বিংশ শতাব্দীর বিশ্লেষণাত্মক দর্শনের অন্যতম গুরু, যুক্তিবাদী লেখক ও গণিতজ্ঞ বার্ট্রান্ড রাসেল (১৮ মে ১৮৭২-২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭০) তার বিখ্যাত হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডের তৃতীয় অধ্যায়টি ম্যাকিয়াভেলি এবং তার রাষ্ট্রদর্শন গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্স’ নিয়ে লিখেছেন। রাসেলের এ বিবরণ ও মূল্যায়ন সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

রেনেসাঁ যদিও কোনো গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক দার্শনিকের জন্ম দেয়নি, রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে উপস্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। তিনি নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি। তার কথা শুনলেই ভয়ংকর ধাক্কা খাওয়ার মতো ব্যাপার ঘটে—এটা রীতিতে পরিণত হয়েছে। আর তিনি কখনো কখনো সাংঘাতিক আঘাত দেয়ার মতো করেই লিখেছেন। যদি ভান করে থাকার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন তাহলে আরো অনেকেই তার মতো এখন আঘাত দেবেন।

তার রাজনৈতিক দর্শন বিজ্ঞানভিত্তিক ও অভিজ্ঞতালব্ধ। আর সে অভিজ্ঞতা তার নিজের—লক্ষ্য ভালোই হোক কিংবা মন্দ সে বিবেচনা করার দরকার নেই। সে লক্ষ্যই কর্মপদ্ধতির বৈধতা দেবে। লক্ষ্যটা কী তা যদি কখনো বলার সুযোগ পান তা শুনে আমরা করতালি দিতে পারি। তার নামের সঙ্গে যেসব অসম্মানজনক গালাগাল জড়িয়ে আছে তার সৃষ্টি হয়েছে ভণ্ডদের ক্ষোভের কারণে। এটা সত্যি, তিনি যা বলেছেন তার অনেক বিষয়ে নিয়ে সমালোচনার সুযোগ রয়েছে। ভণ্ডরা অন্যায় কাজ করে যাবে, কিন্তু সে সম্পর্কে কোনো সভ্য ভাষণ শুনতে রাজি নয়। রাজনৈতিক অসততা সম্পর্কে তার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নিয়ে কথা বলার মতো কেউ অন্য কোনো সময় অন্য কোনো দেশে ছিল না। হয়তো গ্রিসের কেউ তা বলতে পারত, যাদের তাত্ত্বিক শিক্ষা এসেছে সোফিস্টদের কাছ থেকে আর ব্যবহারিক শিক্ষা যুদ্ধমান ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে। ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৭-১৫২৭) ইতালির ফ্লোরেন্সের অধিবাসী, তার বাবা একজন আইনজীবী। ধনীও ছিলেন না, আবার ঠিক দরিদ্রও নন। তার বয়স যখন কুড়ির ঘরে, ফ্লোরেন্সে ধর্মগুরু সাভোনারোলার আধিপত্য চলছে। কিন্তু তাদের পরিণতি স্পষ্টতই ম্যাকিয়াভেলির ওপর বিশেষ দাগ কেটেছে। যেজন্য তিনি বলতে পেরেছেন সব সশস্ত্র নেতারা জিতে গেছেন; নিরস্ত্ররা ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি সাভোনারোলাকে দ্বিতীয় ভাগে ফেলেছেন আর প্রথম ভাগে মোজেস, সাইরাস ও রোমুলাস। রেনেসাঁয় খ্রিস্টের নাম অনুল্লেখিত থেকে গেছে।


সাভোনারোলার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর ১৪৯৮ সালে ম্যাকিয়াভেলি ফ্লোরেন্স সরকারের অধীনে একটি ছোট চাকরি পান। পরবর্তী সময়ে কিছু কূটনৈতিক দায়িত্বও পালন করেন। তিনি বরাবর মেডিসি পরিবারের বিরোধিতা করে আসছিলেন। ১৫১২ সালে মেডিসি হারানো সিংহাসন উদ্ধার করার পর তিনি গ্রেফতার হন (তার ওপর শারীরিক নির্যাতন হয়। তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ফ্লোরেন্সের কাছে গ্রামাঞ্চলে নির্বাসিত জীবন কাটানোর অনুমতি দেয়া হয়)। অন্য কোনো কাজ করার সুযোগ না পেয়ে তিনি লেখালেখি শুরু করেন এবং ১৬১৩ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য প্রিন্স লেখেন। মেডিসির আনুকূল্য লাভের আশা নিয়ে তিনি বইটি দ্বিতীয় লরেঞ্জোকে উৎসর্গ করেন। তবে তার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এ সময় তিনি প্রজাতান্ত্রিক ও উদারপন্থী ধাঁচের ডিসকোর্সও লিখছিলেন।

মেডিসির সঙ্গে সমঝোতায় ব্যর্থ হয়েও ম্যাকিয়াভেলি তার লেখা অব্যহত রাখেন। তার মৃত্যুর সময় পর্যন্ত (১৬১৭) তিনি বাধ্যতামূলক অবসর যাপন করেন। সে বছরই পঞ্চম চার্লসের সেনাবাহিনী রোম তছনছ ও লুটপাট করে এবং তখন ইতালীয় রেনেসাঁর মৃত্যু ঘটে।

প্রিন্সিপালিটি (প্রিন্স শাসিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র) কেমন করে বিজয় করতে হয়, কেমন করে ধরে রাখতে হয় এবং কেমন করে এসব রাষ্ট্র হাতছাড়া হয় সে ইতিহাস ও সমকালীন ঘটনা বিশ্লেষণ করে ম্যাকিয়াভেলি দ্য প্রিন্সে তা উপস্থাপন করেছেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর ইতালির এ ধরনের ছোটবড় অনেক উদাহরণ রয়েছে। যে নির্মমতা ও বিশ্বাসঘাতকতা অষ্টাদশ বা ঊনবিংশ শতাব্দীতে অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে তা স্বাভাবিক গণ্য হতো। বৈধতা ছিল হাতে গোনা কজন শাসকের, এমনকি পোপও অবৈধ নির্বাচনে ও দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়েছেন। আমাদের কাল এবং আমাদের রাজনীতিচর্চা সম্ভবত আরো ভালো করে ম্যাকিয়াভেলির মূল্যায়নে সক্ষম—হিটলারের রাইখস্ট্যাগে আগুন, তার পার্টির ক্ষমতা দখল এবং তার বিশ্বাসভঙ্গ।

যেখানে শাসকের আচরণ বিবেচ্য ম্যাকিয়াভেলি এতদিনকার প্রচলিত নৈতিকতা প্রত্যাখ্যান করেছেন। যদি বরাবরই ভালো মানুষ থেকে যান তাহলে শাসকের ধ্বংস অনিবার্য। তাকে অবশ্যই শেয়ালের মতো ধূর্ত এবং সিংহের মতো সাহসী হতে হবে।

কীভাবে প্রিন্স বিশ্বাস রাখবেন? দ্য প্রিন্স গ্রন্থের এ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, বিশ্বাস রাখাটা অত্যাবশ্যকীয় নয়, যদি প্রিন্স রাষ্ট্রকে লাভবান করেন তবেই বিশ্বাস রাখা যাবে, অন্যথায় অবিশ্বাসী হলে সমস্যা নেই বরং কখনো কখনো তাকে অবশ্যই অবিশ্বাসী হতে হবে। তাকে তার প্রকৃত চরিত্র মুখোশে রাখার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। তাকে প্রয়োজনে ভান করতে হবে। মানুষ সরল, বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে তাদের ব্যস্ততা, একবার প্রতারিত হয়ে পুনরায় প্রতারিত হওয়ার প্রতীক্ষায় থাকে। ষষ্ঠ আলেকজান্ডার সারা জীবন প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই করেননি। ম্যাকিয়াভেলি এটাও চাইছেন, প্রিন্সকে যেন জনগণ ধার্মিক মনে করে। শাসকের জন্য মুখোশ গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি খ্রিস্টবাদ বা বাইবেল নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি। তার রাজনৈতিক যুক্তির ভিত্তি হিসেবে খ্রিস্টবাদ ও বাইবেল নেই। ক্ষমতা তাদের জন্য, যাদের একটি অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় ক্ষমতা দখল করার এবং দখলে রাখার দক্ষতা আছে। জনপ্রিয় সরকারের প্রতি তার সমর্থনের ভিত্তি নাগরিকের অধিকারের ধারণা থেকে আসেনি; এসেছে পর্যবেক্ষণ থেকে। এ ধরনের সরকার কম নির্দয়, তাদের বিবেচনা শক্তির ঘাটতি কম এবং তারা স্বৈরাচারী সরকারের চেয়ে বেশি স্থিতিশীল।

ম্যাকিয়াভেলি তার ডকট্রিনে নৈতিক ও অনৈতিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করেননি। রাজনীতির তিনটি লক্ষ্য আছে—স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সুবিন্যস্ত সংবিধান। সবচেয়ে ভালো সংবিধান প্রিন্স, অভিজাত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষমতা ও অধিকারের ভাগ-বণ্টন নির্দিষ্ট করে দেয়। এ ধরনের সংবিধান কার্যকর থাকলে বিপ্লব করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং স্থিতিশীলতা বিরাজ করে।

রাজনীতির উদ্দেশ্য ক্ষমতারোহণ করা। এখানে পদ্ধতিটিকে ভালো-মন্দের আলোকে নয়; সাফল্যের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সাফল্য মানে লক্ষ্য অর্জন করা। কিন্তু সফল সাধুর চেয়ে সফল পাপীর সংখ্যা অনেক বেশি। সাফল্য লাভের বিজ্ঞানটি যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা পাপী ও সাধু উভয়ের জন্য উপকারী হবে। সাধুর লক্ষ্যও যদি রাজনীতি হয়, তিনিও পাপীর মতো সাফল্য অর্জনে আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

ভণ্ডামি বা হিপোক্রেসির মাধ্যমে কিছু পরিমাণ সাফল্য অবশ্য অর্জন করা যাবে, কিন্তু উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান থাকলে সে সাফল্য অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হয়ে যাবে (পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় রাজনৈতিক অবস্থা এবং বিংশ শতাব্দীকে রাসেল যখন পর্যালোচনা করছেন, তখনকার পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তার ব্যবধান। ইউরোপের অনেক দেশই এখন বিভিন্ন ধরনের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে। অনস্বীকার্য, ম্যাকিয়াভেলির মনুষ্য চরিত্র বিবেচনা ও একালের ধারণা এক নয়)।

বার্ট্রান্ড রাসেল ম্যাকিয়াভেলির প্রিন্সের শক্তি ও দুর্বলতার ওপর আলোকপাত করেছেন।

ম্যাকিয়াভেলিকে কারা প্রভাবিত করেছেন আর কারা ম্যাকিয়াভেলির প্রভাবে প্রভাবান্বিত?

ম্যাকিয়াভেলিকে প্রভাবান্বিত করেছেন: জেনোফোন, প্লুটার্ক, প্রেত্রার্ক, ট্যাকিটাস, পলিবিয়াস, থুকিডাইডাস, লিভি, দান্তে, ইবনে খালদুন, প্লেথন ও মার্সেলো ফিসিনাস।

ম্যাকয়াভেলি যাদের প্রভাবিত করেছেন: বেকন, হবস, হ্যারিংটন, রুশো, গিবন, স্পিনোজা, হিউম, জন অ্যাডামস, মার্কি দ্য সাদ, হেগেল, নিেস, প্যারেটো ভিনসেনজো কুয়োকো, গ্রামসি, আলথুসার, শেলিং, নেগরি, ওয়ালজ, ডেনিম ডিডেরট, কার্ল স্মিথ, পেটিট, স্ট্রস ওয়েবার, সিমমন্ডি।

যারা তাকে আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক মনে করেন, তারা ম্যাকিয়াভেলির সঠিক মূল্যায়নই করেন।

 

ইবনে মোতালিব: লেখক