গত ৬, ৭, ৮ ডিসেম্বর ব্যাকআর্ট ফাউন্ডেশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সম্প্রসারণ ভবনে উদযাপিত হয় ব্যাকআর্টের প্রজেক্ট ‘আরবান আওয়ারস থ্রি’। এর আগে আরবান আওয়ারসের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজেক্ট হয় ২০১৪ ও ২০১৫ সালে। এবারের প্রজেক্টে অংশ নেন ৩৩ জন শিল্পী। এর মধ্যে ৬ ও ৭ তারিখ শিল্পীরা যে যার মতো স্পেস নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন। ৮ তারিখ ছিল ওপেন স্টুডিও, যা সবার জন্য উন্মুক্ত।

ব্যাকআর্ট ফাউন্ডেশন শুরু করেন শুভ সাহা, ছবি জুলফিকার, উমা মন্ডল ও বিপ্লব বিপ্রদাস। আরবান আওয়ারসের প্রথম প্রজেক্ট দিয়ে তাদের শুরু। পরবর্তীতে এতে যুক্ত হন জুয়েল এ রব, সানজিদ মাহমুদ ও আরো অনেকে।

শিল্প এখন আর গ্যালারির চার দেয়ালের মধ্যে আটকে নেই। এটি এখন জনমানুষের খুব কাছে চলে এসেছে। শিল্পীরা একে নিয়ে এসেছেন উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। এতে শিল্পী ও জনমানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে শিল্পের সেতুবন্ধন। শিল্প উপস্থাপনের ভাষাও এখন বেশ বদলে গেছে। শিল্পীরা গতানুগতিক ধারার বাইরে চিন্তা করছেন। হাতের কাছে যা পাওয়া যায়, তাই দিয়েই শিল্প নির্মাণ করা যেতে পারে। কিংবা কোনো কিছু ছাড়াই শুধু শরীরের ভাষা দিয়ে উপস্থাপিত হচ্ছে শিল্প। আবার শিল্পীদের ভাবনায়, শিল্পসত্তা রয়েছে প্রতিটি মানুষের মধ্যেই। তাকে জানান দেয়াও একজন শিল্পীর দায়িত্ব মনে করছেন কেউ কেউ। সে রকম কিছু চিন্তা থেকে এবারের প্রজেক্টটি কিউরেট করেছেন শুভ সাহা। ব্যাকআর্ট ফাউন্ডেশন ও আরবান আওয়ারস থ্রি নিয়ে কথা বলেন তিনি—

‘ব্যাকআর্টের শুরু ২০১৩ সালের শেষের দিকে। তখন শুরু হলেও এর কাজ শুরু হয় ২০১৪তে; জানুয়ারিতে একটা পারফরম্যান্স ওয়ার্কশপের মধ্য দিয়ে, ব্যাকআর্টের নাম উহ্য রেখে। ২০১৪-এর শেষের দিকে আরবান আওয়ারস প্রজেক্ট দিয়ে ব্যাকআর্টের ব্যানারে এর যাত্রা শুরু। আরবান আওয়ারস করার পর ২০১৫তে আমেরিকার ক্যানসাসে আমরা একটা প্রেজেন্টেশন দিই এবং এক্সিবিশন করি। এ বছরের সেপ্টেম্বরে আমাদের এক্সিবিশন ছিল তাইওয়ানে। তাইওয়ানে একটি বড় ফেস্টিভ্যাল হয়। ওখানে তারা বাংলাদেশ থেকে বৃত্তকে আর আমাদের ইনভাইটেশন দেয়। এছাড়া সায়েন্স মিউজিয়ামের সঙ্গে একটা কলাবোরেশনে কাজ করেছি নেটিভ মিথ সেকেন্ড সিজনে। অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কলাবোরেশনে কাজ করি নেটিভ মিথ থার্ড সিজনে।  ব্যাকআর্টের মূল প্রজেক্ট আসলে নেটিভ মিথ নিয়ে কাজ করা। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে, বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব নেটিভ মিথ আছে, সেই মিথলজিগুলোকে ফাইন্ড আউট করে তা রিসার্চের জন্য আর্টিস্টদেরকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে লোকাল আর্ট বা ট্রেডিশনাল আর্টকে কনটেম্পোরারি আর্টে ব্যাক করাই ব্যাকআর্টের মূল উদ্দেশ্য। ২০১৭তে ব্যাকআর্ট ফাউন্ডেশন থেকে ঢাকা লাইভ আর্ট বিয়েনাল করি। এটা ছিল বাংলাদেশের প্রথম সবচেয়ে বড় পারফরম্যান্স ফেস্টিভ্যাল। দেশের আর্টিস্টদের পাশাপাশি বাইরের অনেক আর্টিস্ট এতে অংশ নেন। এটি বিয়েনাল ফর্মে দুই বছর পরপর হয়ে থাকে। আগামী জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো হতে যাচ্ছে লাইভ আর্ট বিয়েনাল। এতে বাইরের ৩০ এবং বাংলাদেশ থেকে ২০ জন শিল্পী অংশগ্রহণ করবেন। ২৫টি দেশের শিল্পীরা এতে অংশগ্রহণ করবেন। এছাড়া বিয়েনালকে কেন্দ্র করে একাধিক পারফরম্যান্স আর্ট ওয়ার্কশপ থাকছে।

আরবান আওয়ারস থ্রি নিয়ে বলার আগে বলে নিই, আমাদের প্রজেক্টে অংশগ্রহণকারীরাই মূল অর্গানাইজার। আমরা চেষ্টা করি আমাদের কোনো কর্তৃত্ব জাহির না করতে। আর্টিস্টদের কতভাবে ইনভলব করা যায়, সেটাই আমাদের প্রচেষ্টা। আরবান আওয়ারস অর্থ শহরের সময়গুলো। আমরা শহরে বসবাস করি। তাই শহরকে নিয়ে আমাদের যত ভাবনা, শহরকে আরো কতটা জীবনমুখী করা যায়, আমাদের ভাবনাটা সেদিক থেকে। আর্টের মধ্য দিয়ে আমরা এ ভাবনাটা প্রকাশ করতে চাই। এখান থেকে অডিয়েন্স কোনো সাজেশন পাবে বা কোনো অ্যাডভাইস পাবে অথবা দেখে নিছক শান্তিই পেল। ওই চিন্তা থেকেই আমরা আর্টিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। যেমন তাদের আর্টগুলো যাতে বেশি ইন্টারেক্টিভ হয়, খুব সহজেই দর্শকের কাছে পৌঁছানো যায়। আমরা মূলত কমিউনিটিভিত্তিক কাজে ফোকাস করি, যাতে কমিউনিটি ডেভেলপ হয়। আমরা মনে করি কমিউনিটির উন্নয়ন ছাড়া লোকাল আর্ট সিনে উন্নয়ন সম্ভব না। সে কারণে আমরা কমিউনিটিকে নিয়ে কাজ করার চিন্তা করি সবসময়। আমাদের আর্টগুলো তাই পাবলিক আর্ট হয়। আমাদের প্রজেক্টগুলো হয় পাবলিক বেইজ আর্ট প্রজেক্ট। আর্টগুলোও ইন্টারেক্টিভ হয়। পাবলিকের ইন্টারেকশন থাকে অনেক বেশি। এবারের প্রজেক্ট কিউরেট করতে গিয়ে আমার প্রথমেই যেটা মনে হয়েছে, শহর থেকে একটা দল কাজ করবে, যারা পুরোপুরি শহুরে। শহরের ধুলাবালি, যানজট, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে অতিবাহিত করতে হয় তাদের প্রতিটি দিন। সেখান থেকে তিনটি দিন তারা কাটাবে সম্পূর্ণ  প্রকৃতির মাঝে। যেখানে কোলাহল নেই, ধুলা নেই, সম্পূর্ণ ইকো সিস্টেমে ভরপুর। সে জায়গায় গিয়ে তারা কীভাবে নিজেদের আবিষ্কার করবে। তারা যদি শহরের মতোই ম্যাটারিয়ালিস্টিক চিন্তা করে বা শহর থেকে কিছু ম্যাটারিয়াল নিয়ে গিয়ে ওটাকে ভিত্তি করে শিল্পকর্ম করার কথা ভাবে, সেদিকে আমরা ফোকাস করিনি। আগে স্পেস থেকে কতটুকু নেয়া যায়। তারপর আর্টের প্রয়োজনে কিছু অংশ হয়তো সাবসিডি হিসেবে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু মূল বিষয় থাকবে স্পেস। স্পেসটাকে প্রাধান্য দিয়ে সবাই কাজ করার চেষ্টা করেছে। স্পেস থেকে সংগ্রহ করা উপাদান দিয়ে আমরা কিছু করব, এটাই মূল বিষয় ছিল। আসলে আমাদের ভাবনা এমন ছিল না যে, এ তিনদিনে কেউ ভালো কোনো শিল্পকর্ম তৈরি করে ফেলবে। এখানে শিল্পীরা আসবে এবং তারা আর্টওয়ার্ক না করেও এখান থেকে কিছু আহরণ করে নিয়ে যাবে, যা হয়তো পরে তার কাজে লাগবে। কিন্তু ইতিবাচক দিক হলো, সবাই তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে কাজ করেছে।’&dquote;&dquote;

শুভর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমরা এগোতে থাকি। সম্প্রসারণ ভবনের গেট দিয়ে ঢোকার শুরুতেই দেখা যায় শিল্পীদের বেশকিছু শিল্পকর্ম। গেট দিয়ে ঢুকে ভেতরে নানা দিকে ছড়িয়ে আছে আরো অনেক শিল্পীর কাজ। অধিকাংশ আর্টওয়ার্কই ছিল ইনস্টলেশন। এছাড়া ছিল পারফরম্যান্স আর্ট। কথা হয় কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে।

গেটের বাইরে শুরুতে ছিল জাহিদ হোসেনের শিল্পকর্ম। জাহিদ বলেন, ‘আমার কাজের নাম ড্রিম ক্যাচার। বাংলায় যদি বলি স্বপ্নধরা বা স্বপ্নজাল। আমরা সবাই স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। আমরা সেই স্বপ্নের জাল বুনতে থাকি প্রতিনিয়ত। এখানে আমি বোঝাতে চাচ্ছি উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন। একটা সাকসেস হলে আরেকটা সাকসেসের পেছনে আমরা দৌড়াই। আমার মূল জায়গাটা ছিল, আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একদিক থেকে আমরা যতটাই দিনে দিনে উন্নত হচ্ছি, ততটাই আবার পরিবেশ বা অন্যান্য দিক দিয়ে ধ্বংস করে ফেলছি নিজেকে বা আটকে যাচ্ছি। অর্থাৎ নিজেরাই নিজেদের বন্দি করে ফেলছি। সেই বন্দিদশাটাও একদিক থেকে বলা কাজের মাধ্যমে।

আমি কিছু মরা ডাল একত্র করে সুতো দিয়ে পেঁচিয়ে একটা জাল বোনার মতো করেছি। আমি যেমন নিজে থেকে নাম দিয়েছি ড্রিম ক্যাচার বা স্বপ্নজাল। তেমনি এটার পাশ দিয়ে যে মানুষগুলো যাচ্ছিল, তারা বলাবলি করছিল এটা মাকড়সার জাল। তারা এক রকম তাদের মতো করে রিলেইট করতে পেরেছে বিষয়টা। তো সেই সুতোর ফাঁকে ফাঁকে ভোরের শিশির জমে সেখানে রোদ পড়ে একটা চকমকে বিষয় তৈরি করেছে। আমাদের স্বপ্ন থাকে ঝকঝকে, পরিশীলিত। আমাদের তথাকথিত আধুনিকতা বলতে যা বোঝায়, সেই মডার্ন হতে গিয়ে, সেই স্বপ্নের জাল বুনতে গিয়ে আমরা নিজেকে ধ্বংস করছি। আমরা নিজেদের প্রয়োজনে গাছ কেটে ফেলছি, মাটি কেটে ইট বানানো হচ্ছে বা কারখানা বানাচ্ছি। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে বিলাসিতা না করলেও হয়। আবার যেমন আমার কৃত্রিম পণ্য ব্যবহার না করলেও হয়। আমি হয়তো প্রাকৃতিক জিনিস দিয়েই আমার প্রয়োজন মেটাতে পারি। কিন্তু মডার্ন হতে গিয়ে আমরা আর্টিফিসিয়াল হয়ে যাচ্ছি। অথচ সবকিছু ঠিক রেখেই সুন্দর জীবনযাপন করা সম্ভব। আমার মনে হয় শুধু শিল্পীরা নয় সমাজের সব সোসাইটির মানুষ যখন বুঝতে পারবে, আমরা স্বপ্ন দেখব মডার্ন হব, সব কিছুই করব কিন্তু আমাদের পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে নয়। যতটা পারি প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রেখে নিজেরা এগোব। এটা যদি সবাই বুঝতে পারে, সেখানেই আমার কাজের সার্থকতা।’&dquote;&dquote;

গেটের কাছাকাছি ছিল রামিজ সাহির একটি শিল্পকর্ম। বলা যায় এ প্রজেক্টের উদ্দেশ্যগত দিক দিয়ে সফল একটি কাজ। এটি অনেক বেশি দর্শকের সঙ্গে ইন্টারেকশন করে। রামিজ বেশকিছু মরা ডাল দিয়ে বেশ দক্ষ হাতে একটা মানুষের ফিগার তৈরি করে সেটা বসিয়ে দেয় একটি বেঞ্চে। দর্শক সহজেই এ কাজের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারেন। দর্শকদের দেখা যায় বেশ আনন্দ নিয়ে পাশে বসে ছবি তুলতে, চারপাশ দিয়ে ঘুরেফিরে দেখতে। শিল্পের ছোঁয়া মানুষের চোখে-মুখে।

সম্প্রসারণ ভবনটি আগে ছিল ছাত্রাবাস। এর অধিকাংশ কক্ষ এখনো পরিত্যক্ত অবস্থায়। ফলে শিল্পীরা খোলা স্পেস ছাড়াও বিভিন্ন রুম নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পান। রুমেই স্পেস তৈরি করে নেয়। একটি রুমে পারফরম্যান্স করে একজন সমসাময়িক শিল্পী। তার এ কাজ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশ সাহসী উদ্যোগ বলতে হবে। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে সে তার বক্তব্য প্রকাশ করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ শিল্পী বলেন, ‘আমার ইনার ফিলিংস থেকে আমি কাজগুলো করি। আমাদের অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। এটা হতে পারে সামাজিক, পারিবারিক বা ধর্মীয়। ধর্মীয় বলতে আমি নিজে ধর্ম বিশ্বাস করি। কিন্তু এর অনেক কট্টর দিক আছে। শরীরকেন্দ্রিক মানসিক কট্টরতা। এ কট্টরতা আমাকে অস্বস্তি দেয়। আমি আগেও এ ধরনের কাজ বেশকিছু করেছি। আমার কাছে মনে হয়, শারীরিক নগ্নতা আসলেই নগ্নতা কিনা, সেটা একটা ব্যাপার। মানসিকভাবে আমরা একটা পর্দা দিয়ে রাখি চোখের সামনে। এ পর্দাটা যখন সরে যায়, তখন বিষয়টা খুব স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমি কাজগুলো করতে গিয়ে দেখেছি দর্শক হয়তো প্রথমে বিচলিত হয়, কিন্তু একটা পর্যায়ে তারাও বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেয়। তাদের কাছে নুড আর ন্যাকেটের পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা শরীরকেন্দ্রিক চিন্তা করি। আমাকে একটা আবরণ হয়ে থাকতে হবে বা আমাকে সুন্দর দেখাতে হবে। অথচ সবচেয়ে আগে আমার শরীর, সেটাই সত্য।

গেট দিয়ে ঢুকে নানা কাজের মধ্যে চোখে পড়ে মেহেদি মাসুদের কাজ। মরা পাতার একটা লাইন গাছ থেকে ঝুলে মাটিতে এঁকেবেঁকে গেছে অনেক দূর। কাজ নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। আমরা মানুষ, আমরা মানুষ হয়েও প্রকৃতিকে সবসময় কন্ট্রোল করার চেষ্টা করি। প্রকৃতিকে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করি। একটা গাছ, তার স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠার কথা। কিন্তু গাছটাকে কেটেকুটে ডালপালা ছেঁটে আরো সুন্দর করার চেষ্টা করি। গাছ তো এমনিই সুন্দর। এটাকে কেটে আরো সুন্দর করার কি দরকার। এটার কারণ হিসেবে বলা যায়, মানুষ সবকিছুকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার, নিজের মতো করে সাজানোর চেষ্টা করে। আমার কাজের মধ্য দিয়ে আমি বোঝাতে চেয়েছি মানুষ তার আশপাশের সব কিছুকেই তার মতো করে দেখতে পছন্দ করে। সেটা গাছ হোক, সেটা অন্য একটা মানুষ হোক বা যা কিছুই হোক, মানুষ সবকিছুকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে। আমার মনে হয়, মানুষের এ প্রবৃত্তি থেকে বের হয়ে আসা উচিত। সবাইকে তার মতো চলতে দেয়া উচিত। প্রকৃতিকেও তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যেতে দিতে হবে।&dquote;&dquote;

ডানে একটা ছাল খসে যাওয়া গাছে সাপ্টে আছে বেশকিছু ম্যাটারিয়াল। কোথাও পুঁথি, কোথাও ভাঙা চুরি, অব্যবহূত প্লেট, এটা-সেটা আরো অনেক কিছু। তাহমিনা হাফিজ লিসার কাজ এটা। প্রথম দুদিনের পুরো সময় দেখা গেছে তিনি ভার্সিটির স্টুডেন্ট বা বাইরে থেকে আসা নানা জনের কাছ থেকে তাদের ব্যবহার করা কোনো জিনিস অথবা কিছু না থাকলে একটা চিরকুট সংগ্রহ করছেন। সেগুলো দিয়েই রঞ্জিত করেছেন গাছটিকে। তিনি বলেন, ‘আমরা যে জীবনযাপন করি, এ জীবনে একটা ওভারল্যাপিংয়ের গল্প আছে। সেটা কখনো প্রকৃতিকে, কখনো রিলেশন, কখনো নিজেকে নিজে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বিভিন্ন ওভারল্যাপিংয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের জীবনযাত্রা এগোতে থাকে। বাস্তবতাই এমন। এর যেমন কিছু নেগেটিভ প্রভাব থাকে, কিছু পজেটিভ প্রভাব থাকে। এসব প্রভাব নিয়েই মূলত কাজ করা। কাজটা খুব সিম্বলিক পথে করা। যেমন আমার কাজে যে উপাদানগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো একেকটা মানুষের প্রতীক। এগুলো সবই একেকটা মানুষ থেকে সংগ্রহ করা। এখানে সেই মানুষের প্রতীক হিসেবে, তার উপস্থিতি হিসেবে ওই জিনিসগুলো ওখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই যে এত মানুষের এত ধরনের স্মৃতি, তাদের উপস্থিতি। এ উপস্থিতিটা যদি একক ধরি প্রকৃতিকে, এ প্রকৃতিকে ওভারল্যাপিং করে করেই আমরা এগোচ্ছি। আবার শুধু প্রকৃতিই না, আমরা আমাদের টিকে থাকার জন্য সবকিছুকেই ওভারল্যাপিং করছি। সামগ্রিক দিক মিলিয়ে এ কাজটা উপস্থাপন করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ব্যাকআর্টের আরবান আওয়ারস থ্রি বেশ সফল একটি প্রজেক্ট ছিল। সমসাময়িক শিল্পীদের পাশাপাশি অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষানবিশ শিল্পী। এ প্রজেক্টের মাধ্যমে নতুন শিল্পীরা আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পেরেছেন। তারা চিন্তার নতুন খোরাক পেয়েছেন। তাদের প্রায় অনেকেরই একাডেমিক ধারার বাইরে এটাই প্রথম কাজ। সেদিক থেকে তাদের চেষ্টাটাকে বেশ সফল বলতে হবে। তাদের কাজে যথেষ্ট এফোর্ট দেয়ার চেষ্টা চোখে পড়ে। যদিও কনটেম্পোরারি আর্টে প্রকাশের ভাষা এখন অনেক বদলে গেছে। কনটেম্পোরারি আর্টে ‘লেস ইজ মোর’ বলে একটা কথা এখন প্রচলিত। অর্থাৎ কত অল্পতে মূল বিষয়টা বোঝানো যায়। সেখানে কিছুটা ঘাটতি ছিল। অনেকের কাজ অনেক বেশি ন্যারেটিভ। অনেক অনেক গল্প উঠে এসেছে কাজে। এর মধ্যেই কেউ কেউ একক কাজ না করে কলাবোরেশনে কাজ করার সাহস দেখিয়েছেন, যা প্রশংসনীয়। 

পাশাপাশি দর্শকরাও নতুন ধরনের কাজের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছেন। তারা অনেক সময় উদ্দীপনা নিয়ে সরাসরি শিল্পীর কাজে সহযোগিতা করেছেন। দর্শক শুধু চোখে দেখেই ক্ষান্ত হননি। শিল্পীদের সঙ্গে তাদের কাজের বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলার আগ্রহ দেখিয়েছেন। শিল্পী ও দর্শকের সমন্বয়ে সার্থক একটি প্রজেক্ট ছিল আরবান আওয়ারস থ্রি।