অবশেষ মনি ডোমের চাকরিটা হয়েই গেল। স্কুলের ঝাড়ুদার। একই সঙ্গে টয়লেট পরিষ্কার, পানি দিয়ে টয়লেটের ভেতর চৌবাচ্চা ভর্তি করাসহ প্রতিটি ক্লাসরুম সপ্তাহে একদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা— এসব সামান্য কাজের জন্য তাকে বিজ্ঞ কমিটি অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ৩০০ টাকা সাকূল্যে বেতন ধার্য করল। মনি ডোম ও তার বৌ মহাখুশি।

বোঝা গেল না চাকরি পেয়ে খুশি, নাকি বেতন পেয়ে খুশি।

মনি নয়, মনির বৌ হেডমাস্টারের পায়ে ধরল—

‘বাবুজি, তুই মোর মরদরে নুকরি দিয়াছস, মুই তোর বান্দি হইয়া গেল। এ কথাসকল মনির বৌ সুখি হেডমাস্টারকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বলতে গেলে হেডমাস্টার তাকে বলল, ‘ওই যে বললি, কি জানি, বান্দি হয়ে থাকবি, কথাখানা মনে রাখিস।’ এ কথাখানা মনে রাখার কী প্রয়োজন, সুখি তা বুঝল না। হয়তো সব কিছু, কঠিন কিংবা সহজ, যাদের জীবন জীবনের মতো নয়, তাদের বোঝার দরকার নেই।

সে ঘাড় কাত করল, যেন সব সে বুঝেছে।

আজাহার দপ্তরি পেশাগতভাবে জ্যেষ্ঠ, মনিকে কাজ বুঝিয়ে দিতে লাগল, ‘১৮টি ক্লাসরুম, আরো পাঁচটি অন্যান্য রুম, মোট ২৩টি রুম ঝাড়বি। টয়লেট পরিষ্কার করবি, পানি দিবি। এছাড়া কাপড়হাটী সাফ করবি প্রতি শুক্রবার, বুঝলি? তোরা তো মদখোর। মদটদ খেয়ে স্কুলে আইবি না, মাতলামি-ছাদলামি বাদ।’

মনি জিব কাটল।

‘বাবুজি, হাম কুইথন মদ পিয়া? মোর লাইসেন ভি কেতু মাত্তবর লে গিয়া। মাত্তবর মদ পিয়া। হামকো একটু-আধটুক দি গিয়া। নেশা নেহি হুয়া।’ এরপর সুখিকে সাক্ষী মানল, ‘বল না বৌ, মুই সাচ বুলগিয়ানা?’

কিন্তু সুখি কিছু বলার আগেই আজাহার বলল—

‘মাতবর খাবে তো খাবে। সম্মানী লোক নিয়ে কথা কবি না। তোর চাকরি থাকবে না।’

খুবই মারাত্মক কথা। মদ খাওয়া ও চাকরি চলে যাওয়া।

কিন্তু মদ না খেলে ডোমগোষ্ঠী, গু-মুত পরিষ্কার করা যাদের পেশা, তারা এসব করবে কীভাবে? কেতু মাতবররা কী ময়লা সাফ করবে? এ কথা মনে করে ধূসর আকাশের দিকে তাকাল মনি। মাতবর যা করে, মনি ভাবল, শুয়ার কি বাচ্চা, তার লাইসেন আটকে রাখে, মনি মদ এনে না দিলে হুমকি দেয়।

মনি ঠিকঠিকমতো কাজকাম বুঝে নিল। পরের দিন ৭টা থেকে তার আগমনের সময় নির্ধারণ করে দেয়া হলো।

মনি তার বৌ সুখিকে নিয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে সুখি ও মনি হেডমাস্টারের সঙ্গে দেখা করল।

‘বাবুজি, আদাব। মোরা যাইতাছি।’ ওরা দুজন একসঙ্গে বলে উঠল।

আসলে চাকরিটা কার— বোঝা মুশকিল, মনির না ওর বৌ সুখির, দুজনে একে অন্যের হয়ে কিংবা একত্রে মিশে গিয়ে কথা বলা ও যাবতীয় কিছু করছে।

‘তাহলে কাল থেকে ঠিকঠাক চলে আয়। কাজে ফাঁকিটাকি মারবি না,’ হেডমাস্টার বলে দিয়েছিলেন।

পরদিন নির্ধারিত সময়ে মনি স্কুলে হাজির হলো। তার দুহাতে দুটি ঝাড়ু। ঝাড়ুর মুঠোতে লম্বা বাঁশের দণ্ড। একটি বড় ঝাঁকা দড়ি দিয়ে কোমরে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে এসেছে। উদোম গা। মাথায় গামছা বাঁধা। মেদহীন পুরুষ্টু শরীর, কাঠামোবদ্ধ, খুবই অত্যাধুনিক দেহ। একটাই সমস্যা— সে ডোমগোত্রীয় এবং মানববিষ্ঠা পরিষ্কারক। যা আমরা দীর্ঘসময় পেটের ভেতর যত্নে লালন করি, এক সময় মহানন্দে পেট থেকে নির্গত করি। আহা, সেগুলোই তারা পরিষ্কার করে আমাদের কাছে ঘৃণার পাত্র ও অচ্ছুত হয় এবং একই কারণে সারা মাসের শ্রম ও ঘাম বিক্রি করে ৩০০ টাকায়, তাও বহু শর্তের বিনিময়ে।

মনি স্কুলের বারান্দায় পা দিয়েই হাঁক মারল,

‘বাবুজি হাম আ গিয়া।’

তার এই অদ্ভুত ভাষার উত্তর দেয়ার জন্য কেউ কাছে নেই কিংবা তাকে গ্রহণ করারও কেউ নেই।

এগিয়ে এল নিত্যসময়ের সঙ্গী সুখি ডোম, যার আসার কোনো হেতুই নেই। এল পেখম তুলে, দুহাতে হাঁটুর কাপড় উপরে  তুলে। এক পেঁচি কাপড় বড় মনোহর, দুনিয়ার কাউকে তার মতো মানাবে না। সে পাল্টা হাঁক দিল,

‘হাম মরদের মাগি আগিয়া, কুচ পরওয়া নেহি। তু কাম লাগায়া।’ এ এক ধরনের দেহাতি ভাষা, ওদের মুখে অদ্ভুত রস সিঞ্চন করে।

‘হা হা বৌ, তো রামের নাম লিলাম, ঠিক হ্যায়?’

মনি সুখির দিকে, অনেকটা অনুমতি চাওয়ার মতো করে তাকাল।

‘রাম, রাম’ সুখি বলল।

অতঃপর মনি ক্লাসরুমে ঢুকে পড়ল।

মনে হয় সুখির কোনো কাজ নেই, মনিকে নিরাপত্তা দেয়া ছাড়া। সুখি দেয়াল ঘেঁষে হেলান দিয়ে বসে পড়ল মাথা পিছনে উঁচু করে, দু’হাত হাঁটুর ওপর রেখে। স্কুলের মাঠে সকালের রোদ ঝিকঝিক করছে। তারই আলোকচ্ছটা সুখির কপালে আলতো ছোঁয়াল। সে মাথা ঈষৎ কাত করে মনির কক্ষের দিকে তাকিয়ে রইল নির্নিমেষ।

মনি ডোমের চাকরি হয়েছে— এ খবর মনি যে বস্তিতে বসবাস করে চল্লিশ ঘর বাসিন্দা নিয়ে, স্কুলের উত্তর পাশে বজার, বাজারের উত্তর পাশে গাঙ, গাঙের উত্তর পাশে গোরস্তান, তার পাশেই সেই প্রাচীন বস্তি, সেখানে বাতাসের ধায় চাউর হলো। চিলতে ঘর থেকে রুহিণীর মা অলকা, সে একজন থুত্থুড়ে বুড়ি, লাঠি হাতে কুঁজো হয়ে কিন্তু এই মুহূর্তে সে জোয়ানের মতো। ঘরে ঘরে খবর পৌঁছে দিল, ‘মুই লাতি মন্নি ভি নকরি হুগায়া। ৩০০ রুপিয়া মাইনা হুগা।’ বুড়ি প্রতি ঘরে যায় আর বলে। চৌকাঠের পাল্লা ধরে সবাই শোনে, আর একজন ডোমের চৌদ্দপুরুষের মধ্যে শেষতক এসে একজনের চাকরি হওয়ায় খুশির বান ডেকে যায়।

ডোমদের বস্তি কত প্রাচীন, কেউ বলতে পারে না। ওদের কেউ কেউ আগে ঘোড়ার গাড়ি টানত, মাছ, কাছিম ও কুচিয়া প্রিয় খাবার ছিল। এখন অবস্থা পাল্টেছে। দিন বদলের সঙ্গে পেশার পরিবর্তন হয়েছে। একদল বাড়ি বাড়ি গিয়ে পায়খানা পরিষ্কার করে, মেথর শ্রেণীভুক্ত তারা। একশ্রেণী বাজারের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করে। তারা হাটবারে দোকান থেকে মজুরির বিনিময়ে ‘হপ্তা’ তোলে, এটাই তাদের জীবিকা। যারা একটু অবস্থাপন্ন, তারা কুলিগিরি করে। ঢাকা নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্রান্সপোর্টের গাড়ি আসে। তারা মাল খালাস করে বাজারের ব্যবসায়ীদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়।

কয়েক ঘর আরো উন্নত শ্রেণীর। তারা বুট-বাদাম ভেজে বাজারে বিক্রি করে। দু’পয়সা কামাই করে। কিছুটা পরিচ্ছন্ন থাকে। লেখাপড়ার ধার ধারে না কেউ। এদের মধ্যে মনি শিক্ষিত এই অর্থে যে, সে নিজের নাম লিখতে জানে, যদিও গবেষণার বিষয় হবে সে নাম উদ্ধার করতে। তা হোক, সে তা পারে এবং এজন্য বস্তিতে তার সম্মান বেশি। নিজেদের মধ্যে সমস্যা হলে উঠোনে চট বিছায়, মনি মাঝখানে বসে মীমাংসা করে দেয়। সবাই তা মেনে নেয়।

এই তো সেদিন নিজেদের মধ্যে মস্ত এক ফ্যাসাদ হয়ে গেছিল। মাতব্বরবাড়ির পায়খানার পাইপ ফেটে গিয়ে মলটল সব বেরিয়ে ইয়াকথু ইয়াকথু, দেহ অভ্যন্তরস্থ নাড়িভুঁড়ি পচা দুর্গন্ধে যখন ওলট-পালট হচ্ছে, তখন দু’টাকা বেশি পেয়ে পলক ডোম দৌড়ে গিয়ে পরিষ্কার ও ঠিকঠাক করে দিয়ে এসেছিল। এ নিয়ে বেধে গেল তুমুল হট্টগোল। কেননা সিধু ডোমের এলাকা ওটা, সে চিৎকার করে উঠল,

‘এই মোর পয়দা পলকা এদার আও, তু ছালা ক্যায়ছা মাতবার কা গু ছাফ কর না হুয়া? উয়া ভি মেরা ইলাকা নেহি?’ তার পর পলকের ওপর হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ডোমেরা এগিয়ে এল। সিধুর হাত থেকে পলককে বাঁচাল।

মনি ডোম, যে হলো শিক্ষিত, বস্তিতে ছিল না। চোলাই আনতে গিয়েছিল সখিপুর। আনা কি এতই সহজ? রাত্তির কালো আন্ধার হয়ে গেল। ঘরে ছিল কাছিমের লাল টকটকে গোশত। ভেবেছিল ভগবানের নামে, রামের নামে গলাটা ভিজাবে, কিন্তু বস্তিতে ঢুকেই ‘ইয়া কিয়া খবর হ্যায়!’ সিধু ও পলকা কাজিয়া লাগা? তারপর চোলাইয়ের হাঁড়ি সুখির হাতে ধরিয়ে দিয়ে গর্জন করে উঠল, ‘সিধু আওর পলকা এধার আনা।’

একে একে বস্তির চিলতেপটকা ছাপড়া থেকে ডোমেরা বের হলো। ছোট্ট উঠোনে বারোয়ারি চট বিছানো হলো। মনি ডোম বিচারকের আসনে বসল। উভয়ের কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে তাত্ক্ষণিক রায় দিল, পলক মাতবরবাড়ির গু.ময়লা সাফ করে যে টাকা পেয়েছে, সেখান থেকে সিধুকে কুড়ি রুপিয়া দিতে হবে। এখন থেকে বিনা অনুমতিতে কারুর এলাকায় কেউ যেতে পারবে না।

‘সাচ বিহিত হুয়া’ এই বলে ডোমেরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল— মনি ডোম লয়গো, শিক্ষত মনি, বাহবা বাহবা। তারপর তারা মনির চোলাই রামের ‘লাম লিয়ে’ গলা ভিজাতে লাগল।

রাত গভীরতর হচ্ছে। আকাশ অন্ধকার। জোছনার বালাই নেই। মিটমিট করে তারারা আকাশ ছেয়ে আছে। কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে জোয়ান বুড়ো চক্রাকারে বসে চোলাই খাচ্ছে। দু-একজন নারী ডোম ঘরের মধ্যে। ঘর তো নয়, চার বাঁশের খুঁটির ’পর কোনোভাবে আটকানো কয়েকটি টিন। চোলাই টেনে খড়ের বিছানায় বিভোর ঘুম।

সুখি আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরুল। পেছনের ঝোপজঙ্গলে ঢুকে দু’হাতে মাটি খামচে মাটি সরাল। একটি তক্তা বিছানো। হেঁচকা টানে তক্তা উঠিয়ে আনল। একটি মাটির হাঁড়ি। বেশ ভারী। হাঁড়ির চারদিকের মাটি আলগা করে খুব যত্নে, যেন ভেঙে না যায়, এমনভাবে আলতো করে টেনে তুলল। এর ভেতরে আছে সুখির নিজের হাতে তৈরি খাঁটি জিনিস। গরম ভাতের পানি, তেঁতুল, শুকনো মরিচ ও আরো কিছু গোপনীয় উপাদান মিশিয়ে মাটির নিচে রেখেছিল দীর্ঘদিন। এখন তা পচে কড়া ও খাঁটি মাল তৈরি হয়েছে। সুখির মা, মহাখালী বস্তির বাসিন্দা ছিল। এখন মরে ভূত, তাকে শিখিয়েছিল। সুখি ঢাকনা খুলল। ‘আহ্, কি গেরান!’ সুখি নিজেই মোহিত হলো। তারপর চারদিকে একবার সতর্কতার সঙ্গে দেখে নিয়ে, ঠোঁট দুটি চোঙ্গার মতো গোল করে, ঘে ঘে করে অস্ফুট কিন্তু তীব্র শব্দ করল। অদূরে কাছরা থেকে একটি ছায়ামূর্তি মাটি ফুঁড়ে যেন বের হলো। সন্তর্পণে ছায়াটি এগিয়ে এল সুখির সন্নিকটবর্তী।

‘রুপিয়া কাঁহা?’ সুখি ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল।

হাত বাড়িয়ে মূর্তি রুপিয়া ধরল। সুখি ছোঁ মেরে রুপিয়াগুলো নিয়ে ট্যাঁকে গুঁজে ফেলল।

এটা সুখির গোপন ব্যবসা। কেউ জানে না, মনি পর্যন্ত না।

সুখির বহুত রুপিয়া প্রয়োজন। কত রুপিয়া? সে নিজও জানে না। কীভাবে জানবে জীবনের অদেখা খণ্ডবিখণ্ড কল্পনাগুলোকে, যার সম্মুখীন সে কখনো হয়নি?

এই ডোমগোষ্ঠীর ভেতর ওলট-পালট খেতে খেতে তার অনাগত বেটা বেড়ে উঠুক, তা সে চায় না। একদিন সে মা হবে, তার বেটা শিক্ষিত হবে। তারা আর এ বস্তিতে থাকবে না।

শহরে যাবে। তাকে মানুষের বর্জ্য, হাটবাজার, রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতে হবে না। মানুষ হয়ে শিয়াল-কুত্তার মতো বাঁচতে হবে না। মাথাখানা খাড়া থাকবে। কিন্তু কবে হবে তার বেটা? সুখি রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরের উঠোনে ডোমেরা চোলাইয়ের নেশায় বেপরোয়া হট্টগোল শুরু করেছে। সুখির বুক থেকে দীর্ঘশ্বাষ বেরিয়ে এল।

পরদিন ডোমদের ভোর হলো একটু দেরিতে।

মনির স্কুলে যেতে হবে ৮টায়। সে হাঁকডাক শুরু করে দিল। সুখি মনির সঙ্গে চলল। মনির হাতে ঝাকা। ঝাড়ু হাতে সুখি। মনি মাথা পরিপাটি করেছে। অল্প ছেঁড়া একটি লুঙ্গি পরেছে। ঘাড়ে গামছা। স্কুল বলে কথা। তাকে তো পরিপাটি হতেই হবে!

মনি খুব যত্নে ক্লাসরুম, দেয়াল ও ছাদের কোনাকানি, বিদ্যালয় সম্মুখসহ মাঠ, এমনকি ফ্যানগুলো পর্যন্ত গামছা ভিজিয়ে মুছে দেয়, যা তার নিয়োগশর্তের মধ্যে ছিল না। ‘ইয়ে মেরা সাচ কাম হায়। ছাত্রা মেরা ভাই।’ মনি মনে মনে ভাবে আর পুলকিত হয়। আসলে মনি যা ভাবে, তা বিস্ময়কর। তার জানামতে স্কুল পবিত্র জায়গা। একে সুন্দর রাখলে ভগবান রাম খুশি হবেন। কোথাও একটুকু কাগজ দেখলে সে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দেয়। এভাবে মনির হাতে স্কুল হেসে ওঠে।

মনি কাজ করে উদাম গায়। মনে হয় তার কোনো ক্লান্তি নেই।

এভাবে নিরলস আনন্দে বিভোর হয়ে প্রতিদিনের শ্রম মনিকে মাতিয়ে রাখে। সুখি যদি তার শ্রম বিক্রির বায়না না থাকে, বরাবরই মনির সঙ্গী হয়। সে যেন মনির অনুপ্রেরণা, উদ্দীপনা। মনি কাজ করে, সুখি তার দিকে তাকিয়ে থাকে বেদনাবিধুর অনুরাগে।

মনির চাকরির ছয় মাস অতিবাহিত হলো। মনি ও সুখির জীবনপথ এক সরলরেখায় অতিক্রম করছিল। স্কুলের বাইরে প্রায় মাঝরাত অবধি মনি পায়খানা পরিষ্কার করে বাড়তি টাকা উপার্জন করে। সুখি সপ্তাহে একদিন বাজারের ময়লা আবর্জনা ও ড্রেন পরিষ্কার করে উপার্জন করে। স্কুলে কাজের সময় মনি নেশা করে না। ‘স্কুল মে মন্দির হায়। ওদারছে শরাব নাহি পিয়া।’ মনি সুখিকে বলত।

সুখি হাসত। আহা, তার বেটা একদিন জন্ম নেবে, বড় হবে আর এই স্কুলে পড়বে। ‘রাম, রাম’ এভাবে আবেগভরে সে ভগবানকে ডাকত। কখনো কখনো প্রার্থনার আর্তধ্বনি সুখির অন্তর থেকে বের হতো। ভগবানের উদ্দেশ্যে দু’হাতের তালু একত্রিত করে কপালে ঠেকাত। কিন্তু নির্মম ও একপেশে ভগবান সুখির প্রার্থনা তাচ্ছিল্যভরে ছুড়ে ফেলে দিল।

সবে মাত্র গ্রীষ্মকাল শুরু হয়েছে। এবার মনে হচ্ছে তাপদাহ শুরু হবে। তারই লক্ষণ প্রথম থেকে বোঝা যাচ্ছে। ক্লাসরুমের কাজ শেষ করে মনি মাঠ পরিষ্কার করছে। গরমে তার শরীর ঘেমে জল গড়িয়ে পড়ছে। সুখি তাকে জল খাওয়াল। মনি কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার ঝাড়ু হাতে নিতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই হেডমাস্টার মনিকে ডেকে পাঠাল।

তড়িঘড়ি করে মনি ছুটে চলল হেডমাস্টারের কক্ষ বরাবর, বড়সাহেব তাকে ডেকে পাঠিয়েছে, তাই বিলম্ব করা উচিত হবে না। সুখি যে তার নিশ্বাস-প্রশ্বাসে মিশে আছে, মনির পিছুুপিছু ছুটল।

‘সেলাম বাবুজি’— এ কথা বলে মনি হেডমাস্টারের রুমে ঢুকে পড়ল। সুখি দরোজার পাল্লা ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

হেডমাস্টার মাথা নিচু করে যথেষ্ট গাম্ভীর্যসহকারে কিছু একটা লিখছিলেন। মনির আগমনের শব্দ পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তিনি এমনভাবে মনির দিকে তাকালেন, অজানা আশঙ্কায় মনির মন কেঁপে উঠল।

ডান দিকের ড্রয়ার টান দিয়ে তিনি একটা লম্বাটে খাম বের করলেন। কিছুক্ষণ সেটি নাড়াচাড়া করলেন, নখ দিয়ে আঁচড় কাটলেন আনমনে। তারপর গলা পরিষ্কার করে কথা শুরু করতে চাইলেন অনেকটা ভূমিকা পেশ করার মতো করে এমনভাবে যেন, কেউ তাকে বলপূর্বক কথাগুলো বলতে বাধ্য করছে— ‘মনি শোন,’ হেডমাস্টার শুরু করলেন, ‘সব ক্ষমতা আমার নেই, কমিটি যদি না চায়, আমি কীই-বা করতে পারি, তোর ’পর আমি খুশি, আমরা সবাই খুশি,’ হেডমাস্টার অগোছালোভাবে বলছিলেন, ‘কিন্তু আমার করার কিছুই নেইরে, তুই কাল থেকে আর স্কুলে আসিসনে। এই খামটা নে। এক মাসের বেতন আগাম আছে আর আছে বরখাস্তের চিঠি।’ এ পর্যন্ত বলে হেডমাস্টার খামটি এগিয়ে দিলেন।

মনির মনে হলো তার হাত-পা, মাথামুণ্ডু কে যেন টুকরো টুকরো করে কেটে ছিন্নভিন্ন করছে। কী তার অপরাধ? তার এটা তো নকরি ছিল না, নিজ বাড়ির মতো মমতা ছিল। এখানে বাচ্চারা ছিল, তারা ছাত্র বি ছিল। তাদের দেখে মনির কত ভালো লাগত।

‘নে ধর,’ হেডমাস্টার আবার বললেন।

মনি নিরুত্তর। সে কাঁপছে।

‘রাখ বাবুজি, তোর রুপিয়া নেহি লেঙ্গা। মাগর বোল নারে মোর মরদকা কসুর কিয়া।’ তোর টাকা আমাদের লাগবে না। কিন্তু আমার স্বামীর দোষ কী, তা আমাকে বলতে হবে। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে কথাগুলো সুখি ছুড়ে দিল হেডমাস্টারের দিকে।

এ কণ্ঠস্বরে তিনি চমকে উঠলেন, এ যেন প্রতিবাদ, এটাই হওয়ার কথা ছিল। তিনি চুপ করে রইলেন।

‘বোল না, কিওয়া কসুর হায় মোর মরদকা। তুই চুপ কেন? আমার স্বামীর অপরাধের কথা বলতে হবে। নইলে আমি ছাড়ব না।’ এগুলো সুখির কথা।

মনি সুখিকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সোজা হেডমাস্টারের পায়ে কেঁদে পড়ল।

‘বাবুজি, মাপ কর দিজিয়ে, মেরা বহুত কসুর হ্যায়। মুই এইসা জমিনকা বহুৎ পিয়ার করেঙ্গা। মেরা নুকরি তু রাখ না যে। মুই তু গোলাম হায়।’

হেডমাস্টার খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়লেন।

তার জাতপাত নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। তার ওপর সে একজন মদখোর। ধর্মীয় শিক্ষক আব্দুল হাই সাহেব আপত্তি তুলেছেন। কাজেই তাকে সরিয়ে একজন সাচ্চা লোক নিয়োগ দিতে হবে।

আব্দুল হাই সাহেবের কথা প্রথমত হেডমাস্টার কানে তোলেননি। তিনি তার মতো করে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু আব্দুল হাই সাহেব আরো কজন শিক্ষককে নিয়ে ঘোঁট পাকালেন। শিক্ষকদের একজন নুরুন্নবী, তিনি প্রতিবাদ করে বলার চেষ্টা করলেন, ‘মনিকে আমরা বেতন দিয়ে রেখেছি, তার শ্রম আমরা কিনে নিয়েছি। অতএব তার দেয়া পানির হালাল-হারাম কি! আমরা হিন্দু ময়রার মিষ্টি কিনে খাই, খাই না? সেটা হালাল কি হারাম বিচার করি?’

নুরুন্নবী সাহেবের অকাট্য যুক্তি।

কিন্তু কাজ হলো না।

তারা কোনো যুক্তি মানতে রাজি নয়। যেখানে হারাম-হালালের প্রশ্ন, সেখানে যুক্তি কী, সেখানে শুধু বিশ্বাস। মনিকে সরাতে হবে, মদ্যপ লোকজনকে স্কুলে রাখা যায় না।

হেডমাস্টার বেকায়দায় পড়ে গেলেন। তিনি কমিটির মিটিং ডাকলেন। আলোচনা হলো। কিন্তু সব আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে ধর্মীয় অনুভূতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে মানবতার বিষয়টি তুচ্ছ রেখে মনি ডোমকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো। হেডমাস্টারকে নির্দেশ দেয়া হলো এক মাসের বেতন অগ্রিম দেয়ার জন্য। জনৈক সদস্য মন্তব্য করলেন, ‘এটাই মানবতা।’

কিন্তু মনি স্কুল ছেড়ে যাবে না। সে হেডমাস্টারের পায়ে মাথা খুঁড়ছে। তার বৌ সুখি দরোজা ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন পাথরের মূর্তি। এভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর তার চোখ দিয়ে আগুনের হলকা বের হতে লাগল। সে ছুটে চলে গেল।

মনি একইভাবে হেডমাস্টারের পায়ে মাথা পেতে আছে। তিনি এখন নির্বিকার। মনিকে চলে যেতেই হবে।

শিক্ষকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে— মনি, এই বিধর্মী, কখন পবিত্র স্কুল ছেড়ে চলে যাবে।

বহু সময় চলে গেল। মনি হেডমাস্টারের পায়ে পড়েই আছে।

হঠাৎ একহাতে বড় একটি বালতি নিয়ে হিংস্র সাপের মতো হিসহিস করতে করতে সুখি হেডমাস্টারের রুমে ঢুকে পড়ল। সমস্ত রুম পচা দুর্গন্ধে ভরে গেল। হেডমাস্টার নাকে রুমাল দিলেন, কিন্তু কোনো কাজ হলো না।

সুখি একদম হেডমাস্টারের কাছে চলে এল।

তার হাতে বালতিভর্তি মানববিষ্ঠা। সে ঘোষণা করল, যদি বিনা কারণে তার মরদের নুকরি যায়, হেডমাস্টারের মাথায়, সদস্যদের মাথায়, সবার মাথায় বালতির মল ঢেলে দেবে। তার এই উন্মত্ত রূপ দেখে হেডমাস্টার প্রথমে হতভম্ব ও পরে ভীত হয়ে পড়লেন।

‘এই পাগল, করিস কী, করিস কী, সরে যা, যা বলছি।’ হেডমাস্টার অনেকটা আর্তস্বরে কাকুতি-মিনতি শুরু করলেন।

কিন্তু সুখির এই একই হুমকি।

মনি একটু দূরে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সুখির অগ্নিমূর্তি দেখছিল। বৌয়ের তেজ তাকে সাহসী করল বলে মনে হয়। কেননা মনি উচ্চৈঃস্বরে বলল, ‘তার নুকরি কোন সালা ভি খায়। হুঙ্কার দিল, মোরা ডোমজাত হায়।’

হেডমাস্টার ঘাবড়ে গিয়ে দৌড়ে পালালেন।

শিক্ষকরা একে একে সটকে পড়লেন।

বালতি হাতে বারান্দায় সুখি দাঁড়িয়ে। তার পাশে মনি।

শিক্ষকশূন্য স্কুল।

সব ছাত্র মাঠে দাঁড়িয়ে উল্লাস করছে।

বিকালে কমিটি ও শিক্ষক সমন্বয়ে মিটিং বসল। বিষয় মনির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা।

দীর্ঘ আলাপ-আলোচনায় পরিস্থিতি পর্যালোচনান্তে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, মনিকে রেখে একজন অতিরিক্ত লোক নিয়োগ দেয়া হবে পানি সরবরাহের জন্য।

এ সিদ্ধান্ত মনিকে জানিয়ে দেয়া হলো।

মনি বা সুখি এ সিদ্ধান্তে খুশি হলো বলে মনে হলো না। কেননা তাদের নোংরা পেশা ও জাতের কারণেই বাবুরা পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করতে পারে, শুধু জলটুকু বাদ দিয়ে।

নিরুত্তর মনি। নিরুত্তর সুখি। হঠাৎ দুজনেই খুব শান্ত। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে তারা ধীরপায়ে চলে গেল।

পরদিন মনি বা সুখি স্কুলে এল না।

তার পরদিনও এল না এবং আর এল না।

এরপর তাদের কেউ আর অত্র তল্লাটে কোনোদিন দেখেনি।

পুনশ্চ: গল্পটি এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অনিবার্য কারণে হয়নি। এ ঘটনার পর ৩০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেই নুরুন্নবী মহাখালী থেকে টাঙ্গাইল আসার বাসে চড়েছেন। বাস ছাড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে তার পাশের খালি সিটে একজন টগবগে তরুণ তাড়াহুড়া করে বসল। গায়ের রঙ কালো। গোলাকার মুখাবয়ব মায়াবী। বাস ছেড়ে দিল।

সে পকেট থেকে দামি মোবাইল বের করে কথা শুরু করল, ‘হা মাইজি, বাস ছাড় না হুয়া...’

হা মা, বাস ছেড়েছে। তুমি চিন্তা করো না। আমি ঠিকঠাক পৌঁছে যাব। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবে।

নুরুন্নবী চমকে উঠলেন। এ কার কণ্ঠস্বর! সেই চেহারা, সেই দেহাতি ভাষা! এও কি সম্ভব।

তিনি কিছুটা সময় নিয়ে আত্মস্থ হলেন। তারপর তরুণের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সে কোথায় যাবে।

তরুণ বলল, ‘টাঙ্গাইলের বল্লা গ্রামে। সেখানে একটি অতিপ্রাচীন বস্তি আছে, ডোমবস্তি নামে পরিচিত। আমার বাবার ভিটা ছিল। সেই ভিটা দেখব। আমার মা বলেছেন, বাবা সেখানকার স্কুলে চাকরি করতেন। বাবাকে জাতের কারণে তাড়িয়ে দেয়া হয়।’

‘তুমি কী করো?’ নুরুন্নবী জানতে চাইলেন।

‘মাস্টারি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ত্ব্ব পড়াই। আমি আমার ডোমদের ইতিহাস লিখছি।’ এরপর নুরুন্নবীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জনাব, আপনি কি বল্লা গ্রাম চেনেন?’

‘আমি সেই হতভাগা, যে তোমার বাপকে সাপোর্ট করেও অসম্মান থেকে বাঁচাতে পারিনি। আমি খুবই দুর্বলচিত্তের মানুষ।’ নুরুন্নবী সাহেব বললেন।

‘আপনিই কি নুরুন্নবী স্যার, বাবা মৃত্যুর আগে আপনার কথা বহু বলেছেন। বাবার স্কুলে গিয়ে আপনাকে খুঁজতাম। কী ভাগ্য আমার! আপনাকে এখানেই পেয়ে গেলাম।’ এই কথা বলে মনি ও সুখির ছেলে বাসভর্তি লোককে অবাক করে দিয়ে নুরুন্নবী স্যারের পা ধরে চুম্বন করল।

নুরুন্নবী স্যারের চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগল।