১৩২০ বাংলার পৌষ-মাঘ যৌথ সংখ্যা ‘মহাজন বন্ধু’ সাময়িকী জানাচ্ছে, কৃষির প্রতি শিক্ষিত যুবকদের তেমন আগ্রহ নেই, আস্থাও নেই।
ইংরেজি ১৯১২-১৩ সালের সরকারি হিসাবে বাংলার ভূমির পরিমাণ ১৫ কোটি বিঘা (১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার কারণে বাংলা মানে অবিভক্ত বাংলা)। এর মধ্যে চাষের উপযোগী ভূমি সাড়ে সাত কোটি বিঘা, চাষের অযোগ্য জমি ৩ কোটি ৩০ লাখ বিঘা। আর পতিত জমি দেড় লাখ বিঘা। চাষের উপযুক্ত বনভূমি দেড় কোটি বিঘা এবং অনুপযুক্ত বনভূমি ১ কোটি ২০ লাখ বিঘা।
চট্টগ্রাম বিভাগে পতিত জমি পাঁচ লাখ বিঘা, ঢাকা বিভাগে পাঁচ লাখ বিঘা, রাজশাহী বিভাগে আট লাখ বিঘা। বর্ধমান বিভাগে ৬০ লাখ ও প্রেসিডেন্সি বিভাগে ৩০ লাখ বিঘা।
সে বছর ৯০ লাখ বিঘা জমিতে পাট চাষ হয়েছে, কিন্তু এর চেয়ে বেশি পরিমাণ পাট চাষের জমি অনাবাদি রয়ে গেছে। পাট থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৩৬ কোটি টাকা। চাষ উপযোগী জমির উৎপাদনক্ষমতার দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এ আয় অত্যন্ত কম।
শিক্ষিত যুবকরা কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে না নিলে এত বিশাল পরিমাণ জমি পতিত থাকত না। এ নিয়ে সরকার চিন্তিত। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কৃষি বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।

টিস্যু ভাবনা: কাগজের তোয়ালে
যে কাগজের টিস্যু ব্যবহার করে নিতম্ব পরিষ্কার করা হলো, সেই টিস্যু কি মুখও পরিষ্কার করবে? শুরুতে টিস্যু সমাদৃত হয়নি। বাংলায় টিস্যুর বাজার পেতে বহু বছর লেগেছে।
১০৫ বছর আগে ‘মহাজন বন্ধু’র আষাঢ়, ১৩১৯ সংখ্যার একটি রচনা থেকে কাগজের তোয়ালেবিষয়ক একটি স্তবক পুরো উদ্ধৃত করছি:
কাগজের তোয়ালে ইউরোপ আমেরিকায় খুব চলিয়াছে। পূর্ব্বে বলিয়াছি, নূতন এবং চালাইতে হইলে তাহার সুখ্যাতি করা চাই এবং সে সুখ্যাতি যে সে লোকেরা করিলে হয় না। সমাজ মধ্যে যে শ্রেণীর লোকের সঙ্গে মরণ-বাঁচনের সম্বন্ধ সেই শ্রেণীর লোকের দ্বারা তাহা করা চাই, তাই কাগজের তোয়ালে সম্বন্ধে বড় বড় ডাক্তারের মতামত গ্রহণ করা হইয়াছে। তাঁহারা বলিয়া দিয়াছেন যে কাগজের তোয়ালে দ্বারা সংক্রামক ও স্পর্শাক্রামক রোগ বিস্তার হয় না। শীতপ্রধান দেশে হোটেলে হাজার হাজার লোক একত্রে আহার করেন। তাহারা গ্রীষ্মপ্রধান দেশের ন্যায় আহারের পর জল দ্বারা হস্ত ও মুখ ধৌত করেন না। অর্থাৎ আঁচান না, কারণ জলে কনকনে শীত! কাজেই হাত ও মুখ রুমাল বা তোয়ালে দিয়া মুছিয়া ফেলেন। খবরের কাগজ দিয়া এ কাজ যে চলে না এমন নহে, তবু ঐ সকল স্থানে কাগজের রুমাল বাহির হইয়াছিল। এক্ষনে তোয়ালে বাহির হইয়াছে, বস্ত্রের তোয়ালেতে হাজার হাজার লোক একসঙ্গে হাত-মুখ মুছিলে, তাহা সঙ্গে সঙ্গে অপরিষ্কার হয়, ধোপার বাড়ি দিতে হয়, এবং হাজার লোকের ব্যবহূত তোয়ালে দ্বারা সংক্রামক রোগ সংক্রামিত হয়, তাহা সহজে অনুমেয়। তৎপরিবর্তে এক্ষনে কাগজের তোয়ালে প্রত্যেককে এক একখানি দিলে চলে, পরন্তু ইহার দামও অতিশয় শস্তা হইয়াছে। এত শস্তা বস্ত্রের তোয়ালে কাঁচাইবার জন্য যে খরচ হয় সেই খরচে অবাধে হাজার হাজার লোককে কাগজের তোয়ালে এক একখানি দিলে ক্ষতি হয় না। ৪৫০ খানি কাগজের তোয়ালে, মাপ ১৮ ইঞ্চি দীর্ঘ, ১২ ইঞ্চি প্রস্থ। মূল্য ১৪ আনা মাত্র।
কাগজের তোয়ালের প্রথম ব্যবহার আমেরিকায়। সেখানকার ডাক্তাররা প্রত্যয়ন করেছেন, এ তোয়ালে ব্যবহারে চর্ম ও চক্ষু রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু মহাজন বন্ধু তা বিশ্বাস করেনি। ওদিকে আমেরিকা ও ইউরোপে কাগজের তৈরি বাসনে বেশ খাওয়াদাওয়া করে যাচ্ছে।
এবার উপসংহারে বলা হয়েছে:
তাই আমরাও বলি বঙ্গবাসী! সাবধান হও, ডাবের দেশে দুই পয়সার ডাব ফেলিয়া চারি পয়সার সোডা ওয়াটার ধরিয়াছ। কিন্তু গুণধর্ম্মে সোডা ওয়াটার এবং ডাব একই দ্রব্য। অতএব সাবধান, যেন তুমি কাগজের বাসনে না মজ।...

ঢাকার মাছ কলিকাতায় ভক্ষণ!
মাছের ব্যবসায় নতুন উদ্যোগ। অগ্রহায়ণ ১৩১৯ বঙ্গাব্দ ‘মহাজন বন্ধু’তে খবরটি এসেছে:
সাগরজাত মত্স্য কলিকাতায় আনিয়া বিক্রয় করিবার জন্য সহরে ‘বেঙ্গল কোম্পানী’ নামক এক যৌথ কারবার গঠিত হইয়াছে। এই কোম্পানী কপোতাক্ষী নদীর মোহনা হইতে হাসনাবাদ পর্য্যন্ত মোটর নৌকায় (মোটরবোট) মাছ আনিবেন। নৌকা তৈয়ারী হইয়াছে। তৎপরে হাসনাবাদ হইতে কলিকাতায় রেলে মাছ আসিবে। কাশীমবাজারের মহারাজ ও রায় শ্রীযুক্ত যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী প্রভৃতি এ অনুষ্ঠানের উদ্যোগী। মিঃ কে চৌধুরী কার্য্যাধ্যক্ষ। যাহা হউক, এই কার্য্যটী অনুষ্ঠানে না থাকিয়া কার্য্যতঃ হইলেই কলিকাতাবাসী শস্তায় মত্স্য ভক্ষণ করিতে পাইবেন। আমাদের এমন অদৃষ্ট হইবে কি? ঢাকায় গিয়া শস্তায় মত্স্য খাইয়াছি। গোয়ালন্দ হইতে রেলযোগে বরফ দ্বারা সংরক্ষিত মত্স্য প্রাতঃকালে সিয়ালদহ স্টেশনে আমদানী হইয়া যথেষ্ট বিক্রীত হয় এবং এই কার্য্য বহু বাঙ্গালী করিতেছেন। বাবুদের মত্স্য ব্যবসায়ের সহিত এই সবল প্রকৃত মাছের মহাজনদিগের নাম থাকিলে, আমাদের আশা ভরসা আরো বৃদ্ধি হইত, কেননা বাবুরা কোন কর্ম্মে কর্ম্মী?
স্বদেশীর এ কী হাল!
স্বদেশী আন্দোলনের নেতারা বিদেশী দ্রব্য বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন। এ ডাক যে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে— ‘মহাজন বন্ধু’ আগাম জানিয়েছিল।
স্বদেশী ডাক যে ব্যর্থ, হিসাব কষে দেখিয়ে দিল মহাজন বন্ধু অগ্রহায়ণ ১৩১৯ সংখ্যা। বঙ্গে বিদেশী দ্রব্য আমদানি নামক রচনা থেকে আংশিক উদ্ধৃত:
১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে যুদ্ধের পূর্ব্বে আমদানি রপ্তানি দ্বিবিধ উপায়ে ভারতবর্ষে ৫০ কোটি টাকার উপর হইত, আজ সেই স্থলে ৪০০ কোটি টাকার বাণিজ্য চলিতেছে। কলিকাতার স্বর্গীয় রামদুলাল সরকার মহাশয় আমেরিকার সঙ্গে সর্ব্বপ্রথম কারবার করেন। তোমরা ঐরূপ কারবার কাহার সঙ্গে খুলিয়াছ?
তোমরা না দিয়াশলাই স্বদেশী করিয়াছিলে? কিন্তু তাহাতে বিদেশী দিয়াশলাই বন্ধ হইয়াছে কি? গত বর্ষে কলিকাতায় ২৬ লাখ ২৯ হাজার টাকার দিয়াশলাই আমদানী হইয়াছে। তোমরা না সাবানের কারখানা খুলিয়াছ? তাহাতে সাবান আমদানী বন্ধ হইয়াছে কি? গত বর্ষে কলিকাতায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকার সাবান আনীত হইয়াছে। যে সকল মা লক্ষ্মীরা কাচের চুড়ী স্ব স্ব হস্ত হইতে ভাঙ্গিয়াছিলেন, তাহারা এইবার দেখুন, গত বর্ষে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার কাচের চুড়ী কলিকাতায় আমদানী হইয়াছিল। যাহারা বলেন বিদেশীরা আমাদের দেশ হইতে খাদ্য ও শস্য লইয়া যায় এবং তদ্বিনিময়ে কাচ ইত্যাদি আনিয়া দেয়, তাঁহারা মনে রাখিবেন ক্রমেই উহারা চাউল গম প্রভৃতি এ দেশে আনিয়া দিবে, এতদিন তাহাও দিতেছিল...।
তাহার পর চিনি আমদানীর কথা, মসলা আমদানীর কথা, কুইনাইন আমদানীর কথা, প্যাটেন্ট ঔষধ আমদানীর কথা; কাচের কারখানা ভারতে যে ছিল না এমন নহে, তবুও বোতল আমদানী প্রতি বর্ষেই অধিক হইতেছে, গত বর্ষে ২ লাখ টাকার বোতল বঙ্গে আসিয়াছিল।...
বঙ্গের ইতিহাসে উহাদের (মিথ্যাচারী স্বদেশী নেতাদের) মিথ্যা ভাষণ স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হউক।
আরো বেতন বৃদ্ধি, বৈষম্য বৃদ্ধি
১৩২৭ বঙ্গাব্দের শেষে সঞ্জীবনী পত্রিকা বৈষম্যমূলক বেতন বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
পোস্ট ও টেলিগ্রাফ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি হইয়াছে। চীফ ইঞ্জিনিয়ার ২৭৫০ টাকা হইতে ৩০০০ টাকা বেতন পাইবেন। টেলিগ্রাফ ও ওয়ার্কশপের যে সকল সুপারিনটেনডেন্ট ৭০০ টাকা হইতে ১২৫০ টাকা বেতন পাইতেন, তাহারা ১০২৫ টাকা হইতে ১৫২৫ টাকা বেতন পাইবেন। ১৭৫০ হইতে ২১৫০ টাকা বেতনর দুইটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হইয়াছে।
ভারত কামধেনুকে অতি জোরে দহন করা হইতেছে। ইহার ফল অসন্তোষ। ধেনু তাই লাথি মারিতেছে।
এই ভেদনীতির অর্থ কী? প্রত্যেক ইউরোপীয় ছাত্রের শিক্ষার জন্য গবর্ণমেন্ট বত্সরে ৫৭.৪ টাকা, কিন্তু প্রত্যেক ভারতীয় ছাত্রের জন্য বত্সরে ৬.৪ টাকা ব্যয় করিয়া থাকেন। অর্থাৎ ভারতবর্ষের টাকার উপর ভারতীয়দের যত অধিকার ইউরোপীয়দের অধিকার তাহার ৯ গুণ অধিক।
তোমরা কর্মক্ষেত্রে ভেদনীতি অবলম্বন করিবে আর মুখে বক্তৃতার সাম্য প্রচার করিবে— সেই ফাঁকা বক্তৃতায় কাহারো মন ভিজিবে না। ইউরোপীয় ছাত্রের শিক্ষার জন্য গবর্ণমেন্ট মাথাপিছু যত টাকা ব্যয় করেন ভারতীয় ছাত্রের জন্যও তত ব্যয় করিতে ন্যায়তঃ ধর্ম্মতঃ বাধ্য।






