বেনয়ামিন মোজার। অনুবাদ: এস হোসেন
অধিকাংশ দেশেরই তার মতো একজন লেখক আছেন: শ্মশ্রুমণ্ডিত যে বিখ্যাত মানুষটির চেহারা ডাকটিকিট অলঙ্কৃত করে, যার নাম বিভিন্ন পথঘাটের মর্যাদা বাড়ায় এবং যার রচনাবলি অপঠিত অবস্থায় পৌত্র-প্রপৌত্রদের বইয়ের তাকে পড়ে থাকে। তার রচনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকার ভান না করে কারো পক্ষে হাইস্কুলের গণ্ডি পেরোনো সম্ভব নয় বলে অনেকেই বেশ অল্প বয়সেই তার রচনা পড়ে। শিশু যেভাবে পুষ্টিকর শাকসবজি দেখে, অনেকটা সেভাবেই তার সম্পর্কে ভাবে।
নাইট অব দি ইম্পেরিয়াল অর্ডার অব দ্য রোজ, ব্রাজিলিয়ান একাডেমি অব লেটার্সের প্রতিষ্ঠাতা জোয়াকিম মারিয়া মাচাদো দে আসিস দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পর্যায়ের লেখকদের আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীতে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
কৃষি, বাণিজ্য ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক অসাধারণ কর্মী মাচাদো কাফকা (ওয়ার্কার্স অ্যাকসিডেন্ট ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউট) ও কাবাফির (থার্ড সার্কল অব ইরিগেশন) মতোই ছিমছাম জামাকাপড় পরতেন, সাদামাটা পাড়ায় থেকেছেন, আমলাতান্ত্রিক কাজকর্ম করেছেন এবং বিরল ক্ষেত্রে জন্মশহরের বাইরে পা ফেলেছেন।
মাচাদোর ‘আধা ডজনের মতো ভঙ্গি, স্বভাব আর নিজস্ব বুলি ছিল’ লিখেছেন ১৯৩৬ সালে তার প্রথম দিকের একজন জীবনীকার লুসিয়া মিগেল পেরেইরা। রাজনীতি এড়িয়ে গেছেন তিনি। আদর্শ স্বামী ছিলেন। অবসর সময় বইয়ের দোকানে কাটাতেন এবং একাডেমি অব লেটার্স প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সাহিত্যে প্রশাসনিক কাঠামো যোগ করেছিলেন।
৪০ বছর বয়সের সময় এক সাংবাদিক তার জীবনী রচনা অসম্ভব ঘোষণা করেন: ‘তার মতো এমন গম্ভীর আর কেউ নেই।’ পর্যবেক্ষকরা তাদের পক্ষে যৎসামান্য যতদূর সম্ভব সংগ্রহ করেছেন। খর্বাকৃতি ছিলেন তিনি, মৃগী রোগগ্রস্ত ও তোতলা এবং তাকে মুলাটো, অর্থাৎ তিনি আংশিক আফ্রিকান বংশোদ্ভূত বলেও জানতে পারেন তারা।
এ বংশপরিচয় প্রায়ই তার জীবনের প্রথম উল্লেখিত ঘটনা হয়ে থাকে। বেশির ভাগ আফ্রিকানের তার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথম স্থান মাইলফলক গ্রন্থ দ্য কালেক্টেড স্টোরিজ অব মাচাদো দে আসিসে (লিভারাইট) তাকে ‘সাবেক দাসের পৌত্র’ হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। নিজে হয়তো এ তকমা বেছে নিতেন না। তাঁর মা শ্বেতাঙ্গ ছিলেন, অভিবাসী অ্যাজোরীয় ধোপানি, মাচাদোর নয় বছর বয়সে মারা যান তিনি; বাবা দোআঁশলা বাড়ি রঙকারী হলেও তার বাবা-মা আদতেই দাসত্বের অধীন ছিলেন।
ব্রাজিলীয় সমাজের বিস্তৃত দৃশ্যপটে এটা বিরল নয় (বেশির ভাগ ব্রাজিলীয়ই দোআঁশলা)। তার সামাজিক পটভূমি ছিল এমনই। বাবা-মা শিক্ষিত ছিলেন। অস্পৃশ্য নয়, বরং শ্রমিকশ্রেণীর অংশ ছিলেন।
কিন্তু অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সে মাচাদো যে উঁচুতলার সমাজে পা রেখেছিলেন, সেখানে দৃশ্যত দোআঁশলা লোকের সংখ্যা বিরল ছিল। অল্প বয়সে সহায়ক লোকজনের সঙ্গে খাতির জমানোর ঝোঁক ছিল তার: জনৈক যাজক তাকে লাতিন শিখিয়েছিলেন বলে কথিত আছে; এক অভিবাসী রুটি তৈরিকারী শিখিয়েছেন ফরাসি। ১৭ বছর বয়সে এক রঙমিস্ত্রির দোকানে কাজ করার সময় বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে এবং অচিরেই কবিতা প্রকাশ শুরু করেন তিনি।
কর্মী হিসেবে উদাসীন ছিলেন। সারাক্ষণ পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকতেন এবং দিনে এক বেলার বেশি খাওয়ার মতো আয় করতে পারতেন না। তবু তার প্রথম দিকে প্রকাশিত নাটক ও কবিতা একটি ক্ষুদ্র বুদ্ধিজীবী মহলের প্রশংসা লাভ করে এবং ১৮৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘রিসারেকশন’ ৬৩ বছর পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টিকে থাকা এক জটিল সাফল্যের সূচনা ঘটিয়েছিল।
মাচাদোর ব্যতিক্রমী সামাজিক উত্থান নানা মন্তব্যের জন্ম দিয়েছে। যারা তাকে অপছন্দ করতেন, তারা বংশপরিচয়কেই তার বিরুদ্ধে খাড়া করেছেন: ১৮৯৭ সালে জনৈক সমালোচক তাকে ‘সঙ্কর ব্রাজিলীয় উপজাতির প্রকৃত প্রতিভূ’ বলে উল্লেখ করেন। মিগেল পেরেইরা ৩০০ পৃষ্ঠার জীবনীতে ৪০ বার—বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খামোকা—তার জাতিগত পটভূমির কথা উল্লেখ করেছেন।
উৎসসংক্রান্ত এ বাস্তবতার দিকে নজর দেয়ার কারণে তার জীবনের অন্যান্য বিষয়আশয় আবছা হয়ে গেছে। ১৮৩৯ সালে ব্রাজিলের স্বাধীনতার ১৭ বছর পর—এবং রিও ডি জেনিরোর প্রথম বইয়ের মুদ্রণের মাত্র ৩১ বছর পর—জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পর্তুগিজরা ব্রাজিলে হাজির হওয়ার ৩০০ বছর পর গোটা উপনিবেশে মুদ্রণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। গোটা একটি দেশকে নিজের মতো করে ভাবতে দেয়া হয়নি।
নতুন জাতির কোন ধরনের সাহিত্যের প্রয়োজন ছিল? অন্যান্য আমেরিকান দেশের মতো স্বাধীনতার অব্যবহিতপর জন্ম নেয়া বহু ব্রাজিলীয় লেখক স্বদেশীয় মোটিফের ভেতর দিয়ে এক ধরনের ঐকমত্য গড়ার চেষ্টা করেছেন। কবি গনকালেভস ডায়েস ‘ইন্ডিয়ানিস্ট’ মহাকাব্য রচনা করেন এবং তুপি ভাষার অভিধান বের করেছেন। ঔপন্যাসিক হোসে দে আলেনসার ইন্ডিয়ানদের—বিশেষ করে নারী—এক নতুন কিংবদন্তির কেন্দ্রে স্থাপন করেন।
ব্রাজিলের এ ছবি বহিরাগতদের কাছেও দীর্ঘদিন আবেদন রেখেছে। ১৫৫০ সালে ৫০ জন তুপিনাম্বাকে রাজার মনোরঞ্জনের লক্ষ্যে একটা ব্রাজিলীয় গ্রাম নতুন করে তৈরির জন্যে নরমান্ডিতে নিয়ে আসা হয়েছিল। কয়েক শতাব্দ পরও ব্রাজিলের কথা ভাবতে গিয়ে বেশির ভাগ বিদেশী ওই গ্রামের কথা কল্পনা করেছে: সুবোধ বুনো মানুষে আকীর্ণ আদিম ট্রপিক্যাল স্বর্গ। তবু—যথেষ্ট একঘেয়েভাবেই—ব্রাজিল নানাভাবে ওদের কল্পনার চেয়ে ঢের বেশি চেনাজানা বলেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। মাচাদোর কখনই দেশের বাইরে ধরা না পড়ার এটা একটা কারণ হতে পারে। জাতীয় লোকগাথায় আগ্রহী ছিলেন না তিনি; কোনো পরিবেশ সম্পর্কে তার বর্ণনা হেনরি জেমস বা এডিথ হোয়ারটনের চেয়ে দূরবর্তী ছিল না। তার বেশির ভাগ বই রিও ডি জেনিরোর ধনী এবং মোটামুটি অলস অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত; এ ব্রাজিলকে আবার বেশির ভাগ বিদেশী চিনতে পারেনি।
এমনকি ব্রাজিলীয় লেখক হওয়া সত্ত্বেও মাচাদোর রচনা বেমানানভাবে স্থানীয় রঙহীন। কেউ অতিরিক্ত কালো আবিষ্কার করলে অন্যজন আবার সেভাবে কালো ভাবেন না: তেমনি তার পটভূমির কারণে যেমন হওয়া উচিত ছিল, সেভাবে সামাজিক বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়েও সংশ্লিষ্ট নয়। হাজার হোক, ব্রাজিল পৃথিবীর বৃহত্তম দাসের আধার ছিল এবং আমেরিকার সর্বশেষ দেশ হিসেবে দাসপ্রথা বাতিল করেছিল। ১৮৮৮ সালে অবশেষে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার সময় মাচাদোর বয়স ৫০-এর কাছাকাছি।
১৯০৮ সালে মাচাদোর মৃত্যুর মাত্র এক প্রজন্ম পর তার খ্যাতির বিস্তৃতি লাভ করেছে। ১৯৩৩ সালে গিলবার্তো ফ্রেইর দ্য মাস্টার্স অ্যান্ড দ্য স্লেভস দিয়ে সূচিত বিভিন্ন বইয়ের একটা ধারা এককালের ভীতি ও লজ্জার উৎস সঙ্কর জাতিকে জাতীয় গর্বের ধারায় পরিণত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্লু ক্লাক্স ক্লান পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সময় ব্রাজিল ক্ষীণ হয়ে আসা জাতিগত সীমারেখার দেশ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠে (জাতিগত গণতন্ত্র, যেমন বলা হয়ে থাকে, ব্রাজিলের দাসত্ব ও বর্ণবাদের ভয়ঙ্কর ইতিহাস অগ্রাহ্য করেছে।)। ব্রাজিলের মহান লেখকরা সঙ্কর রক্তের হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল এবং নতুন করে নির্মিত মূল্যবোধের প্রতীকে পরিণত হতে পেরেছিলেন তারা। মাচাদো তার মরণোত্তর ভূমিকায় বিব্রত হতেন বলে সন্দেহ করতে পারেন কেউ।
তবু যেসব ব্রাজিলীয় তাদের সংস্কৃতিকে সাম্বা, ফুটবল ও বস্তির বাইরে ভিন্ন কিছুতে পরিচিত করে তুলতে উদগ্রীব, তাদের ক্ষোভ সৃষ্টি করে মাচাদোর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েনি। সেটা দশকের পর দশক তার রচনা অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসা ব্রাজিলীয় কর্তৃপক্ষ বা অসংখ্য মুখপাত্র নিয়োজিত করা প্রকাশকদের তরফ থেকে প্রয়াসের অভাবের কারণে নয়।
তার রচনার তর্জমা সহজই হওয়ার কথা। পোজ দেয়া পোর্ট্রেটের জন্য ঋজু চেহারা গদ্যেও উপস্থিত রয়েছে। কেবল তার বানান বাদে—অন্তহীন ক্লান্তিকর আধুনিকায়নের ফলে অনেকগুলোই নিজস্ব একাডেমি অব লেটার্স থেকে ঘোষিত—তার পর্তুগিজ ভাষা আদৌ পুরনো নয়। রোমান্টিকদের অলঙ্কার নেই এতে, কিংবদন্তি রচয়িতাদের স্বদেশীকৃত বুলি নেই। তার রচনা সমসাময়িকদের চেয়ে ঢের বেশি পাঠযোগ্য হয়ে আছে।
কিন্তু অনড় বুনন ও ক্ষ্যাপামোর বর্ণনার ভেতর টানাপড়েন অনুবাদ প্রতিহত করে। এক গল্পের মূল চরিত্র জনৈক সাধু ঘোষণা করছেন, ‘ঝিঁঝিঁ পোকা হাওয়া থেকে জন্মায় আর নারকেল পাতা জন্মায় নতুন চাঁদের মিলনের সময়’; অন্য একটি গল্প একটা সূচের জবানে বলা হয়েছে।
‘প্রায় হাজার পৃষ্ঠার ‘দ্য কালেক্টেড স্টোরিজ’ একক ইংরেজি সংস্করণে উপস্থিত ব্যাপক আওতার রচনা ধারণ করেছে। মার্গারেট জুল কস্তা ও রবিন পিটারসনের তর্জমায় ১৮৭০ থেকে ১৯০৬ সাল পর্যন্ত প্রায় চার দশকের রচনা অন্তর্ভুক্ত করেছে বইটি। এটি পড়তে গিয়ে মনে হবে, যেন লেখক নিজের সঙ্গে কোনো ধরনের রফা করেছেন। তার পরিমার্জিত গদ্য—অভ্রান্ত রাশভারী প্রকাশ্য সত্তার মতো—প্রশাসনের একটা স্তম্ভ হিসেবে তার অবস্থান তুলে ধরবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তার প্লটগুলো ক্রমেই বেশি হারে কৌতুকময়, দুর্জনোচিত ও বিচিত্র চেহারা নিয়েছে।
মাচাদোর প্রথম দুটি গল্প সংকলনে উনিশ শতকীয় গল্পের সব শনাক্তযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে: যানবাহনে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি, কঠিন হূদয় নারী, দুর্ভাগ্যজনক উত্তরাধিকার। ব্রাজিলের সামন্ত সমাজের কাহিনী এগুলো, রাশিয়ার মতো মনে হয়। এসব গল্পে বিছানা থেকে নামতে অক্ষম ওবলোমভের মতো চরিত্র আছে। অন্যান্য চরিত্র স্পায় যায়, ফরাসি উপন্যাস পড়ে এবং ভীষণভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে উত্তরাধিকারীকে বিয়ের প্রয়াস পায়। তাতে ব্যর্থ হয়ে একজন চাচা হয়তো কোনো মঠে আরামদায়ক কোনো পদ হাতিয়ে নেয়।
সুতরাং গোড়ার দিকের এসব গল্পে বিয়ের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রচুর ভিন্নতা রয়েছে। অপচয়কারী দোনা অমুককে নিজের ভালো হয়ে যাওয়ার কথা বিশ্বাস করাতে পারবে? প্যারিস থেকে ফেরা বিলাসী মানুষটা কি সহজ-সরল পল্লীবালার বাহুতে সুখের দেখা পাবে? প্লটগুলো বুদ্বুদ তোলে এবং ভাষা অগভীর (‘আমিই থিয়েটারের সেই রহস্যময় আগন্তুক’) হলেও কখনো পরিহাস বা আত্মসচেতনতা হারায় না।
একসঙ্গে সব পড়ার পর গোড়ার দিকের রচনাগুলো পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হবে। কিন্তু মাচাদো দে আসিস শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যে পরিণত লেখকদের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবেই চটুল ও প্রীতিকর। দ্বিতীয় গল্প সংকলন ‘মিডনাইট টেলস’ এবং ১৮৮১ সালে প্রকাশিত তৃতীয় সংকলন ‘মিসসেলানিয়াস পেপার্স’-এর মধ্যবর্তী নয় বছরে একটা কিছু পাল্টে গেছে।
‘যাদের মানসিক ভারসাম্য অটুট আছে,’ ‘মিসসেলানিয়াস পেপার্সে’র একটি ঔপন্যাসিকা ‘দি অ্যালিয়েনিস্ট’-এর কথক বলছে, ‘এখন তাদেরও সম্ভবত অসুস্থ হিসেবে দেখতে হবে।’
এ পর্যবেক্ষণ ঔপনিবেশিক আমলের পশ্চাদ্ভূমি ইতাগুইয়ের সিমাও বাকামার্তের। দি অ্যালিয়েনিস্টের কোনো প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক নেই, উত্তরাধিকারের সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার মতো কোনো অপব্যয়ীও নেই। মাচাদো বাকামার্তের উন্নত শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পড়াশোনা করতে পর্তুগালে গিয়েছিল সে, সেখান থেকে নিজ দেশে ফিরে এসেছে, এখানে তার বিস্ময়কর পাণ্ডিত্য পড়শিদের চমকিত করে। উন্মাদদের চিকিৎসার জন্য দ্য কাসা ভার্দে নামে একটা প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় সে।
যে কাউকেই মানসিক রোগী ঘোষণার ক্ষমতা পেয়ে জ্ঞানী এ মানুষটি ইতাগুইয়ের বেশির ভাগ আপাত সুস্থ বাসিন্দার আড়ালে লুকানো অবস্থা দেখে হতবিহ্বল হয়ে যায়। অচিরেই প্রায় গোটা শহরই কাসা ভার্দেতে হাজির করা হয়: ‘আমার গবেষণার বিষয় উন্মাদনাকে এ-যাবৎ যুক্তির সাগরে স্রেফ দ্বীপ ভাবা হয়ে এসেছে, এখন আমি সন্দেহ করছি, সেটা আসলে একটা মহাদেশ।’
গোটা শহর বাকামার্তের বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠে, কিন্তু বিপ্লবীরা ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার পর পরই ওরা বুঝতে পারে যে উন্মাদদের পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়াতে দেয়া চলবে না। ভয়ঙ্কর একটা জিনিস আবিষ্কারের আগ অবধি নির্লিপ্তভাবে কাজ করে চলে অ্যালিয়েনিস্ট: যারা সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য স্বাভাবিকতার ভাব দেখায়, তারাই আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক নাগরিক।
তার গল্পগুলোয় মাচাদো ভীষণ সম্মানিত মানুষের ভঙ্গুর সুস্থতা তুলে ধরে আমোদিত হয়েছেন। তবে তার বাক্যেই রয়েছে আসল রসবোধ। তাকে ‘উপজাতি’র সদস্য বলে অভিযুক্তকারীসহ বহু সমালোচক এটা ধরতে পারেননি। যা বলতে চান, তার উল্টোটা বলার শান্ত ভঙ্গিই তাকে এতটা কৌতুকাবহ করে তুলেছে।
‘ইয়োখিম ফিদেলিসের মৃত্যু গোটা এনজেনো ভেলহোর উপকণ্ঠে অবর্ণনীয় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে,’ এভাবে শুরু হয়েছে একটা গল্প, ‘এবং বিশেষত ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের হূদয়ে।’ মাচাদোর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে পরিচিত যে কেউ বুঝবেন যে আসলে এই ইয়োখিম লোকটা কতখানি ঘৃণিত ছিল, সেটাই বলতে চাইছেন তিনি।
মাচাদোর বর্ণনা সবসময়ই পরোক্ষ এবং কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক বাণীও তাই। কমেডি অপেরা ধরনের গোড়ার দিকের গল্পগুলো উনিশ শতকের রিও ডি জেনিরোর অগভীরতা, অর্থলিপ্সুতা ও উচ্চবিত্তের আলস্য ধারণ করেছে। সমাজের সমালোচনা পরোক্ষ, এমনকি মুগ্ধকারী: মাচাদো কখনো ধর্মান্ধ বা ধর্মপ্রচারক ছিলেন না।
কখনো প্যারিস বা সাও পাওলো দেখেননি তিনি। যে জগৎ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, সেখানে একজন সম্রাট দেশকে শাসন করবেন। সময়টা উত্তপ্ত জানুয়ারি এবং প্রতিটি ঘরে কয়েকজন দাস থাকাটা নেহাতই স্বাভাবিক।
দোনা বিয়েত্রিজ ফরমাশ দিয়ে, দাসদের গালমন্দ করে, পরিষ্কার টেবিল ক্লথ আর ন্যাপকিন গুছিয়ে এবং কেনাকাটার ফর্দ বর্ণনা করার ফাঁকে পার্লার আর রান্নাঘরে ব্যস্তসমস্ত আনাগোনা করছে; সংক্ষেপে, এমন বিশেষ দিনে প্রত্যেক গৃহকর্ত্রীর সামাল দেয়ার মতো হাজারো জিনিস সামালাচ্ছে।
এমনকি রিওর বিখ্যাত জাঁকজমকও তার রচনায় অনুপস্থিত। তার দেখা একমাত্র ল্যান্ডস্কেপ সম্পর্কে পর্যটক সুলভ দৃষ্টিভঙ্গি নেয়া অসম্ভব। ‘প্রকৃতি তোমার উপন্যাসে চমত্কার সব পাতা অনুপ্রাণিত করবে’—বলছিলেন তার এক বন্ধু। চেষ্টা করে দেখেছেন তিনি, কিন্তু আট বা দশ লাইন পরই একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। ‘প্রকৃতি আমার ভালো লাগে না’—বন্ধুকে বলেছেন মাচাদো। ‘মানুষ আমার আগ্রহের বস্তু।’
ভ্রমণ নয়, অসাম্প্রদায়িকতা পড়াশোনা থেকে আসার প্রমাণ: বই মারফত গোটা বিশ্বকে জেনেছেন তিনি। তার বৈশিষ্ট্যহীন প্রথাগত চেহারার মতো ইউরোপীয় সাহিত্যের বিস্তৃত উল্লেখ ব্রাজিল অতীন্দ্রিয় বনজঙ্গল ও মানুষখেকো সাপের আবাস হওয়ার ধারণা পাল্টে দিয়েছে। ঔপনিবেশিক ব্রাজিলে মুদ্রণ নিষিদ্ধ থাকলেও বই নিষিদ্ধ ছিল না। দেশটার সমৃদ্ধ ও প্রাচীন সাহিত্য ছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা স্থানীয়ভাবে উত্পন্ন হয়নি। ব্রাজিলীয়দের প্রায়ই উৎসাহ জোগানো বিচিত্রময়তা নিয়ে কাজ করার বহু শতক সত্ত্বেও ব্রাজিল সবসময়ই, ভালো হোক বা মন্দ হোক, পুরোপুরি পাশ্চাত্য সমাজেরই অংশ ছিল। সক্রেটিস ও লা রোচেফুকো ওই বিশ্বেরই অংশ ছিলেন; তেমনি রান্নাঘরের দাসরাও।
মাচাদো দে আসিস দেখিয়েছেন যে মানবীয় কমেডি সব জায়গায় একই এবং আমাদের সর্বজনীন সত্যি হলো মানুষ ও সমাজের ভেতরের সংঘাত, সাধারণত সমাজই জেতে। এবং তার জীবন ও রচনাবলি এ ধরনের বিজয় যেমন মনে হয় তেমনি কঠোর না হওয়ারই আভাস দেয়। বাহ্যিক সমরূপতা হয়তো আমাদের স্বাধীনতার নিরাপত্তার জন্য যা দরকার তা-ই। সম্ভবত অ্যালিয়েনিস্টের মতো সবচেয়ে চমত্কারভাবে মানিয়ে চলেছে যে, সে-ই সবচেয়ে বড় উন্মাদ।






