মুখলিসা বুবি:
একজন শিক্ষাবিদ ও বিচারক
১৮৯৭
সালে রাশিয়ার
তাতারস্তানে প্রতিষ্ঠিত
হয় মেয়েদের
প্রথম আধুনিক
স্কুল। ১৯০৮
সালে স্কুলটিতে
পড়তে আসে
মধ্য রাশিয়ার
নিঝনি নভগ্রোদ
প্রদেশের মেয়ে
রায়হানা। তাদের
উচ্ছৃঙ্খল মেয়েকে
মানুষ করার
জন্য বাবা-মাই
তাকে সেখানে
পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
তো সেই
রায়হানা পরবর্তী
সময়ে অনেক
চিঠি লেখেন
তার স্কুলের
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষকে,
যার একটিতে
ভাস্বর হয়ে
আছে নিচের
কথাগুলো: ‘আপনি
আমাদের পিতা-মাতার
থেকেও বেশি
দয়া দেখিয়েছেন,
আমি খুবই
কৃতজ্ঞ! আমি
জানি, যা
দিয়েছেন, তার
এক-দশমাংশও
ফিরিয়ে দিতে
পারব না।’
কথাগুলো মুখলিসা
বুবিকে নিয়ে,
যিনি ১৮৬৯
সালে তাতারস্তানের
রাজধানী কাযান
থেকে ৩২০
কিলোমিটার দূরের
একটি সাধারণ
গ্রামে জন্মগ্রহণ
করেও পুরো
রাশিয়ার ইতিহাসকে
প্রভাবিত করেছেন,
পুনর্জাগরণের যুগে
মুসলিম জ্ঞান
ও ঐতিহ্যের
দীপশিখাটি জ্বালিয়ে
রেখেছেন। অষ্টাদশ
শতাব্দীর রাশিয়ান
সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয়
ক্যাথেরিনের দেখানো
পথ অনুসরণ
করে মুসলিমদের
জীবনকে এভাবে
ধর্মীয় আইনের
অধীনে সুগঠিত
করার প্রয়াস
নেয়া হয়।
সেই অ্যাসেম্বলির
একটি আসন
থেকে নির্বাচিত
হয়ে ইতিহাস
সৃষ্টি করেন
মুখলিসা বুবি,
কারণ এটা
ছিল কোনো
মুসলিম নারীর
বিচারক হওয়ার
প্রথম ঘটনা।
পরবর্তী ২০টি
বছর মুখলিসা
বুবির কার্যস্থল
ছিল ডিপার্টমেন্ট
অব ফ্যামিলি
অ্যাফেয়ার্স, যারা
কাজ করত
বিবাহবিচ্ছেদ, যৌতুক,
সম্পত্তির উত্তরাধিকার,
সন্তান হেফাজত
ও অন্যান্য
মেয়েলি অভিযোগ
নিয়ে। মুখলিসার
শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা
যেন পরিপূর্ণতা
পেল বিচারপতির
কাজটিতে। তিনি
নারীদের অধিকার
সমুন্নত রাখতে
কঠোর নির্দেশনা
প্রদান করেন।
তার তদারকি
ও নেতৃত্বে
একটি আদর্শ
বিবাহ চুক্তির
খসড়া প্রণয়ন
করা হয়,
যার অন্যতম
উদ্দেশ্য ছিল
মুসলিম নারীদের
বহু বিবাহজনিত
সমস্যা থেকে
রক্ষা করা।
কমিউনিস্ট শাসনের
গোড়ার দিকে
মুখলিসার নারী
আন্দোলনকে পূর্ণ
সহযোগিতা ও
স্বীকৃতি দেয়া
হয়েছিল। লেনিনের
কাছে মুসলিমরা
ছিলেন পশ্চিমা
উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে
সংগ্রামে সারা
বিশ্বের অগ্রদূত।
কিন্তু ১৯২২
সালে স্ট্যালিন
লেনিনের স্থলাভিষিক্ত
হওয়ার পর
সেই মুসলিমরাই
প্রতিক্রিয়াশীল ও
বুর্জোয়া হিসেবে
চিহ্নিত হন।
তাদের অটোমানদের
ঘনিষ্ঠ মনে
করা হতো।
মুসলিম মসজিদ,
সমিতি, স্কুল,
সুফি সেন্টার
বন্ধ করে
দেয়া হতে
থাকলে একপর্যায়ে
মুখলিসার স্কুলটিও
বন্ধ করে
দেয়া হয়।
অচিরে শরিয়া
কোর্টও ভেঙে
দেয়া হয়
এবং মুখলিসাকে
বিচারপতির দায়িত্ব
থেকে অব্যাহতি
দেয়া হলো।
১৯৩৭ সালে
মুসলিম স্বায়ত্তশাসন
বিলোপ করার
মাধ্যমে জনজীবন
থেকে ইসলামকে
উত্খাতের প্রচেষ্টা
চূড়ান্ত রূপ
পায়। সেই
বছরই বুর্জোয়া
জাতীয়তাবাদী সংগঠনের
সদস্য সন্দেহে
গ্রেফতার করা
হয় মুখলিসাকে।
বিদেশী গোয়েন্দাদের
সঙ্গে সংযোগ
রাখার সাজানো
অভিযোগ আনা
হয় তার
বিরুদ্ধে এবং
বিচারের প্রহসন
শেষে ঝুলিয়ে
দেয়া হয়
ফাঁসিকাষ্ঠে। অন্যান্য
দেশে যখন
মুসলিম নারীদের
অধিকার সংরক্ষণের
কাজটি আরো
কয়েক দশক
পরে শুরু
হয়েছিল, মুখলিসা
সেই বিপ্লবের
যুগেই কাজটিকে
প্রায় প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের
পর্যায়ে নিয়ে
গিয়েছিলেন। সোভিয়েত
ইউনিয়নের পতনের
পর অবশ্য
মুখলিসা বুবির
গৌরবময় পুনরুত্থান
ঘটেছে। ২০১৪
সালে কাজানের
ইসলামিক কালচার
মিউজিয়াম মুখলিসা
বুবির জীবন
ও কর্মের
ওপর একটি
স্থায়ী প্রদর্শনী
কেন্দ্র খুলেছে।
সারা রাশিয়ায়
এখন তাকে
শ্রদ্ধা করা
হয় একজন
শিক্ষক, বিচারক
ও সমাজ
সংস্কারক নেতা
হিসেবে।
হালিদে ইদিপ:
আধুনিক তুরস্কের জননী
আধুনিকতা,
ইসলামতন্ত্র, আর
পাশ্চাত্যবাদ—এসবের
মধ্যে কোনো
বিরোধ আছে?
নাকি এদের
মধ্যে কোনো
ছেদরেখা টানা
যায়? আধুনিক
তুরস্কের লেখিকা,
রাজনীতিবিদ, সমরসেনানী
ও
মানবাধিকার কর্মী
হালিদে ইদিপের
জীবন ও
কর্ম আমাদের
এ বিষয়গুলো
নতুন করে
চিন্তা করতে
শেখায়। ২৪
বছর বয়সে
লেখা তার
প্রথম উপন্যাসে
হালিদে উত্তর
খোঁজার চেষ্টা
করেন দুটো
প্রশ্নের: ‘কে
তুর্কি? আর
টার্কিশ বলতেই
বা কী
বোঝায়?’
১৮৮৪ সালে
তুরস্কের অভিজাত
একটি পরিবারে
জন্ম নেয়া
হালিদে ইদিপ
দাদির কাছে
কোরআন শেখেন
এবং একই
সঙ্গে পাশ্চাত্য
ধারার স্কুলে
পড়াশোনা করে
বড় হয়েছেন।
তাই তার
চিন্তাধারা পাশ্চাত্য
ও প্রতীচ্য
দুই স্রোতেই
বয়েছে। কিন্তু
১৯০১ সালে
আমেরিকান গার্লস
কলেজ থেকে
প্রথম মুসলিম
গ্র্যাজুয়েট হিসেবে
বের হওয়ার
পর থেকে
এক অস্থির
সময়ের মুখে
পড়তে হয়
তাকে। ফ্রান্সের
অনুকরণে আধুনিকতার
ধুয়া ওঠে
তুরস্কের সর্বত্র;
১৯০৮ সালে
এ ধোঁয়াই
জন্ম দেয়
তরুণ তুর্কি
আন্দোলন, যা
বিপুল বেগে
তরঙ্গায়িত হয়
তুর্কি সমাজে
এবং ভাঙতে
থাকে প্রচলিত
সব প্রথা
ও ধ্যানধারণা।
তরুণ তুর্কিরা
অটোমান সালতানাতের
প্রতি আনুগত্য
ও ইসলাম
ধর্মে বিশ্বাস—এ
দুটোর ওপর
স্থান দেয়
টার্কিশ জাতীয়তা
ও ঐক্যকে।
তরুণ বয়সে
হালিদেও এই
তুর্কি জাগরণে
শরিক হয়ে
পড়েন, ‘নতুন
তুরস্ক’ ধারণাকে
ঘিরে গড়ে
ওঠা সামাজিক
ও সাংস্কৃতিক
সংগঠন ‘টার্কিশ
হার্থ’ ও
সাময়িকী ‘টার্কিশ
হোমল্যান্ড’-এর
সঙ্গে জড়িত
হয়ে পড়েন।
অধিকারবোধ তাকে
এতটা দখল
করে যে
হালিদে ১৯১০
সালে তার
প্রথম স্বামীকে
দ্বিতীয় বিয়ের
কথা তুলতেই
ডিভোর্স দিয়ে
দেন।
১৯১৮ সালে
অটোমান সাম্রাজ্য
ভেঙে পড়লে
ইতালি আনাতোলিয়া
দখল করে
নেয়, গ্রিস
দখলে নেয়
ইযমির। ফলে
১৯১৯-২২
পর্যন্ত যে
স্বাধীনতা যুদ্ধ
হয়, তার
নেতৃত্বে আসেন
তরুণ তুর্কি
আন্দোলনের সক্রিয়
কর্মী মুস্তফা
কামাল পাশা।
এ আন্দোলনের
কেন্দ্রভাগে থেকে
নেতৃত্ব দেন
হালিদে ও
তার দ্বিতীয়
স্বামী ডক্টর
আদনান। ১৯২২
সালে কামাল
আতাতুর্ক তুরস্ক
জয় করার
পর তার
মন্ত্রিসভায় হালিদের
স্বামীরও স্থান
হয়। আর্মেনিয়ান
ও গ্রিক
উত্খাতের কারণে
তুরস্কের মুসলিম
জনগোষ্ঠীর হার
৮০-৯৮-এ
উঠে এসেছিল,
সুতরাং কামাল
আতাতুর্কের জাতীয়তাবাদী
আন্দোলন তুরস্ককে
অধিকতর এক
ইসলামিক পরিচিতি
প্রদান করল,
কম্পাসকে ঘুরিয়ে
দিলে ইসলামের
দিকে অনেকখানি।
কিন্তু কামাল
আতাতুর্ক তো
ইসলামকে মনে
করতেন তুরস্কের
আধুনিকায়ন তথা
পশ্চিমায়নের প্রধান
বাধা। এখানেই
হালিদে ইদিপের
সঙ্গে ছিল
তার বিরোধ;
হালিদেও নারী
স্বাধীনতা চাইতেন,
কিন্তু তিনি
তার জন্য
কোরআনের শিক্ষার
ওপর নির্ভর
করাকেই বাস্তবানুগ
মনে করতেন।
হালিদে মনে
করতেন, নারীরাই
রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের
মূল কারিগর।
তার লেখা
থেকে পাই,
যে মায়েরা
আদিম যুগে
কৃষি ও
শিল্পোদ্যোগ শুরু
করেছেন সন্তানদের
খাওয়াতে ও
পরাতে, তাদের
প্রকৃতিই দান
করেছে ‘চরম
সংরক্ষণশীলতা’ ও
‘চরম
বিদ্রোহ’-এর
মতো আপাতবিরোধী
দুটো শক্তি,
যা পরিবার
ও রাষ্ট্র
গড়ার পথে
অন্যতম নিয়ামক।
হালিদে ও
তার সমমনাদের
নিয়ে একটি
বিরোধী দল
গড়ে তোলা
হয় ১৯২৪
সালে, কিন্তু
এক বছর
না যেতেই
কামাল আতাতুর্ক
একে নিষিদ্ধ
করেন তার
প্রাণনাশের অভিযোগ
তুলে। হালিদে
বিপদের গন্ধ
পেয়ে ১৯২৬
সালে তুরস্ক
ছেড়ে যান।
ইউরোপ, আমেরিকা
ও ভারতে
শিক্ষকতা ও
ভাষণের মাধ্যমে
তারা বেশ
ক’টি
বছর পার
করে দেন।
আতাতুর্ক মারা
যাওয়ার চার
মাস পর
১৯৩৯ সালে
হালিদেরা ফিরে
আসেন তুরস্কে।
উম্মে কুলসুম: ঐক্যের ধ্রুবতারা
১৯৬৭
সালে যে
আরব-ইসরায়েল
যুদ্ধ সংঘটিত
হয়, তা
মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে
নতুন রূপ
দান করে।
কল্পিত ইহুদি
রাষ্ট্রের জন্য
যতটুকু ভূমি
ভেবে রাখা
হয়েছিল, তার
থেকে তিন
গুণ জায়গা
দখল করতে
সমর্থ হয়
ইসরায়েল। জীবন,
সম্পদ, জায়গা
ও সম্মানের
হানি পুরো
মুসলিম বিশ্বকে
শোকার্ত করে
রাখে, সে
সময় এক
মিসরীয় গায়িকা
এগিয়ে আসেন
সমষ্টিগত শোক
ও হতাশার
আকাশে প্রশান্তি
এক সাহসের
এক অভূতপূর্ব
ও অশ্রুতপূর্ব
সুর নিয়ে।
১৮৯৮ ও
১৯০৪-এর
মধ্যে কোনো
এক সময়ে
জন্ম নেয়া
উম্মে কুলসুম
যখন কায়রোয়
চলে আসেন
স্থায়ীভাবে, ততদিনে
তার বয়স
২০ আর
কায়রো পরিণত
হয়েছে প্রধান
আরব শহরে,
যেখানে গায়ক-গায়িকাদের
বিপুল চাহিদা।
একদিন এক
সম্পদশালী মহিলার
অনুষ্ঠানে ডাক
পড়ে, তার
সুরেলা কণ্ঠ
ও পরিষ্কার
শব্দচয়ন শ্রোতাদের
মন জয়
করে নেয়।
এরপর আর
পিছে ফিরে
তাকাতে হয়নি,
প্রায় ৩০০
গান রেকর্ড
করে ফেলেন।
এ সময়েই
কণ্ঠের তেজ,
সামর্থ্য ও
নিখুঁত উচ্চারণের
ওপর ভর
করে এবং
শাস্ত্রীয় আরবীয়
গাথাগুলোর সফল
প্রয়োগ করে,
আরব মর্যাদাকে
মানুষের হূদয়ে
পৌঁছে দিতে
থাকেন উম্মে
কুলসুম। একটি
উন্নততর আরব
বিশ্বের স্বপ্নকে
সামনে রেখে
তিনিও যোগ
দেন যেন
বিপ্লবে, ঝড়
তোলেন সুরের।
জামাল নাসের
এতটাই আপ্লুত
হন যে
কুলসুমকে আখ্যায়িত
করেন ‘প্যান
আরবের সাংস্কৃতিক
আইকন’ হিসেবে,
ভূষিত করেন
‘মিসরের
কণ্ঠ’ উপাধিতে।
জাহা হাদিদ:
কাচ ও
কংক্রিটের ওপর
বক্র একটি
রেখা
বিশ্বখ্যত
গার্ডিয়ান পত্রিকার
সঙ্গে এক
সাক্ষাত্কারে খ্যাতনামা
স্থপতি জাহা
হাদিদ বলেছিলেন,
‘এটা
একটা দুই
দিক ধারালো
তলোয়ারের মতো।
যখনই আমার
নারীত্ব গ্রহণ
করে নেয়া
হয়েছে, আমার
আরবি পরিচয়
নতুন সমস্যা
হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
কিন্তু এই
দুইধারি তলোয়ারকেই
দক্ষতার সঙ্গে
নিজের অনুকূলে
কাজে লাগিয়ে
তার স্থাপত্য
মেধা পৌঁছে
গেছে লন্ডন
থেকে সাংহাই,
বাকু থেকে
ভিয়েনা, সিউল
থেকে নিউইয়র্ক;
পৃথিবীর প্রধান
শহরগুলোর আকাশরেখা
সাক্ষী হয়ে
দাঁড়িয়ে আছে
১৯৫০ সালের
অক্টোবরে ইরাকে
জন্মগ্রহণকারী ব্রিটিশ
নাগরিক জাহা
হাদিদের স্থাপত্যের
ধারণা পাল্টে
দেয়া কৃতিত্বগুলো।
জাহা হাদিদের
পিতা মুহাম্মদ
হাদিদ ইরাকের
বাদশাহ ফয়সালের
অর্থ মন্ত্রণালয়ের
উচ্চপদসহ বিভিন্ন
গুরুত্বপূর্ণ সরকারি
পদে অধিষ্ঠিত
হন। ১৯৫৮
সালে ইরাকের
হাসেমি রাজতন্ত্রের
পতনের পাঁচ
বছর পর
বামপন্থী ক্যু
হলে হাদিদের
সম্পত্তি জাতীয়করণ
করা হয়।
এ অবস্থায়
কন্যা জাহাকে
বিদেশ পাঠিয়ে
দেন তার
পিতা। একসময়
আগের প্যারিস
বলে পরিচিত
লেবাননের বৈরুতে
পাড়ি দেন
জাহা এবং
ইসলামের ইতিহাসে
গুরুত্বপূর্ণ ও
খ্যাত বৈরুতের
আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে ব্যাচেলর
ডিগ্রি অর্জন
করেন। গ্র্যাজুয়েশনের
পর শিক্ষানবিশ
কাল সম্পন্ন
করার পর
১৯৮০ সালে
নিজের ফার্ম
প্রতিষ্ঠা করেন
জাহা। উজ্জ্বল
ভবিষ্যতের হাতছানি
দেখাচ্ছিল তার
নতুন ফার্ম।
কিন্তু উদ্ভাবনী
ও দর্শনীয়
হলেও তার
কাজগুলো সহজ-সরল
ও একরৈখিক
ছিল না।
জাহার জটিল
স্থাপত্যগুলোর বাস্তবায়ন
খুবই ব্যয়সাপেক্ষ
ছিল। ফলে
তার ডিজাইনগুলো
অনেকটা সময়
অনির্মিত হয়ে
থাকল। সেই
সময়টাতে তিনি
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্থাপত্যের
ওপর ভাষণ
দিয়ে সময়টা
ব্যয় করেন।
১৯৮২ সালে
জাহা প্রথম
গোল্ড মেডেল
লাভ করেন,
যা তাকে
প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্ষেত্রটিতে
এগিয়ে দেয়।
এরপর ১৯৮৮
সালে নিউইয়র্কের
মিউজিয়াম অব
মডার্ন আর্টে
তার কাজ
প্রদর্শিত হলে
জাহার খ্যাতি
আকাশের চূড়া
স্পর্শ করে।
জাহার সমালোচকরা
তার কাজের
পেছনে ‘বিমূর্ততা,
বিনির্মাণবাদ, প্যারোমেত্রিকতা’
এসব অস্বচ্ছ
লেবেল লাগিয়ে
দিয়েছেন। হ্যাঁ,
সবসময় সোজা
লাইন থেকে
ঘুরে গেছেন
তিনি। জাহা
গ্লাস, স্টিল
ও কংক্রিট
নিয়ে অনেক
কিছু কল্পনা
করেছেন যা
পদার্থবিদ্যার সূত্রকে
চ্যালেঞ্জ করেছে।
২০১২-এর
অলিম্পিকের জন্য
নির্মিত লন্ডন
অ্যাকোয়াটিক সেন্টার,
আর চায়নার
গুয়াংঝু অপেরা
হাউজের একটি
ভাসমান বৈশিষ্ট্য
রয়েছে, যা
এর পর্যবেক্ষকদের
একটি স্থায়ী
চলন ও
গতির অভিজ্ঞতা
উপহার দিতে
সক্ষম হয়।
জাহা হাদিদ
তার স্টাইল
নিয়ে নিজেই
বলেন, ‘৯০
ডিগ্রি পেতে
হবে এমন
চিন্তা থাকে
না আমাদের
মাথায়। বরং
আমরা শুরুতে
ভাবি, একটি
কর্ণ নিয়ে।
কারণ কর্ণ
বা ডায়াগনাল
একটি বিস্ফোরণের
ধারণা নিয়ে
আসে যে
কিনা স্পেস
বা শূন্যকে
কাটাকাটি করে
একটা রিফর্ম
বা সংস্কারের
রূপ দেবে।’
মারিয়াম মির্জাখানি: গণিতের রাজকুমারী
ইরানে
ইসলামিক বিপ্লব
সংঘটিত হওয়ার
কিছুটা আগে,
১৯৭৭ সালের
১২ মে
একজন প্রকৌশলী
পিতা ও
গৃহবধূ মায়ের
মধ্যবিত্ত ঘরে
জন্ম নেন
মারিয়াম। ওই
সময়টাতে মারিয়ামের
পরিবার তাদের
সন্তানকে পূর্ণ
প্রতিরক্ষা দিয়ে
গেছেন। ইরাক-ইরান
যুদ্ধের পর
পুনর্গঠনের যুগে
ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি
শিক্ষাকে সর্বাধিক
গুরুত্ব দিয়ে
জাতির সব
থেকে মেধাবী
ছাত্রছাত্রীদের জন্য
কিছু বিশেষ
স্কুল নির্মাণ
করে। আশ্চর্য
হলো গণিত
ছিল একমাত্র
বিষয় যাতে
মারিয়াম ওপরের
দিকে থাকতে
ব্যর্থ হতেন
তার সিক্স
গ্রেডে থাকাকালীন।
তার বন্ধুর
কাছ থেকে
জানা যায়,
একদা মারিয়াম
বিশের মধ্যে
ষোল স্কোর
করেছিলেন এবং
তিনি নিশ্চিত
ছিলেন যে
গণিতের কারণেই
এমন হয়েছে।
রাগে, ক্ষোভে,
শোকে তিনি
স্কোরশিট ছিঁড়ে
ফেলেছিলেন। সেই
সময়টাতে তিনি
তাত্ত্বিক গণিতবিদ
হওয়ার কথা
স্বপ্নেও ভাবেননি।
কিন্তু ফারযেইনজান
স্কুলের অধ্যক্ষের
প্রচেষ্টায় গণিত
অলিম্পিয়াডে অংশ
নেয়ার সুযোগ
হয় মারিয়ামের,
১৯৯৪ সালে
হংকংয়ে এবং
পরের বছর
কানাডায় গোল্ড
মেডেল অর্জন
করেন। একটি
বিষয়ে নিখুঁত
স্কোর করেন
মারিয়াম এবং
অলিম্পিয়াডের ইতিহাসের
সর্বোচ্চ সম্মাননা
লাভ করেন।
এ রকম
অর্জনের পর
শরিফ ইউনিভার্সিটি
অব টেকনোলজিতে
সরাসরি সুযোগ
পেয়ে যান
মারিয়াম, সেখানে
হাঙ্গেরিয়ান গণিতবিদ
পল আরডোসের
আড়াই দশক
আগের সৃষ্ট
গাণিতিক সমস্যাটির
সমাধান করে
তাক লাগিয়ে
দেন।
মারিয়াম মির্জাখানি
২০০৪ সালে
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে পিএইচডি
লাভ করেন।
এরপর আটলান্টিক
পাড়ি দিয়ে
উড়ে যান
অক্সফোর্ডের ক্লে
ম্যাথমেটিক্যাল ইনস্টিটিউটে,
যাদের ব্রত
ছিল মানুষের
সাংস্কৃতিক ও
বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে
গাণিতিক চিন্তার
সৌন্দর্য ও
ক্ষমতাকে কাজে
লাগানো। সেখান
থেকে ফেলোশিপ
সম্পন্ন করে
মারিয়াম প্রিন্সটন
বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি
পদ লাভ
করেন। শিগগিরই
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
মাত্র ৩২
বছর বয়সেই
তাকে পূর্ণ
অধ্যাপকের পদ
অর্পণ করে।
সেখানে কাজ
শুরু করার
পর রাইম্যান
সমতল ও
স্থানিক জ্যামিতিতে
অবদানের জন্য
ইতিহাস সৃষ্টি
করে ফিল্ড
মেডেল লাভ
করেন মারিয়াম।
নেচার জার্নাল
তাকে ২০১৪
সালে ১০
জন মানুষের
একজন গণ্য
করেন যারা
পৃথিবীর জন্য
সব থেকে
গুরুত্বপূর্ণ।
মারিয়ামের ভাষায়
গণিতের সৌন্দর্য
তার কাছেই
ধরা দেয়,
যে ধৈর্য
ধরে অনুসরণ
করতে পারে
একে। তিনি
দাবি করতেন
যে তিনি
একজন ধীর
চিন্তক, অনেকটা
সময় ব্যয়
করার পরই
কেবল পরিষ্কার
হতো তার
কাছে পথটা।
তার কাছে
গাণিতিক সমস্যার
সমাধান ছিল
যেন জঙ্গলে
হারিয়ে যাওয়া,
সমস্ত জ্ঞানকে
ব্যবহার করে
এরপর একটি
কৌশল যার
প্রয়োগ ও
কিছুটা ভাগ্যের
সহায়তায় এরপর
পাহাড়ের চুড়োয়
উঠে যাওয়া
আর সবকিছু
পরিষ্কার দেখতে
পাওয়া, বিস্তৃতভাবে।
মারিয়াম তরুণ
প্রজন্মের উদ্দেশে
বলেন, ‘জানার
চেষ্টা করো,
আসলেই তুমি
কী চাও,
আর কখনই
পথ-বিচ্যুত
হয়ো না।’
মারিয়াম বিনোদন
শিল্পে ‘জিনিয়াস’-এর
যে অদ্ভুতুড়ে
রূপটি প্রদর্শিত
হয়, সে
রকম ছিলেন
না। তার
বন্ধুরা বলেন,
‘মারিয়াম
আর দশজনের
মতোই মনোরম
ছিলেন এবং
আমরা তাকে
এ রকমই
ভালোবাসতাম যদি
তার কোনো
স্বীকৃতি নাও
থাকত।’
মোহাম্মদ কাজী মামুন: লেখক





