রবার্ট ডি নিরোর হলিউড গ্যাংস্টার মুভি ‘আ ব্রঙ্কস টেল’ (১৯৯৩)-এ এক মাস্তান বস তার কারাগার জীবনের একটি কাহিনী শোনাতে গিয়ে বলেছেন সে সময় তিনি ম্যাকিয়াভেলির দ্য প্রিন্স বইটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছেন। ইতালির যে প্রিন্স এর উদ্দেশ্যেই তিনি তার রাষ্ট্রদর্শনের এ অভিসন্দর্ভ লিখে থাকুন না কেন বইটি লেখার ৪৮০ বছর পর একজন গ্যাংস্টার সাগ্রহে তা পাঠ করেছেন জানলে ম্যাকিয়াভেলি খুশিই হতেন। একদা নিষিদ্ধ এই বইয়ের ভাষ্য অনুযায়ীই যে ব্যবহারিক রাষ্ট্রদর্শন আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাঠামো গড়ে উঠেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

সফল শাসক হতে হলে প্রিন্সকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে শৃগাল ও সিংহের কাছ থেকে। ফাঁদ শনাক্ত করবে শৃগাল আর নেকড়েকে সন্ত্রস্ত করে তুলতে সিংহ—কেবল সিংহের চরিত্রে অভিনয় করে যাওয়া ভীষণ বোকামি। ম্যাকিয়াভেলির কয়েকটি উদ্ধৃতিই তার অভিজ্ঞতার বিস্তৃতি ও অনুধাবনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে:

 

l একজন শাসকের বুদ্ধিমত্তা পরিমাপ করতে হলে তার চারপাশের লোকজনকে দেখুন।

l কোনো কাজ না করে আফসোস করার চেয়ে কাজটা করে পস্তানোও ভালো।

l যে সরকার তার নাগরিককে সশস্ত্র করতে ভরসা পায় না, সে সরকারের নিজের ওপরই বিশ্বাস নেই।

l সিংহ নিজেকে ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে পারে না আর নেকড়ের বিরুদ্ধে শৃগাল অসহায়। কাজেই ফাঁদ চিনতে হলে হতে হবে শৃগাল আর নেকড়েকে আতঙ্কিত করতে হতে হবে সিংহ।

l অন্যের ষড়যন্ত্র খোঁজার আগে নিজের অযোগ্যতার কথা ভাবুন।

l রাজনীতির সঙ্গে নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক নেই।

l আমি নরকে যেতে চাই, স্বর্গে নয়। প্রথমটিতে আমি পোপ, বাদশাহ, প্রিন্সদের সান্নিধ্য পাব। শেষেরটিতে কেবল ভিক্ষুক, ধর্মপ্রচারক আর সাধু।

 

ম্যাকিয়াভেলিতে কী এসে যায়?

ম্যাকিয়াভেলির জন্ম ৫২২ বছর আগে। তিনি কি এখনো প্রাসঙ্গিক? তাকে বাদ দিলে কি এসে যায়?

এক কথায় জবাব: যদি দুই হাজার বছরের ইতিহাসে একজন বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক দার্শনিককে গণ্য করতে হয় তিনি হবেন ম্যাকিয়াভেলি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশের রাজনৈতিক দলের ইতিহাস, রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার ইতিহাস এবং ক্ষমতা ধরে রাখার ইতিহাস যদি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা যায় তাহলে ম্যাকিয়াভেলি কতটা সত্য বলেছেন তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনীতির সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা দিয়েছেন তিনি।

নৈতিকতার প্রশ্ন তুললে এক কথায় তাকে খারিজ করে দেয়া যায়, যদিও সবারই জানা ক্ষমতার রাজনীতিতে নৈতিকতাই সবার আগে নির্বাসিত হয়। ম্যাকিয়াভেলির নামের প্রথমাংশ নিককোলো। শয়তানকে স্নেহ করে ‘ওল্ড নিক’ বলা হয়। নিক নেয়া হয়েছে ম্যাকিয়াভেলির নামের প্রথমাংশ থেকে। ম্যাকিয়াভেলি যথেষ্ট রাজনৈতিক কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করেছিলেন। ফ্লোরেন্টাইন রিপাবলিকের সচিব হিসেবেও কাজ করছেন। অভিজাত মেডিসিরা যখন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হটিয়ে দিয়ে অভিজাত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করল ম্যাকিয়াভেলি গ্রেফতার হলেন নির্যাতিত হলেন, বিচার মোকাবেলা করলেন এবং গ্রামাঞ্চলে নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন। লরেঞ্জো দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের দৌহিত্র ক্ষমতাসীন তরুণ লরেঞ্জো দ্য মেডিসির অনুগ্রহ লাভের উদ্দেশ্যে লিখিত হলেও ম্যাকিয়াভেলি তার বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে পরিপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক সততার সঙ্গে ব্যবহারিক রাজনীতির গ্রন্থ দ্য প্রিন্স রচনা করেন ১৫১৩ সালে। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ১৫৩২ সালে।

এ গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য সাফল্যের সঙ্গে ক্ষমতা ধরে রাখা আর তা করতে লরেঞ্জোর মতো প্রিন্সকে সার্বক্ষণিক রাজনীতি সম্পৃক্ত থাকতে হবে। তিনি যদি ক্ষমতাসীন থাকতে চান তাহরে কল্পলোকের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নয়, তার রাজনৈতিক কার্যক্রম বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। কারণ বাস্তবতার সম্পর্কের বন্ধন হালকা হয়ে গেলে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি বেড়ে যাবে। প্রিন্স তার জনগণের ভালোবাসার রাজকুমার,  না ঘৃণার রাজকুমার—এ দুইয়ের মধ্যে তাকে শেষেরটাই বেছে নিতে হবে। তাকে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে এবং প্রজাদের কাজ থেকে সম্মান আদায় করতে হবে। আর তা করার এবং আদায়ের বিবেচনা শক্তি তার থাকতে হবে। তাকে হতে হবে ভার্চুয়াস। ম্যাকিয়াভেলির ভার্চুয়াস মানে সনাতন ন্যায়পরায়ণ নয়, বরং উল্টোটা। এর মানে প্রয়োজনে অনৈতিক হয়ে উঠতে হবে। শিয়াল ও সিংহের গুণে ভূষিত প্রিন্সের বাইরের ও ভেতরের চেহারা এক হওয়ার দরকার নেই। তাকে ধার্মিক, মানবিক ও সদয় মনে হলেও অন্তরে তিনি হবেন ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সর্বাধিক কুশলী মানুষ। রঙ বদলানো গিরগিটির মতো হবেন, যখন প্রয়োজন সুবিধেমতো রঙ বদলাবেন।

এখানে জোর দিয়ে বলা দরকার ম্যাকিয়াভেলি শয়তান—ইভিল ছিলেন না কিংবা কেবল শয়তানির জন্য দ্য প্রিন্স-এর প্রেসক্রিপশন প্রণয়ন করেননি। প্রিন্স কিংবা রাজা যাতে নিরুপদ্রব শাসন চালিয়ে যেতে পারেন সে জন্য তিনি এ সন্দর্ভ রচনা করেছেন।

দুর্ভাগ্যবশত ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ম্যাকিয়াভেলির বইটিকে রাজনীতি, প্রশাসন, দর্শনশাস্ত্রের গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা না করে তখনকার বুদ্ধিজীবী ও ধর্মতাত্ত্বিকরা অনৈতিকতাপ্রসূত একটি শয়তানের গ্রন্থ মনে করেছেন এবং ম্যাকিয়াভেলিকে অনৈতিকতা ও অমানবিকতা প্রচারের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। ‘লক্ষ্যই প্রক্রিয়ার যৌক্তিকীকরণ করে’—শক্তিশালী এ বাক্য বহু অশুভ পদক্ষেপকে এক ধরনের বৈধতা দিতে শুরু করে। তিনি প্রিন্সকে পরামর্শ দিয়েছেন, ‘হ্যাঁ, তোমাকে নির্দয় হতে হবে, কিন্তু নিছক নির্মমতার জন্য নির্দয় নয়; তোমার নির্মমতার কারণ পরিস্থিতির দাবি মেটাতে গিয়ে তুমি নির্মম হয়েছ।’

শয়তানকে যতই টানা হোক, তিনি শয়তানি নয়, প্রিন্সকে বাস্তবতার শিক্ষা দিয়েছেন। প্রিন্সকে মন্দ হতে হবে কিন্তু তা ‘বাই ডিফল্ট’ নয় বরং প্রয়োজনের তাগিদে। রাজনীতিবিদরা বাস্তবে ম্যাকিয়াভেলি চর্চা করলেও প্রকাশ্যে তা বলতে রাজি ছিলেন না। রাসেল সেজন্যই অনুরূপ রাজনীতিবিদ থেকে বুদ্ধিজীবী সবাইকে ভণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রানী প্রথম এলিজাবেথ ম্যাকিয়াভেলি প্রদর্শিত পথই অনুসরণ করেছেন, কিন্তু জনসমক্ষে তার বিরোধিতা করেছেন এবং তাকে শয়তানসুলভ বলে ঘোষণা করেছেন কিন্তু বিছানার পাশের টেবিলের ওপর প্রিন্সের একটি কপি বরাবরই রেখেছেন।

গণতন্ত্রের বুলি আওড়ানো জনসমর্থনহীন সব সরকারকেই টিকে থাকতে হলে ম্যাকিয়াভেলির ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী নিত্যকার কাজকর্ম করতে হয়। এ কালে ম্যাকিয়াভেলি সর্বাধিক প্রাসঙ্গিক।

ম্যাকিয়াভেলির চিন্তা বস্তুবাদী অনেক চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে। বিভিন্ন বিষয়ে ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান স্কুল অব থট’ বিশেষ প্রাধান্য লাভ করেছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে সুবিধা নেয়া ও শাসন দেখার অভিজ্ঞতা অনেকের হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে বারবার বলেছেন, বাইবেল তার গাইড বুক, ইতালির মাত্তেও সালভিনি খ্রিস্টীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বাইবেল ছুঁয়ে কসম কাটছেন, জপমালা চুমু খাচ্ছেন। ভোটের জন্য ধার্মিক সাজার রাজনৈতিক ছলচাতুরী বেড়ে যাচ্ছে। ম্যাকিয়াভেলিও দেখিয়েছেন জনতাকে নিজের দিকে টানতে রাজনীতিবিদ নিজে কী তা নয়, তিনি কী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপিত করেছেন সেটাই বড় কথা।

ঐতিহাসিক ম্যাকিয়াভেলি

তিনি ঐতিহাসিকও ছিলেন। ‘ডিসকোর্সেস অন লিভি’তে তিনি বলেছেন রাজনীতি বুঝতে হলে অতীতের দিকে তাকাতে হবে। দুটি প্রধান চরিত্রের কথা বলেছেন। রোমের পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতা রমুলাস একটি স্ত্রী-নেকড়ের কাছে লালিত হয়েছেন। রমুলাস তার ভাই রেমুসকে হত্যা করেছেন। সবার কাছেই এটা নির্মম ও ভয়ংকর মনে হতে পারে—ভাইকে কেন হত্যা করবেন?

ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন রেমুসকে মরতে হয়েছে রমুলাসের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে। সেটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাকে রোম শহরের গোড়াপত্তন করতে হবে। প্রথাগত নৈতিকতা নিয়ে চললে তার লক্ষ্য অর্জন ব্যর্থ হয়ে যাবে।

ম্যাকিয়াভেলির প্রাসঙ্গিকতা অনিবার্য। তিনি সাবলীল ভাষায় রাজনীতির পৃথিবী নিয়ে আলোচনা করেছেন, নৈতিকতা নিয়ে নয়—যখন শাসকের অস্তিত্বই প্রশ্নের সম্মুখীন তার নৈতিকতার গর্ব করার সুযোগ নেই। তাকে ষড়যন্ত্র করতে হবে, কিন্তু প্রতারণা তার সার্বক্ষণিক লক্ষণ নয়; যখন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন তখনই প্রতারণা লব্ধ সুফল নিজের জন্য ব্যবহার করা যাবে।

ম্যাকিয়াভেলিয়ান হলেই তাকে শয়তান হতে হবে ব্যাপারটা এমন নয়। ম্যাকিয়াভেলি নিজেও ম্যাকিয়াভেলিয়ান ছিলেন না।

ডিউক অব আরবিনো লরেঞ্জো দ্য মেডিসিকে উদ্দেশ করে সন্দর্ভটি লিখিত:

রাজত্বটি কেমন হবে? রোমান পদ্ধতি অনুসরণ শ্রেয় হবে।

১. নতুন দখল করা প্রিন্সডম হতে পারে, কিংবা লোকবসতির উপনিবেশ বা কলোনি যা উপযুক্ত মনে হয়।

২. তাদের ক্ষমতা বাড়তে না দিয়ে কম ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে।

৩. বিদেশী শক্তির সুনাম বৃদ্ধি প্রতিহত করতে হবে।

৪. ক্ষমতাশালী লোকজনকে শেষ করে দেয়া জরুরি।

স্বাধীন দেশ দখল করলে পরবর্তী কার্যক্রম কী হবে?

১. রোম যেমন কার্থেজ গুঁড়িয়ে দিয়েছিল তাই করতে হবে।

২. সেখানে গিয়ে তাদের সঙ্গে থাকতে হবে, ব্যক্তিগতভাবে শাসন করতে হবে।

৩. রাষ্ট্র অক্ষুণ্ন রেখে অলিগার্কি বা কতিপয় ব্যক্তির একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

‘ক্রিমিনাল ভার্চু’—অপরাধমূলক গুণাগুণের মাধ্যমে বিজিত দেশে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিশ্চিহ্ন করে ফেরতে হবে। ম্যাকিয়াভেলি দুটি অনুসরণীয় উদাহরণ দেন: অ্যাগাথোক্লেস সিরাকিউজের ‘প্রেটর’ হওয়ার পর শহরের অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ সবাইকে একটি বৈঠক ডাকেন। তার ইঙ্গিতে সেনাবাহিনী তাদের সবাইকে হত্যা করে। তাতে সিনেটর থেকে শুরু করে ধনবান নাগরিক—পুরনো অভিজাততন্ত্রের সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তিনি কোনো বিরোধিতার মোকাবেলা করেননি, ফলে আফ্রিকায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করার সুযোগ পান। ইতালির অলিভারোত্তো দ্য ফার্মো তার ক্ষমতাধর নিকটাত্মীয়সহ একটি ব্যাঙ্কুয়েটে উপস্থিত সব শত্রুকে ঘেরাও করে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু যথেষ্ট সতর্ক ছিলেন না বলে তিনিও একইভাবে নিহত হন।

জনগণকে নিজের পক্ষে আনতে হলে প্রতিকূলতা ভয় পেলে চলবে না, শিগগিরই সব ক্ষমতার অধিকারী হতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে শাসন করা যাবে না। জনগণের যখন একজন প্রিন্স প্রয়োজন তাকে সে সময়মতো আবির্ভূত হতে হবে।

নিজস্ব সামরিক বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো বাহিনীকে বিশ্বাস করা যাবে না। তাকে যুদ্ধকৌশল শিখতে হবে। সঠিক মিত্র বেছে নিতে হবে। মিত্র যদি লড়াইয়ে জিতে আপনার ক্ষমতা কম হোক, বেশি হোক আপনি লাভবান হবেন। আপনি যদি অধিক ক্ষমতাবান হন তাহলে মিত্র আপনার অধীনে থাকবে, যদি মিত্র অধিক শক্তিশালী হন তাহলে আপনার প্রতি তার দায়িত্ব রয়েছে মনে করবে। আর আপনার পক্ষ যদি হেরে যায় তাহলেও পরাজিতদের মধ্যে আপনার মিত্র থাকল। ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন অধিকতর শক্তিশালী কোনো শক্তির সঙ্গে প্রিন্সের মৈত্রী স্থাপন করা সমীচীন হবে না, তবে বাধ্য হলে ভিন্ন কথা। কোন অভিযান সবচেয়ে বেশি লাভজনক হবে আর কোনটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ তা নির্ধারণের মতো প্রজ্ঞাবান তাকে হতে হবে।

কর্মচারী নিয়োগের প্রশ্নে তিনি তিনটি শ্রেণীবিন্যাস দেখিয়েছেন:

১. যারা নিজে থেকে বিষয়টি বোঝেন তাদের নিয়োগ করা সর্বোত্তম।

২. যারা অন্যদের অনুসরণ করে বোঝেন তারা চলনসই।

৩. যারা নিজেরা বোঝেন না, অন্যের মাধ্যমেও না তারা পরিত্যাজ্য।

ভালো-মন্দের তফাত করার বুদ্ধিমত্তা প্রিন্সের থাকতে হবে। ইতালির যেসব প্রিন্স ব্যর্থ হয়েছেন রাজ্য হারিয়েছেন—এটাই তাদের নিয়তি ছিল যারা দাবি করেন—ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন তাদের দাবিটি ভুল। ‘কেউ আপনাকে টেনে তুলবে’—এমনটা যারা বিশ্বাস করেন এটা তাদের ভ্রান্তি। রাজ্যহারা প্রিন্সরা তাদের কোনো না কোনো ‘বাহু’র ত্রুটি ও দুর্বলতার জন্যই মার খেয়েছেন। জনগণ তাদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়েছে, তারা জানতেন না কেমন করে তাদের ক্ষমতা ও আসন বিপদমুক্ত রাখতে হবে।

প্রিন্সকে তার নাগরিক ও প্রজাদের ব্যাপারে উদারপন্থী হওয়া আবশ্যক। তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য প্রতারণামূলক বক্তব্য ও কাজ অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। জনসমর্থন পায়নি বলেই এর আগেকার একটি প্রজাতান্ত্রিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে। ফ্লোরেন্সের জনগণ গণতন্ত্রমনা এবং যুদ্ধবিরোধী জানার পরও ম্যাকিয়াভেলি প্রিন্সকে পরামর্শ দিয়েছেন যেন জনগণকে সশস্ত্র করা হয়। প্রিন্স যে শহর দখল করবেন তাকে সেখানেই অবস্থানের পরামর্শ দিয়েছেন। মেডিসিরা যে শহরের বাইরে প্রাসাদ বানিয়ে বসবাস করে তিনি এটা অনুমোদন করেন না, বিচ্ছিন্ন অবস্থানে থাকলে বিদ্রোহীরা সহজেই অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গ্রিন্সকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে।

প্রিন্সশাসিত রাষ্ট্র বা প্রিন্সিপালিটির চারটি ধরন তিনি নির্ধারণ করেছেন:

১. উত্তরাধিকারমূলে প্রাপ্ত, ২. মিশ্র-বর্তমান রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য রাষ্ট্র, ৩. নিজের ক্ষমতা/অন্যের ক্ষমতা/অপরাধমূলক কাজ/নির্মমতার মাধ্যমে প্রাপ্ত নতুন রাষ্ট্র এবং ৪. পোপশাসিত ক্যাথলিক রাষ্ট্র।

তার রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর প্রতি প্রিন্সের বিশেষ নজরদারি থাকতে হবে:

ক. ভাড়াটে সৈন্য বিপজ্জনক ও সবচেয়ে কম বিশ্বাসযোগ্য, খ. অন্য শাসকের কাছ থেকে লাভ করা সহযোগী বাহিনী—অক্সিলিয়ারি ট্রুপস বিপজ্জনক ও কম বিশ্বাসযোগ্য, গ. দেশী সৈন্য সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য ও সৈন্যবাহিনীর জন্য প্রত্যাশিত, ঘ. মিশ্র সৈন্যবাহিনী দেশী সৈন্যের চেয়ে কম নির্ভরযোগ্য।

প্রিন্সকে কেমন হতে হবে:

ক. যত না সদয় তার চেয়ে বেশি কৃপণ;

খ. যত না ক্ষমাপ্রবণ তার চেয়ে বেশি নির্দয়;

গ. কারো স্বার্থবিরোধী হলে প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেয়ে ভাঙাই শ্রেয়;

ঘ. নিজেকে ঘৃণ্য করে তোলা যাবে না, জনগণের শুভকামনাই তার জন্য সর্বোত্তম প্রতিরক্ষার বর্ম;

ঙ. সুখ্যাতির জন্য প্রিন্সকে বড় প্রকল্প হাতে নিতে হবে;

চ. চাটুকার নয় জ্ঞানী উপদেষ্টা নিয়োগ করতে হবে;

ছ. প্রিন্সের মধ্যে সিংহের সাহস ও শৃগালের ধূর্ততার সমন্বয় ঘটতে হবে;

জ. লক্ষণ নির্ধারণ করবে তার কর্মপদ্ধতি।

চোখ-কান যাদের খোলা তারা বেশ ভালো করেই দেখছেন ইতিহাসে যারা ক্ষমতাসীন হয়েছেন, ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল রপ্ত করেছেন তাদের সবাই ম্যাকিয়াভেলির ব্যবস্থাপত্র অনুসরণ করছেন।

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা