‘খাদিজা ছিলেন স্বাধীনচেতা ও অত্যন্ত দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন এক নারী’—নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন ইতিহাসের অধ্যাপক রবার্ট হোইল্যান্ড এভাবেই বর্ণনা করেছেন বিবি খাদিজাকে (রা.)। তার এ ব্যক্তিত্বের প্রমাণ মেলে জীবনের নানা কালপর্বে। তিনি সেকালের আরবের ঐতিহ্য অনুসারে তার সম্পর্কীয় ভাইদের বিয়ে করতে অস্বীকার করেছিলেন। খাদিজা (রা.) চেয়েছিলেন, তিনি নিজেই তার জীবনসঙ্গী বেছে নেবেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন রাসুলকে (সা.)।

যখন রাসুল (সা.) আরবের প্রতিকূল পরিবেশে ওহি প্রচার শুরু করেন, সেই কঠিন সময়ে বিবি খাদিজা তার পাশে ছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন নবীজীবনের নিষ্ঠা আর একাগ্রতা। তাকে আগলে রাখতে চেয়েছেন সব মানবিক সামর্থ্য দিয়ে। যখন কেউ রাসুলকে (সা.) বিশ্বাস করেনি, খাদিজা করেছেন। ইসলামের সেই প্রাথমিককালে বিবি খাদিজার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে।

খাদিজা যখন রাসুলকে (সা.) বিয়ে করেন, তখন তিনি আরবের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত নারী ও একজন স্বাধীন উদ্যোক্তা। তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ীর কন্যা। তার পিতা বিরাট এক বাণিজ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। এক যুদ্ধে তিনি নিহত হন। তার পর পারিবারিক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন খাদিজা। ইতিহাসবিদ ও লেখক বেটানি হিউজ বলেন, ‘স্পষ্টতই তিনি তার নিজের পথ নিজে তৈরি করে নিতে অভ্যস্ত ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তার এই যে ব্যবসায়িক দক্ষতা—এটাই তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেয়।’

খাদিজা (রা.) পারিবারিক সূত্রে অনেক ধনসম্পত্তি পেয়েছিলেন সত্য, কিন্তু তিনি সেখানেই থেমে থাকেননি। বরং নিজে দক্ষ হাতে ব্যবসা পরিচালনা এবং তা বিস্তৃত করেছেন। ব্যবসাকে বিস্তৃত করতে তিনি দক্ষ ও সৎ কর্মী খুঁজেছেন। এ ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতো রাসুলকে (সা.) বাছাই করলেন ব্যবসার দায়িত্ব অর্পণ করতে। তখন মক্কা থেকে উত্তরে রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্য কাফেলা প্রেরিত হতো। এসব কাফেলায় থাকত পশুর চামড়া, পশমি কাপড় আর সুগন্ধি দ্রব্যের মতো পণ্যের চালান। খাদিজারও ছিল এমন কাফেলা। মক্কার ব্যবসায়ীদের মতো খাদিজার পণ্যেরও প্রধান গ্রাহক ছিল মূলত রোমান অধ্যুষিত সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীতে তখন চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা ব্যাপক। রাসুল (সা.) যখন দুই মাসের ব্যবসায়িক সফর শেষে ফিরলেন, প্রমাণিত হয়ে গেল খাদিজার আস্থা জলে যায়নি। উপরন্তু সফরসঙ্গীদের কাছে শোনা রাসুলের (সা.) সততা আর ব্যক্তিত্ব তাকে আরো আস্থাশীল করে তুলল। পিতামাতা হারানো এক তরুণের ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠতা, কঠোর পরিশ্রম, চারিত্রিক দৃঢ়তা আর আলোকময় পদচারণা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে খাদিজা নিজে থেকেই প্রস্তাব দিলেন বিয়ের। রাসুল (সা.) তা প্রত্যাখ্যান করেননি। শুরু হলো নতুন সময়ের।

খাদিজা (রা.) রাসুলকে (সা.) স্বীকৃতি দিতে দেরি করেননি। এখানেই তার মহত্ত্ব। খাদিজা স্বামীকে নিয়ে কতটা দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন, নবুয়ত-পরবর্তী আচরণে তা স্পষ্ট। ওহির প্রথম ঘটনার পরই তলব করেন ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেলকে। মক্কায় তখন হানিফ নামে ছোট সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল, যারা ইবরাহিমের (আ.) শিক্ষার ওপর নিজেদের প্রতিষ্ঠিত রাখার প্রয়াস চালাচ্ছেন। ওয়ারাকা তাদেরই একজন। ওয়ারাকাও আরবদের মধ্য থেকে একজন নবীর আগমনে বিশ্বাস করত। খাদিজা যখন তার কাছে রাসুলের (সা.) অভিজ্ঞতা বললেন, বিস্ময়ে অভিভূত ওয়ারাকা জানালেন পূর্ববর্তী নবীদের বৈশিষ্ট্য। জানালেন রাসুলের (সা.) সফলতা ও সম্ভাব্য প্রতিকূলতার কথা। জোর তাগিদ দিলেন স্বামীর ব্যাপারে আরো বেশি সচেতন হওয়ার জন্য।

নানা ব্যাপারেই রাসুল (সা.) খাদিজার কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন। ভরসা করতেন। সে যুগে মক্কার দুরবস্থা বিমর্ষ করত রাসুলকে (সা.)। সেই দুশ্চিন্তার ভার যেন সাহস আর শক্তিতে পরিণত হতো খাদিজার কাছে। হেরায় ঐকান্তিক ধ্যানমগ্নতা নির্বিঘ্ন করতে করেছেন খাবার সরবরাহ। রাসুলও (সা.) ঘরে ফিরে এসে খাদিজার কাছে বর্ণনা করতেন হেরার অভিজ্ঞতা। নবুয়তপ্রাপ্তির পর ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়েও পরামর্শ হতো খাদিজার সঙ্গে।

খাদিজা (রা.) চাইতেন রাসুল (সা.) যেন ইসলাম প্রচারে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেন। এ পর্বে তিনি ব্যবসা বা আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিজেই সামলেছেন। রাসুলকে (সা.) শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে খাদিজা তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকেও ব্যবহার করেছেন।

কোরআনের শিক্ষা প্রচারের সময় ক্রমে প্রতিকূল হয়ে ওঠে চারপাশ। কুরাইশরা নানাভাবে বাধা দিতে থাকল রাসুলের (সা.) প্রচারণায়। অবশেষে নবুয়তের সপ্তম বছরে গিয়ে নিল শেষ পদক্ষেপ। বনু হাশিম ও বনু আবদে মুত্তালিবকে সবকিছু থেকে বয়কট করা হলো। আরব সমাজ ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই গোত্রকেন্দ্রিকতা। যেকোনো প্রকার বয়কট তাই ভয়াবহ। পরিণামে টানা তিন বছরের জন্য মারাত্মক দুর্দশার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে মুসলমানরা। পুরো সময়জুড়েই নিজের অর্জিত সম্পদ, পরিচিতি আর প্রতিপত্তিকে নির্দ্বিধায় খাদিজা খরচ করেছেন ক্ষুদ্র মুসলমান সমাজের কল্যাণে।

রাসুল (সা.) আর খাদিজার (রা.) সম্পর্কও ছিল অন্য মাত্রার। খাদিজার জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করেননি রাসুল (সা.)। জিবরাইল যখন রাসুলকে (সা.) ঐশী নির্দেশনা শিখিয়ে দিতেন, রাসুলের (সা.) পরেই সবার আগে সেই বার্তা পৌঁছত খাদিজার কানে। নবুয়তের প্রথম তিন বছর রাসুল (সা.) শুধু নিজের পরিবারে অর্থাৎ স্ত্রী খাদিজা, নিজ কন্যা ও আলীকে (রা.) দ্বীন শিক্ষা দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সবকিছুই দুর্লভ। এমনকি খাদ্যও কিনে আনতে হয় রাতের আঁধারে। বয়কটের সেই কষ্টকর সময়ে বিরান উপত্যকায় ৬১৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন খাদিজা। তার তিনদিন পরেই মৃত্যুবরণ করেন রাসুলের (সা.) চাচা ও আলীর (রা.) পিতা আবু তালিব। এ দুই আঘাত রাসুলের (সা.) জীবনে এতটাই প্রবল ছিল যে বছরটির নাম হয় ইয়াওমুল হুযুন বা বিষাদের বছর। তার তিন বছর পরেই রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। মুসলমানরা প্রতিষ্ঠিত করে নিজেদের। কেবল মক্কা নগরী না, পদানত করে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যকেও। কিন্তু রাসুলের (সা.) জীবনে খাদিজা ছিলেন অতুলনীয়। প্রায়ই সাহাবিদের কাছে তুলে ধরতেন খাদিজার ত্যাগের কথা। কুরবানি হলে মাংস পাঠাতেন খাদিজার পরিচিতজনদের মাঝে। যখনই খাদিজার প্রসঙ্গ উঠত, আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়তেন।

রাসুল (সা.) আর খাদিজার কন্যা ফাতিমা (রা.)। বেড়ে ওঠা খাদিজার (রা.) মতো নারীর তত্ত্বাবধানে। ফাতিমার বিয়ে হয় আলীর (রা.) সঙ্গে। আলী নিজেও শৈশব থেকে বেড়ে উঠেছেন রাসুলের (সা.) তত্ত্বাবধানে। ইসলাম যখন পরিবারের বাইরে প্রচার শুরু হয়নি, তখনো আলী মুসলিম। ওহি নাজিলের প্রথম আয়াত থেকেই বিশ্বাসী। ফাতিমা সেই দুই তরুণ হাসান ও হোসেনের মাতা, যাদের জান্নাতের নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরও নিজের জ্যোতিতে উজ্জ্বল ফাতিমা। এজন্য তার আরেক নাম জাহরা বা জ্যোতির্ময়ী।

৬১০ সালে অর্থাৎ ওহির যাত্রার বছরেই তার জন্ম বলে ধারণা করা হয়। খাদিজা যেদিন মৃত্যুবরণ করলেন, কন্যা ফাতিমা তখন কান্নায় অস্থির। ফাতিমার পরিচিতি পাওয়া যায় আরো এক জায়গায়। যখন কুরাইশরা রাসুলকে (সা.) অপমান করেছে, ফাতিমা ছুটে এসেছে পিতার সেবায়। রাসুল (সা.) নিজেও ফাতিমাকে কাছ ছাড়া করতে চাননি। বিয়ে দিয়েছেন আলীর কাছে। বসবাস করতেন কাছাকাছিই। যখন তিনি রাসুলের (সা.) বাড়িতে প্রবেশ করতেন, রাসুল (সা.) তার জন্য উঠে দাঁড়াতেন, তার হাত ধরতেন, হাতে চুমু দিতেন এবং নিজের আসনে বসাতেন। অন্যদিকে যখন রাসুল (সা.) তার গৃহে প্রবেশ করতেন, তখন তিনি উঠে দাঁড়াতেন, রাসুলের (সা.) হাত ধরতেন, চুমু দিতেন এবং নিজের আসনে বসাতেন।

রাসুলের (সা.) অসুস্থতার সময়ে ফাতিমা দেখাশোনা করতেন। খাদিজার (রা.) মৃত্যুর পর ফাতিমা তার পিতাকে বিষাদ ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলাতে সহায়তা করেছেন। পিতা ও রাসুলের (সা.) প্রতি তার দায়িত্ববোধ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। তার ও আলীর (রা.) সংসারে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলেও তিনি রাসুলের (সা.) জন্য খাবার পাঠাতেন। রাসুলও (সা.) একই কাজ করতেন। মুসলমানরা যুদ্ধে গেলে তিনি সেনাদের জন্য খাবার রান্না করে পাঠাতেন। তার কথা মানুষ অনুপ্রাণিত হতো।

পরিশ্রম ও বদান্যতার জন্য তার খ্যাতি ছিল। ফাতিমা ব্যক্তিত্বের দিক থেকে দৃঢ় ছিলেন। একদিকে পিতার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক শুদ্ধতা আর অন্যদিকে মাতার কোমলতা ও নিষ্ঠা উভয়ের সমাবেশ ঘটেছিল যেন তার মাঝে। তাই অভিভাবকের মতো নিজে অভুক্ত অবস্থায় থেকেও অনাহারীর মুখে খাবার তুলে দিতেন। চিন্তিত হতেন মুসলিম উম্মাহ নিয়ে।

পিতার ওফাতের পরই ক্রমে নিজেকে সবার থেকে পৃথক করে নেন ফাতিমা। পুরুষ দূরের কথা, কোনো কুরাইশ নারী এমনকি রাসুলের (সা.) স্ত্রীর সঙ্গেও তিনি দেখা করতেন না। এমন অবস্থায় রাসুলের (সা.) ৭৫ দিন কিংবা ৯৫ দিন পর তিনিও ইহজীবন ত্যাগ করেন। আলী (রা.) তার দাফন সম্পন্ন করেন।

প্রথম খলিফা আবু বকরের কন্যা এবং রাসুলের (সা.) স্ত্রী আয়িশা (রা.)। মদিনায় রাসুলের (সা.) ইসলাম প্রচারসংক্রান্ত সব কাজকে কাছ থেকে দেখেছেন আয়িশা। নিজের সন্তান না থাকার পরও রাসুলপত্নী হিসেবে পেয়েছেন উম্মুল মুমিনিন খেতাব। সত্যিকার অর্থেই মুসলিম সমাজের অগ্রগতির জন্য তিনি দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছেন রাসুলের (সা.) অনুপস্থিতিতে। বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার জন্য খ্যাতি ছিল তার। তার সূত্রে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাদিস পাওয়া গিয়েছে। এর সংখ্যা ২ হাজার ২১০টি। রাসুলের (সা.) মৃত্যুর পর নানা সমস্যার জন্য সাহাবিরা তার কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। ছিলেন একাধারে মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুজতাহিদ, ফকিহ ও কবি।

কবিতা বিষয়ে আয়িশার জ্ঞানের কথা জানা যায় অনেক জীবনীকারের বিবরণে। আরবি ভাষাতেও তার গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। এসব গুণ চাপা পড়ে গিয়েছে ইসলামী শাস্ত্রে তার বিপুল অবদানের পেছনে। প্রাথমিককালের অনেক বিবরণে ইসলামপূর্ব আরবের লোককথা ও ঔষধবিদ্যায় আয়িশার জ্ঞানের কথা জানা যায়। নবম শতকের আরব ইতিহাসবিদ আল-বালাধুরি আয়িশার এ জ্ঞানের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, আয়িশা যেকোনো বিষয়ে পর্যবেক্ষণ এবং সেটা গভীরভাবে আত্মস্থ করতেন।

আল-বালাধুরি লিখেছেন, রাসুলের (সা.) সাহাবারা অনেকেই ইসলামের নানা আইন ও নীতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আয়িশার শরণাপন্ন হতেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা.) ও উসমান (রা.) নানা বিষয়ে আয়িশার পরামর্শ চাইতেন। ধর্মীয় সমস্যার সমাধান দানে শুধু নয়, কোরআন সংকলনের মতো বৃহত্তর উদ্যোগেও রেখেছেন অবদান।

রাসুল (সা.) আয়িশার ঘরে মৃত্যুরণ করেন। তার পিতা আবু বকরের (রা.) মতো তিনিও ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন গোটা জীবন। ইসলামপূর্ব যুগে আরবে নারীর অবস্থান ছিল ভয়াবহ। ইসলামে নারীর অধিকার, অবস্থান নিয়ে অনেক নীতি তার সূত্রে জানা যায়। রাসুলের (সা.) সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন, অন্য স্ত্রীর সঙ্গে ওঠাবসা, গৃহের ভেতরে রাসুলের (সা.) আচরণ গ্রন্থিত হয়েছে তার মাধ্যমে।

আবু বকরের পর ওমর (রা.) মুসলিম জাহানের খলিফা মনোনীত হন। আবু বকর (রা.) রিদ্দার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইসলাম ত্যাগকারী বড় একটা অংশকে নির্মূল করেন। ওমর সেই অভিযাত্রাকে আরো বিস্তৃত করতে থাকেন। উভয় সময়েই আয়িশা থেকেছেন প্রথম সারিতে। রাসুলের (সা.) সঙ্গেও আয়িশা অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি আহতদের সেবা করেছেন, তাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করতেন।

ইসলামের ইতিহাসের প্রথম গৃহযুদ্ধ বলে পরিচিত উটের যুদ্ধ নামকরণ হয়েছিল, কারণ আয়িশা (রা.) উটের পিঠে চেপে এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এ থেকে তার রাজনৈতিক প্রভাবটি স্পষ্ট হয়। এ যুদ্ধে পরাজয়ও তার রাজনৈতিক প্রভাবকে শেষ করে দেয়নি। বরং মুসলমানদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ইসলামী জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনি সবার কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন। আইন নিয়ে তার সঙ্গে পুরুষ বিদ্বানদের বিতর্ক হতো। জীবনের শেষ দুই বছর তিনি রাসুলের (সা.) কাছে শেখা নানা বিষয় সবাইকে বলে যান। তিনি ইসলামী আইন ও রীতিনীতির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য সচেষ্ট ছিলেন।

৫৮ হিজরি বর্ষে ১৭ রমজান মৃত্যুবরণ করেন আয়িশা (রা.)। তার আগে দীর্ঘ সময় নিজেকে ব্যয় করেছেন মুসলমানদের জন্য। তার অনাড়ম্বরতা আর দয়ার খ্যাতি ছিল। ইসলামী শরিয়তের এক-চতুর্থাংশ বর্ণিত হয়েছে আয়িশার (রা.) সূত্রে। এ কারণে আরবে ইসলামের প্রতিষ্ঠা এবং বিকাশে আয়িশার (রা.) অবদানকে ইতিহাসবিদরা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন।

খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ, ফাতিমা বিনতে মুহম্মদ ও আয়িশা বিনতে আবু বকর ইসলামের প্রতিষ্ঠা পর্বের আলোচনায় এই তিন নারীকে না আনলে তা অসম্পূর্ণ। মুসলিম সমাজ নিতান্ত দুর্বল অবস্থা থেকে পরবর্তীকালে আরব ভূখণ্ডের একচ্ছত্র কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইসলামের এ বিকাশ পর্বে পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারীরা রেখেছেন অবদান। সেই মুসলিম নারীদের পথপ্রদর্শক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন খাদিজা, ফাতিমা ও আয়িশা। ইতিহাসে তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র মর্যাদাপূর্ণ স্থান।

আহমেদ দীন রুমি: লেখক