পশুপাখি, গাছপালা, শিকার, কবিতা, মদ নিয়ে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আগ্রহ কম-বেশি সবারই জানা। আকবরের রেখে যাওয়া বিস্তৃত, শক্তিশালী সাম্রাজ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জাহাঙ্গীরকে যুদ্ধের ময়দানেও খুব একটা যেতে হয়নি। তাই নিজের শখ পূরণের অবারিত সুযোগ ছিল তার। একবার রাতে একটি হাতিকে শীতে কাঁপতে দেখে জাহাঙ্গীর সেটার জন্য গরম দুধের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীরের আরেকটি বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ ছিল, সেটা হলো জাদু, ভোজবাজি। একবার তিনি চলার পথে নিজের বহর থামিয়ে দিয়েছিলেন কর্ণাটকি এক বাজিকরের খেলা দেখতে। সেই বাজিকর তিন গজ লম্বা এক শিকল গিলে ফেলার কসরত দেখাচ্ছিল। জাদু দেখার এ নেশা জাহাঙ্গীরের দরবারের কাজেও প্রভাব ফেলেছিল। একবার বাংলার কিছু মানুষ গিয়েছিলেন তাদের গভর্নরের ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। শেষমেশ জাদুকরদের পোশাক পরে অভিযোগকারীরা সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। মোগল আমলে বাজিকরদের নানা বিস্ময়কর কাণ্ড দেখে অভিজাতরা বাকরুদ্ধ হয়ে যেতেন। যেমন জাহাঙ্গীরের আমলেই এক মোগল অভিজাত এক বাজিকরকে বললেন উপস্থিতভাবে একটি গাছ তৈরি করে দেখাতে। এটা ছিল সে আমলে ভারতীয় বাজিকরদের এক আলোচিত জাদু। সত্যিই সেই বাজিকর চোখের পলকে মাটিতে ফুল-ফলসহ একটি গাছ হাজির করেছিলেন।

ভারতবর্ষের জাদুকর শ্রেণীতে কারা কারা অন্তর্ভুক্ত? জাদুওয়ালা, তামাশাওয়ালা, জাদুকর, মাদারি, মায়াকারী, কালান্দার, সাপুড়ে, কাটপুতলিওয়ালা, বহুরূপী—সম্প্রদায় ও বর্ণভেদে তালিকাটা আরো লম্বা। প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ জাদুকরদের ১২টি ভাগ আছে এবং এরা পরস্পর ভ্রাতৃবন্ধনে আবদ্ধ। এদের মধ্যে আছে বাজিকর, সাপুড়ে, পশু দিয়ে খেলা দেখানো, পুতুল নাচিয়ে, ভেনট্রিলোকুইস্ট, গল্প বলিয়ে, নকলকারী, দড়াবাজিকর। এ ১২ দলের সদস্যরা ঘুরতে ঘুরতে একে অন্যের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে তিন পাথরের ওপর তৈরি করা চুলায় খাবার ভাগ করে নেন। আধুনিককালে এসে এসব গোত্রের সেই জৌলুস, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। কিন্তু এ সম্প্রদায়গুলোর ইন্দ্রজাল কয়েক সহস্রাব্দ ধরে ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

ভারতে এখনো এমন অনেক দল টিকে আছে। এখন শহুরে দলগুলো স্মার্টফোন ব্যবহার করে, তাদের শোর ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে। তবে তাদের কর্মপদ্ধতি এখনো বদলায়নি। তারা বংশপরম্পরায় জাদুর রহস্য শিখে আসছেন। ভ্রাম্যমাণ জাদুকরদের জন্য এখন পেট চালানোই দায়। তার পরও তারা আর কোনো জীবন বেছে নিতে পারেন না। কারণ এ পেশাই তাদের জীবন!&dquote;&dquote;

ঢাকা শহরে রাস্তার পাশে আশির দশকেও দেখা যেত বাক্সে ভরে মানুষের শরীরে তলোয়ার ঢুকিয়ে দেয়ার জাদু। এতে শুরুতে একজন মানুষকে, সাধারণত কোনো কিশোরকে একটি বেতের বাক্সে ঢুকানো হয় সবার চোখের সামনে। এরপর সেই বাক্স কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। জাদুকর শুরু করেন তার জাদুমন্ত্র। এবার কোনো রকম আগাম বার্তা না দিয়েই জাদুকর সেই বাক্সে তলোয়ার চালিয়ে দেন। শোনা যায় ভেতরের কিশোরের আর্তনাদ, বেরিয়ে আসে তাজা রক্ত! এরপর সব সুনসান গলায় তলোয়ার বেঁধা অবস্থায় বাক্স থেকে সেই কিশোর বেরিয়ে আসে। কিশোর এক হাতে তলোয়ারের বাট, আরেক হাতে ফলা ধরে আছে। তাকে দেখে মনে হবে তার গলায় তলোয়ার বিঁধে আছে। এরপর জাদুকর সবার কাছ থেকে সম্মানী গ্রহণ শুরু করেন। এ কাজ মিটে গেলে তিনি কিশোরকে আবার বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন। তারপর আবার কালো কাপড় দিয়ে সেটা ঢেকে দেয়া হতো। কিছুক্ষণ পর সেই তলোয়ারবিদ্ধ কিশোর সুস্থ দেহে বেরিয়ে আসতেন। এটি দুনিয়ার সবচেয়ে পুরনো ও রহসম্যয় জাদুর একটি।

জাদু তাহলে কী? উত্তরে কেউ বলেন, ‘অসম্ভব কাজের শৈল্পিক উপস্থাপনা’। তবে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে জাদুর সংজ্ঞা নির্ধারণ করাটা কঠিন। এডমন্ড লিচ নামের একজন নৃতত্ত্ববিদ কাজ করেছেন তাইওয়ান, মিয়ানমার, কুর্দিস্তান ও শ্রীলংকায়। নিজের কাজ শেষ করে ১৯৮২ সালে তার মন্তব্য ছিল এমন—‘একজন পেশাদার নৃতত্ত্ববিদ হিসেবে কর্মজীবন শেষ করার পর আমি যে উপসংহারে পৌঁছেছি, তা হলো &dquote;&dquote;ম্যাজিক শব্দটির কোনো অর্থ নেই।’ এর এক দশক আগে ওলন্দাজ সাংস্কৃতিক নৃতাত্ত্বিক ভ্যান বাল সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘ম্যাজিক একটা বিপজ্জনক শব্দ, ম্যাজিকের চেয়েও বিপজ্জনক। কারণ এটা এমনই এক হ্যান্ডসাম শব্দ, যেটা আমাদের অবোধ্য সবকিছুকেই ধারণ করতে পারে। এ টার্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন ধোঁয়াশাপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়া হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা কিছুই ব্যাখ্যা করে না।’ তবে খেয়াল করার বিষয় লিচ ও ভ্যান বাল দুজনই যে জাদুর কথা বোঝাচ্ছেন, তা হলো ধর্মীয় আচার, প্রকৃতি পূজা সম্পর্কিত, অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস। এ জাদু বিনোদনের জন্য দক্ষ একদল মানুষের দেখানো জাদু নয়, এখানে জাদুর দুটি উদ্দেশ্য ও রীতির পার্থক্য বোঝা গেল। কিন্তু ভারতে এ দুই ধরনের জাদুর পার্থক্যরেখাটি অস্পষ্ট। একজন হিন্দু কিংবা মুসলিম সন্ত চাইলে কোনো কিছুকে অদৃশ্য করে দিতে পারেন, নিজের শরীরে লোহার দণ্ড প্রবেশ করিয়ে আবার বের করতে পারেন কিংবা উত্তপ্ত কয়লার ওপর দিয়ে হেঁটে যাতে পারেন। এসব করে তারা তাদের ভক্তদের নিজের আধ্যাত্মিক শক্তির জানান দিতেন। একই সঙ্গে এসব আজুবা দেখিয়ে তারা ভক্তদের কাছে থেকে আর্থিক সহায়তাও পেতেন। পরে দেখা গেল ভ্রাম্যমাণ জাদুকররা এসব কাণ্ড অনুকরণে বিনোদন দেয়া শুরু করলেন। তারা দেখালেন মাটির তলায় কবরস্থ হওয়া, পেরেক গাঁথা বিছানায় শোয়া। এখানেও প্রদর্শনীর বিনিময়ে জাদুকররা দর্শকদের কাছ থেকে বকশিশ পেতেন। ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত জাদুকর পিসি সরকার ১৯৬০-এর দশকে মঞ্চে তার আড়াই ঘণ্টার শো শুরু করতেন মণ্ডলা আঁকা ও দেবী দুর্গার প্রতিকৃতির সামনে দীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে। পিসি সরকার মঞ্চে আসতেন আগের দিনের রাজাদের মতো পোশাক পরে, তার অনুষ্ঠান ছিল বলিউডের সিনেমার চেয়েও জাঁকালো কিন্তু একবারে খাঁটি ভারতীয়।

ম্যাজিক বা জাদু অর্থে সংস্কৃত শব্দটি হলো ইন্দ্রজাল, মানে দেবতা ইন্দ্রের জাল। ইন্দ্রজাল শব্দটি আরো অনেক অর্থে ব্যবহূত হয় যেমন হাতের &dquote;&dquote;ভোজবাজি, দড়াবাজি, ইল্যুশন বা মায়া, ফাঁদ, কোনো জিনিসের আবির্ভাব বা গায়েব হয়ে যাওয়া, এমনকি যুদ্ধে শত্রুকে ধোঁকা দেয়ার কাজে বিভিন্ন জাদু।

আরবিতে সিহর মানে জাদু বা মায়া। ব্যবহূত অর্থে সিহর মানে আত্মা এবং দানবদের সহায়তায় দড়াবাজি, জ্যোতিষবিদ্যা এবং নানা বিস্ময়কর কর্মকাণ্ড। বিভিন্ন ওষুধ, সুগন্ধি ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার বিদ্যাও ছিল সিহরের অন্তর্ভুক্ত।

পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা যেমন জেমস ফ্রেজার যেভাবে জাদু, ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করতে চান, তেমনটা থেকে বেরিয়ে আসতে চান জন জুবরজিকি। ভারতের জাদু সংস্কৃতি নিয়ে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রয়েছে, যার নাম জাদুওয়ালাজ, জাগলারস অ্যান্ড জিনস: আ ম্যাজিক্যাল হিস্টরি অব ইন্ডিয়া। তিনি মনে করেন, জাদুওয়ালাদের শিল্পকে বিভিন্ন বিনোদন ও ধর্মীয় আচারের মূল ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।  যেমন রাস্তার পাশে যেসব দল জাদু দেখায়, তাদের দলে নারী, পুরুষ, শিশু সবাই থাকে; অনেকে একাধিক চরিত্রে কাজ করে। পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তারা শুরুতে বাজনা বাজায়। কিছুটা ভিড় জমার পর তারা নানা ধরনের শারীরিক কসরত দেখানো শুরু করে দর্শকদের আগ্রহ জাগাতে। কিছু পাপেট শো হয়, অনেক সময় ক্লাউনরা হাস্যরসের সৃষ্টি করে। এরপর শুরু হয় মূল আয়োজন। দর্শকরা হিন্দু হলে ইন্দ্রকে স্মরণ করা হয়, আর মুসলিম হলে একই জাদুকর বিড়বিড় করে কোরআনের আয়াত উচ্চারণ করেন। এরপর সব প্রদর্শনী শেষ হলে দলের নারী সদস্যরা সদ্য বিবাহিত নারীদের পুত্র হওয়া নিশ্চিত করতে জড়িবুটি দিতেন।&dquote;&dquote;

এ রকম একটি আয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে কোন জাদুর অর্থ কী, সেটা নির্ণয় করতে গেলে অর্থহীনতায় পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। জাদু ও ধর্মের মধ্যে আরো কিছু অস্পষ্ট সীমানা আছে। দড়ির ওপর হাঁটার মতো কাজগুলোকে শারীরিক কসরতের কাতারে ফেলা যায়। এর উল্টোদিকে মানুষকে বশীকরণ করা, ধাঁধার মধ্যে ফেলাটাকে বলা যায় ব্ল্যাক ম্যাজিক বা ডাকিনীবিদ্যা।

জন জুবরজিকি মনে করেন, ভারতের সবখানেই ইন্দ্রের জালের মতোই জাদু ছড়িয়ে আছে— অথর্ব বেদের শ্লোকে, নানা পুরাণে, কিংবদন্তিতে। দিল্লি, মুম্বাই, লন্ডন, ক্যামব্রিজসহ আরো অনেক জায়গার লাইব্রেরি কিংবা আর্কাইভে ভারতীয় ম্যাজিকের অনেক বিস্ময়কর ঘটনার বিবরণী যেমন পাওয়া যায়, তেমনি আছে এর অন্ধকার, নিষ্ঠুর এক অধ্যায়ও। অনেক সময় অযোগ্য বা দুর্নীতিবাজ উদ্যোক্তারা ভারত থেকে শত শত বাজিকর, নৃত্যশিল্পী, সংগীতশিল্পীকে লন্ডন, ব্রাসেলস, বার্লিনের মতো শহরে নিয়ে &dquote;&dquote;যেত এবং এক সময় তাদের সব দায়দায়িত্ব অস্বীকার করে রাস্তায় ছেড়ে দিত। ইন্ডিয়া অফিস তখন এদের দেশে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হতো। এ রকম একজন ছিলেন অমর নাথ দত্ত, তাকে ধোঁকা দিয়ে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাকে কুইনসের রাস্তায় ছেড়ে দেয়ার পর তিনি প্যারিসের এক বিপ্লবী দলে যোগ দেন, যারা ব্রিটিশ শাসন উত্খাতের লক্ষ্যে গড়ে উঠেছিল। অমরকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অমর শেষমেশ লিঙ্গ সিং নাম নিয়ে বোমা তৈরির কৌশল ব্যবহার করে পশ্চিমা দেশের মঞ্চে জাদু দেখাতেন।  ১৯৩০-এর দশকে খোদা বক্স নামে এক কাশ্মীরি ইংল্যান্ডের মঞ্চে আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে ও চোখ বাঁধা অবস্থাতেও দৃষ্টিমানদের মতো সব কিছু বলে দিয়ে শোরগোল তুলেছিলেন। তার খ্যাতি পরবর্তী ভারতীয় জাদুকর গোগিয়া পাশা ও পিসি সরকারের পশ্চিম যাত্রা সহজ করেছিল।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় জাদুর দলগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মেলা, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে ডাক পেতে শুরু করে। ১৮১০-এর দশকের শেষভাগে দক্ষিণ ভারতের রাম স্বামী আমেরিকা, ইউরোপ, ইংল্যান্ডে পারফর্ম করা শুরু করেন এবং তার সময়ে দুনিয়ার অন্যতম বিখ্যাত জাদুকর হয়ে ওঠেন। আর অনেক দলও ধীরে ধীরে পশ্চিমে নিজেদের জায়গা করে নিতে থাকে। এদের মধ্যে ওরিয়েন্টাল ট্রুপ ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন শহরের লাখ লাখ মানুষ ভারতীয় জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিল। উনিশ &dquote;&dquote;শতকের শেষ নাগাদ মাদ্রাজ, দিল্লি, লখ্নৌ, লাহোর শহরের জাদুকররা দুনিয়ার বৃহত্তম সাম্রাজ্যের অন্যতম পরিচিতিতে পরিণত হয়েছিলেন। শূন্যে দড়ি ছুড়ে দেয়া এবং সেটা শূন্যেই ঝুলে থাকা, তারপর সেই দড়ি ধরে মানুষ কিংবা কোনো প্রাণীর বেয়ে ওঠা চক্ষু চড়কগাছ করেছিল পশ্চিমা দর্শকদের। ফকিররা জীবন্ত অবস্থায় কবরস্থ হয়েও কয়েক মাস পর আবার জীবিত হয়ে উঠতেন। কিংবা মাটিতে নিমিষে ফলসহ আম গাছ তৈরি করা। এসব জাদুর খবরে পশ্চিমা সংবাদপত্র, জার্নালের পাতা ভরে যেত। ১৮৯৯ সালের ডিসেম্বরে লন্ডনের স্ট্রান্ড ম্যাগাজিন ঘোষণা করে, ‘যেকোনো সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করুন ভারত কেন বিখ্যাত? প্রতি ১০ জনে অন্তত একজন তাজমহলের গৌরব, ব্রিটিশদের প্রভুত্ব, এমনকি কিপলিং সাহেবকেও পাত্তা দেবে না; সেই একজনের উত্তর হবে ভারতীয় বাজিকর।’

ভারতীয় জাদুর এ বিস্ময়কে অতীত থেকে একবার খুঁজে দেখা যাক। কিন্তু এ কাজ করতে গেলে অবশ্যই ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য, এর সমাজ-সংস্কৃতির সামনে একটা আয়না ধরতে হবে। বৈদিক যুগে জাদুর চর্চা ছিল। সুফি ও যোগীরা কার অলৌকিক কাণ্ড বেশি শক্তিশালী, সে প্রতিযোগিতায় নামতেন। বৌদ্ধ ও জৈন পণ্ডিতরা দার্শনিক তর্কে জিততে জাদুর সাহায্য নিতেন, মন্ত্র আওড়াতেন। ভারতীয় ভবিষ্যদ্বক্তাদের দারুণ চাহিদা ছিল প্রাচীন রোমে। চীনের ট্যাং সাম্রাজ্যের সম্রাটরা ভারতীয় &dquote;&dquote;অ্যালকেমিস্টদের নিয়োগ করতেন আয়ু ও যৌনশক্তি বৃদ্ধির গোপন সূত্র সন্ধান করতে। জাদুকরদের কৌশলকে নিজের মায়া দর্শন ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করেছিলেন ষষ্ঠ শতকের দার্শনিক, সন্ত শংকর। আব্বাসীয় খলিফার আমলে বাগদাদের বই বিক্রেতারা ভারতীয় জাদুবিদ্যার নানা কলাকৌশলের আরবি অনুবাদের বই বিক্রি করতেন।

ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা জাদুর মাধ্যমে মন্দিরের মেঝেকে উঁচু-নিচু করে সাগরের ঢেউয়ের মতো ঢেউ দেখাতেন। মাগরেব থেকে আসা এক পর্যটকের সামনে এক ভারতীয় জাদুকর ঘনক আকৃতি ধারণ করেন। এ কাণ্ড দেখে সেই পর্যটক বেচারা মূর্ছা গিয়েছিলেন। মালাবার উপকূলে জাদুকররা মুক্তোশিকারি ডুবুরিদের মন্ত্র পড়ে মানুষখেকো কুমিরের হাত থেকে বাঁচাতেন।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে হেরোডটাস থেকে শুরু করে ইতিহাসবিদ, ভূগোলবিদ, বণিক, মিশনারি, অভিযাত্রী, তীর্থযাত্রীরা ভারতকে অদ্ভুত প্রাণী, সাধু-&dquote;&dquote;সন্ত, গণত্কার, সাপুড়ে, এবং জাদুকরদের ভূমি বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের গ্রন্থাগারগুলোয় ট্যাং রাজত্ব, আব্বাসীয় খিলাফত এবং মধ্যযুগ ও রেনেসাঁ আমলের যেসব বড় গ্রন্থ পাওয়া যায়, সেখানে বৈদিক মন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। আরো জানা যায়, যোগীদের নানা রহস্যময় কাজের কথা। ১৮ শতক নাগাদ এসব বইয়ের অনেকগুলো ফরাসি, ইতালীয় জার্মান ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে। এসব বই পশ্চিমাদের কল্পনাকে আরো উসকে দেয়। তারা প্রাচীনকাল থেকে শুনে আসা ভারতের সঙ্গে জাদুর সম্পর্কের যেন প্রমাণ হাতে পেতে থাকেন। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দে গ্রিক চিকিৎসক টেসিয়াস জানিয়েছিলেন, ভারতের অবস্থান মানুষের জানা দুনিয়ার একেবারে পূর্ব প্রান্তে, তিনি ভারতে এমন এক জাতের মানুষের অস্তিত্বের কথা লিখেছেন, যাদের মুখ কুকুরের মতো এবং যারা কথা না বলে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ চিত্কার করে। আবার আছে এমন প্রাণী, যার চেহারা মানুষের, দেহ সিংহের এবং বৃশ্চিকের লেজ।

আলেকজান্ডারের আক্রমণের সময় থেকেই এ অঞ্চলে গ্রিকদের আগমন শুরু। অ্যাপোলোনিয়াস তক্ষশীলা ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি ভারতে নানা অদ্ভুত জীব এবং কাণ্ডকারখানার বিবরণ দিয়েছেন। ‘পুরো ভারতে বিরাটাকার ড্রাগন দেখা যায়, পর্বতে আরও।’ অ্যাপোলোনিয়াস ভারতে হেলেনীয় সংস্কৃতির অনেক নিদর্শন খুঁজে পেয়েছিলেন। তার সম্মানে তক্ষশীলার রাজা যে ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন, সেখানে দড়াবাজিকরদের &dquote;&dquote;বিভিন্ন কসরত প্রদর্শিত হয়েছিল। তক্ষশীলা থেকে তারা গিয়েছিলেন ব্রাহ্মণদের এলাকায়। অ্যাপোলোনিয়াসের বর্ণনা মতে, ব্রাহ্মণদের সেই আস্তানা এক খাড়া সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর, যেখানে মেঘ ভেসে বেড়ায়। তার কথায়, ‘ব্রাহ্মণরা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন। আমি দেখেছি ভারতের ব্রাহ্মণরা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থেকেও সেখানে নেই। কোনো সুরক্ষা ছাড়াই তারা সুরক্ষিত। তাদের কাছে কিছু নেই কিন্তু তারাই দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী।’

ইবনে বতুতার বিবরণী থেকে জানা যায়, ভারতের হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই জাদু, জ্যোতিষবিদ্যা, ডাকিনীবদ্যা, অলৌকিক কর্মকাণ্ড এবং যোগীদের বিভিন্ন জাদুতে বিশ্বাস করত। ভারতীয় সাধুরা বতুতার কাছে এক পরম বিস্ময়ের বিষয় ছিলেন। তিনিই ভারতে জীবন্ত কবরস্থ হয়ে বেঁচে থাকার কাণ্ডটি উল্লেখ করেছেন।

নিকোলাও মানুচ্চি সম্রাট শাহজাহানের আমলেই ভারতে এসে মোগল দরবারে চাকরি পেয়েছিলেন। তার বিবরণী আওরঙ্গজেব ও দারা শুকোর সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিবরণী। তারা এ বিবরণীতে নানা ধরনের জাদু, ডাকিনীবিদ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। মানুচ্চি ছাড়াও সেসময় মোগল দরবারে ছিলেন ফাসোয়াঁ বার্নিয়ার, তিনি ছিলেন চিকিৎসক। তার ভারত বিবরণী থেকেই কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ওই নির্দিষ্ট কালপর্বের ভারত সম্পর্কে ধারণা নিয়েছিলেন। বার্নিয়ারের বিবরণীকে যথেষ্ট প্রামাণ্য বিবেচনা করা হয়। তিনি লিখেছেন ভারতের ফকিররা স্বর্ণ তৈরি করতে পারেন। বার্নিয়ারের বিবরণী প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে।&dquote;&dquote;

আব্বাসীয় আমলের বাগদাদ: সন্ধ্যা হয়ে এলে তখন বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা ছিল না। তাই সাধারণ মানুষ তখন পড়ার মতো আলো পেত না। ধনীরা হয়তো নানা ধরনের বাতি জ্বালাতে পারত। এ রকম সময়, সন্ধ্যার পর রাওয়ি বা পেশাদার গল্প বলিয়েরা সাধারণ মানুষকে আনন্দ দিত গল্প শুনিয়ে। সেই গল্পে থাকত আরবের অভিযাত্রা, সাগরের দানো, জিনদের প্রেমিকা এবং ভারতের জাদুবিদ্যা। খলিফা হারুন আল-রশিদ এবং তার পুত্র মামুনের হাত ধরে বাগদাদ তখন জ্ঞানের রাজ্যের অগ্রপথিক।

এ যুগে ৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে শিয়া পণ্ডিত আল নাদিম প্রকাশ করলেন ফিহরিস্ত আল-উলুম বা বিজ্ঞানের ক্যাটালগ। বইটির দশম অধ্যায়ে পাওয়া যায় ফারসি, গ্রিক ও সংস্কৃত ভাষার যেসব গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদ করা হয়েছিল, সেগুলোর তালিকা। আল নাদিমের বইয়ে একটি অংশ আছে ভারতীয় জাদুবিদ্যা নিয়ে। মায়াবিদ্যা ভারতের একটি বিশেষত্ব। এ বিষয়ে তাদের লিখিত গ্রন্থও আছে। সেগুলোর কয়েকটি আরবি ভাষায় অনূদিতও হয়েছে। আল নাদিম লিখেছেন, ভারতীয় জাদুকররা গ্রহ-নক্ষত্রের হিসাব করে মন্ত্রঃপূত কবচ ব্যবহার করে নানা ধরনের আশ্চর্য কাণ্ড দেখান। তারা কোনো সেনাদলকে বিপথে চালাতে পারে, শত্রুকে হত্যা, পানির ওপর দিয়ে হাঁটা এবং কয়েক নিমেষে বহু পথ পাড়ি দিতে পারে। নাদিম বাব্বাহ নামে একজন ভারতীয়র নাম উল্লেখ করেছেন, জাদুমন্ত্র ও মায়বিদ্যা নিয়ে যার লেখা বই পুরো আরব দুনিয়ায় পরিচিত ছিল। আরবে ভারতীয় জাদুবিদ্যার বইয়ের অনুবাদ ও ব্যবহারের আরো নিদর্শন আছে। এবং আরব ও পারস্য থেকে এসব বই রোমেও হাজির হয়েছিল।&dquote;&dquote;

আরবের গল্প বলার রীতি মুসলিম শাসনের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছিল। এ প্রভাব বিশেষভাবে দেখা যায় পাঞ্জাব অঞ্চলে। এখানে আছে জিনের নানা কিংবদন্তি। ভারতীয় সংস্কৃতিতে জিন মানে দৈত্যাকার এক শক্তি, যে কখনো অতি সুদর্শন আবার কখনো কদাকার চেহারায় হাজির হয়। সে অদৃশ্য হতে পারে এবং নিজের ইচ্ছামতো দুনিয়ার যেকোনো স্থানে হাজির হতে পারে। এ জিন ভারতের দানোদের মতো ঝড় সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। খারাপ জিন রাতের বেলা ঘুরে বেড়ায়। যে বাড়িতে হানা দেয়, তাদের জন্য দুর্ভাগ্য, মৃত্যু, রোগশোক বয়ে আনে। জমি চাষ করা, কুয়া খননে জিনরা বিরক্ত হয়, তখন তারা সাদা সাপের রূপ নিয়ে উড়ে যায়। পাঞ্জাব অঞ্চলের কৃষকরা তাই জিনদের বেশ ভয় পায়। সিন্ধ অঞ্চলে হিন্দুদের রাক্ষস আর মুসলিমদের জিন মিলেমিশে যায়।

জিনদের অলৌকিক ক্ষমতার বিষয়টি ইসলামী সংস্কৃতিতে সবখানেই দেখা যায়। তবে জিনের গঠন নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের ধারণায় ফারাক আছে। আরবের সংস্কৃতিতে মনে করা হয় জিনের উদ্ভব হয় ধোঁয়া বা আগুন থেকে এবং তারা বাতাসের মতো। মিসরে প্রচলিত জিনদের চোখ আগুনের মতো এবং তারা আগুনে পরিণত হয়ে মিলিয়ে যায়।&dquote;&dquote;

জিনদের সঙ্গে আলাপ করে ভবিষ্যৎ জানা যায়, এ বিশ্বাস মুসলিম দুনিয়ায় প্রচলিত আছে। ভারতের অওধের কিছু অংশ ও রোহিলখাণ্ডে প্রচলিত আছে যুদ্ধে নিহত সেনাদের কবরস্থান থেকে জিনদের সেনাবাহিনী হাজির হয়ে যেতে পারে। ভারতের উত্তর প্রদেশের বিজনোরের লোককথায় আছে এক ফকির একবার এক শহরে গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের বললেন, শহরটি জিনদের দ্বারা আক্রান্ত, এখানে মানুষের বসবাস ঠিক নয়। এরপর তিনি জাদু করে জিনদের পরাভূত করেন। তারপর তিনি বলেন এবার সবাই শহরে বাস করতে পারে। কিন্তু অধিবাসীরা জানালেন সেই ফকির না থাকলে তারা আর শহরে থাকবেন না। এরপর আমৃত্যু সেই ফকির সেখানেই বাস করেছিলেন।

১৭৯৭ সাল, মাদ্রাজের এক সন্ধ্যা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক কর্মকর্তা বাজিকরদের নানা ধরনের কসরত দেখে বিস্মিত। তিনি বাজিকর দলের নেতাকে ইউরোপে শো করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু সেই বাজিকর রাজি হননি। তার বিশ্বাস মতে কোনো হিন্দু কালা পানি বা কৃষ্ণ সাগর পেরোলে আত্মা দূষিত হয়ে যাবে। সেই ইংরেজের মনে হয়েছিল আরব্য রজনীর সব অবিশ্বাস্য কর্মই এই বাজিকররা করে দেখাতে পারবে। সেকালে পুরো ভারতেই বাজিকররা ছিল কিন্তু করোমানডেল উপকূলের বাজিকররাই নাকি সবচেয়ে বেশি  বিস্ময়ের জন্ম দিত। সেসময় একজন ইংরেজ পর্যটক উল্লেখ করেছেন মাদ্রাজের এ বাজিকরদের শরীর এমন যে তাদের মানুষ না বলে সরীসৃপ বলাই ভালো। রোপ ড্যান্সিংয়ে দুনিয়ার তাদের সমকক্ষ কেউ নেই বলে মত দেন তিনি। তার মতে, এদের ক্ষমতা মনুষ্য প্রকৃতিকে ছাড়িয়ে যায়। আর দক্ষিণ ভারতের মিশনারিরা মনে করতেন এবং তারা &dquote;&dquote;প্রমাণ দিতেও প্রস্তুত ছিলেন যে এ বাজিকরদের খোদ শয়তানের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। ২৬ ইঞ্চি তলোয়ার গিলে ফেলাটাই ইউরোপীয়দের সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল। কিন্তু ইউরোপের মাটিতে থাকা মানুষরাও ভারতীয়দের এসব কারসাজি দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। ১৮১২ সাল থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা দেখে ভারতীয় বাজিকরদের ইংল্যান্ডে নেয়ার জন্য সক্রিয় উদ্যোগ নিতে থাকে। অবশেষে কালা পানির ট্যাবু ভেঙে কয়েকটি দল ইউরোপ যেতে আগ্রহী হয়। ১৮১৩ সালের জুলাইয়ে ইংল্যান্ডের রাস্তায় বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যাতে লেখা ছিল ‘আসছে ভারতীয় বাজিকররা, যারা তলোয়ার গিলে ফেলতে পারে’।

ইংল্যান্ডে ভারতীয় বাজিকররা ইতিবাচক সাড়া পেয়েছিল। ফলে বেশি বেশি অনুষ্ঠানের চাহিদা তৈরি হয়। ১৮১৮ সালে চারজন বাঙালি বাজিকর ও একটি হাতি নিয়ে জাহাজ বন্দরে ভিড়ে।

১৯৩৫ সালে ওরিয়েন্ট লাইনার ওরোন্টেজে করে ইংল্যান্ডে পৌঁছান কাশ্মীরের তরুণ খোদা বক্স। ১৩ বছর বয়সে সে ঘর ছেড়ে মিয়ানমার, শ্রীলংকা ও ভারতের বিভিন্ন স্থান ঘুরে জাদু শিখেছিলেন এবং অধ্যাপক কেবি ডিউক নাম ধারণ করেন। ১৯৩০-এর দশকে তিনি মুম্বাইয়ের থিয়েটার ও নাইট ক্লাবে চোখ বাঁধা শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওরোন্টেজ জাহাজে খোদা বক্স ছাড়া ছিলেন রেজিনাল্ড টিগু-জোনস। তিনি ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে ছদ্মনামে সফর করছিলেন, কারণ তাকে সোভিয়েত হিট স্কোয়াড মেরে ফেলার জন্য&dquote;&dquote; খুঁজছিল। তার বিরুদ্ধে বলশেভিক কর্মীদের হত্যার অভিযোগ ছিল। স্ট্যালিন তাকে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চর’ আখ্যা দিয়েছিলেন। রেজিনাল্ড ১৯১৭ সাল থেকে দিল্লি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে কাজ করছিলেন। যাহোক, তিনি ভারতীয় জাদু নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। একদিন জাহাজে খোদা বক্স ও টিগু পাশাপাশি বসে ছিলেন। টিগু বই পড়ছিলেন। হঠাৎ খোদা বক্স চোখ ঢেকে টিগুকে বইটি দিতে বললেন। তারপর তিনি যেকোনো পাতা উল্টে চোখ বাঁধা অবস্থাতেই সেখানে যা লেখা আছে, তা পড়ে শোনাতে শুরু করলেন। খোদা বক্স চোখ বাধা অবস্থাতেও খোলা চোখের মতোই সব দেখতে পেতেন। বিস্মিত টিগুকে খোদা বক্স জানান ছোটবেলা থেকে মোমবাতির শিখার নীল অংশের দিকে চোখের পলক না পেলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে করে তার এই ক্ষমতা জন্মেছে।

লন্ডনে পৌঁছে খোদা বক্স ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য এক্স-রে আইজ’ নামে শো শুরু করেন। খোদা বাক্স তার ইচ্ছামতো দম আটকে রাখতে পারতেন। আরো পারতেন আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে, বিষ খেয়েও সুস্থ থাকতে পারতেন। ১৯৩৫ সালে কাউন্সিল ফর ফিজিক্যাল ইনভেস্টিগেশন তার চোখের ‘বিদ্যা’র পরীক্ষা নেয় এবং যথারীতি বক্স চোখ বাঁধা অবস্থাতেই বই পড়ে সবার চোখ ছানাবড়া করে দেন।

বাঙালি জাদুকরদের মধ্যে দুনিয়া কাঁপিয়েছেন পিসি সরকার। তার নাম কমবেশি সবারই জানা। তিনি নিজেকে ‘দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাদুকর’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।&dquote;&dquote;

পিসি সরকার বা প্রতুল চন্দ্র সরকারের জন্ম ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার আশেকপুর গ্রামে। স্কুলে থাকতেই গণিতে তার পারদর্শিতা সবাইকে চমকে দিয়েছিল। অনেকে বলতেন তিনি দানব। কিন্তু তিনি ছিলেন জাদুকর। বালক বয়সেই জাদু শিখতে গণপতি চক্রবর্তীর শিষ্য হন। ১৯৩৩ সালে সরকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক হন। এরপর নানা জায়গায় জাদু দেখাতে শুরু করেন। তখনই তিনি নিজেকে ভারতের শ্রেষ্ঠ জাদুকর দাবি করতে শুরু করেন, কিছুদিন পর ‘দুনিয়া সেরা’। এরপর ভারতের নানা প্রান্ত থেকে তার ডাক আসতে শুরু করে, কিছুদিন পর বিভিন্ন দেশ থেকে। তার আত্ম অহংকার নিয়ে সামলোচনা থাকলেও তিনি পশ্চিমা দুনিয়ায় পূর্ব দেশের মানুষের জাদু ঐতিহ্যের সবচেয়ে আলোচিত নাম। তার জীবন জটিল, ঠিক জাদুর মতোই।