অনুবাদ: শওকত হোসেন
[আমেরিকান পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ফ্রান্সিস ফোর্ড কোপোলার জন্ম ১৯৩৯ সালের ৭ এপ্রিল। তাকে চলচ্চিত্র নির্মাণে নিউ হলিউড ওয়েভের মূল কারিগর হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৭২ সালে দ্য গডফাদার ছবিটির মাধ্যমে কোপোলা গ্যাংস্টার সিনেমার জনরায় বিপ্লব সৃষ্টি করেন। এ ছবির জন্য তিনি সেরা পরিচালকের অস্কার জয় করেন। এছাড়া ছবিটি আরো দুটি বিভাগে অস্কার পেয়েছিল। ১৯৭৪ সালে তিনি দ্য গডফাদার পার্ট টু তৈরি করেন। ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো সিক্যুয়াল ছবি, যা সেরা ছবির অস্কার জেতে। কোপোলা আবারো সেরা পরিচালকের অস্কার পকেটে পোরেন। কোপোলা বিভিন্ন সংস্থার স্বীকৃতিতে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পরিচালকদের একজন হিসেবে বিবেচিত। কোপোলা পরিচালিত আরো কিছু ছবির মধ্যে আছে আমেরিকান গ্রাফিতি (১৯৭৩), দ্য কনভারসেশন (১৯৭৪), অ্যাপোক্যালিপস নাউ (১৯৭৯), দ্য কটন ক্লাব (১৯৮৪) প্রভৃতি।]
একই প্রজন্মের মানুষ কোপোলা ও ইন্ডিয়ান-আমেরিকান তালিসে। দুজনই বেড়ে উঠেছেন পুবে। দুজনের অবস্থানই যার যার পেশার সর্বোচ্চ শিখরে এবং দুজনের ফারাকটাও চোখে পড়ার মতো। একজন হূষ্টপুষ্ট, অন্যজন ছিপছিপে গড়নের। সাক্ষাত্কারের জন্য একজন বসেছেন বুক খোলা শার্ট আর কোঁচকানো প্যান্ট পরে, অন্যজন পাট-ভাঙা শার্ট গায়ে; একটি বারের জন্যও টাই বা জ্যাকেট এধার-ওধার করেননি তিনি। একজন উচ্ছল, বিতর্কে আগ্রাসী; অন্যজন প্রশান্ত, স্থির, নীরব কুশলী। এপ্রিলের এক সাপ্তাহিক অবকাশে ওদের এই সাক্ষাৎ ঘটে। শনিবারের পর্বটি জোট্রোপ স্টুডিয়োর সারিতে কোপোলার বাংলোয় এবং রোববারের অংশটুকু পরিচালকের কাছের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়; দ্বিতীয় দিন কোপোলার স্ত্রী ইলেনিয়র উপস্থিত ছিলেন। কথোপকথনের পুরো সময় সিগার টেনেছেন কোপোলা, মাঝে মধ্যে সিগারেটও টেনেছেন, চুমুক দিয়েছেন সোডায়। কিন্তু কিছুই মুখে দেননি তালিস। একমাত্র সেন্সরশিপ-সংক্রান্ত উসকানিমূলক আলাপটুকু বাদে আলোচনাটি বিরামহীন সৌজন্যের ভেতর অনুষ্ঠিত হয়। —লি এইসেনবার্গ
তালিসে: আপনার ছবিগুলোয় আপনি ক্রমাগত একই লোকজনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। ডুভ্যাল, ব্র্যান্ডো...
কোপোলা: যেকোনো ভদ্র পরিচালকই তাদের রাখতে চেষ্টা করেন যারা...
তালিসে: যেমন বার্গম্যান ও ফেলিনি।
কোপোলা: কিন্তু আধুনিক কালে কেউই বছরে আট বা দশটি ছবি নির্মাণকারী কোনো প্রতিষ্ঠান মারফত এ চেষ্টা করেননি।
তালিসে: ফেলিনি যেমন তার অনুভূত আবেগ প্রকাশের লক্ষ্যে মাস্ত্রোয়ানিকে ব্যবহার করেন, আপনার এমন কোনো অভিনেতা আছেন, যিনি কিনা আদতে কোপোলা?
কোপোলা: এ পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে আমার ছবির কোনো চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করিনি। তবে আমার পরিকল্পিত এক ভবিষ্যৎ প্রকল্পে এমনই একটা চরিত্র আছে; তাতে কে অভিনয় করবেন, সেটা নিয়েই ভাবছি।
তালিসে: কে?
কোপোলা: ডাস্টিন হফম্যানের কথা ভেবেছি। তিনি দেখতে-শুনতে আদৌ আমার মতো নন, কিন্তু তিনি এমন কেউ, যাকে আমি যা করি তা-ই অনুসরণকারী ওই চরিত্রে দেখতে পাচ্ছি।
তালিসে: ফ্রান্সিস, আপনি তো অগুনতি মানুষকে পেশাগত দিক থেকে সফল হতে সাহায্য করেছেন, আপনার ওয়ান ফ্রম দ্য হার্ট ছবিটি যখন আর্থিক সংকটে পড়ে, তখন কি তাদের কারো কারো সহায়তা জোগাতে এগিয়ে আসার ব্যর্থতায় হতাশ হয়েছেন—যদি আদৌ সাহায্যের প্রয়োজন থেকে থাকে, যেমনটা পড়েছি?
কোপোলা: না। জানতাম, অনেকের কাছ থেকেই সাহায্য আশা করতে পারি না।
তালিসে: কেন নয়?
কোপোলা: তার কারণ আমার ধারণা, বেশির ভাগ মানুষই টাকাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভাবে। আপনি একে আঁকড়ে থাকেন, চান না বরবাদ হয়ে যাক। টাকার ব্যাপারে আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো এটা স্রেফ কাজে লাগানোর মতো কিছু। কিন্তু অন্য অনেকেই টাকা ধার দেয়ার বেলায় সিরিয়াসভাবে চিন্তা করে। এটা স্রেফ ওদের সীমাবদ্ধতা।
তালিসে: এটা কি আগেই জানতেন, নাকি গত কয়েক মাসে জানতে পেরেছেন?
কোপোলা: আমার সক্রিয় পেশার গত ২০ বছরেই শিখেছি এটা। মানুষ টাকার কারণে বাধাগ্রস্তই হয়, এটা ওদের স্বাধীনতা দেয় না। সামনে বেড়ে নতুন কিছু করার প্রয়াস পেতে উৎসাহিত করে না; বরং আরো বেশি রক্ষণশীল করে দেয়। ছোট থাকতে আমার নিজ পরিবারের কথাই মনে আছে, বুঝতেই পারছেন, অমুক চাচার ৫০ ডলার দরকার হয়ে পড়লেও তমুক চাচি কিছুতেই সেটা দেয়া সম্ভব মনে করেননি। পরিণামে আমি বুঝতে পেরেছি, খুব অল্পজনই আমাকে ‘আরে, তোমার নামের খাতিরেই তোমাকে আধ মিলিয়ন ডলার ধার দিচ্ছি’ বলতে যাবে। সম্ভবত এটাই ওদের সবচেয়ে নিরাপদ ঋণ হতে পারত; আসলে একজন কিন্তু শুধু আমার নামের ভরসায়ই আমাকে আধ মিলিয়ন ডলার ধার দিয়েছিলেন। তবে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম।
তালিসে: সেই মানুষটি কি আপনার বন্ধু জর্জ লুকাস, যাকে চলচ্চিত্র ব্যবসায় যোগ দিতে সাহায্য করেছিলেন?
কোপোলা: না। জর্জ লুকাসের কাছে কখনো কিছু চাইনি আমি।
তালিসে: কেন?
কোপোলা: কী জানেন, এটা ওর স্বভাবই না। সত্যি। তরুণ বয়সে জোট্রোপ প্রতিষ্ঠার সময় আমাদের একটা কপিয়ার দরকার হয়েছিল। থ্রি-এমের প্রতিনিধি ছিলেন জর্জের বাবা। উৎপাদন খরচে একটা থ্রি-এম মেশিনের ব্যবস্থা করতে পারবে কিনা, জিজ্ঞেস করেছিলাম জর্জকে। ও বলেছিল: ‘বাবা কোনোদিনই এটা করবে না।’ জর্জ ক্যালিফোর্নিয়ার এক রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে, টাকা যেখানে গুরুতর বিষয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছেলেরা বাবার মতো হয়। আমি অবশ্য কোনোভাবেই এজন্য দোষারোপ করিনি ওকে।
তালিসে: আপনি কি মনে করেন না যে অন্যের বিপদে কারো উদারতার স্বভাব প্রসারিত হোক?
কোপোলা: কার কাছে যেতে হবে আর কার কাছে নয়, সেটা ঠিকই বুঝি। আমি বিলি ফ্রেডকিনের কাছে ১ মিলিয়ন ডলার চাইতে পারি, সেটা ও দেবেও। কিন্তু এটাই ওর স্বভাব।
তালিসে: মার্লোন ব্র্যান্ডোর বেলায়? আপনি তাকে অনেকটা পতনোন্মুখ ক্যারিয়ার থেকে পুনরুজ্জীবন দিয়েছেন।
কোপোলা: আপনি জানেন, ব্র্যান্ডো নানা বিষয়ে সাহায্য করেন এবং মোটমুটি উদার। কিন্তু বড় অংকের টাকার কথা বলছি আমরা: আধ মিলিয়ন বা ১ মিলিয়ন ডলার। যা-ই হোক, এখানে টাকার ব্যাপারটা কখনই বিরাট কিছু ছিল না। পত্রিকা এটা সৃষ্টি করেছে।
তালিসে: কিন্তু টাকার অভাব ওয়ান ফ্রম দ্য হার্ট শেষ করার ক্ষমতা তো প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছিল।
কোপোলা: আমার মনে হয় না আদৌ এমনটা ঘটেছিল। হয়তো ভীতিকর একটা সপ্তাহ কাটাতে হয়েছিল আমাদের। কিন্তু আমি যা করেছি, তা হলো, বলেছি: ‘দেখো, আমার হাতে এ ছবিটা আছে এবং দুটো সপ্তাহ কাটিয়ে দিতে পারলেই ছবির এত বেশি কাজ শেষ করতে পারব যে তখন প্রশ্ন উঠবে, আমাকে ঠেকাতে সামনে আসবে কে? একবার চালু করে দিতে পারলে এটা সম্ভাবনায় একটা কিছু—ব্যাংকের কাছে সম্ভাবনাময় সম্পদ, শিল্পের কাছে একটা নতুন ফিল্ম—আমি জানতাম, আমাকে ঠেকাতে যথেষ্ট শক্তির প্রয়োজন পড়ত।’
ঠিক তা-ই ঘটেছিল। আমরা ভাঁওতা দিয়ে পথ করে নিয়েছি। টাকা-পয়সা ছাড়াই ছবির কাজ শুরু করেছি। দুই সপ্তাহ বাদে সামনে বাড়ার মতো ছবির যথেষ্ট কাজ হয়ে গেছে। কী জানেন, পত্রিকাগুলো একটা কাজ করে, যেটা সম্পূর্ণ বিরক্তিকর: যে গল্প তারা লিখতে চায়, সেটা জেনেই খবরের কাছে যায়। সাংবাদিকরা হয়তো ২০টা আগ্রহ জাগানোর মতো বিষয়ের দেখা পান, কিন্তু তারা শুধু তাদের কাঙ্ক্ষিত জিনিসটাই বেছে নেন। তো আমরা প্রেস কনফারেন্সে ওয়ান ফ্রম দ্য হার্টের ঘোষণা দেয়ার সময় প্রযুক্তি, কৌশল, প্রতিভা ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে কথা বলেছি। একটা প্রকল্পে একত্র হওয়া শিক্ষানবিশ ও প্রবীণ চিত্রনির্মাতাদের কথা বলেছি ওদের। কিন্তু ওরা স্রেফ আর্থিক সমস্যার কথাই জানতে চান। ওদের কাছে আমার উত্তর ছিল, টাকা-পয়সার সমস্যা বরাবরই আছে আমার এবং সবসময়ই সেটা উতরেও যাই। এটাই সবচেয়ে সহজ অংশ। শৈল্পিক দিকটাই কঠিন, আসল জিনিস, বুঝলেন? কিন্তু পত্রিকাগুলো রসালো খবরেই বেশি উৎসাহী।
তালিসে: কিন্তু মাইকেল কিমিনোসহ ওদের মাঝে এমন লোকও আছেন, যারা টাকার কারণেই তাদের ছবি দেখাতে পারেননি।
কোপোলা: কিমিনো সেটা দেখিয়েছেন।
তালিসে: বেশ, কিন্তু খরচার ব্যাপারটাই কি ওর পক্ষে হেভেন’স গেট-এ যা করতে চেয়েছিলেন, সেটা করা অসম্ভব করে তোলেনি? ওর পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নেয়া হয়নি?
কোপোলা: আমার তা মনে হয় না। আমার ধারণা, হেভেন’স গেট-এর সঙ্গে আজকের দিনে চলচ্চিত্র নির্মাণের আরো বড়, মৌলিক প্রশ্ন জড়িত ছিল। সাধারণত যা ঘটে সেটা হলো পরিচালক একটা অ্যাডভেঞ্চারে নামেন এবং মূলত তথাকথিত স্টুডিওর ব্যাপারে ভীত থাকেন। কারণ তিনি জানেন যে যাদের সঙ্গে কাজ করছেন, তারা তিনি যা চান সেটা নিয়ে আলোচনার যোগ্য নন। তাই একজন সক্ষম পরিচালক হিসেবে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য নিজস্ব শক্তি কাজে লাগান: ফাইনাল কাটের অধিকার, এটার ফাইনালের অধিকার, ওটার ফাইনালের অধিকার। ফলে স্টুডিওর আর তেমন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। পরিচালক ছবি তৈরি শুরু করেন। গুটির একটা চালের কারণে জীবন প্রভাবিত হবে জানা থাকায় পরিচালক ছবিটিকে সুন্দর, দর্শনীয়, অনন্য করার প্রয়াসের ভেতর দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা চালান। বলতে গেলে ছবিটির মূল অগ্রাধিকার কী ছিল, সেদিকে আর খেয়াল থাকে না।
তালিসে: বই লেখা ও চিত্র পরিচালনা, এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কাজ। কোপোলা কিংবা কিমিনো অথবা ফ্রেডকিনের জগতের তুলনায় বই প্রকাশনায় সেভাবে অর্থ সম্পর্কিত নয়। পরিচালক জৌলুসময় জীবন কাটান: বেশুমার অসাধারণ সব বস্তুগত মালিকানা—অটোমোবাইল, ম্যানশন ও দেশজোড়া সম্পদ। অন্যদিকে একজন লেখকের ধনী হওয়ার কথা নয়। দরিদ্র অবস্থায় মারা গেলেই সম্ভবত তার প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিই দেখানো হবে।
কোপোলা: পরিচালকরা লেখকদের চেয়ে খুব ভালো বা মন্দ অবস্থায় থাকেন বলে মনে করি না—মার্টিন স্করসেসে আর কিমিনো এবং অন্যরা অবিশ্বাস্য জীবন যাপন করছেন না। স্করসেসে একটা অ্যাপার্টমেন্টে মোটামুটি জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি ইউরোপে যেতে পারেন, কিন্তু আপনি বলতে পারেন, আমার কিন্তু নিজের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব নেই।
তালিসে: বেশ, আপনার আসলে তার দরকারও নেই।
কোপোলা: না, নেই। কিন্তু চলচ্চিত্র ব্যবসা থেকে আমার আয়ের বিপুল অর্থ আসে না। হ্যাঁ, অনেক টাকা বানিয়েছি আমি, সত্যিই অনেক, কিন্তু সেটা এসেছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থেকে।
তালিসে: তবু টাকাটা আদিতে চলচ্চিত্র থেকেই এসেছিল বলে মনে করি আমি।
কোপোলা: আমি হয়তো গডফাদার থেকে ৬ কিংবা ৭ মিলিয়ন ডলার আয় করেছি, গডফাদার ২ থেকে আরো ৩ বা ৪ মিলিয়ন, আমেরিকান গ্রাফিতি থেকে আরো ৩ বা ৪ মিলিয়ন এবং অ্যাপোক্যালিপস নাউ থেকে আরো ২ মিলিয়ন। তাহলে চলচ্চিত্র ব্যবসা থেকে সাকল্যে ১০-১৫ মিলিয়ন ডলার পেয়েছি। একই সময়ে আপনি জানেন, সারাক্ষণ বিভিন্ন জায়গায় টাকা খরচও করছি। একটা ওল্ড-এজ ট্রেইলার পার্কে বিনিয়োগের পরামর্শ দেয়া হলে তা-ই করেছি, কিন্তু ভেবেছি, ‘খোদা, আমি দেখতে পারব না বা সুন্দর লাগে না, এমন কিছুতে টাকা খাটাতে চাই না।’ আমার কাছে সুন্দর লাগা জিনিসই কিনেছি আমি। ছোটখাটো একটা দালান দেখে বলেছি: ‘ওহ, ওটা আমার লাগবে, কি সুন্দর।’ আমার একটা ফিল্ম কোম্পানি দরকার, তো একটা কিনে নিয়েছি। আমার টাকা বেড়ে উঠেছে। যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে ঢের বেশি আয় করেছি। যা কিছু স্পর্শ করেছি, তা-ই বহুগুণে বেড়ে উঠেছে।
তালিসে: কিন্তু ওয়ান ফ্রম দ্য হার্ট নির্মাণের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে সম্প্রতি আমাদের ধারণা হয়েছে, আপনি বেতন মেটানোয় ব্যর্থ একজন দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ।
কোপোলা: আমার দাম ১০০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। তার মানে এই নয় যে আমি কর্মীদের বেতন মেটাতে পারব। জর্জ লুকাসের কথা বাদ দিলে আমি সবচেয়ে ধনী চিত্রনির্মাতা হতে পারি, কিন্তু আমার নগদ টাকা নেই।
তালিসে: তরুণ বয়সে কখনো কি টাকার প্রয়োজন থাকলে জোগাড়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন?
কোপোলা: ছোটবেলায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা কিছুই জানতাম না। এই হয়তো কিছু টাকা থাকত, আবার তার পরই বাবা হয়তো বলতেন, বন্ধকের ব্যবস্থা করতে পারেননি। টালমাটাল অবস্থা। টাকাটা বিরাট মাথাব্যথার কারণ ছিল যেন। আজ আমাকে বিলিয়ন ডলার দিলে এক বছরেই খরচ করে ফেলব। কিন্তু এক বছর পর সেটার দাম ঠেকবে ১০ বিলিয়নে। টাকা হচ্ছে একটা উপায়, প্রভাব বিস্তারের উপায়। আপনাকে এখানে এসে আমার সঙ্গে খেলতে বাধ্য করতে পারার একটা উপায়। কথায় আপনাকে রাজি করাতে পারব না। আমার প্রভাব থাকতে হবে।
তালিসে: পত্রিকাগুলো গত বছর আপনার আর্থিক সমস্যার প্রতি গুরুত্বারোপ করে উপকারই করেছে বলেই আমার ধারণা। আপনাকে আরো সহানুভূতিময় চরিত্রে পরিণত করেছে। বেশির ভাগ দর্শকের মতো এ মানুষটিও আর্থিক সমস্যায় ভুগছেন।
কোপোলা: সাধারণ মানুষ আমাদের বিভিন্ন সমস্যা ঘাঁটাঘাঁটি করছে ভাবার চেয়ে ওদের প্রতি ঢের বেশি সম্মান বোধ করি আমি।
তালিসে: তাহলে গসিপ ম্যাগাজিনগুলোর সাফল্যকে বিচার করবেন কীভাবে?
কোপোলা: সবসময়ই এমন মানুষ থাকবে, যারা পপকর্ন বিনোদনের শরণ নেবেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সিংহভাগ মানুষ উচ্চতর স্তরে অনুপ্রাণিত হতে চান না।
তালিসে: আপনার কথা সত্যি হলেই ভালো। কিন্তু শ্রোতারা আপনি যা বলেছেন, তা চায় বলে মনে করি না। টেলিভিশনের টপরেটেড শোগুলোর দিকে তাকান।
কোপোলা: সবই জঘন্য। আমার ধারণা, জনগণকে কোন জিনিসটা দিতে হবে, সেটা যারা স্থির করছেন, তারা নিজেদের অর্থনীতিকে চালু রাখতে সবচেয়ে নিম্নস্তরের সম্ভাব্য জিনিস দিচ্ছেন। কোনো কোম্পানি আদৌ কি তিন বছর পরের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কোম্পানির ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ, একটা বিশাল প্রতিষ্ঠান হতে যাচ্ছে আমাদের। কঠোর পরিশ্রম করতে চলেছি আমরা এবং এ বছর কী হবে তাতে কিছু এসে যায় না। আমরা এখন থেকে তিন বছর পরের কথা ভাবছি।’ আমেরিকান ব্যবসা-বাণিজ্য এভাবে চলে না। জাতিকে শক্তিশালী করে তোলা মহান বিনিয়োগকারী এবং শিল্পপতিরা ভিন্ন ক্যালিবারের মানুষ।
তালিসে: এই জাতি কি...
কোপোলা: বিনিয়োগকারীদের হাতেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
তালিসে: বিনিয়োগকারী ও অভিযাত্রী আর পৃষ্ঠপোষক এবং তাদের সমর্থন জোগানো মহান শিল্পপতিদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এটা। পরের দলের বেশির ভাগই আদর্শবাদী নয়, বরং কট্টর মুনাফাখোর, যারা মূলেই আগ্রহী ছিলেন। হ্যারিম্যান ও রকফেলারের মতো মানুষ, ওরা কঠিন, নিষ্ঠুর, নীচ ছিলেন...
কোপোলা: হেনরি ফোর্ড ইঁদুরের মতো হলেও বিশেষ কিছু তৈরি করেছিলেন।
তালিসে: মাস মার্কেট অটোমোবাইল।
কোপোলা: কিন্তু ঘড়ির মতোই তৈরি করা হয়েছে।
তালিসে: আমি তা বলব না।
কোপোলা: মডেল টি ফোর্ড...
তালিসে: ওটা সস্তা ছিল। সস্তায় বিক্রি হতো। একটা রঙেই সেটা কিনতে বাধ্য করেছেন তিনি। কালো, ব্যস।
কোপোলা: কিন্তু মডেল টি ফোর্ড নকশার দিক থেকে মাস্টারপিস ছিল। মানুষকে সত্যিই একটা কিছু দিয়েছিলেন ফোর্ড। তিনি তাদের...
তালিসে: সরল একটা জিনিস।
কোপোলা: কে বলেছে, অসাধারণ কোনো কাজ সরল হতে পারবে না? আমার কাছে একটা মডেল টি আছে। ওটার দিকে তাকালেই বলি, ‘ওহ, দেখো, কী কাজ করেছেন তিনি।’ কখনো কেউ একজন বলবে, ‘এখন আর আগের মতো গাড়ি বানায় না ওরা।’ কিংবা ‘দ্য টোয়ালাইট জোন ভালো ছিল—এখন আর ভালো টেলিভিশন শো বানাচ্ছে না কেন ওরা?’ আসল ব্যাপার হলো, আমাদের সবাইকেই একসঙ্গে টেনে নিচে নামানো হয়েছে। দক্ষ পেইন্টার, কারুশিল্পী, স্পেশাল ইফেক্টের কারিগর আর শৃঙ্খলাপরায়ণ অভিনেতাদের নিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র ছিল দুনিয়ার সেরা। গত ২৫ বছরে একে আমরা ধ্বংস করেছি। কথাটা ঠিক।
তালিসে: আপনি যেখানে উপস্থিত, সেখানে কীভাবে একে সত্যি বলছেন, এ দেশে আপনি যা চান করতে পারেন, চলচ্চিত্র থেকে অর্থ উপার্জন করছেন, যাকে অনেকেই শিল্পকর্ম বলে?
কোপোলা: কেউ লক্ষ করেনি যখন মহান চলচ্চিত্র শিল্প, মহান কারুশিল্প, মহান ঐতিহ্যকে পদ্ধতিগতভাবেই ধ্বংস করা হয়েছে। সবকিছু ধ্বংস করার মতো একই কারণে ধ্বংস করা হয়েছে সেসব: আরো নির্ভরযোগ্য ব্যবসার জন্য। হলিউডে সত্যিকারের কোনো চলচ্চিত্র ব্যবসা নেই। হলিউড এখন সুবিশাল টেলিভিশন শিল্প হয়ে গেছে।
তালিসে: আপনার স্টুডিওতে নতুন ভিডিও প্রক্রিয়া সেই শিল্পকলাকেই আরো কলুষিত করার পথে নতুন পদক্ষেপ বলে উদ্বিগ্ন নন আপনি?
কোপোলা: এটা অনেকটা চলচ্চিত্র লেখার সৌকর্যকে কলুুষিত করছে বলার মতো। আমার মনে হয়, ইলেকট্রনিক সিনেমা শিল্পকর্ম নির্মাণ কম ব্যয়বহুল করে বেশিসংখ্যক মানুষের নাগালে নিয়ে যাবে। আমার ধারণা, দুই বছরের ভেতর ফিল্মের আর শুটিং হবে না। আপনি টাইপরাইটারে লেখেন, নাকি পেন্সিলে?
তালিসে: পেন্সিল। পরে টাইপ করি। কিন্তু পার্থক্য হলো, আমি একেবারেই একাকী কাজ করি আর আমার মনে হয়, চিত্রনির্মাতা হওয়ার একটা অনন্য দিক হলো, আপনাকে একা কাজ করতে হয় না।
কোপোলা: করতে হয় না আবার হয়। সত্যিকারের কাজটা একাকীই সারা হয়।
তালিসে: আপনি ছোট থাকতে একাকী প্রচুর সময় কাটাতেন। বছরখানেক পোলিওতে ভুগেছেন। পেছনে তাকালে সেই একটি বছরকে খুবই ফলপ্রসূ ঠেকে না?
কোপোলা: আমার মনে হয়, আপনি যেকোনো কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যান না কেন, যেকোনো বাস্তব সংকট, যখন আপনি ভেঙে পড়েন, সেটা আপনাকে যেখানে ছিলেন তার চেয়ে অনেক দূরের কোথাও রেখে যায়।
তালিসে: আপনার ১৩ বছর বয়সে এটা হয়েছিল?
কোপোলা: না, আমার বয়স ছিল নয়।’
তালিসে: কতটা কষ্টের ছিল?’
কোপোলা: সেটা ছিল ১৯৪৯ সালের পোলিও মহামারী, সব অভিভাবকের পক্ষেই ভীতিকর সময়। চারপাশের শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছিল।
তালিসে: তখন কি নিউইয়র্কে ছিলেন?
কোপোলা: আমি ছিলাম লং আইল্যান্ডে। একদিন স্কুলে গিয়েছি, তারপর দেখা গেল, ওরা আড়ষ্ট ঘাড়সহ আমাকে বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপর অ্যাম্বুলেন্স এসে জ্যামাইকা হসপিটালে নিয়ে গেল। ওখানে হলওয়ে আর বাথরুমেও শিশুদের অসংখ্য র্যাক—সবার জন্য কামরা ছিল না। ১০ হাজার কেঁদে চলা শিশুতে ঘেরাও হয়ে থাকা দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। একদিন আশপাশে যখন কেউ ছিল না, আমি উঠতে গিয়ে মেঝেয় পড়ে যাই। বুঝতে পারছিলাম, আমার হাত বা পা কাজে লাগাতে পারছি না। মা-বাবা অবশ্যই অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে। তিনি বললেন, আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছি। আমি আর হাঁটতে পারব না। বাড়ি ফেরার পর শোয়ার ঘরে রাখা হলো। বিছানার চাদরের সাথে সেঁটে দেয়া হয়েছিল আমাকে, যাতে পড়ে না যাই। তখনই কী ঘটছে বুঝতে পারি। বরাবর বাস্কেটবল খেলোয়াড় হতে চেয়েছি আমি। কিন্তু এক বছর প্যারালাইজড ছিলাম, সময়টা নিজের শোয়ার ঘরে কাটিয়েছি। অনেকে উপহার নিয়ে এসেছে আমার জন্য। আমার একটা টেলিভিশন, একটা ১৬ মিলিমিটার মুভি প্রজেক্টর, একটা টেপ রেকর্ডার, একটা ভেন্ট্রিলোকুইস্ট ডামি এবং জেরি মাহোনি ও পল উইনচেলের অটোগ্রাফওয়ালা একটা ছবি। ভেন্ট্রিলোকুইস্ট আর পাপেটিয়ার হয়ে গেলাম আমি। প্রচুর টেলিভিশন দেখতাম। তারপর আনুমানিক নয় মাস পর আমার ভাইকে বললাম, ‘অ্যাই অগি, এটা দেখ তো।’ আমার হাত সামান্য উঁচু করলাম। সেরে উঠতে শুরু করেছিলাম আমি।
তালিসে: ছেলেবেলার উল্লেখযোগ্য একটা সময় আমিও একা কাটিয়েছি। আমার শহর নিউ জার্সির ওশান সিটি গ্রীষ্মকালে উৎসবমুখর ও ঝলমলে হলেও শীতে অন্তত আট মাস বিষণ্ন থাকে।
কোপোলা: ওখানে শীতকালেও ছিলেন?
তালিসে: হ্যাঁ। আপনি কখনো উপন্যাস বা ছোট গল্প লেখার চেষ্টা করেছেন?
কোপোলা: ১৫ বছর বয়সে একট উপন্যাসের ৬০ পৃষ্ঠা শেষ করেছিলাম।
তালিসে: আপনার কাজকর্মে আপনি যা করেন, সেগুলো কীভাবে একসঙ্গে হয়?
কোপোলা: আনুমানিক তিন বছর আগেই অ্যাপোক্যালিপসের পর মনে হয় এসব ব্যাপারে আমার মনোভাব বদলে ফেলেছি। তার আগে এটা ভালোভাবে করার ব্যাপারে খুবই উদ্বিগ্ন থাকতাম। এরপর স্রেফ এ নিয়ে উত্কণ্ঠিত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, স্রেফ সাধ্যমতো কঠোর পরিশ্রম করেছি। কোনো কিছু নিখুঁত না হলে তার কারণ আমি সেটা ঠিকমতো পারিনি বলে নয়। এখন আমি এমনকি অ্যাপোক্যালিপস বা দ্য গডফাদারের সঙ্গেও নৈকট্য বোধ করি না। আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের সঙ্গে কতটা সফলভাবে মিশতে পেরেছি, সে ব্যাপারে বলতে পারি, তেমন একটা ভালো নই তাতে। আসলে আমি আরো অনুপ্রাণিত ব্যক্তিগত জীবনের আশা করি। বিভিন্ন পেশার লোকজনের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেতে এই ‘ফল’ থেকে কিছুদিনের জন্য নিউইয়র্কে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যারা আমার কৌতূহলের বিভিন্ন বিষয়ে উত্তর জোগাতে পারবেন। আমি চলচ্চিত্রের জরুরি অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যাকুল হয়ে আছি।
তালিসে: অ্যাপোক্যালিপস কীভাবে আপনাকে বদলে দিয়েছিল?
কোপোলা: সত্যিই কঠিন ছিল সেটা। ছবিটি নির্মাণের সময় এমনও হয়েছে যে সমস্যা সমাধান করতে না পারায় আক্ষরিক অর্থেই মরতে বসেছি মনে হয়েছে। ভোর ৪টায় শীতল ঘর্মাক্ত শরীরে ঘুমোতে যেতাম। যখন সব চুকে গেল, বুঝতে পারলাম, সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গায় আছি। কিছুই আর আগের মতো করে দেখছিলাম না। আমি প্রতিভাবান কিনা, অস্কার জিততে পারব কিনা, ধনী নাকি গরিব হয়ে যাব, সেই চিন্তা বাদ দিয়েছি।
তালিসে: তাহলে আগের মতোই সন্ত্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছিলেন?
কোপোলা: আমি কখনই সন্ত্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি করিনি। হ্যাঁ, এটা নাজুক ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু তখন নিজেকে প্রশ্ন করলাম, ‘আমার বেলায় সবচেয়ে খারাপ কী ঘটতে পারে?’ আমার বেশকিছু ভিন্ন ভিন্ন প্রতিভা ছিল। সবসময়ই ভালো রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে পারব বলেই সিদ্ধান্তে পৌঁছি।
তালিসে: আপনি যখন কাজ শুরু করেন, তখন এমন ছবি বানিয়েছেন, যেগুলোকে আজ ‘সফট পর্ন’ বলা হবে।
কোপোলা: আমি দুটো স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি করেছি।
তালিসে: কোনোটাই দেখিনি, তবে ওগুলো কি পর্নগ্রাফিক বিবেচিত হতে পারে?
কোপোলা: চল্লিশের দশকে হয়তো হতে পারত। শিওর।
তালিসে: তাহলে ধরুন জ্যামাইকার কোনো যাজক আপনাকে সেন্সর করল বা লিজিয়ন অব ডিসেন্সি ধরনের পাহারাদাররা আপনাকে কালোতালিকাভুক্ত করল—চিরকালের জন্য আপনাকে ছবি নির্মাণ থেকে নিষিদ্ধ করা হতে পারত। হয়তো কখনই অ্যাপোক্যালিপস বানাতে পারতেন না। আপনি এ ধরনের সেন্সরশিপের ক্ষমতাকে সমর্থন করেন? সংবাদপত্রের ভূমিকা নিয়েও আপনি বিরক্ত।
কোপোলা: গে, আমি বলছি না যে কী বলতে হবে কোনো গির্জার সে নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতা থাকা উচিত। আমি বলছি, সংবাদপত্রের মতো এত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কোনো কিছুর কাজকর্ম নির্বিকারভাবে করার অধিকার আছে কিনা...
তালিসে: না, অবশ্যই না।
কোপোলা: কিন্তু নিজের সম্পর্কে পুরোপুরি সত্যি কিছু কখনই সংবাদপত্রে পড়িনি আমি। এই যদি অবস্থা হয়, আরো যেসব জিনিস পড়ছি সেগুলোর কী দশা? পত্রিকা নিতম্বে ঘা খেতে যাচ্ছে। পত্রিকা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এ দেশের গলায় সংবাদপত্র একটা যাঁতাকল। এটা সত্যি কথা বলে না। পরিবর্তনের জন্য তাগিদ দেয় না।
তালিসে: সংবাদপত্র কোনো একরৈখিক শক্তি নয়।
কোপোলা: কিন্তু এটা সততা, নৈতিকতা কিংবা সত্যির শক্তিও না। এটা একটা জঘন্য দল।
তালিসে: নিশ্চিতভাবে নিক্সনের আমলকে নজরে রাখার সময় তা ছিল না। ভিয়েতনামেও নয়। অ্যাপোক্যালিপস এক কেলেঙ্কারিপূর্ণ যুদ্ধকে উন্মোচন করেছিল, সংবাদপত্র যেটা ছবি নির্মাণের বহু আগেই প্রকাশ করেছে।
কোপোলা: ভিয়েতনাম যুদ্ধ... টাইম ম্যাগাজিন সম্পর্কে কী বলবেন?’
তালিসে: বেশ, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস সম্পর্কেই বা কী বলবেন? ডেভিড হালবারস্ট্যাম আর নিল শিহান সম্পর্কে?
কোপোলা: আমি কি বলেছি যে ওরা চমত্কার সাংবাদিক নন?
তালিসে: আর ম্যালকম ব্রাউনি...
কোপোলা: ওরা ছিলেন বিশাল মানুষ। কিন্তু পুরো সংবাদপত্র তা নয়। হলবারস্ট্যাম। হলবারস্ট্যামের সাথে সংবাদপত্র নিয়ে কথা বলে দেখুন। তিনি আপনকে বলবেন। সংবাদপত্র অবিরাম বিষণ্নকারী খবর, খুনখারাবির খবর ছাপিয়ে দেশের প্রতিটি মানুষকে যারপরনাই বিষাদগ্রস্ত, অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আমাদের পথঘাটে এত এত বিষণ্ন মানুষকে ঘুরে বেড়াতে আর দেখিনি। আমার কাছ থেকে এটা পাচ্ছে না ওরা। জীবন সম্পর্কে আমার মনোভাব অত্যন্ত ইতিবাচক। ওরা এটা পাচ্ছে খবরের কাগজ থেকে।
তালিসে: যেমন ধরুন আপনি দ্য গডফাদারে যেমন ঢালাওভাবে সহিংসতাকে তুলে ধরেছেন, সেটাই কাউকে একটা আইসপিক তুলে নিয়ে তার অপছন্দের কারো হাতে গেঁথে দিতে প্ররোচিত করতে পারে—আপনার ছবির এবটা বিশেষ দৃশ্য এটা। ধরুন...
কোপোলা: অন্ততপক্ষে আমি যা তুলে ধরেছি, সেটা আমার উপলব্ধির সত্যি।
তালিসে: সত্যিই...
কোপোলা: আমি এখানে মিথ্যা খবরের কথা বলছি, যেগুলোর হাত থেকে আমাদের রক্ষা নেই।
তালিসে: কিন্তু মনে করুন, জাজ বললেন, দ্য গডফাদার নামে সহিংস ছবিটি...
কোপোলা: আমরা একই প্রসঙ্গে কথা বলছি না, গে?
তালিসে: আমি সেন্সরশিপের কথা বলছি।
কোপোলা : আমি পেশাগত দায়িত্বশীলতার কথা বলছি।
তালিসে: ধরুন আপনার ছবিগুলোকে অযোগ্য মনে করা হলো...
কোপোলা: তাহলে ওগুলো আর দেখানো হবে না।
তালিসে: তাহলে কি এ সমাজ আরো শ্রেয়তর কিছু হবে?
কোপোলা: সংবাদপত্র আসল সত্যি তুলে ধরলেই এটা একটা উন্নত সমাজ হয়ে উঠবে।
তালিসে : ‘সত্যি’ কিন্তু সংজ্ঞায়িত করা কঠিন।
কোপোলা: আহা, ওরা তো এমনকি চেষ্টাও করে না। আপনি জানেন ওরা কেমন। আমরা হলবারস্ট্যামের মতো মানুষের কথা বলছি না। আমি বলছি মিথ্যা বলার প্রস্তুতি নিয়ে আসা লোকদের কথা।
তালিসে: এ ব্যাপারে কী করা যেতে পারে? মহান পিউরিটান কায়দায় শাস্তি?
কোপোলা: সাংবাদিকদের পরিচালনায় একটি স্বআরোপিত নৈতিকতা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তালিসে: আমাদের মনে হয় সেটা আছে।
কোপোলা: আমি ভুল প্রমাণ করতে পারব, এমন কিছু কেউ পত্রিকায় লিখে বসলে কার কাছে লিখব আমি? এ সাংবাদিককে কে তার পেশা থেকে বিরত রাখতে পারবে—বেআইনি কাজ করা কোনো ডাক্তারের মতো?
তালিসে: মামলার শিকার হওয়াটা কেমন আপনি জানেন?
কোপোলা: আরে, আপনার চেয়ে বেশি আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে!
তালিসে: আপনাকে নিজের পকেটের টাকায় মাশুল গুনতে হয়েছে?
কোপোলা: সবসময়। আমি আমার জীবনে কোনো মামলায় জিতিনি। আবার এমন নয় যে হেরেছি। ব্যাপারটা হলো, আপনাকে মামলা লড়তে গিয়ে এত বেশি টাকা খরচ করতে হয় যে সেটা হেরে যাওয়ারই শামিল।
তালিসে: ঠিক এবং এই মামলাবাজ সমাজের একটা পরিণতি লেখক ও শিল্পীদের ওপর আগাম বাধা আরোপ, সেন্সরশিপ, আক্রান্ত করার ভীতি এবং সবশেষে এমন একটা রাষ্ট্র, যেখানে সাংবিধানিক স্বাধীনতা মরাল মেজরিটির মাণদণ্ডের অধীনে চলে যাবে।
কোপোলা: অন্য মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারো নেই। আমার মনে হয়ে যে দি ইনকোয়্যারার প্রায়ই সত্যি নয় এমন সব জিনিস ছাপায়। আমরা এমন একটা ব্যবসাকে সুযোগ করে দিয়েছি, যেটি যারা প্রকাশ্য জীবন যাপন করে, তাদের বেছে নিয়ে তাদের সম্পর্কে নানা জিনিস রটায়, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের বারোটা বাজায়, বিব্রত করে, আঘাত দেয় এবং ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টের কারণে কোনো সমস্যা হয় না, কারণ নিক্সন? আমার মনে হয়, ক্ষমতাসীন নিক্সনও রেপরোয়া সংবাদপত্র থেকে ঢের ভালো হতো।
তালিসে: বাক্স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলার সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, যারা এ কাজটি করছেন, তাদেরই আগে রক্ষা করতে হয়। প্রিন্ট মিডিয়ার সবচেয়ে খারাপ মতপ্রকাশকারী সম্ভবত দি ইনকোয়্যারার।
কোপোলা: তাহলে ওদের ব্যবসা থেকে বের করে দেয়া হোক।
তালিসে: এরপর তাহলে কে হবে?
কোপোলা: আমি একটা অনুমান করছি। আপনাকে গ্যারান্টি দিতে পারি, পাঁচ বছরের মধ্যে আপনার কল্পনার চেয়ে বেশি প্রেস সেন্সরশিপের দেখা পাবেন। আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি আপনাকে এবং সেটা ঘটবে মূলত শিল্পকে নিজের পায়ে টেনে নামানো হয়েছে আর নিজের আবর্জনাকে নিয়ন্ত্রণ করেনি বলেই।
তালিসে: আপনি যে ওয়াচডগের কথা বলছেন, তিনি মারাত্মক ধরনের মানুষ হবেন। তিনি হবেন একজন ব্যর্থ আমলা, যিনি সামলে উঠতে...
কোপোলা: আপনি মানুষ সম্পর্কে বড়ই নির্মম।
তালিসে: আমি নির্মম নই। আমি একজন বাস্তববাদী।
কোপোলা: আপনাকে আমি একটা শেষ প্রশ্ন করতে পারি?
তালিসে: হ্যাঁ।
কোপোলা: আপনি যা চান তা-ই যদি পেতেন, আপনার কোনো ইচ্ছাপূরণ হোক চাইলে কী চাইবেন?
তালিসে: স্বাস্থ্য। ৭৫ বছর পর্যন্ত সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইতাম।
কোপোলা: আপনি এভাবেই ইচ্ছাপূরণ করতেন? আমি বহু স্বাস্থ্যবান, দুর্গত লোককে দেখেছি।
তালিসে: বেশ, আপনার ইচ্ছাটা কী হতো?
কোপোলা: আমার একটা ইচ্ছাপূরণের সুযোগ থাকলে ওহ, ফাউস্টের মতো একটা কিছু চাইতাম। আপনি জানেন, সামগ্রিক জ্ঞান বা এ-জাতীয় কিছু।
তালিসে: অনেকেই মনে করে সেটা তাদের আছে।
কোপোলা: কারা?
তালিসে: অনেকেই, যারা ভ্রান্ত।
কোপোলা: আমি যখন ছোট ছিলাম, একটা ক্যাডিলাক কনভার্টিবল আর একটা সানবিম আলপাইন এবং একটা ফোর্ড থান্ডারবার্ড ও একটা পন্টিয়াক হলেই ব্যস—এসব গাড়ি পাওয়াই যথেষ্ট হতো।
তালিসে: আপনাকে কোন জিনিসটা ভীত করে, ফ্রান্সিস?
কোপোলা: ভালোবাসার কাউকে হারানো। আপনিও কি তাই বলবেন?
তালিসে: হ্যাঁ, তাই। মৃত্যু সম্পর্কে আমার কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা আছে। আমাকে তা কিছুটা ত্রস্ত করে। আমার মা-বাবা দুজনের বয়স আশির কাছাকাছি। আমার বেশির ভাগ বন্ধুদের বিপরীতে, যারা তাদের পরিবারে মৃত্যু দেখেছে, আমি দেখিনি।
কোপোলা: আমিও না। কেউ কখনো মারা যায়নি। আমার দাদি ছাড়া।
তালিসে: এ বছর মৃত্যু নিয়ে প্রচুর ভেবেছি আমি, আপনি যেহেতু একজন নাট্যকার, আপনি কি নাটকীয় মৃত্যু চাইবেন?
কোপোলা: হ্যাঁ। ইউকিও মিশিমার মতো। তিনি তার চার খণ্ডের মহাকাব্যের শেষ খণ্ডের কাজ শেষ করেছেন, মিলিটারি হেডকোয়ার্টার দখল করে ধ্রুপদী কায়দায় আত্মহত্যা করেন—সব একদিনেই। মানে, এটা একটা বিদায় ছিল বটে।
—এস্কোয়ার ফিল্ম কোয়ার্টারলি, জুলাই ১৯৮১






