কেরালার সংস্কৃতি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটক, রাজ্যে বসত গড়া বণিক শ্রেণী ও রাজবংশ দ্বারা প্রভাবিত। আর্য, দ্রাবিড়, আরব ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে কেরালার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যুগ যুগ ধরে ভারত ও ভারতের বাইরের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কেরালার সংস্কৃতি বর্তমান রূপ পেয়েছে। উৎসব ও কেরালা অবিচ্ছেদ্য। প্রতি বছর হাজারখানেকের বেশি উৎসব উদযাপিত হয় এখানে। এসবের কোনোটি সামাজিক এবং কোনো কোনোটি ধর্মীয়। কোনো কোনোটি নতুন, আর কিছু উৎসব বহুকাল ধরে পালিত হচ্ছে। নিজস্ব সময় ও নিয়মানুসারে কেরালার এসব উৎসবের সময় নির্ধারিত। কৃষিকাজ ও ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয় মালয়ালম ক্যালেন্ডার। ৮২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে এ ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু হয় মালয়ালিদের মাঝে।

কেরালার বহু মন্দিরেই বছরের বিশেষ দিনে বিভিন্ন উৎসব পালিত হয়। এসব উৎসবের একটি সাধারণ বিষয় হলো পবিত্র পতাকা উত্তোলন করা। উৎসবের শেষ দিন প্রতিমা বিসর্জন শেষে পতাকা নামিয়ে নেয়া হয়। এসব উৎসবের মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো বার্ষিক থ্রিস্যুর পুরাম উৎসব। কেরালার থ্রিস্যুর জেলার শিবমন্দিরে প্রতি বছর এ উৎসব পালিত হয়। থ্রিস্যুর পুরামের প্রধান আকর্ষণ হলো হাতি, আতশবাজি আর ভিড়। উৎসবের অঙ্গ হিসেবে অন্তত একটা হাতিকে ভারি সাজসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। প্রতিমাকে হাতির পিঠে করে গ্রামের পথে শোভাযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়। মন্দিরের আশপাশে বিভিন্ন বাড়িতে শোভাযাত্রা এসে পৌঁছলে, বাসিন্দারা অর্ঘ্য হিসেবে ভাত, নারকেল ও নৈবেদ্য অর্পন করে। শোভাযাত্রাগুলোয় প্রায়ই অন্তর্ভুক্ত থাকে ঐতিহ্যবাহী সংগীত পাঞ্চারি মেলাম বা পারিচাভাদ্যম। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এ রাজ্যের অন্যান্য উৎসবের মাঝে রয়েছে মাকারাভিলাক্কু, চিনাক্কাথুর পুরাম ও আট্টুকাল পোঙ্গালা।

কেরালার কৃষকদের ফসল তোলার উৎসব ওনাম। কেরালার প্রধান উৎসব ওনাম, রাজ্যটির কৃষিজীবী অতীতের স্মারকও বটে। ওনাম কেরালার লোক-উৎসব, যার উপলক্ষে চারদিন সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। মালয়ালম ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস, চিংগাম (ইংরেজি আগস্ট-সেপ্টেম্বর) এ অসুর রাজা মহাবলীর স্বভূমি প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী এ উৎসব পালিত হয়। ওনাম উৎসবে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ওনাক্কোডি পরে কেরালার লোককাহিনীর ওনাপোট্টান সাজে নারী ও পুরুষরা। এ উৎসবে নৌকাবাইচ ভাল্লাম কালী, পুলিকালী নৃত্য ইত্যাদি আয়োজন করা হয়। ওনামের খাদ্য ‘সাধ’ প্রস্তুত করা হয় কলাপাতায়। খাদ্যের তালিকায় থাকে দুই ডজন থেকে ৬৭ রকমের নিরামিষ ভোজ। নিরামিষের সঙ্গে থাকে পাঁপড় ভাজা ও ইঞ্জিপুলি স্যুপ। মিষ্টান্ন হিসেবে থাকে পায়েস, পাচাদি ও মরু।

কেরালার বিপুল বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির যোগসূত্র মালয়ালম ভাষা। রাজ্যটির ৯৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ভাষা মালয়ালম। মালয়ালিতে ভারতের প্রথম ভ্রমণকাহিনী রচিত হয়। গদ্যের আগে গীতিকাব্যের নিদর্শন পাওয়া যায় কেরালার ইতিহাসে। মালয়ালম সাহিত্যের ইতিহাসজুড়ে বিস্তৃত কাব্য ও মালয়ালম সংগীত। সংস্কৃত ও মালয়ালম ভাষায় রচিত ‘মণিপ্রভালম’ কাব্য কেরালার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

কেরালার সংগীত দক্ষিণ ভারতের সংগীতের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ। বহুকাল ধরে সংগীতজ্ঞদের সাধনায় কেরালার ধ্রুপদী সংগীত তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ধ্রুপদী সংগীতের কৃতিত্বটা দেয়া যায় মন্দির সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত পূজা-অর্চনা ও রীতি রেওয়াজকে। কেরালার মন্দিরে উদ্ভূত হয় ‘সোপান সঙ্গীতম’। কালী দেবীর আরাধনা সংঘীত ‘সোপান সঙ্গীতম’-এর উত্পত্তি শাস্ত্রীয় সংগীতের শাখা সংগীত থেকে। ইডাক্কা নামক একজাতীয় পার্কাসিভ যন্ত্র ব্যবহার করে উপাসনা সংগীতটি করা হয়। মারার ও পথুভাল সম্প্রদায়ের পুরুষদের কণ্ঠস্বরে নাম অনুসারে মন্দিরের ‘সোপানে’ গাওয়া হয় সোপান সঙ্গীতম। কেরালার ঐতিহ্যবাহী সংগীতের আদি শাখা শাস্ত্রীয় সংগীত। কর্ণাটক সংগীত দ্বারা কেরালার শাস্ত্রীয় সংগীত প্রভাবিত। উনিশ শতকে মহারাজ স্বাথী থিরুনাল রাম ভার্মার পৃষ্ঠপোষকতায় কর্ণাটক সংগীত এ রাজ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের অন্যতম প্রধান ধারা ‘কথাকলি’র উত্পত্তি কেরালা থেকেই। গল্পের ধারায় প্রবাহিত হয় এ মূকাভিনয়টি। নানা রূপসজ্জায়, পোশাক ও মুখোশ পরে নৃত্য ও গানের মাধ্যমে পরিবেশিত হয় লোককাহিনী। প্রথাগত বিষয়বস্তু মহাকাব্য ও পৌরাণিক কাহিনী। আধুনিক কথাকলিতে স্বতন্ত্র ধারায় পশ্চিমা গল্পও ফুটে ওঠে। নৃত্যশিল্পীরা রঙিন সাজে পরিবেশন করে শেকসপিয়ারের কোনো নাটক।

ক্ল্যাসিক্যাল পিরিয়ডে কথাকলিসহ মোহিনীয়াত্তম, কুডিয়াত্তম, থুল্লাল ও কৃষ্ণনাট্যম প্রভৃতি ধ্রুপদী নাচ বিকাশ ঘটেছে বিভিন্ন মন্দিরে। এসব ধ্রুপদী নাচ মূলত বিভিন্ন সময়ে রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রসিদ্ধ হয়েছে। মন্দিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য নাচগুলো হলো কেরালা নাটায়ম, থিরায়াত্তম, কালীয়াত্তম ইত্যাদি। কেরালার মুসলমানদের মধ্যে ওপ্পানা ও ডাফমুট্টু নাচ জনপ্রিয়। স্থানীয় খ্রিস্টানদের মধ্যে মারগামকালী, পারিচামুট্টকালী ও চাভিট্টু নাদাকম নাচ জনপ্রিয়।

কথাকলি নাচ কেরালার ঐতিহ্য। কথাকলিতে ব্যবহূত গানগুলো রাগপ্রধান। গানে সাধারণত পার্কাসিভ বা তালজাতীয় যন্ত্র সংগীতের আয়োজন করা হয়। এর মাঝে ঢোলজাতীয় বাদ্য মাদ্দালাম, চেন্দা ও ইডাক্কার প্রয়োগ বেশি। এছাড়া পুরাণ-আশ্রিত নাচের পোশাকে রঙের নির্দিষ্ট ব্যবহারে ইংগিত মেলে নাটকের চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের। নেতিবাচক ভূমিকায় দুঃশাসন কিংবা হিরণ্যকশিপুর পোশাকে লালের বাহার থাকে। যোদ্ধাদের মুখ, মুখোশ ও পোশাকে সবুজ রঙ ব্যবহার করা হয়। ভিক্ষু ও নারীদের পরিধেয় পোশাকে হলুদ ব্যবহূত হয়।

‘মুণ্ডু’ কেরালার নারী-পুরুষ উভয়েরই ঐতিহ্যবাহী পোশাক। কটির নিম্নভাগে ধুতি বা লুঙ্গি ধরনের এ পরিধেয় সাধারণত সাদা রঙের হয়। কিছু মুসলিম নারীদের মাঝে কালো বা আকাশি রঙের পর্দা প্রথার চলও রয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে হিন্দু নারীদের পরিধেয় হয় রেশমের তৈরি জারদোজি বা কুন্দনের কাজ করা কাঞ্চিপুরাম শাড়ি। মুসলিম নারীরা পরে শাড়ি বা সোনালি জরির কাজ করা পর্দা। কেরালার উৎসবে রঙিন পোশাকের জমকালো ব্যবহার হলেও সাধারণত দিনে নারী ও পুরুষদের পরিধেয় পোশাক হয় সাদা। বলা হয়, পবিত্রতা ও বন্ধুত্ব প্রকাশে সাদা পোশাকের চল রয়েছে এ রাজ্যে।

মালয়ালম সিনেমা আধুনিক কেরালার সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ। মালয়ালম সিনেমার ইতিহাস বহুদিনের। বর্তমানে কেরালায় হিন্দি, ইংরেজির তুলনায় মালয়ালি সিনেমার গানই তুলনামূলকভাবে অধিক জনপ্রিয়। এখানকার মানুষ নিজেদের ভাষা, সংগীত ও সংস্কৃতি এখনো তাদের আধুনিক সিনেমায় উপস্থাপন করে বলেই এ জনপ্রিয়তা সম্ভব হয়েছে। ভারতের বৃহৎ সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে মালয়ালমের অবস্থান চতুর্থ। কাহিনী নির্ভরতা ও চমত্কার সিনেমাটোগ্রাফির কারণে মালয়ালম সিনেমার খ্যাতি কেরালা ছাড়িয়ে গেছে। মজার ব্যপার, কেরালার সংগীত সমৃদ্ধ হলেও মালয়ালম সিনেমায় প্লেব্যাক গান শুরু হয় বেশ পরে। পিএস দিবাকরের সংগীতায়োজনে ১৯৪৮ সালে প্রথম ‘নির্মলা’ সিনেমায় প্লেব্যাক রাখা হয়।

কেরালায় প্রাণীবৈচিত্র্য থাকলেও সেখানে হাতির কদর খুব বেশি। ত্রিশ্যুর পুরাম উৎসবে হাতির ব্যবহারের কথা আগেই বলা হয়েছে। কেরালার বিভিন্ন উৎসবে ও কেরালা সংস্কৃতিতে হাতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৭০০ প্রজাতির ভারতীয় হাতির আশ্রয় কেরালা। বিভিন্ন উৎসবের পাশাপাশি এ আধুনিককালের নানা শোভাযাত্রায়ও হাতি ব্যবহার করা হয়। মালয়ালম সাহিত্যে হাতিকে ‘সাহ্যার (পর্বত) পুত্র’ বলে অভিহিত করার নিদর্শন পাওয়া যায়। রাজ্যটির সঙ্গে হাতির সম্পৃক্ততা এতটাই বেশি যে হাতির প্রতীক দ্বারা চিহ্নিত করা হয় কেরালা সরকারকে।

একুশ শতকে এসে কেরালার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাগুলো হয় বিলুপ্ত অথবা স্থানীয় উৎসবে কোনো শিল্পকলা রূপে টিকে আছে। এর মাঝে পুরাক্কালী, পাদায়ানী, ভেলাকালী ইত্যাদি এখন স্রেফ কেরালার স্থানীয় উৎসবে কোনো মন্দিরে নৃত্যকলা হিসেবেই পরিচিত। তবে নৌকাবাইচ এখনো কেরালার জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যগত উৎসব। কেরালার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে মার্শাল আর্ট কালারিপায়াট্টু বা কালারি। ‘কালারি’ অর্থ যুদ্ধক্ষেত্র’। কালারির ইতিহাস তিন হাজার বছর প্রাচীন। ধারণা করা হয়, ভারতের সব থেকে আদি মার্শাল আর্ট কেরালার কালারি। মালয়ালম প্রাচীন গীতিকাব্য ভাডাক্কান পাট্টুকাল গাথায় কালারির উল্লেখ পাওয়া যায়।

ভারতের অধিকাংশ মার্শাল আর্টের মতো কালারির আচার ও দর্শনের অনুপ্রেরণা আসে সনাতন ধর্ম থেকে। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র, আয়ুর্বিদ্যা এ মার্শাল আর্টের ওপর প্রভাব ফেলেছে। কালারির ন্যায় বিভিন্ন দক্ষিণ ভারতীয় মার্শাল আর্টের যোগসূত্র যোগব্যায়াম, নাচ ও শিল্পকলা। কালারি বিদ্যা রপ্ত করা কথাকলীর নৃত্যশিল্পীরা নাচে দক্ষ হয়ে থাকে বলে কথিত আছে। এমনকি কিছু ধ্রুপদী নাচের স্কুলগুলোয় আজও শরীরচর্চার অংশ হিসেবে মার্শাল আর্ট শেখানো হয়।

দ্রাবিড়-সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হলেও কেরালার স্থাপত্যকর্মে ব্যতিক্রম দেখা যায়। কেরালার স্থাপত্যে বাস্তুশাস্ত্রের প্রভাব রয়েছে। রাজ্যের মন্দিরগুলো বাস্তুশাস্ত্রের দুইটি নির্মাণ তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত; থান্ত্রা সামুচায়াম ও স্লিপারত্নম। অধিবাসীদের বিশ্বাস এর ফলে মন্দিরে শুভ শক্তির প্রবেশ হয় ও অশুভ শক্তির প্রস্থান ঘটে। কেরালায় বৃহৎ মন্দিরের সংখ্যা অপ্রতুল। মন্দিরের ছাদ হয় ঢালু আকৃতির। ছাদের পাঁচিলগুলো মন্দিরের সীমানা নির্দেশ করে। মন্দিরের তুলনায় জৈন স্মৃতিস্তম্ভের সংখ্যা বেশি। এর মাঝে নাগেরকিলের কাছে অবস্থিত চিত্রল জৈন গুহা, পেরুমবাভরের কাছে কাল্লিল পাথরে মন্দির, পালাক্কাদ ও সুলতানবাথেরির কাছাকাছি আলাথুরে বেশকিছু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ জৈন সভ্যতার নিদর্শন তুলে ধরেছে কেরালায়। পালাক্কাদ থেকে তিন কিলোমিটার দূর জৈনিমেদু জৈন মন্দির এর ইতিহাস ছয় হাজার বছর পুরনো। তবে ১৫২২ সালে জৈন মন্দিরটি সনাতন হিন্দু মন্দিরে পরিণত করা হয়। আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা জৈনিমেদু থেকে মহাবীর ও পরশুনাথসহ বেশকিছু মূর্তি উদ্ধার করে।

মালাবার উপকূলে আরব সাগরের তীরে ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব রাজ্যটির বিচ্ছিন্ন অবস্থান কেরালার স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী ধারা টিকিয়ে রেখেছে। আধুনিক গান ও সিনেমা জগতেও তেমনি রেখেছে স্পষ্ট স্বাক্ষর।

 

সৈয়দ মেহরাজ কবির: লেখক