প্রাচীন ভারতের
বাণিজ্যের ইতিহাস
আলোচনায় এর
দক্ষিণ উপকূল
গুরুত্বপূর্ণ। সিল্করোড
ধরে চলা
বাণিজ্য ব্যবস্থা
পূর্বের সঙ্গে
পশ্চিমকে যুক্ত
করেছিল বহুকাল
আগে। স্থলের
পাশাপাশি সমুদ্রপথে
বিস্তৃত বাণিজ্যের
ক্ষেত্রে প্রধান
একটি কেন্দ্র
হয়ে উঠেছিল
দক্ষিণ ভারতের
মালাবার উপকূল।
আজকের কেরালা
সিনেমা, অসাম্প্রদায়িকতা
ও ট্যুরিজমের
জন্য বিখ্যাত
হলেও প্রায়
তিন হাজার
বছর (মতান্তরে
ছয় হাজার)
আগে এখানে
গড়ে উঠেছিল
জমজমাট বাণিজ্যবন্দর।
আরব, সুমেরীয়
ও ব্যাবিলনীয়দের
সঙ্গে প্রাথমিক
বাণিজ্য সম্পর্ক
তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে
ফিনিশীয়, গ্রিক,
রোমান, মিসরীয়রা
এখানকার বিচিত্র
পণ্য, বিশেষত
মসলা ও
সুতি কাপড়ে
আকৃষ্ট হয়।
তবে আরব
ও ফিনিশীয়রা
নিশ্চিতভাবেই মসলার
প্রতি আকৃষ্ট
হয়ে এসেছিল।
কিন্তু বর্তমান
কেরালার ভৌগোলিক
সীমানা সাপেক্ষে
সেই অতীত
বাণিজ্যকে বোঝা
কিছুটা কষ্টকর।
মালাবার উপকূলজুড়ে
বেশ কয়েকটি
বন্দর গড়ে
উঠেছিল। অধুনালুপ্ত
কিংবা সময়ের
সঙ্গে পরিবর্তিত
এসব বন্দরের
মাধ্যমেই দক্ষিণ
ভারতের বাণিজ্য
পরিচালিত হতো।
আজ আমরা যাকে কালিকট বলে জানি সে বন্দরটি আগে ‘কোলিকোড’ নামে পরিচিত ছিল। অন্যদিকে প্রাচীনকালের যে বন্দরটির নাম সর্বাধিক পাওয়া যায়, সেই ‘মুজিরিস’ বর্তমানে বিলুপ্ত। রোমান লেখক প্লিনি দা এলডার এ মুজিরিস বন্দরকে ‘ভারতের প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ভারতের মসলা নিতে রোম সাম্রাজ্যের প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা খরচ হতো এবং এসব মসলার উৎসস্থল দক্ষিণ ভারত। মুজিরিস বন্দর ছিল মসলা ক্রয় ও পরিবহনের একটি কেন্দ্র। প্লিনি এ অঞ্চলের শাসকের নাম চেলেবোথরা বলে উল্লেখ করেছেন, যাকে ইতিহাসবিদরা ‘চেরা’র রোমান উচ্চারণ বলে মনে করেন। ইতিহাস জানায়, চেরা সাম্রাজ্যের আমলেই এ অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক বাণিজ্য জাহাজের আগমন হতো। স্বর্ণভর্তি এসব বাণিজ্য জাহাজ পশ্চিম থেকে আসত এবং স্বর্ণের বিনিময়ে মসলা ক্রয় করে ফিরতি পথ ধরত।
মুজিরিস সম্পর্কে
বলতে গিয়ে
সুমেরীয়দের কথা
উল্লেখ করতে
হয়। কেরালার
সমুদ্র বাণিজ্য
ও সমুদ্রপথ
সম্বন্ধে সুমেরীয়দের
পুরনো লিপিতে
উল্লেখ পাওয়া
যায়। সেখানে
কেরালার এ
উপকূলকে ‘মসলার
বাগান’ বলে
উল্লেখ করা
হয়েছে। মূলত
গোলমরিচ দিয়ে
শুরু করে
এলাচ, দারচিনি
ও অন্যান্য
নানা ধরনের
মসলা রফতানি
করে মালাবার
ভারতের অন্যতম
সম্পদশালী অঞ্চলে
পরিণত হয়।
সমুদ্র বাণিজ্যের
এ জমজমাট
কেন্দ্র হওয়ার
কারণে মুজিরিসে
নানা অঞ্চলের
মানুষের আগমন
ঘটতে থাকে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি
এখানে নাবিকদের
জন্য পণ্যশালা
প্রভৃতি তৈরি
হয়েছিল। মসলা,
স্বর্ণের সঙ্গে
মদজাতীয় পণ্য
বেচাকেনার জন্য
মুজিরিস বিখ্যাত
হয়ে ওঠে।
সংগম যুগের
(খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ
শতক থেকে
খ্রিস্টিয় তৃতীয়
শতক) একটি
কবিতায় মুজিরিসকে
‘মদ্যে
প্রাচুর্যপূর্ণ’ বলে
উল্লেখ করা
হয়েছে। এছাড়া
কবিতাটি বলে,
‘এ
অঞ্চল কোনো
রকম বৈষম্য
ব্যতিরেকে তার
অতিথিদের দান
করে।’ কী
দান করে
সে সম্বন্ধে
স্বর্ণের উল্লেখ
স্পষ্ট। জাহাজ
ভরে অন্য
অঞ্চল থেকে
আসা এ
স্বর্ণ এবং
মুজিরিসের নিজস্ব
ফসল দিয়ে
‘অতিথি’দের
আতিথ্য করা
হতো। ভারতের
এ দক্ষিণ-পশ্চিম
উপকূলে আরব
বণিকরা অতিথি
হয়েছিল ইসলামের
আগমণের আগেই।
আরব উপসাগরীয়
অঞ্চলের সঙ্গে
কেরালার বাণিজ্য
সম্বন্ধ সম্পর্কে
ইতিহাসবিদরা সবাই
একমত হয়েছেন।
সর্দার পানিক্কারের
মতে, সমগ্র
আরব উপকূল,
বিশেষত মাসকাট
ও অন্যান্য
প্রধান বন্দর
থেকে কেরালায়
নিয়মিত বাণিজ্যতরীর
আগমন হতো।
ডাচরা জাভা
পর্যন্ত বাণিজ্য
বিস্তার করে
গোলমরিচ চাষ
শুরুর আগে
শুধু কেরালায়
এটি উত্পন্ন
হতো। সেকালে
শীতপ্রধান দেশে
গোলমরিচ একটি
প্রয়োজনীয় মসলা
হয়ে উঠেছিল,
যা কিনা
কেরালা থেকে
জাহাজ ভরে
আরবরা মক্কায়
নিয়ে যেত
এবং সেখান
থেকে সিল্করোড
ধরে পূর্ব-পশ্চিমে
প্রেরিত হতো।
চীন, ভারত,
কনস্ট্যান্টিনোপল ও
আফ্রিকায় আরবদের
একচেটিয়া বাণিজ্য
থাকার কারণে
ভারতের দক্ষিণ
উপকূলে জাহাজ
ভিড়িয়ে পণ্য
ক্রয় করা
তাদের জন্য
সহজ ও
স্বাভাবিক একটি
বিষয় হয়ে
ওঠে। নবম
শতাব্দীর আরব
পর্যটক আবু
জায়েদ লিখেছেন,
‘ওমানের
আরবরা, ছুতারের
আয়ুধ নিয়ে
প্রচুর নারকেল
উৎপাদন হয়
এমন জায়গায়
গমন করে।
তারা নারকেল
গাছ কেটে
শুকিয়ে তা
দিয়ে ভেলা
তৈরি করে।
কাপড়ের পাল
খাটিয়ে সেই
ভেলায় প্রচুর
নারকেল নিয়ে
এসে তারা
বাণিজ্য করে।’
আবু জায়েদের
বয়ান পড়ে
মনে হতে
পারে, ইসলামী
যুগেই আরবরা
ভ্রমণ করত।
তাছাড়া নারকেল
তো কেবল
ভারতে উত্পন্ন
হতো না।
শ্রীলংকার সঙ্গে
আরবদের সরাসরি
বাণিজ্য সম্পর্ক
ছিল। এখানে
প্রথম কথা
হলো, শ্রীলংকার
সঙ্গে বাণিজ্য
থাকার কারণেই
কেরালার উপকূলে
আসা আরবদের
জন্য সহজ
ছিল। পাশাপাশি
আরব কবি
ইমরুল কায়েসের
লেখায় গোলমরিচের
উল্লেখ পাওয়া
যায়। ইমরুল
কায়েস ইসলাম-পূর্ব
আরব কবি
এবং তখনো
গোলমরিচ কেবল
কেরালায়ই উত্পন্ন
হতো। ভারতীয়
উপকূল থেকে
প্রথমে ইয়েমেনের
বন্দরে এবং
সেখান থেকে
লোহিত সাগর
ধরে সিরিয়ায়
পণ্য নেয়া
হতো। এরপর
মিসর-আলেকজান্দ্রিয়া
পেরিয়ে এসব
পণ্যের ঠিকানা
হতো ইউরোপ।
অর্থাৎ ইসলামের
উন্মেষের আগেই
আরবরা ভারতের
দক্ষিণ-পশ্চিম
উপকূলে—স্পষ্ট
করে বললে
মালাবারে—হাজির
হয়েছিল।
ইসলাম প্রচারের
পর এ
আগমন বৃদ্ধি
পায়। শুরুর
দিকে কেবল
বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে
আগমন করলেও
এ সময়
ধর্ম প্রচারও
একটি কারণ
হয়ে দাঁড়ায়।
দক্ষিণ ভারতের
প্রত্নতত্ত্ববিদ কেএম
মোহাম্মদ মালাবারে
আরব আগমন
সম্বন্ধে লিখতে
গিয়ে কে
শ্রীধরের মত
উল্লেখ করেছেন।
শ্রীধর মনে
করেন, ‘আরবরা
বহু পূর্ব
হতেই সমুদ্র
বাণিজ্য করত।
এ সময়
তাদের উপস্থিতি
দ্বিগুণ করে
তোলে। ভারতে
ইসলামের আগমন
বললে আজ
অবধি অনেকে
মোহাম্মদ বিন
কাসিমের সিন্ধু
অভিযানকে বোঝেন,
কিন্তু মালাবার
উপকূলে ইসলামের
আগমন আরো
আগে হয়েছিল।
তবে এ
প্রচার খ্রিস্টান
মিশনারিদের মতো
ছিল না।
মুসলিমরা ব্যবসার
পাশাপাশি ইসলাম
এবং এর
বিধি ব্যবস্থা
সম্পর্কে মানুষকে
জ্ঞাত করেছিল।
সমুদ্র ধরেই
যে ভারতে
ইসলামের প্রথম
আগমন হয়েছিল
এবং তা
যে মালাবারেই
হয়েছিল, বর্তমান
ত্রিশুর জেলার
কডুঙ্গালুরে অবস্থিত
চেরামান জুমা
মসজিদটি সে
কথার প্রমাণ।
মসজিদটি ৬২৯
খ্রিস্টাব্দে তৈরি
বলে ধারণা
করা হয়।
অর্থাৎ মোহাম্মদ
বিন কাসিমের
বহু আগে,
নবী মোহাম্মদ
(স.)-এর
জীবদ্দশায় এ
মসজিদ তৈরি
হয়। কেরালা
ও মালাবার
অঞ্চলে ধীরে
ধীরে মুসলিম
বসতি স্থাপিত
হয়েছিল। এমনকি
এ অঞ্চলের
ভাষায়ও আরবি
ও ইসলামী
ছাপ এখনো
বর্তমান।’
বাণিজ্য লক্ষ্মীর
আশীর্বাদ লাভের
আশায় ডাচ,
পর্তুগিজ বণিকরাও
কালিকট, কোচিন
প্রভৃতি বন্দরে
এসে নোঙর
করত। ফলে
বিভিন্ন ধারার
মানুষের সম্মিলনে
কেরালা বৈচিত্র্য
লাভ করার
সঙ্গে সঙ্গে
একটি ‘প্রায়
কসমোপলিটন’ হয়ে
উঠেছিল। ইউরোপীয়দের
আগমন তো
বহু পরের
কথা, এমনকি
এ অঞ্চলে
রাজা সলোমন
এসেছিলেন বলেও
উল্লেখ করা
হয়। নেবুচাদনেজারের
কয়েদ থেকে
পালিয়ে মালাবার
উপকূলে ইহুদিদের
আগমন এবং
স্থানীয় রাজাদের
প্রতি তাদের
আনুগত্যের গল্প
এখনো প্রচলিত।
কিন্তু কেবল
গল্প নয়,
বাস্তব প্রমাণও
রয়েছে। বর্তমান
কোচিতে ‘জুইশ
স্ট্রিটে’ অবস্থিত
একটি সিনাগগ
(ইহুদিদের প্রার্থনাস্থল)
এবং কিছু
স্থাপনা থেকে
সেকালের কেরালায়
ইহুদিদের অস্তিত্ব
সম্বন্ধে নিশ্চিত
হওয়া যায়।
এমনকি নিশ্চিতভাবে
এখানে একসময়
বৌদ্ধ ধর্মও
বিকশিত হয়েছিল।
টিএম থমাস
আইজ্যাক বলেন,
‘খননকার্য
থেকে নিশ্চিত
হওয়া যায়
যে মুজিরিস
একসময় দক্ষিণ
ভারতের বৌদ্ধ
ধর্মের কেন্দ্রে
পরিণত হয়েছিল।
কডুঙ্গালুরের কুড়ুম্বা
ভগবতীর মন্দির
বৌদ্ধ ধর্মের
উপস্থিতির সাক্ষ্য
বহন করে।
পরবর্তী সময়ে
স্থানীয়রা বৌদ্ধ
ধর্ম ত্যাগ
করা শুরু
করলে এটি
একটি হিন্দু
মন্দিরে পরিণত
হয়।’ থমাস
আইজ্যাকের মতে,
এ অঞ্চলে
জৈন ধর্মের
বিকাশেরও প্রমাণ
রয়েছে।
বর্তমান কেরালার
ভাষা ও
জীবনাচরণের দিকে
তাকালে একটি
অসাম্প্রদায়িক চেহারা
দেখা যায়।
এতগুলো ধর্ম,
জাতি ও
ভাষার মানুষের
সম্মিলন স্থানটি
স্বভাবতই একটি
স্বতন্ত্র চরিত্র
ধারণ করেছে।
তবু কেরালায়
ইসলাম ধর্মের
প্রাধান্য লক্ষ
করা যায়।
মালয়ালমভাষী, কেরালার
উপকূল ও
লাক্ষাদ্বীপে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক
মুসলিম বসবাস
করে। এখানকার
মুসলিমদের পূর্বপুরুষের
ইতিহাস খুঁজতে
গেলে ওই
সমুদ্র বাণিজ্যের
কথাই ঘুরেফিরে
আসবে। তবে
এখানে উল্লেখযোগ্য
তথ্য হলো
একাদশ শতাব্দীতে
বিজয়-চোল
শাসনের সময়
আরবদের সমুদ্র
বাণিজ্য সমৃদ্ধির
শীর্ষে আরোহণ
করে। কিন্তু
মুসলিম, আরব
বসতিগুলো এ
সময়েরও আগে
স্থাপিত হয়েছিল।
কাসিমের সিন্ধু
অভিযানের আগেই
মালাবারে আরব
বসতি স্থাপিত
হওয়ার প্রমাণ
রয়েছে। আহমাদ
আল বালাধুরি
লেখেন, ‘বণিজ্যের
স্বার্থে কিছু
আরব পরিবার
বসতি স্থাপন
করেছিলেন। পরিবারের
জ্যেষ্ঠ সদস্যরা
মারা গেলে
স্থানীয় রাজা
পরিবারের অন্যদের
সিন্ধুতে প্রেরণের
সিদ্ধান্ত নেন।
পথিমধ্যে অনেকে
মারা গেলে
হাজ্জাজ বিন
ইউসুফের নির্দেশে
মুহম্মদ বিন
কাসিমের অধীনে
সেনা প্রেরণ
করা হয়।’
বালাধুরির লেখার
পাশাপাশি উত্তর
মালাবারের পান্থালিয়িনি
কোল্লামে একটি
আরবি লিপি
পাওয়া যায়।
লিপিতে উল্লিখিত
১৬৬ হিজরি
মোতাবেক এ
লিপির সময়
৭৫২ খ্রিস্টাব্দ।
এছাড়া ৮৪৯
খ্রিস্টাব্দে রচিত
তারিশাপল্লী লিপি
থেকেও বন্দরের
আশপাশের বিভিন্ন
অঞ্চলে মুসলিমদের
উপস্থিতির কথা
জানা যায়।
পরবর্তী সময়ে
স্থানীয় রাজা
জামোরিনের সঙ্গে
মুসলিমদের ঘনিষ্ঠ
সম্পর্ক তৈরি
হয়।
জামোরিন মূলত
একটি উপাধি।
মালাবারের হিন্দু
রাজারা এ
উপাধি ধারণ
করতেন, যার
অর্থ ‘সমুদ্রের
রাজা’।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী
এ রাজারা
সত্যিই সমুদ্রে
আধিপত্য করতেন,
বিশেষত ভাস্কো
দা গামার
উত্তমাশা অন্তরীপ
আবিষ্কারের আগ
পর্যন্ত। পরবর্তী
সময়েও জামোরিনরা
শক্তিশালী অবস্থানে
ছিলেন। মালাবারে
বিস্তৃত উপকূলজুড়ে
তত্কালীন কোলিকোড
থেকে শুরু
করে প্রাচীন
মুজিরিস, টিন্ডিস,
বর্তমান কোচিসহ
বেশকিছু বন্দর
ছিল। নিজ
নিজ শাসনকালে
জামোরিন এসব
বন্দরের বাণিজ্য
তদারক করতেন।
নিজেরা হিন্দু
হলেও মুসলিমদের
সঙ্গে তাদের
সুসম্পর্ক ছিল।
এ সময়
পর্তুগিজরা আধিপত্য
করার চেষ্টা
করলে একাধিকবার
জামোরিনদের সঙ্গে
সংঘর্ষ উপস্থিত
হয়। ষোড়শ
শতাব্দীর ভারতে
ইউরোপীয়দের আগমনের
পরিমাণ দ্রুত
বেড়ে চলছিল।
পর্তুগিজরা শক্তি
বৃদ্ধির চেষ্টা
করলে দক্ষিণ-পশ্চিম
উপকূলে—যেখানে
একসময় বড়
বড় বাণিজ্য
জাহাজের আগমন
ঘটত—ছোটবড়
রণতরী ভিড়তে
আরম্ভ করে।
১৫০৩ খ্রিস্টাব্দ
থেকে পর্তুগিজদের
সঙ্গে স্থানীয়
রাজার ক্রমাগত
সংঘর্ষ হতে
থাকে। নৌযুদ্ধের
জন্য ১৫২০
খ্রিস্টাব্দে জামোরিন
কর্তৃক কুট্টি
আহমেদ আলীকে
নিযুক্ত করা
হয় এবং
এখান থেকেই
বিখ্যাত ‘মারাক্কার’
পদের সূচনা
হয়েছিল। ১৫২০
থেকে ১৬০০
খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত
৮০ বছর
সময়ে চারজন
মারাক্কার—জামোরিনদের
প্রতি অনুগত
থাকার পরও
পর্তুগিজ চক্রান্তে—চতুর্থ
মারাক্কার মোহম্মদ
আলীকে খোদ
জামোরিন মৃত্যুদণ্ড
দেন। অসাম্প্রদায়িক
মালাবারও আসলে
ঔপনিবেশিক চক্রান্ত
থেকে মুক্তি
পায়নি।
বন্দর ও বাণিজ্য সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বহু বিষয়ের অবতারণা হয়েছে—বস্তুত কেরালার বৈচিত্র্যই এমন যে বহু বিষয় সামনে চলে আসে। আলোচনা পুনরায় বাণিজ্যের দিকে ঘুরিয়ে দিলে আমরা দেখব প্রাচীন সেই মুজিরিসের বাণিজ্যও বিচিত্র। আজকের দিনের পপুলিস্ট বয়ানে কেরালা, তথা মালাবারের বাণিজ্য সম্বন্ধে আলোচনা পর্তুগিজ আগমন থেকে শুরু হয়। এ নিবন্ধে মুজিরিস, কোলিকোডে সুপ্রাচীনকাল থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হতো বলে আমরা প্রমাণ পেলাম। আলোচনায় আরব প্রসঙ্গ অধিক আলোচিত হলেও উল্লেখ করতে হয় যে কেরালায় ইউরোপীয়রা মধ্যযুগের আগেই আগমন করেছিল। Rome and Carthage: The Punic Wars বইয়ে রেজিনাল্ড বোসওয়ার্থ স্মিথ মত প্রকাশ করেন যে, রোম ও কার্থেজের বৃহৎ দরজাগুলো মালাবারের চন্দনকাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। ইমরুল কায়েস যদিও অ্যান্টিলোপের মলের সঙ্গে তুলনা করে মালাবারের গোলমরিচের কথা বলেছেন, কেরালার বন্দরগুলো থেকে কেবল গোলমরিচ রফতানি হতো না। গোলমরিচের সঙ্গে মসলার মধ্যে এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি থেকে শুরু করে মুক্তা, এমনকি গাছের গুঁড়ি পর্যন্ত রফতানি হতো। গাছের মধ্যে শিশু গাছ, চন্দন প্রধান। মালাবারের সেগুনের চাহিদা ছিল প্রচুর। পরবর্তীকালে ইংরেজ ঔপন্যাসিকদের লেখায়ও সে প্রমাণ মেলে।
পশ্চিমের পাশাপাশি
কেরালার সঙ্গে
পূর্বেরও যোগাযোগ
স্থাপিত হয়েছিল।
দূর প্রাচ্যের
সঙ্গে সে
যোগাযোগ কতটা
বিস্তৃত হয়েছিল
তা স্পষ্ট
না হলেও
চীনের সঙ্গে
মালাবার উপকূলের
যোগাযোগ ছিল।
কথিত আছে
কলোম্বাস ও
ভাস্কো দা
গামারও প্রায়
শতবছর আগে
চীনের মিং
রাজপরিবারের একজন
নৌ সেনাপতি
চেং হো
কোলিকোডে আগমন
করেছিলেন। ভারত
মহাসাগরে অভিযানের
সময় তিনি
অসুস্থ হয়ে
মৃত্যুবরণ করলে
তার মৃতদহে
কালিকট উপকূলে
সমাধিস্থ করা
হয় বলেও
প্রচলিত। চেং
হো এসেছিলেন
কিনা তা
নিশ্চিত হওয়া
না গেলেও
পরবর্তী সমেয়
চীনা ব্যবসায়ীরা
সত্যিই এসেছিলেন।
প্লিনি দি
এল্ডারের প্রতিধ্বনি
করে চীনা
নাবিক মা
হুয়ানও কালিকটকে
‘বৃহৎ
বাণিজ্য কেন্দ্র’
বলে উল্লেখ
করেন। কেরালা
উপকূলে তিরিশের
অধিক মসজিদ
দেখেছেন বলে
মা হুয়ান
উল্লেখ করেছেন।
ইউরোপীয়দের আগে
কেরালা, মালাবারে
মুসলিম প্রাধান্যের
আরেকটি প্রমাণ
মা হুয়ানের
এ লেখা।
চীনারা ভারতে
বসতি, উপনিবেশ
স্থাপন করতে
আগ্রহী ছিল
না কিংবা
সুযোগ হয়নি।
কেরালার সংস্কৃতি
লক্ষ করলে
চীনের সঙ্গে
যোগাযোগের দৃষ্টান্তের
পাশাপাশি কেরালায়
এদের প্রভাব
অনুভব করা
যায়। চীনা
পাট্টু (চীনা
রেশম), চীনা
চাটি (পাত্র),
চীনা ভরানি
(কলস), চীনাপল্লী
প্রভৃতি কেরালার
সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে
জড়িত। দশম
থেকে পঞ্চদশ
শতাব্দী পর্যন্ত
কালিকট, কোচিনসহ
কেরালার ছোটবড়
বন্দরে চীনাদের
আগমন ঘটত
বলে কেরালার
ইতিহাস উল্লেখ
করে।
বর্তমানে কেরালা
আমাদের কাছে
এর প্রাকৃতিক
সৌন্দর্য সংস্কৃতি,
শিক্ষা, অসাম্প্রদায়িকতা
থেকে আরম্ভ
করে কারো
কারো কাছে
হয়তো মালয়ালম
সিনেমার শৈল্পিক
উপস্থাপনের জন্য
পরিচিত। সত্যি
বলতে পূর্ব
ও দক্ষিণে
তামিলনাড়ু, উত্তরে
কর্ণাটক, পশ্চিমে
লাক্ষাদ্বীপ সাগর
দিয়ে ঘেরা;
কোচিন, দক্ষিণ
কানাড়া, মালাবার
ও ট্যাভানকোর
নিয়ে গঠিত
প্রায় ৩৯
হাজার বর্গকিলোমিটারের
কেরালা তার
দীর্ঘ ইতিহাসের
কোনো কালপর্ব
বিস্মৃত না
হয়ে তা
ধারণ করে
রাখার কারণে
আজ এর
স্বাতন্ত্র্য, বৈচিত্র্য
ও সৌন্দর্য
অটুট রয়েছে।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





