‘গরুর খুঁটোয় বেন্ধে বউ পিটালো কোন শালা, কোন শালি নাঙের সাথে পলায়ে গেল ভাতারের কোছড়ে লাথি মেরে, কার পুকুরে কিডা ডুব দেল কিডা দেল না, কেন দেল কেন না— ফিরিস্তি শুনতি শুনতি আর বিচার করতি করতি ফুরসত পাইনে, শ্বাস নিতিও ভুলে যাই, জানেন! চব্বিশ ঘণ্টার একটা সেকেন্ড আমি নিজির জন্যি ব্যয় করিনে। মানুষ মানুষ করতি করতি অমানুষ হয়ে গেলাম। অথচ এরাই কিনা আমার দোষ গেয়ে বেড়ায়! ভাল্লাগে, বলেন? মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই। রাজনীতি করতি আসাই ঘাট হয়েছে। না হলি চোর ধরতামও না, চোর হতামও না। আরে আমার কি লোকেরটা নিয়া লাগে? বাপের সম্পত্তির জোরেই তো সারা জীবন ঠ্যাঙের ওপর পা তুলে খাতি পারব। নিয়ার জন্য আসিনি ভাই, আসিছি কাজ করতি। অথচ কেউ না কেউ লেগেই থাকে পিছে! যা করিনি তার দায়ও নিতি হয়। আপনাদের সংবাদপত্রগুলোও কেমন যেন, কানকথায় এত কান দেয়, বিরক্ত লাগে মাঝে মাঝে। কিছু করি না করি, চুলকানি হলি যেমন খোঁচায় মানুষ, অমন খোঁচাতিই থাকেন। নিউজ করার আগে একবার অন্তত শুনে তো নিতি পারেন, পারেন না? ঘটনা ঘটলি তার অন্তত দুটো পক্ষ থাকে। সংবাদ করতি গেলি দুই পক্ষের কথাই শুনতি হবে। একজনের বক্তব্য আংশিক, তা শুনে নিউজ করলি তো অর্ধেক লেখা হবে। আর আংশিক সত্যি যে সত্যি না, তা তো সবাই জানে! এই যে আপনি সময় নিয়ে আসেছেন, জিজ্ঞেস করেছেন, দুদিক থেকে ঘটনা জেনে বুঝে লেখবেন, এইটা হলো গিয়ে আসল সাংবাদিকতা।
তা যা-ই হোক, যা বলছিলাম, টাকা দিয়ে বিল কিনলাম, বিড়ির ফ্যাক্টরি করব। লোকে বলে বেড়াচ্ছে, আমি নাকি সরকারি জাগা জোর করে লিখে নিয়েছি। কবে না জানি শুনতি হবে, নিঃশ্বাসও আমি সরকারি টাকায় নিই! মানুষ পারেও, বুঝলেন! টাকার মানে টাকা গেল, আবার চোর বদনামও নিলাম। সবাই হন্যে হয়ে গেছে। মওকা পেলেই টোকা দেচ্ছে গায়ে। যেন আমি মৌমাছির চাক, টোকা দিলিই মধু ঝরাব। এই কেসটাও ও রকম একটা টোকা। তাও ভালো ও মহিলা, পুরুষ হয়ে জন্ম নিছি নারীর টানে টলবই, কবে দেখবেন বাগানের কলা গাছও কেস করবে আমার নামে— আমি তাকে ধর্ষণ করিছি! হা হা হা! নিশ্চয়ই বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র এটা। না হলি আমি তো শালির উপকারই করিছি। বর তালাক দিয়েছে, যাওয়ার জায়গা নেই, লোকে ছিঁড়ে খুবলে খেত না আমি জায়গা না দিলি? যান আপনি দরগার বড় হুজুরের কাছে, শুনে আসেন, উনি যেভাবে বলেছেন, আমি সেভাবেই শরিয়াহ মোতাবেক করিছি সব। হ্যাঁ, তিন মাসের মধ্যে ছাড়ার কথা ছিল, ছাড়তি পারিনি। সময়ই হচ্ছিল না আসলে। নির্বাচনের সময় কাজের কি শেষ থাকে? সব তো এই একা হাতে করা। অন্য নেতাদের মতো আমি তো আর ক্যাডার পুষিনে। তাছাড়াও মেয়েটার সাথে সব মিলে কিছুটা এদিক ওদিক করিছি— স্বীকার করি। কিন্তু ওটুকু না করে আমার উপায় ছিল না। ওকে দেখিছেন আপনি? দেখলি বুঝতেন, যা করিছি, ভুল করিছি হয়তো, কিন্তু পাপ না। এর অন্যথা করার সাধ্য পুরুষ হিসেবে আমার ছিল না। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলিও তা-ই করত। যান না, এলাকায় খুঁজে দেখেন কোনো চুদিরব্যাটাকে পান কিনা, যে মেয়েটাকে দেখে একবারের জন্যও খাবি খায়নি! পাবেন না। শুধু শুধু দোষ দিয়ে লাভ নেই।
তার পরও এত নেমকহারাম হলো কী করে মহিলা? এতটা দিন ধরে বোঝা টানলাম ওর। খাওয়ালাম। পরালাম। মাখালাম। বাচ্চা বুড়ি কেউই যখন নিরাপদ না, তখন বুকে আগলে নিরাপত্তা দিলাম। ওষুধ পথ্য কেনা, চিকিত্সা— সব করলাম। ওর কোন বাপ করত এরাম করে? ওর তো সারা জীবন আমার পা ধুয়ে পানি খাওয়ার কথা। অথচ সে কিনা গীবত করে বেড়াচ্ছে! কেস মারিয়ে বেড়াচ্ছে! আমাকে চেনে ও? ওই কেস আমি ওর পাছায় ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে বের করে আনতি পারি। কিন্তু করব না। গ্রামের মানুষ, আমারই তো লোক। নিশ্চয়ই ভুল বুঝতি পারবে। আমার সমস্যাটা ঠিক এখানেই। অপরাধীকেও শাস্তি দিতে পারিনে, মায়া হয়। মানুষের প্রতি খুব দুর্বল আমি। এ দুর্বলতারই সুযোগ নিয়েছে মাগিটা।
যা হোক, এসব আবার লিখে দিয়েন না কিন্তু। এমনিতেই ঝামেলার বোঝা মাথায়। তার ওপর এই শাকের আঁটি বাড়াতি চাইনে।
আচ্ছা, অনেক কথা হলো, এবার যে মাফ করতি হয়! একটা মিটিং আছে উপজেলায়, যাওয়া লাগবে।
আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। সুমায়-সুযোগ হলি এইরাম আসবেন মাঝে মধ্যি, গল্পগুজব করা যাবে। চারপাশে মূর্খ মানুষের বাস। মন খুলে কথাই বলা যায় না, বক বললে বুক বোঝে, ফাঁক বললে ফুঁক! হা হা হা। মাঝে মাঝে শিক্ষিত মানুষের সঙ্গ না পেলে জংলি জংলি লাগে! আজ তাহলে উঠি, কেমন? ডাল-ভাত রান্না হচ্ছে, দুটো খেয়ে যাবেন। নইলে কিন্তু মন খারাপ করব।
এই, কিডা আছিস, উনাকে নাশতা পানি দে। যাওয়ার আগে খামটা দিস ঠিকঠাকমতো।’
উঠোনজুড়ে অঘ্রাণের মিষ্টি রোদ। রোদের গায়ে বাতাসের দোল। বাতাসে বাতাসে নবান্নের ঘ্রাণ। সে ঘ্রাণের ঢেউ কেটে বের হয়ে গেল চেয়ারম্যান। যাওয়ার আগে ছেলেটাকে দেখে নিল আরেকবার। কপালের ভাঁজটা মিলিয়ে গেল তখন— নাহ! একে নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সাহস পাবে না কিছু লেখার। তবু সাবধানের মার নেই। ওসিকে বলে রাখতে হবে একটু।
২.
‘না না, ছিঃ ছিঃ, তা কেন হবে! আমি কি পাগল, যে পেপারের লোকের কাছে কথা লুকাব? তাছাড়া লুকাবই বা কী? খুলেই বলব যা জানি। আমি শুধু ভাবছি, ব্যাপারটা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কী করে! সব মিলে ভালো ঠেকছে না আমার। যা না, তা-ই বানানোর সময় এখন। শেষ জমানা বুঝি এসেই গেল!
মহররমের আট চান্দের দিন ছিল সেদিন, মনে আছে। জোহরের আগে আগে, আমি এস্তেঞ্জা করতি বেরোইছি, গোসল করতি যাব। নামাজের আগে একটা মিলাদ পড়ানোর কথা। মতি মেম্বারের ফোন এল— খুব ঝামেলায় পড়েছে, উদ্ধার করতে হবে। তখনই আসতে চায় একবার। আমার তো তাড়া ছিল, তাই বললাম, ফোনে বলা যাবে কিনা। না, আসতি হবে। গোসল শেষ করে উঠতে পারিনি, উনি এসে হাজির। সাথে এক লোক আর তার পরিবার। তালাকের ব্যাপারস্যাপার। লোকটা বলছে, রাগের মাথায় বলে ফেলেছে না বুঝে, এখন অনুতপ্ত। একসাথেই থাকতে চায় ওরা। তালাক দেয়ার পর গত দুদিন ছিলও!
বললাম, বাবা শোনো, রাগের মাথায় হোক বা ভুল করে, উর্বর জমিনে বীজ ফেললি যেমন চারা হয়, এও তেমন। তালাক বলিচাও যখন, তখন তালাক। ঘটনা যা ঘটাইছ, তার দায়ভার তো নিতিই হবে। আবার বিয়ে না করলি তোমাদের আর একসাথে থাকা হবে না। তার জন্যি হিল্লে বিয়েই একমাত্র পথ। মাওড়ার মতো কানতি লাগল ওরা তখন। এমন কান্না, সহ্য হয় না। তার ওপর পড়েই থাকল পা ধরে। মায়া লাগছিল। কিন্তু আমার তো করার কিছু নেই, যা করার ওদেরই করতি হবে। ওদের তখন কান্নার ধুম, কিছু বলেও না, বিদেয়ও হয় না, আমিও উঠতি পারিনে। বেশ একটা মুসিবতেই পড়ে গেলাম! না পেরে মেম্বার বলল, অত চিন্তার কিছু নেই, তিন মাসের ব্যাপার তো, সেটা সে-ই সামলে নেবে। শুনেই যেন জ্বলন্ত চুলোয় পড়ল ওরা। কান্নাকাটি বাড়ল, চিত্কার-চেঁচামেচি বাড়ল, লোকজন জোগাড় হয়ে গেল। ব্যাপারটা কিরাম না? মেম্বার তাই আমারে দায়িত্ব দিল রাজি করাতে। মন মানছিল না, কিন্তু মেম্বার-ব্যক্তি-মানুষ, চেয়ারমেনি ভোটে দাঁড়াবে দুদিন পর, তাকে অমান্য তো করতি পারিনে। আর এইরাম একজন যদি কারো দায়িত্ব নিতে চায়, তাতে আমি কিডা আপত্তি করার? বিয়ে পড়ায়ে দিলাম। তিন তালাকের ল্যাঠা তিন কবুলে চুকে গেল!
খুব মামুলি একটা ঘটনা। মনে থাকার কথা না। ছিলও না। কিন্তু মাস ছয়েক পর আবার তারা হাজির। এবার আর স্বামীডা নেই। মেম্বার সাবই নিয়ে এসেছে মেয়েটাকে। শরিয়াহ মোতাবেক বিয়ে করতে চায়। অসহায় এক বেগানা নারীর ভরণপোষণের ব্যবস্থা হবে, বাচ্চা দুটোর আশ্রয় হবে ভেবে খুশিমনেই সেরে দিলাম কাজডা। আমার তো এতটুকুই কাজ, না? এরপর কী হলো না হলো, কিডা কারে নির্যাতন করল, কিডা কারে দিয়ে খারাপ কাজ করাল, তা কি দেখার কথা আমার, নাকি তার সুযোগ আছে বলেন? ফরিয়াদ না আসলি বিচার হবে কোত্থেকে? মেঘ না জমলে কি বৃষ্টি ঝরে?’
বাইরে তখন বিকাল গড়ানো আলো। মন কেমন করা সন্ধ্যার ধূসর আবহে ছেয়ে আছে চারদিক। হুজুর উঠলেন। ওজুটা ভেঙে গেছে। ওজুখানায় যেতে যেতে আস্তাগফিরুল্লাহ পাঠ করলেন তিনবার। তালাকের ব্যাপারটা ওইবারই প্রথম, হিল্লে বিয়েটা না দিলেও চলত। সগিরায় কবিরার দণ্ড দেয়া হয়ে গেছে। কিন্তু যে কেলেঙ্কারি থেকে একবার তাকে বাঁচিয়েছিল মেম্বার, তার কথায় ‘না’ করার সাধ্য কি হুজুরের ছিল? ভাবতে ভাবতে অজু করতে লাগলেন তিনি। কিন্তু কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারলেন না, তিনবারের জায়গায় কবজি ধুতে হলো পাঁচবার, নাকে পানি দিতেও ভুলে গেলেন। খেয়াল করতেই আবার শুরু করলেন গোড়া থেকে।

৩.
‘বউ চাকরি পেয়েচে। টানাটানির সংসারে দুটো বাড়তি টাকা ঢোকবে, আমার খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু চাকরিডা নোংরা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মায়াবড়ি দিয়ে আসতি হবে। কনডম দিয়ে আসতি হবে। এর-তার পেট ফেলানোর ব্যবস্থা করতি হবে। ভাবতিই গা গুলোচ্ছিল। তাছাড়া ঘরের বউ বাইরি বাইরি ঘুরে বেড়াবে, কিডা কী বলে, ভেবে মন ঠিক সায় দেচ্ছে না। গরিবির মানই সব, তা বিক্রি করা টাকার আমার দরকার নেই। তাই বারণ করিলাম। কিন্তু নেড়ি কুত্তার মতো খেঁকিয়ে উটিল বউডা। শুনে তো আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আরে ভাই, আমার বউ কনে যাবে, কী করতি যাবে, কার সাতে যাবে, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব তো আমারই, নাকি? না, আমার মতো অত্যাচারী ভাতারের ঘর আর করবে না, তার পথ সে দেখে নেবে! চিন্তা করা যায়!
স্বামী-স্তিরির জীবন হচ্ছে হাঁড়িকুড়ির জীবন, ঠুকঠাক লাগবেই ভেবে ভেবে মাফ করে দিছি। তবে ওইদিন আর পারিনি, বুজলেন! মুখ ফসকে বেরোয়ে গেছে কথাডা। বলার পরও বুঝিনি যে, তালাক হয়ে গেল। কিন্তু বউডা দেখি গড়াগড়ি দিয়ে কানতি লাগল। বাচ্চারাও। মুখ্যসুখ্য মানুষ, আমি কি আর অতশত বুঝি? ছুটে গেলাম মতি মেম্বারের বাড়ি। পার্টির ইউনিয়ন সভাপতি, সাপ সে ওঝাও সে-ই, বিপদে আপদে তার কাছেই ধরনা দেয় সবাই। আমিও পায়ে গিয়ে পড়লাম তার।
প্রথমে গাঁইগুঁই করল খুব। তারপর যেন মন গলল একটু। বলল, যে রোগ সে ওষুধ। হুজুর ছাড়া কেউ এর সমাধান দিতি পারবে না। নিয়ে গেল হুজুরের কাছে। তারপর যা হওয়ার তা হলো, পাপের শাস্তি, ভোগ তো করতিই হবে। তিন মাস তো? ও দেখতি দেখতি কেটে যাবে। ভাবলাম। কিন্তু যখন বউডা গিয়ে চেয়ারম্যানের পাশে বসল, তার চোখভর্তি খাল, খালভর্তি ঢেউ, আমি যেন ডুবে যাতি লাগলাম। আমার কলজেডা যেন কেউ ছিঁড়ে নিতি লাগল। মাথাডা নিয়ে কেউ যেন পিষতি লাগল যাঁতায়। মনে হচ্ছিল মরেই বুঝি যাব, কিন্তু তা গেলি এ দোজখজ্বালা ভোগ করবে কিডা? দমডা তাই বেরোয়নি।
হুজুর বলেছে, হিল্লেবাসের মধ্যি কোনো রকম দেখা-সাক্ষাৎ করা যাবে না। তিন মাস তো দূরির কথা, আমি তিনদিনও থাকতে পারলাম না! লুকোয়ে গিয়ে দেখা করলাম, করেই বুঝলাম, মরা ছাড়া পথ নেই আমার। মেম্বার বলেছে, তার সাথে স্বামী-স্তিরির মতো থাকা লাগবে। না হলি তিন মাস পার হলিও ছাড়বে না! বউডার গলা বসে গেছে কানতি কানতি, চোখ দুটো পাকা টমাটুমির মতো।
একে তো ধর্মের গিরো, তার ওপর মতিচোরার শয়তানি। আমরা তখন দুধারি করাতে আটকানো। হাট দুর্বল মানুষ, আমি সহ্য করব কী করে? আবার গিয়ে পড়লাম মেম্বারের পায়। সরাসরি তো বলা যায় না, মিনতি করলাম আকারে ইঙ্গিতি। চালাক লোক তো, কিছু বলল না, গায়-মাথায় হাত বুলোয়ে ঘরে পাঠাল। পরের দিন আবার গেলাম। বাড়িভর্তি লোক। ব্যস্ততার ঠেলায় হাঁটুর কাপড় যে উপরে উটে যাচ্ছে, দেখার সুমায় পাচ্ছে না। এক ফাঁকে শুধু বলল, এত পাগল হইচিস ক্যান? তোর বউরে কি আমি বেচে দোব, নাকি ভাড়া খাটাব বাজারে, যে মরতি বসিচিস? যা, দেকি কী করা যায়।
বুকির ভেতর যেন বল্লম দিয়ে খোঁচাতি লাগল কেউ। মনে হচ্ছিল তখুনি শেষ করে দিই শুয়োরটাকে। না হয় নিজি মরি। কিন্তু মা নেই, আমিও না থাকলি পথে বসপে বাচ্চা দুটো, তাই বাড়ি ফিরে গেলাম। পরের দিনই শুনি, আমি নাকি হযরতের চাতালে ডাকাতি করতি গিছি। আমার নামে কেস হয়েছে, পুলিশ আসছে। ধরা পড়লিই ক্রসফায়ার! তাই এই পলায়ে পলায়ে বাঁচা। চেয়ারম্যানের বউ হয়ে বউডা মনে হয় সুখীই আছে, আমার চিন্তা হয় বাচ্চা দুডো নিয়ে। কিন্তু কপালডা এতই খারাপ, বাপ হয়েও তাদের খোঁজখবর নিতি পারিনে। কিরাম আছে ওরা, কতি পারেন ভাই?’
ধান উঠে গেছে। দিগন্তজোড়া শূন্য খালি মাঠ। বুকজুড়ে তার গোছা গোছা স্মৃতির রোঁয়া আর বিগত চাষের ক্ষত। এখানে ওখানে থম ধরে বসে আছে শ্যালো মেশিনের ক্লান্ত অচল কুটির। এদের সবচেয়ে পড়োপড়ো নড়বড়ে সবচেয়ে বুড়ো ছাউনির ভেতরে বসে আছে লোকটা। চারপাশে বাঁশের চটার বেড়া, নিচে খেজুর পাতার চাটাই। নীল পলিথিনের চালা মাথার ওপর। চেহারাটা তাই নীল দেখাচ্ছে, যেন বিষ জর্জর দেহ। নীলাভ কালো দেহটা উদোম করে সে বুনে যাচ্ছে দড়ি। আসন্ন শীতে এ গাঁয়ের রসবতী খেজুর গাছগুলোর পরিচর্যার ভার নিয়েছে সে। মানুষ কি আর এমনি এমনি খাওয়ায়!
৪.
‘গলায় বাঁধা ধর্মের দড়ি, পায়ের গোড়ায় সমাজের। তবু পলায়ে গেলাম এক রাতে। কিন্তু কপাল যার খারাপ, শুকনো পথেও তার পা পিছলায়। ধরে ফেলল শুয়োরের চ্যালারা। শুয়োরডা বাড়ি ছিল না, ফিরল দুদিন পর। কিন্তু কিছুই বলল না আমাকে। রাতে এসেও কিছু না। হাবভাব দেখে বরং বুঝলাম, তার ভীমরতি চাগান দিয়েছে। এখন বিদেশী কোনো খারাপ ছবি দেখবে। শুয়ার আগে প্রায়ই ওসব দেখাত আমারে। না দেখার সাধ্য ছিল না, বাধ্য হয়ে তাকিয়ে থাকতাম সিডির দিকে, মনে হতো চোখে মরিচ ডলে দিয়েছে কেউ। জ্বলাচোখ নিয়ে সেদিনও তাকায়ে রইছি। হঠাৎ খেয়াল করলাম, ওটা বিদেশী কোনো ছবি না, আমারই ভিডিও! এরাম হলি মানুষির কিরাম হয় জানিনে, তবে একেবারে পাথর হয়ে গেলাম আমি। অবশ হয়ে গেলাম। মনে হলো ছাগল কাটা ছুরি দিয়ে কেউ আমার চামড়া ছিলতি লেগেছে, ছুরিডা ভোঁতা। দম বন্ধ হয়ে যাতি লাগল। হারামিডা তখন সত্যিই গলা টিপে ধরল। মুখে শুয়োরের মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ। বলল, ‘আর যদি পলাতি চেষ্টা করিস, তো তোর খুকিরে ধরে ভিডিও করব। তারপর মা-মেয়েকে বাজারে ছেড়ে দেব একসাথে।’ তারপর আর উচ্চবাচ্য করিনি। চিৎ হতি বললি হইছি, উপুড় হতি বললিও হইছি। বাচ্চাকে মত্ত হাতির পায়ে রেখে মা তো মরতিও পারে না, সেই সুযোগই নিয়েছে শুয়োরডা। ভোটের সময় কী না করিয়েছে আমারে দিয়ে! আমি শুধু পায় ধরতাম, কপালে যা লিখা ছিল, যা হওয়ার ছিল, হয়েছে, এখন দয়া করে স্বীকৃতি দিক আমারে। রোজার সুমায় তো মন নরম হয় মানুষির, এক ভোরে ছেহেরি খাতি খাতি জড়ায়ে ধরলাম পা, ‘বিয়ে করেন আমারে, নাই মেরে ভাসায়ে দেন গাঙে। আমি আর পারছিনে।’ পরদিনই আমারে হুজুরির কাছে নিয়ে গেল সে, বিয়ে করল শরিয়াহ মুতাবেক। কী যে হালকা সেদিন লাগল আমার নিজিরে! মনে হলো পাহাড় লেবে গেল বুকির উপরেত্তে। মনে হলো যাক, দিন ফিরল এইবার। কিন্তু বিয়েডাও যে আমাকে আটকে রাখারই বাহানা ছিল, তা বুঝিনি। বুঝলাম তখন, চেয়ারমেনি জিতার পরদিনই, যখন বের করে দেল। সেই থেকে এই পথে পথে ঘুরছি, মানুষির লাথি-গুঁতো খেয়ে বেঁচে আছি।
সব দোষ আমার। পুরুষ মানুষ ওইরাম, তা তো জানা কথাই। সমস্যাটা খুকির বাপের আগে থেকেই ছিল। কতদিন সহ্য করিছি, সেদিন কেন পারিনি আমি? পারলি তো তালাকই হতো না! ভুলডা আমারই। মনে হলিই চুল ছিঁড়ি, হাত কামড়াই। আমি এখন কনে যাব, কী করব? বাচ্চাদের মুখি ভাত দিতে পারিনে, গায়ে কাপড় নেই। কেস করতি গেলাম, সেখেনেও মরণ। ভিডিওডা যেহেতু ওরা দেখেনি, ওতে ঠিক কী কী আছে, কতটুকু আছে, না বললি নাকি কেস নিতি পারবে না। বলতি বলতি মনে হচ্ছিল, তখনই যদি মরতি পারতাম! কিন্তু তা-ই বা মরি কী করে, বিষ কিনতিও তো টাকা লাগে! অবশ্যি গাড়ির নিচে পড়তি পারতাম, গায় আগুন ধরায়ে দিতি পারতাম, কিন্তু মনে হলো, শেষ চিষ্টা একটা করে দেখি।
এখন এই আপনারাই আমার ভরসা। আপনারা আমার ধর্মের ভাই, পায়ে পড়ি আপনাদের, কিছু একটা ব্যবস্থা করেন। আমি পাপী হলিও আমার বাচ্চা দুডো তো নিষ্পাপ— ওদের বাঁচান। আপনাদের ধর্মের দুহাই, ওদের দিকি একটু তাকান। শরিয়ত মুতাবেক আমি চেয়ারম্যানের স্ত্রী। ভরণ-পোষণের অধিকারটুকু আমারে আদায় করে দ্যান।’
তিনভাগ জল আর একভাগ কথায় যখন শেষ হলো মহিলার বয়ান, বাইরে তখন অসময়ের বৃষ্টি। পত্রিকা অফিসের কাচের জানালায় বেয়ে নামা পানির ঝাপসা আঠাল আড়াল। ওপাশের পৃথিবীর কিছুই দেখা যায় না স্পষ্ট। তবু তাকিয়ে থাকে সে। অফিসের ভেতর বিকালের নাশতা, হাসি-ঠাট্টায় ভেঙে এলিয়ে পড়ছে সময়। মহিলার সামনেও একটা পিরিচ, তাতে দুটো সিঙ্গাড়া। সেদিকে তাকায় না মহিলা। চোখ ফোলা তার, গলা বসে গেছে। বুকের ভেতর আত্মঘৃণার ঢেউ। যে শুয়োরের লাশের ওপরও তার থুতু ছিটানোর কথা, যার ফাঁসি কামনা করে এসেছে প্রতিটা দিন, তার কাছে ফিরতেই মরিয়া হয়ে আছে সে! কোন জন্মের পাপের সাজা ভোগ করতে হচ্ছে এ তাকে? পুলসিরাতও নাকি শেষ হয় একসময়, তার জীবনের এ যন্ত্রণার কি শেষ নেই কোনো?






