সাক্ষাৎকার: ফিলিপ্পে মেসনার্দ
অনুবাদ: শওকত হোসেন
আপনি ভারতের পূর্বাঞ্চল বাংলার কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেছেন। অঞ্চলটি কীভাবে আপনার কাজের ক্ষেত্রে প্রভাব রাখে?
গায়ত্রী স্পিভাক: ব্রিটিশরা এ পথেই ভারতে এসেছিল, তাই ভারতের বেশ কৌতূহলোদ্দীপক একটি জায়গা এটি। ১৭৫৭ সালে এ পথেই হাজির হয় ওরা। ওরা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া নামে একটা কোম্পানি। তখন অটোমানদের সত্যিকার সাম্রাজ্যবাদী অস্তিত্ব ছিল; তো এ ব্রিটিশ বণিকরা সাম্রাজ্যবাদী হওয়ার কায়দা জানত না। সুতরাং ব্রিটিশরা বাংলাকে— কলকাতার অবস্থান এখানেই— ভুল কায়দায় দেখেছে। যেমন— ওরা বাংলা রপ্ত করেছে, বাংলা ব্যাকরণ লিখেছে, বেশি করে বাঙালি হয়ে উঠেছে, হিন্দু বাবু শ্রেণী প্রতিষ্ঠা করেছে ইত্যাদি। বাংলা একটা বিশেষ ধারায় প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে ভারতের বাকি অংশে ঢের বেশি সাম্রাজ্যবাদী ছিল ওরা। সুতরাং একটা মাত্রা পর্যন্ত ভিন্ন রকম ছিলাম আমরা (এ সম্পর্কে ভিক্টর কিয়েরমান এবং অন্যদের ইতিহাসভিত্তিক রচনা রয়েছে)। তো একটা দিক হচ্ছে এটা এবং আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, বাংলা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকায় বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক বামধারা ছিল। যেমন রজনী পাম দত্ত— তার বাবা বাঙালি ছিলেন— অন্যতম মার্ক্সীয় অনুবাদক ছিলেন। গোটা বাংলাই কিঞ্চিৎ ভিন্ন রকম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি যা-ই মনে করি না কেন, কলকাতায় জন্ম নেয়ার কারণে নিঃসন্দেহে প্রভাবিত হয়েছি।
আপনার প্রশিক্ষণ ও চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে মার্ক্সের প্রভাবের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করবেন?
গায়ত্রী: এই বাঙালি পরিপ্রেক্ষিতে, হ্যাঁ, কেননা এটাও সত্যি যে কিছুদিন আগেও পশ্চিম বাংলা বামফ্রন্ট সরকারের অধীনে ছিল। পুরনো মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার বিপরীতে কমিউনিস্ট পার্টি— মার্ক্সবাদী ক্ষমতায় ছিল। সুতরাং মার্ক্সবাদের সঙ্গে আমার পরিচয় আসলে অস্তিত্বমান সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রভিত্তিক ছিল। ভারতের কেন্দ্র সরকার সমাজতন্ত্রী না থাকায় এটা বেশ অদ্ভুত ধরনের অবস্থা ছিল। সুতরাং আমি আমাকে প্রভূত প্রভাবিতকারী সমর সেন সম্পর্কে লিখেছিলাম। ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পক্ষে ফ্রন্টিয়ার নামে একটা সাময়িকী চালাতেন তিনি। এখনো আছে ওটা। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কেন্দ্র যেখানে বামপন্থী নয়, সেখানে কীভাবে পার্লামেন্টারি বামের বিরোধী হওয়া যায়— পশ্চিম বাংলায় যেমন ছিল। অনেকটা পার্লামেন্টারি বামের বামপন্থী সমালোচনার বামপন্থীর মতো। বেশ পরে পশ্চিমা মার্ক্সবাদের সঙ্গে আমার পরিচয় থেকে একেবারেই ভিন্ন ছিল এটা। বলা যায়, আমার গোড়ার দিকের মার্ক্সবাদী শিক্ষার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই ছিল না। আপনাকে একটা কথা বলি, ১৯৬১ সালে স্নাতক ছাত্র হিসেবে কর্নওয়েলে ছিলাম আমি। তখন ভারতীয় ব্যাপারটা রীতিমতো চালু ছিল— বুঝতেই পারছেন, হিপ্পিদের আগে আগে বিটনিকস ধরনের ব্যাপার। এটা আমার জানা ভারত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। কিন্তু তরুণ বয়স ছিল আমার, আমি তাতে জড়িয়ে গিয়েছি, অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানটান গেয়েছি। তারপর ১৯৬২ সালে ম্যালকম এক্স কর্নেলে এসে জেমস ব্রাউনের সঙ্গে আলাপ করেন। শ্রোতাদের ভেতরে ছিলাম আমি, পরিষ্কার মনে আছে— আমি ভেবেছি, ‘হায় ঈশ্বর! এ তো কলকাতার মতো!’ কারণ আমেরিকানদের এত পছন্দের অন্য ভারত বাস্তব ভারত ছিল না; তরুণ বয়সে আমি এতে গা ভাসিয়েছিলাম। তো এভাবেই মার্ক্স আমার রক্তে ঢুকে গেছেন।
কিন্তু সেটা মার্ক্সবাদের সনাতনী ভাষ্য নয়—
গায়ত্রী: মোটেই না। আসলে সাংহাইয়ে ইন্টারন্যাশনাল বাইয়েনিয়াল অ্যাসোসিয়েশনে মূল প্রবন্ধ পড়ছিলাম আমি। তখন বলেছি, ‘মার্ক্স আমার ভাই।’ সঠিক মার্ক্সকে প্রতিষ্ঠার কোনো ইচ্ছা আমার নেই, যাতে তাকে অনুসরণ করা যেতে পারে। এবং আমি উনিশ শতকের বিপ্লব ভবিষ্যতের কবিতার দিকে দৃষ্টি রাখার কথা উল্লেখ করা অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করতে খুবই পছন্দ করি। অর্থাৎ আমি ভবিষ্যতের কবিতার পক্ষে।
আপনি কীভাবে বিশেষত উত্তর ঔপনিবেশিক এবং সাধারণভাবে একাডেমিক ক্ষেত্রে গবেষণায় আপনার সমালোচনামূলক অবস্থানকে সংজ্ঞায়িত করবেন?
গায়ত্রী: উত্তর ঔপনিবেশিক... আমার পক্ষে নিজেকে উত্তর ঔপনিবেশিকবাদী ভাবা কঠিন। আমার মনে হয়, ফ্রান্সে আমাকে একজন উত্তর ঔপনিবেশিকতাবাদী কিংবা আদর করে আমরা যাকে বলি ‘প্রোকো’ বলেই ভাবা হয়। সুতরাং আমার বেলায় অস্তিত্বহীন একটা যুক্তিতে আমার বিরোধিতা করা হয়। আপনি জানেন, রোমান্টিক রিভিউ আমাকে ফ্রান্সে উত্তর ঔপনিবেশিকতার ওপর লিখতে অনুরোধ করেছিল। এখানকার অভিবাসীদের প্রতি আমি সম্পূর্ণ সহানুভূতিশীল। ওরা ‘উত্তর ঔপনিবেশিক’ শব্দটা বেছে নিলে আমি ওদের পক্ষে দাঁড়াই। কিন্তু ভারতে আমার জন্ম হওয়ায় (আমি একজন ভারতীয় নাগরিক) ওরা ‘উত্তর ঔপনিবেশিক’ বললে সেটা পরিহাসমূলক পরিভাষা হয়ে দাঁড়ায়। আমার চোখে জাতীয় মুক্তি বিপ্লব নয়। আলোচনার ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা পাওয়ার দিন থেকেই উপনিবেশ থেকে মুক্তির ব্যর্থতার সূচনা হয়েছিল, ব্যাপারটা সত্যিই ভিন্ন রকম ছিল। আমাকে ফ্রান্সে উত্তর ঔপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে লিখতে বলা হলো যখন, ওরা পরে বলেছিল যে, উত্তর ঔপনিবেশিক হওয়ার কারণে যারা আমাকে দুষ্ট মেয়ে ভেবেছে, ফ্রান্সের সেইসব সমালোচকের অবস্থান শোধরানোর পদক্ষেপ নেব। কিন্তু নিজেকে উত্তর ঔপনিবেশিক ভাবিনি বলে আমি লুলুম্বা, এমে সেজেয়ারে প্রমুখদের সম্পর্কে লিখেছিলাম। লেখাটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু পরে সম্পাদক কিছুটা হতাশার সঙ্গেই বলেছেন, ‘আপনি কেন আপনার উত্তর ঔপনিবেশবাদ সম্পর্কে ফরাসি সমালোচকদের মোকাবেলা করলেন না?’ আমি বলেছি, ‘কারণ আমার দ্বারা সেটা সম্ভব নয়, কারণ আমি উত্তর ঔপনিবেশিকবাদী নই।’ আসলে আমি যাকে ‘উত্তর ঔপনিবেশিকবাদ’ বলি, সেই ব্যাপারটা শুরু করার সময় উত্তর ঔপনিবেশিকতা নিয়ে কিছু করছি বলে ভাবিনি। তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাকে ব্যবহার করার ধরন দেখে ডোন্ট কল মি পোস্টকলোনিয়াল নামে একটা বই লিখি। অমর্ত্য সেন তখন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের সিন্ডিকেটে ছিলেন, ফোন করে আমাকে বললেন: ‘গায়ত্রী, এটা একটা সিরিয়াস বই। যেনতেন নাম রেখো না। প্রথম অধ্যায়টি কান্টের ওপর হওয়ায় এর নাম আ ক্রিটিক অব পোস্টকলোনিয়াল রিজন রাখা উচিত।’ তো এটাই বইটার নাম হয়ে গেছে। তবে আদতে এটা উত্তর ঔপনিবেশিকতাবাদের সমালোচনা। এবং আমার লেখা নিবন্ধটার নাম ছিল, ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ কোনো কারণে আমার সবচেয়ে বেশি পরিচিত রচনা হয়ে গেছে। মোটেই উত্তর ঔপনিবেশিকতাবাদী রচনা নয়। এটা হিন্দু ধর্মমত এবং উপনিবেশপূর্ব ঐতিহ্যের সমালোচনা। বেশির ভাগ লোক পড়ে না। তারা ভাবে আমি এখনো উত্তর ঔপনিবেশিকতাবাদ নিয়েই পড়ে আছি। আমাকে উত্তর ঔপনিবেশিকতাবাদী কায়দায় এটা-সেটা লেখার অনুরোধ জানিয়ে ই-মেইল আসে।
সাধারণভাবে একাডেমিক ক্ষেত্রে আপনার সমালোচনামূলক অবস্থান সম্পর্কে বলুন? কেননা অত্যন্ত ভিন্ন ধরনের সমালোচনামূলক অবস্থানে রয়েছেন আপনি—
গায়ত্রী: পুরোপুরি। আমার মনে হয় সারা দুনিয়ায়, প্রায় সর্বস্তরে— কমিউনিটি স্কুল থেকে শুরু করে অভিজাত স্কুল পর্যন্ত, সরকারি ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর পার্থক্য প্রায় বোধের অতীত। সাধারণ ঝোঁকটা করপোরেটাইজেশনের দিকে— ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়, তা সত্ত্বেও এটাই একটা বিরাট দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। এটা একটা। তারপর দ্বিতীয় ব্যাপারটা হলো, দর্শনের মামুলীকরণ, যাতে আমরা অংশ নিচ্ছি। আমরা শিক্ষকদের দর্শনায়িত করি, আমরা এতে অংশ নিই। আর যারা দর্শন শিক্ষা দেন, তারা এমন বিশেষ কায়দায় শেখান যেন সমসাময়িক বিশ্বে আমাদের কোনো গুরুত্ব নেই। আমি মনে করি, আমার প্রশ্নের মুখে পড়া অন্যতম বিষয় এটা, সাধ্যমতোই বিরোধিতা করে যাই। সবশেষে আমি বলব, দেখুন, ষাটের দশকে আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপ্লবের কথা বলেছি কিন্তু তখন আমরা যে কথা জানতাম না তা হলো, অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপ্লব করে এবং সুন্দর সুন্দর স্কুল প্রতিষ্ঠা করে আদৌ লাভ হওয়ার নয়। শিক্ষাকে হলিস্টিক হতে হবে। অন্য কথায়, আমাদেরকে সত্যিই প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক হয়ে তৃতীয় ও তার পরবর্তী পর্যায়ে নজর দিতে হবে। এ বোধটুকু আমাদের থাকতেই হবে। কারণ শিক্ষাক্ষেত্রে শ্রেণীবৈষম্য দুনিয়াকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তো সংক্ষেপে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমার অবস্থান এটাই।
আপনি মূলত তুলনামূলক সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘ডেথ অব ডিসিপ্লিন’-এর কথা বলেছেন। এটা আপনার একটি বইয়ের শিরোনামও (২০০৫, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস)। এ কথার আরো গভীর অর্থ কী?
গায়ত্রী: অন্যরাও এই একই প্রশ্ন করেছেন আমাকে। আমি কী করছি জানতে চেয়েছেন তারা। শোকগাথা লিখছিলাম আমি। শোকগাথার মানে সবকিছু ফুরিয়ে যাওয়ার পর আপনি বলে ওঠেন, ‘আবার বেঁচে উঠছে এটা।’ আসলে ওই লেকচারগুলো দেয়ার সময় এগুলোকে ‘নব্য তুলনামূলক সাহিত্য’ নাম দিয়েছিলাম। তো একটা পর্যায় পর্যন্ত বলতে পারেন যে, আসলে আমি শোক করছিলাম না; বরং গোটা তুলনামূলক সাহিত্যের মরণ উদযাপন করছিলাম আর আশায় ছিলাম যে, সমাজবিজ্ঞান ও সাহিত্যকে একসূত্রে গাঁথার মতো একটা কিছুর আবির্ভাব ঘটবে— বিশ্বের প্রতিটি ভাষাই প্রথম ভাষা হতে পারার কথা স্বীকার করে নেবে সেটা, ফলে যুক্তির আগেই সেটা শেখা যাবে এবং নৈতিক প্রতীককে জীবন্ত করে তুলবে। কারণ ‘প্রথম ভাষায়’ সঠিকভাবে চিন্তার ক্ষমতা আয়ত্তে আসার আগেই রপ্ত করা ভাষার বেলায় এটাই ঘটে। তো এমন কিছুই আশা করছিলাম আমি এবং আমার মনে হয়, পুরনোকে কবর দিয়ে নতুনের উদযাপনের লক্ষ্যেই মৃত্যুর ধারণাটুকু ছিল।
আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন না যে, এ পরিস্থিতি জ্ঞান, যুগপৎ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণকারী শাস্ত্রের ভেতরকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরো সাধারণ একটা অবস্থা তুলে ধরে?
গায়ত্রী: শাস্ত্রীয়করণ এড়িয়ে যাওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। এটা একটা প্রয়োজনীয় আপদ। এ নিয়ে ভাবিনি। তবে একটা চমৎকার প্রশ্ন তুলেছেন আপনি। আমি শাস্ত্রের কথা বলার সময় আপনার চিন্তাধারাকে গড়ে তোলা বিভিন্ন রূপ বোঝাই। শাস্ত্র ওয়াকিবহাল মানুষ হিসেবে আপনি কেমন এবং জানার বিষয়কে কীভাবে নির্মাণ করতে হবে, সে ধারণা জোগায়। এটা এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রস্তুতি। প্রায়ই তা গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলতে পারে। অন্যদিকে অল্প কিছু লোকের সঙ্গে পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়েছে, যারা শাস্ত্রের সীমানাকে প্রসারিত করেছেন, যাতে তাদের ক্ষেত্রে শাস্ত্র—বিষ—ওষুধে পরিণত হয়। সুতরাং আমি বলব শাস্ত্রের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাস্তবতার প্রত্যক্ষ ও মধ্যস্থতাহীন অভিজ্ঞতা আছে বলে মনে হয় না। আমি বলব, শাস্ত্রীয় প্রস্তুতি এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রস্তুতি। অন্যদিকে যেকোনো ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠান যেভাবে শাস্ত্র নির্মাণ করে, সেটা জ্ঞানতাত্ত্বিক শাস্ত্রীয়করণের চেয়ে খানিকটা ভিন্ন বলে অবশ্যই ক্রমাগত প্রশ্ন করে যেতে হবে। আমি শাস্ত্রের জন্ম দেয়া জ্ঞানের সঙ্গে মধ্যস্থতাহীন বাস্তব জীবনের বিরোধিতা করব না।
আপনি একাডেমিক বুদ্ধিজীবীরা যে ব্যবস্থার ভেতর বাস করছেন, তার ভেতরে থেকেও সত্যিকারের সমালোচনামূলক চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারেন বলে বিশ্বাস করেন?
গায়ত্রী: আমি তা-ই আশা করি, যদি তা ব্যবস্থার অভ্যন্তরে হয়ে থাকে। বেশির ভাগ মানুষই ব্যবস্থার ভেতরে থেকেই সফল হতে চায়। এমনকি রেডিক্যাল হয়েও। তো তারা সেটা পারবে বলে বিশ্বাস করতে চাই আমি। অন্যদিকে আমি গবেষণার জগতে প্রচুর আনাগোনা করে থাকি এবং বিশেষজ্ঞ হিসেবে সম্পর্কিত হওয়ায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামেও যাই। সুতরাং আজকের দিনে নীতিমালার জগৎ একাডেমি থেকে কতটা দূরবর্তী, তার একটা ধারণা রাখি।
আমার প্রশ্ন আপনার ভাষায় তথাকথিত ফরাসি তত্ত্ব, ফুকো, ডেল্যুজ প্রমুখের সমালোচকদের মোকাবেলাও অন্তর্ভুক্ত করছে—
গায়ত্রী: বেশ, না। ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ নামের নিবন্ধেই সমালোচনামূলক ছিলাম আমি। দেখুন, বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত, মেট্রোপলিটান অভিবাসীদের বেলায় এক ধরনের আত্মজৈবনিক মুহূর্ত রয়েছে। মনে আছে, এডোয়ার্ড সাঈদ আমাকে বলেছিলেন, একটা সময় তিনি বুঝতে পারেন, ‘আমি প্রাচ্যায়িত হয়ে গেছি।’ তো এ ধরনের ঘটনা ঘটে এবং এমন এক মুহূর্তে আমি ভাবছিলাম, ‘কীভাবে ফরাসি তত্ত্বের বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলাম যে, ইয়েল ফ্রেঞ্চ স্টাডিজ চাইছে আমি যেন ফরাসি তত্ত্ব নিয়ে লিখি আর ক্রিটিক্যাল ইনকোয়ারি চাইছে বিনির্মাণ প্রসঙ্গে লেখা? (আশির দশকের গোড়ার দিকের কথা এটা) সুতরাং আত্মজৈবনিক মুহূর্ত আমারও এসেছিল। সেটা থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। মনে হয়, একটা সংলাপের দিকে মনোযোগ দেয়াই আমার কায়দা ছিল। আমি তাত্ত্বিক সৃষ্টির দিক থেকে ফুকো ও ডেল্যুজের বেলায় নেতিবাচক ছিলাম না। আসলে দুজনকেই দারুণ সমীহ করি। তবে আমি যেটা লক্ষ করেছি তা হলো, পরস্পরের সঙ্গে আলাপের সময় তারা যেন বিশ্বের হাজারো পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়া সাধারণভাবে প্রতিস্বজ্ঞামূলক তাত্ত্বিক অবস্থান ব্যবহার করছেন না। আর ১০ জনের মতোই কথা বলছেন: খেটে খাওয়া শ্রেণীকে রোমান্টিসাইজ করছেন ইত্যাদি। কিন্তু লেখার সময় তারা এভাবে লেখেননি। তো সেখানেই সমালোচনা— কথোপকথনের সমালোচনা, তাদের সাধারণ তাত্ত্বিক অবস্থানের নয়। বছর পরিক্রমায় দেরিদার সঙ্গেও বেশ সখ্য হয়েছিল আমার। এবং লাঁকা— লাঁকাকে কবি মনে হয় আমার। আমার কাছে কবিতা খারাপ কিছু নয়, জীবনভর কবিতার সঙ্গে বাস করেছি। আমার ধারণা, ফ্রয়েড একজন মনোদৈহিক দার্শনিক, যিনি নৈতিক তাত্ক্ষণিকতা হিসেবে বয়ানকে কাজে লাগান। খুবই পুরনো ঐতিহ্য এটা। আমার মনে হয়, লাঁকার কবি প্রতিভা রয়েছে, যেমন— হেগেলকে সাইকোঅ্যানালিসিসের সমার্থক বলতে পারার ক্ষমতা রাখা। অত্যন্ত শক্তিশালী অন্তর্দৃষ্টি। সুতরাং আমি ষাট ও সত্তরের দশকের এ চিন্তকদের স্রেফ সমালোচনা করিনি, উঁহু।
আপনি জাঁক দেরিদার কথা বলেছেন। আপনার নিজস্ব চিন্তার ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব কতখানি?
গায়ত্রী: ঠিক নিশ্চিত নই। কারণ ব্যাপারটা এত আত্মস্থ হয়ে গেছে যে, আমি ‘বাহ, আপনি দেখছি দেরিদীয়’ বলে উঠি না। ব্যাপারটা তেমন নয়। বহুদিক থেকেই আমাকে তাড়া করে বেড়ান তিনি। যারপরনাই অন্তঃস্থ এটা। অবশ্যই আমি সমালোচনামূলক হওয়ার ক্ষমতা রাখি। তবে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এখানেই আমি একজন বহিরাগত একাডেমিক বুদ্ধিজীবী। কিন্তু মূলত তার চিন্তার ধরনে আমি অভিভূত হয়ে গেছি।
কিন্তু আপনি তাকে ফুকো ও ডেল্যুজের কাতারেই ফেলেছেন?
গায়ত্রী: কিছু ক্ষেত্রে। একই কাতার কেমন হওয়ার কথা ঠিক জানি না। তবে এটা ঠিক যে, ফুকো ও ডেল্যুজকে দেরিদার মতো চিনি না আমি। আপনি কারো কাজ তর্জমা করার সময় সবচেয়ে নিবিড় পাঠ হয়ে থাকে এবং তারপর আপনি এ বিষয়ে কোনো বিশেষজ্ঞের মতো আপন পেশায় থিতু হন। ফলে আপনার দায়দায়িত্ব কিছুটা বদলে যায়। অন্যদিকে আমি সবে কলাম্বিয়ায় ফুকো’স কলেজে দে ফ্রান্স লেকচারের ওপর শেষ বক্তব্য রেখেছি। ফুকো যা বলতে চেয়েছেন, প্রায় সেদিকেই গেছি। কয়েক বছর আগে ‘ফুকো অ্যান্ড নাজিবুল্লাহ’ নামে একটা লেখা লিখেছিলাম। নাজিবুল্লাহ আফগানিস্তানের শেষ কমিউনিস্ট প্রেসিডেন্ট ছিলেন। একটা ল্যাম্পপোস্টে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল তাকে। জনতা সেটা প্রত্যক্ষ করেছে। ফুকোর সার্ভেইলার এত পুনির, ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশমেন্ট-এর সূচনা হয়েছে এভাবেই: জনতা একটা ফাঁসি প্রত্যক্ষ করছে। তো আরো একবার আমি ফুকোর উপাদানের আশ্রয় নিয়েছি। এভাবেই আমি তত্ত্ব পড়ি এবং পড়াই, বহুভাবেই সেটা সম্ভব। ফলে সেগুলো মধ্যস্থতাভিত্তিক হয়ে ওঠে। আমি এমনভাবে তত্ত্ব পড়ি না বা পড়াই না, যাতে তত্ত্বকে আমরা কী পড়ছি, তার বর্ণনা দেয়ার উপায় হিসেবে কাজে লাগানো যায়। আমি এমনভাবে তত্ত্ব পাঠ করি যেন যিনি এটা লিখছেন— মার্ক্সও আছেন এর ভেতর— সৃজনশীল উপায়ে নিজের খাতিরেই তত্ত্বে রূপ দিচ্ছেন। তারপর উপাদানগুলো আমার মনোজগতের অংশ হয়ে ওঠে। তো আমি যখন পড়ি, বিভিন্ন ধারণার চেহারায় ফুটে ওঠে।
এবার নির্দিষ্ট কিছু ধারণার বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারি আমরা। অবশ্যই সাবঅল্টার্নের প্রশ্ন দিয়েই শুরু করতে হবে। আপনি কি এ শব্দটির গ্রামসি-অর্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ? আদিতে এ পরিভাষাটি সামরিক ভাষার অংশ ছিল। আমরা কিছু পরিণাম নিয়ে কথা বলতে পারি?
গায়ত্রী: সবার আগে আমি জানতে চাইব, ‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দের সঙ্গে আমিই কেন সবচেয়ে বেশি সম্পর্কিত। ব্যাপারটা চমৎকার, মেনে নিচ্ছি কিন্তু আমি সেভাবে কিছু করছি বলে মনে হয় না। এ শব্দটাকে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছি। হ্যাঁ, গ্রামসির অর্থের সঙ্গে যথেষ্ট নিবিড়ভাবে পরিচিত আমি, সামরিক অর্থকেও কৌতূহলোদ্দীপক মনে করি। কারণ সাধারণভাবে আপনি গোটা সেনাবাহিনীর দিকে নজর দিলে— সাবঅল্টার্ন হলো যারা হুকুম তামিল করে, হুকুম দেয় না। অন্যদিকে সাবঅল্টার্ন অফিসারদের নিচ থেকে দেখেন, তারাও আসলে হুকুম দিয়ে থাকে। সুতরাং তার মানে তারা এক ধরনের স্থানীয় পদক্রম থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত নয়। তো সামরিক উপমা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক।
আপনি ‘সাবঅল্টার্ন’ ও ‘জনপ্রিয়’ (আমরা হয়তো ‘জনতা’র সঙ্গে আরেক দফা পার্থক্য টানতে পারি), ‘শ্রেণী’ ও ‘দারিদ্র্য’, ‘জাতি’ ও ‘বর্ণ’, ‘লিঙ্গ’ ও ‘যৌনতা’র... ভেতর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেছেন...এ জোড়া ধারণাগুলোর ব্যাখ্যা দিতে পারেন?
গায়ত্রী: আসলে আমরা কিন্তু ‘নাগরিক’ ও ‘জাতীয়তা’র মতো বিষয়গুলোও যোগ করতে পারি। আমি বলব, দ্বিতীয় পর্যায়গুলোই বেশি অস্পষ্ট। প্রথমগুলো অনেক বেশি তাত্ত্বিক ও কাঠামোবদ্ধ। এখন মনে রাখবেন, ‘জনতা’ বেশ বড় একটা শব্দ। আমি স্রেফ বলতে পারি না যে, ‘দেখো, এটা সাবঅল্টার্ন থেকে আলাদা।’ বেশির ভাগ দ্বিতীয় শব্দের বেলায়ই এটা খাটে। কিন্তু বাস্তবে দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ— দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক ইতিহাসে সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের সূচনা করেছেন— ‘সাবঅল্টার্ন’ ও ‘জনতা’ শব্দ দুটিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। আমি এটা মেনে নিয়েছি। তিনি আরো বলেছেন, জনতা গোটা সামাজিক ক্রমধারা থেকে বহু দূরের (ভারত সম্পর্কে লিখছিলেন তিনি, কারণ এটা দক্ষিণ এশিয়াসংক্রান্ত ইতিহাস)। আশির দশকের গোড়ার দিকে সূচিত সাদার্ন এশিয়ান হিস্ট্রিরিয়ান্সের সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ গ্রুপের ‘সাবঅল্টার্ন’ সম্পর্কিত ওই বিশেষ ধারণাটি আমার ‘ডিকনস্ট্রাক্টিং হিস্ট্রিরিওগ্রাফি’ শিরোনামের একটি নিবন্ধে রয়েছে। মোটেই সুলিখিত নয় এটা, তবে আমি লিখেছি। এরপর আসছে ‘দারিদ্র্য ও শ্রেণী’, এটাও অন্য লোকদের খাড়া করা একটা নিরেট পার্থক্য— একমাত্র শ্রেণী সচেতনতা থাকলেই একটি শ্রেণী অস্তিত্ব পেতে পারে। সুতরাং কেবল আয়ের মাত্রাই আসলে শ্রেণীকে তুলে ধরে বলাটা শ্রেণী কথাটার সক্রিয় অর্থ কেড়ে নেয়ারই শামিল হবে। এটা একটা বিমূর্ত শব্দ। এরপর ‘যৌনতা ও লিঙ্গে’র ধারণা একটি কৌতূহলোদ্দীপক পার্থক্য। কেননা পার্থক্য হিসেবে খানিকটা আবছা। লিঙ্গ হচ্ছে বিশেষ শারীরিক পার্থক্যের বিচারে কীভাবে শ্রমিকের সামাজিক বিভাজন হচ্ছে। একে অন্য যেকোনো পার্থক্যের আগেই ধারণা করা যেতে পারে। এটা বেশ পদ্ধতিগত (যৌনতা-লিঙ্গের ব্যবস্থার এ ধারণা আমার নয়)। তবে যৌনতার ধারণাকে সত্যি বলতে গোটা সমাজের বিচারে পদ্ধতিগত করার দরকার পড়ে না। এর বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত ব্যবহারও থাকতে পারে। জৈবিক/দৈহিক বিবেচনা করে যাওয়ার কারণে এটি অনেক বেশি শিথিল কিন্তু লিঙ্গ নিঃসন্দেহে শ্রেণীর মতো: অনেক বেশি পদ্ধতিগত বিষয়। নাগরিক ইত্যাদির বেলায়ও তাই। প্রথমগুলো কাঠামোগত, চলিষ্ণু এবং পদ্ধতিগত, যেখানে দ্বিতীয়গুলো লিঙ্গ-যৌনতার বদলে আসলে বলা উচিত যৌনতা-লিঙ্গ— অনেক বেশি অস্পষ্ট, একান্ত ও দৈহিক অর্থ থাকতে পারে।
তা সত্ত্বেও যৌনতা সম্ভবত জৈব-রাজনৈতিক অর্থের চেয়ে নিবিড় হতে পারে—
গায়ত্রী: বেশ, সবসময় এটা সত্যি নয়। দুর্ভাগ্যবশত জৈব-রাজনৈতিককে যৌনতার কথা বলে পার্থক্য করা যেতে পারে। এটা সবসময় মাথায় রাখতে হবে।
‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রশ্নের উত্তরে আপনি বলেছেন যে, সাবঅল্টার্ন কথা বলতে পারে না। এ নেতিবাচক উত্তরের কারণে আপনি কি মনে করেন যে, এর প্রতি সাড়া, যাকে উসকানিমূলক ও নেতিবাচক সাড়া মনে হতে পারে, অপর সম্পর্কে পশ্চিমা চিন্তার নিকটবর্তী প্রতিভূ?
গায়ত্রী: না। আমি সব পশ্চিমা চিন্তাভাবনার সঙ্গে অভ্যস্ত নই। (আসলে পাশ্চাত্য বলতে কী বোঝায়, তাও ঠিক বুঝি না। মানে অস্ট্রেলিয়া কি পশ্চিম?) কিন্তু যা-ই হোক, আমি বলব কেউ কেউ সাবঅল্টার্ন সম্পর্কে আমার ধারণাকে রেডিক্যাল অল্টারিটির ধারণা বিবেচনা করে লিখেছেন। লেভিনাসের মতো দার্শনিকদের অপর সম্পর্কে চিন্তার ইতিবাচক ধারা সম্পর্কে ভাবছেন না তারা। পুরো নৈতিক দর্শন, যেখানে অপর ও পরম অপর ইতিবাচক বিষয়। এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা জিনিস। তারা অপর সম্পর্কে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ বিচারে ভেবেছেন। কৃষ্ণাঙ্গরা উপনিবেশে পরিণত জাতি: স্বদেশী, আফ্রিকান...এবং এ ধরনের ব্যাপার। না। দেখুন, ফরাসি তাত্ত্বিক থেকে দূরে সরে যেতে আমি একজন পারিবারিক সদস্যের ওপর নির্ভর করেছি। আমার নানির বোন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীদের— তখনকার একটা খুদে গ্রুপ স্কুল— অংশ ছিলেন তিনি। ১৯২৬ সালে তার বয়স ছিল ১৭ বছর, গুপ্তহত্যার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাকে। হত্যা করতে না পারায় আত্মহত্যা করেছিলেন। কিন্তু গলায় দড়ি দেয়ার আগে ঋতুস্রাবের জন্য চারদিন অপেক্ষা করেছেন, যেন নিজের শরীরের সঙ্গে কথা বলতে এবং একজন নারী অনন্য পুরুষের জন্যই অস্তিত্ববান বলে উল্লেখ করা প্রথাগত লিঙ্গীয় পরিচয়ের বিরোধিতা করতে পারেন। এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চেয়েছিলেন তিনি। এমনকি এ ভীষণ সময়েও যখন মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, ঋতুস্রাবের অপেক্ষা করেছেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন কেউ যেন না ভাবে যে, অসঙ্গত সন্তানধারণের কারণেই কাজটা করেছেন। কেবল তা-ই নয়, এমনকি বোনকে একটা চিঠিও লিখে গেছেন আমার নানি, যেন ৬০ বছর পর ওটা খোলা হয়। কারণ ভারত কবে স্বাধীন হবে জানতেন না তিনি। নিজের শরীর ও হাত দিয়ে কথা বলার জন্য সব কষ্ট সহ্য করেছেন তিনি। কিন্তু তার পরও দুই প্রজন্ম পরে আমার প্রজন্ম, আমার খালাতো বোন, আমার মতো একই শিক্ষাগত পটভূমি ছিল তার: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হই আমি, সেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছে। বলেছিল, ‘অবৈধ সন্তান ধারণের কারণে আত্মহত্যা করেছে এমন একজনকে নিয়ে কেন কাজ করছ?’ তখন সক্রোধে আমি বলেছি, ‘সাবঅল্টার্নরা কথা বলতে পারে না!’ এমনকি নিজের সারা শরীর দিয়ে কথা বলেও এমন ভয়ঙ্কর সময়ে চারদিন অপেক্ষা করে চিঠিটা লিখেছিলেন তিনি— কথা বলার প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন— কথা বলার কাজটা শেষ হতে পারেনি। সুতরাং তিনি কথা বলতে পারেননি। তার মানে এই নয় যে, ওরা কথা বলতে পারে না। এটা কথা বলার একটা ভঙ্গি— কখনই পুরোপুরি শেষ হয় না। চলতেই থাকে, চিরকাল চলে। কারণ ভাষা এমন একটি চলিষ্ণু বিষয়— এক জায়গায় স্থির থাকে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও শোনার মতো একটা অবকাঠামো থাকলে এটা শেষ হতে পারে। কেউই তাকে শুনতে পারেনি। এ কারণেই কথাটা আমি যেভাবে বলেছি, সেটা ক্রোধের বুলি— যেমন লোকে বলবে, ‘বিচার বলে কিছু নেই।’ তার মানে এই নয় যে, আসলেই বিচার-আচার নেই। এর মানে হলো, আইনের অস্তিত্ব থাকলেও আইনই বিচার নয়। এর মানে এটাই। কিন্তু আসল কথা বুঝতে মনোযোগ দিয়ে কেউই লেখাটা পড়েননি। তাকে নিয়ে লিখছি বলে মা বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। আমি বলেছি, ‘মা, কেউই নজর দেবে না।’ বিশেষ করে আমি যেহেতু বলিনি যে, তিনি আমার নানির বোন (আমার নানির বোন এ ধরনের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়ার কারণেই লোকে আমাকে ভালোবাসুক, চাইনি)। সুতরাং ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে বেশ লম্বা সময় নিয়েছি। আমি বক্তব্য রাখার ২০ বছর পর একটা সম্মেলন হয়েছিল। একটা নিবন্ধ লিখেছিলাম, যেখানে সবকিছু ব্যাখ্যা করেছি। কিন্তু আমি এটাই বুঝিয়েছিলাম: এর সঙ্গে পশ্চিমের কৃষ্ণাঙ্গদের স্তব্ধ করে দেয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
আমি ভাবছি, সাবঅল্টার্ন কথাটা ব্যক্তিকে না বুঝিয়ে বরং ভাষা কিংবা আরো স্পষ্টভাবে ডিসকোর্স ব্যবহারে অক্ষম রয়ে যাওয়া নিপীড়িত গোষ্ঠীকে বোঝায়। আমার কি ভুল হচ্ছে?
গায়ত্রী: না। যেমন বলেছি, প্রথম স্রেফ ফরাসি বিশেষজ্ঞ হওয়ার থেকে দূরে সরে যাওয়ার সময় আমি আমার পরিবারের ওপর নির্ভর করে একজন ব্যক্তি সম্পর্কে কথা বলেছি। কিন্তু আদতে গ্রামসির সংজ্ঞাটি হচ্ছে, ‘সরলীকরণ করা যাবে না, এমন প্রান্তিক সামাজিক গোষ্ঠী’। মানে প্রলেতারিয়েতকে পুঁজির যুক্তি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে কিন্তু এদের যাবে না। সুতরাং হ্যাঁ, ওরা একটি গোষ্ঠী। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ওরা ভাষা ব্যবহার করতে পারে না। অবশ্যই ভাষা ব্যবহার করে কিন্তু কী বলছে শোনার মতো সেই অবকাঠামো আমাদের নেই। ৩০ বছর ধরে এ কাজটাই করছি আমি। একটা অবকাঠামো গড়ে তোলা, যাতে অভিজাত গোষ্ঠী, সরকার ওরা কী বলছে শোনে।
আমরা শব্দের খেলা শুরু করলে আমি যদি বলি সংস্কৃতি, আপনার মনে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়?
গায়ত্রী: অন্ধবিশ্বাস।
যুক্তি—
গায়ত্রী: ভঙ্গুর।
উত্তর ঔপনিবেশিক—
গায়ত্রী: গণতন্ত্র।
স্মৃতি—
গায়ত্রী: এটা কঠিন। চট করে কিছু বলতে পারব না।
পর্যটক—
গায়ত্রী: আমি বিরোধিতা করি এমন কেউ।
আমি সঠিক মনে করে থাকলে আপনি বলেছেন যে, আপনার প্রকল্পটি সাবঅল্টার্নসংক্রান্ত গবেষণার জন্য নয়; বরং শিক্ষার একটা দর্শন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ওদের কাছ থেকে শেখার জন্য। আরো গভীরভাবে, সঠিকভাবে আমরা কি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, সাবঅল্টার্ন সত্যিই একটি বিষয়বস্তু বা গবেষণার বিষয়?
গায়ত্রী: মনে হয় আপনার কথাই ঠিক। অন্যদিকে আমি বিশ্বাস করি, যেকোনো কিছুই গবেষণার বিষয় হতে পারে। একটা কিছু নিয়ে গবেষণায় মন্দ কিছু নেই। কেউ যদি কোনো বিষয় নিয়ে এমনভাবে গবেষণা করে যে, সেটা তদন্তের বিষয় ছাড়া আর কিছুই না, সেক্ষেত্রে এটা সমস্যা। আমি একজন সাহিত্য সমালোচক। আমাদের একক ও প্রমাণের অতীত কিছু নিয়ে গবেষণার ধরনটি আসলে আমাদের গবেষণার বস্তুতে তাড়িত হওয়ারই ইচ্ছা। আসলে ভালো ইতিহাসবিদ ও নৃতাত্ত্বিকরাও এমন (তার মানে, আরো বেশি করে গুণগত সমাজবিজ্ঞান)। সুতরাং গবেষণার বিষয়বস্তু নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। তবে আপনি একদম ঠিক বলেছেন, আমার ভেতর সাবঅল্টার্ন সম্পর্কে কোনো নৃতাত্ত্বিক কৌতূহল বা ঐতিহাসিক উৎসাহ নেই। গ্রামসিকে অনুসরণ না করলেও পরবর্তী সময়ে দেখেছি যে, গ্রামসির প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল আমি। কারণ গ্রামসিও সাবঅল্টার্ন বুদ্ধিজীবী গড়ে তোলা সম্পর্কে অনেক কিছু বলেছেন এবং প্রথাগত বুদ্ধিজীবীরা মনিব-ভৃত্য সম্পর্কে থাকায় যেখানে সাবঅল্টার্ন পরিবেশ থেকে সবক পাওয়া প্রথাগত বুদ্ধিজীবীরাই অনুসারী। সুতরাং হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি, যে কাজ করে আসছিলাম, সেটা এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানসিকতা নিয়ে কীভাবে কাজ করা যায়, সেটা শেখা। আমাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত, নমশূদ্র হিন্দু— শিশুদের ভেতর গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানকে গেঁথে দেয়ার জন্য। কারণ ওরা ভোট দিতে যাচ্ছে। তো সংক্ষেপে এটা সত্যিই আমার প্রকল্প।
আপনি যেমন জানেন, গত দশকগুলোয় অক্সিডেন্টে, বিশেষত পশ্চিমে স্মৃতিসংক্রান্ত বিষয়, অভিব্যক্তি ও অতীত সম্পর্কিত ডিসকোর্স বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা স্মৃতির নজির হিসেবে ইহুদি গণহত্যা নিয়ে কথা বলেছি এবং আজকের দিনে স্মৃতি হচ্ছে আমেরিকান গণহত্যা, তুতসি গণহত্যা, কম্বোডীয় গণহত্যা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইত্যাদি সংক্রান্ত বিচিত্র প্রসঙ্গ। পাশ্চাত্য সমসাময়িক সংস্কৃতির এ গুরুত্বপূর্ণ অংশ কীভাবে সাবঅল্টার্ন পরিপ্রেক্ষিতে খাটে? এর সঙ্গে কীভাবে মিলিত হওয়া যেতে পারে?
গায়ত্রী: আমার ধারণা স্মৃতি হয়তো আজকের দিনে পশ্চিমের সরকারি ইতিহাস রচনার তাত্ত্বিক বিরোধিতা কিন্তু স্মৃতির আবির্ভাব, প্রবেশাধিকারের চেয়ে... এটা সাবঅল্টার্ন বিষয়। সাবঅল্টার্নের প্রবেশাধিকার নেই। অথচ পশ্চিমা অভিজাত তাত্ত্বিকরা সরকারি ইতিহাস রচনার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়েছেন, সাবঅল্টার্নেরও সরকারি ইতিহাসে প্রবেশাধিকার নেই। সুতরাং এক ধরনের স্মৃতি আছে বৈকি। আমি স্মৃতি সম্পর্কিত পাশ্চাত্য তত্ত্বের ব্যাপারে— বিশেষ করে গণহত্যাসংক্রান্ত বিরবণী নিয়ে— কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত। আমি গণহত্যা হিসেবে শনাক্ত করা কোনো কিছুর বর্ণনা জাতীয় কিছুকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত বলে মনে করি না। এটা অনিবার্যভাবে সেদিকেই যায়। আমি মনে করি, কেউ স্মৃতিকে সম্মান দেখাতে চাইলে সেটাকে ইতিহাস রচনাকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো কিছুতে পরিণত করা ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে আমি বিশেষ ধরনের মুখস্থবিদ্যার বিরোধিতা করেছি। অন্যদিকে সাবঅল্টার্ন স্মৃতির বেলায়, শিক্ষিত তাত্ত্বিকরা যাকে নৃতাত্ত্বিক উপাদান ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে ব্যবহার করবেন না, এ বিষয়টি রয়েছে। সুতরাং আমি সাবঅল্টার্ন স্মৃতিকে স্রেফ আপনার বিশ্লেষণ শেষে সঠিক জায়গায় তুলে রাখার মতো কিছু মনে করি না। কারণ সাবঅল্টার্ন স্মৃতি ও অভিজাত স্মৃতির ভেতর কোনো তফাত নেই। স্মৃতি এভাবেই কাজ করে, এটা মেনে নিন। আদতে প্রায়ই সাবঅল্টার্ন স্মৃতি ধর্মের মাধ্যমে সুগম হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, রণজিৎ গুহর ৩২ বছর আগে লেখা এলিমেন্টারি অ্যাস্পেক্টস অব পিজ্যান্টস ইনসার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া এবং ডব্লিউ.ই.বি. ডু বয়েসের ১৯৩৫ সালের ব্ল্যাক রিকনস্ট্রাকশন নামে চমৎকার গ্রন্থে সাধারণ ধর্মঘটে ইউনিয়ন আর্মির দাসদের যোগদান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে নজরে পড়া খুবই তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার এটা। দুজনই সাবঅল্টার্ন যেভাবে— ডু বয়েস অবশ্যই সাবঅল্টার্ন শব্দের ব্যবহার করছেন না— বিশ্ব ঐতিহাসিকতায়— প্রায় একক উপায়— ধর্মের ডিসকোর্স মারফত প্রবেশাধিকারের ধরনকে শনাক্ত করেছেন। সুতরাং সমবেত স্মৃতি নিজেই গড়ে ওঠে। এ বিষয়ে লেখার সময় ডু বয়েসের কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক, সাদা শ্রমিক ছিল এবং পরের অধ্যায় হচ্ছে ‘প্রভুর আবির্ভাব’। কারণ এভাবেই দাস-ক্রিশ্চানরা ধর্মে দাসপ্রথার অস্তিত্ব থাকার কথা বুঝতে পেরেছিল। কারণ বিশ্ব ঐতিহাসিকতায় এটাই তাদের প্রবেশাধিকার ছিল। এ কারণেই এটা এত জটিল। তো অভিজাতগোষ্ঠী একে উত্তরতাত্ত্বিক চর্চা হিসেবে কাজে লাগালে আমি পুরোপুরি সমালোচনামুখর হয়ে উঠি। সুতরাং এভাবেই একে সাবঅল্টার্নিটির সঙ্গে সম্পর্কিত করব।






