কলকাতা শহরের রাসবিহারী এভিনিউয়ের যে জায়গাটিতে ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ, সেখানে দেশপ্রিয় পার্কের কাছে পশ্চিম থেকে পুব দিকে ধীরে ধাবমান একটি ট্রাম এসে থামে এবং তাতে উঠে পড়ি। ঘটনার ৬৪ বছর পর, ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর তেমনি এক হেমন্তের সন্ধ্যায় এই নিরিবিলি, ছিমছাম আর প্রশস্ত সড়কের উপরে ‘আদিম সর্পিণী সহোদরার মতো’ ছড়িয়ে থাকা ট্রামের লাইনে আমরা জীবনানন্দকে খুঁজি।
এখন কলকাতা শহরে ট্রামে ওঠা বেশ কঠিন। কেননা এখন ট্রাম ও অন্যান্য যানবাহন যেমন বাস, ট্যাক্সি, মোটরসাইকেল সবাই এক রাস্তায় চলে। বড় রাস্তার মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ট্রাম লাইন। ফলে কোনো সিগন্যালে কিংবা রাস্তার মাঝখানে ট্রামে উঠতে গেলে খুব সতর্কভাবে অন্য যানবাহন এড়িয়ে ট্রাম লাইনের কাছে যেতে হয়। এ এক ঝক্কি বটে। জীবনানন্দের সময়ে এ রকমটি ছিল না। তখন ট্রামের লাইন ছিল আলাদা। ফলে এই সময়ে জীবনানন্দ বেঁচে থাকলে হয়তো ট্রামে ওঠার সাহসই করতেন না।
ট্রাম লাইনের এই বিতিকিচ্ছিরি দশায় ট্রামের কর্মচারীরও ক্ষুব্ধ। তাদের ধারণা ও বিশ্বাস, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ধীরে ধীরে কলকাতা শহরকে ট্রামশূন্য করে দেবে, যার নানা আয়োজন তাদের চোখে পড়ে। এই শহরে একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, ট্রাম এখন গুরুত্ব হারাতে থাকা অজনপ্রিয় গণপরিবহনে পরিণত হয়েছে, যার আসলে ‘ঐতিহ্য’ ছাড়া কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। তারা দ্রুত গন্তব্যে যেতে চায়। ট্রামের মতো ধীরলয়ের বাহনে তারা স্বল্প দূরত্বে এবং কম পয়সায় যেতে চাইলেই কেবল ওঠে। ট্রামকে এভাবে খাদের কিনারায় নিয়ে আসার পেছনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারেরও দায় কম নয়। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প মেট্রোরেলের জন্য জমি ছেড়ে দিতে হয়েছে ক্যালকাটা ট্রাম কোম্পানিকে (সিটিসি)। বন্ধ করে দিতে হয়েছে একাধিক রুট।
রাসবিহারী এভিনিউ থেকে গড়িয়াহাট যেতে যেতে কথা হয় ট্রামের একজন টিকিটম্যান মাহথে রামের সঙ্গে। ১৯৮১ সাল থেকে তিনি ট্রামের টিকিটম্যানের চাকরি করছেন। জানালেন, তিনি যখন চাকরি শুরু করেন, তখনও ট্রামের বেশ কদর ছিল। বালিগঞ্জ-টালিগঞ্জে ওভারলোড হয়ে যেত। কিন্তু এখন ট্রাম লাইনের দুই পাশে রাস্তা করে দেয়ায় ট্রাম পড়ে গেছে মাঝখানে। ফলে মানুষের আগ্রহ কমেছে। কথা হয় ট্রামের দুজন চালকের সঙ্গেও। তারা নিজেদের নাম বলতে চাইলেন না। তবে যথারীতি খেদ ঝাড়লেন সরকারের ওপর। কারণ তাদের শঙ্কা, সরকার ধীরে ধীরে পুরো কলকাতা শহরকে ট্রামশূন্য করে দেবে এবং তখন তাদের জীবিকার সংকটে পড়তে হবে। তারা বললেন, ট্রাম ধীরগতির বাহন বটে; কিন্তু এটি অন্য যানবাহনের চেয়ে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব। মাহথে রাম জানালেন, প্রায় চার দশকের চাকরিজীবনে তিনি ট্রাম দুর্ঘটনায় কাউকে মরতে দেখেননি। কদাচিৎ অন্য যানবাহনের সাথে ধাক্কাটাক্কা লাগলেও তাতে হতাহতের সংখ্যা নেহাতই কম।
ট্রামের আদ্যোপান্ত
কলকাতায় ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অনানুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম চালু হয়। আর্মেনিয়া ঘাট থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ছিল এর রুট। এই পথের দৈর্ঘ্য ছিল ৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার। কিন্তু যাত্রীর অভাবে এ পরিষেবাটি ওই বছরের ২০ নভেম্বর বন্ধ হয়ে যায়। এর সাত বছর পর ১৮৮০ সালের ১ নভেম্বর ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি নামে একটি লন্ডনভিত্তিক কোম্পানি পুনরায় ট্রাম চালু করে। শুধু ভারত নয়, পুরো এশিয়ার মধ্যে কলকাতা শহরেই প্রথম ট্রাম চালু হয়। শুরুতে ট্রামের বাহক ছিল ঘোড়া। সে সময় ট্রাম কোম্পানিটির হাতে ১৭৭টি ট্রাম ও এক হাজার ঘোড়া ছিল। পরে স্টিম ইঞ্জিন ব্যবহূত হতো ট্রাম চালানোর জন্য। ওই সময় ট্রাম কোম্পানির ১৯ মাইল ট্রাম লাইন ছিল। এরপর ধীরে ধীরে ট্রামে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে থাকে। ১৯০০ সালে চালু হয় বিদ্যুৎ-চালিত ট্রাম। বর্তমানে ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানির অধীনে ২৫টির মতো ট্রাম লাইন আছে।
গত শতাব্দীর আশির দশকেও কলকাতা শহরে প্রায় ৪৫০ ট্রাম চলত বলে জানা যায়। কিন্তু সেই সংখ্যা কমতে কমতে এখন রাস্তায় নামে গোটা পঞ্চাশেক। কমেছে ট্রামের রুট সংখ্যাও। কলকাতা ট্রামওয়েজ কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের আওতায় ২৭০টি ট্রাম রয়েছে, এর মধ্যে চারটি বিশেষ গাড়ি। ১৮৯টি স্টিলবডি ৫৬টি কাঠের তৈরি, যেগুলো তৈরি হয়েছে ১৯৪০-৫০ সালের মধ্যে। বাকি ২১টি স্টিল ও কাঠের সমন্বয়ে তৈরি, যেগুলোকে ইংরেজিতে বলা হয় SLC (Stream Lined Cars)। এ গাড়িগুলোও তৈরি হয় ১৯৪০-৫০ সালের মধ্যে।
বর্তমানে কলকাতায় ট্রামের সাব-স্টেশন আছে ১০টি। এগুলো হচ্ছে শ্যামবাজার, রাজাবাজার, এমজি রোড, ডালহৌসি, এসপ্লানেড, হেস্টিংস, মনিনপুর, কালিঘাট, গড়িয়াহাট ও নোনাপুকুর। আর ট্রামের ডিপো আছে বেলগাছিয়া, রাজাবাজার, পার্ক সার্কাস, গড়িয়াহাট, কালিঘাট, টালিগঞ্জ ও খিদিরপুরে।
প্রতিটি ট্রামে গাড়ি বা কম্পার্টমেন্ট আছে দুটি করে, যেখানে ৫৪টি আসন রয়েছে। তবে পিক আওয়ারে ১২০ জন যাত্রী যেতে পারেন। ট্রামের ভাড়া দূরত্ব ভেদে ৫-৬ রুপি। তবে দুটি হেরিটেজ ট্রাম ‘বনলতা’ ও ‘বলাকা’র আসন সংখ্যা যথাক্রমে ৪৫ ও ২৩, যার ভাড়া ১০ রুপি। শনি ও রোববার এবং বিশেষ দিবসে এ ট্রাম দুটি চলে।
যানবাহনের আধুনিকীকরণ ও বৈচিত্র্য এবং দ্রুত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছার বাহন আসায় ট্রামের গুরুত্ব কমে গেছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল চালুর পর থেকেই ট্রামের ওপর মানুষের নির্ভরতা কমতে থাকে। তাছাড়া এই পরিবেশবান্ধব বাহনটির উন্নয়নে খুব বেশি উদ্যোগও নেয়া হয়নি। বরং সরকারের নানা কর্মকাণ্ডে এখন এটা স্পষ্ট যে তারা ধীরে ধীরে হয়তো কলকাতা শহরকে ট্রামশূন্য করে দেবে। ১৯৮১ সালে বউবাজার-শিয়ালদহ, বেন্টিক স্ট্রিট, এসপ্লানেড থেকে লালবাজার রুট বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় হাওড়া ব্রিজ ও হাওড়া স্টেশন লুপ। ২০১১ সালে বন্ধ হয়ে যায় বেহালা-জোকা রুট। ফলে ট্রামের রুট বন্ধ হওয়ার এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে একসময় হয়তো ট্রাম দেখতে মানুষকে জাদুঘরে যেতে হবে। আর ট্রামের গল্প পড়তে হবে গল্প-কবিতা-উপন্যাসে।
১৪ অক্টোবর ১৯৫৪
কবি জীবনানন্দ দাশ কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিতে নয়, বরং মারা গেছেন ট্রামের মতো একটা ধীরগতির বাহনের তলায় পড়ে। ফলে তার সৃষ্টিকর্ম তো বটেই, দশকের পর দশক ধরে এই দুর্ঘটনায় নিপতিত হওয়ার বিষয়টিও নানামাত্রিক আলোচনা ও তর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ ট্রাম লাইনে তিনি যে রকম ভয়াবহভাবে পড়ে গিয়ে শরীরের হাড়গোড় ভেঙেছেন, তা ওই ঘটনার আগেপরে আর ঘটেছে বলে তার সমসাময়িকরা মনে করতে পারেন না।
জীবনানন্দের সুহূদদের কারো কারো কাছে বিষয়টা খুব অস্বাভাবিকও নয়। অশোক মিত্র (আপিলা-চাপিলা, পৃষ্ঠা ১০৫) জানাচ্ছেন, জীবনানন্দের এই ট্রাম দুর্ঘটনা তাদের অনেকের কাছেই কেন জানি অবশ্যম্ভাবী বলে মনে হয়েছিল। যে আশঙ্কার উেস তাঁর চকিত চাহনি, সতর্ক-ঘাবড়ানো-অতর্কিত পদক্ষেপ, তাঁর কবিতার পঙিক্ততে পঙিক্ততে যা মনে করিয়ে দিত; ‘সতত সতর্ক থেকে তবু কেউ যেন ভয়াবহভাবে পড়ে গেছে জলে’। জীবনানন্দ জলে পড়ে যাননি, পড়েছেন ট্রামের তলায়, তবে সর্বনাশের এই বিকচনটি সম্বন্ধে তিনি যেন আগে থেকেই জ্ঞাত ছিলেন।
সত্যপ্রসন্ন দত্ত হাসপাতালের দিনগুলোতে একবার জীবনানন্দের শেষ দিককার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠদের একজন ভূমেন্দ্র গুহকে বলেছিলেন: এটা মেনে নিতে তার একটুও অসুবিধা হচ্ছে না যে, আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দই একমাত্র, যিনি ট্রামের মতো স্লোমুভিং গাড়ির তলায় পড়ে আহত হতে পারেন, অন্য কেউ হলে নিশ্চয়ই ফসকে যেতে পারতেন।
কী ঘটেছিল ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর? প্রভাতকুমার দাস (জীবনানন্দ দাশ, তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১৬০) জানাচ্ছেন, প্রতিদিনকার মতো সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরিয়ে বাসায় ফেরার পথে রাসবিহারী এভিনিউয়ে ‘জলখাবার’ ও ‘জুয়েল হাউজ’-এর সামনে রাস্তা পেরোতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। কিছুটা দূরে যে একটা ট্রাম অবিরাম ঘণ্টা বাজিয়ে এগিয়ে আসছে, সেদিকে খেয়াল নেই। হয়তো ডায়াবেটিসের জন্য সামান্য সময় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। গাড়ি যখন থামল, তখন তার দেহ ক্যাচারের ভেতরে ঢুকে গেছে। রক্তাপ্লুত অচৈতন্য দেহ উদ্ধারের কাজে পুটপাত থেকে ছুটে আসেন জলখাবারের (পরবর্তীকালে দোকানের নাম হয় শেলী ক্যাফে) মালিক চুনিলাল দেব। তিনিই ট্রামের ক্যাচার থেকে কবিকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনেন। তখন তার অবস্থা সংকটজনক অজ্ঞান অচেতন। অল্প সময়ের মধ্যে ট্যাক্সিতে করে নিয়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চুনিলালের কাছে খবর পেয়ে বাড়ির লোকজন হাসপাতালে ছুটে যান। দুর্ঘটনার ফলে জীবনানন্দের পাঁজরা, কণ্ঠা ও ঊরুদেশের হাড় ভেঙে যায়।
কবির অন্যতম জীবনীকার গোপালচন্দ্র রায় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী চুনিলালের ভাষ্য উদ্ধৃত করে জানাচ্ছেন, সমবেত জনতার মধ্য থেকে দু-একজনের কথা কানে এল। তারা বলছেন, ট্রাম লাইনের ঘাসের ওপর দিয়ে ভদ্রলোক (জীবনানন্দ) আপন মনেই আসছিলেন। ট্রামের ড্রাইভার ঘণ্টা বাজিয়েছে, দু-একজন রাস্তার লোক ট্রাম আসছে বলে চিত্কারও করেছে। কিন্তু ভদ্রলোক কিসের চিন্তায় এত বিভোর ছিলেন যে কোনো কিছুই তাঁর কানে যায়নি।
জীবনানন্দের সর্বশেষ কর্মস্থল হাওড়া গার্লস কলেজের সহকর্মী অজিত কুমার ঘোষ (জীবনানন্দ প্রসঙ্গ: জীবন নদীর তীরে, হাওড়া গার্লস কলেজ পত্রিকা, পৃষ্ঠা ৬৫) দুর্ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা এ রকম—ট্রামের অতর্কিত ধাক্কায় তিনি পড়ে গেলেন। ঘটাং করে ট্রামের ব্রেক কসার শব্দ হলো, ট্রামের গোটা শরীর থরথর করে কেঁপে থেমে গেল। জীবনানন্দকে টেনে বের করা হলো। প্রথমে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, জ্ঞান হতেই জিজ্ঞাসা করলেন ‘আমি কোথায়?’
দুর্ঘটনার পরদিন শুক্রবার বিকালে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে জীবনানন্দকে দেখতে গিয়েছিলেন অজিতকুমার। তার হাত ধরে জীবনানন্দ শিশুর মতো বললেন, ভেবেছিলাম ট্রামটা তো জলখাবারের সামনের স্টপেজে থামবে, আমি এরই মধ্যে পার হয়ে যাই। কিন্তু তা আর হলো না। মরেই যেতাম। কিন্তু কেন যেন বেঁচে উঠলাম।
ক্লিন্টন বি সিলি (অনন্য জীবনানন্দ, পৃষ্ঠা ১৩) লিখেছেন, চুনিলাল তাকে জানান, হইচই শুনতে পেয়ে ঘটনা ঘটার ?মুহূর্তের মধ্যে সেখানে পৌঁছার পর তিনি দেখতে পান, কেউ একজন ট্রামের নিচে পড়ে আটকে আছেন। চুনিলাল—গাট্টাগোট্টা মানুষটি—ঝুঁকে পড়ে ট্রামের একপাশে দুই হাত লাগিয়ে পরিস্থিতির প্রয়োজনে অতিমানবীয় শক্তি প্রয়োগ করে ট্রামের একটা পাশ আলগা করে তুলে ধরেন, যাতে জীবনানন্দের শরীরটাকে টেনে বের করা যায়।
দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা?
শাহাদুজ্জামান (একজন কমলালেবু, পৃষ্ঠা ৭) বলছেন, ট্রামের মতো এমন একটা স্লোমুভিং (ধীরগতির) লোকোমোটিভকে এড়িয়ে যাওয়ার টনক মানুষের থাকার কথা। ট্রামের ক্যাচার তৈরি হয়েছিল লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পশু তাড়ানোর জন্য। কিন্তু জীবনানন্দ দাশই সম্ভবত ট্রামের ক্যাচারে আটকে যাওয়া প্রথম এবং শেষ মানুষ। ফলে আদিম সাপের মতো ছড়িয়ে থাকা ট্রামের চাকার নিচে তাঁর এই মৃত্যু নিয়ে জট থেকে যায়। প্রশ্ন থেকে যায়, এটা কি একটা দুর্ঘটনা, নাকি তিনি ট্রামের চাকার নিচে আত্মহত্যা করেছেন?’
আবদুল মান্নান সৈয়দ (রচনাবলি, বাংলা একাডেমি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫৮) লিখছেন, ট্রামচালক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবেচনায় বারবার ঘণ্টা বাজানো সত্ত্বেও তিনি লাইনের ওপর চলে এসেছিলেন। এ থেকেই সন্দেহ হয়, স্বেচ্ছামৃত্যু কিনা। যদিও কেউ তা স্পষ্ট করে বলেননি। মগ্ন স্বভাবের জন্যও হতে পারে।
জীবনানন্দের এই মগ্ন স্বভাব বা অন্যমনস্কতার সাক্ষ্য দিয়ে সঞ্জয় ভট্টাচার্য (কবি জীবনানন্দ দাশ, পৃষ্ঠা ১২৫) লিখেছেন, জীবনানন্দ এমনিতেই একটু অন্যমনস্ক ছিলেন। রাস্তায় বুদ্ধদেব বসু পেছন থেকে ডেকে তাঁর সাড়া পাননি, এমন ঘটনাও আছে। পাশাপাশি গণেশ এভিনিউতে হেঁটে দেখেছি, একটি কথাও বলছেন না বা হঠাৎ কী মনে হওয়ায় জোরে হেসেই উঠলেন হয়তো।
মৃত্যুর পরের বছর ১৯৫৫ সালে জীবনানন্দের সবশেষ কর্মস্থল হাওড়া গার্লস কলেজ তাঁর স্মরণে যে স্মরণিকা প্রকাশ করে, সেখানে উমা চট্টোপাধ্যায় নামে এক ছাত্রী একদিন জীবনানন্দের সঙ্গেড় রাস্তায় যে স্মৃতি বর্ণনা করেছেন, সেখানেও তার এই নিজের ভেতরে থাকা বা অন্যমনস্কতা স্পষ্ট। উমা (হাওড়া গার্লস কলেজ পত্রিকা, পৃষ্ঠা ২১) বলেছেন, বাসের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন জীবনানন্দবাবু। তার দৃষ্টি স্থির, কী এক গভীর চিন্তায় মগ্ন। পশ্চিম দিগন্ত তখন রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। যেন কী একটা ভীষণ লজ্জার কথা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আমি এই অপূর্ব সন্ধিক্ষণে কী এক আশ্চর্য বস্তুর সন্ধান পেলাম এর মধ্যে, যা উপলব্ধি করা যায়, কিন্তু প্রকাশ করা যায় না। তার দৃষ্টি ভাবের আবেগে তন্দ্রাচ্ছন্ন। তিনি মন দিয়ে তা উপলব্ধি করছেন নিত্যকালের প্রতিদিনের বিশেষ সন্ধ্যা কী বলতে চাইছে সে কথা। এই সময়ে একটা বাস চেঁচাতে লাগল—হাওড়া হাওড়া। তিনি যেন হঠাৎ ঘুম ভেঙে তার মধ্যে উঠে বসলেন। মনে হলো, এই ছন্দপতনে তিনি যেন খুবই বিরক্ত হলেন।
কিন্তু তার পরও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না যে জীবনানন্দ স্বেচ্ছায় ট্রামের নিচে পড়েছেন। কারণ হাসপাতালের শেষ দিনগুলোর যে বর্ণনা তার সুহূদ ও স্বজনরা দিয়েছেন, সেখানে তার বেঁচে থাকার ব্যাকুলতাও তীব্র। স্ত্রী লাবণ্য দাশ (মানুষ জীবনানন্দ, পৃষ্ঠা ৩৬) জানাচ্ছেন, পৃথিবী থেকে চিরবিদায়ের আগে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে কবি যে অদ্ভুত মনোবল, অপরিসীম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়। জীবনানন্দের খুড়তুতো ভাই ডাক্তার অমল দাশও বিভিন্ন সময়ে লাবণ্যকে বলেছেন, বৌদি, দাদা যে কি সাংঘাতিক যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করছেন, সেটা মানুষের কল্পনাতীত।
ট্রামের বিষাক্ত স্পর্শ
বরিশালে জীবনানন্দের ঘনিষ্ঠ এবং তার পরোক্ষ ছাত্র অরবিন্দ গুহর (আমি চলে যাব, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ’, পৃষ্ঠা ১৪৭) আক্ষেপ: যে শহরে উনি বহুকাল ছিলেন, যে শহরকে উনি খুব ভালোবাসতেন—সেই বরিশালে থাকলে, আর যা-ই হোক ট্রাম ওঁকে স্পর্শ করতে পারত না। তবে জীবনানন্দ ট্রামকে স্পর্শ করেছে, নাকি তিনি ট্রামকে, সেই তর্ক বহুদিন হয়েছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, মৃত্যুর ১৬ বছর আগে তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন:
‘কলকাতার ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে—
ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে
কয়েকটি আদিম সর্পিণী সহোদরার মতো
এই যে ট্রামের লাইন ছড়িয়ে আছে
পায়ের তলে, সমস্ত শরীরের রক্তে এদের
বিষাক্ত স্পর্শ অনুভব করে হাঁটছি আমি।’
এখন প্রশ্ন হলো, ট্রামের বিষাক্ত স্পর্শ অনুভব করার কথা কি তিনি আগেভাগেই জেনে গিয়েছিলেন? তিনি কি সেই দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন যে ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় কলকাতার বালিগঞ্জ ডাউন ট্রাম ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসবে আর রাসবিহারী এভিনিউতে তিনি অন্যমনস্ক হয়ে সেই ট্রামের লাইনে উঠে পড়বেন!
‘একটি নক্ষত্র আসে’ কবিতায় লিখছেন:
‘শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ, কলকাতা এখন
জীবনের জগতের প্রকৃতির অন্তিম নিশীথ।’
অর্থাৎ ট্রামের সঙ্গেই যে তার অন্তিম পরিচয় হবে, সেটি সম্ভবত তিনি জেনে গিয়েছিলেন বহু আগেই।
জীবনানন্দ ঠিক যে জায়গাটিতে দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছিলেন, পরবর্তীকালে গবেষকরা সেটি চিহ্নিত করেন এবং তার ছবিও গ্রন্থভুক্ত হয়। বাংলাদেশেও ঐতিহ্য প্রকাশনী ছয় খণ্ডে জীবনানন্দের যে রচনাসমগ্র প্রকাশ করেছে, তারও ষষ্ঠ খণ্ডে সেই দুর্ঘটনাস্থলের একটি ছবি সংযুক্ত রয়েছে।
বনলতা হেরিটেজ ট্রাম
জীবনানন্দের মৃত্যুর কয়েক দশক পর কলকাতার রাস্তায় নেমেছিলেন বনলতা সেন; মানুষ নয়, ট্রাম হয়ে। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার রাসবিহারী এভিনিউতে যে ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর ২২ অক্টোবর মারা গিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে এক অগ্নিকাণ্ডে সেই ট্রামটি পুড়ে যায়। এর বহু বছর পর জীবনানন্দের প্রতি সম্মান জানিয়ে ‘বনলতা’ নামে একটি হেরিটেজ ট্রাম চালু করেছিল কলকাতা ট্রাম কর্তৃপক্ষ (সিটিসি)। সিটিসি মাঝেমধ্যেই বিশেষ কারো প্রতি সম্মান রেখে বা বিশেষ দিবস উপলক্ষে এ রকম হেরিটেজ ট্রাম চালু করে। কিন্তু সেগুলো বেশি দিন চলে না। এটা অনেকটা বিশেষ দিবসে স্মারক ডাকটিকিটের মতো। যতটুকু জানা যায়, বনলতা হেরিটেজ ট্রামও মাসখানেক চলার পর বসিয়ে দেয়া হয়। ওই সময় রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’ নামেও একটি হেরিটেজ ট্রাম চালু করা হয়। এর একটি পরবর্তীকালে ধর্মতলা সিটিসি ট্রাম ডিপোর পাশেই কফিশপের মতো ব্যবহার করা হয়। যে কেউ সেখানে যেতে পারে। অন্যটি মোডিফাই করে এসি ট্রাম করা হয়েছে।
কলকাতা শহরের মানুষ মনে করে, তাদের ব্যস্ততা বেড়েছে, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার তাড়াও আছে। কিন্তু তার পরও ট্রাম উঠে গেলে কলকাতার কৌলিন্য হারিয়ে যাবে। ঢং ঢং শব্দ করে ময়দানের বুক চিরে ফোর্ট উইলিয়ামকে সাক্ষী রেখে অসংখ্য খেলার মাঠ ও রেসকোর্সের পাস দিয়ে যখন ট্রাম যায়, তখন ট্রামের জন্য এই আর ১০টি শহরের সাথে কলকাতার পার্থক্য রচিত হয়। আবার দূষণমুক্ত যান হিসেবেও ট্রামের জুড়ি নেই।
ট্রাম যে ভবিষ্যতে জাদুঘরে চলে যাবে, তার লক্ষণ এখনই স্পষ্ট। হেরিটেজ ট্রাম ভাড়া নিয়ে যে কেউ বিয়ের আসরও বসাতে পারেন। অনেকেই বিয়ের মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে আসর বসান লঞ্চে, স্টিমারে, এমনকি বিমানেও। কিন্তু কলকাতায় বিয়ের জন্য কেউ হেরিটেজ ট্রাম ভাড়ায় চাইলে সেটিও পাওয়া যাবে। চলন্ত রেস্তোরাঁ হিসেবে ব্যবহারের জন্য ট্রাম ভাড়া দেয়ার বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রয়েছে। সিটিসির একজন কর্মকর্তা জানালেন, বর্তমানে দিনে গড়ে ৪৫-৪৬টির বেশি ট্রামকে রাস্তায় নামানো যাচ্ছে না। তাই সচল-সক্ষম থাকলেও বহু ট্রামকে দিনের পর দিন বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। সেসব ট্রাম কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা চলছিল কিছুদিন ধরেই। সেই ভাবনা থেকেই চলন্ত ট্রামের মধ্যে রেস্তোরাঁ চালুর জন্য ট্রাম ভাড়া দেয়া হবে। তখন হয়তো জীবনানন্দের ভাষায়ই মানুষে বলবে:
‘আবার এসেছি ফিরে—ধোঁয়ায় ধুলায় ভিড়ে
ফুটপাথে—ট্রামের জগতে
পথ থেকে পথে ফিরি
পথ থেকে ক্লান্ত পথে পথে।’






