ডেভিড দেবিদার। অনুবাদ: শওকত হোসেন
বিক্রম শেঠের আ সুইটেবল বয় বেরুনোর পর ২৫ বছর কেটে গেছে। কাল্পনিক রাষ্ট্র ‘পূর্ব দেশ’ নামে (মোটামুটি পূর্ব উত্তর প্রদেশ) একটি দেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালের পটভূমিতে সুবিশাল এ উপন্যাস (হার্ডকভারে ১,৩৪৯ পৃষ্ঠা) উচ্চাভিলাষ, আওতা ও জাঁকের বিচারে অনন্য হয়ে আছে। লতা নামে এক তরুণী এবং তার তিন প্রেমিককে ঘিরেই এর মূল কাহিনী। কয়েক বছর ধরে শেঠ উপন্যাসটির দ্বিতীয় পর্ব আ সুইটেবল গার্ল নিয়ে কাজ করছেন। এ উপন্যাসে এখন প্রবীণা লতা পৌত্রের জন্য উপযুক্ত পাত্রীর খোঁজ করছে। হিন্দুস্তান টাইমস ইংল্যান্ডে শেঠকে তার বাড়িতে খুঁজে পায়। এখানেই উপন্যাস রচনায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি। দিল্লিতে (আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময় ফেসটাইমের মাধ্যমে) আলেফ বুক কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড দেবিদারের নেয়া দীর্ঘ সাক্ষাত্কারের উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে পত্রস্থ হচ্ছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে আলেফ বুক কোম্পানি শেঠের বইয়ের সম্পাদনার কাজ করছে।
আপনি আ সুইটেবল বয় রচনার সময় কখনো ভেবেছিলেন যে এটি গত ২৫ বছরের সবচেয়ে বিখ্যাত বইগুলোর একটিতে পরিণত হবে? এ সময়ে কেবল ভারতে প্রকাশিত কয়েক লাখ বইয়ের ভেতর পাঠকের মনে অনপনেয় দাগ ফেলে যাওয়া খুবই অল্পসংখ্যক বইয়ের একটি এটি। এ ব্যাপারটা আপনার কেমন লাগে?
বেশ, আদৌ এমন কিছু আশা করিনি। আমি ভেবেছিলাম— কিঞ্চিৎ অভব্যের মতোই বলতে দিন— বেশ কয়েক বছর ধরে লেখার মতো একটা ভালো বই এটি, কিন্তু অবশ্যই এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আশা করিনি। হাজার হোক, বেশ গুরুত্বহীনভাবে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের একজন প্রকাশক ছিলাম আমি এবং প্রকাশনার বিপজ্জনক জলে পা ডুবিয়েছি, যেখানে হাঙ্গর নয়, বরং ভালো হোক বা মন্দ, বেশির ভাগ বই বিনা শব্দে উধাও হয়ে যায়। মানে আমার মনে হচ্ছে, আপনি ভাগ্যবান হোন বা দুর্ভাগা, একটি বইয়ের স্বীকৃতি লাভ বা উদযাপিত হওয়ার ব্যাপারটা প্রায় দৈবিক। আমার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পশ্চাত্ভূমির পটভূমিতে রচিত— ১৯৫০-এর দশকের ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে বেশির ভাগের ধারণাই ছিল এমন, নিজেকে ব্যাখ্যার মতো নির্ঘণ্টবিহীন, ভীষণ দীর্ঘ, প্রকাশের পক্ষে ব্যয়বহুল, তর্জমার পক্ষে অতিরিক্ত ব্যয়সাপেক্ষ, সমালোচনার বেলায়ও তা-ই (সমালোচনার জন্য কেবল নির্দিষ্ট একটি অংশই পাচ্ছেন আপনি এবং আপনাকে হাজার পৃষ্ঠারও বেশি পড়তে হবে)— একটি বই এতটা ভালো করবে কল্পনা করার জো ছিল না। যাহোক, বইটির স্বীকৃতি লাভ আমাকে ভীষণ আনন্দিত করেছে। তবে এটা এক ধরনের ধাক্কাও।
প্রতিকূলতা সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকার পরেও কেন এ ধরনের একটা বই লিখতে গেলেন? বলতে গেলে, পুরনো কেতার প্রায় ১০ লাখ শব্দের ১৯৫০-এর দশকের পটভূমিতে চারটি পরিবারের অসংখ্য প্রজন্মকে নিয়ে চার পর্বের কাহিনী। কোন জিনিসটা আপনাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে?
বেশ, এক ধরনের অজ্ঞতা থেকে শুরু করেছিলাম, আর ঘোর আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। মোটেও ১০ লাখ শব্দের নয়, মোটামুটি ছয় লাখ হবে। সে যাহোক, বইটি এত বিশাল হবে ভাবিনি। আমি ভেবেছিলাম এটা অনেকটা মার্চেন্ট অব ভেনিসের স্বর্ণ, রুপা আর সিসার কাসকেট বহনকারীর মতো লতা এবং ওর তিন প্রেমিকের কাহিনী হবে। মনে হয়েছিল, এর ভেতর থেকে একটা কিছু বেরিয়ে আসবে এবং সেটা বেশ ভালো ও অন্তরঙ্গ কাহিনী হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু এমন দানবীয় কিছুতে পরিণত হতে পারে, তার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। থাকার কথাও নয়। আর উপমা দিয়ে বলতে গেলে, একবার বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে নামার উপায় ছিল না; নিজেকে বাঘের মুখে পড়তে দিতে না চাইলে কাহিনীটা কীভাবে শেষ হচ্ছে জানা দরকার ছিল। তো আমার কথা হলো, যদি জানা থাকত, শুরু করার মতো সাহস বা নির্বুদ্ধিতা হতো কিনা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। অবশ্য এভাবে অনেক কিছুই ঘটে। অনেকটা ফ্রম হেভেন লেক-এ তিব্বতে আমার হিচহাইকিং সফরের মতো। তিব্বত ও নেপালের মধ্যে মৈত্রী সেতু বানের পানিতে ভেসে যাওয়ার কথা জানতাম না। জানলে হয়তো পথেই নামতাম না। দ্য গোল্ডেন গেটের বেলায়ও একই কথা। একটা বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়েছিলাম, ফের ঘোরের ভেতর চলে গেছি... ভাবছিলাম বেশ তো, ক্যালিফোর্নিয়ার পটভূমিতে উপন্যাস লিখতে পারব না, এমন কোনো কথা তো নেই এবং ওই প্রয়াসের কারণে অর্থনীতির ডিগ্রি বিসর্জন দেয়ার দরকার হবে, তাও জানতাম না। অজ্ঞতা যেকোনো বড় প্রকল্পে হাত দেয়ার পক্ষে দুর্দান্ত উপায় এবং ঘোর— আমি তেমন একটা গোছানো মানুষ নই— আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আপনার গোছানো মানুষ না হওয়ার দাবির সঙ্গে একমত হব কিনা নিশ্চিত নই। লেখালেখি চালিয়ে যেতে এবং আপনার মতো সক্রিয় হতে গেলে এক ধরনের শৃঙ্খলা থাকতেই হয়।
আমার ভূগোল আর অর্থনীতির শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করে দেখুন।
বেশ, ব্যাপক কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্রে...
আপনি যাকে অপরচুনিটি কস্ট বলবেন, এ ব্যাপারটা আছে। সুতরাং অবশ্যই এটা কিংবা ওটা করতে পারি এবং ধরা যায়, তাতে ফসকে যাওয়া সুযোগগুলো...কিন্তু তেমন কোনো সূক্ষ্ম হিসাব ছিল না এটা, স্রেফ আমাকে যা করতেই হতো। এবং সক্রিয়তা সম্পর্কে বলতে গেলে, হ্যাঁ, আপনি শব্দ সংখ্যা ইত্যাদি গুনতে পারলে আমার তাই মনে হয়, কিন্তু এ পর্যন্ত আমার গোটা জীবনে মাত্র তিনটি উপন্যাস লিখেছি আমি।
বেশ, অনেক লেখকই আছেন, যারা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বই লিখতে পারলেই বর্তে যাবেন। আপনি যখন আপনার তিনটি উপন্যাসের কথা ভাবেন, তিনটি বইয়ের ভেতর অন্তত দুটি আজকের দিনেও বিপুল সংখ্যায় পড়ার বাস্তবতা কিন্তু বিরল। অর্থনীতির বিচারে উৎপাদনের মূল্য কিন্তু অসাধারণ।
ডেভিড, আপনি কি কোনোভাবে আমার প্রকাশক?
হ্যাঁ (হাসি)। আসুন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার লেখার প্রক্রিয়া কীভাবে বদলে গেছে সে সম্পর্কে একটু কথা বলি। আপনি এখন যে বইটি লিখছেন— আ সুইটেবল গার্ল— আপনার বয়স ষাটের কোটায় থাকতেই সমাপ্তির প্রক্রিয়ায় ছিল, অথচ আ সুইটেবল বয় লেখা হয় আপনার বয়স ৩০ ও ৪০ বছরের কোটায় থাকতে। এখন আপনার লেখার ধরন কি শুরুর সেই সময় থেকে আলাদা? ঘোরের ব্যাপারটা আপনার মৃত্যু পর্যন্ত থেকে যাবে, কিন্তু এখন যখন লেখালেখি করছেন, সেটা শুরুর সময় থেকে কীভাবে ভিন্ন? এছাড়া অন্য ব্যাপারও আছে। আমি জানি আপনার পরিবার বিশেষত মা-বাবা আপনার জীবনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। আপনার বাবার এখন বেশ বয়স হয়েছে, মা সম্প্রতি গত হয়েছেন... এসব ব্যাপার আপনার লেখার ধরন আর চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে?
চটপট ভেবে বলতে হবে। এটা মনে হয় জীবনযাপনেরই একটা ধরন। এটা ঠিক, একবার কেউ একজন বলেছিল যে জীবিত কাউকে নিয়ে কিছু লেখা যায় না। আমি জানি, আমার গ্রেট আংকেল শান্তি বেঁচে থাকতে বেশ কয়েকবার তার জীবন এবং আমার জার্মান ইহুদি বড় খালাকে নিয়ে টু লাইভস বইটা লেখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তার মৃত্যুর আগে সেটা সম্ভব হয়নি। অন্য ব্যাপারগুলো হলো, কিছু ব্যাপার মা-বাবা জীবিত থাকতেই আপনি লিখতে পারেন, যেগুলো তাদের বিচলিত করার বেলায় আপনি কিঞ্চিৎ সচেতন। কিন্তু লেখক হিসেবে এসব জিনিস একপাশে সরিয়ে রাখাই আপনার দায়িত্ব। আমরা সবাই আগে হোক বা পরে মরতে চলেছি, তো প্রতিভার ক্ষেত্রে অসৎ থাকা বা আপনার সম্পর্কে অন্যরা কী ভাববে, সেটা নিয়ে বড় বেশি উত্কণ্ঠিত হয়ে নিজের অনুপ্রেরণাকে অগ্রাহ্য করার অর্থ হয় না। এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষা ব্যূহ হচ্ছে, আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে পারেন? আমার কাছে খ্যাতি গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের বাইরে— যদিও বেশ দরাদরি করে থাকি আমি— টাকাও ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমার পরিবার ও অল্প কয়েকজন বন্ধুর ভালোবাসাই গুরুত্বপূর্ণ। আর এক ধরনের মর্যাদার অনুভূতি নিয়ে নিজের দিকে তাকানোর বাস্তবতা এবং সকালে শেভ করার সময় কিংবা নারী হলে মেকআপ নেয়ার সময় আয়নার দিকে তাকিয়ে গ্লানি বোধ না করা। এটাই আসল কথা এবং তাহলেই হয়তো দুনিয়ায় ভালো কিছু করতে পারবেন। যদি না পারেন, অন্তত খুব বড় ক্ষতি করে ফেলবেন না। তো এগুলোই সাধারণ নীতি।
এখন জীবনে কী করতে চাই আর কোন জিনিসটা করতে ভালো লাগে, সেটা জানার ক্ষেত্রে আমি দারুণ ভাগ্যবান। আমার বয়স যখন তিরিশের কোটায়, অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়াসে বেশ লম্বা সময় পার করার পর কিছুটা বরং দেরিতেই ব্যাপারটা ধরতে পারি, তবে পেরেছি। যে কাজ আমার পেশা হতে যাচ্ছে, সে কাজে সময় দেয়ার সমৃদ্ধ ওই বছরগুলোয়, আমাকে জোগানো ওই বছরগুলোর বিষয়বস্তুর মূল্য আমার পেশার চর্চায় প্রবেশ করেছে। সে কারণেই, উদাহরণস্বরূপ,আ সুইটেবল বয় স্রেফ প্রেমের কাহিনী না হয়ে অর্থনীতি, রাজনীতি, একটা বৃহত্তর ঘটনাপ্রবাহ, ভারতীয় জীবনধারা, আমাদের জীবন সমষ্টির পাশাপাশি ব্যষ্টিক উপাদানেও প্রভাবিত হওয়ার কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এবং সমষ্টির কথা ভাবতে গেলে, কেবল আমার মা-বাবাই নন, বরং আমারও মৃত্যু ঘটার মতো ব্যাপারগুলো আমাকে ভীষণ স্বস্তি জোগায়। এটা বিরাট স্বস্তির কথা। কারণ আপনি মারা যাওয়ার পর আর কোনো ভয় থাকবে না, গ্লানি থাকবে না, কিছু না। দ্বিতীয় কথা হলো, আমরা কত তুচ্ছ। মানে একবার কে যেন আমাকে বলেছিল, প্রতিটা গ্যালাক্সিতে শত বিলিয়ন নক্ষত্র আছে এবং আমাদের জানা মহাবিশ্বে আছে ১০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সি। এখন মানে, সত্যি, এটা-সেটা নিয়ে অস্থির হয়ে ওঠার স্রেফ কোনো মূল্য নেই। আমাদের ক্ষুদ্রতা আর আমাদের কাছে আমাদের জীবনের গুরুত্ব, এ দুটি জিনিস জানা ভীষণ স্বস্তির ব্যাপার।
এটা আমাকে এমন একটা প্রসঙ্গের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেটা নিয়ে আপনার চিন্তাভাবনার কথা জানতে চাই। তাহলে এক্ষেত্রে লেখালেখির মতো শিল্পকলার মূল্য কী? এটা কি নিজেই যথেষ্ট, নাকি লেখালেখির কোনো যুক্তি আছে?
বেশ, আমার মনে যে ভাবনাটা এসেছে সেটা হলো, লেখকরা স্রেফ মানুষ, সাধারণ নাগরিক। সব ব্যাপারে তাদের কোনো মন্তব্য থাকতে হবে তা নয়। মোটেই তা নয়। দুনিয়ায় কিছু ঘটলেই যে তাদের কলাম ইঞ্চি ভরে তুলতে হবে তাও নয়। তাদের চিন্তাভাবনা থাকতেই পারে, সে চিন্তা জটিল হতে পারে কিংবা কোনো বিশেষ ব্যাপারে আদৌ কোনো মতামত না-ও থাকতে পারে। তবে লেখালেখির উদ্দেশ্যের বেলায়, আমার ধারণা, আমি যখন কবিতা লিখি, তখন ভাবি না যে আমার লেখার উদ্দেশ্য এই-সেই। মনে করুন, একটা ছোট কবিতা লিখেছি আমি: ‘আজ রাতে তোমরা যারা ঘুমিয়ে আছো’— মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। কবিতাটা কোনো হাসপাতালের দেয়ালে লেখা হয়েছে বা বিষণ্নতার সময় কেউ অন্য একজনকে পড়ে শুনিয়েছে জেনে তাড়িত হয়েছি। কিন্তু লেখালেখির ক্ষেত্রে এটা আমার লক্ষ্য ছিল না। এটা স্রেফ হাজির হয়েছে। তবে আপনাকে একটা কথা বলি। আপনি জানেন, আসলে আমার বন্ধু, পরামর্শক ও অনুপ্রেরণাদায়ী টিমোথি স্টিলই বেশি ভালোভাবে তুলে ধরেছেন এটা। দ্য গোল্ডেন গেট লেখার সময় উৎসাহিত করেছেন, সাহায্য করেছেন, এ প্রয়াসে অনেকটা সহযোগী কবি এবং নিশ্চিতভাবে সহকবি ছিলেন তিনি। দ্য গোল্ডেন গেট তাকেই উৎসর্গ করেছি, কিন্তু তিনি তার পরের বইটি দ্য গোল্ডেন গেটে ব্যবহূত স্তবকেই আমাকে উৎসর্গ করেন। আমার সনেট ধরনের উৎসর্গ লিপিতে মূলত তার কথাই ভেবেছিলাম, কিন্তু আমার উৎসর্গে টিমোথির প্রতিক্রিয়া ছিল আমরা কেন লিখি, লেখালেখির যুক্তি কোথায় তার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ। কবিতাটা এ রকম:
আমরা জীবনে পা রাখি এবং এভাবে
মানুষের কণ্ঠস্বরের উত্তরাধিকার পাই।
আমরা ভাগ করে নিই বলেই শব্দ শব্দ হয়ে ওঠে
বিস্ময় আমাদের রুচিকে অনুপ্রাণিত করে
জীবনের জটিল তথ্যগুলোর সুরাহার জন্য
যন্ত্রণার সঙ্গে রফা করার জন্য
যৌক্তিক আত্মবিস্মৃতির চেয়ে কম নয়
এমন কিছুর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে।
বছরের পর বছর আমরা ছন্দ আর পরিমাপ বিনিময় করেছি
আমাদের পদ্যগুলো বই হয়ে উঠলে
আশা আছে অন্যরা হয়তো
সেগুলো থেকে সান্ত্বনা, অনুভব বা সুখ খুঁজে পাবে
যদিও বছরগুলো তাদের নিজ গতিতে
এবং যদিও আমাদের একসঙ্গের সময়গুলো দূরে সরে যায়।
আসুন ‘অন্যরা হয়তো সেগুলো থেকে সান্ত্বনা অনুভব বা আনন্দ খুঁজে পাবে’ পঙিক্তটি বেছে নিয়ে আ সুইটেবল বয়-এর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাক। এ মুহূর্তে বইটির কারণে কারো কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর সাড়া কী ছিল?
দুটি বা তিনটি ভিন্ন ভাবনা আসছে আমার মনে। একটা হলো, নানি, মা আর মেয়ে বইয়ের দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে যখন বলেছিল, ‘আমরা সবাই এ বইটি পড়েছি এবং আমরা সবাই ওই সময় যে কাজই করে থাকি না কেন, বাদ দিয়েছিলাম।’
কী দারুণ। কোথাকার ঘটনা এটা?
কলকাতা। মেয়েটাকে আমি বলেছিলাম, ‘তোমার মা কখন পড়েছেন এটি’, ও বলল, ‘অন্তঃসত্ত্বা থাকতে।’ আমি বললাম, ‘তাহলে জন্মের সময় তোমার মাথা নিশ্চয়ই চ্যাপ্টা ছিল, তুমি কি আমার নামে মামলা করতে চেয়েছিলে?’ মেয়েটা বলল, ‘না, এখনো না।’ তো আমি এখন চতুর্থ প্রজন্মের অপেক্ষায় আছি, দুটো চ্যাপ্টা মাথা এবং তারপর হয়তো ওরা কাজটা করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে। এটা ছিল একটা। দ্বিতীয়বার এক আমেরিকান মহিলা আমাকে এ কথা লিখে জানিয়েছিলেন, ‘প্রিয় মিস্টার শেঠ, এটা গল্পের আদলে একটি চিঠি, আপনার গল্পের মতো ততটা জটিল আর দীর্ঘ নয়, কিন্তু আপনাকে না বলে পারলাম না।’ আমার প্রকাশক মারফত ওটা আমাকে পাঠিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, গল্পটা তার বাবাকে নিয়ে; ইংরেজি সাহিত্যপ্রেমিক ও প্রফেসর ছিলেন ভদ্রলোক। হাসপাতালে জীবনের শেষ দিনগুলোয় প্রিয় ক্ল্যাসিক রচনা বাদে অন্য কিছু পড়তে ভীষণ কষ্ট হতো তার, কিন্তু তখন আমার বইটির সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেন মহিলা। পরস্পরকে পড়ে শোনাতেন তারা। মহিলার মনে ভদ্রলোকের জীবনের শেষ বছরের সঙ্গে এটি সম্পর্কিত হয়ে গিয়েছিল এবং শেষকৃত্যে গান্ধীর আশ্রম রচনাবলি থেকে আমার অনূদিত অংশটুকু পাঠ করেছিলেন তারা: উস জাগ মুসাফির ভোর হোয়ি...। জেগে ওঠো সফরকারী, আকাশ আলোকিত হয়ে গেছে— ঘুমিয়ে আছো কেন। এখন তো রাত নয়। তিনি বলেছিলেন, প্রার্থনার মতো ছিল ব্যাপারটা। তৃতীয় যে ঘটনার কথা মনে পড়ছে সেটা একটু হাস্যকর। আমার এক বন্ধু একটা কামরায় ছিল। আমি একটা কিছু করতে চাইছিলাম, তো ওকে ফোন করে বললাম, ‘আচ্ছা, তুমি খুব ব্যস্ত নাকি?’ তারপর ওই কামরায় গিয়ে দেখি, একটা বালির বস্তার ওপর বসে আছে সে। আমাকে দেখে ক্রুদ্ধ চোখে তাকাল, ঘর থেকে ভাগিয়ে দিল আমাকে। বেরুনোর মুহূর্তে ভাবছিলাম, আরে, ও দেখি আমার বই-ই পড়ছে! কিঞ্চিৎ বিরক্ত বোধ করার কথা মনে আছে আমার। আমি লেখক, যেখানে ওর কাছে খানিকটা সময় চাইছিলাম, আর সে কিনা আমারই বই পড়ছিল!
যাহোক, আমার এ কথাও বলা উচিত যে অনেকেই আমার বইটা ভয়ংকর একঘেয়ে আর প্যাঁচালো দৈর্ঘ্যের কারণে শেষ করার পর ছুড়ে ফেলে দেয়ার ইচ্ছার কথা বলেছেন।
লেখালেখির সময় দুনিয়াটাকে নিজের কাছে অর্থবহ করে তোলার চেষ্টা করছেন, এমন মনে হয়?
কোনো এক পর্যায়ে নিশ্চয়ই সেটা করি, তবে নিজেকে খুব বেশি বিশ্লেষণের চেষ্টা করি না। ধরুন যখন কোনো কবিতা লিখি তখন হয়তো আমার আবেগ-অনুভূতির একটা অর্থ খোঁজার চেষ্টা করি, কিন্তু আপনি উপন্যাস লেখার সময় আসলে বিভিন্ন চরিত্রের মনের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করেন, যারা নিজেরাই একবারেই ভিন্ন, অনেক সময় বিরোধময় কায়দায় নিজেদের জগতের অর্থ খোঁজার চেষ্টা করছে কিংবা হয়তো দুনিয়াদারির থোড়াই কেয়ার করে তারা বরং ঝলসানো ইলিশ মাছ গুড় নাকি মুড়ি দিয়ে বানানো হয়, তা নিয়েই বেশি ভাবিত।
আচ্ছা বিক্রম, বলুন তো লেখার সময় আপনার সামনে কে থাকে? কোন জিনিসটা আপনাকে স্রেফ লেখার কাজ আর অনুপ্রেরণা ছাড়া এগিয়ে নিয়ে যায়...মনে করুন আপনি একজন বক্সার, আপনার সামনে কে আছে?
বেশ কৌতূহলকর প্রশ্ন। একটু ভাবতে দিন। আমার একজন আদর্শ বুদ্ধিদীপ্ত পাঠক আছেন, তবে বইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সেই পাঠকের পরিবর্তন ঘটে। এ পাঠকের চরিত্র বা ব্যক্তিত্বের অন্যতম দিক হচ্ছে, আমি যে বিশ্বে লেখালেখি করছি, সেখানকার জীবন ও সময় সম্পর্কে তাকে ওয়াকিবহাল থাকতে হয়। যেমন ধরুন, আ সুইটেবল বয় লেখার সময় আমি কোনো পশ্চিমা পাঠকের কথা ভাবিনি, পঞ্চাশ বা ষাট এমনকি চল্লিশের দশকে ভারতে ছিলেন এমন কারো কথা কল্পনা করেছি, আমি যে জগতের কথা লিখতে যাচ্ছি, সেটি সম্পর্কে যার উপলব্ধি আছে, যার কাছে পান কি জিনিস কিংবা পুরুষোত্তম দাস তান্দন কে খুলে বলতে হবে না। মানে আমি স্রেফ নিশ্চিত ধরে নিয়েছি। তাই কোনো নির্ঘণ্ট ধরনের কিছু নেই। বুদ্ধিদীপ্ত, ওয়াকিবহাল পাঠক একেই বলে। একইভাবে অ্যান ইকুয়াল মিউজিকের বেলায় পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কেউ। কোনো ভারতীয় পাঠকের খাতিরে পাশ্চাত্য সংগীতের মৌল ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করতে যাইনি, যেমন পাশ্চাত্য পাঠকের কাছে ভারতীয় রাজনীতির পটভূমি ব্যাখ্যা দিতে যাব না। তেমনি দ্য গোল্ডেন গেটের বেলায়ও পূর্ব উপকূলীয় পাঠকের কাছে পশ্চিম উপকূল কেমন, ব্যাখ্যা দিতে যাব না বা ব্র্রিটিশ জনগণের জন্য আমেরিকান বানান পাল্টাব না। আসলে বইটির কোনো কোনো ছড়া আমেরিকান ছড়া, আমি জেড হরফকে ফিলোসফির সঙ্গে মিলিয়েছি...তো আমার কাছে আদর্শ পাঠক এমন কেউ, যিনি আমি যে জগৎ সম্পর্কে লিখছি সেটি সম্পর্কে জানেন; যার হূদয় সত্যিকারের সুরে স্পন্দিত হবে, কিন্তু ভুল সুর থাকলে ধরতেও পারবেন।
লেখালেখির সময় আর কী কী জিনিসের দিকে খেয়াল রাখেন?
আপনার অবশ্যই একটা অন্তঃস্থ ভয়ংকর ডিটেক্টর থাকতে হবে...।
হেমিংওয়ে এ কথা বলেছিলেন।
হেমিংওয়ে এটা বলেছেন এবং একদম ঠিক ছিলেন তিনি। আর যে জিনিসটা মাথায় রাখি সেটা হলো, অডেনের সেই কথাটা, যেখানে তিনি বলেছিলেন— ‘আমৃত্যু এর সাথে, এর সাথে, এর সাথে, এর সাথে’ হওয়ার চেষ্টা করো না। চলতি হাওয়ায় গা ভাসানোর কোনো অর্থ নেই, অন্যের প্রশংসা নিয়ে চলারও মানে হয় না। আয়নায় কেবল নিজের মুখটাই আছে আপনার, কাগজের বুকে আপনার কথাগুলো, আর সত্যিই আপনি এটা আপনার নামে বেরুতে দিতে চান কিনা, নাকি এখনো মণ্ডে পরিণত গাছের ওপর ভিত্তি করে বই বের করে চলা দুনিয়ায় এ অদ্ভুত অনুচ্ছেদের খাতিরে গাছ কেটে নামাতে চান?
লেখক হওয়ার এটা খুবই খাঁটি উপায়। আমার মনে হয় না এখন আর এভাবে চিন্তা করার মতো প্রচুর লেখক আছেন। তবে একই সময়ে আমি জানি, আপনিও খুব বাস্তব সমস্যার বেলায় অভিজ্ঞ এবং সংস্কৃত একজন মানুষ। এ দুজন কীভাবে একসঙ্গে চলেন?
প্রথমে আমি যেটা বলব... প্রথমটি দুনিয়াকে দেখার একেবারে খাঁটি উপায় সম্পর্কিত। ইংরেজি ভাষায় লিখি বলে একটা পর্যায় পর্যন্ত এ নিখাদ অবস্থা বজায় রাখতে পারি, বিশাল পাঠকগোষ্ঠী আছে এর, কারণ আমাকে পরিবারের ভরণপোষণ করতে হয় না, এর অর্থনীতিই কিছুটা সহায়তা জুগিয়ে থাকে। কিন্তু চেখভের মতো আমার চেয়ে ঢের ভালো লেখকদের প্রচুর লেখালেখি করতে হয়েছে, তার কোনো কোনো গল্প রীতিমতো অসাধারণ। কিন্তু কোনোটা আবার স্রেফ জনপ্রিয় ঘরানার। এমনকি শেক্সপিয়রও কতজনকে কাছে টানতে পারেন, সে ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন। তো খাঁটিত্বের ধারণা বরাবরই বাস্তবতার ধারণার সঙ্গে মিশে থাকে। নির্বোধদের আসন দেয়া চলে? এমনকি ভার্দেও এ নিয়ে বিচলিত ছিলেন। খাঁটিত্ব সম্পর্কে বলা যায়, এটা মিশেল বস্তু। দ্বিতীয় বিষয়টা হলো, নিজের কথার প্রতি সৎ থেকেও কীভাবে আপনি বাস্তববাদী থাকতে পারেন। আমরা ভাগ করে নিই বলেই শব্দ শব্দ হয়ে ওঠে, আমরা কলুষিত করি না বলেও শব্দ শব্দ হয়ে ওঠে এবং আমি মনে করি, যতক্ষণ মূল জায়গাটির খাঁটিত্ব বজায় রাখতে পারছি ততক্ষণ চৌহদ্দিকে অর্থায়ন করতে পারি। যুক্তি আছে মনে না করা পর্যন্ত আমি হাজার পৃষ্ঠার কোনো বইয়ের একটা সেমিকোলনও বদলাব না।
একদম ঠিক। বলতেই হচ্ছে, আপনার বই সম্পাদনা করতে গিয়ে এটা বুঝতে পেরেছি...কিন্তু আমাকে এও বলতে হচ্ছে, আপনার লেখা সম্পাদনা সবসময়ই একটা প্রীতিকর অভিজ্ঞতা, কারণ সম্পাদকীয় পরামর্শে যুক্তি খুঁজে পেলে সেটা চটপট মেনে নেন...আপনি কী বলতে চাইছেন, কীভাবে বলতে চান, সে ব্যাপারে স্পষ্ট হওয়ার কারণেই এটা হতে পারে। একটা বিষয়ে আমার কৌতূহল রয়ে গেছে। সেটা হলো, একটি সনেট এবং আ সুইটেবল বয়-এর মাঝে বেশ কয়েক হাজার শব্দ রয়ে গেছে। এ দুটি কীভাবে একই সৃজনশীল মস্তিষ্ক থেকে দেখা দিল, কারণ এটা বেশ বিরল?
হ্যাঁ...কিন্তু আরো অনেকে ছিলেন...
যেমন পাস্তারনাক।
ঠিক বলেছেন, পাস্তারনাক কিংবা ফরাসি ঐতিহ্যে ভিক্টর উগো। ইংরেজি ঐতিহ্যে আপনি ডি.এইচ. লরেন্সের মতো কাউকে পেয়ে যাবেন কিংবা টমাস হার্ডির কথা ভাবতে পারেন, অসাধারণ কবি তিনি। মানে বলতে চাইছি ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম মহান কবি, আবার অসাধারণ ঔপন্যাসিকও (যদিও ভালো নাট্যকার নন! এখানে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু ব্যর্থতায় সমস্যা কী?)। আমার মনে হয় বাতি জ্বালানোর আগ পর্যন্ত আপনি বিভিন্ন কামরায় হাতড়ে হাতড়ে চলতেই পারেন। পুশকিন, ঠাকুর বা গ্যেটের কথা ধরুন, এরা সম্পূর্ণ পরিবর্তনশীল, অসংখ্য ধারায় লেখালেখি করেছেন। অন্যদিকে জেন অস্টিনের মতো কারো কথা ভাবুন, কেবল একটা ধরনেই লিখেছেন তিনি। তবে সেটা অসাধারণ। আমি মনে করি, নানা রূপ ও আকারের লেখক আছেন।...
ঠিক আছে, শেষের কয়েকটা প্রশ্ন, বিক্রম। প্রথমটির সঙ্গে আ সুইটেবল বয়-এর সম্পর্ক না থাকলেও ৩৭৭ ধারার সঙ্গে সম্পর্ক আছে। এটা রদের ব্যাপারে জোরালো মত ছিল আপনার। সুপ্রিম কোর্টের ৩৭৭ ধারা নাকচ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?
এটা এক বিস্ময়কর রায় কিংবা চারটি রায়ের একটা সেট। বিচিত্র উপায়ে ২৫ বছর আগে শুরু হয়ে এ দীর্ঘ লড়াই বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছে। দিল্লি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের ভেতর চালাচালি হয়েছে এবং গুরুত্বের ভিত্তিতে বিচারের লক্ষ্যে দিল্লি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ২০০৯ সালের মানবিক ও যুক্তিবান দিল্লি হাইকোর্টের শাহ ও মুরালিধরনের রায় সিংভি ও মুখোপাধ্যায়ের ১১.১২.১৩ তারিখের রায়ে নাকচ হয়ে যায়; এ তারিখটা কিঞ্চিৎ কুখ্যাতির সঙ্গেই আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যাবে। সুপ্রিম কোর্ট বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠিয়ে একে শোধরানোর চেষ্টা করে...বহু বছর ধরে এ লক্ষ্যে যারা সংগ্রাম করেছেন— আইনবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট, সংশ্লিষ্ট সব নাছোড় এবং সাহসী মানুষসহ আবেদন দাখিলকারী পাঁচ ব্যক্তি— তারা বিপুল প্রশংসার দাবি রাখেন।
তবে আমি বলব বেঞ্চের পাঁচজনই সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বের দাবিদার। বিচারপতি চন্দ্রচুধের রায় সবচেয়ে ইঙ্গিতবহ এবং আমি বলব, প্রধান বিচারপতির রায় (বিচারপতি খানউইলকার যাতে সায় দিয়েছেন), বিচারপতি নরিমান ও বিচারপতি মালহোত্রার রায় নিজস্ব গুণ বিচারে উল্লেখযোগ্য এবং মামলার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে।...
আমি যদি ঠিকমতো মনে করে থাকি, একাধিক রায় আম্বেদকারিতে নীতিমালার অধীনে ভারতীয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্তিকরণের কথা বলেছে। আমার কাছে অন্তর্ভুক্তিবাদ, ভ্রাতৃত্ববোধের ধারণায় অবশ্যই অন্য ধর্ম, বর্ণ, ভাষাগোষ্ঠী ও ভারতের উপজাতি জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মানও ধারণ করতে হবে।
আপনি উপজাতি, বিশেষত মধ্য ভারতের উপজাতিদের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, সেটির ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ।
ছত্তিশগড়ে সময় কাটিয়েছি আমি, অন্যান্য জায়গায়ও ছিলাম। স্পষ্ট করে বললে, ভারতের উপজাতি জনগোষ্ঠী সব দিক থেকেই আমার-আপনার মতো এ দেশেরই নাগরিক, ডেভিড। কিন্তু ওদের জীবন ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। ৭ থেকে ৮ শতাংশ মানুষ উপাজাতি হলে প্রায় ১০০ মিলিয়ন মানুষ দাঁড়ায়, মানে ১০ কোটি ভারতীয়। লোভের কারণে ভূমিগ্রাসের এক খেলায় ওদের ঘঁটি বানানো হচ্ছে। আর ক্ষমতার জন্য সংখ্যার বিচারের খেলায় ঘুঁটি। শেষের ক্ষেত্রে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা কিংবা আপনার ধর্মীয় গোষ্ঠীর আকার বাড়ানোই আসল। এখন ক্রিশ্চান মিশনারি, হিন্দু মিশনারি সবাই সংস্কৃতায়ন বা গসপেলায়নের লক্ষ্যে ওদের জীবনধারা, একেবারে শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান পর্যন্ত ওদের বিশ্বাসকে অবনমন করছে। কিন্তু আরো খারাপ কথা ভূমিগ্রাস। ওদের জমি কেড়ে নেয়া হচ্ছে, পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে এবং পবিত্র স্থানগুলো অপবিত্র করা হচ্ছে স্রেফ প্রলোভনের কারণে। যেন কয়লা বা বক্সাইট জামা মসজিদ বা কাশী বিশ্বনাথ কিংবা স্বর্ণমন্দিরের নিচেই আবিষ্কার করতে হবে এবং মনে করতে হবে যে ওসব ভেঙেচুরে ফেলার স্বাধীনতা আমাদের আছে...।
ওদের গ্রামগুলো পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, সুদূরের বিভিন্ন শিবিরে দল বেঁধে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে ওদের, প্রায়ই মাওবাদী আর বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার অপরাধে অভিযুক্ত করে কারারুদ্ধ করা হচ্ছে, তারপর বছরের পর বছর বিনা বিচারে আটকে রাখা হচ্ছে। আর এখন যারা এদের সাহায্য করতে চাইছেন তাদের বিরুদ্ধেও সহিংস মাওবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ আনা হচ্ছে। যেমন ধরুন, সুধা ভরদ্বাজের মতো একজন। তিনি ভালো মানুষ, দুর্গতদের সহায়তায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে খুবই হাস্যকর বানোয়াট অভিযোগ তোলা হয়েছে। আমাদের দেশে এমনটি চলতে দিতে পারি না। আমরা আমাদের দেশের উপজাতি নাগরিক এবং যারা তাদের সাহায্য করতে চাইছেন, তাদের জীবিকা এবং অনেক সময় জীবন নিশ্চিত হওয়ার আগে প্রতিটা মামলা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে পারি না।
শেষ প্রশ্ন। কিছুদিন আগে আপনি ধারাবাহিক কাহিনী রচনার একটা পরিকল্পনা দেখিয়েছিলেন আমাকে, যেখানে আ সুইটেবল বয় এবং আ সুইটেবল গার্লও অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং একসঙ্গে নাম হবে আ ব্রিজ লিভস। আমার মনে হয়, আপনি একে গঙ্গার ওপর বিছিয়ে থাকা এক বিরাট পিপুল গাছের শাখা হিসেবে কল্পনা করেছেন। এখনো কি ভাবনাটা আপনার মনে আছে?
হ্যাঁ, সত্যি, কেবল মনে নয়, আমার কলমের ডগায়ও আছে! কাজ এগোচ্ছে বলে এ নিয়ে খুব বেশি কিছু বলতে চাই না। তবে এমন কিছুই হচ্ছে এটা। আ সুইটেবল বয় এবং আ সুইটেবল গার্লের মাঝখানে লম্বা সময়ের ফারাক রয়ে গেছে। প্রথমত, এখন আমি আরো ৩০ বছর বুড়িয়ে গেছি এবং দ্বিতীয়ত, ২০ বছর বয়সী লতা যে সময়কালে বাস করত— আসলে এটা কেবল লতার কাহিনী নয়, লতা ও মানের কাহিনী— আর এখন ৮০ বছর বয়সের লতা যে সময়ে বাস করছে, তার ভেতর ৬০ বছরের ব্যবধান। গার্ল লিখতে গিয়ে আমি দেখলাম নিজের জন্য কয়েকটা সিঁড়ি দরকার, যাতে মাঝের সময়ে বিভিন্ন চরিত্রের বেলায় কী ঘটেছে বুঝতে পারি।
তাই মনে মনে ষাটের দশকের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ঘিরে একটি, আবার সত্তরের দশকে সেই জরুরি অবস্থার সময় ফেরারি মানের বন্দি হওয়া এবং মানুষের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের রায়কে বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের ভীষণ সাহসী রায় দেয়ার পরের ঘটনা নিয়ে এক ধরনের নভেলা বা সংক্ষিপ্ত উপন্যাস নির্মাণ শুরু করি। তো এটা হলো সত্তরের দশক। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে ছিল আশির দশক: এক শিখ অফিসার ট্রেনে কলকাতা থেকে দিল্লি যাচ্ছেন। মাত্র একদিনের ব্যাপ্তিতে পুরো ঘটনা। দাদা-দাদি হিসেবে লতা ও মান এবং ওদের দায়িত্ববান আর দায়িত্বহীন সন্তানসহ নব্বইয়ের দশক, বেশ বড় উপন্যাসিকা, মাত্র একদিন নয়, বরং পুরো একটা দশক নিয়ে; এবং সব শেষে বর্তমান শতকের প্রথম দশক ২০০০-০৯-এর পটভূমিতে আ সুইটেবল গার্ল-এর ঠিক আগের সময়কে নিয়ে: এটা একটা প্রেমকাহিনী, যেটি নিয়ে কিছু বলব না, খুবই নিবিড় প্রেমের গল্প। এ পাঁচটি নভেলার কথা চিন্তা করায় সন্তান, পৌত্র-পৌত্রী, উত্তেজনা, উন্মত্ততা, বিভিন্ন বছরের পরিক্রমায় ভারতের বদলে যাওয়া উপলব্ধিতে কাজে এসেছে। সব শেষে দুটি ছোটগল্পের বই স্থির করেছি, একটি একেবারের সূচনার দিকে (বয়-এর আগে), এটার নাম ইনিডিপেনডেন্স (অতীত থেকে রসদ নিচ্ছে এটা) এবং অন্যটি সব শেষে (গার্ল-এর পর), এটার নাম অবলিভিয়ন (যেটা ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে)। তবে অবলিভিয়নকে হতাশার চোখে দেখি না, বরং অনেকের মতো আশীর্বাদ এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নির্বাণ মনে করি।
[ঈষৎ সংক্ষেপিত]






