রাজপুত্ররা মিত্রলাভের গল্পগুলো শুনে আচার্যকে বলল: আচার্য, মিত্রলাভের গল্পগুলো চমত্কার লাগল। এবার সুহূদ্ভেদের গল্প বলুন।

রাজপুত্রদের গল্পগুলো ভালো লেগেছে শুনে বিষ্ণুশর্মা সানন্দে বললেন: তবে শোনো...

 

সিংহ, ষাঁড় ও শেয়াল

 

এক বনে ছিল এক সিংহ ও এক ষাঁড়। উভয়ের মধ্যে চমত্কার ভাব। দুজনে মিলেমিশে মহানন্দে ছিল। কিন্তু এক অতিলোভী ও ধূর্ত শেয়াল তাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করে দিল।

রাজপুত্ররা সাগ্রহে বলল: কীভাবে?

বিষ্ণুশর্মা। শোনো সে কাহিনী। দাক্ষিণাত্যে সুবর্ণবতী নামে এক নগর ছিল। সেখানে বর্ধমান নামে এক বণিক বাস করত। তার অনেক ধন-সম্পদ। কিন্তু তার আরো সম্পদ চাই। কারণ সে যখন তার চেয়ে অত্যধিক ধনবান বন্ধুদের দিকে তাকাত, তখন তার নিজেকে খুব দরিদ্র মনে হতো। তখন তার পণ্ডিতদের কথাও মনে পড়ত। পণ্ডিতরা বলেন: যার প্রচুর ধন-সম্পত্তি আছে, সে যদি ব্রহ্মঘাতীও হয়, লোকে তাকে মান্য করে; আর ধন-সম্পত্তি না থাকলে চন্দ্রের মতো নির্মল বংশে জন্মগ্রহণ করলেও কেউ তাকে মান্য করে না। উদ্যোগহীন, অলস, কেবল ভাগ্যে নির্ভরশীল ও সাহসহীন ব্যক্তিকে লক্ষ্মী আশ্রয় করে না, যেমন বৃদ্ধ স্বামীকে যুবতী স্ত্রী আলিঙ্গন করতে চায় না। আলস্য, স্ত্রীর বশ্যতা, চিরকাল রোগভোগ, প্রয়োজনে জন্মভূমি ছেড়ে কোথাও যেতে না চাওয়া, অল্পতে সন্তুষ্ট হওয়া ও ভীরুতা — এ ছয়টি হচ্ছে দরিদ্রের লক্ষণ। যে সামান্য সম্পদেই ভাবে সে ভালো আছে, তার দারিদ্র্য কখনো কাটে না। উত্সাহহীন, আনন্দহীন, বীরত্বহীন ও শত্রুর আনন্দবর্ধন করে— কোনো মা যেন এমন পুত্রের জন্ম না দেন। যা পাওয়া যায়নি, তা পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যা পাওয়া গেছে, তা সযত্নে রক্ষা করতে হবে। রক্ষিত সম্পদ ক্রমাগত বাড়াতে হবে। আর বর্ধিত সম্পদ সৎপাত্রে দান করতে হবে। তবেই মানবজীবন সার্থক হবে।

এরূপ চিন্তা করে বর্ধমান একদিন নন্দনক ও সঞ্জীবক নামে দুই ষাঁড়কে জোয়ালে জুড়ে গাড়িখানা বিভিন্ন জিনিসে পূর্ণ করে ব্যবসার নিমিত্ত কাশ্মীরের উদ্দেশে যাত্রা করল। চলতে চলতে হঠাৎ সঞ্জীবক সুদুর্গ নামক এক গভীর অরণ্যে হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল। বর্ধমান বিমর্ষ হয়ে পড়ল। তার মনটা অস্থির হয়ে উঠল। খানিক চিন্তা করে সে মনে মনে বলল: অস্থিরতা সকল কাজের অন্তরায়। পণ্ডিতেরা বলেন, বিপদে স্থিরচিত্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

এরূপ ভেবে বর্ধমান সঞ্জীবককে ত্যাগ করে ধর্মধুর নগরে গেল। সেখানে বিশালাকার এক বৃষকে এনে জোয়ালে জুড়ে আবার চলতে লাগল।

এদিকে সঞ্জীবক তিন পায়ে ভর দিয়ে কোনো রকমে উঠে দাঁড়াল এবং কিছুদিনের মধ্যে তার পা ভালো হয়ে গেল। ইচ্ছেমতো আহার-বিহার করে অল্পদিনেই সে হূষ্টপুষ্ট হয়ে উঠল। খায়দায় আর বিকট গর্জন করে।

ওই বনের রাজা এক সিংহ। নাম পিঙ্গলক। সে একদিন জলপান করতে যমুনার দিকে যাচ্ছিল। কিছু দূর গিয়ে এক অজানা প্রাণীর বিকট গর্জন শুনতে পেল। ভয়ে তার পিলে গেল চমকে। কিসের জলপান! আগে জীবনটা বাঁচুক! এই ভেবে সে পিছিয়ে এল। নিজের আবাসে এসে ভাবতে লাগল, এ কে এল আমার রাজ্যে?

এদিকে দমনক ও করটক নামে দুই শেয়াল দূর থেকে পিঙ্গলককে জলপান না করেই ফিরে আসতে দেখে ফেলল। তারা পিঙ্গলকের মন্ত্রিপুত্র। তাদের কৌতূহল হলো। দমনক করটককে বলল: করটক, প্রভু যে জলপান না করেই ফিরে এলেন! ব্যাপারখানা কী?

করটক বিরক্তিভরে বলল: এই ব্যাটা বিনা অপরাধে বহুকাল ধরে আমাদের অবজ্ঞা করছে। এজন্য আমরা অনেক দুঃখ পেয়েছি। কাজেই এর ব্যাপারে আমাদের নাক না গলানোই ভালো। তাছাড়া আমরা আর ওর গোলামি করব না। দেখো, পরের আশ্রিত ব্যক্তি রোদে পুড়ে, জলে ভিজে, শীতে কষ্ট করে যেটুকু সুখ পায়, বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিজের পরিশ্রমে তার চেয়ে বহুগুণ সুখ পায়। কারো অধীন না হয়ে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক সম্মানের। যারা পরাধীন, তাদের জীবিত বললে মৃত বলবে কাদের? যারা মূর্খ, তারাই গণিকার ন্যায় নিজেদের নানাভাবে সাজিয়ে পরের উপভোগ্য করে তোলে। আর মনিবরা চাকরদের কোন চোখে দেখে, শুনবে? চাকর যদি মনিবের কাছে চুপ করে থাকে, তাহলে মনিব তাকে বলে বোবা, বেশি কথা বললে বলে বাচাল, অন্যায় সহ্য করলে বলে ভীরু, সহ্য না করলে বলে ছোটলোক, সবসময় কাছে কাছে থাকলে বলে দুর্বিনীত, আবার দূরে দূরে থাকলে বলে মূর্খ। এমন জীবনকে ধিক!

দমনক করটককে সান্ত্বনার সুরে বলল: এ কী বলছ তুমি, ভাই? রাজা হচ্ছেন বটবৃক্ষ। তাকে আশ্রয় করে কত লোক জীবন ধারণ করে। রাজা তুষ্ট হলে অচিরেই সেবকদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। তাই রাজার সেবা করব না?

করটক বলল, তাহলেও আমি বলব, ওসব রাজরাজড়াদের ব্যাপারে আমাদের থাকার দরকার নেই। যার যা কাজ নয়, তা করতে গেলে সেই কীলক উৎপাটনকারী বানরের মতো দশা হবে।

দমনক আগ্রহভরে জানতে চাইল, কী হয়েছিল সেই বানরের?

করটক। শোনো, বলছি...

 

কীলক উৎপাটনকারী বানর

মগধ দেশের একটি জনপদের নাম ধর্মারণ্য। সেখানে শুভদত্ত নামে এক কায়স্থ বাস করতেন। তিনি একটি বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করছিলেন। সেখানে একখানি কাঠ করাত দিয়ে ফাঁড়াই করা হচ্ছিল। কিছুটা ফাড়াই হওয়ার পর সূত্রধর দুই খণ্ড কাঠের ফাঁকে একটা কীলক (খিল) দিয়ে খেতে গিয়েছিল। এই সুযোগে খেলতে খেলতে এক দল বানর সেখানে এল। তার মধ্যে একটি বানর লাফ দিয়ে সেই অর্ধ ফাড়াই করা কাঠের ওপর উঠে কীলকটা হাতে ধরল। তখন তার অণ্ডকোষ দুটি দুই কাঠের ফাঁক দিয়ে ঝুলছিল। সে কীলকটি নিয়ে টানাটানি করতে করতে হঠাৎ সেটি উঠে এল। অমনি দুই কাঠের চাপে তার অণ্ডকোষ দুটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। বানর মারা গেল। তাই বলছিলাম, যার যা কাজ নয়, তা করতে যাওয়া বিপজ্জনক।

দমনক বলল: তবুও প্রভুর ভালো-মন্দ চিন্তা করা সেবকের ধর্ম।

করটক। সে কাজ প্রধানমন্ত্রীই করুন, যার ওপর রাজার সমস্ত কাজের ভার দেয়া হয়েছে। তাছাড়া কারো অনধিকার চর্চা করা উচিত নয়। এর ফলে মৃত্যুও ঘটতে পারে, যেমন ঘটেছিল বোকা গর্দভের।

দমনক। কী সে ঘটনা? খুলে বলো।

করটক। বলছি, শোনো...

 &dquote;&dquote;

বোকা গর্দভ

বারাণসীতে কর্পূরপটক নামে এক ধোপা ছিল। তার ছিল একটি পোষা কুকুর ও একটি গর্দভ। একদিন রাতে ধোপা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এমন সময় বাড়িতে চোর ঢুকেছে। গর্দভ কুকুরকে বলল: বন্ধু, বাড়িতে চোর ঢুকেছে। তুমি চিত্কার করে প্রভুকে জাগাচ্ছ না কেন?

কুকুর বলল: এটা আমার কাজ। এ নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি কি জানো না যে, আমি দিন-রাত এর ঘর পাহারা দিই। যেহেতু সে অনেক দিন নিশ্চিন্তে আছে, তাই সে আমার কথা ভুলে গেছে। ঠিকমতো খাবারও দেয় না। আসলে প্রভুরা বিপদে না পড়লে সেবকদের আদর করে না।

গর্দভ ক্ষোভের সঙ্গে বলল: কাজের বিনিময়ে যে পুরস্কার চায়, সে নিন্দার যোগ্য।

কুকুর। তবে তুমি শোনো, যে প্রভু কেবল কাজের সময়ই মিষ্টি কথা বলে, সেও নিন্দার যোগ্য।

গর্দভ এবার রেগে গিয়ে বলল: ওরে দুষ্টবুদ্ধি, তুই পাপিষ্ঠ; কেননা প্রভুর বিপদের সময় তুই তার কাজ উপেক্ষা করছিস। ঠিক আছে। প্রভু যাতে জাগেন, আমি তা-ই করছি।

এই বলে গর্দভ জোরে চিত্কার দিল। তার চিত্কারে চোর পালিয়ে গেল। ধোপা ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসে দেখে, কুকুরটি নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। চোর এলে তো তারই চিত্কার করার কথা। তাই অকারণে চিত্কার করে অসময়ে ঘুম ভাঙানোর জন্য ধোপা গর্দভের ওপর ক্ষেপে গেল এবং লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাকে মেরে ফেলল। তাই বলছিলাম, অনধিকার চর্চা করা উচিত নয়। দেখো, আমাদের কাজ শুধু খাদ্যের জন্য পশুর অন্বেষণ করা। তাই সেই কাজে মন দাও। আর তারই বা এখন প্রয়োজন কী? আমাদের তো কয়েক দিনের খাবার মজুদ আছে।

দমনক সক্রোধে বলল: তুমি কি শুধু খাবারের জন্যই রাজার সেবা করছ? এটা অন্যায়। শুধু নিজের জন্য নয়, পরের জন্যও ভাবতে হয়। দেখো, যার জীবন থাকলে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীও বাঁচে, তার জীবনই সার্থক। নিজের জন্য কে না বাঁচে? যে বাঁচলে অনেকে বাঁচে, তার বাঁচাই প্রকৃত বাঁচা। কাকও তো যা-তা খেয়ে বেঁচে থাকে। তাহলে তার বাঁচা আর তোমার বাঁচায় পার্থক্য কী?

করটক বলল: আমরা হলাম সামান্য কর্মচারী। আমাদের এতসব বিচারে কী প্রয়োজন?

দমনক: দেখো, এ পৃথিবীতে এমনিতেই কেউ উচ্চ বা নিচ পদ লাভ করে না। নিজ নিজ চেষ্টা ও কর্মের দ্বারাই তা লাভ করে। একখণ্ড পাথরকে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠাতে অনেক কষ্ট করতে হয়, কিন্তু তাকে নিচে ফেলতে কোনো কষ্ট করতে হয় না। তেমনি নিজেকে উপরে তুলতে হলেও অনেক কষ্ট করতে হয়, নিচে নামাতে তা করতে হয় না। যার যার কাজই তাকে উপরে ওঠায় আবার নিচে নামায়। যে প্রাচীর তৈরি করে সে ক্রমশ উপরে ওঠে, আর যে কূপ খনন করে সে ক্রমশ নিচে নামে।

করটক: তা তুমি কী বলতে চাও, স্পষ্ট করে বলো।

দমনক: আমাদের প্রভু কোনো কারণে ভয় পেয়ে ফিরে এসে চুপচাপ বসে আছেন।

করটক: তুমি কী করে বুঝলে, তিনি ভয় পেয়েছেন?

দমনক: কারো আকার, ইঙ্গিত, চলন, কাজ, কথা ও চোখমুখের বিকৃতির দ্বারা তার মনোভাব বোঝা যায়। আমি বুঝতে পেরেছি, প্রভু নিশ্চয় ভয় পেয়েছেন। তাই আমি তার কাছে গিয়ে তার ভয় দূর করার চেষ্টা করব। এটাই আমার কর্তব্য।

করটক: দেখো, যে অনাহূতভাবে প্রভুর কাছে যায় এবং তার প্রিয়পাত্র হওয়ার চেষ্টা করে, পণ্ডিতেরা তাকে মূর্খ বলেন।

দমনক: পণ্ডিতেরা এও বলেন, বুদ্ধিমান ব্যক্তি যার যেমন মনোভাব তা অনুধাবন করে তার অন্তরে প্রবেশ করে শিগগিরই তাকে বশীভূত করে।

করটক: তা তুমি সেখানে গিয়ে কী করবে?

দমনক: প্রভু আমার প্রতি সন্তুষ্ট না বিরক্ত, তা আগে জানব।

করটক: তা জানার উপায় কী?

দমনক: মুখে হাসি হাসি ভাব, কুশল জিজ্ঞাসা, গুণের প্রশংসা করা, সাদরে বসতে বলা ইত্যাদি হচ্ছে সেবকের প্রতি প্রভুর সন্তুষ্ট থাকার লক্ষণ।

করটক: তবুও প্রসঙ্গ না এলে ও ব্যাপারে তোমার কিছু বলা উচিত হবে না। কারণ অপ্রাসঙ্গিক কথা বললে বুদ্ধিমানও অপমানিত হন।

দমনক: তুমি ভয় পেয়ো না। আমি কোনো অপ্রাসঙ্গিক কথা বলব না। তবে মনে রেখো, প্রভুর বিপদের সময়, প্রভু ভ্রান্ত পথে যাওয়ার সময় এবং প্রভুর কোনো ভালো কাজের সময় চলে যাচ্ছে বুঝতে পারলে হিতাকাঙ্ক্ষী ভৃত্য নীরব থাকতে পারে না। প্রভু কিছু না বললেও সেসব ব্যাপারে তার কথা বলা উচিত। এটাই রাজনীতির নিয়ম। তাই তুমি আমায় অনুমতি দাও। আমি যাই।

করটক: তথাস্তু। তোমার যাত্রা শুভ হোক।

দমনক করটকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পিঙ্গলকের উদ্দেশে যাত্রা করল। পিঙ্গলক তাকে দূর থেকে আসতে দেখে সাদরে প্রবেশ করাল। দমনকও ভক্তিভরে তাকে প্রণাম জানাল। পিঙ্গলক বলল: অনেক দিন পর তোমায় দেখলাম।

দমনক বিনয়ের সঙ্গে বলল: প্রভু, আমরা সামান্য ভৃত্য। আপনি না ডাকলে তো আর কাছে আসতে পারি না। তবে প্রভুর বিপদ দেখলে তো আর দূরে থাকতে পারি না।

দমনককে দেখে পিঙ্গলকের সাহস ফিরে এল। সে সলজ্জভাবে বলল: না, না। তোমরা আমার কত পুরনো লোক। তোমাদের ছাড়া কি আমি থাকতে পারি? আজ থেকে তুমি আমার কাছে কাছেই থাকবে।

দমনক বুঝতে পারল, পিঙ্গলক সত্যিই ভয় পেয়েছে। তার এখন বিশ্বস্ত লোকের দরকার। এ সুযোগে তার কাছে যেতে হবে। তাই সে বলল, কিন্তু প্রভু, আপনি যদি ভালো-মন্দ বিচার না করে সবার প্রতি সমান আচরণ করেন, তাহলে যোগ্য ব্যক্তির উত্সাহ নষ্ট হয়ে যায়। দেখুন, মানুষ তিন ধরনের হয়— উত্তম, মধ্যম ও অধম। যোগ্যতা অনুসারে তাদের যথাস্থানে বসাতে হয়। কেউ যদি মাথার অলঙ্কার পায়ে, আর পায়ের অলঙ্কার মাথায় পরে, তাহলে সব গোলমাল হয়ে যায়।

পিঙ্গলক দমনকের কথার অর্থ বুঝতে পারল। সে এও বুঝতে পারল যে, এই বিপদের সময় তাকেই তার দরকার। তাই সে দরদভরা কণ্ঠে বলল: তুমি এমনভাবে কথা বলছ কেন? তুমি হলে আমার প্রধানমন্ত্রীর পুত্র। কাছের লোক। আমার মনে হয়, কোনো দুষ্ট লোকের কথায় প্রতারিত হয়ে তুমি এতদিন আমার কাছে আসোনি। তোমায় আমার মন্ত্রী করলাম। এখন থেকে তুমি সবসময় আমার কাছেই থাকবে। তা এবার আসল কথাটি বলো।

দমনক। মাফ করবেন প্রভু। আমি দূর থেকে দেখলাম, আপনি যমুনায় জলপান করতে গিয়ে জলপান না করেই হকচকিত হয়ে ফিরে এসেছেন। এর কারণ কী?

পিঙ্গলক বনের রাজা। সে ভয় পেয়েছে এবং তা আবার তার প্রজা দেখে ফেলেছে, এটা ভেবে সে একটু লজ্জা পেল। তাই সলজ্জভাবে বলল: তুমি ঠিকই বলেছ। এ গোপন কথা বলার মতো বিশ্বাসের পাত্র কেউ নেই। এখন তুমি এলে এবং একমাত্র তুমিই সেই বিশ্বাসের পাত্র। তাই তোমাকে বলছি। শোনো, এই বনে এক অদ্ভুত প্রাণী এসেছে। ভয়ঙ্কর তার গর্জন। গর্জনের মতো তার শক্তিও নিশ্চয়ই তেমনই হবে। তাই আমাদের এ বন ছেড়ে অন্য বনে চলে যাওয়া উচিত।

দমনক কম্পিত কণ্ঠে বলল: এটা তো তাহলে খুবই ভয়ের ব্যাপার! সে গর্জন তো আমরাও শুনেছি! যে শত্রু সম্পর্কে ভালো করে না জেনে রাজাকে তার সঙ্গে যুদ্ধ করার পরামর্শ দেয়, সে যোগ্য মন্ত্রী নয়। তাই আগে ব্যাপারটা জানতে হবে।

পিঙ্গলক। কিন্তু আমি সত্যিই খুব ভয় পেয়েছি!

দমনক মনে মনে বলল: তা আমি বুঝতে পেরেছি। তা না হলে আমার সঙ্গে এ বন ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ করবে কেন? প্রকাশ্যে বলল: প্রভু, আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি, ততক্ষণ আপনি ভয় পাবেন না। কিন্তু করটক প্রভৃতিকেও কাছে ডাকুন। এ বিপদের সময় সবার এক থাকা উচিত। সবার ঐক্যের প্রয়োজন।

দমনকের কথামতো পিঙ্গলক করটককেও মন্ত্রী নিযুক্ত করল। তারপর তারা দুজনে ভয়ের প্রতিকার করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে রওনা হলো। যেতে যেতে করটক বলল: আচ্ছা, এই বিপদের প্রতিকার সম্ভব না অসম্ভব, তা না জেনে তুমি যে মহারাজকে কথা দিয়ে এলে?

দমনক হাসতে হাসতে বলল: ভয়ের কারণ আমার জানা হয়ে গেছে। ও হলো একটা ষাঁড়। মহারাজ ও আমাদের সবারই ভোজ্য।

করটক। যদি তা-ই হয়, তাহলে মহারাজের ভয় তখনই দূর করলে না কেন?

দমনক। যদি তা করতাম, তাহলে কি আমাদের এ সম্মান বাড়ত? তুমি আর আমি মন্ত্রী হতে পারতাম? দেখো, রাজনীতিশাস্ত্রে বলা হয়েছে, রাজাকে কখনো নিশ্চিন্ত করতে নেই। তাকে সর্বদা মন্ত্রীদের ওপর নির্ভরশীল করে রাখতে হয়। আর যদি তা করো, তাহলে তোমার অবস্থা হবে সেই দধিকর্ণের মতো।

করটক। কে সেই দধিকর্ণ? কী হয়েছিল তার?

দমনক। শোনো, বলছি...