‘বহু
বছর পর,
ফায়ারিং স্কোয়াডের
সামনে দাঁড়িয়ে
কর্নেল আউরেলিয়ানো
বুয়েন্দিয়ার মনে
পড়ে যাবে
সেই দূর
বিকালের কথা,
যেদিন তার
বাবা তাকে
বরফ চেনাতে
নিয়ে গিয়েছিল।’
ভারিয়ান কুন্নাথু
কুঞ্জাহামেদ হাজিকে
নিয়ে গ্যাব্রিয়েল
গার্সিয়া মার্কেসের
বিখ্যাত ‘সিয়েন
আনিয়োস দে
সোলেদাদ’ উপন্যাসের
প্রথম বাক্যটি
দিব্যি লিখে
দেয়া যায়।
স্মরণ করা
যেতে পারে,
কুঞ্জাহামেদের মৃত্যুও
হয়েছিল ফায়ারিং
স্কোয়াডে এবং
বাবার জীবন
তাকেও উদ্বুদ্ধ
করেছিল। কিন্তু
উপন্যাসের কর্নেল
বুয়েন্দিয়া চরিত্রটি
যতটা সাংস্কৃতিক,
কুঞ্জাহামেদের জ্ঞাত
জীবন ততটাই
রাজনৈতিক; তত্কালীন
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের
চোখে তা
‘বিদ্রোহী’।
তার জীবত্কালে
ব্রিটিশ প্রোপাগান্ডা
তো ছিলই,
হালে তাকে
নিয়ে তর্ক
উঠছে—তিনি
যতটা না
বিপ্লবী, তার
চেয়েও বেশি
সাম্প্রদায়িক নেতা।
এর কারণ,
তার অভ্যুত্থানের
মূলে ছিল
ধর্মের ব্যবহার।
কুঞ্জাহামেদকে বুঝতে
হলে বিষয়টি
নিয়ে বিশ্লেষণে
যেতে হবে।
বলা ভালো,
ভারতীয় উপমহাদেশের
রাষ্ট্রশাসন বোঝার
জন্যও রাজনীতিতে
ধর্মের ব্যবহার
বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব
দেয়ার আগে
কুঞ্জাহামেদ হাজির
অবস্থান ছিল
গোপন রাজনৈতিক
নেতার মতো,
আত্মগোপনে থেকে
নেতৃত্ব দেয়া।
যে কারণে
২০ আগস্ট
১৯২১ ব্রিটিশ-ভারতের
কেরালার মালাবার
অঞ্চলে মোপলা
অভ্যুত্থান শুরু
হলেও তিনি
নেতৃত্ব গ্রহণ
করেন ২৪
আগস্ট। সে
হিসেবে আমরা
মালাবার অভ্যুত্থানের
শতবর্ষে আছি।
ইতিহাসে কুঞ্জাহামেদের
চরিত্রটি জীবন্ত,
এখনো তাকে
নানা আলোয়
দেখা হয়।
মসজিদে ব্রিটিশ
পুলিশের হামলার
গুজবে থানায়
হামলা করতে
গিয়ে গুলির
শিকার গ্রামবাসী
লুট করেছে
থানা ও
সরকারি কোষাগার।
নিপীড়কের উত্থানের
পর লুটে
নেয়া সম্পদ
পুনরুদ্ধারের মতো
ব্যাপার। দ্বিতীয়
ঝোঁক, কোর্ট
আর রেজিস্ট্রি
অফিসের নথি
ধ্বংস করা।
পূর্ব অভিজ্ঞতা
থেকে তারা
দেখেছেন, ওইসব
নথিবলে তাদের
সম্পদ লুটের
আইনি দোহাই
দেয়া হয়েছে।
তাই ওই
নথি ধ্বংস
তাদের নৈতিক
দায়িত্বের রূপান্তর
করছে। এখানে
উল্লেখ করা
প্রয়োজন, এ
বিদ্রোহীরা মূলত
দরিদ্র কৃষক
শ্রেণীর মানুষ।
কুঞ্জাহামেদ হাজি,
আলী মুসলিয়ারের
আন্দোলন যে
ধর্মীয় মোড়কে
দেখা হয়,
তার বাস্তবতা
খতিয়ে দেখা
দরকার। তার
ভিত্তিও পাওয়া
যাবে। স্মরণ
করা যেত
পারে, ১৮৯৬
সালে কুঞ্জাহামেদ
যখন হজের
উদ্দেশে মক্কা
যাচ্ছেন, তারও
১০ বছর
আগে ১৮৮৫
সালে ভারতীয়
কংগ্রেস পার্টি
গঠিত হয়েছে।
প্রায় ১০
বছর পর
১৯০৫ সালে
কুঞ্জাহামেদ যে
সময় মক্কা
থেকে ফেরেন,
ততদিনে বঙ্গভঙ্গ
ঘোষণা ও
রদ আন্দোলন
শুরু হয়েছে।
মালাবারে কুঞ্জাহামেদ
নেতৃত্ব গ্রহণের
আগে সর্বভারতীয়
আন্দোলনের নেতৃত্ব
দিচ্ছে কংগ্রেস।
তাদের কর্মসূচিতে
সর্বভারতীয় দিক
বিবেচনায় থাকত।
মজার বিষয়
হলো, প্রায়
২১ বছর
দক্ষিণ আফ্রিকায়
কাটিয়ে ১৯১৫
সালে মোহনদাস
করমচাঁদ গান্ধী
ভারতে ফিরে
আসছেন রাজনৈতিক
অভিপ্রায় নিয়ে।
১৯২১ সালে
তিনি কংগ্রেসের
নেতৃত্ব গ্রহণ
করছেন। এ
সময়ে সুভাষ
চন্দ্র বসুও
ফিরে আসছেন
রাজনীতি করার
জন্য। কুঞ্জাহামেদও
বিদেশে গিয়ে
ফিরে এসেছিলেন।
সঙ্গে করে
যে দর্শন
নিয়ে এসেছিলেন,
তা গান্ধী-সুভাষের
চেয়ে বিস্তর
ফারাক। বরং
তা অনেক
বেশি গোষ্ঠীকেন্দ্রিক
ও ধর্মাশ্রয়ী।
ততদিনে কেন্দ্র
থেকে মূলোৎপাটিত
হলেও ভারতবর্ষে
ছায়া খেলাফত
প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়
ছিল তার।
আরেক দিক
দিয়ে দেখলে
কুঞ্জাহামেদের আন্দোলনের
আরেকটি ইঙ্গিত
ছিল, যা
ভারতীয় কংগ্রেস
ধরতেই পারেনি।
প্রথম দিকে
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের
কৌশলগত কারণে
মহাত্মা গান্ধী
সমর্থন করলেও
পরে তা
আর জারি
থাকেনি। অথচ
ছয় মাস
নিজস্ব শাসন
জারি রেখে
কুঞ্জাহামেদরা দেখিয়ে
ছিলেন, চাইলে
ভারত থেকে
ব্রিটিশদের বিতাড়িত
করা যেত,
কিন্তু রাজনৈতিক
ওই কথা
বললেও কংগ্রেসের
সে মনোভাব
ছিল না।
সে বিরোধ
থেকে সুভাষ
বসু কংগ্রেসের
ভেতরেই ফরোয়ার্ড
ব্লক গঠন
করেছিলেন, শেষ
পর্যন্ত দেশত্যাগে
বাধ্য হয়েছিলেন।
গান্ধী যে
স্বরাজের কথা
বলেন, কুঞ্জাহামেদরা
তা প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন।
সময়ের নিরিখে
আরেকটা বিষয়
দেখার ছিল,
কুঞ্জাহামেদরা যখন
খেলাফত প্রতিষ্ঠার
কথা ভাবছেন,
ততদিনে গণরাষ্ট্রে
আরেক স্বরূপ
তৈরি হয়েছে
সোভিয়েত ইউনিয়ন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধপূর্বাপর
সময়ে সমাজতান্ত্রিক
রাষ্ট্রের ধারণা
বড় ঘটনা।
কুঞ্জাহামেদ যখন
১৯০৫ সালে
মক্কা থেকে
ফেরেন, ততদিনে
প্রথম রুশ
অভ্যুত্থান (১৯০৫)
সংঘটিত হচ্ছে।
অবশ্য সমাজতান্ত্রিক
বিপ্লব সংঘটিত
হয়েছে ১৯১৭
সালে। বিশ্বের
রাজনৈতিক চেতনা
ও রাষ্ট্রগঠনের
ইতিহাস এ
সময়ের আগে-পরে
ভাগ হয়ে
গেছে। এ
থেকে অনুপ্রাণিত
হয়ে বিশ্বের
অনেক দেশের
মতো ভারতেও
এ চেতনার
বিস্তার ঘটে।
রাজনীতি সচেতন
কুঞ্জাহামেদ খবরটা
রাখেন না,
তা ভাবা
যায় না।
কিন্তু কুঞ্জাহামেদ
এর ধার
ঘেঁষেননি। ঘেঁষলে
তার অভ্যুত্থান
আরো রাজনৈতিক
হতো প্রতিবাদ-প্রতিশোধ
আক্রোশের চেয়ে।
অভ্যুত্থান ও
কর্তৃত্ব গ্রহণের
মডেল কুঞ্জাহামেদের
সামনেও ছিল।
কিন্তু তিনি
খেয়াল করেননি,
তখন দ্রুত
পরিবর্তন হতে
থাকা বিশ্বে
তার মডেল
পরিত্যক্ত হতে
শুরু করেছে।
কুঞ্জাহামেদের নেতৃত্বের
ধরন তার
সমসময়ের চেয়ে
সোয়াশ বছর
আগের টিপু
সুলতানের (২০
নভেম্বর ১৭৫০-৪
মে ১৭৯৯)
সঙ্গে বেশি
মিল পাওয়া
যাবে। আঞ্চলিক
কারণেও এ
সংযোগ পাওয়া
যাবে। কুঞ্জাহামেদদের
মালাবার এলাকা
১৭৯২ সাল
পর্যন্ত টিপু
সুলতানের অধীনেই
ছিল। পরে
ব্রিটিশরা তা
নিজেদের কর্তৃত্বে
নেয়। এ
থেকে টিপু
সুলতানের সঙ্গে
ব্রিটিশদের বিরোধ
তুঙ্গে ওঠে।
টিপু চেয়েছিলেন
স্বাধীন রাজ্যশাসন।
ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে
অনুগতদের সংগঠিত
করতে ধর্মকেই
অবলম্বন করেছিলেন
টিপু সুলতান।
স্বাধীনতা বলতে
তিনি আল্লাহর
আইনের শাসন
প্রতিষ্ঠা ও
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
শুল্কমুক্ত রাখার
কথা বলেছিলেন।
এজন্য ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানিকে
কর দেবেন
না। ব্রিটিশদের
আধুনিক অস্ত্রের
মুখে শেষ
পর্যন্ত সফল
হতে পারেননি।
পরবর্তী সময়ে
সিপাহি বিদ্রোহের
মতো বড়
ঘটনা ঘটেছে
ভারতবর্ষে। ফকির-সন্ন্যাসী
অভ্যুত্থানও হয়েছে
তারপর। হিন্দু
সন্ন্যাসী, মুসলিম
মাদারি ও
ধার্মিক ফকিরদের
পরিভ্রমণে করারোপের
পরই ওই
অভ্যুত্থান ঘটে।
এসব আন্দোলনে
ধর্মের ব্যবহার
দেখা গেছে।
কৃষকরা এর
সঙ্গে যুক্ত
হয়েছিলেন জমিদারদের
করের কড়াকড়ি
থেকে মুক্তি
পেতে। তবে
কুঞ্জাহামেদদের আন্দোলনের
সবচেয়ে বেশি
মিল পাওয়া
যাবে সৈয়দ
মীর নিসার
আলী তিতুমীরের
(২৭ জানুয়ারি
১৭৮২-১৯
নভেম্বর ১৮৩১)
নেতৃত্বে ওহাবি
আন্দোলনের সঙ্গে।
তিতুমীর হজের
জন্য মক্কা
গিয়েছিলেন ১৮২২
সালে। তার
পথপ্রদর্শক সৈয়দ
আহমেদ শহীদকে
তিনি গুরু
হিসেবে গ্রহণ
করে ওহাবি
মতবাদে উদ্বুদ্ধ
হন। এর
পাঁচ বছর
পর ১৮২৭
সালে দেশে
ফিরে খেলাফত
গঠনের চেষ্টায়
লেগে পড়েন।
এর অংশ
হিসেবে কৃষকদের
নিয়ে জমিদার
ও নীলকরদের
উচ্ছেদ আন্দোলনে
নেতৃত্ব দেন।
তিনি খেলাফত
গঠন করতে
পারেননি ঠিকই,
কিন্তু উদ্যম
রেখে গেছেন।
আজকের দিনে
প্রশ্ন উঠছে,
তিতুমীর-টিপু
সুলতান কি
ভারতের ঔপনিবেশিক
বিরোধী বীর,
নাকি ধর্মীয়
অভ্যুত্থানের নেতা
ছিলেন? একই
প্রশ্ন উঠছে
মালাবার অভ্যুত্থানের
নেতা ভারিয়ান
কুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ
হাজিকে নিয়ে।
অনেকে তাকে
তিতুমীরের উত্তরসূরি
মনে করেন।
কিন্তু তাকে
বিবেচনা করতে
হবে তার
জীবনের আলোকেই।
কুঞ্জাহামেদের জন্ম
১৮৮৩ সালে
ব্রিটিশ-ভারতের
কেরালা প্রদেশের
মালাপুরাম জেলার
পন্ডক্কাদ পঞ্চায়েতের
ভেল্লুভাঙাদ গ্রামে।
পরে তার
পরিবার মানজেরির
নেল্লুথ এলাকায়
সরে যায়।
এর কারণ
তার বাবা
ছাক্কিপারামবান মঈধীনকুট্টে
হাজিও ছিলেন
স্থানীয় নেতা।
একই সঙ্গে
বণিক ও
কৃষক। ১৮৯৪
সালে ‘মান্নারক্কাড
বিদ্রোহে’ যুক্ত
থাকার দায়ে
মঈধীনকুট্টেকে কুখ্যাত
আন্দামানে দ্বীপান্তর
করা হয়।
একই কারণে
‘বিদ্রোহীদের’
সম্পত্তি কেড়ে
নিতে শুরু
করলে এক
রকম বাধ্য
হয়েই ভিটা
ছাড়েন তারা।
তবে ঠিক
২০ বছর
পরে কুঞ্জাহামেদ
পৈতৃক গ্রামে
ফিরে আসেন
স্থায়ী বসবাসের
উদ্দেশ্যে। মনে
রাখা দরকার,
কুঞ্জাহামেদের দাদাও
একজন স্থানীয়
নেতা ছিলেন।
এটা তার
দ্বিতীয় যাত্রা
বলা যায়।
এদিক দিয়ে
দেখলে কুঞ্জাহামেদদের
অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদান
স্থানীয়ভাবে বেড়ে
চলা নানা
অত্যাচারেরই অবশ্যম্ভাবী
প্রতিক্রিয়া। যে
বিষয় তিতুমীরের
ক্ষেত্রে পাওয়া
যাবে না।
তিতুমীরের পরিবার
আরব থেকে
ধর্ম প্রচারে
আসা পরিবার
বলে জানা
যায়। তিতুমীর
হজে গিয়েছিলেন
নিপাট ধর্মীয়
উদ্দেশ্যে। তবে
কুঞ্জাহামেদের হজে
যাওয়ার পেছনে
আরো একটা
কারণ আছে।
ঘটনাটা মালাবার
অভ্যুত্থানের প্রায়
২৫ বছর
আগের। ব্রিটিশরাজের
পৃষ্ঠপোষকতায় মানজেরির
‘কোভিলাকাম’
(প্রশাসনপ্রধান) জমির
‘দখলদার’
(তখনো জমি
যৌথ সম্পত্তি
হিসেবে দখল
ভিত্তিতে চলে)
উচ্ছেদ করে
ভূস্বামীদের দিচ্ছিল।
এর প্রতিবাদে
কুঞ্জাহামেদের নেতৃত্বে
দখলদারদের অভ্যুত্থান
ঘটে। এ
সময় পেছনে
ব্রিটিশ পুলিশ-গোয়েন্দারা
লেগে পড়ে।
আত্মরক্ষায় গা
ঢাকা দেয়ার
দরকার হলে
১৯০৫ সালে
হজের উদ্দেশে
মক্কায় পাড়ি
দেন। এদিক
দিয়েই তিতুমীরের
চেয়ে আলাদা
হয়ে যান
কুঞ্জাহামেদ।
দুয়ের অভ্যুত্থানের
ক্ষেত্রে ভাষার
একটি বিরাট
ভূমিকা ছিল।
তিতুমীর জানতেন
আরবি, ফারসি
ও বাংলা।
যে কারণে
তার অভ্যুত্থান
নদীয়া, চব্বিশ
পরগনা ও
ফরিদপুরে বিস্তীর্ণ
অঞ্চলে ছড়িয়েছে।
তবে কুঞ্জাহামেদ
জানতেন মালয়ালম,
ফারসি ও
ইংরেজি। ইংরেজি
জানার ফলে
কুঞ্জাহামেদের সুযোগ
হয়েছিল ব্রিটিশরা
তাদের বিরুদ্ধে
কী প্রচারণা
চালাচ্ছে তা
বোঝার। তিনিও
এর জবাব
দিতে পেরেছিলেন
পত্রিকায় লিখে,
কূটনৈতিক চেষ্টার
মাধ্যমে। কুঞ্জাহামেদের
আন্দোলন মালাবার
অঞ্চলে হলেও
খবর ছড়িয়েছিল
ইংরেজি জানা
সবার কাছে।
আরো একটা
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
আছে তিতুমীর
ও কুঞ্জাহামেদের
মধ্যে। এটা
তাদের নামের
দিকে খেলায়
করলেই বোঝা
যায়। ‘মীর’
ও ‘সৈয়দ’
পদবি তিতুমীরের
নাম যতটা
ভারতীয়, তার
চেয়ে বেশি
আরবীয় মুসলিম
আভিজাত্য প্রকাশ
করে। ধুতির
বদল ‘তাহবান্দ’
নামক পোশাক,
এমনকি মুসলিম
শিশুদের নামও
আরবি রাখার
তাগিদ ছিল
তার। অত
বড় অভ্যুত্থানের
নেতৃত্ব দিলেও
তার অনুগতদের
মধ্যে মুসলিমের
বাইরে অন্য
সম্প্রদায়ের অনুসারীর
কথা খুব
জানা যায়
না।
হজ করার
সূত্রে ‘হাজি’
যুক্ত হলেও
ভারিয়ান কুন্নাথু
কুঞ্জাহামেদের নাম
একান্তই প্রাদেশিক
ভাব বহন
করে। তার
অভ্যুত্থানের শীর্ষ
নেতৃত্বেও ছিল
অমুসলিম নেতা।
স্থানীয় মার্শাল
আর্টের দক্ষতা
তাকে সম্মুখ
লড়াইয়ে সহযোগিতা
করেছে, তা
সবারই জানা।
লক্ষণীয় হলো
স্থানীয় সাংস্কৃতিক
চর্চা তাকে
স্থানীয়দের কাছে
জনপ্রিয় করেছে।
মক্কা ভ্রমণের
পর তিতুমীর
খেলাফত শাসন
প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট
হয়েছেন। তার
এ স্বপ্নকে
ভিত্তি দিয়েছে
কৃষকের খাজনা,
নীলকরদের বিরুদ্ধে
আন্দোলনে কৃষকদের
সম্পৃক্ত করার
মধ্য দিয়ে।
ব্যাপারটা ওপর
থেকে নিচে
নামার মতো,
বুদ্ধি থেকে
কর্মে নামার
মতো। সেক্ষেত্রে
কুঞ্জাহামেদের ব্যাপারটা
একেবারেই বিপরীত
বলা যাবে।
কৃষকের ওপর
চাপিয়ে দেয়া
অসম্ভব কর,
জমি কেড়ে
নেয়া বন্ধের
একটা স্থানীয়
বন্দোবস্ত করতে
চেয়েছেন। এজন্য
তিনি হাজির
করেছেন খেলাফত
রাষ্ট্রের ধারণা।
ব্যাপারটা কর্ম
থেকে বুদ্ধিতে
উন্নীত হওয়ার
মতো।
উইলিয়াম হান্টার
বলেন, বারাসাতের
যুদ্ধে প্রায়
৮৩ হাজার
কৃষক সেনা
তিতুমীরের পক্ষে
যুদ্ধ করেন।
কুঞ্জাহামেদের অন্যতম
সেনাধ্যক্ষ নায়িক
থামি জেলে
ডায়েরিতে লেখেন,
তাদের পক্ষে
প্রায় ৬০
হাজার মানুষ
লড়াই করেছিল।
তিতুমীরের তিন-চতুর্থাংশ
সৈন্য নিয়ে
কুঞ্জাহামেদ টানা
ছয় মাস
মালাবার অঞ্চল
নিজেদের অধিকারে
রেখেছিলেন। ঔপনিবেশিক
সময়ে এ
এক ছোট্ট
‘স্বরাজ’।
এটা ঠিক,
কুঞ্জাহামেদ অভ্যুত্থানের
শুরু হয়েছিল
ধর্মের মোড়কে।
বিশ শতকের
গোড়া পর্যন্ত
এটা একটা
জনপ্রিয় কৌশল
বলা যাবে।
সিপাহি বিদ্রোহ
শুরু হয়েছিল
যেমন বন্দুকের
গুলির টোটায়
শূকর আর
গরুর চর্বি
দেয়ার অজুহাতে।
পরে মঙ্গল
পাণ্ডেসহ অন্য
সিপাহিদের ওপর
আক্রমণের কারণে
অভ্যুত্থান ছড়িয়ে
পড়ে। সাঁওতালদের
অভ্যুত্থানের সময়ও
যেমন বিশেষ
প্রার্থনা করা
হতো, যেন
ব্রিটিশ সৈন্যদের
বন্দুক গলে
যায়, সৈন্যরা
ম্যালেরিয়া আক্রান্ত
হয়ে মারা
যায়। কুঞ্জাহামেদদের
ঘটনাও শুরু
হয় মামবুরাম
মসজিদ ও
‘মাক্ষ্যাম’
ব্রিটিশ সৈন্যরা
ধ্বংস করেছেন
এমন গুজবে।
এ নিয়ে
আলী মুসলিয়ারের
নেতৃত্বে লোকজন
কাচারি (থানা,
বিচার দপ্তর,
ভূমি অফিস
এলাকা) গেলে
পুলিশ তাদের
ওপর গুলিবর্ষণ
করে। পরে
অভ্যুত্থানটি কৃষক
ও সাধারণ
মানুষের মধ্যে
ছড়িয়ে পড়ে।
মালাবার অভ্যুত্থানের
ন্যায্যতা পাওয়া
যাবে সে
সময়ের কৃষকদের
করবৃদ্ধির মধ্যে।
Peasant Protests and Revolts
in Malabar বইতে
সম্পাদক কেএন
পানিক্কার দেখাচ্ছেন,
১৭৯২ সালে
টিপু সুলতানের
কাছ থেকে
ক্ষমতা দখলের
পর ব্রিটিশরা
প্রথমে সব
জমি নিজেদের
করে নেয়,
আর কিছু
জমি তালুকদারদের
হাতে ভাড়া
দেয়। করের
বোঝা চাপিয়ে
কৃষকদের জমি
ছাড়া করে।
১৮৫১ সালে
মালাবারের ২৪০
বর্গকিলোমিটারের প্রায়
১৫ লাখ
১৫ হাজার
মানুষ বাস
করত। এর
৩৩ দশমিক
৫ শতাংশ
মানুষ ছিল
কৃষিনির্ভর। ১৯০১
সালে এ
সংখ্যা বেড়ে
দাঁড়ায় ৬২
দশমিক ৫
শতাংশ। ১৯১১
সালে এ
চিত্র বদলে
৬০ দশমিক
৪৪ শতাংশ
কৃষিশ্রমিক, ৩৩
দশমিক ৪৩
শতাংশ বর্গাচাষী,
৬ দশমিক
১৩ শতাংশ
মাত্র নিজের
জমিতে চাষ
করতে পারত।
১৯২১ সালে
মালাবারে জনসংখ্যা
যখন প্রায়
৩০ লাখ
৯৯ হাজারে
পৌঁছে, তাতে
কত মানুষ
জমিহীন শ্রমিকে
পরিণত হয়েছে
বোঝাই যায়।
এ সময়
উৎপাদিত ফসলের
৪০ শতাংশ
সরকারি শুল্ক
হিসেবে দিতে
হতো, তারপর
ছিল জমিদারের
ভাগ।
১৮১৩ সালে
ধার্য করা
তালুকপ্রতি ২০৩
রুপি দিতে
না পারায়
পরবর্তী আট
বছরে (১৮২১
সাল পর্যন্ত)
মালাবারে ১
হাজার ২২৫টি
নিলাম অনুষ্ঠিত
হয়। এদিকে
১৮২১ সালে
টিপু সুলতানের
সময়ের চেয়ে
৯৪ হাজার
৭৫৯ রুপি
বেশি আয়
করে কোম্পানি।
১৯০০ সালে
তা বেড়ে
দাঁড়ায় ১৩
লাখ ৫৩
হাজার ৮৯০
রুপি। ১৮৬২-৮০
পর্যন্ত ১৮
বছরে ৯১
হাজার ৭২০
জনের বিরুদ্ধে
জমি থেকে
উচ্ছেদের রায়
দেয়া হয়।
১৮৮১ সালে
৫১১ জন
জানমির (জমির
ভাড়া মালিক)
মধ্যে মাত্র
১২ জন
ছিল মাপিলা,
বাকি সবাই
ছিল বর্ণ
হিন্দু। একদিকে
দারিদ্র্যের সংখ্যা
বাড়ছে, অন্যদিকে
বর্ণ হিন্দুদের
সম্পদের পরিমাণ
বাড়ছে। এমন
আরো অনেক
কারণে কৃষকের
অভ্যুত্থান প্রায়
অবশ্যম্ভাবী হয়ে
পড়েছিল। মালাবার
অভ্যুত্থান সাম্প্রদায়িক
মোড়কে হিন্দুবিরোধী
বলার চেয়ে
জমিদারবিরোধী বলাই
ঠিক হবে।
অভ্যুত্থানের দিনে
কুঞ্জাহামেদ ঝানু
রাজনীতিকের পরিচয়
দিয়েছিলেন আমেরিকাভিত্তিক
The
Friends of Freedom for India সংগঠনে
লেখা চিঠিতে।
লেখাটি ১৯২১
সালের ৭
ডিসেম্বর Detroit Free Press I The Baltimore Sun পত্রিকা
প্রকাশ করে।
কুঞ্জাহামেদ লেখেন,
‘We are
at war with England. We are fighting for the independence of India. And we are
doing exactly what the Americans did to free America from British Domination.
So anyone giving aid and comfort to the enemy will be severely dealt with,
irrespective of social position or religious affiliation.’
কুঞ্জাহামেদ হাজিকে
নিয়ে বিতর্কের
অবকাশ সবসময়ই
থাকবে। তিনি
জাতীয় বীর,
নাকি আঞ্চলিক
নেতা কিংবা
সাম্প্রদায়িক গোত্রপ্রধান,
এ নিয়ে
বিতর্ক উঠবেই।
সে বিতর্কের
উৎসও অরাজনৈতিক
কিছু নয়।
তত্ত্বের, ইতিহাসের
নতুন নতুন
অনুসন্ধানের ফলে
মূল্যায়ন বদলাবে,
ক্ষমতার পালাবদলে
দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও
বদলাবে। ইতিহাসে
অনেক কালপর্বেই
দেখা গেছে
ধর্মীয় প্রেরণায়
ঔপনিবেশিক বা
দখলদার শক্তির
মোকাবেলা। সে
বিচারে ভারিয়ান
কুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ
হাজি গভীরভাবে
প্রাসঙ্গিক।
অলাত এহ্সান: গল্পকার, সমালোচক





