রেভারেন্ড লাল বিহারী দে সম্পাদিত ‘দ্য বেঙ্গল ম্যাগাজিন’-এর ১৮৭৩ সালের মে মাসের সংখ্যায় প্রকাশিত অজ্ঞাত লেখকের ‘এক্সপেরিয়েন্সেস অব আ বেঙ্গলি মানি লেন্ডার’ শীর্ষক রচনার অনুবাদ ভাষান্তর: শানজিদ অর্ণব
‘অবিশ্বাসী কুকুর’, ভিড়ের মধ্যে পাশ কাটানোর সময় ইহুদি আইজ্যাকের উদ্দেশে বলে উঠল টেম্পলার। সব অপমান হজম করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আইজ্যাক বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়। যদি আমাকে এমনটা বলে আপনার শৌর্য রক্ষিত হয়, তবে তাই’— আইভানহো
কেউ একজন লিখেছিলেন, ‘ঋণদাতা বা গ্রহীতা কোনোটাই হয়ো না।’ তবে আমি মনে করি, যিনি এমনটা বলেছিলেন, তিনি দুনিয়া ও এর রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ। এক কাছের বন্ধু জানিয়েছেন উপদেশটি শেক্সপিয়ারের (হ্যামলেট), যা পরে বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন গ্রহণ করেছিলেন। সেই বন্ধুটি আরো বলেছেন, শেক্সপিয়ার ও বেঞ্জামিন উভয়ই দুনিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। তারা বাণিজ্য সম্পর্কে যেসব পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলোর খুব কমই অলাভজনক বা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। স্বীকার করতে দোষ নেই, আমি শেক্সপিয়ার বা ফ্রাংকলিন কাউকে নিয়েই বেশি মাথা ঘামাইনি। দুনিয়া নিয়ে তাদের যত জ্ঞানই থাকুক না কেন, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের উপদেশ যতই কাজে লাগুক না কেন, ঋণ বিষয়ে তারা উভয়ই ভ্রান্ত ছিলেন। আমি মনে করি, তাদের পরামর্শ গ্রহণ করলে দুনিয়ার অর্থনীতি স্থির হয়ে যেত। কোনো সন্দেহ নেই, বাংলার জীবনযাত্রা একেবারে থমকে যেত। আমি ৫৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঋণের মহাজনির কাজ করছি। অনেক লম্বা সময়— একজন সিভিল সার্ভেন্টকে পেনশন পর্যন্ত যতদিন কাজ করতে হয়, সময়টা তার চেয়েও অনেক বেশি। আমি প্রতিদিন মানুষকে দেখেছি, যাদের টাকা ধার করা প্রয়োজন হয় পরিবারকে অনাহার থেকে রক্ষা করতে বা অন্য কোনো ঋণ পরিশোধ করতে, একটা দিনও দেখিনি, যেদিন কেউ টাকা ধার নিতে আসেনি। এখন আমি যদি শেক্সপিয়ার বা ফ্রাংকলিনের কথা মানতাম, যদি তাদের টাকা ধার না দিতাম বা তারা যদি আমার কাছে আসতে বাধা পেত, তাহলে কী হতো? তাদের পরিবার না খেয়ে থাকত, তাদের দেনা শোধ হতো না এবং মাঝখান থেকে আমি কিছু আর্থিক লাভ থেকে বঞ্চিত হতাম। এই নেতিবাচক ফলগুলো কারোর জন্যই উপকার বয়ে আনত না, উল্টো মানুষের বিভিন্ন রকমের ক্ষতি হতো। আমার কাজের সমর্থনে সরকারি ঋণ, কাগুজে টাকা এবং অর্থ সংগ্রহের আরো উপায়ের কথা শোনাতে পারি, কিন্তু আমি সেগুলো সম্পর্কে ভালো জানি না এবং এসব বিষয় আমাকে ভীত করে তোলে। আর এসব আলাপে গিয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। এবার আমি সরাসরি আমার মূল বিষয়ে ঢুকতে চাই। জানি না আমার বিবরণী পাঠককে কতটা আকর্ষণ করতে পারবে। তবে আমার লেখায় কেউ বৈচিত্র্যের অভাব পাবেন না। আমার পেশার কাজ চলেছে স্কুলে, কৃষিজমিতে, গ্রামে, শহরে। ক্লায়েন্টদের মধ্যে আছেন স্কুলের শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, কেরানী, বণিক, নাবিক, বাবু, আইন ব্যবসায়ী। জীবনের যত পর্ব বাংলায় দেখা যায়, তার সবগুলোই আমি দেখেছি। একটি গোষ্ঠী থেকেই কেবল আমি নিজেকে সবসময় দূরে রেখেছি, তারা হলো রানীর সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা। আমার সরলতা বলতে বাধ্য করছে যে, এ সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের কাছ থেকে আমি প্রচুর আবেদন পেয়েছি (বিশেষত তরুণ কর্মকর্তাদের), কিন্তু তাদের সবার প্রতিই আমার শুষ্ক উত্তর ছিল এ রকম—
‘মহোদয়,
আমি একজন দরিদ্র মানুষ। আপনার উপকার করার কোনো সামর্থ্য আমার নেই।’
অনেকে আমার এ উত্তরের জন্য আমাকে ‘বুড়ো মিথ্যুক’ নামে ডাকত। অনেকে প্রার্থনা করত আমি যেন নরকে জ্বলে-পুড়ে মরি। কিন্তু তারা কেউ আমার পকেট থেকে একটি রুপিও বের করতে পারেনি। আমার কাছে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও আমি সিভিল সার্ভেন্টদের আবেদনকে সবসময় এড়িয়ে গিয়েছি এবং সত্যিই সবসময় আমি তাদের মিথ্যা বলে এসেছি। পাঠকরা এ মিথ্যা বলার জন্য আমাকে দোষী ভাবতে পারেন। কিন্তু তারা হয়তো বাংলার ঋণদাতাদের প্রকৃত অবস্থা ভালোভাবে জানেন না। কেউ বলতে পারেন আমাদের আত্মা মিথ্যা আর শপথভঙ্গে কলুষিত। তাহলে এবার আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করব। কাজ করতে গিয়ে সিভিল সার্ভিস ব্যতীত আমি বিভিন্ন পেশার মানুষের দোষ-গুণ বুঝতে পেরেছি। আমাদেরকে যেভাবে ‘রক্তচোষা’ বা আরো যেসব নেতিবাচক উপাধিতে ভূষিত করা হয়, সেগুলো একেবারেই সঠিক নয়। বরং উকিলদের মতো সমাজে আমাদের অনেক প্রয়োজনীয় অবদান আছে।
ঋণদাতাদের ব্যাপারে যেসব কুসংস্কার তৈরি হয়েছে, সেগুলো অধিকাংশেরই জন্ম সাম্প্রতিক সময়ে। আমি যখন এ ব্যবসা শুরু করি বা যখন প্রথম আমি এর সুবিধাগুলো পর্যবেক্ষণ করেছিলাম, তখন ঋণদাতাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা শুনিনি। সে সময় আমাদের মানুষ ছিল সাদাসিধে, বিদেশী কোনো ধারণা তাদের মনে তখনো জন্মায়নি। সবাই সন্তুষ্টচিত্তে পূর্বপুরুষদের রাস্তায় চলত। এরপর শুরু হলো ইংরেজকরণ, তবে বিদেশীরা আমাদের নিয়ে কী বলত, কী ভাবত, তা নিয়ে আমরা পাত্তা দিতাম না। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বা আমি বলতে চাই দেশে উচ্চশিক্ষা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। তরুণরা আমাদের বিভিন্ন ধরনের প্রাচীন রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ শুরু করল। আমাকে ছোটবেলাতেই শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, একমাত্র শিক্ষাই কোনো মানুষকে অর্থ উপার্জনের যোগ্য করে তোলে। এবং এটা আমি এখনো বিশ্বাস করি। এখন ধরা হচ্ছে, শিক্ষার নিজেরই একটি মূল্য আছে, যা তার অর্থমূল্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রজারা যেন জমিদারদের সুবিধা নিশ্চিত করতেই বেঁচে থাকেন। বলা হচ্ছে, এখন তাদের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে, তারা অনেকে এমনকি জমিদারদের মতোই সুখে আছেন। যে ব্রাহ্মণদেরকে আমি আগে সম্মান করতাম, এখনো করি, তারাও এখন আমাদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে এবং গোপনে ঘৃণামিশ্রিত মন্তব্য করেন। আমার এই বুড়ো চোখের সামনে সবকিছু যেন উল্টে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো সন্দেহ নেই যে ঋণদাতারা হেনস্থা হবেন। আমার সহগোত্রীয়রা যখন হেনস্থা হচ্ছেন, তখন আমার হেনস্থা হওয়া নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকা উচিত নয়। কিন্তু আমাকে নীচ, জঘন্য মানুষ বলে অপমান করে পরের দিনই আমার কাছে ‘মাত্র কয়েক রুপি’ ধার চাওয়াটা কেমন দেখায়! আমাদের যে হেনস্থা করা হতো, তা অত্যন্ত ক্ষতিকর। তবে কেন যে এ নিগ্রহ চলত, সেটা কখনই বোঝা যেত না। যদি আমাদের কাজ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম থাকত, তাহলে কেউ বলতে পারত যে আমি অমুক কাজটি ঠিক করিনি। কোনো নীতির
পরিবর্তে আমরা বরং অস্পষ্ট বাগাড়ম্বরের শিকার হতাম। এ রকম অসুস্থ ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা আগে কখনো বাংলায় ছিল না। আমাদের নিগ্রহকারীদের চেপে ধরলে তারা বলত, ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য সমৃদ্ধ দেশে এ টাকা ধার দেয়ার কাজ করে কিছু মানুষ, যাদের হাঙরের মতো ঘৃণা করা হয় এবং সমাজে তাদের সম্মানজনক কোনো স্বীকৃতি নেই। এরা ছিল নীচু গোত্রের ইহুদি এবং তাদের খলচরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কেউ সুদে টাকা ধার দিলে তাকে ইহুদি বলে গণ্য করা হতো। তার নিকটাত্মীয়রাও তাকে ত্যাগ করত। ইউরোপে আমাদের সমগোত্রীয়দের অবস্থা যদি এমনটা হয়, তাহলে সেটা মোটেও সুখের কোনো বিষয় নয়। তাই আমার মনে হয়, ইউরোপীয় সমাজে কিছু গুরুতর সমস্যা আছে। আমি ভাগ্যবান যে, আমি এ রকম কোনো দেশে জন্মাইনি। আমাদের হেনস্থাকারীরা বলে যে মুসলমানরাও তাদের লেনদেনের ক্ষেত্রে এমন খুঁতখুঁতে নয়, তারা কখনো নিজেদের ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাউকে সুদে টাকা ধার দেয় না। আমাদের হেনস্থাকারীদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। টাকা ধার দেয়া যদি অবাঞ্ছিত হতো এবং এতে যদি সমাজের ক্ষতি হতো, তাহলে সেই বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই এবং এটাও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মুসলিম শাসকরা এ দেশে ঋণদান ব্যবস্থা চালু করেননি। এখন আমাদের সমাজে যেসব অনৈতিক বিষয় ক্রিয়াশীল, তার সবগুলোর জন্যই মুসলিম শাসকদের দায়ী করা হয়, এ দাবির কিছু সত্য আবার কিছু মিথ্যা। অনেকে কোনো প্রমাণ ছাড়া এটি পর্যন্ত বলে থাকেন যে আমাদের সংগীতের বর্তমান দুরবস্থার জন্যও মুসলমানরা দায়ী! কিন্তু ঋণদান বিষয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কিছু বলার নেই। মুসলিম আইন প্রণেতারা তাদের ধর্মাবলম্বীদের সুদে টাকা ঋণ দেয়ার বিষয়ে বাধা দেন। তাই তারা মুসলিম ঋণদাতাদের দ্বারা নানা সমস্যায় পড়েছেন বলেই আমার সন্দেহ। আমি সারা জীবনেও বুঝতে পারলাম না যে মুসলিমদের সঙ্গে কোনো সংসর্গ না থাকা; তাদের সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে আমার কোনো মিল না থাকা এবং যাকে মুসলমানদের ধর্মীয় বিধিবিধান বিনীতভাবে ঘৃণা করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং যার ধর্মে এ ব্যবসা নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই, তাকে কেন হেনস্থা করা হবে। তদুপরি এ ব্যবসা আমার জন্য ভালো উপার্জনের ব্যবস্থা করেছে এবং আমার সন্তানদের দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্ত রেখেছে। আমি আবারো বলতে চাই ঋণ দেয়া মহাজনদের অযৌক্তিকভাবে হেনস্থা করা হয়। এবং বাংলার আর্থসামাজিক পেক্ষাপটে ঋণের প্রয়োজনীয়তা আছে। তাদের প্রতি এত নিগ্রহ ও কুসংস্কার সত্ত্বেও আমরা কুসীদজীবীরা কীভাবে পোদ্দারি চালিয়ে গিয়েছিলাম, সে প্রশ্ন অবশ্যই উঠতে পারে। জবাবটা প্রস্তুত করাই আছে— আমরা নিষ্ঠুরভাবে সুদ আদায় করি, তা সে হোক বিধবা কিংবা এতিম। তবে আমাদের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ আমাদের অপকারের চেয়ে উপকারই বেশি করেছে। আমরা আজ যতটুকু ভালো আছি, তাতে এ যুদ্ধেরও অবদান আছে।
পরিস্থিতি অবশ্য অন্য রকম হতে পারত না। বাঙালি সমাজে সবাই একেকজন মহাজন। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত— নারী, পুরুষ, শিশুনির্বিশেষে সবাই সুদে টাকা কামাতে ভালোবাসে। এ ইচ্ছা এতটাই প্রবল যে অনেকের জন্য পোদ্দারি করাটা রীতিমতো নেশা হয়ে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক পেশা। আমার এক বন্ধু আছে যে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সে অর্থই আবার অন্যদের সুদে ধার দেয়, এ বন্ধুটিকে নিয়ে পাঠক কী বলবেন! আবার আরেকজনকে জানি যে চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে মাত্র ৮ শতাংশ হারে সে টাকা অন্যদের ধার দিয়েছে। আমার পেশাকে আমি অন্য সহকর্মীদের মতোই ভালোবাসি। তবে আমি কখনো কেবল আর্থিক লাভ ছাড়া কেবল ধার দেয়ার জন্য কাউকে টাকা দেইনি। আমার অভিজ্ঞতা বলে নারীরা টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে ভালো। তারা শুধু ধার দেয়ার উদ্দেশ্যে ধার দেন না। তাদের সুদের হার মোটামুটি এক রকম— প্রতি রুপিতে মাসে ১ আনা; আমি জানি এটা হচ্ছে বার্ষিক ৭৫ শতাংশ। আরেকটি বিষয় হচ্ছে নারীরা নীরবে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যান। তারা কখনো শোরগোল তোলেন না, ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে কোনো কাগুজে প্রতিশ্রুতি নেন না, তাদের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনাও বিরল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তারা সুদ বা মূলের একটি পয়সাও কখনো খোয়ায়নি। নারী মহাজনরা শুধু নারীদেরই ধার দিতেন। লেনদেন হতো অন্তঃপুরে, ঋণগ্রহীতারা সেখানে তাদের জামিন নিয়ে আসত— আর তা হতো সাধারণত সোনা বা রুপার গহনা। অনেক সময় কাপড় কিংবা ঘরের তৈজসপত্রও রাখা হতো। এ লেনদেনের জন্য কোনো সাক্ষী উপস্থিত থাকত না। মাসে মাসে মহাজনের কাছে সুদ পৌঁছে যেত এবং নির্দিষ্ট সময়ে মূল্যও শোধ হতো, তিনি তখন জামিন রাখা অলঙ্কার ফিরিয়ে দিতেন; ব্যস লেনদেন শেষ। কোনো পক্ষ থেকেই লিখিত দলিল রাখা হতো না। সব হিসাব করা হতো মনে মনে এবং আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে মহাজন কখনো হিসাবে ঠকতেন না। পুরুষ কুসীদজীবীরা তাদের নারী সহকর্মীদের মতো এত বিচক্ষণ ছিলেন না, তার ওপর তাদের আরো অনেক জটিল পরিস্থিতিতে জড়িয়ে যেতে হতো। ফলস্বরূপ তারা অনেক সময় তাদের মূলধন হারাতেন। তবে এক জায়গায় টাকা হারালেও আরো ১০০ জায়গায় অন্তত তারা মুনাফা করতেন। স্কুলের ছেলেরাও টাকা ধার দিত এবং তারা কখনো টাকা খোয়ায় না। ছাত্রদের মধ্যে টাকা লেনদেন হতো স্কুলের বই বা অন্যান্য ছোটখাটো কিছু জামিন রেখে। এসব ঋণ দেয়া হতো খুবই কম সময়ের জন্য, আর সুদের হার হতো রুপিতে মাসে ১ থেকে ২ আনা। এটা স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, বাংলার সমাজে সব স্তরেই ঋণ দেয়া-নেয়াকে একটি বৈধ পেশা হিসেবে দেখা হয়। তাই সমাজ থেকে এ পেশার মানুষকে উচ্ছেদ করাটা কোনো সহজ কাজ নয়।
একসময় আমি ভাবতাম কলেজ পাস করা ছাত্ররা আমাদের সবচেয়ে বড় বিরোধী হয়ে উঠবে, কারণ তারা গোঁড়া যেকোনো বিষয়কে ঘৃণা করে এবং প্রাচীন রীতিপ্রথার বিরোধী। আমার ধারণা ছিল তারা উদাহরণ ও ধারণার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে পোদ্দারি ব্যবসা থেকে দূরে থাকার উৎসাহ জোগাবে।
আমার আশঙ্কার কোনোটাই সঠিক হয়নি। আমাদের আক্রমণ করা বা তরুণদের তাদের প্রভাববলয়ে নেয়ার পরিবর্তে তারা বরং আমাদের কাছে এল। অনেক গ্র্যাজুয়েট আমাদের পেশায় এসেছেন এবং আমার কোনো সন্দেহ নেই যে আরো অনেকে আসবেন। এ শিক্ষিতদের মধ্যে যারা মফস্বল ও গ্রামে বসত করেছিলেন, তারা তাদের চালাকি আর উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে স্থানীয় বুড়ো মহাজনদের প্রায় হটিয়ে দিল। আমি আন্তরিকভাবে চাই, দেবতা আমাদের নিয়তি নির্ধারণ করেন, তিনি যেন এদের মঙ্গল করেন। আমাদের মহাজনদের সঙ্গে ইউরোপের ঋণদাতাদের তুলনা করুন! কী পার্থক্য। সামাজিক কলঙ্ক হওয়ার পরিবর্তে কুসীদজীবীরা বাংলায় সামাজিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছে। ঘৃণিত হওয়ার পরিবর্তে আপনাকে শুধু সাধারণ মানুষ নয় বরং সরকারি কর্তারাও কাছে ডাকছে। নিজের মুখ লুকানোর পরিবর্তে পৌরসভার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হবে এবং বাঙালি সমাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্য আপনার সাহায্য চাওয়া হবে। ভাইসরয়ের দপ্তর এবং বৈঠকখানাও আপনার জন্য উন্মুক্ত। সব ধরনের পার্টিতে আপনাকে দাওয়াত দেয়া হবে। আপনার স্ত্রী আপনাকে হূদয়হীন বলে ভর্ত্সনা না করে বরং আপনাকে আরো বেশি অর্থ সংগ্রহে সাহায্য করবে। আপনার ভালোবাসার ধন পুত্র বিধবা ও এতিমদের সঙ্গে আপনার লেনদেনে কোনো দোষ খুঁজবে না। এক বা দুই বছরে যদি কোনো ক্ষেত্রে ৫০০ বা ৬০০ শতাংশ লাভ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে সবাই আপনাকে বুদ্ধি ও দূরদর্শিতার জন্য প্রশংসা করবে। এর চেয়ে ভালো আর কোনো পেশা আছে? আমরা যদি আমাদের গ্রাহকদের ধুলায় মিশিয়ে দেই, আমরা যদি বল প্রয়োগে কারোর ঘরবাড়ি ভেঙে দেই, আমরা যদি মানুষকে চাপ দিয়ে তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেই, এতিম ও বিধবাদের সঙ্গে যদি আমরা প্রতারণা করি, আমরা যদি শ্রমজীবীদের দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে রাখি এবং এর মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার উন্নতিতে বাধা দেই, আমাদের জন্য সমাজের নৈতিক উচ্চতা যদি খর্ব হয়— এসব যদি আমরা করতাম, সমাজ আমাদের কাজে কখনই সমর্থন দিত না, নিজের পুত্রদের মতো আমাদের খোঁজখবর রাখত না। আমার পেশার সমর্থনে কথা বলতে বলতে আমি ক্লান্ত। ভবিষ্যতে আমার কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আরো লেখার ইচ্ছা আছে।






