ছেলেটির সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় বারে। এই শহরের সিটি সেন্টারের এক গাছের নিচে ভাপিয়ানো নামে জমজমাট বারে সে আমার পাশে এসে বসে। তখন মাত্র সাঁঝবেলা।

সপ্তাহের শেষ দিন গাণ্ডেপিণ্ডে সোনালি তরল গিলে পুরো পাঁচদিনের কর্মবেদনাকে নিষ্কাশন প্রক্রিয়া চলছিল। আমার বন্ধুর হাতে তখন বিয়ারের তৃতীয় গ্লাস। সোনালি বুদ্বুদ ওঠা সেই গ্লাসের দিকে আমি মুগ্ধ চাতক পাখি। মদিরায় আমার হাতেখড়ি নেই। তাই আমি এক বোতল বিটার লেমন তথা লেবুর শরবতে লবণ-চিনি এমনকি আলু ভাজা খাওয়ার গোল মরিচ দিয়ে একটা ঘোঁটা বানাতেই ব্যস্ত ছিলাম। আমার বন্ধু বলে চলছিল তার শেষ প্রেমিকার কথা। একটা গাড়ি নেই বলে সে চলে গেছে। রেশনের ট্রামে প্রেম করে টিনএজাররা। ৩০ পেরিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর প্রেমের জন্য গাড়ি থাকতে হয়।

আমার বন্ধু হয়তো বিয়ারের চতুর্থ গ্লাস নেবে এবং কিছুটা কাঁদবে। সার্বিয়ান মেয়েটিকে সে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছিল। আমি হাতের ভাঁজ করা টিস্যুটিকে পুনরায় ভাঁজ করছি বন্ধুকে দিতে হবে। এতসব প্রস্তুতির মধ্যে সে এসেছিল। আমাদের টেবিলে একটি চেয়ার ফাঁকা ছিল। সেখানে সে বসার অনুমতি চাইল মাত্র। এরপর তোয়াক্কা না করে একটা একটা টাকিলা শটের অর্ডার দিল। আমার বন্ধুর বয়ানে ছেদ পড়েছে বলে সে বিরক্তির চোখে তাকাতেই ছেলেটা হেসে দিয়ে জার্মান ভাষায় যেটা বলল, তার অর্থ দাঁড়ায়, তোমার ভাষায় তোমার গল্প করো। আমার জানার বা শোনার ইচ্ছা নেই। আমার শুধু বসার একটা জায়গা দরকার।

চারটে টাকিলা শট শেষ করে যাওয়ার সময় সে আলতো করে আমার ধরে রাখা গ্লাসে টোকা দিয়ে বলেছিল, আমার চোখে কী খুঁজছিলে সুন্দরী?

সুন্দরী কমপ্লিমেন্টে আমি ভীষণ অভ্যস্ত। পালটা হেসে জবাব দিলাম, তোমার দেশ কোন দেশ, এত সুপুরুষ জন্ম দেয়।

টাকিলার সঙ্গে শেষ করা একটা দুমড়ানো লেবুর খোসা আমার হাতে দিয়ে সে জানিয়েছিল, দেশ শব্দটা আমার কাছে এই কচলানো লেবুর খোসার চেয়েও তেতো।

সে চলে যেতেই আমার বন্ধু রাজাকার গাল দিয়ে উঠল। রাজাকার ছাড়া কেউ নিজের দেশকে তেতো বলতে পারে না, এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে সেদিনের মতো আমরা মদিরা পানে ইস্তফা দিলাম।

তারপর দুই সপ্তাহ কেটে গেছে। সাময়িক প্রবাসজীবন কাটিয়ে বাড়ি ফেরার আর মাত্র নয়দিন বাকি। এর মধ্যে যতবার বন্ধুদের সঙ্গে বারে গিয়েছি, আমি সেই ছেলেটাকে খুঁজেছি। কী যেন একটা পরিচিত ছায়া আমি সেদিন দেখেছিলাম। আরেকবার দেখতে চাই।

সেদিন আমার শেষ কর্মদিবস ছিল। গত ৩৫ দিন এখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি শাখায় আমি শরণার্থী ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং করতে এসেছিলাম। আমার দেশ এখন রোহিঙ্গা সংকট পাড়ি দিচ্ছে। আমার মতো এক্সপার্টদের কত কদর হবে। সেই আশায় শত লবিং করে এই ট্রেনিং বাগিয়েছি আমি। আর আটদিন থাকব। এই আটদিন রিক্রিয়েশন তথা বিনোদন আর বিনোদন। বন্ধুরাই সব করে দিল—প্যারিস ট্যুর, আর রিভার ক্রুজ। চারদিনের রিভার ক্রুজে রাইনের ওপর ভেসে বেড়াব। সুইজারল্যান্ড থেকে পানিতে ভেসে বের হয়ে লাইচেনস্টেইন থেকে অস্ট্রিয়া, সেখান থেকে জার্মানি, তারপর ফ্রান্স হয়ে নেদারল্যান্ডস। এর পরই রটারড্যামের সমুদ্র উপকূল। একদিন সমুদ্রে থেকে গায়ের চামড়া ট্যান করে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরব।

দেশ থেকে আসার পর একদিন নদীতীরে এসে বেশ ভাবচক্কর করে ছবি তুলে লিখেছিলাম রাইনের তীরে। কবির সুমনের গানে রাইন প্রথম শুনেছিলাম আমি। আমার বন্ধুরা আমার সেসব আবেগে পানি ঢেলে লিখল, এর চেয়ে ধানমন্ডি লেক অনেক বড়, আর হাতির ঝিলের পানিতে নাকি অনেক স্রোত।

সমুদ্রপাড়ের মেয়ে আমি। উখিয়া আমার আদি নিবাস, বিশাল নাফ নদী দেখেই বড় হয়েছি। তবু নদী দেখলে আদিখ্যেতাই লাগে। এখানেও নাফের মতো রাইনের বুকে সি গাল ওড়ে। হাত বাড়িয়ে খাবার দিলেই লুফে নেয়। রিভার ক্রুজে আসা অবধি আমি ডেকে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে সি গালকে খাওয়াচ্ছি। একদিনে ৫ ইউরোর রুটি সিগালকেই খাইয়ে দিয়েছি। আমার মা যদি শোনে ৫০০ টাকা আমি বনের পাখিকে খাইয়েছি, তবে অপচয়ের ওপর এক বিষম লেকচার শুনতে হবে। সে সময় সে দ্বিতীয়বার এসেছিল।

আমাদের কি আবার দেখা হওয়ার কথা ছিল? স্পষ্ট ইংরেজিতে জানতে চাইল।

আমি উত্তর করলাম, আমি চেয়েছিলাম।

পালটা জবাবে সে জানতে চেয়েছিল, আমি সুপুরুষ বলে?

আমার কণ্ঠস্বরের উদারা-মুদারা-তারা সব মাত্রা ভেঙে আমি ভাঙা কাচের মতো ঝনঝনিয়ে হেসে উঠলাম। আমার হাসিতে ডেকের অদূরে রোদ পোহানোর জন্য বসে থাকা এক বুড়ো দম্পতি চোখ কুঁচকে তাকাল।

আমি তাকে জানিয়েছিলাম, ছেলেদের সৌন্দর্য নিয়ে আত্মবিশ্বাস আমাকে অবাক করে না, আমাকে অবাক করে চোখের তারার গল্প। তোমার গল্প জানতে চাই বলেই চেয়েছিলাম আবার দেখা হোক।

হাত বাড়িয়ে নাম বলল নাউস। কিন্তু বানান শুরু করবে কে দিয়ে। তার নাম আমাকে আরো ধন্ধে ফেলে দিয়েছিল। আমি চট করে হাতের মোবাইল দিয়ে গুগল ঘুরে এসে জানলাম, নাউস জার্মান নাম। কিন্তু এই ছেলেকে কোনোভাবেই জার্মান লাগছে না।

সে এই রিভার ক্রুজের আয়োজকদের একজন। ক্রুজ আয়োজন করাটাই তার পেশা। রাতে স্পেশাল ডিনারের দাওয়াত দিয়ে বিদায় নিল। হাসিঠাট্টায় খুনসুটিতে আমাদের তিনদিন কেটে গেল। আমি নাউস থেকে বিশ্বরাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, সাহিত্য নিয়ে হাজারখানেক গল্প শুনে ফেললেও সেই চোখের তারায় লুকানো গল্পটা জানতে পারিনি। জানতে পারিনি দিন শেষে সে কার জন্য ঘরে ফেরে। কে তার কপালে চুমু দিয়ে বলে, ফিরেছিস খোকা!

তৃতীয় দিন নাউস বিয়ার নিয়ে বসেছিল। আমার বিয়ারের মগের ওপর ভাসা ফেনাকে ফেনিল সমুদ্র মনে হয়। আর ভেতরের সোনালি তরল যেন গলে যাওয়া সোনা। বিয়ারে নেশা হয় না, তবু যেন নাউস সেদিন নেশাতুর হয়েছিল। বলতে শুরু করেছিল তার সেই গোপন গল্পটা।

মাত্র ১১ বছর বয়সে তুমুল এক বৃষ্টির দিনে এক নৌকায় ভাসতে ভাসতে এসেছিল মাল্টার সমুদ্রসীমায়। কোস্টগার্ড গ্রেফতার করে পুরো নৌকা। ছেলে-বুড়োসহ কত মানুষ সেই নৌকায়। পানি নেই, খাবার নেই। মায়ের শুকিয়ে যাওয়া স্তনে একটু দুধ খুঁজে ফেরা শিশুদের অসহায় কান্না। একেকজনের চিল চিত্কারে কান পাতা দায়। নাউসের মনে নেই, কে তাকে এই জাহাজে তুলে দিয়েছিল। শুধু মনে আছে, তার একটা ঘর ছিল। জেলে বাবা একদিন ফিরল না। সমুদ্রেই হারিয়ে গিয়েছিল। বাবা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে আইভরি কোস্টের সমুদ্রতীরে উপকূলেই ঠায় বসে থাকত সে। সেখানেই একদিন দেখতে পায়, তার মা গলায় বেগুনি অর্কিডের মালা ঝুলিয়ে মাছের আড়তের মালিকের সঙ্গে হেঁটে গেল। মায়ের চুলেও সেদিন রুপালি তারার মতো অর্কিড গোঁজা ছিল।

তারপর সেই সমুদ্র, সেই নৌকা, ভাগ্যের অন্বেষণে ইউরোপে ছুটছিল এক আধভাঙা জাহাজের ৮১ জন মানুষ। নাউস অবশ্য একবারও মানুষ বলেনি। শরণার্থী বলেছিল। মাল্টার সমুদ্রে ঠাঁই নেয়া সেই জাহাজকে নয়দিন প্রশাসন আটকে রাখল মাঝসমুদ্রে। ক্ষুধার জ্বালায় একদিন এক নয় বছরের শিশু গলা চিপে মেরে ফেলল এক অ্যালবাট্রস পাখিকে। মৃত সেই পাখিকে নিয়ে সবার কী উল্লাস। রান্না হবে। কিছু খাওয়া হবে। সেই পাখির এক টুকরো তার ভাগ্যেও জুটেছিল। আগেই জানত গলা দিয়ে নামবে না। সেদিন রাতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হলো। সমুদ্রে ঝড়, আর না খেতে পারা মানুষগুলোর পাকস্থলী ঝলসানো গোশতের স্বাদ নিতে পারেনি। শুরু হলো বমি আর ডায়রিয়া। চোখের সামনে অ্যালবাট্রস হত্যাকারী সেই শিশুর চোখটা মরে গেল। ১০ দিনের দিন মাল্টার প্রশাসন একটু নরম হয়ে উপকূলে প্রবেশের অনুমতি দিল। কিন্তু মাটিতে নামতে পারবে না এই শর্তে। আবহাওয়া ভীষণ প্রতিকূল, ৮১ জন শরণার্থীকে ডুবিয়ে মারার পাপ তো ইউরোপের যিশু সইবেন না। তাই সদয় আচরণ। উপকূলে আসার পথে ভাসিয়ে দেয়া হলো সেই শিশুর লাশ। সাহায্যকারী সংস্থা এল। চার মাস সমুদ্রে থেকে তামাটে বর্ণকে আরো তামাটে করে নাউস আশ্রয় পেল জার্মানির এক শরণার্থী শিবিরে। ওরা যখন তার নাম জিজ্ঞাসা করেছিল, নিজের নাম তখন মনেই ছিল না। কেউ তাকে ডেকেছিল বয় নাম্বার ১৭ নামে। ওটুকুই বলতে পেরেছিল। নাম রাখা হলো নাউস। অর্থাৎ ধারালো। এক জার্মান দম্পতি তার খোরপোষের দায়িত্ব নিয়েছিল।

নাউসের নির্লিপ্ত চোখ গল্প বলে চলেছে। চোখের তারার গল্পটা যে আমার কত চেনা, সেই চেনা গল্পটাকেই খুঁজছিলাম আমি। তার বলার ভঙ্গিতে কিছু একটা ছিল, তাই আমার চোখ বাঁধ মানেনি।

নাউস তার তর্জনি দিয়ে আমার চোখের পানি তুলে নিয়ে বলল, তোমাদের দেশের মেয়েরা কি অন্যের গল্পেও কাঁদে?

আমি পাল্টা জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার দেশের মেয়েরা কাঁদে না?

সে যে জবাব দিল, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না—আমার তো দেশ নেই, আমি শরণার্থী।

আমি তখনই বিদায় নিয়ে চলে এলাম। ডেকে উঠে এলাম। মানুষের গল্পে এত মিল কেন থাকে, আর সেই গল্পটা কি আমাকেই জানতে হবে, এটাই আমাকে কুরে খাচ্ছে। ভীষণ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। আর মনের মধ্যে ঝড়।

আমাকে রুমে খুঁজে না পেয়ে ডেকে এসেছিল নাউস। হাতের চাদরটা জড়িয়ে দিতে দিতে বলল, কী হয়েছে তোমার?

আমি তোমার থেকে দূরে থাকতে চাই কিছুক্ষণ, বলেই নিচে নেমে এলাম।

অনেকদিন পর একটা নির্ঘুম রাত কাটল। ভোরের দিকে ঝিমুনির মতো এসেছিল, তাতে বাবা এসেছিলেন। নয় বছর আগে মারা যাওয়া বাবা বললেন, পৃথিবীটা শরণার্থীদের, এতে এত কষ্ট পাওয়ার কি আছে?

সকালে নাউস নিজেই কফি নিয়ে এল, এই কদিনে বেশ জেনে গেছে, আমি কোন কফি কীভাবে খেতে পছন্দ করি। নাউস শক্ত করে আমার দুই হাত ধরে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি সেই অ্যালবাট্রস মারা যাওয়ার গল্পে কষ্ট পেয়েছ? এটাই জীবন মেনে নাও। আমরা তো নিয়েছি। আমি এই পৃথিবীর সন্তান। কোনো দেশের নই।

আমি তার চোখের দিকে তাকিয়েই ছিলাম অনেকক্ষণ। তখন আমার চোখে একটা মৃত অ্যালবাট্রস আর মৃত রাজহাঁসের চোখ খেলা করছিল। ১৯৭৮ সালে এক যুবক এমনই এক বৃষ্টির দিনে নৌকায় ভেসে এসেছিল বাংলাদেশে। তার আদরের পোষা রাজহাঁসগুলো সেদিন মরে গিয়েছিল। মৃতদেহ ভাসছিল বাড়ির পেছনের পুকুরটায়। বাবার মুখে এ গল্প আমি বহুবার শুনেছি। যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন শুধু নিজের ভিটে আর মাটির ঘ্রাণের গল্প বলতেন। আমার দাদাকেও ওরা মেরে ফেলেছিল। মায়ের কল্যাণে আমি বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী একজন মানুষ। কিন্তু আমার সযতনে লুকিয়ে রাখা গোপন পরিচয় বড় তাচ্ছিল্যের, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী’।

সেদিন দুপুরে আমাদের পাঁচতারকা জাহাজ রটারড্যামের উপকূলে পৌঁছে। সে সময় তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল। আমিই একমাত্র পাগল, যে বৃষ্টিতে ভিজছিলাম। আমার আসলে চোখের কান্না লুকানোর ছিল। সমুদ্রে পৌঁছা উপলক্ষে এই জাহাজের বলরুমে বেজে চলছে ‘উই রিচ ইন দ্য সি’ জাতীয় একটা গান। সবাই সেই তালে তালে খুব নাচছিল। আমাকে ছাতা নিয়ে খুঁজতে এসেছিল নাউস। কপোল গড়িয়ে পড়া চোখের পানি আর বৃষ্টির পানি আমি তার কাছ থেকে আলাদা করতে পারিনি। আমরা সেই উত্তাল সমুদ্রে এক আকাশ বৃষ্টির নিচে চুমু খেয়েছিলাম তুমুল আলিঙ্গনে। আমাদের দুজনের চোখেই তাড়া করে বেড়াচ্ছি একজোড়া মৃত অ্যালবাট্রসের চোখ। আমি অনুভব করছিলাম, আমার শেকড় বিচ্যুত পূর্বপুরুষের ওষ্ঠ, ভালোবেসে যাদের কেউ কোনোদিন স্পর্শ করেনি।