রেনেসাঁ পরবর্তী ফ্লোরেন্সের যে কয়েকজন লেখক অমর হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি অন্যতম। তিনি ইতালি সরকারের বিভিন্ন বড় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ফলে তার রাজনৈতিক তত্ত্বের বিরাট অংশ তার কর্ম-অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই রচিত। তার মহান কীর্তি ‘দ্য প্রিন্সে’র জন্যই তিনি বেশি সমাদৃত। বৃহৎ ইতালি রাজ্যের স্বপ্ন ও স্বদেশপ্রেম ম্যাকিয়াভেলিকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দর্শনের দিকে ধাবিত করেছে।

প্রায়ই রাষ্ট্রের নিন্দনীয় ও নীতিবিবর্জিত আচরণ নির্দেশ করতে ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান’ শব্দটি ব্যবহূত হয়। একজন ম্যাকিয়াভেলিয়ান নেতা তার নিজের ক্ষমতা স্থায়ী ও সুসংহত করতে নিকৃষ্টতম পন্থা অবলম্বন করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। ম্যাকিয়াভেলির দর্শন মতে, রাষ্ট্রই হচ্ছে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং সেদিক দিয়ে তা অন্য কোনো উচ্চতার ক্ষমতার অধীন হতে পারে না। মধ্যযুগে সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হতো পার্থিব ক্ষমতা হিসেবে রাষ্ট্রধর্ম, নৈতিকতা, ঐশ্বরিক আইন বা প্রাকৃতিক আইনের উচ্চতর ক্ষমতার অধীন। কিন্তু ম্যাকিয়াভেলি এসব ক্ষমতাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ঘোষণা করেন, রাষ্ট্রই হচ্ছে সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং তার ওপর কোনো উচ্চতর কর্তৃত্ব থাকতে পারে না। ম্যাকিয়াভেলি আরো বিশ্বাস করেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও সম্প্রসারণের জন্য যা কিছু অনুকূল তাই করতে পারে। এতে ধর্ম বা নৈতিকতা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না।

১৪৯৪ সালে ইতালিতে ষাট বছরের ‘হাউজ অব মেডিচি’র শাসনের অবসান ঘটে এবং প্রজাতন্ত্র পুনরায় চালু হয়। এর চার বছর পরই ২৯ বছর বয়সী ম্যাকিয়াভেলি ফ্লোরেন্সের সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। দীর্ঘ ১৮ বছর রিপাবলিকান দলের হয়ে সরকারের কূটনৈতিক ও সামরিক নীতিনির্ধারক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৫১২ সালে যখন নানামুখী চাপে ফ্লোরেন্টাইন সরকারের অবস্থা যখন টালমাটাল, তখন মেডিচি বংশ ক্ষমতা পুনর্দখল করে। তিনি চাকরিচ্যুত ও নির্বাসিত হন। সেইন্ট আন্দ্রিয়া শহরে ১৩ বছর অরাজনৈতিক জীবন কাটানোর পর ১৫২৫ সালে মেডিচিরা ম্যাকিয়াভেলিকে সরকারে যোগদান করার আহ্বান জানায়। ম্যাকিয়াভেলি সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে ফ্লোরেন্সে ফিরে সরকারি কাজে যোগ দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বটে, ম্যাকিয়াভেলি চাকরিতে যোগ দেয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় মেডিচিরা ক্ষমতা হারায়। এবার রিপাবলিকানরা এসে আজীবন রিপাবলিকান রাজনীতি করা ম্যাকিয়াভেলিকে চাকরিচ্যুত করে। সে বছরই অর্থাৎ ১৫২৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন ম্যাকিয়াভেলি। চার্চে পূর্ণ মর্যাদায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। ‘চার্চ অব ক্রস’-এ তাকে সমাহিত করা হয়। সমাধিতে তার সম্মানস্বরূপ লাতিন ভাষায় খোদাই করা আছে, ‘কোনো প্রশংসাই এই মহান ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট নয়।’

ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন একজন ঐতিহাসিক মর্যাদার রাজনৈতিক বিজ্ঞানী। তিনিই সর্বপ্রথম রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়ন না করে প্রকৃত রাজনৈতিক আচরণের প্রতি গভীর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মানুষকে দেখেছেন চিরন্তন অপরিবর্তনীয় চরিত্র হিসেবে। মানুষের মধ্যে লোভ, স্বার্থপরতা, প্রতারণা এসব বৈশিষ্ট্যকে ম্যাকিয়াভেলি দেখেছেন সহজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবে। বরং তার মতে, মানুষের এ নেতিবাচক স্বভাবগুলো সর্বদা তাদের ভালো কাজের উদ্যমকে দমিয়ে রাখে না। এ নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোকেই যদি যথাযথরূপে পরিচালিত করা যায়, তাহলে বরং সামাজিক উন্নয়নের পথ আরো সহজ হয়ে ওঠে। ফ্রান্সিস বেকন ১৬২৩ সালে লিখেছেন, ‘আমরা ম্যাকিয়াভেলি ও এই শ্রেণীর লেখকদের প্রতি খুব বেশি কৃতজ্ঞ, যারা অকপটে তুলে ধরেছেন মানুষ কী করে এবং তাদের কী করা উচিত নয়।’

রাজনৈতিক কর্মজীবন তার কাজকে খুব বেশি প্রভাবিত করেছে। তিনি রাজনৈতিক সাফল্যকে পন্থার চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিতেন। ‘দ্য প্রিন্স’ ও ‘ডিসকোর্সেস’-এ তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সমাজের ভালোর জন্য সাফল্য খুঁজে পেতে যেকোনো পন্থা অবলম্বনে উৎসাহিত করেছেন। তার কর্মময় জীবনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে তিনি নিজ আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি তার সবচেয়ে বিখ্যাত কর্ম, দ্য প্রিন্স (১৫১৩) রচনা করে ফ্লোরেন্টাইন শাসকের অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করেছিলেন। বইটির উৎসর্গপত্রে লেখা আছে, To the Magnificent Lorenzo di Piero de Medici. (দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট লরেঞ্জো ডি পিয়েরো দ্য মেডিচির প্রতি)

এই ‘লরেঞ্জো দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট’ একটি বণিক রাজপরিবারের প্রতিনিধিত্ব করতেন যাদের নীতিবাক্য ছিল ‘ক্ষমতা পাওয়ার জন্য অর্থ; অর্থ টিকিয়ে রাখার জন্যই ক্ষমতা।’ রাজনৈতিক আদর্শকে এমন নগ্নভাবে উপস্থাপন করার নজির খুব কমই আছে। দ্য প্রিন্সে ম্যাকিয়াভেলির মতে, রাষ্ট্রকে সবসময় যে ধর্ম ও নৈতিকতার পথ ধরে চলতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। ম্যাকিয়াভেলি অবশ্য মনে করেন, ধর্ম ও নৈতিকতার পথ অনুসরণ করে রাষ্ট্র যদি তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে, তবে তা হবে সর্বাপেক্ষা উত্তম। কিন্তু যেহেতু মানুষ প্রকৃতিগতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ, প্রতারক, লোভী ও হিংসুটে। কাজেই এ পথে চলে রাষ্ট্র কোনো দিনই তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে না। প্রতি পদক্ষেপে তাকে বাধাপ্রাপ্ত হতে হবে। সুতরাং ধর্ম বা নৈতিকতার কথা আদৌ চিন্তা না করে রাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য ‘যা কিছু অনুকূলে’ তাই করে যাবে। তার মতে, রাষ্ট্র যদি চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে পারে, মাধ্যম যতই নিচ বা ঘৃণ্য হোক না কেন অর্জিত সাফল্যই মাধ্যমের যৌক্তিকতা প্রমাণ করবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, লক্ষ্য মাধ্যমের যৌক্তিকতা বিধান করে, মাধ্যম লক্ষ্যের নয়।

তিন শতাব্দী পরে ডেভিড হিউম (১৭১১-১৭৭৬) স্বীকার করেছেন, একজন শাসক কখনই জনরোষের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। জনগণের দয়ায় যে শাসক হয়ে ওঠে, তার সবসময় সে বিশ্বাস ধরে রাখা উচিত। তাদের চাওয়া-পাওয়ার গুরুত্ব দেয়া, তাদের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে না যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অবশ্য নিপীড়িত না হওয়াই তাদের একমাত্র চাওয়া। শাসকের জন্য সৌভাগ্যজনক যে জনগণ সাধারণত এর চেয়ে বড় বা জটিল কিছু দাবি করে না।

একজন শাসক যখন ধর্ষকামী হয়ে ওঠে; তার প্রজাদের সম্পদে হস্তক্ষেপ করে, তখনই জনগণের ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠে। অতএব, তাকে এগুলো থেকে বিরত থাকা উচিত। যতক্ষণ না তাদের সম্পত্তি বা তাদের সম্মান স্পর্শ করা হয়, জনগণ সন্তুষ্টভাবে বাস করে। শাসককে তখন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোকাবেলা করতে হয়, যা অনেক উপায়ে এবং সহজেই সীমার মধ্যে রাখা যায়।

ম্যাকিয়াভেলি স্বীকার করেছেন একজন শাসক দরিদ্র অঞ্চলের চেয়ে একটি সমৃদ্ধশালী রাজ্যে খুব সহজেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারে। তাই জনসাধারণের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শাসকের প্রতি নির্ভরতা গড়ে তুলতে হবে। প্রজাদের কৃষি, বাণিজ্য ও অন্য সবকিছুর নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। কর চাপিয়ে দেয়া হবে, হালের গরু কেড়ে নেয়া হবে—এমন ভয় দেখিয়ে তাদের দমিয়ে রাখা যাবে না। যারা নতুন কর্মসংস্থান করতে চায় তাদের পুরস্কৃত করলে জনগণ শাসককে মহানুভব বলে স্বীকৃতি দেয়।

আজকের দুনিয়া যদি পরামর্শটি সর্বজনীনভাবে গ্রহণ করত, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট হতো। এবং আশা করা পৃথিবীর সর্বত্র দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হতো।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, অ্যাডাম স্মিথ ম্যাকিয়াভেলির অগ্রসর অর্থনৈতিক দর্শনকে খুব কমই অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। The Wealth of Nations গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন:

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে উৎপাদন ও বাণিজ্য দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। যে রাজ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত নয়, প্রজারা নিজেদের সম্পদ নিয়ে উত্কণ্ঠায় থাকে, যেখানে চুক্তির বিশ্বাস আইন দ্বারা সমর্থিত নয়, ঋণের বোঝা তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে, সেখানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা যায় না। প্রকৃত অর্থে যেখানে সরকারের ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা নেই, সেখানে বাণিজ্য ও উৎপাদন বিকশিত হতে পারে না।

তাহলে এতগুলো দেশ কেন টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে? এমনকি সমৃদ্ধ দেশগুলোও তাদের সামর্থ্যের আলোকে যথেষ্ট উন্নতি করতে পারেনি। এক কথায় বলতে গেলে, তাদের শাসকরা তাদের দেশের ভালোর জন্য খুব বেশি ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান’ শাসকরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। অনেকক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থকেই তারা বড় করে দেখেছেন।

ম্যাকিয়াভেলি, স্মিথ ও অন্যান্য মনীষীর প্রজ্ঞা থেকে শাসকরা জানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত করা। তবু যুদ্ধ বা ব্যক্তিস্বার্থে তারা এ অধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করেছে। বলতে গেলে শাসকদের হাতেই জনগণ লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে। জনগণের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার এবং ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি পালনের পরিবর্তে তারা জনগণের অধিকারকে অতিক্রম করেছে এবং প্রকারান্তরে নিজ রাজ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এ ধ্বংসাত্মক সুবিধাবাদকে দূর করার জন্য দার্শনিক, অর্থনীতিবিদরা উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছেন। শাসকদের কর্মকাণ্ডকে বৈধ কাজে সীমাবদ্ধ করা এবং সীমা অতিক্রম করলে শাস্তি লিখিত সংবিধান, সরকারি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা শাসকদের ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি’ দেয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করছেন। যেন একজন শাসকের নিজস্ব প্রণোদনা তার অর্থনৈতিক সামর্থ্যের আলোকে নির্ধারিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত এ বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতিকে সুরক্ষিত করার দীর্ঘস্থায়ী কোনো উপায় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। অতএব, যতদিন আমরা শাসকদের সঙ্গে আছি আমাদের ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান’ শাসকদেরই সহ্য করতে হবে।

 

 

রবার্ট হিগস: রাজনৈতিক অর্থনীতির একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ফেলো। ‘দি ইনডিপেনডেন্ট রিভিউ’-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক