকে
দুই বছরের
টিউশন ফি
জমা দিতে
বলল। কিন্তু
তিনি স্বশিক্ষিত
হওয়ার সিদ্ধান্ত
নেন। তিনি
তাতেই সফল
হন। তিনি
শিক্ষকতা দিয়ে
কর্মজীবন শুরু
করেন। আইন
নিয়ে পড়াশোনা
করে ১৮৩৭
সালে বারে
যোগ দেন,
সুপ্রিম কোর্টের
প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীও
হন। একাধিক
কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ
করেন। মেক্সিকান
আমেরিকান যুদ্ধের
সময় অশ্বারোহী
বাহিনীতে যোগদান
করেন। ওয়াশিংটন
ডিসিতে তার
ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠিত
আছে।
লরেন্স রকফেলার
(১৯১০-২০০৪)
বিখ্যাত রকফেলার
পরিবারের সন্তান,
ব্যবসায়ী, বক্তা
ও দাতা।
তিনি হার্ভার্ডের
স্কুলে নিজ
গুণে ভর্তি
হন। দুই
বছর ক্লাস
করেন এবং
এক পর্যায়ে
সিদ্ধান্ত নেন
তিনি আইনজীবী
হবেন না।
তাহলে আর
সময়ক্ষেপণ কেন
করছেন। তার
আগে তিনি
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি
থেকে স্নাতক
হন। তিনি
ইস্টার্ন এয়ারলাইনস
প্রতিষ্ঠা করেন
এবং দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধোত্তর সামরিক
উড়োজাহাজ নির্মাণের
প্রতিষ্ঠান ম্যাকডোনেল
এয়ারক্রাফট করপোরেশনের
বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার
হন। তিনি
রিডার্স ডাইজেস্ট
পত্রিকারও অন্যতম
প্রতিষ্ঠাতা।
রবার্ট গুল্ড
শ দাস
প্রথা বিলোপের
অন্যতম নেতা
এবং আমেরিকান
সিভিল ওয়ারের
খ্যাতিমান কমান্ডার।
১৮৩৭ সালে
বস্টনের দাসত্ব
বিলোপে সক্রিয়
একটি শ্বেতাঙ্গ
পরিবারে তার
জন্ম। স্কুলে
বেশ কয়েকটি
ভাষা শিখে
১৮৫৬ সালে
হার্ভার্ডে ভর্তি
হলেন। কিন্তু
তার বিপ্লবী
সত্তার সঙ্গে
হার্ভার্ডের পরিবেশ
সংগতিপূর্ণ ছিল
না, তবু
তিনি তিন
বছর হার্ভার্ডের
সঙ্গে যুক্ত
থেকে কোনো
ডিগ্রি না
নিয়ে ফিরে
আসেন এবং
আমেরিকার অন্যতম
‘সব
সৈনিক কৃষ্ণাঙ্গ’
এমন একটি
রেজিমেন্ট—চুয়ান্নতম
ম্যাসাচুসেটস রেজিমেন্টের
দায়িত্ব নেন
এবং তিনি
নিজেই তার
কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের
বুঝিয়ে দেন
যে তারা
শ্বেতাঙ্গ সৈনিকদের
চেয়ে কম
দেশপ্রেমিক নয়।
সুতরাং সাদাদের
চেয়ে কম
বেতন তারা
পেতে পারে
না। রবার্ট
গুল্ড শ
নিজে লড়াই
করে তাদের
বেতন সাদাদের
সমান ১৩
ডলার নিশ্চিত
করেন। সে
সময় সাদা
ও কালোর
এ সমতা
সৃষ্টি ছিল
অকল্পনীয় ব্যাপার।
তাকে তার
জীবনের লক্ষ্য
ঠিক করে
দিয়েছিল আঙ্কল
টমস কেবিন
নামের উপন্যাস।
গণযুদ্ধের সময়
তিনি নিহত
হন এবং
তার ইচ্ছেতেই
তার রেজিমেন্টের
নিহত সাধারণ
সৈনিকদের সঙ্গে
সমাহিত করা
হয়। মাত্র
২৬ বছর
বয়সে মানবদরদি,
সমতাবাদী কর্নেল
রবার্ট গুল্ডের
জীবনাবসন ঘটে।
১৯৩৬ সালের
নোবেল সাহিত্য
পুরস্কার বিজয়ী
নাট্যকার ইউজিন
ও’নিল
(১৮৮৮-১৯৫৩)
একটি হার্ভার্ড
কোর্সে যোগ
দিয়েছিলেন। তিনি
মূলত প্রিন্সটন
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র
ছিলেন। এক
বছরের মাথায়
প্রিন্সটন কর্তৃপক্ষ
তাকে বিদায়
করে দেয়,
এর কয়েকটি
সম্ভাব্য কারণ
গবেষকরা উল্লেখ
করেছেন—
ক. তিনি
খুব কমসংখ্যক
ক্লাসে হাজিরা
দিয়েছেন, ফলে
নন কলেজিয়েট
হয়ে বাদ
পড়ে যান।
খ. অসদাচরণ
করেন।
গ. অধ্যাপক
উড্র উইলসনের
জানালা দিয়ে
বিয়ারের বোতল
নিক্ষেপ করেন।
উইলসন পরে
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট
নির্বাচিত হন।
ও’নিলের
বাবা নাটকের
দল দিয়ে
বিভিন্ন স্থানে
ঘুরেছেন, সঙ্গে
থাকতেন তার
মা ইউজিন।
এমনি এক
নাট্যসফরের সময়
হোটেল কক্ষে
তার জন্ম।
ও’নিল
নাটক লিখতে
শুরু করেন।
নাটকের ওপর
একটি কোর্স
করতে হার্ভার্ডে
এসেছিলেন। তাকেও
হার্ভার্ড ড্রপড
আউটের দলে
ফেলা হয়।
তিনি চারবার
পুলিত্জার পুরস্কার
পেয়েছেন।
দ্য পোর্ট্রেট অব আ
লেডি
এবং দ্য অ্যাম্বাসেডর খ্যাত
ঔপন্যাসিক হেনরি
জেমসের (১৮৪৩-১৯১৬)
বাবা দার্শনিক
হেনরি জেমস
সিনিয়র ছেলেকে
বিজ্ঞান ও
দর্শনের প্রতি
অগ্রণী করে
তুলতে ইউরোপ,
আমেরিকায় ঘুরে
বেড়িয়েছেন। হেনরি
এমনকি বাবার
মতো গ্রিক
ও লাতিন
সাহিত্যও পছন্দ
করেননি। তবে
তিনি ইউরোপীয়
ভাষা শিখেছেন
এবং ফরাসিতে
বালজাকের লেখা
পড়ে মন্তব্য
করেছেন ‘গ্রেটেস্ট
মাস্টার’।
১৮৬২ সালে
তিনি হার্ভার্ড
ল স্কুলে
ভর্তি হন,
কিন্তু অল্প
দিনেই বুঝতে
পারেন এ
বিষয় তাকে
টানছে না।
তবে হার্ভার্ড
তাকে উইলিয়াম
ডিন হাওয়েলস,
চার্লস এলিয়ট
নর্টন, অভিভার
ওয়েল্ডেল হোমস
প্রমুখের সঙ্গে
বন্ধুত্বের সুযোগ
এনে দেয়।
তিনি হার্ভার্ড
ছেড়ে দেন।
তার কাছে
অনেক বেশি
গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপ
ঘুরে বেড়ানো—তিনি
চার্লস ডিকেন্স,
জন রাস্কিন,
ম্যাথু আর্নল্ড,
উইলিয়াম মরিস
ও জর্জ
এলিয়টের সঙ্গে
সাক্ষাৎ করেন।
১৯১১, ১৯১২
ও ১৯১৬
সালে নোবেল
পুরস্কার দৌড়ে
তার নাম
ছিল। ১৯৫২
ও ১৯৫৬
সালের মার্কিন
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে
ডেমোক্র্যাট প্রার্থী
অ্যাভালি স্টিভেনসন
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যলয়
থেকে সাহিত্যে
ও ইতিহাসে
ডিগ্রি নেয়ার
পর বাবার
আগ্রহে হার্ভার্ড
স্কুলে ভর্তি
হলেন। সেখানে
তার মোটেও
ভালো লাগেনি।
যদিও পরবর্তী
সময়ে তিনি
আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ
আইনপ্রণেতাদের একজন
হয়ে ওঠেন।
তিনি পর
পর তিনবার
ফেল করার
পর হার্ভার্ড
ল স্কুল
থেকে নিজেকে
প্রত্যাহার করে
নেন।
নেপালের রাজ
বীরেন্দ্র লন্ডনের
ইটন কলেজ,
জাপানের টোকিও
ইউনিভার্সিটির, যুক্তরাষ্ট্রে
হার্ভার্ডে ভর্তি
হন—তার
কোর্স অসমাপ্তই
রয়ে যায়।
মিডিয়া টাউকুন
পিটার হার্স্ট
(১৮৬৩-১৯৫১)
হার্ভার্ডের অন্যতম
প্রধান দুর্বিনীত
ছাত্র হিসেবে
বহিষ্কৃত হন।
তিনি গাধার
পিঠে প্রফেসরের
নাম লিখে
ছেড়ে দিয়েছেন।
চেম্বার পটে
(সে আমলের
কমোড) অধ্যাপকদের
ছবি এঁকে
তাদের রুমে
ঢুকিয়ে দিয়েছেন,
মদের পার্টি
দিয়েছেন।
একালের সেরা
দুজন ডিগ্রিহারা
কিংবা হার্ভার্ডের
ডিগ্রিকে পাত্তা
না দেয়া
বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব
হচ্ছেন মার্ক
জাকারবার্গ ও
বিল গেটস।
হার্ভার্ডের ডিগ্রি
নিয়ে প্রতিষ্ঠিত
হওয়ার চেয়ে
বরং ডিগ্রি
প্রত্যাখ্যান করে
বিশ্বখ্যাত হওয়াটা
হয়তো অধিকতর
মর্যাদার ও
কৌতূহলের।
ইবনে মোতালিব: লেখক





